Chapter-4, রাষ্ট্রের প্রকৃতি এবং তার উপাদান

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনব্যবস্থা, রাজস্বব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, ভারতীয় সমাজজীবন, নারীদের অবস্থা প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনা রয়েছে। কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে রাজার প্রতি বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন, যথা— রাজ্যশাসন, পালন, প্রজাস্বার্থরক্ষা, দণ্ডবিধি, কূটনীতি গ্রহণ, গুপ্তচর নিয়োগ, যুদ্ধ পরিচালনা পদ্ধতি প্রভৃতি। দেওয়ানি, ফৌজদারি ছাড়াও ব্যক্তিগত আইনাবলি অর্থশাস্ত্রে বিশদভাবে বর্ণিত রয়েছে।

অর্থশাস্ত্ৰ গ্ৰন্থটি মহীশূরের পণ্ডিত ড. শ্যামশাস্ত্রী ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে আবিষ্কার করেন।

অর্থশাস্ত্রে বলা হয়েছে যে, রাজা ফেচ্ছাচারী না হয়ে প্রজাদরদি হবেন। কোচিলোর মতে প্রজাদের মঙ্গল, সমৃদ্ধি ও সুখপ্রদানের ক্ষেত্রে রাজাকে সক্রিয় থাকতে হবে।

কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্রকে জীবদেহের সঙ্গে তুলনা করে এর সাতটি অঙ্গের কথা বলেছেন। এগুলি হল- স্বামী, অমাত্য, পুর, জনপদ, কোশ, দণ্ড ও মিত্র। রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ সম্পর্কিত এই তত্ত্ব 'সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব' নামে পরিচিত।

গুপ্তযুগে বিশাখদত্ত রচিত 'মুদ্রারাক্ষস' নাটক থেকে আমরা জানতে পারি যে, চাণক্যের ছদ্মনাম ছিল কৌটিল্য। বৌদ্ধ ও জৈন শাস্ত্র গ্রন্থগুলিতেও এর সমর্থন মেলে।

কৌটিলা বর্ণিত রাষ্ট্রের সাতটি অঙ্গ বা উপাদানের প্রথমটি হল স্বামী অর্থাৎ রাজা। কৌটিলোর স্বামী উপাদানটির সঙ্গে গ্রিক দার্শনিক প্লেটো বর্ণিত রাষ্ট্রাদর্শ দার্শনিক রাজা (Philosopher King) বা অভিভাবক শ্রেণির (Guardian Class)-এর মিল রয়েছে।

কৌটিল্য তাঁর সপ্তাঙ্গ তত্ত্বে রাজকর্তব্যের বর্ণনা প্রসঙ্গে চারটি গুণাবলির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। এগুলি হল— [1] অভিগামিক গুণ [2] প্রজ্ঞাগুন, [3] উত্থান গুণ ও [4] আত্মসম্পদ।

কৌটিল্য বলেছেন—প্রতিটি গ্রামে কমপক্ষে একশত এবং অনুধ্রব পাঁচশত পরিবার বসবাস করবে। স্মরণীয় আটশত গ্রাম নিয়ে জনপদের বৃহত্তম একক গঠিত হবে।

কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রে চার ধরনের দুর্গের উল্লেখ করেছেন। এই চার দুর্গের নাম হল — গিরি দুর্গ, মরুদুর্গ, জলদুর্গ, বনদুর্গ।

রাষ্ট্রব্যবস্থার যাবতীয় কাজ পরিচালনায় কোশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। রাজকোশে সোনা, রুপা, মণি ও অন্যান্য রত্ন সঞ্চিত থাকলে দুর্ভিক্ষ-সহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মোকাবিলা করা যায়। কোলে অর্থ না থাকলে স্থায়ী সেনাবাহিনী রাখা যায় না, ফলে রাজ্যে শান্তি- শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়।

কৌটিল্যের কুটনীতির চারটি উপাদান হল- [1] সাম (সন্তুষ্টি  বিধান), [2] দান (অর্থ বা বস্তুর বিনিময় বা দুর্বল রাজাকে অভয় দান,) [3] দন্ড (সামরিক শক্তির প্রয়োগ) ও [4] ভেদ (বিভেদ নীতির প্রয়োগের দ্বারা শত্রু শিবিরে ভাঙ্গন)।

পারসিক প্রদেশগুলির শাসনব্যবস্থা 'স্যাট্রাপি' নামে পরিচিত ছিল।

কৌটিল্যের মতে রাষ্ট্রের সপ্তম অঙ্গ মিত্র দুই প্রকার। এগুলি হল- সহজ ও কৃত্রিম।

অর্থশাস্ত্র অনুসারে অমাত্য শ্রেণিভুক্ত কয়েকজন কমচারী হলেন—পুরোহিত, কোশাধক্ষ্য , রাজদূত, সন্নিধাতা, দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচারক প্রভৃতি।

গ্রামীণ শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে কৌটিল্য বর্ণিত কয়েকজন পদাধিকারী হলেন— অধ্যক্ষ, গোপ, স্থানিক চিকিৎসক সংখ্যায়ক (গাণনিক), সংঘকারিক (বার্তাবাহক) প্রভৃতি। এ ছাড়াও গ্রামের শান্তিরক্ষার জন্য নিযুক্ত ছিল শান্তি রক্ষক বাহিনী। শবর, চণ্ডাল, পুলিন্দ ও অরন্যচরদের মধ্যে থেকে এই শান্তিরক্ষক বাহিনীর সদস্যদের চয়ন করা হত।

কূটনীতির সংজ্ঞা প্রসঙ্গে কৌটিল্য বলেছেন—“নরক্ত পৃথিবীং কৃত্স্নাং জয়েত্যের ন হীয়তে।'' (অর্থশাস্ত্র, ৬/১)। অর্থাৎ ন্যায় সম্পর্কে জ্ঞানী রাজা নিজের কোনো ক্ষতি না করেও সমগ্র পৃথিবী জয় করতে পারেন যে নীতির দ্বারা তা হল কূটনীতি। কৌটিল্যের কাছে এই কূটনীতির তাৎপর্য হল নিজের রাজ্যে সুস্থিতি প্রতিষ্ঠা এবং অন্য রাজ্যের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।

কৌটিল্যের বিদেশনীতি বা কূটনীতির ধারণা গড়ে উঠেছে যে তত্ত্বকে কেন্দ্র করে তা মণ্ডলতত্ত্ব নামে খ্যাত।এই মণ্ডলতত্ত্বে মোট ১২ অর্থ জন রাজা এবং তাদের সম্পর্ক আলোচিত হয়েছে। অমাত্য, জনপদ, দুর্গ, কোশ ও বল এই পাঁচটি প্রকৃতি নিয়ে গঠিত রাষ্ট্রের স্বামী বা রাজাকে ঘিরেই গড়ে ওঠে রাজমণ্ডল যার কেন্দ্রে রয়েছে বিজিগীষু রাজা।

