Chapter-4, বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ

উন্নতার সঙ্গে বায়ুচাপের সম্পর্ক ব্যাস্তানুপাতিক | কারণ — বায়ুর উন্নতা বাড়লে তা হালকা হয় এবং প্রসারিত হয়, যার ফলে বায়ুর চাপ কমে। নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্যের আলো লম্বভাবে পড়ে, ফলে সেখানে উন্নতা বেশি থাকায় স্থায়ী নিম্নচাপ বলয় সৃষ্টি হয়। বায়ু শীতল হলে তা ভারী এবং সংকুচিত হয়, ফলে বায়ুর চাপ বাড়ে, অর্থাৎ শীতল বায়ু উচ্চচাপ সৃষ্টি করে। পৃথিবীর দুই মেরু অংশে সূর্যের আলো তির্যকভাবে পড়ে বলে সেই অঞ্চল খুব ঠান্ডা বা শীতল, তাই পৃথিবীর দুই মেরু অঞ্চলে স্থায়ীভাবে উচ্চচ্চাপ বিরাজ করে।

 

বায়ুমণ্ডলে দুই ধরনের বায়ুচাপ লক্ষ করা যায়— উচ্চচাপ (high pres- sure) এবং নিম্নচাপ (low pressure) | এই উচ্চচাপ ও নিম্নচাপ বলতে কোনো নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ুতে কী পরিমাণ বায়ুর অণু (molecule) বা বায়ুকণা আছে তা বোঝায় | যদি কোনো নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ুতে খুব বেশি
সংখ্যায় বায়ুর অণু থাকে, তাহলে তার ওজন বা চাপ বেশি হবে অর্থাৎ উচ্চচাপ হবে। আর যদি ওই একই আয়তনের বায়ুতে কম সংখ্যায় বায়ুর অণু থাকে, তবে তার ওজন বা চাপ কম হবে অর্থাৎ নিম্নচাপ হবে। সুতরাং উচ্চচ্চাপের বায়ু ঘন এবং নিম্নচাপের বায়ু পাতলা প্রকৃতির হয়।

 

বায়ুর ওজন আছে, তাই বায়ু চাপও প্রয়োগ করে | তবে, বায়ুর চাপ বেশি হবে না কম হবে তা নির্ভর করে বায়ুতে কী পরিমাণ বায়ুকণা আছে তার ওপর। কোনো নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ুতে বায়ুর ঘনত্ব খুব বেশি হলে (খুব বেশি সংখ্যায় বায়ুকণা থাকলে) তার ওজন ও চাপ বেশি হবে অর্থাৎ উচ্চচাপ হবে আবার কোনো নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ুতে বায়ুর ঘনত্ব কম হলে (কম সংখ্যায় বায়ুকণা থাকলে) তার ওজন ও চাপ কম হবে অর্থাৎ নিম্নচাপ হবে। বায়ুর উচ্চচাপ ও নিম্নচাপ সাধারণত ব্যারোমিটার যন্ত্রে পরিমাপ করা হয়। যদি ব্যারোমিটারে বায়ুচাপের মাত্রা 1013 মিলিবার বা তার বেশি হয়, তবে
সেই অবস্থাকে বায়ুর নিম্নচাপ বোঝায়। সেই অবস্থাকে বায়ুর উচ্চচাপ এবং 986 মিলিবার বা তার কম হয়, তাহলে সেই অবস্থাকে বায়ুর নিম্নচাপ বোঝায়।

ভূপৃষ্ঠের কতকগুলি নির্দিষ্ট স্থানে প্রায় সারা বছর ধরে বায়ুর চান না
নিম্নচাপ লক্ষ করা যায়। বায়ুর পানি এক একটি নির্দিষ্ট
অঞ্চল বরাবর পৃথিবীকে বলয়ের মতো ঘিরে থাকে। এগুলিকেই বায়ুচাপ
বলয় বলে।
ভূপৃষ্ঠের সাতটি বায়ুচাপ বলয় হল - নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়, ? উত্তর
গোলার্ধের উপক্রান্তীয় বা কর্কটীয় উচ্চচাপ বলয়, (3) সুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয়
নিম্নচাপ বলয়, দক্ষিণ গোলার্যের উপক্রান্তীয় বা মকরীয় উচ্চচাপ কায়,
7 কুমেরু উচ্চাপ বলয় | কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়, 6 সুমেরু উচ্চচাপ বলয় এবং

ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয়ে 30° অক্ষাংশ-সংলগ্ন অঞ্চলে (25°-35° উত্তর ও
দক্ষিপ) মেরু অঞ্চল থেকে শীতল বায়ু এবং নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে উন্ন বায়ু
ক্রমশ শীতল হয়ে ওপর থেকে নীচে নেমে আসে। এর ফলে ভূপৃষ্ঠের
সমান্তরালে বায়ুর প্রবাহ বিশেষ থাকে না। তাই ওই অংশের বায়ুমণ্ডলে একটি
শান্ত অবস্থা বিরাজ করে। এজন্য উভয় গোলার্ধে 30°-35° অক্ষরেখার
মধ্যবর্তী অঞ্চলকে ক্রান্তীয় শান্তবলয় বলে |

