Chapter -4⇒ভূমিরূপ

উ:- মানবজীবনে পর্বতের প্রভাব অপরিসীম। যেমন—

(1) জলবায়ুর ওপর প্রভাব : সুউচ্চ পর্বতশ্রেণি কোনো অঞ্চলের জলবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। যেমন – ভারতের উত্তরে হিমালয় পর্বত অবস্থান করায় গ্রীষ্মকালে জলীয় বাষ্পপূর্ণ দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটে এবং শীতকালে সাইবেরিয়ার শুষ্ক শীতল বাতাস ভারতে প্রবেশে বাধাপ্রাপ্ত হয়।

(2)নদনদীর উৎস : বরফাবৃত পর্বতমালা নদনদীর উৎস হিসেবে কাজ করে এবং নদীতে সারা বছর জলের জোগান দেয়।

 (3)বনজ সম্পদের প্রাচুর্য : পার্বত্য অঞ্চলের স্বাভাবিক উদ্ভিদ থেকে প্রচুর কাঠ, ভেষজ ওষুধ, ফল, মধু, মোম পাওয়া যায়।

(4)পশুচারণ ক্ষেত্র: পার্বত্য অঞ্চলের তৃণভূমিতে পশুচারণ করে বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন।

(5)ধাপ চাষ : পার্বত্য অঞ্চলে কৃষি অনুন্নত হলেও পর্বতের গায়ে ধাপ কেটে চা, কফি, ধান প্রভৃতির চাষ করা হয়।

(6) শিল্প: বনজ ও কৃষিজ সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বন্ধুর ভূপ্রকৃতিতেও চা শিল্প, কাগজ শিল্প, প্লাইউড শিল্প গড়ে উঠেছে।

(7)পর্যটন শিল্প : পার্বত্য অঞ্চলের মনোরম জলবায়ু ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনে সহায়তা করে থাকে। যেমন- ভারতে দার্জিলিং, মানালি, সিমলা এরকমই উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পর্যটন কেন্দ্র।

(8)জলবিদ্যুতের জোগান : পার্বত্য অঞ্চলে নদীগুলি খরস্রোতা হওয়ায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।

(9) বহিঃ শত্রুর আক্রমণ রোধ : দুর্গম পর্বতমালা প্রাচীরের মতো অবস্থান করে দেশকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। হিমালয় পর্বতটি বহু প্রাচীনকাল থেকেই প্রহরীর মতো বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে ভারতকে রক্ষা করছে।

উ:- মালভূমি (Plateau) : সমুদ্র সমতল থেকে 300 মিটার বা তারও কিছুটা ঊর্ধ্বে অবস্থিত, খাড়া ঢালযুক্ত সুবিস্তৃত তরঙ্গায়িত বা সামান্য বন্ধুর ভূভাগ মালভূমি নামে পরিচিত। প্রসঙ্গত, আকৃতিগতভাবে মালভূমি অনেকটা টেবিলের ন্যায় দেখতে হওয়ায় একে টেবিল ল্যান্ড' (Table Land) বলে।

 উদাহরণ : ভারতের দাক্ষিণাত্যছোটোনাগপুর মালভূমি, তিব্বতের পামির মালভূমি প্রভৃতি।

 মালভূমি সৃষ্টির কারণ : মালভূমি সৃষ্টি হওয়ার পিছনে সাধারণত তিনটি কারণ দায়ী। এগুলি হল –

(1) ভূ-আলোড়ন পাত সঞ্চরণ :

 (i) পাত সঞ্চরণ তত্ত্ব অনুসারে পাতগুলির চলনের ফলে পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রাচীন ভূখণ্ড ফেটে বিচ্ছিন্ন হয়ে মহাদেশীয় বা শিল্ড মালভূমি গঠন করে। যেমন— আরব মালভূমি, কানাডিয়ান শিল্ড প্রভৃতি।

 (ii) পাত সঞ্চরণের ফলে ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টির সময় পর্বতের মাঝের নীচু অসমতল ভূমি উঁচু হয়ে মালভূমি সৃষ্টি হয়। এগুলি পর্বত দ্বারা বেষ্টিত। যেমন –– তিব্বত মালভূমি, ইরানের মালভূমি প্রভৃতি।

(iii) অনেক সময় ভূ-আলোড়নের ফলে ভূপৃষ্ঠের বিস্তৃত সুউচ্চ ভূভাগ একদিকে হেলে পড়ে ও মালভূমিতে পরিণত হয়। যেমন— ভারতের উপদ্বীপীয় মালভূমি।

(iv) ভূ-আলোড়নের ফলে সৃষ্ট চ্যুতির পাশের কোনো অংশ অনেক সময় উত্থিত হয়ে মালভূমিতে পরিণত হয়। যেমন— ফ্রান্সের সেন্ট্রাল ম্যাসিফ্ মালভূমি।

(2)ক্ষয়সাধন : নদী, বায়ু, হিমবাহ, সমুদ্রতরঙ্গ, আবহবিকার প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা কোনো উচ্চভূমি বা পর্বতমালা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে মালভূমির আকার ধারণ করে। যেমন— মধ্য ভারতের বুন্দেল্খণ্ড ও বাঘেল্খণ্ড মালভূমি।

(3)সঞ্চয় কাড: (i) নিঃসারী অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ভূগর্ভস্থ ম্যাগমা ভূপৃষ্ঠের বাইরে এসে লাভারুপে সাধিত হয়ে মালভূমিতে পরিণত হয় । যেমন – ভারতের দাক্ষিণাত্য মালভূমি বা ডেকানট্রাপ । (ii) শুষ্ক অঞ্চলে বালুরাশি জমা হয়ে মালভূমি সৃষ্টি হয়। যেমন – আফ্রিকার সাহারা মালভূমি। (iii) অতিশীতল অঞ্চলে বরফ জমে উঁচু হয়ে মালভূমি সৃষ্টি হয়। যেমন—আন্টার্কটিকা মালভূমি ও গ্রিনল্যান্ড মালভূমি ।

উ:- পৃথিবীর প্রধান চারপ্রকার মালভূমি হল:  1)পর্বতবেষ্টিত মালভূমি, 2) লাভা মালভূমি ও 3)ব্যবচ্ছিন্ন মালভূমি, 4)মহাদেশীয়  ।

