Chapter-4, ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রধান বৈশিষ্ট্য:
বড়লাট লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের ২২ মার্চ বাংলা প্রদেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল—
1 জমিদারি ব্যবস্থা বংশানুক্রমিক : চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিতে জমিদারের স্থায়ী স্বত্ব স্বীকৃত হয়। জমিদার নির্দিষ্ট পরিমাণ বার্ষিক রাজস্ব জমা দিয়ে বংশানুক্রমিকভাবে জমিদারি ভোগ করতে পারতেন।
2 সূর্যাস্ত আইন : চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে সরকার নির্ধারিত রাজস্ব বছরের নির্দিষ্ট দিনের সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বে জমা দিতে হত। কোনো জমিদার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাজস্ব জমা দিতে না পারলে তাঁর জমিদারি হাতছাড়া হতে পারত।
3 স্থায়ী রাজস্ব : চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারের ওপর ধার্য রাজস্ব স্থায়ী ছিল।
4 রাজস্ব আদায়ে কঠোরতা : চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে কঠোরভাবে নির্দিষ্ট রাজস্ব আদায় করা হত। খরা, বন্যা, মহামারি বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটলেও রাজস্ব মকুব করা হত না।

বাংলার গভর্নর-জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলার জমিদারদের সঙ্গে ভূমিরাজস্ব আদায়ের জন্য চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করেছিলেন। এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাবে বাংলার কৃষক সমাজ কিছু সুফল পেলেও অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুফল
1 চাষযোগ্য জমির পরিমাণবৃদ্ধি : চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদারগণ জমির মালিকানা সম্বন্ধে নিশ্চিত হন। তাই তারা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বনজঙ্গল পরিষ্কার করে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ বাড়াতে থাকে। তারা জমিতে মূলধন বিনিয়োগেও উৎসাহ। পান।
2 কৃষক সমাজে সংস্কারমূলক কাজ : জমিদারগণ বংশানুক্রমিক জমিদারি স্বত্ লাভ করার ফলে অনেক জমিদার নিজ নিজ এলাকার উন্নয়নে মনোনিবেশ করেছিলেন। জমিদারদের উদ্যোগে অনেক বিদ্যালয়, চিকিৎসালয়, পুষ্করিণী, পথঘাট নির্মিত হয়েছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাংলার কৃষককুলের ক্ষতি : চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাংলার কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তারা বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল—
1 জর্মির স্বত্বহীনতা : চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিতে কৃষকদের কোনো মালিকানা-স্বত্ব ছিল না— কৃষকদের স্বত্ব খারিজ করে তাদের প্রজায় পরিণত করা হয়েছিল।
2 জমি থেকে উৎখাত : এই বন্দোবস্তে জমিতে কৃষকের অস্তিত্ব জমিদারের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কৃষক খাজনা দিতে না পারলে তার জমি জমিদার বাজেয়াপ্ত করত। জমিদার ইচ্ছা করলে যখন তখন জমি থেকে প্রজাকে উচ্ছেদ করতে পারত।
3 অভ্যধিক রাজস্ব : চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদাররা কৃষকদের কাছ থেকে জোর করে বাড়তি রাজস্ব আদায় করত। তা ছাড়া কৃষকদের কাছ থেকে নানা ধরনের আবওয়াব বা বে-আইনি কর আদায় করা হত। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে জমিদাররা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ৩৫ লক্ষ পাউন্ড রাজস্ব দেওয়ার কথা বলেছিল
কিন্তু তারা কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করেছিল ১ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা। বাংলার কৃষক পরিবার
4 কৃষকদের ওপর অত্যাচার : চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারগণ বা মধ্যস্বত্বভোগী সম্প্রদায় কৃষকদের কাছ থেকে অত্যধিক হারে রাজস্ব দাবি করত। কৃষকগণ এই বাড়তি রাজস্ব দিতে না পারলে জমিদাররা তাদের ওপর অত্যাচার করত।