মণ্ডলতত্ত্বের প্রথম শ্রেণিতে রয়েছেন বিজিগীষু রাজা যার সঙ্গে বাকি ১১ জন রাজার মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত পাঁচজন রাজা হলেন—[1] অরি (শত্রু), [2] মিত্র (বিজিগীষু রাজার কন্ধু), [3] অরি মিত্র অর্থাৎ (শত্রু রাজার বন্ধু), [4] মিত্র মিত্র অর্থাৎ (বিজিগীষু রাজার বন্ধুর বন্ধু) ও [5] অরি মিত্র মিত্র (শত্রু রাজার বন্ধুর বন্ধু)। সপ্তম থেকে দ্বাদশ সংখ্যক রাজা হলেন—[1] পার্শ্বিগ্রাহ (পশ্চাদের শত্রু), [2] আক্রন্দ (পশ্চাদের বন্ধু),

[3] পার্শিগ্রাহাসার (পশ্চাদের শত্রুর বন্ধু),  [4] আক্রন্দসার (পশ্চাদের বন্ধুর বন্ধু), [5] মধ্যম (মাঝামাঝি), [6] উদাসীন (নিরপেক্ষ)।

কৌটিল্য বলেছেন রাষ্ট্রে রাজার শক্তি তিন প্রকার— [1] মন্ত্র শক্তি (মন্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ ক্ষমতা), [2] প্ৰভু শক্তি (বাস্তব সম্পদ ও বল ক্ষমতা) ও [3] উৎসাহ শক্তি (রাজার ব্যক্তিগত দৈহিক ও উদ্যোগ ক্ষমতা)। এই তিন ধরনের শক্তি প্রয়োগের দ্বারা রাজা যে সফলতা অর্জন করেন তা হল মন্ত্র, প্রভু, উৎসাহ সিদ্ধি।

সুলতানি যুগের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ইতিহাসবিদ ও রাষ্ট্রনীতিবিদ ছিলেন জিয়াউদ্দিন বারনি (১২৮৫-১৩৫৭ খ্রি.) তাঁর রচিত দুটি গ্রন্থ হল 'তারিখ-ই-ফিরোজশাহি’ এবং ‘ফতোয়া-ই জাহান্দারি'।

জিয়াউদ্দিন বারনি ইতিহাসকে শুধুমাত্র একটি ধারাবিবরণী বা কাহিনি বলে মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন ইতিহাস ধর্ম বা ঐতিহ্য নয় তা হল বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ। এই বিচারে তাঁর ফতোয়া-ই জাহান্দারির ভিত্তি ছিল—পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও সত্যানুসন্ধান।

বারনি রচিত ফতোয়া-ই-জাহান্দারি গ্রন্থের বিষয়বস্তু হল রাজতন্ত্রের সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক কীরূপ হওয়া উচিত, রাজার কী কী দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করা উচিত, দিল্লির সুলতানদের শাসননীতি কোন্ পথে পরিচালিত হওয়া উচিত, সুলতানি শাসনের প্রকৃতি বা স্বরূপ কেমন হওয়া উচিত প্রভৃতি।

সুলতানি যুগের প্রথম ঐতিহাসিক গ্রন্থ ছিল 'ফতোয়া-ই-জাহান্দারি'। গ্রন্থটির লেখক ছিলেন সুলতানি যুগের উল্লেখযোগ্য ইতিহাসবিদ ও রাষ্ট্রনীতিবিদ জিয়াউদ্দিন বারনি।

জিয়াউদ্দিন বারনির ইতিহাস দর্শনের দুটি মূল বৈশিষ্ট্য হল— [1] বারনির ইতিহাস সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ প্রসঙ্গে তাঁর মত হল—ঐতিহাসিক তার লেখার মধ্যে দিয়ে সঠিকভাবে সত্যকে প্রকাশ করবেন। [2] বারনির ইতিহাস দর্শনের আর একটি বৈশিষ্ট্য হল—ইতিহাসের সঙ্গে হাদিসের সম্পর্কস্থাপন।

‘ফতোয়া-ই-জাহান্দারিতে বারনি, গজনীর সুলতান মামুদের জবানিতে বিষয়বস্তু পরিবেশন করেছেন। মামুদ তাঁর পুত্র ও ইসলামি শাসকদের উদ্দেশ্যে পারসিক উপাখ্যানের উদ্ধৃতিগুলি তুলে ধরেন।

বারনির মতে একজন আদর্শ সুলতান তিনি, যিনি শরিয়ত আইন চালু রাখবেন, ইসলাম বিরোধীদের দমন করবেন, অবিশ্বাসীদের প্রতি কঠোর নীতি নেবেন, আপসহীন ন্যায় বিচার করবেন। এ ছাড়াও আদর্শ সুলতান ন্যায়পরায়ণ মুসলমানদেরই প্রশাসনিক পদগুলিতে নিয়োগ করবেন।

গ্রিক দার্শনিক প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের রাষ্ট্রচিন্তা বারনিকে প্রভাবিত করেছিল। প্লেটো রচিত 'রিপাবলিক' এবং অ্যারিস্টট্ল রচিত 'পলিটিক্স' এই দুই গ্রন্থের মূল তত্ত্বই ছিল বারনির রাষ্ট্রচিন্তার মূল উৎস।

বারনির ‘ফতোয়া-ই-জাহান্দারি'-তে মূলত ইসলামের রাজতন্ত্রের অবস্থান, দিল্লির সুলতানদের রাজতান্ত্রিক আদর্শ, তাদের দায়িত্ব, কর্তব্য প্রভৃতি বিষয়গুলির উল্লেখ আছে।

‘ফতোয়া-ই-জাহান্দারি'-তে শাসক ও রাষ্ট্রের স্থায়িত্বের ব্যাপারে নির্দেশনাগুলি হল— [1] একটি শক্তিশালী, দক্ষ ও সন্তুষ্ট সমরবাহিনী গঠন; [2] পূর্ণরাষ্ট্রীয় কোণাগার স্থাপন; [3] সঠিক কর আদায় ব্যবস্থা; [4] উপযোগী গুপ্তচর ব্যবস্থা।

বারনি বলেছেন—সুলতান বা শাসকগণ ইসলামের লালন-পালন বা রক্ষার জন্য নিজেদের সর্বশক্তি নিয়োগ করবেন। তারা এমন এক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবেন যেখানে ইসলাম ধর্ম সর্বতোভাবে বিকাশ লাভের সুযোগ পাবে।

জিয়াউদ্দিন বারনির রাজপদ সংক্রান্ত দুটি তত্ত্বের ধারণা মেলে। প্রথম তত্ত্বটি হল ঐতিহ্যোভূতিক, দ্বিতীয়টি হল ঐশ্বরিক ধারণায় অনুপ্রাণিত তত্ত্ব। প্রথম তত্ত্ব অনুযায়ী রাজার রাজপদ কোরান ও পয়গম্বর কর্তৃক অনুমোদিত নয় । দ্বিতীয় তত্ত্ব অনুযায়ী রাজা হলেন পৃথিবীতে ঈশ্বর প্রেরিত দূত, ঈশ্বরের প্রতিনিধি বা ঈশ্বরের ছায়া  (জিলুল্লাহ)।

বারনির মতে মধ্যযুগের সুলতানদের প্রধান দায়িত্ব ছিল সমস্ত প্রজার ধর্ম রক্ষা করা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। পাশাপাশি তাঁকে ইসলামের মর্যাদা রক্ষা করতে হত।

'থিওক্র্যাসি শব্দের অর্থ হল 'ধর্মাশ্রয়ী বা পুরোহিত-তান্ত্রিক রাষ্ট্র”, 'জাহান্দারি' শব্দের অর্থ হল 'ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র'। ।