(1)পর্বতবেষ্টিত মালভূমি (Intermontane plateau) :

 সংজ্ঞা : যে-সকল  মালভূমি প্রায় চারদিকেই পর্বত  দ্বারা বেষ্টিত হয়ে সৃষ্টি হয়, তাকে  পর্বতবেষ্টিত মালভূমি বলে।

সৃষ্টির কারণ : পাত সঞ্চারণের ফলে বা গিরিজনি আলোড়নের ফলে, ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টির সময় পর্বতের মধ্যবর্তী নীচু অসমতল ভূমি প্রবল পার্শ্বচাপে উঁচু হয়ে পর্বতবেষ্টিত মালভূমি সৃষ্টি হয় ।

বৈশিষ্ট্য : (i) ভঙ্গিল পার্বত্য অঞ্চলে এই মালভূমি দেখা যায়। (ii) এগুলি অধিক উচ্চতাবিশিষ্ট হয়। (iii) মালভূমিগুলি পাললিক শিলায় গঠিত হয় এবং এতে জীবাশ্ম থাকতে পারে। (iv) চারদিক পর্বতবেষ্টিত হওয়ায় এখানকার পরিবেশ শুষ্ক প্রকৃতির হয়।

উদাহরণ : তিব্বত মালভূমি (বৃহত্তম পর্বতবেষ্টিত মালভূমি), পামির মালভূমি (উচ্চতম মালভূমি) প্রভৃতি।

(2) লাভা মালভূমি Volcanic Plateau): 

সংজ্ঞা : ভূপৃষ্ঠে ক্রমাগত  লাভা সঞ্চয়ের ফলে যে মালভূমির  হয়, তাকে লাভা মালভূমি বলে।

সৃষ্টির কারণ : ভূত্বকের  কোনো ফাটল বা ছিদ্রপথ দিয়ে ভুগর্ভের কোনো উত্তপ্ত ম্যাগমা ধীরে ধীরে বিদার   অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠের  বাইরে বেরিয়ে এসে লাভারূপে শীতল ও কঠিন হয়ে সঞ্চিত হয়।  এইভাবে ক্রমাগত বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুরে লাভা সঞ্চিত হয়ে উঁচু মাল্ভুমির সৃষ্টি হয় ।

বৈশিষ্ট্য : (i) সাধারণত মহাদেশের অভ্যন্তরে এই মালভূমি দেখা যায়। (ii) এই মালভূমি প্রধানত ব্যাসল্ট শিলায় গঠিত হয় । (iii)পর্যায়ক্রমে লাভা নিঃসরণের ফলে এই মালভূমিতে ‘সিঁড়ি -র মতো ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়। (iv) মালভূমির মাটি সাধারণত কালো রঙের হয় । (v)এই মালভূমির উপরিতল চ্যাপটা হয়।

উদাহরণ : দাক্ষিণাত্য মালভূমি, কলম্বিয়া মালভূমি, ইথিওপিয়া মালভূমি প্রভৃতি।

3)বাবচ্ছিন্ন মালভূমি (Dissected Plateau) :

সংজ্ঞা : কোনো বিস্তীর্ণ  মালভূমি অঞ্চল কতকগুলি নদী  উপত্যকা দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বিচ্ছিন্ন হলে,তাকে  বাবচ্ছিন্ন মালভূমি বলে।

সৃষ্টির কারন : কোনো উচ্চ মালভূমি কঠিন ও কোমল শিলায় গঠিত হলে বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি যেমন – আবহবিকার, নদী, বায়ু প্রভৃতির দ্বারা কোমল শিলা অধিক ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং কঠিন  শিলায় গঠিত অংশগুলি উঁচু হয়ে অবস্থান করে। পরবর্তীকালে ক্ষয়প্রাপ্ত নীচু কোমল শিলার ওপর নদীবিন্যাস গড়ে ওঠে এবং সমগ্র মালভূমিটি নদী উপত্যকা দ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়ে ব্যবচ্ছিন্ন মালভূমিতে পরিণত হয়।

বৈশিষ্ট্য: (I) মালভূমিগুলি প্রাচীন শিলা দ্বারা গঠিত ও খনিজ সমৃদ্ধ হয়। (II) কঠিন শিলাগঠিত অংশগুলির উচ্চতা প্রায় সমান হয়। (iii) মালভূমির উচ্চতা ক্রমহ্রাসমান। (iv) এই মালভূমির মাঝে ছোটো ছোটো গম্বুজাকৃতির পাহাড় দেখা যায়।

উদাহরণ: ছোটোনাগপুর মালভূমি, মালনাদ মালভূমি প্রভৃতি।

 4)মহাদেশীয় মালভূমি (Continental Plateau) : 

সংজ্ঞা: বিস্তীর্ণ মহাদেশীয় অংশ জুড়ে প্রাচীন শিলায় গঠিত মালভূমিকে মহাদেশীয় মালভূমি বলে।

সৃষ্টির কারণ : পাতসংস্থান তত্ত্ব অনুসারে পাত সঞ্চালনের ফলে পৃথিবীর প্রাচীন ভূখণ্ড (আঙ্গারাল্যান্ড ও গন্ডোয়ানাল্যান্ড) ফেটে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে মহাদেশীয় মালভূমি গঠিত হয়।

বৈশিষ্ট্য : (i)মহাদেশীয় মালভূমি প্রাচীন ভূখণ্ডের অংশ। (II) এগুলি প্রাচীন শিলায় গঠিত, তাই একে শিল্ড মালভূমিও বলা হয়।  (iii) এই প্রাচীন শিলা অত্যন্ত কঠিন ও সহজে ক্ষয় হয় না। (iv) মালভূমির পৃষ্ঠদেশ বা উপরিভাগ তরঙ্গায়িত। (V) এগুলি খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ।