পৃথিবীর ক্রান্তীয় অঞ্চলে বায়ুর ঘনত্ব বেশি হওয়ার কারণ নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় থেকে যে উগ্ন এবং হালকা বায়ু ওপরে ওঠে, তা ঠান্ডা
ও ভারী হয়ে ক্রান্তীয় অঞ্চলে নেমে যায়। ও পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য পৃথিবীর দুই মেরু অঞ্চলের উচ্চচাপ বলয়ের ঠান্ডা ও ভারী বাতাস
নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে আসে। তার কিছু অংশ 25°-35° অক্ষাংশের মধ্যে নেমে আসে। আবার মেরু অঞ্চলে বায়ুর ঘনত্ব বেশি কারণ সূর্যরশ্মি এখানে সারা বছর তির্যকভাবে পড়ে এবং 6 মাস অধকার থাকে। ফলে প্রচন্ড ঠান্ডার জন্য বাতাস শীতল ও ভারী হয় । ( প্রচন্ড ঠান্ডার জন্য এখানে বাষ্পীভবন কম হয় । 3 পার্শ্ববর্তী মেরু প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয় থেকে যে বায়ু ক্রমণ ওপরে উঠে শীতল ও ভারী হয় তার কিছুটা অংশ এখানে নেমে আসে।

মেরুবৃত্ত অঞ্চলে নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়ার তিনটি কারণ আছে— পৃথিবীর আবর্তন বেগ মেরু অঞ্চলের তুলনায় মেরুবৃত্তে বেশি হওয়ায় বায়ু ছিটকে
বেরিয়ে যায়, ও মেরুবৃত্ত অঞ্চলের উন্নতা তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় মেরু অঞ্চল থেকে বায়ুপ্রবাহ মেরুবৃত্ত অঞ্চলে পৌঁছে আয়তনে বেড়ে
যায় এবং 3 মেরু অঞ্চলের শীতল বায়ুর সঙ্গে ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে আগত উন্ন পশ্চিমা বায়ুর সংঘর্ষে এই অঞ্চলের বায়ু ঊর্ধ্বগামী হয়।

জলীয়বাষ্প বিশুদ্ধ বায়ুর চেয়ে হালকা, সেই কারণে যে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি সেই বায়ু শুষ্ক বায়ুর তুলনায় অধিক হালকা| সাধারণভাবেই হালকা বায়ুর চাপ কম ও শুষ্ক এবং শীতল বায়ুর চাপ বেশি হয়, এই কারণে— শীতকালে যেহেতু শীতল, শুষ্ক বায়ু প্রবাহিত হয় তাই এই বায়ুর চাপ বেশি অর্থাৎ শীতকালে বায়ুর চাপ বেশি | অন্যদিকে, বর্ষাকালে বায়ুতে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ সর্বাধিক থাকে, তাই বর্ষাকালে বায়ুর চাপ কম।

বায়ু প্রবাহিত হওয়ার কয়েকটি কারণ হল নিম্নরূপ-
1 বায়ুচাপের পার্থক্য: মূলত দুটি স্থানের মধ্যে বায়ুচাপের পার্থক্যের কারণে বায়ু প্রবাহিত হয়। বায়ু সর্বদা উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপের দিকে প্রবাহিত হয়।
2 উন্নতার পার্থক্য: কোনো স্থানের বাতাস বেশি উস্ন হলে তা উত্তপ্ত হয়ে প্রসারিত ও হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায়। এর ফলে ওই জায়গায় সাময়িক নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। এজন্য পাশের শীতল বাতাস সেই স্থান
পূরণ করার জন্য ছুটে আসে ও বায়ু প্রবাহিত হয়।

3 জলীয়বাষ্প: বাতাসে জলীয়বাষ্প বেশি থাকলে সেই বায়ুর চাপ কম হয় ও নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। ফলে উচ্চচাপ অঞ্চলের ভারী বাতাস সেদিকে
প্রবাহিত হয়।
4 পৃথিবীর আবর্তন: পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাথে সাথে বায়ুমণ্ডলও আবর্তিত হয় | এই আবর্তনের ফলে যে বলের সৃষ্টি হয় তার প্রভাবে বায়ু প্রবাহিত হয়।

বায়ুর উন্নতা: বায়ু উম্ন হলে প্রসারিত ও হালকা হয়, ফলে তার ঘনত্ব কমে যায়, অর্থাৎ চাপ হ্রাস পায়। এই কারণে নিরক্ষীয় অঞ্চলে বায়ুর চাপ কম হয়। আবার, বায়ুর উন্নতা কমলে বায়ু সংকুচিত হওয়ায় ঘনত্ব বাড়ে, সুতরাং, চাপও বৃদ্ধি পায় | উভয় মেরু অঞ্চলেই অতিরিক্ত ঠান্ডার
জন্য বায়ুর চাপ বেশি।