বায়তওয়ারি বন্দোবস্ত : ইংরেজ আমলে সরকারের সঙ্গে রায়ত বা কৃষকের সরাসরি রাজস্ব প্রদানের ব্যবস্থাকে রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত বলা হয়। মাদ্রাজের গভর্নর থমাস মনরো-কে ‘রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের জনক' বলা হয়। ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে এই রাজস্ব ব্যবস্থা চালু হয়েছিল।
রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের বৈশিষ্ট্য : রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের বৈশিষ্ট্যগুলি হল-
1 এই ব্যবস্থায় রায়ত বা কৃষকের সঙ্গে সরকারের সরাসরি রাজস্বপ্রদানের ব্যবস্থা ছিল।
2 এই ব্যবস্থায় রায়ত জমির মালিক হতেন না, তিনি নির্দিষ্ট খাজনা দেওয়ার বিনিময়ে জমি ভোগ করার অধিকার পেতেন।
3 এই ব্যবস্থায় রাজস্বের হার নির্ধারিত হত উৎপন্ন ফসলের অংশ হিসেবে। আবার কোথাও ৪৫ শতাংশ, কোথাও ৫৫ শতাংশ খাজনা নেওয়া হত।
4 এই ব্যবস্থায় ইচ্ছেমতো যখন তখন রাজস্ব বৃদ্ধি করা হত না, ২০-৩০ বছর অন্তর রাজস্বের হার বৃদ্ধি করা হত।

রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের ফলাফল : রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের সুফল ও কুফল দুই-ই ছিল— সুফল : রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের সুফলগুলি হল—
1 রায়তওয়ারি বন্দোবস্তে মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির শোষণ ছিল না।
2 এই ব্যবস্থায় কৃষককে সরকার নির্ধারিত রাজস্বই দিতে হত বাড়তি কর দিতে হত না। নিয়মিত খাজনা প্রদান করলে জমি থেকে রায়তকে উচ্ছেদ করা হত না।
কুফল : রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের কুফলগুলি হল—
1 এই ব্যবস্থায় কৃষক জমির মালিকানা পেত না। কৃষক ছিল কোম্পানির ‘ভাড়াটে চাষি’ মাত্র।
2 এই ব্যবস্থায় রাজস্বের হার ছিল খুব বেশি।
3 এই ব্যবস্থায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলেও খাজনা হারে রদবদল করা হত না।

মহলওয়ারি বন্দোবস্ত : ইংরেজ আমলে যে ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থায় সরকার কয়েকটি গ্রামের বা মহলের রাজস্ব গ্রাম প্রধানেরমাধ্যমে আদায় করত তাকে মহলওয়ারি বন্দোবস্ত বলা হয়। বোর্ড অফ কমিশনার্স-এর সম্পাদক হোল্ট ম্যাকেঞ্জিকে ‘মহলওয়ারি বন্দোবস্তের জনক' বলা হয়। এই বন্দোবস্ত উত্তর-পশ্চিম ভারত, মধ্য ভারত ও গাঙ্গেয় উপত্যকা অঞ্চলে চালু ছিল।
★ মহলওয়ারি বন্দোবস্তের বৈশিষ্ট্য:
1 মহলওয়ারি বন্দোবস্তে একটি অঞ্চলের রাজস্ব নির্ধারণ করে গ্রামবাসীদের মধ্যে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হত।
2 জমি জরিপ করে জমির উৎপাদন ক্ষমতা অনুসারে রাজস্ব নির্ধারিত হত। এতে রাজস্বের হার ছিল উৎপন্ন ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ।
3 এই ব্যবস্থায় সরকার ও রায়তের মাঝে গ্রাম প্রধান ছাড়া আর কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছিল না।
4 এই ব্যবস্থায় ২০/৩০ বছর অন্তর রাজস্বের পরিবর্তন হত।
» মহলওয়ারি বন্দোবস্তের ফলাফল : মহলওয়ারি বন্দোবস্তের সুফল ও কুফল দুই ছিল।
সুফল :
1 মহলওয়ারি বন্দোবস্তে গ্রামপ্রধান ছাড়া আর কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছিল না বলে শোষণ ও অত্যাচার ছিল না।
2 এই ব্যবস্থায় ইচ্ছামতো যখন তখন রাজস্ব বৃদ্ধি করা হত না।
3 কোনো ব্যক্তি সময়মতো রাজস্ব দিতে না-পারলেও সরকার তাকে জমি থেকে উৎখাত করত না। কারণ, সরকার গ্রামের প্রধানের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় করত।
কুফল:
1 মহলওয়ারি বন্দোবস্তে কৃষক জমির মালিকানা স্বত্ব পেত না— জমি ভোগ করার অধিকার পেত মাত্র।
2 এই ব্যবস্থায় অনেক সময় গ্রামপ্রধান গ্রামের কৃষকদের ওপর অত্যাচার করত।
3 এই ব্যবস্থায় রাজস্বের হার ছিল অত্যন্ত বেশি। কোনো কৃষক রাজস্ব দিতে না পারলে অন্যদের সেই রাজস্ব মিটিয়ে দিতে হত, না হলে সকলের জমি হাত ছাড়া হয়ে যেত। তাই মহলওয়ারি বন্দোবস্তকে একটি ‘ভীতিপ্রদ পরীক্ষা’ বলে অভিহিত করা হয়।