উদাহরণ : গন্ডোয়ানাল্যান্ড বিচ্ছিন্ন হয়ে সৃষ্টি হয়েছে দাক্ষিণাত্য মালভূমি, আরবীয় মালভূমি, আফ্রিকা মালভূমি, ব্রাজিল মালভূমি ও পশ্চিম অস্ট্রেলীয় মালভূমি। অন্যান্য মহাদেশীয় মালভূমির মধ্যে রয়েছে কানাডিয়ান শিল্ড, সাইবেরিয়ান মালভূমি, বাল্টিক মালভূমি প্রভৃতি।

উ:- মানবজীবনের ওপর মালভূমির প্রভাব অপরিসীম। যেমন—

(1) খনিজ সম্পদের ভাণ্ডারস্বরূপ : মালভূমি অঞ্চল প্রচুর খনিজসম্পদে পূর্ণ হয় বলে একে খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার হিসেবে ধরা হয়। এখানে সাধারণত কয়লা, আকরিক লোহা, ম্যাঙ্গানিজ, নিকেল, তামা, অভ্র, চুনাপাথর প্রভৃতি মূল্যবান খনিজ সম্পদ পাওয়া যায়। খনিজ সম্পদের প্রাচুর্যের জন্য ভারতের ছোটোনাগপুর মালভূমিকেভারতের খনিজ ভাণ্ডার’ বলে।

(2) শিল্প স্থাপন : শিল্প গড়ে ওঠার প্রয়োজনীয় কাঁচামাল (খনিজ বা কৃষিজাত) সহজে পাওয়া যায় বলে এখানে বৃহদায়তন লৌহ-ইস্পাত শিল্প, ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প, কার্পাস বয়ন শিল্প গড়ে উঠেছে।

(3) কৃষিকাজ : মালভূমি অঞ্চলের বন্ধুর ভূপ্রকৃতি ও স্বল্প বৃষ্টিপাত কৃষিকাজের অনুপযোগী হলেও মালভূমির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী উপত্যকার উর্বর মাটিতে তুলো, ধান, পেঁয়াজ, আখ চাষ করা হয়। আবার মালভূমির খাড়া ঢালে চা, কফি, রবার চাষ করা যায়। যেমন— ভারতের দাক্ষিণাত্য মালভূমির কৃয়মৃত্তিকায় প্রচুর তুলো চাষ হয়।

(4) জলবিদ্যুতের প্রাচুর্য : বন্ধুর ভূপ্রকৃতির জন্য মালভূমি অঞ্চলের নদীগুলি খরস্রোতা হওয়ায় সহজেই জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কর যায়। যেমন— দক্ষিণ ভারতের প্রায় সব নদী থেকেই জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।

(5)বনজ সম্পদ : মালভূমি অঞ্চলে উৎপন্ন স্বাভাবিক উদ্ভিদ থেকে প্রচুর মূল্যবান বনজ সম্পদ পাওয়া যায়।

(6)পর্যটন শিল্পকেন্দ্র : মালভূমি অঞ্চলের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ এখানে পর্যটন শিল্পকেন্দ্র গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।

 

 

উ:- সমভূমি (Plain) : সমুদ্রপৃষ্ঠের একই সমতলে বা সামান্য উঁচুতে, তবে 300 মিটারের কম উঁচুতে অবস্থিত প্রায় সমতল বা সমতল বিস্তীর্ণ স্থলভাগকে সমভূমি বলে। যেমন – ভারতের গঙ্গা নদী বিধৌত সমভূমি অঞ্চল, রাশিয়ার সাইবেরিয়ান সমভূমি।

বিভিন্ন প্রকার সমভূমির সৃষ্টি : নিম্নলিখিত কারণে বিভিন্ন প্রকার সমভূমির সৃষ্টি হয়। যেমন—

(1)পলিগঠিত সমভূমি সৃষ্টি : বন্যার সময় নদীর মধ্য ও নিম্নগতিতে নদীর উভয় পার্শ্বে পলি, বালি, কাঁকর ইত্যাদি সঞ্চিত হয়ে যে সমভূমি গঠন করে, তাকে পলিগঠিত সমভূমি বলে।

উৎপত্তি :বর্ষাকালে নদীর দুকূল ছাপিয়ে বন্যার সৃষ্টি হলে বন্যার জলের সঙ্গে বাহিত পলি, বালি, নুড়ি, কাদা, কাঁকর নদীর উভয় তীরের নিম্নভূমিতে সঞ্চিত হয়। বছরের পর বছর এইভাবে। পলি সজ্জিত হয়ে নীচু জায়গা ভরাট হয়ে উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে সমভূমিতে পরিণত হয়।

 বৈশিষ্ট্য : (i) এই সমভূমি অত্যন্ত উত্তর প্রকৃতির হয়। (ii) প্রতি বছর বন্যায় নতুন করে পলি সজ্জিত হয়। (iii) প্লাবন সমভূমিতে কাঁকর, বালি, নুড়ি, কানা সজ্জিত হয়ে স্বাভাবিক বাঁধ বা Levree গঠিত হয়। (iv) এই সমভূমিতে নদী বাঁক, অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ দেখা যায়।

উদাহরণ : গাজোর সমভূমি, ব্রহ্মপুত্র সমভূমি প্রভৃতি।

(2)লোয়েস সমভূমি সৃষ্টি: সংজ্ঞা : মরুভূমির বালি বায়ুপ্রবাহের দ্বারা বহুদূর উঠে গিয়ে সজ্জিত হয়ে যে সমভূমি সৃষ্টি হয় তাকে লোয়েস সমভূমি বলে।‘লোয়েস’ শব্দের অর্থ  সূক্ষ্ম  পলি বা স্থানচ্যুত বস্তুকণা।

উৎপত্তি : সাধারণত 0.05মিলিমিটারের কম ব্যাসযুক্ত বালিকণা সহজেই প্রবল বায়ুপ্রবাহের সঙ্গে বাহিত হয়। এই বায়ুর গতি কমে গেলে বা বায়ু বৃষ্টিপাতের সম্মুখীন হলে বায়ুষিত বালিকণা অবক্ষিপ্ত হয় এবং লোয়েস সমভূমি গড়ে ওঠে।

বৈশিষ্ট্য : (I) এই সমভূমির গভীরতা কম হয়। (ii) এই সমভূমি প্রবেশ্য ও অনুর্বর হয়। (iii) এই সমভূমিতে স্তর বিন্যাস দেখা যায় না।