উন্নতার তারতম্য, উচ্চতা, বায়ুতে জলীয়বাষ্পের উপস্থিতি, পৃথিবীর আবর্তন গতি, বায়ুমণ্ডলের ঘনত্বের তারতম্যের ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীতে মোট সাতটি চাপ বলয়ের সৃষ্টি হয়েছে । এগুলি হল- নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়, উত্তর গোলার্ধের উপক্রান্তীয় বা কর্কটীয় উচ্চচাপ বলয়, দক্ষিণ গোলার্ধের উপক্রান্তীয় বা মকরীয় উচ্চচাপ বলয়, 4 সুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়, 5 কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়, 6 সুমেরু উচ্চচাপ বলয় এবং 7 কুমেরু উচ্চচাপ বলয়।
(1) নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়: [i] অবস্থান: নিরক্ষরেখার উভয়দিকে 10° উত্তর C3 দক্ষিণ
অক্ষরেখার মধ্যবর্তী অঞ্চলে সারা বছর বায়ুর নিম্নচাপ দেখা যায় বলে এই অঞ্চলটির নাম নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় বা নিরক্ষীয় শান্ত বলয় বা ডোলড্রামস |
[ii] সৃষ্টির কারণ: প্রধানত তিনটি কারণে এই নিম্নচাপ বলয়টি সৃষ্টি হয়েছে – (a) সারা বছর সূর্যরশ্মির লম্বভাবে পতন, (b) জলভাগ
বেশি থাকায় বায়ুতে অধিক জলীয়বাষ্পের উপস্থিতি এবং (c) পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য নিরক্ষীয় অঞ্চলের ওপরের বায়ুর
উত্তরে ও দক্ষিণে ছিটকে যাওয়া|
ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় : [i] অবস্থান : নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের উভয়দিকে প্রায় 25° থেকে 35° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষরেখার মধ্যে বায়ুমণ্ডলে যে দুটি উচ্চচাপ বলয়ের উপস্থিতি লক্ষ করা যায় তাকে উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় 75B বলে। এই উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয়ের উত্তর গোলার্ধের অংশটিকে কর্কটীয় উচ্চচাপ বলয় এবং দক্ষিণ গোলার্ধের অংশটিকে মকরীয় উচ্চচাপ বলয় বলা হয়।

বায়ুর উন্নতা ও চাপ উভয়ই আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপাদান হলেও উভয়ের মধ্যে এক ব্যাস্তানুপাতিক সম্পর্ক লক্ষ করা যায়।
1 উগ্ন বায়ুর চাপ কম: বায়ু যখন উয় হয় তখন তা আয়তনে বাড়ে বা প্রসারিত হয়। আবার, বায়ু যখন প্রসারিত হয় তখন তার ঘনত্ব কমে, ফলে চাপও কমে। উদাহরণ – নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারা বছরই বেশি সূর্যতাপ পাওয়া যায় বলে এখানকার বায়ুমণ্ডলে সর্বদা স্থায়ীভাবে
নিম্নচাপ বিরাজ করে । পশ্চিমবঙ্গে গ্রীষ্মকালে অধিক উন্নতার কারণে বায়ুর চাপ কম থাকে।
2 কম উম্ন বায়ুর চাপ বেশি: বায়ুর উন্নতা কমলে বায়ু সংকুচিত হয়| বায়ু যতই সংকুচিত হয়, ততই তার ঘনত্ব বাড়ে, ফলে চাপও বৃদ্ধি
পায়। সুতরাং, বায়ুর উন্নতা কমলে বায়ুর চাপ বাড়ে। উদাহরণ- সুমেরু ও কুমেরু অঞ্চলে সূর্যরশ্মি অত্যন্ত তির্যকভাবে পড়ে বলে
মেরুদ্বয়ে সারা বছর অত্যন্ত শীতল অবস্থা বিরাজ করে, তাই এই দুই অঞ্চলের বায়ু অত্যন্ত শীতল ও সংকুচিত অবস্থায় থাকে। এর ফলে
এই দুই অঞ্চলে দুটি স্থায়ী উচ্চচাপ বলয় সৃষ্টি হয়েছে, যাকে মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয় বলা হয়। জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ুর চাপ কম: বায়ু উম্ন হলে তার জলীয়বাষ্প ধারণক্ষমতা বাড়ে। যেহেতু জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু শুষ্ক বায়ুর তুলনায় হালকা, তাই যখন বায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যায়, তখন তার বর্ষাকালে বায়ুর চাপও কম হয়। চাপও কমে | উদাহরণ—বায়ুতে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প থাকে বলে
এইভাবেই দেখা যায় যে, বায়ুর উম্নতা কমলে চাপ বাড়ে, আর উন্নতা বাড়লে চাপ কমে | সুতরাং, বায়ুর উন্নতা ও বায়ুর চাপের সম্পর্ক ব্যাস্তানুপাতিক।

নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় সৃষ্টির কারণ : নিরক্ষরেখার দু-দিকে 5° থেকে 10°অক্ষরেখার মধ্যে (অর্থাৎ 0° থেকে 5° এবং কোনো কোনো এলাকায় 10° পর্যন্ত) সারা বছর ধরে বায়ুর নিম্নচাপ বিরাজ করে। প্রধানত তিনটি কারণে এই নিম্নচাপ বলয়টির সৃষ্টি হয়েছে— ↑ এই অঞ্চলে সূর্যরশ্মি সারা বছর লম্বভাবে পড়ে বলে বায়ু সারা বছরই উয় ও হালকা থাকে, তাই বায়ুর চাপ কম হয়।
2 এখানে জলভাগ বেশি বলে বায়ুতে জলীয়বাষ্পের পরিমাণও বেশি, তাই অধিক জলীয়বাষ্পের কারণে বায়ুর চাপ কম হয়।
3 নিরক্ষরেখায় পৃথিবীর আবর্তনের গতিবেগ বেশি বলে নিরক্ষীয় অঞ্চলের বায়ু ওপরে উঠে উত্তর ও দক্ষিণে ছিটকে যায় অর্থাৎ বায়ুর ঘনত্ব কমে যায়। এবং নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়। নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ে 0° থেকে 5° অক্ষরেখার মধ্যবর্তী অঞ্চলে বায়ু সর্বদাই উর্ধ্বগামী হয়। ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে বা অনুভূমিকভাবে (horizontally) বায়ুর বিশেষ কোনো প্রবাহ থাকে না, এজন্য বায়ুমণ্ডলে কিছুটা শান্ত অবস্থা বিরাজ করে, তাই ওই অঞ্চলটিকে বলে নিরক্ষীয় শান্তবলয় (equatorial doldrums ) | মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয় সৃষ্টির কারণ : দুই মেরু প্রদেশ সংলগ্ন অঞ্চলে অর্থাৎ উভয় গোলার্ধে 60° থেকে 70° অক্ষরেখার মধ্যে যে স্থায়ী নিম্নচাপ বলয় দুটি আছে, তাদের মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয় বলে। তিনটি কারণে এই নিম্নচাপ বলয় দুটি সৃষ্টি হয়েছে পৃথিবীর আবর্তন বেগ মেরু অঞ্চলের তুলনায় মেরুবৃত্তে বেশি হওয়ায় এই অঞ্চলের বায়ুও বেশি পরিমাণে ছিটকে বেরিয়ে যায়। 2 মেরু অঞ্চলের তুলনায় মেরুবৃত্ত অঞ্চলের ভৌগোলিক বিস্তৃতি এবং উয়তা বেশি হওয়ায় দুই মেরু অঞ্চল থেকে বায়ুপ্রবাহ মেরুবৃত্ত অঞ্চলে পৌঁছে আয়তনে বেড়ে যায়। ও মেরু অঞ্চলের শীতল বায়ুর সঙ্গে ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে আগত উয় পশ্চিমা বায়ুর সংঘর্ষে এই অঞ্চলের বায়ু ঊর্ধ্বগামী হয়।

ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন অংশে প্রধানত বায়ুচাপের পার্থক্যের জন্য বায়ুপ্রবাহ সৃষ্টি হয় কারণ, বায়ু সর্বদা উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে ছুটে যায়। কোনো মানে নিম্নচাপ সৃষ্টি হলে বায়ু প্রসারিত ও হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায়। ভূপৃষ্ঠে বায়ুর চাপের সমতা আনার জন্য চারদিকের উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে বায়ু তখন ওই নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে ছুটে যায় অর্থাৎ বায়ুপ্রবাহের সৃষ্টি হয়। যেমন—নিরক্ষীয় অঞ্চলে প্রচন্ড উন্নতায় নিম্নচাপের সৃষ্টি হলে উপকারীয় উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে শীতল ও ভারী বায়ু নিরক্ষীয় নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে ছুটে যায়।

বায়ুর চাপের পার্থক্যের জন্যই বায়ুপ্রবাহের সৃষ্টি হয়। আমাদের পৃথিবীতে সাতটি চাপবলয় রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি নিম্নচাপ এবং চারটি উচ্চচাপ বলয়। চাপের সমতা বজায় রাখার জন্যই বায়ু উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। যেমন -0 সারা বছর ধরে পৃথিবীর কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে বায়ু নিরক্ষীয় নিম্নচাপের দিকে প্রবাহিত হয়। একে আয়ন বায়ু বলে। 2 কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয়ের কিছুটা বায়ু নিয়মিতভাবে সুমেরুবৃত্ত ও কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে বরে যায়। একে পশ্চিমা বায়ু বলে। ও আবার সুমেরু ও কুমেরু উচ্চচাপ বলয় থেকে শীতল ও শুষ্ক বাতাস সুমেরুবৃত্ত ও কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে সর্বদা ছুটে যায়, একে মেরু বায়ু বলে।

 