'দার-উল-হারব' শব্দের অর্থ হল 'বিধর্মীর দেশ'।'দার-উল ইসলাম' শব্দের অর্থ হল 'ইসলামের পবিত্র ভূমি'।

উলেমা বলতে বিদ্বান ও ইসলামি ধর্মগ্রন্থে পণ্ডিত ব্যক্তিদের বোঝায় যারা ইসলামি শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করেন এবং ইসলামি আইন ‘শরিয়ত'-এর ব্যাখ্যা করেন।

সুলতানি রাষ্ট্রের প্রকৃতি ছিল ধর্মীয়—এই মতের কয়েকজন সমর্থক ছিলেন ঐতিহাসিক ঈশ্বরীপ্রসাদ, এ. এল. শ্রীবাস্তব, আর. পি. ত্রিপাঠি প্রমুখ।

সুলতানি রাষ্ট্রের প্রকৃতি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ—এই মতের কয়েকজন সমর্থক ছিলেন মহম্মদ হাবিব, আই.এইচ. কুরেশি, সতীশচন্দ্র প্রমুখ।

ধর্মাশ্রয়ী বা পুরোহিততান্ত্রিক রাষ্ট্রের ইংরেজি প্রতিশব্দ হল থিওক্র্যাটিক, যা গ্রিক শব্দ থিওস (অর্থ দেবতা) থেকে এসেছে। দেবতান্ত্রিক রাষ্ট্র হল ধর্মাশ্রয়ী বা পুরোহিততান্ত্রিক রাষ্ট্র) এরূপ রাষ্ট্রে ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে গভীর সম্পর্ক থাকে এবং যাজক বা পুরোহিতদের দ্বারা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয়।

ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি হল— [1] রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ ধর্মকে প্রাধান্য দান; [2] বিশেষ ধর্মীয় আইনকে রাষ্ট্রীয় জীবনে গুরুত্ব দান; [3] অন্যান্য ধর্মের প্রতি অনুদারতা প্রভৃতি।

কোরানের ভিত্তিতে মুসলমানদের অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কিত কিছু আইনবিধি রচিত হয়। এই সমস্ত আইনবিধিকে শরিয়ত বলা হয়।।

আনুগত্য প্রদর্শন ও কর প্রদানের মধ্যে দিয়ে অমুসলিমরা মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাস ও ধর্মরক্ষার অধিকার পেত। এই অমুসলিমরা 'জিম্মি' বা বিধর্মী নামে পরিচিত ছিল।

পয়গম্বর হজরত মহম্মদের দেহাবসানের পর একে একে চারজন পবিত্র খলিফা (আবুবকর, ওমর, ওসমান, আলি) হন। তাঁরা আমীর উল-মুমিনিন বা ধর্মবিশ্বাসীদের প্রধান হিসেবে ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলাম ধর্ম পরিচালনা করেন।

পারস্যের রীতিনীতি, রাজকীয় আদবকায়দা দিল্লির সুলতানরা অনুকরণ করতেন। এই রাষ্ট্রাদর্শের মূলকথা ছিল রাজা হলেন ঈশ্বরের প্রতিবিম্ব, রাজার মধ্যে দিয়েই ঈশ্বরের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে।

কৌটিল্য বর্ণিত ষডুগুণ অর্থাৎ ছয়টি গুণ হল- [1] সন্ধি (শান্তি স্থাপন) [2] বিগ্রহ (যুদ্ধ), [3] আসন (নিরপেক্ষতা), [4] যান (যুদ্ধ যাত্রা), [5] সাশ্রয় (অপরের আশ্রয় গ্রহণ বা অপরের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন), [6] দ্বৈধীভাব (একের সঙ্গে সন্ধি অন্যের প্রতি যুদ্ধ)।

অর্থশাস্ত্রে রাজার প্রধান কর্তব্যসমূহ

(1) প্রজাস্বার্থ রক্ষা ও প্রজাকল্যাণ: কৌটিলা বলেছেন, রাজার কর্তবা হল প্রজাস্বার্থ রক্ষা করা এবং প্রজাকল্যাণে নিয়োজিত থাকা। প্রজাদের মঙ্গল, সমৃদ্ধি ও সুখ প্রদানের ক্ষেত্রে রাজাকে সক্রিয় থাকতে হবে। অর্থশাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে- "প্রজাসুখে সুখ্যং  রাজ্ঃ, প্রজানাঞ্ছ হিতে হিতম" (অর্থশাস্ত্র, I, ১৯)। অর্থাত্ প্রজাদের সুখেই রাজার সুখ, প্রজাদের হিত বা মঙ্গলেই রাজার হিত বা মঙ্গল হয়।

(2) সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষা: অর্থশাস্ত্র মতে রাষ্ট্র আসলে সমাজেরই অংশ। সমাজের মধ্যে থেকেই রাষ্ট্রের জন্ম। এই বিচারে রাজার কর্তব্য হল রাষ্ট্রকে রক্ষার মধ্যে দিয়ে সমাজকে রক্ষা করা। প্রয়োজনে রাজা রাষ্ট্রনীতিজ্ঞ (Statesman) বা গুপ্তদের নিয়োগ করে রাজ্যের সমস্ত খবর নেবেন।

(3) দুর্দশা থেকে মুক্ত করা : পিতা যেমন পুত্রকে রক্ষা করেন, রাজার তেমন প্রজাদের যাবতীয় দুদশা থেকে যুক্ত করবেন। বন্যা, মহামারি, খরা, অগ্নিকাণ্ডের মতো প্রাকৃতিক বা আকস্মিক বিপর্যয়ের সময়ও প্রজাদের পাশে দাঁড়ানো রাজার কর্তব্য। দুর্ভিক্ষের সময় দুঃস্থদের সাহায্যের জন্য রাজা রাজকীয় শস্যভান্ডার খুলে দেবেন।

(4) দারিদ্র্য দূরীকরণ: কৌটিল্যের ধারণায় দরিদ্ররা সাধারণত লোভী ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অভাবের তাড়নায় তারা রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে পারে। তাই রাজার উচিত হল দরিদ্রদের সাহায্য দান করে। ধনী-দরিদ্রের মধ্যেকার ব্যবধান মোচনের চেষ্টা করা।

(5) দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন: রাজার গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করা। অপরাধীকে অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী। রাজা যেমন শাস্তি দেবেন, তেমন সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও কর্তব্যনিষ্ঠ নাগরিককে রাজা পুরষ্কৃত করবেন, সম্মাননীয় ব্যক্তিদের সম্মান ও মর্যাদা দেবেন।

 কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে রাজার অন্যান্য কর্তব্য

[1] সুদৃঢ় সেনাবাহিনী গঠন : কৌটিল্যের মতে, সামরিক শক্তির ওপরই রাজ্যের অস্তিত্ব বা স্থায়িত্ব অনেকাংশে নির্ভরশীল। রাজা এমন এক সেনাবাহিনী গঠন করবেন, যারা রাজ্যকে সুরক্ষা করতে সক্ষম হবে। সেনাধ্যক্ষদের সঙ্গে পরামর্শ করেই রাজা যুদ্ধের যাবতীয় পরিকল্পনা নেবেন।