উদাহরণ : মধ্য এশিয়ার গোবি মরুভূমির বালি উড়ে গিয়ে চিনের হোয়াংহো নদী অববাহিকায় সজ্জিত হয়ে লোয়েস সমভূমি গড়ে উঠেছে।

(3)লান্ডা সমভূমি সৃষ্টি :

সংজ্ঞা : ভূপৃষ্ঠের কোনো নিম্ন অংশে ক্রমাগত লাভা সজ্জিত হয়ে যে সমতল ভূমির সৃষ্টি হয় তাকে লাভা সমভূমি বলে।

উৎপত্তি : ভূত্বকের কোনো দুর্বল অংশ বা ফাটল বিয়ে। ভূগর্ভের উত্তপ্ত ম্যাগমা ভূপৃত্তের বাইরে বেরিয়ে এসে লাভারূপে। শীতল ও কঠিন হয়ে সঞ্চিত হয়। এভাবে ক্রমাগত লাভা সঞ্চয়ের ফলে লাভা সমভূমি গড়ে ওঠে।

বৈশিষ্ট্য : (i) এই সমভূমি মহাদেশের অভ্যন্তরে দেখা যায়। (ii) এই সাধারণত শিলায় গঠিত হয়। (iii)এই সমভূমির মাটি কালো রঙের ও উর্বর হয়।

উদাহরন –ভারতের দাক্ষিণাত্য মালভূমির উত্তরে মালব সমভূমি, আইসল্যান্ডের সমভূমি প্রভৃতি।

(4)বদ্বীপ সমভূমির সৃষ্টি : নদীর মোহানায় অতিরিক্ত পলি সজ্জিত হয়ে মাত্রাহীন ‘ব’ আকৃতির সমভূমি গড়ে ওঠে। যেমন— গঙ্গ নদীর মোহানায় সৃষ্ট বদ্বীপ সমভূমি।

(5)হ্রদ সমভূমির সৃষ্টি : কোনো নদীবাহিত নুড়ি, বালি, পলি হ্রদে সজ্জিত হয়ে হ্রদ ভরাট হয়ে গেলে হ্রদ সমভূমি গঠিত ? যেমন— উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার তাল সমভূমি অঞ্চল।

(6)হিমবাহ সমভূমির সৃষ্টি : হিমবাহের দ্বারা সঞ্ঝিত নুড়ি কাঁকর জমে এই প্রকার সমভূমি সৃষ্টি হয়। যেমন— উত্তর আমেরিকা প্রেইরি সমভূমি

(7)ক্ষয়জাত সমভূমির সৃষ্টি : নীচু মালভূমি বা পার্বত্য অঞ্চল বা বছর ধরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে সমপ্রায় ভূমির সৃষ্টি করে। যেমন— ভারতের ছোটোনাগপুর মালভূমির কিছু কিছু অংশ

উ:-মানবজীবনে সমভূমির প্রভাব অপরিসীম। যেমন –

1) কৃষিকাজ : সমভূমি অঞ্চল উর্বর পলিমাটি দিয়ে গঠিত বলে পৃথিবীর অধিকাংশ কৃষিকাজ সমভূমি অঞ্চলেই হয়ে থাকে। এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে ধান, গম, তৈলবীজ, পাট, ডালজাতীয় শস্য, আখ, আলু, শাকসবজির চাষ হয়ে থাকে। এখানকার অধিবাসীদের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ।

2)পশুপালন : কৃষিকাজের পাশাপাশি এখানকার অধিবাসীদের অপর জীবিকা পশুপালন। সাধারণত গবাদি পশু, যেমন— গোরু, মোষ, ছাগল পালন করে থাকেন এবং দুধ, চামড়া ও অন্যান্য পশুজাত দ্রব্য বিক্রয় করে অর্থ উপার্জন করেন।

3)শিল্প : শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সহজলভ্যতা, উন্নত পরিবহণ ব্যবস্থা, ঘনবসতি, চাহিদাযুক্ত বাজার সমভূমি অঞ্চলে থাকার এখানে ধাতব এবং কৃষিভিত্তিক উভয় প্রকার শিল্পই স্থাপিত হতে দেখা যায়।

4)উন্নত পরিবহণ যোগাযোগ ব্যবস্থা : অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে সমভূমি অঞ্চলে উন্নতমানের সড়কপথ রেলপথসহ জলপথ ও বিমানপথ গড়ে উঠেছে। ফলে সহজেই দেশ-বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা যায়।

5)জীবনধারণের জন্য অনুকূল পরিবেশ : পৃথিবীর প্রায় 90% লোক সমভূমি অঞ্চলে বাস করে শুধুমাত্র জীবনধারণের পক্ষে অনুকূল প্রাকৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ থাকার জন্য।

6)শহর পত্তন : সুদুর অতীতকাল থেকেই ব্যাবসা-বাণিজ্যের সুবিধাসহ অন্যান্য সুযোগসুবিধা মানুষকে সমভূমি অঞ্চলে শহর পত্তনে উৎসাহী করেছে। যেমন— কলকাতা, বারাণসী, এলাহাবাদ প্রভৃতি।

উ:- অগ্ন্যুৎপাতের প্রকৃতি অনুযায়ী পৃথিবীতে নিম্নলিখিত তিন  ধরনের আগ্নেয়গিরি দেখা যায়। যেমন –

1)জীবন্ত বা সক্রিয় (Active) আগ্নেয়গিরি : এই আগ্নেয়গিরি   থেকে সবসময় কিংবা একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে অগ্ন্যুৎপাত   ঘটে। এরা দু-প্রকারের হয় -

(i) অবিরাম: যেসব আগ্নেয়গিরি থেকে ঘন ঘন কিংবা অনবরত   অগ্ন্যুৎপাত ঘটে, তাদের অবিরাম আগ্নেয়গিরি বলে। উদাহরণ-   ভিসুভিয়াস।

(ii) সবিরাম : যেসব আগ্নেয়গিরি থেকে দীর্ঘদিন পরপর বা   বিরামসহ অগ্ন্যুৎপাত ঘটে, তাদের সবিরাম আগ্নেয়গিরি বলে।   উদাহরণ— ইটালির স্ট্রোম্বলি।