উনিশ শতকে ইংরেজ শাসিত ভারতে মূলত তিন ধরনের ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা চালু ছিল— 1  পূর্বভারত বা বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত 2 উত্তর ও পশ্চিম ভারতে মহলওয়ারি বন্দোবস্ত 3 দক্ষিণ ভারতে রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত। উনিশ শতকের ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর ভূমিরাজস্ব নীতির প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।
★ প্রভাব:
[1 ঐতিহ্যগত অর্থনৈতিক সম্পর্কের অবসান : ভারতে নতুন ব্রিটিশ ভূমিরাজস্ব নীতির ফলে ভারতের চিরাচরিত ও ঐতিহ্যগত অর্থনৈতিক সম্পর্কের অবসান ঘটে। মুঘল আমলে জমিদার জমির মালিক ছিলেন না— রাজস্ব আদায়কারী ছিলেন। কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদার জমির মালিক হন আর কৃষকরা ভাড়াটে প্রজায় পরিণত হয়।
2 কৃষকদের দুর্দশা বৃদ্ধি : ইংরেজ আমলে নতুন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল সবচেয়ে বেশি পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদার ইচ্ছামতো রাজস্ব আদায় করতেন, রায়তওয়ারি বন্দোবস্তে রাজস্বের হার ছিল ৪৫%-৫৫%।
3. 'মহাজন’দের প্রভাব বৃদ্ধি : নতুন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থায় ইংরেজ সরকার উৎপাদিত ফসলের পরিবর্তে নগদ অর্থে রাজস্ব আদায়ের নিয়ম চালু করে। প্রাকৃতিক কারণে ফসল না হলেও কৃষককে রাজস্ব মেটাতে হত। এই অবস্থায় কৃষকদের ঋণ দেবার জন্য মহাজন
শ্রেণির উদ্ভব হয় এবং তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়।
4 মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব : ইংরেজরা নতুন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের রাজস্ব আদায়কারী নিযুক্ত করেছিলেন। সরকার ও কৃষকের মাঝে অনেক মধ্যস্বত্বভোগী বা উপস্বত্বভোগী শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছিল। এরাই ছিল ধনী, পাশ্চাত্য ভাবধারায় দীক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি।

১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিস রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেছিলেন। এর আগে কোম্পানির অনেক কর্মচারী চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের কথা বলেছিলেন। কারণ-
1 রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি স্থির না থাকায় কৃষক সমাজ ও দেশীয় অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
2 কৃষিক্ষেত্রে বিপর্যয়ের ফলে ভারত থেকে ব্রিটিশ কোম্পানির রেশম ও কার্পাস রপ্তানিতে ভাটা পড়েছিল।
3- কৃষিক্ষেত্রে সংকটের ফলে দেশীয় হস্তশিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে সুবা বাংলার দেওয়ানি লাভের পর থেকে কোম্পানি বারবার খাজনা আদায়ের পদ্ধতিতে পরিবর্তন ঘটিয়েছে। কীভাবে এবং কার কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করা হবে তা নিয়েও কোম্পানি সমস্যায় পড়েছিল। কারণ-
1 নবাবি আমলে নবাব জমিদারদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় তাতে কোনো কোনো জমিদারকে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে রেখে দেওয়া হয়েছিল। আবার অনেক জমিদারকে দায়িত্ব। থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে কর্নওয়ালিস যখন শাসনভার নেন তখন খাজনা আদায়ের প্রশাসনিক কাঠামো সমস্যার মুখে পড়েছিল।