[2] ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: রাজা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নাগরিকদের রক্ষা করবেন। ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে রাজা নিজ সন্তান বা গরুর মধ্যে কোনো প্রভেদ করবেন না। রাজা চারবর্ণের প্রজাদের প্রতিই সমান ব্যবহার করবেন। আইনের চোখে এদের সকলকেই সমানভাবে দেখবেন। ন্যায়বিচার মেনেই তিনি অপরাধীকে দোষী সাব্যস্ত করবেন।

[3] যোগ্যদের নিয়োগ : প্রশাসনের বিভিন্ন পদগুলিতে রাজা দক্ষ ও যোগ্য কর্মচারীদেরই নিয়োগ করবেন। এমনকি সামরিক বাহিনীর প্রধান বা যুদ্ধের সেনানায়কদেরও রাজা নির্বাচন করবেন। রাজা ‘প্রদেষ্ট' নামে প্রধান ফৌজদারি বিচারক এবং 'ব্যাবহারিক' নামে প্রধান দেওয়ানি বিচারকদেরও নিয়োগ করবেন।

[4] ব্যাবসাবাণিজ্যের উন্নয়ন: বাণিজ্য পথকে সুরক্ষিত করা এবং ব্যাবসাবাণিজ্যের উন্নতি ও সম্প্রসারণ রাজার আশু কর্তব্য। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্য বজায় রাখার জন্য রাজাকে সচেষ্ট থাকতে হবে।

[5] সুসম্পর্ক স্থাপন : প্রজাসাধারণ ও প্রতিবেশী রাজ্যের সঙ্গে রাজাকে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। রাজাকে দেখতে হবে প্রজারা যেন। নির্ভয়ে তার কাছে গিয়ে সহজেই তাদের অভাব-অভিযোগগুলি জানাতে পারে। রাজার ভদ্র ও পরিমার্জিত আচরণে জনগণ যেন সন্তুষ্ট থাকেন।

সীমাবদ্ধতা:

প্রথমত, কৌটিল্য রাজাকে স্বাধীন বলে উল্লেখ করলেও বাস্তবে কিন্তু রাজারা স্বাধীন ছিলেন না। নৈতিক এবং আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে রাজার ক্ষমতা সীমিত ছিল। দ্বিতীয়ত, 'সভা' এবং 'সমিতি' রাজার কর্তব্য ও অধিকারকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করত। তৃতীয়ত, রাজাকে অনেকসময় পূর্ব প্রচলিত প্রথা ও স্থানীয় আইনের কাছে নতিস্বীকার করতে হত। চতুর্থত, প্রজাসাধারণের অসন্তোষ বা প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে রাজাকে যে-কোনো কাজ করতে হত।

কৌটিল্যের সপ্তাঙ্গ তত্ত্বের পরিচয়

কৌটিল্য রচিত অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্রের বর্ণনায় ‘সপ্তাঙ্গিক রাজ্যম'—শব্দ দুটির উল্লেখ রয়েছে। সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব অনুযায়ী রাজ্য বা রাষ্ট্র সর্বসমেত ৭টি অঙ্গ বা উপাঙ্গ নিয়ে গঠিত। এই সাতটি অঙ্গ হল—স্বামী, অমাত্য, জনপদ, পুর, কোশ, দণ্ড এবং মিত্র এই সাতটি অঙ্গকে তিনি রাষ্ট্রের অপরিহার্য অঙ্গ বলে উল্লেখ করেছেন। এগুলি হল—

[1] স্বামী: কৌটিল্য স্বামী বলতে রাজা অর্থাৎ রাজ্যের প্রধানকেই বুঝিয়েছেন। এই স্বামী অর্থাৎ রাজার কর্তব্যের উল্লেখে তিনি রাজার চারটি গুণাবলির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন, যথা—

i. অভিগামিক গুণ : সত্যনিষ্ঠা, ধর্মপরায়ণ, বিনয়, শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা প্রভৃতি হল অভিগামিক গুণ।

ii. প্রজ্ঞাপন: দ্রুত কোনো সমস্যা সঠিকভাবে বুঝে নেওয়ার ক্ষমত সঠিক কাজ এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হল প্রজ্ঞাপন।

iii. উত্থান গুন: সাহস এবং দ্রুততার সঙ্গে কাজ শেষ করার ক্ষমতা হল এই গ্রুপের লক্ষণ।

iv. আত্ম সম্পদ : বাগ্মিতা, ইন্দ্রিয় সংযম, তিশক্তি, বিপদকালে অবিচলিত থাকা এই সমস্ত গুণ হল আত্ম সম্পদ।

[2] অমাত্য বা মন্ত্রী: কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে বিভিন্ন ধরনের কর্মচারী বা অমাত্য এবং তাদের নিয়োগ পদ্ধতি, দায়িত্ব ও কর্তব্য আলোচনা করেছেন। অর্থশাস্ত্র অনুসারে এরকম কয়েকজন কর্মচারী হলেন পুরোহিত, সমাহতা, সন্নিধাতা, কোণাযায়, রাজদূত, দেওয়ানি ফৌজদারি মামলার বিচারক প্রমুখ। অমাত্যের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হল কোনো কাজ শুরু করার আগে তার নীতি ও পদ্ধতি নির্ধারণ করা। কৌটিলা বলেছেন— "অমাত্য অবশ্যই দেশীয় হবেন এবং স্বামী (প্রভু)-র প্রতি গভীর অনুরক্ত থাকবেন।"

 [3] জনপদ : জনপদ বলতে কৌটিল্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ড ও তার অধিবাসীদের বুঝিয়েছেন। তিনি বলেছেন জনবিহীন জনপদ অর্থহীন। তিনি আদর্শ ভূখণ্ড বলতে উর্বরভূমি, প্রচুর অরণ্য সম্পদ, খনিজ সম্পদ বিশিষ্ট অঞ্চল এবং উৎকৃষ্ট মানের গোচারণভূমিকে বুঝিয়েছেন। কৌটিলা বলেছেন, প্রতিটি গ্রামে কমপক্ষে একলত এবং সর্বাধিক পাঁচশত পরিবার বসবাস করবে।

[4] দুর্গ: কৌটিল্যের মতে দুর্গগুলি সাম্রাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৌটিল্য চার ধরনের দুর্গের কথা বলেছেন। এগুলি হল—

i. জলদুর্গ: চারিদিকে জলবেষ্টিত এলাকা নিয়ে গঠিত দুর্গ হল জলদুর্গ।

ii. গুহা বা পার্বত্য দুর্গ: চারিদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা বা পাহাড়ের মধ্যে তৈরি হয়—এই ধরনের দুর্গ।

iii. মরুদুর্গ: মরুপ্রান্তর সংলগ্ন দুর্গগুলির নাম ছিল মরুদুর্গ।

iv. বনদুর্গ: বনাঞ্চলে প্রতিরক্ষার প্রয়োজনে স্থাপিত দুর্গের নাম ছিল বনদুর্গ।

[5] কোশ: কৌটিল্যের মতে রাষ্ট্রের শক্তি নির্ভর করে কোন বা রাজার আর্থিক ক্ষমতার ওপর। কোশ হল এমন এক অর্থভাণ্ডার যা রাজা রাজস্ব সংগ্রহের মাধ্যমে উপার্জন করেন অথবা অন্য কোনো সৎ উপায়ে সংগ্রহ করেন। অর্থের কয়েকটি উৎস হল প্রজাদের ওপর আরোপিত ভূমিরাজস্ব, চাষিদের থেকে সংগৃহীত শসাকর, সেচকর, ব্যাবসাদারদের থেকে আদায়িকৃত পশাকর প্রভৃতি।