2)সুপ্ত (Dormant) আগ্নেয়গিরি : এই আগ্নেয়গিরিগুলি   বর্তমানে নিষ্ক্রিয় থাকলেও ভবিষ্যতে যে-কোনো সময়ই অগ্ন্যুৎপাত   ঘটতে পারে। উদাহরণ- ভারতের ব্যারেন, জাপানের ফুজিয়ামা।

3)মৃত (Extinct) আগ্নেয়গিরি : এই আগ্নেয়গিরিগুলি থেকে   ভবিষ্যতে কখনোই আর অগ্ন্যুৎপাত ঘটবে না

উদাহরণ-   মায়ানমারের পোপো।

 

 

উ:- ভঙ্গিল পর্বতের বৈশিষ্ট্য :

1)সৃষ্টি : পৃথিবীর যাবতীয় ভঙ্গিল পর্বত গিরিজনি আলোড়নে   সৃষ্ট অনুভূমিক পার্শ্বচাপের ফলে পলিস্তরে ভাঁজ খেয়ে সৃষ্টি হয়েছে।

2)শিলা : প্রধানত পাললিক শিলা দ্বারা ভঙ্গিল পর্বত গঠিত হয়।   তবে অনেক সময় ম্যাগমা অনুপ্রবেশের ফলে আগ্নেয় শিলা এবং প্রবল   চাপের কারণে কিছু রূপান্তরিত শিলাও দেখা যায়।

3)ভাঁজের প্রকৃতি : প্রবল পার্শ্বচাপের কারণে এই পর্বতে ঊর্ধ্বভঙ্গ, অধোভঙ্গ,   প্রতিসম ভাঁজ, অপ্রতিসম ভাঁজ, ন্যাপ প্রভৃতি ভাঁজ দেখা যায়।

4)উচ্চতা : অন্যান্য পর্বত অপেক্ষা ভঙ্গিল পর্বতের উচ্চতা বেশি।   এই পর্বতে অসংখ্য সুউচ্চ শৃঙ্গ দেখা যায়।

5)বিস্তিত : সুবিশাল অঞ্চল জুড়ে এই পর্বত বিস্তৃত। এর প্রস্থ অপেক্ষা দৈর্ঘ্য অনেক বেশি।

6)জীবাশ্ম : পাললিক শিলা দ্বারা সৃষ্টি হওয়ায় ভঙ্গিল পর্বতে   জীবাশ্ম দেখা যায়।

7)বিভাগ: সময়কাল অনুসারে ভঙ্গিল পর্বত   দুইপ্রকার। যথা – (i) প্রাচীন ভঙ্গিল পর্বত (আরাবল্লি) ও (ii) নবীন   ভঙ্গিল পর্বত (হিমালয়)।

 8)ভূমিকম্প প্রবণতা : নবীন ভঙ্গিল পার্বত্য অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ।

উ:- স্তূপ পর্বতের বৈশিষ্ট্য: 

1)সৃষ্টি : দুটি সমান্তরাল চ্যুতির মধ্যবর্তী অংশ উত্থিত হলে   কিংবা, দুটি  সমান্তরাল চ্যুতির দুই  পার্শ্বস্থ অংশ বসে   গেলে স্তূপ পর্বত   সৃষ্টি হয়।

2)প্রযুক্ত বল : স্তূপ পর্বত  গঠনে অনুভূমিক ও  উল্লম্ব বল পরস্পর   কাজ করে।

3)পর্বতশীর্ষ : স্তূপ পর্বতের শীর্ষভাগ চ্যাপটা প্রকৃতির   হয়ে থাকে।

4) উচ্চতা : স্তূপ পর্বতের উচ্চতা মাঝারি হয়।

5)ঢাল : প্রায় প্রতিটি স্তূপ পর্বত খাড়া ঢালবিশিষ্ট হয়।

6)বিস্তৃতি : স্তূপ পর্বত দীর্ঘ অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত হয় না।

উ:- আগ্নেয় পর্বতের বৈশিষ্ট্য :

1)সৃষ্টি : মূলত পাতের সঞ্চালন, ভূ-আলোড়ন কিংবা ভূপৃষ্ঠের   ফাটল সৃষ্টির দ্বারা ভূ-অভ্যন্তরীণ গলিত পদার্থ উৎক্ষিপ্ত হয়ে আগ্নেয়   পর্বত সৃষ্টি হয়।

2)অবস্থান : ভূপৃষ্ঠের দুর্বল অংশ বা পাতসীমানা   বরাবর আগ্নেয় পর্বত দেখা যায়।

3)গাঠনিক উপাদান : আগ্নেয়শিলা,   ভস্ম, সিন্ডার প্রভৃতি দ্বারা এই পর্বত গঠিত হয়।

4)আকৃতি : আগ্নেয়   পর্বত সাধারণত শঙ্কু বা মোচাকৃতির হয়। তবে গম্বুজাকৃতিরও হয়ে   থাকে।

5)জ্বালামুখ : এই পর্বতে এক বা একাধিক ম্যাগমা নির্গমন   পথ বা জ্বালামুখ থাকে।

6)উচ্চতা : উচ্চতা মাঝারি প্রকৃতির। তবে   সক্রিয় আগ্নেয় পর্বতের উচ্চতা ক্রমশ বাড়তে থাকে।

7)ঢাল : এই   পর্বতের চারপাশের ঢাল বেশ খাড়া হয়।

8)ভূমিকম্প : অগ্ন্যুৎপাতের   সময় আগ্নেয় পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়।

উ:-  ক্ষয়জাত পর্বতের বৈশিষ্ট্য :

1)গঠন : বহির্জাত বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির ক্ষয়কার্যের ফলে   এই পর্বত গঠিত হয়

2)গঠনকারী শিলা : প্রধানত প্রাচীন ও কঠিন   আগ্নেয় ও রূপান্তরিত শিলা দ্বারা এই পর্বত গঠিত।