গভর্নর জেনারেল হয়ে বাংলায় এসে লর্ড কর্নওয়ালিস চেয়েছিলেন বাংলার জমিদারদের উন্নতি হোক। কারণ-
● কৃষির উন্নতির জন্য তিনি বুঝেছিলেন জমির ওপর জমিদারদের অধিকার স্থায়ী হলে তাঁরা কৃষির উন্নতির জন্য অর্থ
বিনিয়োগ করবেন।
● খাজনা আদায়ে সুবিধার জন্য : লর্ড কর্নওয়ালিস জমিদারদের কাছ থেকে সহজে খাজনা আদায় করার পক্ষপাতী ছিলেন। কারণ এর তুলনায় বাংলার অগণিত কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি খাজনা আদায় করা ছিল অনেক কঠিন কাজ।

‘সূর্যাস্ত আইন' ছিল ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের একটি শর্ত। সূর্যাপ্ত আইন : চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারকে বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে কোম্পানির প্রাপ্য রাজস্ব জমা দিতে হত। শেষ দিনের সূর্য ডোবার আগেই প্রাপ্য রাজস্ব কোম্পানিকে জমা দিতে না পারলে জমিদারের জমিদারি হাতছাড়া হত। কোম্পানির রাজস্ব আদায়ের এই নিয়মকে সূর্যাস্ত আইন বলা হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমির অধিকার জমিদারের দখলে থাকলেও বাস্তবে সমস্ত জমির চূড়ান্ত মালিকানা ছিল কোম্পানির হাতে। কোম্পানি জমির মালিকানা নিজের হাতে রাখার জন্যই। সূর্যাস্ত আইন চালু করে।

১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের ২২ মার্চ বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তিত হয়। এই ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলি হল-
1 জমিদাররা বংশানুক্রমিকভাবে জমির উত্তরাধিকারী স্বত্ব ভোগ করতে পারতেন। বিনিময়ে জমিদারকে নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের পূর্বে সরকারি কোশাগারে ভূমিরাজস্ব জমা দিতে হত।
2 ভূমিরাজস্বের হার নির্দিষ্ট এবং স্থির থাকত, খরা, বন্যা বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও রাজস্ব মকুব করা হত না।
3 জমিদারগণ ইচ্ছা করলে জমি দান বা বিক্রি করতে পারতেন।

১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিস 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেছিলেন। এর সুফলগুলি ছিল-
1 চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের ফলে সরকারের প্রাপ্য রাজস্বের পরিমাণ নির্দিষ্ট হয়েছিল।
2 জমিতে জমিদারের স্বত্ব সুনিশ্চিত হওয়ার জন্য জমির উন্নতির দিকে জমিদারগণ নজর দিয়েছিলেন।
3 তা ছাড়া কৃষকদের অবস্থার উন্নতি ঘটেছিল।

১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিস 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেছিলেন। এর কুফলগুলি ছিল—
1 ‘'সূর্যাস্ত আইন' অনুসারে জমিদারগণ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাজনা দিতে না পারলে জমিদারি হাতছাড়া হত।
2 নিলামের মাধ্যমে জমির বন্দোবস্ত দেওয়ার ফলে অনেক ভুঁইফোড় জমিদারের উৎপত্তি হয়েছিল। ও কৃষক ও সরকারের মাঝে মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির উদ্ভব হয়েছিল,
ফলে কৃষকদের ওপর অত্যাচার বেড়েছিল।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাংলার কৃষকদের দুরবস্থা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
প্রথমত, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদার ইচ্ছেমতো কৃষকদেরকাছ থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করত।
দ্বিতীয়ত, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছিল, যারা কৃষকদের শোষণ ও অত্যাচার করত।

১৮২০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি রাজস্ব আদায়ের যে ব্যবস্থা করেছিল, তাকে 'রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত' বলা হয়। এই বন্দোবস্ত মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সির কিছু অংশে চালু ছিল। থমাস মনরোকে রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের প্রবর্তক বলা হয়।

১৮২২ খ্রিস্টাব্দে ভারতের ব্রিটিশ সরকার রাজস্বব্যবস্থার ক্ষেত্রে 'মহলওয়ারি বন্দোবস্ত' চালু করেছিল। কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত একটি মহলে কয়েকজন ব্যক্তিকে যৌথভাবে রাজস্ব দেওয়ার শর্তে যে জমি ইজারা দেওয়া হত তাকে 'মহলওয়ারি বন্দোবস্ত' বলা হয়। এই ব্যবস্থা উত্তরভারত ও মধ্যভারতের কিছু অঞ্চলে চালু ছিল।