[6] দণ্ড: কৌটিল্যের মতে দণ্ড বা বল অর্থাৎ সেনাবাহিনীর ওপর রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব নির্ভর করে। তাঁর ধারণায় সেনারা রাজার ইচ্ছায় পরিচালিত হবে এবং রাজার নির্দেশ মতো কাজ করবে। দণ্ড বা বল শব্দ দ্বারা মূলত হস্তী, অশ্ব, রথ এবং পদাতিক এই চতুরঙ্গ সেনাদের কথা বলা হয়েছে।

[7] মিত্র : সপ্তাঙ্গের শেষ উপাদানটি হল মিত্র বা সুহৃদ (ally)। কৌটিল্যের ধারণায়, মিত্র হল সে-ই, যার কাছ থেকে বিপদের কোনো সম্ভাবনা থাকে না। আর এক দিক থেকে মিত্র বা সুহৃদ শব্দটি বিজিগীষু (জয় করতে ইচ্ছুক) রাজাদের সঙ্গে মিত্রতা সূত্রে আবদ্ধকারীদের বোঝানো হয়েছে। কৌটিলা দু ধরনের মিত্রের কথা বলেছেন-—i. সহজ (Sahaja): পিতামহ ও পিতার সময়কাল থেকে যে ধরনের ব্যক্তিদের সঙ্গে মিত্রতার সম্পর্ক রয়েছে তারা হল সহজমিত্র।

ii. কৃত্রিম (Kritrima): এই ধরনের মিত্র হল অর্জিত মিত্র। এই ধরনের মিত্রতা স্বাস্থ্য, সম্পদ ও জীবনের নিরাপত্তা দেয়। কৌটিল্যের মতে—সহজমিয়তা কৃত্রিয়ের চেয়ে উৎকৃষ্ট বা শ্রেষ্ঠ।

অর্থশাস্ত্রের সংজ্ঞা

[1] অর্থ: 'অর্থ' বলতে সাধারণত টাকা, সম্পদ ইত্যাদিকেই বোঝায়। আর শাস্ত্র' শব্দের অর্থ হল বিদ্যা বা বিজ্ঞান। ব্যুৎপত্তিগত অর্থে তাই অর্থশাস্ত্র হল সম্পদের শাস্ত্র বা বিদ্যা। কিন্তু কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে অর্থনীতির পরিবর্তে রাজনীতির আলোচনা করেছেন।

[2] কৌটিল্য-র মত: কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রের শেষ অধ্যায়ে এর সংজ্ঞা দিয়ে বলেছেন-

"মনুষ্যনাং  বৃত্তি্রর্থঃ, মনুষ্যবর্তী ভূমিরিত্যথঃ।

তস্যাঃ পৃথিব্যা লাভ পালনোপায়ঃ

শাস্ত্রমর্থ শাস্ত্র মিতি।''  (অর্থশাস্ত্র, XV-S)

এই উদ্ধৃতির অর্থ হল—মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উপায় অর্থ। অর্থই হল মানুষের ধারণকারী ভূমি বা পৃথিবী। যে শাস্ত্ৰ এই পৃথিবীকে লাভ করা বা পালন করার উপায় লেখায়, তা হল অর্থশাস্ত্র।

[3] মতের ব্যাখ্যা : সাধারণ অর্থে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে অর্থকে বোঝানো হলেও কৌটিল্যের মত বিশ্লেষণ করে বলা যায়, সেযুগে বিনিময়ের সর্বোত্তম মাধ্যম ছিল ভূমি। ভূমির ওপর নির্ভরশীল কৃষি সেযুগের প্রধান অর্থনীতি। যে রাজার যত বেশি ভূমি ছিল, সেই রাজা তত বেশি শক্তিশালী ছিলেন। তাই ভূমিভিত্তিক রাজ্যজয়, রাজ্যরক্ষা ও রাজ্যশাসন বিষয়ক শাস্ত্রকে 'অর্থশাস্ত্র' হিসেবে আখ্যা দেওয়া সঠিক।

অর্থশাস্ত্রের বিষয়বস্তু

অর্থশাস্ত্রে বিভিন্ন বিষয় আলোচিত হয়েছে। বিষয়গুলি ১৫টি অধিকরণে বিভাজিত হয়ে আলোচিত হয়েছে। অর্থশাস্ত্রে রয়েছে ছ-হাজার শ্লোক। 'তন্ত্র' ও ‘আবাপ' এই দুই মূল অংশে অর্থশাস্ত্রের বিষয়বস্তুগুলি বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়াও অর্থশাস্ত্রে রয়েছে বিভিন্ন বিষয়ের পরামর্শ।

[1] 'তন্ত্র' অংশে আলোচিত বিষয়: 'তন্ত্র' অংশে রাজার বিনয়, বিদ্যাভ্যাস, শিক্ষালাভ, রাজ্য পরিচালনার পদ্ধতি, বিচারব্যবস্থা, অধ্যক্ষদের দায়িত্ব-কর্তব্য প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয়েছে।

[2] ‘আবাপ' অংশে আলোচিত বিষয় : 'আবাপ' অংশে আন্তঃরাজ্য সম্পর্ক, কূটনীতি বিষয়ক ছয়টি কৌশল, সপ্তাঙ্গবিশিষ্ট রাষ্ট্রের (রাজ্যের) নানা সংকট, যুদ্ধকৌশল, বিজিগীষু রাজার কর্তব্য প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয়েছে।

[3] বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ: কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে রাজার প্রতি বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন, যথা—রাজ্যশাসন, পালন, প্রজাস্বার্থ রক্ষা, দণ্ডবিধি, কূটনীতি গ্রহণ, গুপ্তচর নিয়োগ, যুদ্ধপরিচালনা পদ্ধতি প্রভৃতি।

অর্থশাস্ত্রের প্রকৃতি

[1] ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসনিক তত্ত্ব : অর্থশাস্ত্র হল ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসনিক তত্ত্ব। ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসন পরিচালনার শিক্ষা দেয় অর্থশাস্ত্র।

[2] রাষ্ট্রনীতিবিদ্যা: কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রকে রাষ্ট্রনীতির সমার্থক বলে উল্লেখ করেছেন। রাজ্যশাসনের জন্য রাজার যেসমস্ত নিয়মনীতি অনুসরণ করা উচিত তা হল রাষ্ট্রনীতি। দেওয়ানি, ফৌজদারি ছাড়াও ব্যক্তিগত আইনাবলি অর্থশাস্ত্রে বিশদভাবে বর্ণিত রয়েছে।

[3] ভূমি সংরক্ষণবিদ্যা: অর্থশাস্ত্র হল ভূমিরূপী রাজ্যজয় ও তার সংরক্ষণবিদ্যা। এই গ্রন্থ থেকে রাজ্যরক্ষার নানা ধারণা মেলে। অধ্যাপক বি. এ. সালেতার, আর, পি, কাঙলে প্রমুখ মনে করেন অর্থশাস্ত্র হল—ভূমি সংরক্ষণবিদ্যা।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে রাজতন্ত্র ও রাষ্ট্রনীতি