3)উচ্চতা : এই   পর্বতের উচ্চতা বেশি হয় না। ক্ষয়কার্যের ফলে এর উচ্চতা ক্রমশ হ্রাস   পায়।

4)শীর্ষদেশ : এই পর্বতের শীর্ষদেশ ছুঁচোলো বা তীক্ষ্ণ নয়,   অনেকটা গোলাকার বা গম্বুজের ন্যায়।

5)বয়স : ক্ষয়জাত পর্বতগুলি   বয়সে প্রাচীন ।

6)ঢাল ও বন্ধুরতা :পর্বতের চারপাশের ঢাল পার্বত্য ভূমির বন্ধুরতা কম হয়।

উঃ-মালভূমি  বৈশিষ্ট :

1)উচ্চতা : মালভূমি সাধারণত সমুদ্রতল থেকে 300 মিটারে   বেশি উঁচু হয়, তবে গর্বতবেষ্টিত মালভূমির উচ্চতা অনেক বেশি হয়।   যেমন- পামির মালভূমির উচ্চতা প্রায় 4,873 মিটার।

2) ঢাল: মালভূমি চারপাশে খাড়া ঢালযুক্ত হয়।

3)শীর্ষদেশ : মালভূমির বা উপরিভাগ অসমতল  তরঙ্গায়িত প্রকৃতির হয়।

4)আকৃতি : মালভূমির আকৃতি অনেকটা টেবিলের মতো, তাই একে   'টেবিল ল্যান্ড' বলে।

5)বিস্তার : মালভূমিগুলি বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে   অবস্থান করে।

6)গঠনকারী শিলা : মালভূমিগুলি সাধারণত   আগ্নেয় ও রূপান্তরিত শিলা দ্বারা গঠিত হয়।

7)পাহাড় : অনেক   মালভূমির উপরে ছোটো ছোটো পাহাড় দেখা যায়।   ছোটোনাগপুর মালভূমির পরেশনাথ পাহাড়।

8)খনিজ সম্পদ : অধিকাংশ মালভূমি খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হয়।

উঃ- সমভূমির বৈশিষ্ট্য :   1)উচ্চতা : সমভূমি সাধারণত সমুদ্রতল থেকে 300 মিটারের   মধ্যে অবস্থিত। 2)গঠন : সমভূমি প্রধানত ভূ-আলোড়ন, বিভিন্ন   প্রাকৃতিক শক্তির ক্ষয়কার্য এবং সঞ্চয়কার্যের ফলে গঠিত হয়। 3) বিস্তৃতি : সমভূমি বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে অবস্থান করে। স্থলভাগের   পর্বত, মালভূমি ও সমভূমির মধ্যে সমভূমিই অধিক স্থান জুড়ে   রয়েছে। 4)বন্ধুরতা : সমভূমি একেবারেই বন্ধুর প্রকৃতির নয়। এর   উপরিভাগ প্রায় সমতল হয়। 5)ঢাল : সমভূমির ঢাল খুব মৃদু।   সমভূমি ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে সমুদ্রে মিশে যায়। 6)পরিলক্ষিত   অঞ্চল : পৃথিবীর অধিকাংশ সমভূমি নদী, উপত্যকা ও সমুদ্র   উপকূলে গড়ে উঠেছে।

উ:- জীবাশ্ম = জীব + অশ্ম, জীব অর্থাৎ, যার জীবন আছে এবং   অশ্ম শব্দের অর্থ শিলা বা প্রস্তর। কোনো জীবদেহ শিলায় পরিণত   হলে বা প্রস্তরীভূত হলে, তাকে জীবাশ্ম বলে।

ভঙ্গিল পর্বতে জীবাশ্ম দেখা যাওয়ার কারণ : সমুদ্রগতে   যখন স্তরে স্তরে পলি   সম্ভিত হয় তখন তার   মধ্যে বিভিন্ন সামুদ্রিক   উদ্ভিদ ও প্রাণী চাপা   পড়ে যায়। বহু কোটি   বছর ধরে ওই পলি   জমাট বেঁধে পাললিক শিলায় পরিণত হবার সময় চাপা পড়া উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহের ছাগ   পাললিক শিলায় রয়ে যায়। ওই ছাপযুক্ত শিলাকে জীবাশ্ম বলে। এবার পাললিক শিলাস্তরের চাপবৃদ্ধির ফলে তা ভাঁজপ্রাপ্ত হয়ে ভঙ্গিল  পর্বত সৃষ্টি করে। তাই ভঙ্গিল পর্বতে জীবাশ্ম দেখা যায়। উদাহরণস্বরুপ   বলা যায়, টেথিস সাগরের বিশাল পলি সঞ্চিত হওয়ার সময় তার   জীবকুল জীবাশ্মে পরিণত হয় ও এই কারণে ভঙ্গিল পর্বত হিমালয়ে   জীবাশ্ম দেখা যায়।

 

উ:- পার্বত্য অঞ্চলে ভারী শিল্প গড়ে না ওঠার কারণগুলি হল –   

1)খনিজ সম্পদের অপ্রাপ্যতা : পার্বত্য অঞ্চলে খনিজ সম্পদ    যথেষ্ট পরিমাণে থাকলেও তা আহরণ করা খুবই কষ্টসাধ্য ও  ব্যয়সাপেক্ষ। সে কারণে পার্বত্য অঞ্চলে খনিজভিত্তিক ভারী শিল্প গড়ে    ওঠে না। 2) অনুন্নত পরিবহণ ব্যবস্থা : পার্বত্য অঞ্চলে বন্ধুর    ভূপ্রকৃতি অনুন্নত পরিবহণ ব্যবস্থার কারণ। তাই শিল্প স্থাপিত হলেও    তার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি ও উৎপাদিত দ্রব্য রপ্তানিতে    অসুবিধা হয়। 3)দক্ষ শ্রমিকের অভাব  : পার্বত্য অঞ্চল জনবিরল    বলে সেখানে শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ শ্রমিকের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। 4)মূলধন উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যার অভাব : পার্বত্য অঞ্চলে  মূলধন বিনিয়োগকারীর অভাব থাকায় শিল্পের প্রয়োজনীয় টাকার  অভাব ঘটে, ফলে উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যাযুক্ত যন্ত্রপাতি কেনা যায় না। ফলে  ভারী শিল্প গড়ে উঠতে পারে না। 5)চাহিদার অভাব : জনবিরল  পার্বত্য অঞ্চলে শিল্পজাত দ্রব্যের চাহিদাযুক্ত বাজারের অভাব রয়েছে  বলে এখানে ভারী শিল্প গড়ে ওঠে না।