পৃথিবী ক্রমাগত আবর্তন করে চলেছে। এই আবর্তন বেগ নিরক্ষীয় অঞ্চলে সর্বাধিক হয় এবং মেরুতে শূন্য হয়। এই আবর্তনের ফলে পৃথিবী-পৃষ্ঠস্থ যে-কোনো স্বাচ্ছন্দ গতিশীল বস্তুসামগ্রী কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে ছিটকে বেরিয়ে যেতে চায়। কিন্তু পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির জন্য তা পারে না। পার্থিব বস্তুসামগ্রীর বাইরের দিকে ছিটকে যাওয়ার জন্য দায়ী এই বলকে কেন্দ্রবহির্মুখী বল বলে।

1835 সালে জি ডি কোরিওলিস নামে এক ফরাসি বিজ্ঞানী পৃথিবীর আবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট একপ্রকার দিক বিক্ষেপক বলের কথা প্রথম উল্লেখ করেন। তাই তাঁর নামানুসারে এই বলকে কোরিওলিস বল নামে অভিহিত করা হয়। এই বলের প্রভাবে বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্রোত প্রভৃতি উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপের দিকে চলাচলের সময় সোজাপথে প্রবাহিত না হয়ে উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে যায়, যা ফেরেল সূত্র নামে পরিচিত। কোরিওলিস বলের প্রভাব নিরক্ষরেখায় সবথেকে কম ও দুই মেরুতে সর্বাধিক হয়।

বায়ুর চাপ: আবহাওয়া ও জলবায়ুর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল বায়ুর চাপ। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অন্যান্য পদার্থের মতো বায়ুকেও নিজের কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করে, এজন্য অন্যান্য পদার্থের মতো বায়ুরও ওজন আছে। বায়ুর ওই ওজনকে বলে বায়ুর চাপ। সব জিনিসের ওপর বায়ুর চাপ পড়ে, এমনকি আমাদের দেহের ওপর বা চারপাশেও বায়ুর প্রবল চাপ রয়েছে।
বাইস ব্যালট সূত্র: 1857 সালে ডাচ আবহবিদ বাইস ব্যালট প্রমাণ করেন যে, উত্তর গোলার্ধে বায়ুর গতির দিকে পিছন ফিরে দাঁড়ালে ডানদিকের তুলনায় বামদিকে বায়ুর চাপ কম অনুভূত হয়। দক্ষিণ গোলার্ধে ঠিক এর বিপরীত অবস্থা দেখা যায়। বায়ুপ্রবাহ ও বায়ুচাপের পার্থক্যের এই সম্পর্কটি বাইস ব্যালট সূত্র (Buys Ballot's Law) নামে পরিচিত।

দক্ষিণ গোলার্ধে পশ্চিমা বায়ু উত্তর গোলার্ধের পশ্চিমা বায়ু অপেক্ষা অনেক দ্রুতগতিতে প্রবাহিত হয়। কারণ দক্ষিণ গোলার্ধের যে অংশের মধ্যে দিয়ে পশ্চিয়া বায়ু প্রবাহিত হয় সেখানে অর্থাৎ, 35-60° অক্ষাংশের মধ্যে স্থলভাগের তুলনায় জলভাগের পরিমাণ বেশি। তাই এখানে পশ্চিমা বায়ু বাধাহীনভাবে অতি দ্রুতগতিতে প্রবাহিত হয়। কিন্তু উত্তর গোলার্ধে পশ্চিমা বায়ুর গতিপথে স্থলভাগের অবস্থান বেশি থাকার জন্য বায়ু বাধাপ্রাপ্ত হয়। তাই খুব জোরে প্রবাহিত হতে পারে না।

জলভাগ ও স্থলভাগের মধ্যে বায়ুর উন্নতা এবং বায়ুর চাপের পার্থক্য হয় বলে বায়ুচাপ বলয়গুলি অনেকসময় বলয়ের মতো নিরবচ্ছিন্নভাবে পূর্ব পশ্চিমে পৃথিবীকে বেষ্টন না করে ছোটো ছোটো খন্ড বা অংশে বিভক্ত হয়ে অবস্থান করে। বায়ুচাপের এই ছোটো ছোটো বিভাগগুলিকে বলে বায়ুচাপ কক্ষ (pressure cell)। উত্তর গোলার্ধে স্থলভাগের পরিমাণ বেশি হওয়ায় বায়ুচাপ কক্ষ অনেক বেশি থাকে।

সাধারণভাবে বায়ু যে দিক থেকে প্রবাহিত হয়, সেই দিক অনুযায়ী বায়ুপ্রবাহের নামকরণ করা হয়। যেমন—বর্ষাকালে আমাদের দেশে দক্ষিণ পশ্চিম দিক থেকে মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়। তাই একে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বলে। একইভাবে পশ্চিমা বায়ু, সমুদ্রবায়ু, স্থলবায়ু, দক্ষিণা বায়ু প্রভৃতি নামকরণও বায়ুপ্রবাহের দিক অনুসারে করা হয় |