(1) রাজতন্ত্র 

i. ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসনি তত্ত্ব: অর্থশাস্ত্র হল ধর্মনিরপেক্ষ, প্রশাসনিক তত্ত্ব। ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসন পরিচালনার শিক্ষা দেয় অর্থশাস্ত্র।

ii. রাজার ক্ষমতা

[a] রাজার চূড়ান্ত ক্ষমতা: অর্থশাস্ত্র অনুসারে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হলেন রাজা। তিনি রাষ্ট্রের প্রধান অঙ্গ এবং পার্থিব জগতে চূড়ান্ত সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকারী। তাঁর কর্তৃত্বকে উপেক্ষা বা অমান্য করার ক্ষমতা কারও নেই।

(b) ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ: অবশ্য রাজার ক্ষমতার ওপর কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথাও অর্থশাস্ত্রে বলা হয়েছে। কেন-না, রাজাই রাষ্ট্র নয়, তিনি রাষ্ট্রের অংশ যায়। রাষ্ট্র পরিচালনায় অনেকের সাহায্য তাঁর প্রয়োজন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রাজা মন্ত্রীমন্ডলী।

[c] রাজস্বব্যবস্থা: কৌটিল্য তাঁর গ্রন্থে তিন প্রকার রাজস্বের কথা বলেছেন— সীতা, ভাগ এবং বলি। (1) সীতা-রাজার খাসজমি সীতা থেকে রাজার ভালোই আয় হত। (2) ভাগ ভাগ অর্থাৎ প্রজার ব্যক্তিগত জমি থেকে উৎপন্ন ফসলের ১/৬ অংশ কর আদায় করা হত। (3) বলি—বলি নামে একপ্রকার বাধ্যতামূলক কর আদায় করা হত। এ ছাড়া বন, খনি, শিল্প, আমদানি-রপ্তানি, পশুচারণ, পানশালা, কসাইখানা, জল, পথ প্রভৃতি থেকেও কর আদায় করা হত।

iii. রাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষতা : কৌটিল্য রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের কথা বলেছেন।

[a] শাসনকার্যে পুরোহিতদের গুরুত্বহীনতা : আধ্যাত্মিক বিষয়ে পুরোহিতের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষিত হলেও রাষ্ট্রে রাজার ক্ষমতাকে পুরোহিত কোনোভাবেই প্রভাবিত করার অধিকারী নন। পুরোহিত কোনো শাস্তিযোগ্য অপরাধ করলে কৌটিলা নির্দ্বিধায় তার চরম শাস্তির পক্ষে সওয়াল করেছেন।

[b] রাজার প্রতি রাজকর্মচারীদের আনুগত্য :  উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীরা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পরিবর্তে রাজার প্রতি অনুগত থাকবেন বলে কৌটিলোর নির্দেশ ছিল।

[c] বিচারক নিয়োগ পদ্ধতি: বিচারক পদে নিয়োগের পূর্বে কৌটিল্য প্রার্থীর ধর্মীয় বিচারবিবেচনা উপেক্ষা করার মানসিকতা যাচাই করে নিতেন।

[2] রাষ্ট্রনীতি:

(i) রাষ্ট্রদর্শন :

[a] শাসকের নীতিঃ কৌটিল্য বলেছেন, রাজাকে কূটনীতি পরায়ণ হতে হবে এবং রাষ্ট্রে বা শাসনব্যবস্থায় রাজাই একমা সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। রাজাই রাজ্য, রাজা দুর্বল হলে রাষ্ট্র দুর্বল হতে বাধ্য।

[b] রাজার কর্তব্য: 'অর্থশাস্ত্রে' কৌটিলা রাজাকে কঠোর পরিশ্রম করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেছেন রাজার অবাধ ক্ষমতা থাকলেও তিনি কখনোই স্বেচ্ছাচারী হবেন না।

[c] নৈতিকতায় গুরুত্বহীনতা: কৌটিল্য রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য যে-কোনো পদ্মা গ্রহণকেই সমর্থন করেন। তিনি বলেন যে, যুদ্ধই শান্তির একমাত্র পথ। রাষ্ট্রনীতিতে নৈতিকতার কোনো স্থান নেই বলে তিনি মনে করেন।।

[d] মণ্ডলতত্ত্বঃ তাঁর মতে, সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী রাষ্ট্র হল স্বভাবজাত শত্রু এবং তার পরবর্তী রাষ্ট্র হল স্বভাবজাত মিত্র। এই দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের শত্রু ও মিত্র নির্ধারণ করতে হবে। কৌটিল্যের এই তত্ত্বকে 'মণ্ডলতত্ত্ব' বলা হয়।

(ii) প্রজাকল্যাণ:

প্রজা সাধারণের মঙ্গলসাধন করা রাজার গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য ও দায়িত্ব। কৌটিলোর মতে, রাষ্ট্র দুটি উপায়ে প্রজাকল্যাপের দায়িত্ব পালন করতে পারে—

[a] দুর্গতদের কল্যাণ: রাষ্ট্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্ভিক্ষের সময় প্রজাদের ত্রাণ দেবে, কৃষকদের বীজ সরবরাহ করবে, মহামারি প্রতিরোধের উদ্যোগ নেবে, অসহায়, বৃদ্ধ ও বিধবাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেবে ইত্যাদি ।

[b] সর্বসাধারণের কল্যাণ: সর্বসাধারণের কল্যাণের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্র বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প রূপায়িত করবে, অসাধু ব্যবসায়ীদের শাস্তি দিয়ে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করবে, সমাজ কল্যাণে মানুষকে উৎসাহিত করবে ইত্যাদি।

(iii) দুর্গ ও নগর নির্মাণ 
বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিরোধ ও দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রস্থলে এবং চারিদিকে
[18:18, 9/26/2022] Vhai: বিভিন্ন দুর্গ ও নগর নির্মাণের পরিকল্পনা করা রাষ্ট্রের ল উচিত বলে কৌটিলা উল্লেখ করেছেন।

(a) দুর্গ: কৌটিল্য চার ধরনের গুণের কথা বলেছেন পার্বত্যদুর্গ, অরণ্যদুর্গ, জলদুর্গ ও মরুদ্রণ। দুর্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে অর্থসম্পদ, খাদ্যশস্য, ঔষথপত্র, সৈন্যসামন্ত, অস্ত্রশস্ত্র, হাতি, ঘোড়া প্রভৃতি থাকবে।

[b] নগর: নগরগুলি বিশালাকার বাজার হিসেবে কাজ করছে। এবং এখান থেকে রাষ্ট্র প্রভূত রাজস্ব অর্জন করতে পারবে।

 সুলতানি শাসনের প্রাতিষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয় কাঠামো

দিল্লির সুলতানি রাষ্ট্রের শাসনকাঠামোয় দুই ধরনের স্তর লক্ষ করা যায়—একটি কেন্দ্রীয়, অপরটি হল প্রাদেশিক।

[1] কেন্দ্রীয় বিভাগ

i. সুলতানিঃ সুলতানি রাষ্ট্র পরিচালনায় কেন্দ্রীয় দূরের শীর্ষে ছিলেন। সুলতান স্বয়ং। সুলতান নিজেই ছিলেন রাষ্ট্রের সর্বশক্তির আধার। ...এবং সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। খলিফার অধীনে থেকে সুলতান কোরানের নির্দেশ যেনে শাসন চালাতেন। সুলতান একাধারে ছিলেন। শাসন, বিচার, অহিন ও সমর বিভাগের প্রধান।ii. দপ্তরসমূহ