১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে 'সনদ আইন' বা 'চার্টার অ্যাক্ট' পাস হয়েছিল।
1 এই আইনে কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যিক অধিকারের অবসান ঘটানো হয়েছিল এবং সব ব্রিটিশ ব্যবসায়ীকে ব্যাবসা
করার অবাধ অধিকার দেওয়া হয়েছিল।
2 কোম্পানিকে পরবর্তী ২০ বছরের জন্য ভারত শাসনের অধিকার দেওয়া হয়েছিল।

দেশীয় শিল্পের অবক্ষয়ের দুটি কারণ হল-
1 কোম্পানির অসম শুদ্ধ নীতি: ইংরেজ কোম্পানি দেশীয় শিল্প ফাংস করার জন্য ভারতে উৎপাদিত শিল্পসামগ্রীর ওপর অধিক শুল্ক আরোপ করেছিল।
2 শিল্পবিপ্লব: ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডের উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রীতে ভারতের বাজার ছেয়ে গিয়েছিল।

রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের সঙ্গে মহলওয়ারি বন্দোবস্তের পার্থক্য হল-
1 রায়তওয়ারি বন্দোবস্তে সরকারের সঙ্গে চাষির সরাসরি সম্পর্ক স্থাপিত হত। কিন্তু মহলওয়ারি বন্দোবস্তে তা হত না।
2 রায়তওয়ারি ব্যবস্থায় রায়ত বা চাষিকে ব্যক্তিগতভাবে সরকারের কাছে রাজস্ব দিতে হত। কিন্তু মহলওয়ারি ব্যবস্থায় গ্রামের মোট রাজস্ব গ্রামপ্রধান জমা দিলেই হত।

‘দাদন' বলতে বোঝায় অগ্রিম দেওয়া বা ঋণ দেওয়া। ইংরেজরা পণ্য-উৎপাদনকারীকে অগ্রিম অর্থ দিয়ে তাঁর উৎপাদিত দ্রব্য ‘দাদন’দাতার কাছে বিক্রি করতে বাধ্য করত। একে 'দাদন' প্রথা বলা হয়। এতে দাদন গ্রহীতা দাদন দাতাকে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হত।

বাগিচা শিল্প বলতে মূলত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে উৎপাদিত ফসলের চাষভিত্তিক শিল্পকে বোঝায়। ঔপনিবেশিক ভারতে নীল, চা, কফি প্রভৃতি বাগিচা ফসলের উৎপাদনে ইউরোপীয়দের উৎসাহ ছিল প্রবল। যদিও এই বাগিচা শিল্পের বিকাশের ফলে ভারতের অর্থনীতির বিশেষ কোনো উন্নতি দেখা যায়নি।

ব্রিটিশ কোম্পানির আমলে ভারতের গ্রাম-সমাজে মহাজনি ব্যবস্থার বিস্তার ঘটেছিল। মহাজন বলতে বোঝায় যে ব্যক্তি সুদের বিনিময়ে টাকা ধার দেন। মহাজনদের সুদের বিনিময়ে টাকা ধার দেওয়ার ব্যবস্থাকে মহাজনি ব্যবস্থা বলা হয় ৷

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ কোম্পানি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রধানত তিন ধরনের ভূমিরাজস্ব বন্দোবস্ত চালু করেছিল। এগুলি হল

1 চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত,

2 রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত,

3 মহলওয়ারি বন্দোবস্ত।

» প্রবর্তনের এলাকা :

• চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত : চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলায় চালু ছিল।

• রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত : রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতে বিশেষত মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সির কিছু অংশে প্রচলিত ছিল।

• মহলওয়ারি বন্দোবস্ত : মহলওয়ারি বন্দোবস্ত উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রচলিত ছিল।