সারাবছর ধরে নিয়মিতভাবে ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে একইদিকে প্রায় একই গতিবেগে প্রবাহিত বায়ু হল নিয়ত বায়ুপ্রবাহ। নিয়ত বায়ুপ্রবাহ সৃষ্টির প্রধান কারণ ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুমণ্ডলের মধ্যে কতকগুলি স্থায়ী উচ্চচাপ ও নিম্নচাপ বলয়ের অবস্থান। ওই বায়ুচাপ বলয়গুলির মধ্যে চাপের সমতা রক্ষার জন্য নিয়ত বায়ু নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত হয়। নিরক্ষরেখার উভয়দিকে 0° থেকে 5° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষরেখার মধ্যবর্তী অঞ্চলে বায়ু সর্বদাই ঊর্ধ্বগামী হয়। ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে বা অনুভূমিকভাবে বায়ুর বিশেষ কোনো প্রবাহ থাকে না। এজন্য বায়ুমণ্ডলে কিছুটা শান্ত অবস্থা বিরাজ করে, তাই ওই অঞ্চলকে বলে নিরক্ষীয় শাস্তবলয় (equatorial doldrum) | পৃথিবীর তিনটি অংশ জুড়ে নিরক্ষীয় শান্ত বলয় অবস্থান করে।

আয়ন বায়ু একটি নিয়ত বায়ুপ্রবাহ। সারা বছর ধরে একই দিকে, ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে, একই গতিবেগে এই বায়ু প্রবাহিত হয়। ফলে পৃথিবীর জলবায়ুর ওপর এই বায়ু স্থায়ী প্রভাব ফেলে। প্রভাবগুলি হল-- (1) উত্তর পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু যখন উত্তর বা দক্ষিণ গোলার্ধে প্রবাহিত হয় তখন তারা সমুদ্রের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে প্রচুর জলীয়বাষ্প সংগ্রহ করে। জলীয়বাষ্প-পূর্ণ বায়ু মহাদেশের পূর্বদিকে সারা বছর বৃষ্টিপাত ঘটায়। এই কারণে উত্তর-পূর্ব ব্রাজিল, উত্তর-পূর্ব অস্ট্রেলিয়া, হাওয়াই দ্বীপে ভালো বৃষ্টিপাত হয়। মহাদেশের পূর্বদিকে বৃষ্টিপাত বেশি হয় বলে চাষাবাদ ভালো হয়। 2 আয়ন বায়ু যখন মহাদেশের পশ্চিয়ে গিয়ে পৌঁছায় তখন বায়ুতে জলীয়বাষ্প কমে যায়। ফলে সেখানে বৃষ্টিপাত হয় না। একারণে মহাদেশের পশ্চিমদিকে মরুভূমির সৃষ্টি হয়েছে। সাহারা, কালাহারি, আটাকামা মরুভূমি এভাবেই তৈরি হয়েছে।

নিরক্ষীয় অঞ্চলে একটি স্থায়ী নিম্নচাপ বলয় আছে। বায়ুচাপের সমতা রক্ষারজন্য এই নিম্নচাপ বলয়ের দু-দিকে অবস্থিত উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় থেকেদুটি আয়ন বায়ু——উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু এবং দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ুনিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত হয়। নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ে এইদৃষ্টি আয়ন বায়ু পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয় এবং এই অঞ্চলকে বলা হয় আন্তঃক্রান্তীয় কেন্দ্রাভিমুখ অঞ্চল বা আন্তঃক্রান্তীয় অভিসরণ অঞ্চল বাITCZ (Inter Tropical Convergence Zone)। এই অঞ্চলের বায়ু উন্নহওয়ায় সর্বদাই ঊধর্বগামী হয়, তাই ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে বা অনুভূমিকভাবেবায়ুর বিশেষ কোনো প্রবাহ থাকে না। এজন্য বায়ুমণ্ডলে কিছুটা শান্ত অবস্থা বিরাজ করে।

কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে সারা বছর ধরে প্রায় নিয়মিতভাবে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত বায়ু হল আয়ন বায়ু। এই বায়ু উভয় গোলার্ধে 5° থেকে 25° অক্ষরেখার মধ্যবর্তী অঞ্চলে চলাচল করে। আগেকার দিনে বড়ো বড়ো পালতোলা বাণিজ্যিক জাহাজ আয়ন বায়ুর সুনির্দিষ্ট গতিপথ ধরেই বাণিজ্য সামগ্রী নিয়ে চলাচল করত  (অর্থাৎ আয়ন বায়ুর সাহায্যে বাণিজ্য চালাত)। তাই এই বায়ুর আর-এক নাম বাণিজ্য বায়ু (Trade wind)।