[a] দেওয়ান-ই-ওয়াজিরাৎ: শাসন কাঠামোয় সুলতানের পরেই ছিল ওয়াজির বা প্রধানমন্ত্রীর স্থান। রাজস্ব আদায় ও প্রশাসন পরিচালনা ছাড়াও তিনি অসামরিক বিভাগেরও তত্ত্বাবধান করতেন। তাঁর দপ্তরের নাম ছিল 'দেওয়ান-ই-ওয়াজিরা'।

[b] দেওয়ান-ই-আর্জ: সামরিক বিভাগ বা 'দেওয়ান-ই-আজ" এর প্রধান ছিলেন 'আরিজই সামলিক'। আরিজেই মামলিকের কাজ ছিল— সেনা ও যুদ্ধসরঞ্জাম সংগ্রহ করা। সেনাদের বেতন নির্ধারণ ও তা প্রদান করা, সেনাবাহিনীর দুর্নীতি দমন করা প্রভৃতি।

[c] দেওয়ান-ই-রিসালত: কেন্দ্রীয় বিভাগের দেওয়ান-ই রিসালত' নামে বৈদেশিক দপ্তরের প্রধান ছিলেন সদর উপ সুদূর'। বিদেশি রাজদূত ও প্রতিনিধিরা এই দপ্তরের মাধ্যমে সুলতানি রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করত।

[d] দেওয়ান-ই-ইন্সা: এই দপ্তরের মাধ্যমে প্রাদেশিক শাসনকর্তা ও বিভিন্ন সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে সুলতানের গোপন যোগাযোগ রক্ষা করা হত।

[e] অন্যান্য দপ্তর: অন্যান্য কয়েকটি দপ্তর ছিল গুপ্তচর দপ্তরঃ 'বারিদ-ই মামালিক', এটির প্রধান ছিলেন বারিদ ই খাস।

কৃষিদপ্তর: দেওয়ান-ই-আমির-কোহী, পূর্ত দপ্তর, দেওয়ান-ই ইমারত, পেনশন দপ্তর: দেওয়ানই উদ্ভাক, দাতব্য দপ্তর। দেওয়ান-ই-খয়রাত প্রভৃতি।
iii. রাজস্ব ব্যবস্থা : সুলতানি যুগে আয়ের কয়েকটি উৎস ছিল— ভূমিরাজস্ব, জাকাত, জিজিয়া, খামস, খনিজ, উত্তরাধিকারহীন সম্পদ প্রভৃতি। সুলতানি রাজস্বের অপর একটি উৎস ছিল ইত্তা প্রমা | ইক্তার শাসনকর্তা ছিলেন মাকৃতি বা মুকতি নামে কর্মচারীরা।

iv. বিচারব্যবস্থা : বিচার ব্যবস্থার শীর্ষে থেকে সুলতান নিজে সপ্তাহে দু-দিন বিচার করতেন। প্রধান বিচারক ছিলেন কাজি-উল কাজাত'। মুর্তি শরিয়তি আইনের যে ব্যাখ্যা দিতেন, তা অনুসরণ করেই বিচার হত।

v. পুলিশি ব্যবস্থা: শহরে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করত "কোতোয়াল'। তাঁকে সাহায্য করত 'মুহতাসিব'। গ্রামে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করতেন 'গ্রাম্য চৌকিদার।

[2] প্রাদেশিক বিভাগ

i. নানান রূপ : সুলতানি সাম্রাজ্যে তিন ধরনের প্রদেশ লক্ষ করা যায়। যথা- [a] পূর্বতন ইত্তা, যার শাসনকর্তা ছিলেন থাকতি। [b] নববিজিত রাজ্যসমূহ, যথা—বাংলা, জৌনপুর, খান্দেশ। গুগুলির শাসনকর্তাকে বলা হত ওয়ালি (c) পরাজিত হিন্দু রাজাদের রাজ্যসমূহ ।

ii. বিভাগসমূহ: প্রদেশগুলি কয়েকটি গিক বা জেলায় বিভক্ত ছিল। শিক-এর প্রধান ছিলেন শিকদার। শিগুলি পরগনায় এবং পরগনাগুলি গ্রামে বিভক্ত ছিল।

বারনির ধারণায় সুলতানি রাষ্ট্রের প্রকৃতি

অনেকের মতে দিল্লির সুলতানি রাষ্ট্র ছিল ধর্মাশ্রয়ী, আবার কারও কারও ধারণা হল—দিল্লির সুলতানি রাষ্ট্র ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। বারনি এ ব্যাপারে ধর্মনিরপেক্ষ ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন।

(1)ইসলামের আদর্শ থেকে বিচ্যুতিঃ  বারনি মনে করতেন, মধ্যযুগে দিল্লির শাসকগণ ইসলামের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছিলেন। তারা ইসলামীয় আদর্শ বা বিধি উপেক্ষা করেই সুলতানি প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন। প্রথম দিককার সুলতানগণ নিজেদেরকে খলিফার প্রতিনিধি বলে প্রচার করলেও কার্যত তারা ছিলেন স্বাধীন।

(2) রাষ্ট্রনীতি ও ধর্মনীতির পৃথকীকরণ: বারনির ধারণায় শিল্পির সুলতানগণ এটা অনুভব করেছিলেন যে, শাসনকালকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য রাষ্ট্রনীতি ও ধর্মনীতি আলাদা হওয়া উচিত। সুলতানগণ এই আদর্শ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন।

(3) খলিফা ও উলেমাদের প্রতি আপাত আনুগত্য : ইলতুতমিস-স প্রথমদিকের দিল্লির সুলতানগণ নিজেদের প্রয়োজনে খলিফার প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে দিল্লির সুলতানগণ যেমন আলাউদ্দিন খলজি, তাঁর পুত্র মুবারক শাহ খলিফার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন বন্ধ করেন। বলবন, এমনকি মহম্মদ-বিন-তুঘলকও উলেমাদের নিয়ন্ত্রপযুক্ত হয়ে শাসন পরিচালনা করতেন।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে রাজতন্ত্র ও রাষ্ট্রনীতি

(1) রাজতন্ত্র 

i. ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসনি তত্ত্ব: অর্থশাস্ত্র হল ধর্মনিরপেক্ষ, প্রশাসনিক তত্ত্ব। ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসন পরিচালনার শিক্ষা দেয় অর্থশাস্ত্র।

ii. রাজার ক্ষমতা

[a] রাজার চূড়ান্ত ক্ষমতা: অর্থশাস্ত্র অনুসারে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হলেন রাজা। তিনি রাষ্ট্রের প্রধান অঙ্গ এবং পার্থিব জগতে চূড়ান্ত সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকারী। তাঁর কর্তৃত্বকে উপেক্ষা বা অমান্য করার ক্ষমতা কারও নেই।

(b) ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ: অবশ্য রাজার ক্ষমতার ওপর কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথাও অর্থশাস্ত্রে বলা হয়েছে। কেন-না, রাজাই রাষ্ট্র নয়, তিনি রাষ্ট্রের অংশ যায়। রাষ্ট্র পরিচালনায় অনেকের সাহায্য তাঁর প্রয়োজন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রাজা মন্ত্রীমন্ডলী।