ঔপনিবেশিক রাজস্ব বন্দোবস্তের ফলে গ্রামীণ সমাজে

অনেকরকম পরিবর্তন ঘটেছিল। নতুন ভূমি বন্দোবস্তে পুরোনো জমিদারদের অনেকেই তাদের অধিকার হারান। এর ফলে নতুন ব্যবসায়ী, মহাজন ও শহরে জীবিকা নির্বাহকারী মানুষ গ্রামে জমিদারি কিনে নিয়েছিলেন। পুরোনো জমিদারদের সাথে কৃষকদের যে সম্পর্ক ছিল, নতুন জমিদারদের ক্ষেত্রে তা বদলে গিয়েছিল। নতুন জমিদাররা। বেশিরভাগই তাদের জমিদারিতে স্থায়ীভাবে বসবাস না করার ফলে জমি ও কৃষকের উন্নতির কথা চিন্তা করতেন না।

কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ বলতে বোঝায় বাণিজ্যের জন্য প্রয়োজন এমন কৃষিজ ফসলের চাষ করা। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতীয় অর্থনীতির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ। ব্রিটিশ আমলে বাণিজ্যের জন্য যে যে ফসলের চাষ করা হত সেগুলি হল— চা, নীল, পাট, তুলো প্রভৃতি। বস্তুত কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ ছিল ব্রিটিশ আমলে অর্থনীতির আধুনিকীকরণের’ অঙ্গ।

ভারতের অধিকাংশ কৃষকই কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। তাদের পক্ষে কৃষির উন্নতির জন্য ভালো গবাদি পশু, উন্নত বীজ, সার ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা সম্ভব ছিল না। রাজস্ব বেশি থাকার দরুন কৃষকদের উপার্জন হ্রাস পেয়েছিল। ফলত তারা বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল।

ব্রিটিশ আমলে ভারতীয় অর্থনীতিতে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য। বাণিজ্যিক প্রয়োজনে ব্রিটিশ সরকার কৃষকদের দিয়ে জোর করে চা, নীল, পাট, তুলো প্রভৃতির চাষ করাত। রেলপথ নির্মাণ, রফতানির পরিমাণ বৃদ্ধি ও কৃষিতে বাণিজ্যিকীকরণের প্রক্রিয়াকে একত্রে ‘অর্থনীতির আধুনিকীকরণ' 'বলা হত।

১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দের মে থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত দাক্ষিণাত্যে মহারাষ্ট্রের পুণা ও আহম্মদনগর জেলায় যে কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল, তাকে সরকারি পরিভাষায় দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামা বা Deccan Riot বলা হয়।

দ্রাক্ষিণাত্য হাঙ্গামার কারণ :

দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামার কারণগুলি হল—

[1 অত্যধিক ভূমিরাজস্ব : দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল রায়তওয়ারি ব্যবস্থায় কৃষকদের ওপর অত্যধিক করের বোঝা।

2  তুলোর মূল্য হ্রাস : ঐতিহাসিক এল. নটরাজন বলেছেন যে, দাক্ষিণাত্যে কৃষক বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তুলোর মূল্য হ্রাস পাওয়া।

3 মহাজনদের শোষণ : দক্ষিণ ভারতের সাকার মহাজনরা দরিদ্র চাষিদের বিভিন্নভাবে শোষণ করত।

জমিদারদের হাত থেকে কৃষকদের রক্ষা করার জন্য প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে Tenancy Act বা প্রজাস্বত্ব আইন প্রবর্তন করা হয়। এই আইন অনুযায়ী অস্থায়ী কৃষকদের দখলি স্বত্ব দেওয়া হয়। এ ছাড়া জমিদারকে খাজনা বাড়ানোর সময় নির্দিষ্ট কারণ দেখানোর আদেশও দেওয়া হয়।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে এসেছিল ব্যাবসা করার জন্য। তাই প্রথমদিকে তারা বাণিজ্যিক সংস্থা হিসেবেই কাজ করত। আমদানিকৃত দ্রব্য : ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে বিক্রির জন্য যেসব জিনিসপত্র নিয়ে আসত সেগুলির মধ্যে প্রধান ছিল,  1 দামি ধাতু ও 2 নানা রকম প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

রপ্তানিকৃত দ্রব্য : ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারত থেকে যেসব জিনিস নিয়ে যেত সেগুলির মধ্যে প্রধান ছিল, 1 বিভিন্ন ধরনের মশলা  2  কাপড়।

অবশিল্পায়ন বলতে বোঝায় দেশীয় শিল্পের অবক্ষয়। ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ধীরে ধীরে দেশীয় শিল্পের অবক্ষয় ঘটতে থাকে। এর কারণ ছিল