উ:-  সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড়ে 900 মিটারের উঁচু, শিলাময়    বন্ধুর সুবিস্তীর্ণ ভূমিভাগ পার্বত্য অঞ্চল নামে পরিচিত।

পার্বত্য অঞ্চলের বেশ কিছু পরিবেশগত প্রতিকূলতা    এখানকার মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।    যেমন— 1)এখানকার ভূমিভাগ অত্যন্ত বন্ধুর। 2) কৃষিকাজের জন্য    প্রয়োজনীয় উর্বর মাটি এখানে খুব একটা পাওয়া যায় না। 3)এখানকার    রাস্তাঘাট যথেষ্ট অনুন্নত। 4) বাসস্থানগত দিক থেকে মানুষের    বিচ্ছিন্নতাও এই অঞ্চলে অত্যন্ত স্পষ্ট। যার ফলে পার্বত্য অঞ্চলে কৃষি    বা শিল্পের সুযোগ অনেক কম।    তবে এখানকার প্রতিকূল পরিবেশটিতে ঘন অরণ্যের কিংবা    ছোটো বড়ো তৃণভূমির যথেষ্ট প্রাধান্য থাকে। তাই এই প্রভাবটিকে    কাজে লাগিয়েই মানুষ পশুপালন করে থাকে।

উদাহরণ : কুমায়ূন হিমালয়ের খাতি, জাটোলি গ্রামের বেশ    কিছু মানুষ পশুপালনকেই তাদের জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছে।

উ:- প্রবল ভূ-আলোড়নের ফলে দুটি সমান্তরাল চ্যুতির মধ্যবর্তী    অংশ উল্লম্ব বা তির্যক যে-কোনো ভাবে উত্থিত হলেই তাকে স্তূপ পর্বত  বলা হয়। কিন্তু, যখন চ্যুতির মধ্যবর্তী অংশ কেবলমাত্র উল্লম্বভাবে    উত্থিত হয়ে পর্বত গঠন করে এবং যার চারপাশে খাড়া ঢাল দেখা    যায়, তাকে হোর্স্ট বলে। অর্থাৎ, হোর্স্ট হল এক বিশেষ ধরনের স্তূপ    পর্বত। পৃথিবীর বেশিরভাগ স্তূপ পর্বতই চ্যুতির মধ্যবর্তী অংশের    তির্যক বা হেলানো উত্থানের ফলে তৈরি হয়। তাই বলা যায় যে, সব  হোর্স্ট স্তুপ পর্বত হলেও সব স্তুপ পর্বত হোস্ট নয়।

উঃ- সংজ্ঞা : 'মেখলা’ শব্দের অর্থ কোমর বন্ধনী'। প্ৰশাস্ত    মহাসাগরকে বলয় বা কোমর বন্ধনীর মতো ঘিরে পৃথিবীর প্রায় 70%    আগ্নেয়গিরি অবস্থান করছে। তাই একে প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয়    মেখলা' বলে।

 বিস্তারঃ এই আগ্নেয় মেখলা বা বলয়টি প্রশান্ত মহাসাগরের    পূর্ব উপকূলে দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণে হর্ন অন্তরীপ থেকে শুরু করে।    আন্দিজ ও রকি পর্বতমালা হয়ে আলাস্কার মধ্য দিয়ে বেঁকে পশ্চিম    উপকূল বরাবর কামচাটকা, শাখালিন, জাপান, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ ও    ইন্দোনেশিয়া হয়ে দক্ষিণে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত।

সৃষ্টির কারণ : মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল বরাবর    অভিসারী পাত সীমান্তের অবস্থানের জন্য এই আগ্নেয় মেখলা সৃষ্টি    হয়েছে। পূর্ব উপকূলে আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাতের    সংঘর্ষের কারণে এবং পশ্চিম উপকূলে এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া পাতের    সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাতের সংঘর্ষের কারণে আগ্নেয়গিরিগুলি    গড়ে উঠেছে।

উল্লেখযোগ্য আগ্নেয়গিরি : প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব    উপকূলের উল্লেখযোগ্য আগ্নেয়গিরিগুলি হল আকোনকাগুয়া,    কটোপ্যাক্সি, পিলি, ওরিজাবা প্রভৃতি এবং পশ্চিম উপকূলের    উল্লেখযোগ্য আগ্নেয়গিরিগুলি হল ফুজিয়ামা, বাটুর, ক্রাকাতোয়া,    কিলাউইয়া, এরেবাস প্রভৃতি।

উ:-  'শিল্ড' শব্দের অর্থ 'বর্ম' বা 'ঢাল'। পৃথিবীর অতি প্রাচীন    মালভূমি যেগুলি বর্মের মতো খুব কঠিন শিলায় গঠিত সেগুলিকে শিল্ড    বলে। অর্থাৎ, প্রাচীন শিলায় গঠিত মালভূমিগুলিই শিল্ড নামে    পরিচিত। কিন্তু, যে-সকল মালভূমি প্রাচীন শিলায় গঠিত নয়, পরবর্তী। পর্যায়ে ভূ-আলোড়ন বা সঞ্জয়কাজ বা ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্টি   হয়েছে, সেগুলি শিল্ড নয়। সুতরাং, বলা যায় প্রত্যেকটি শিল্ড অঞ্চল।  মালভূমি হলেও, প্রতিটি মালভূমি কিন্তু শিল্ড অঞ্চল নয়।

উদাহরণ : কানাডিয়ান শিল্ড, সাইবেরিয়ান শিল্ড হল মালভূমি। কিন্তু, পামির ও তিব্বত মালভূমি শিল্ড অঞ্চল নয়।