বায়ুচাপ বলয়গুলির সঙ্গে নিয়ত বায়ুপ্রবাহের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। চাপের সমতা বিধানের জন্য বায়ুপ্রবাহ সর্বদা উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চল অভিমুখে প্রবাহিত হয়। ভূপৃষ্ঠের সাতটি বায়ুচাপ বলয়ের মধ্যে চারটি উচ্চচাপ ও তিনটি নিম্নচাপ বলয় অবস্থান করছে। নিয়ত বায়ুপ্রবাহ উপক্রান্তীয় এবং মেরু প্রদেশীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে নিরক্ষীয় এবং মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত হয়। নিয়ত বায়ুগুলি তিন প্রকারের যথা-0 আয়ন বায়ু, 2 পশ্চিমা বায়ু এবং ও মেরু বায়ু। আয়ন বায়ুর সঙ্গে বায়ুচাপ বলয়গুলির সম্পর্ক : নিরক্ষীয় অঞ্চলে একটি স্থায়ী নিম্নচাপ বলয় আছে। বায়ুচাপের সমতা রক্ষার জন্য এই নিম্নচাপ বলয়ের দু-দিকে অবস্থিত উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে বায়ু নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত হয় এবং এইভাবে যে বায়ুপ্রবাহের সৃষ্টি হয়, তাকে আয়ন বায়ু (‘আয়ন' কথার অর্থ ‘পথ’) বলে। পূর্বে পালতোলা জাহাজগুলি আয়ন বায়ুর গতিপথের দ্বারা পরিচালিত হত বলে, একে বাণিজ্য বায়ুও বলে ।

2 পশ্চিমা বায়ুর সঙ্গে বায়ুচাপ বলয়গুলির সম্পর্ক : দুই মেরুবৃত্ত প্রদেশে বা মেরুবৃত্ত অঞ্চলে দুটি নিম্নচাপ বলয়ের সৃষ্টি হয়েছে। বায়ুচাপের সমতা রক্ষার জন্য সংলগ্ন দুই উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে বায়ু সারা বছর নিয়মিতভাবে মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে ছুটে যায়, ফলে পশ্চিমা বায়ুপ্রবাহের সৃষ্টি হয় । ও মেরু বায়ুর সঙ্গে বায়ুচাপ বলয়গুলির সম্পর্ক : বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সুমেরু এবং কুমেরু-সংলগ্ন অঞ্চলে তীব্র ঠান্ডার জন্য বায়ুমণ্ডলে দুটি স্থায়ী উচ্চচাপ বলয় সৃষ্টি হয়েছে। ওই উচ্চচাপ বলয়ের কাছেই মেরুবৃত্ত অঞ্চলে আছে দুটি স্থায়ী নিম্নচাপ বলয় | এজন্য দুই মেরু-সংলগ্ন উচ্চচ্চাপ বলয় থেকে তীব্র ঠান্ডা ও শুষ্ক বায়ু নিয়মিতভাবে পার্শ্ববর্তী মেরুবৃত্ত অঞ্চলের নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত হয় এবং এভাবেই মেরু বায়ুপ্রবাহের সৃষ্টি হয়।

আয়ন বায়ুর শ্রেণিবিভাগ: উভয় গোলার্ধের উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে যে বায়ু সারা বছর ধরে নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট পথে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত হয়, তাকে বলে আয়ন বায়ু । আয়ন বায়ু দু-প্রকার, যথা

উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু: উত্তর গোলার্ধের উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে আয়ন বায়ু নিরক্ষীয় নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে ছুটে যাওয়ার সময় ফেরেলের সূত্রানুসারে ডানদিকে বেঁকে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হয়, তাই এই বায়ুপ্রবাহের নাম উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু।

2 দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু: দক্ষিণ গোলার্ধের উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে আয়ন বায়ু নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত হওয়ার সময় ফেরেলের সূত্রানুসারে একটু বামদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হয়, তাই এই বায়ুপ্রবাহের নাম দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু।
[0:00 pm, 23/08/2022] Anju: আয়ন বায়ুর বৈশিষ্ট্য:

1 গতিবেগ: উত্তর গোলার্ধে স্থলভাগ বেশি থাকায় উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ুর গতিবেগ একটু কম অর্থাৎ ঘণ্টায় 16 কিলোমিটার হয়। অন্যদিকে, দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগ বেশি থাকায় দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু ঘণ্টায় 22 কিলোমিটার বেগে প্রবাহিত হয়।

2 বিস্তৃতি : আয়ন বায়ু সাধারণত নিরক্ষরেখার দু-দিকে 25° অক্ষরেখা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে সারা বছর প্রবাহিত হয়। সুতরাং, দুটি গোলার্ধ মিলে প্রায় 50°-60° অক্ষরেখা জুড়ে আয়ন বায়ু প্রবাহিত হয় এবং তা এই সুবিস্তৃত অঞ্চলের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে।