১৮১৩ সালের অবাধ বাণিজ্য নীতি : ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের সনদ আইনে ভারতে কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের অবসান ঘটে ও অবাধ বাণিজ্যনীতি ঘোষিত হয়। ফলে ইংল্যান্ডে উৎপাদিত জিনিসপত্রে ভারতের বাজার ভরে যায় এবং ভারতের শিল্পগুলি ধ্বংস হতে থাকে।অসম শুল্কনীতি : ব্রিটিশ সরকার ১৮১৫ সালে এক আইন জারি করে ইংল্যান্ডের কারখানায় তৈরি কাপড়ের দাম ২.৫% শুল্ক ধার্য করে। অপরদিকে ইংল্যান্ডে ভারতীয় বস্ত্রের প্রবেশ বন্ধ করার জন্য সেখানে ৬৭.৫% পর্যন্ত শুল্ক ধার্য করে।

একচেটিয়া বাণিজ্যিক অধিকারের বিলোপ : ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠার সময় কোম্পানি ভারতে বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার লাভ করেছিল। কিন্তু ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের সরকার সনদ আইন (চার্টার অ্যাক্ট) পাস করে ভারতে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া। বাণিজ্যিক অধিকারের বিলোপ ঘটিয়েছিল।

[ 2 অবাধ বাণিজ্যনীতি প্রবর্তন : ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে সনদ আইনে অবাধ বাণিজ্যনীতি ঘোষিত হয়েছিল অর্থাৎ ইংল্যান্ডের সকল শ্রেণির বণিক ভারতে এসে ব্যাবসা করার অবাধ অধিকার লাভ করেছিল।

দেশীয় শিল্পের অবক্ষয়ের অর্থনৈতিক ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী।

1 ভারত রপ্তানিকারী দেশ থেকে আমদানিকারী দেশে রূপান্তর: এর আগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভারতীয় দ্রব্যসামগ্রী রপ্তানি হত। দেশীয় শিল্পের অবক্ষয়ের ফলে ভারতের তৈরি দ্রব্যসামগ্রীর রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অপরদিকে ভারতীয়দের প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী বিদেশ থেকে আমদানি হতে থাকে। ভারত দ্রব্যাদি উৎপাদনের পরিবর্তে ইংল্যান্ডের
কলকারখানার জন্য প্রয়োজনীয় তুলো, রেশম, নীল প্রভৃতি সরবরাহ করতে থাকে।

2 বেকারত্ব বৃদ্ধি : দেশীয় শিল্পের অবক্ষয়ের ফলে ভারতীয় শিল্পের সঙ্গে জড়িত শিল্পী ও কারিগররা বেকার হয়ে পড়ে। ফলে ভারতে প্রবলভাবে বেকারত্ব বৃদ্ধি পায় ।

ভারত ছিল ব্রিটেনের উপনিবেশগুলির মধ্যে অন্যতম প্রধান উপনিবেশ। উপনিবেশ হিসেবে ভারতীয় অর্থনীতির অভিমুখ ছিল ব্রিটেনের স্বার্থে পরিচালিত।

1 ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রয়োজনে যথেচ্ছভাবে ভারতীয় সম্পদ ব্যবহার করা হয়।

2 ভারতকে ব্রিটিশ পণ্যের উন্মুক্ত বাজার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

3 ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ব্রিটেনের ল্যাঙ্কাশায়ারে তৈরি সুতি কাপড়ের ৮৫% কাপড় বিক্রি হত ভারতে।

4 ভারতে রেলগাড়ি ও রেলপথ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ১৭%

লোহা ও ইস্পাত আসত ব্রিটেন থেকে। তাই ব্রিটিশ উপনিবেশগুলির মধ্যে ভারতকে সবচেয়ে দামি রত্ন হিসেবে বর্ণনা করা হত।

ঔপনিবেশিক ভারতীয় সমাজের পক্ষে রেলপথ নির্মাণ কতটা জরুরি ছিল সে সম্পর্কে নানান মত আছে। অনেক ভারতীয় মনে করেন তখন ভারতে রেলপথের প্রয়োজন ছিল না। তারা বলেন

1 ব্রিটিশ শাসক যদি ভারতের সেচ ব্যবস্থার উন্নতি করত তাতে ভারতীয়দের অনেক উপকার হত। ব্রিটিশ প্রশাসন ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতে রেলপথ বসানোর জন্য প্রায় ৩৬০ কোটি টাকা খরচ করেছিল। অপরদিকে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোম্পানি জলসেচের জন্য খরচ করেছিল ৫০ কোটি টাকারও কম।