উ:- দাক্ষিণাত্য মালভূমির চারদিকে বিভিন্ন পর্বত যেমন উত্তরে    সাতপুরা পর্বত, দক্ষিণে নীলগিরি পর্বত, পূর্বে পূর্বঘাট পর্বতমালা এবং    পশ্চিমে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা অবস্থান করলেও একে পর্বতবেষ্টিত  মালভূমি বলা হয় না, কারণ—

1)গিরিজনি আলোড়নের ফলে ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টির সময় দুই    বা ততোধিক পর্বতের মধ্যবর্তী অংশ উঁচু হয়ে পর্বতবেষ্টিত মালভূমির    সৃষ্টি হয়। কিন্তু দাক্ষিণাত্য মালভূমি এরূপে সৃষ্টি হয়নি।

2) ক্রিটেসিয়াস যুগে দক্ষিণ ভারতের বিশাল অংশ জুড়ে বিদার    অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে ভূঅভ্যন্তরের উত্তপ্ত ম্যাগমা ভূপৃষ্ঠের বাইরে    বেরিয়ে এসে লাভারূপে সঞ্চিত হয়ে দাক্ষিণাত্য মালভূমির সৃষ্টি  হয়েছে। তাই এটি একটি লাভা মালভূমি।

3)পর্বতবেষ্টিত মালভূমিগুলি সাধারণত পাললিক শিলায় গঠিত   হয়। কিন্তু দাক্ষিণাত্য মালভূমি আগ্নেয় শিলায় (ব্যাসল্ট) গঠিত।

4)পর্যায়ক্রমে লাভা নিঃসরণের ফলে দাক্ষিণাত্য মালভূমিতে    ‘সিঁড়ি'র মতো ধাপ দেখা যায়, তাই একে ডেকানট্র্যাপ’ বলে। পর্বতবেষ্টিত মালভূমি হলে দাক্ষিণাত্য মালভূমিতে এরূপ ধাপ দেখা যেত না।

উ:- সমভূমি অঞ্চলে ঘনবসতি গড়ে ওঠার কারণগুলি হল নিম্নরূপ- 

1)সমতলভূমি: সমভূমি অঞ্চল একেবারেই বন্ধুর প্রকৃতির নয়।  এখানকার সমপ্রায়ভূমিতে সহজেই লোকে বসতি স্থাপন করতে পারে।

2)উর্বর মৃত্তিকা : সমভূমি অঞ্চলের নদীবাহিত উর্বর পলি মৃত্তিকা কৃষিকাজের পক্ষে আদর্শ।

3)অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ : সমভূমি অঞ্চলের অনুকূল    প্রাকৃতিক পরিবেশ মানুষকে ঘনবসতি স্থাপনে আগ্রহী করেছে।

4) শিল্পের অবস্থান : প্রয়োজনীয় কাঁচামালসহ শিল্পের    প্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাব হয় না বলে সমভূমিতে শিল্প স্থাপন করা যায়।    ফলে জীবিকার সুবিধা মানুষকে বসতি স্থাপন করতে আগ্রহী করেছে।

5)উন্নত যোগাযোগ পরিবহণ ব্যবস্থা : সমভূমি অঞ্চলে    খুব সহজেই সড়কপথ, রেলপথসহ নদীতে জলপথ ও বিমানপথ    স্থাপন করা যায়। ফলে উন্নত যোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে    ওঠে যা ঘনবসতি গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

6)প্রশাসনিক সুবিধা : প্রাচীনকাল থেকেই প্রশাসনিক কাজকর্ম    চালনা করার জন্য সমভূমি অঞ্চলেই শহর স্থাপিত হয়েছে, ফলে    জনঘনত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমন— ভারতের জাতীয় রাজধানী শহর দিল্লি।

7)অন্যান্য সুযোগসুবিধা : জীবনযাপনের যাবতীয় সুযোগ সুবিধাসহ স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, অফিস, আদালতের সহজলভ্যতা  মানুষকে সমভূমিতে ঘনবসতি গড়ে তুলতে উৎসাহ দিয়েছে।

উ:- অবস্থান : ভারতের জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম     দিকে অবস্থিত তাজাকিস্তান রাষ্ট্রে পৃথিবীর সর্বোচ্চ মালভূমি পামির     অবস্থিত।

বৈশিষ্ট্য :

1)উচ্চতা : এই মালভূমির গড়     উচ্চতা প্রায় 4873  মিটার।

2)পৃথিবীর ছাদ :  অধিক     উচ্চতায় বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এই মালভূমি অবস্থান করে বলে একে     পৃথিবীর ছাদ বলে।

3) সর্বোচ্চ শৃঙ্গ : এই মালভূমির সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হল মাউন্ট     কমিউনিজম (7495 মি)।

4)পর্বতগ্রন্থি : মালভূমির পাশাপাশি পামির এশিয়ার একটি     উল্লেখযোগ্য পর্বতগ্রন্থি। এই পবর্তগ্রন্থি থেকে প্রসারিত পর্বতগুলি হল   -হিমালয়, লাদাখ, কারাকোরাম, কুয়েনলুন, আলতিনতাগ,     তিয়েনসান, হিন্দুকুশ, সুলেমান পর্বত প্রভৃতি।

উ:- উপরিভাগ কিছুটা সমতল ও চারপাশ খাড়া ঢালযুক্ত বাড়ির     ছাদের ন্যায় দেখতে মালভূমিগুলির গড় উচ্চতা 300 মিটারের সামান্য     বেশি হলেও পামির মালভূমির উচ্চতা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি,     প্রায় 4873 মিটার। এত উঁচুতে অবস্থিত হওয়ার জন্য পামিরকে  ‘পৃথিবীর ছাদ’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

 

উ:- মরুভূমির সূক্ষ্ম হলুদ বর্ণের চুনময় বালুকণা কখনো কখনো     বায়ুর মাধ্যমে বহু দূরে উড়ে গিয়ে সঞ্চিত হয়ে যে সমভূমির সৃষ্টি     করে, তাকে লোয়েস সমভূমি বলে। মঙ্গোলিয়ার গোবি মরুভূমি     থেকে লোয়েস বায়ু বাহিত হয়ে চিনের হোয়াংহো নদীর অববাহিকায়     লোয়েস সমভূমি গঠন করেছে।