3 প্রভাব: পৃথিবীর বড়ো বড়ো উষ্ণ মরুভূমি সৃষ্টির ক্ষেত্রে আয়ন বায়ুর বিশেষ ভূমিকা আছে। আয়ন বায়ুর গতিপথে মহাদেশগুলির পশ্চিম দিকে সাধারণত বৃষ্টিপাত হয় না। তাই কালাহারি, সাহারা, আটাকামা  প্রভৃতি উর্দু মরুভূমিগুলি আয়ন বায়ুর গতিপথে মহাদেশগুলির পশ্চিমে সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে, আমন বায়ুর প্রভাবে মহাদেশগুলির পুব অংশে বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় এইগুলি কৃষিকাজে উন্নত হয়েছে।

অপর নাম: আয়ন ও নিয়মিত গতিবেগের জন্য আগেকার দিনে এই রামুর সাহায্যে পালতোলা জাহাজে করে বাণিজ্য হত, তাই এই বায়ুর অপর নাম বাণিজ্য বায়ু (trade wind)।

পশ্চিমা বায়ুর শ্রেণিবিভাগ: গতিপথ অনুসারে পশ্চিমা বায়ু দু-প্রকার— O উত্তর গোলার্ধে পশ্চিমা বায়ু উৎস অঞ্চল থেকে সুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে আসার সময় ফেরেলের সূত্রানুসারে ডানদিকে বেঁকে দক্ষিণ পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয় । তাই উত্তর গোলার্ধে এই বায়ুকে দক্ষিণ পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু বলে। @ দক্ষিণ গোলার্ধে পশ্চিমা বায়ু উৎস অঞ্চল থেকে কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে আসার সময় ফেরেলের সূত্রানুসারে বামদিকে বেঁকে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয়। তাই দক্ষিণ গোলার্ধে এই বায়ু উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু নামে পরিচিত।

পশ্চিমা বায়ুর বৈশিষ্ট্য: 1 এই বায়ুর গতিবেগ ও দিকমুখী প্রবাহ আয়ন বায়ুর মতো অতটা অপরিবর্তনযোগ্য নয়। 2 পশ্চিমা বায়ু মহাসাগরগুলির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় জলীয়বাষ্প সংগ্রহ করে মহাদেশগুলির পশ্চিম প্রান্তে বৃষ্টিপাত ঘটায়। ও সূর্যের আপাত গতির ফলে পশ্চিমা বায়ু প্রভাবিত অঞ্চলের সীমা সামান্য উত্তরে বা দক্ষিণে সরে যায়। 4 উত্তর গোলার্ধ অপেক্ষা দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগ বেশি থাকায় এই গোলার্ধে পশ্চিমা বায়ু অধিক শক্তিশালী হয় এবং এর গতিপথও অপরিবর্তিত থাকে। 5 পশ্চিমা বায়ু দক্ষিণ গোলার্ধে 40° থেকে 50° অক্ষাংশের মধ্যে প্রবলবেগে ও সশব্দে সোজাসুজি পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে প্রবাহিত হওয়ায় 40° থেকে 50° দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যবর্তী স্থানকে গর্জনশীল চল্লিশা (roaring forties) বলে। 6 পশ্চিমা বায়ু প্রভাবিত অঞ্চলে ঘূর্ণবাত ও প্রতীপ ঘূর্ণবাতের আধিক্য লক্ষ করা যায়। 7 পশ্চিমা বায়ু গ্রীষ্মকালে দুর্বল ও শীতকালে অধিক শক্তিশালী হয়।

মেরু বায়ু: সুমেরুবৃত্ত ও কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে যে দুটি বায়ু নিয়মিতভাবে মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়, তাদের মেরু বায়ু বলে। মেরু বায়ুর শ্রেণিবিভাগ: গতিপথ তথা প্রবাহের দিক অনুসারে মেরু বায়ু দু-প্রকার—i উত্তর গোলার্ধে মেরু বায়ু উৎস অঞ্চল থেকে সুমেরুবৃত্তের দিকে আসার সময় ফেরেলের সূত্রানুসারে ডানদিকে বেঁকে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হয়। তাই উত্তর গোলার্ধে এই বায়ুকে উত্তর-পূর্ব মেরু বায়ু বলে। 3 দক্ষিণ গোলার্ধে মেরু বায়ু উৎস অঞ্চল থেকে কুমেরুবৃত্তের দিকে আসার সময় ফেরেলের সূত্রানুসারে বামদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হয়। তাই দক্ষিণ গোলার্ধে এই বায়ু দক্ষিণ পূর্ব মেরু বায়ু নামে পরিচিত। মেরু বায়ুর বৈশিষ্ট্য:  মেরু বায়ু অত্যন্ত শীতল। এই প্রকার বায়ু অত্যন্ত শুষ্ক অর্থাৎ জলীয়বাষ্প প্রায় থাকে না বললেই চলে। ও মেরু বায়ু খুবই অনিয়মিত প্রকৃতির। 4 উত্তর গোলার্ধ অপেক্ষা দক্ষিণ গোলার্ধেই মেরু বায়ু অধিক ক্রিয়াশীল।  এই প্রকার বায়ু ধীরগতিসম্পন্ন। মেরু বায়ুর প্রভাবে দুই মেরু অঞ্চলে তুষারপাত ও তুষার ঝড়ের সৃষ্টি হয়।