[2] ব্রিটিশ সরকার ব্রিটেনের রেলপথ নির্মাতা কোম্পানিগুলিকে আর্থিক অনেক সুযোগসুবিধা দিয়েছিল। এতে ভারতের সম্পদ ব্রিটেনে চলে যাচ্ছিল।

রেলপথ নির্মাণের ফলে ভারতীয়দের অনেক সুবিধা হয়েছিল। এর ফলে—

1 এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পণ্য পরিবহণ সহজ হয়েছিল।

2 সাধারণ মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছিল।

3 ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারগুলি অনেক ক্ষেত্রে একজোট হতে পেরেছিল।

ভারতে রেলপথ নির্মাণের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন গতি এলেও এর ক্ষতিকারক প্রভাবগুলিও লক্ষণীয়—

1 রেলপথ বসাতে গিয়ে স্বাভাবিক জলনিকাশি ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার দরুণ নানা সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব ঘটে।

2 রেলপথ নির্মাণের জন্য অনেক গাছ কাটার ফলে পরিবেশ দূষিত হয় এবং মাটিক্ষয় বৃদ্ধি পায়।

সম্পদের বহির্গমন বলতে বোঝায় দেশের সম্পদ বিদেশে চলে যাওয়া।

‘ড্রেন থিওরি' বলতে বোঝায় ভারতের সম্পদ ইংল্যান্ডে চলে যাওয়া।

• ভারতে 'ড্রেন থিওরি'র প্রবক্তা হলেন দাদাভাই নৌরজি।

ব্রিটিশ আমলে ভারতের সম্পদ বিভিন্নভাবে ব্রিটেনে স্থানান্তরিত হত। আর এই বিনিময়ে ভারতেরও অবস্থার উন্নতি হত না। ভারতের অর্থনীতিকে ব্রিটেনের প্রয়োজনে ব্যবহার করা হত। বস্তুত ভারতে ব্রিটিশ সরকার ‘স্পঞ্জের মতো' কাজ করত। ভারতের সম্পদ শোষণ করত আর তা ইংল্যান্ডে জমা করত। ভারতে ব্রিটিশ আমলে ব্রিটেনের জাতীয় আয়ের ২% সম্পদ ছিল ভারত থেকে নিয়ে যাওয়া সম্পদ।

টেলিগ্রাফ ব্যবস্থার প্রসারের ফলে কলকাতা থেকে আগ্রা, উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলসমূহ, বোম্বাই, মাদ্রাজ, ওটাকামুন্দ প্রভৃতি অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ফলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের জরুরি খবর ও তথ্য তাড়াতাড়ি ব্রিটিশ শাসনকেন্দ্রগুলিতে পৌঁছে যেত। ফলে কোথাও কোনো বিদ্রোহ দেখা দিলে ব্রিটিশরা দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারত। বলা হয় যে, ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ থেকে ব্রিটিশ শাসনকে টেলিগ্রাফ-ই বাঁচিয়ে দিয়েছিল।

ব্রিটিশ আমলে ভারতীয়দের মধ্যে দারিদ্র্য বেড়েছিল এবং বারবার দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতে ২৪টি দুর্ভিক্ষের ঘটনা ঘটেছিল।

* ভারতীয়দের দারিদ্র্যের কারণ : ভারতীয়দের দারিদ্র্যের কারণ ছিল—

সম্পদের বহির্গমন ও অবশিল্পায়ন। তা ছাড়া

• ব্রিটিশ সরকারের অর্থনৈতিক নীতি : ব্রিটিশ সরকার নিজেদের দেশ ইংল্যান্ডের উন্নতির স্বার্থে ভারতকে বিভিন্নভাবে শোষণের নীতি গ্রহণ করে। তারা ভারতের চিরাচরিত অর্থনৈতিক কাঠামো ধ্বংস করে।

• সরকারি সাহায্যের অভাব : ভারতের কোনো অঞ্চলে প্রাকৃতিক কারণে শস্য নষ্ট হলে সরকার সাহায্য করত না। উপরন্তু জোর করে রাজস্ব আদায় করা হত। ফলে ভারতীয়দের দারিদ্র্য ভয়ংকর আকার ধারণ করত।