[c] রাজস্বব্যবস্থা: কৌটিল্য তাঁর গ্রন্থে তিন প্রকার রাজস্বের কথা বলেছেন— সীতা, ভাগ এবং বলি। (1) সীতা-রাজার খাসজমি সীতা থেকে রাজার ভালোই আয় হত। (2) ভাগ ভাগ অর্থাৎ প্রজার ব্যক্তিগত জমি থেকে উৎপন্ন ফসলের ১/৬ অংশ কর আদায় করা হত। (3) বলি—বলি নামে একপ্রকার বাধ্যতামূলক কর আদায় করা হত। এ ছাড়া বন, খনি, শিল্প, আমদানি-রপ্তানি, পশুচারণ, পানশালা, কসাইখানা, জল, পথ প্রভৃতি থেকেও কর আদায় করা হত।

iii. রাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষতা : কৌটিল্য রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের কথা বলেছেন।

[a] শাসনকার্যে পুরোহিতদের গুরুত্বহীনতা : আধ্যাত্মিক বিষয়ে পুরোহিতের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষিত হলেও রাষ্ট্রে রাজার ক্ষমতাকে পুরোহিত কোনোভাবেই প্রভাবিত করার অধিকারী নন। পুরোহিত কোনো শাস্তিযোগ্য অপরাধ করলে কৌটিলা নির্দ্বিধায় তার চরম শাস্তির পক্ষে সওয়াল করেছেন।

[b] রাজার প্রতি রাজকর্মচারীদের আনুগত্য :  উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীরা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পরিবর্তে রাজার প্রতি অনুগত থাকবেন বলে কৌটিলোর নির্দেশ ছিল।

[c] বিচারক নিয়োগ পদ্ধতি: বিচারক পদে নিয়োগের পূর্বে কৌটিল্য প্রার্থীর ধর্মীয় বিচারবিবেচনা উপেক্ষা করার মানসিকতা যাচাই করে নিতেন।

[2] রাষ্ট্রনীতি:

(i) রাষ্ট্রদর্শন :

[a] শাসকের নীতিঃ কৌটিল্য বলেছেন, রাজাকে কূটনীতি পরায়ণ হতে হবে এবং রাষ্ট্রে বা শাসনব্যবস্থায় রাজাই একমা সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। রাজাই রাজ্য, রাজা দুর্বল হলে রাষ্ট্র দুর্বল হতে বাধ্য।

[b] রাজার কর্তব্য: 'অর্থশাস্ত্রে' কৌটিলা রাজাকে কঠোর পরিশ্রম করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেছেন রাজার অবাধ ক্ষমতা থাকলেও তিনি কখনোই স্বেচ্ছাচারী হবেন না।

[c] নৈতিকতায় গুরুত্বহীনতা: কৌটিল্য রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য যে-কোনো পদ্মা গ্রহণকেই সমর্থন করেন। তিনি বলেন যে, যুদ্ধই শান্তির একমাত্র পথ। রাষ্ট্রনীতিতে নৈতিকতার কোনো স্থান নেই বলে তিনি মনে করেন।।

[d] মণ্ডলতত্ত্বঃ তাঁর মতে, সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী রাষ্ট্র হল স্বভাবজাত শত্রু এবং তার পরবর্তী রাষ্ট্র হল স্বভাবজাত মিত্র। এই দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের শত্রু ও মিত্র নির্ধারণ করতে হবে। কৌটিল্যের এই তত্ত্বকে 'মণ্ডলতত্ত্ব' বলা হয়।

(ii) প্রজাকল্যাণ:

প্রজা সাধারণের মঙ্গলসাধন করা রাজার গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য ও দায়িত্ব। কৌটিলোর মতে, রাষ্ট্র দুটি উপায়ে প্রজাকল্যাপের দায়িত্ব পালন করতে পারে—

[a] দুর্গতদের কল্যাণ: রাষ্ট্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্ভিক্ষের সময় প্রজাদের ত্রাণ দেবে, কৃষকদের বীজ সরবরাহ করবে, মহামারি প্রতিরোধের উদ্যোগ নেবে, অসহায়, বৃদ্ধ ও বিধবাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেবে ইত্যাদি ।

[b] সর্বসাধারণের কল্যাণ: সর্বসাধারণের কল্যাণের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্র বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প রূপায়িত করবে, অসাধু ব্যবসায়ীদের শাস্তি দিয়ে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করবে, সমাজ কল্যাণে মানুষকে উৎসাহিত করবে ইত্যাদি।

(iii) দুর্গ ও নগর নির্মাণ 
বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিরোধ ও দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রস্থলে এবং চারিদিকে
[18:18, 9/26/2022] Vhai: বিভিন্ন দুর্গ ও নগর নির্মাণের পরিকল্পনা করা রাষ্ট্রের ল উচিত বলে কৌটিলা উল্লেখ করেছেন।

(a) দুর্গ: কৌটিল্য চার ধরনের গুণের কথা বলেছেন পার্বত্যদুর্গ, অরণ্যদুর্গ, জলদুর্গ ও মরুদ্রণ। দুর্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে অর্থসম্পদ, খাদ্যশস্য, ঔষথপত্র, সৈন্যসামন্ত, অস্ত্রশস্ত্র, হাতি, ঘোড়া প্রভৃতি থাকবে।

[b] নগর: নগরগুলি বিশালাকার বাজার হিসেবে কাজ করছে। এবং এখান থেকে রাষ্ট্র প্রভূত রাজস্ব অর্জন করতে পারবে।

 বারণির ফতোয়া ই জাহান্দারিতে রাজতন্ত্র ও রাষ্ট্রনীতি

[1] রাজতন্ত্র

(i) রাজতন্ত্রের রূপ:

[a] চরম রাজতন্ত্র: বারনি তাঁর ফতোয়া-ই-জাহন্দারি গ্রন্থে চরম রাজতন্ত্রকে সমর্থন করেছেন। তিনি রাজতন্ত্রকে একটি বংশানুক্রমিক প্রতিষ্ঠান বলে উল্লেখ করেছেন এবং রাজাকে সবধরনের কখন থেকে মুক্ত চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী বলে ঘোষণা করেছেন।

[b] পারসিক রাজতন্ত্রের অনুকরণ: তিনি ভারতের সুলতানি রাজতন্ত্রকে পারস্যের সাসানীয় রাজতন্ত্রের অনুকরণে গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, পারস্যের সম্রাট ইসলামের আদর্শ ভাবধারা রক্ষা করে চলেছে, পারস্যের রাজতন্ত্রের জাঁকজমক, বিলাস-বৈভব ও মর্যাদা সমগ্র ইসলামি জগতে শ্রদ্ধা লাভ করেছে।

(ii) কাউন্সিল গঠন : বারনির মতে, প্রশাসনিক কাজে সাহায্যের জন্য সুলতান এক পরিষদ (কাউন্সিল) গঠন ও তার সংস্কার করবেন। এই কাউন্সিল অর্থাৎ 'মজলিস-ই-খাস' এমন ভাবে গঠন করতে হবে, যাতে রাজার পরিবর্তন ঘটলেও কাউন্সিল কর্তৃক গৃহীত নীতিগুলির কোনো পরিবর্তন হবে না।

(iii). আইনের সংরক্ষণ: বারনির মতে, ইসলামিক রাজ্যগুলিতে কোরান অনুযায়ী শরিয়ত আইনই শেষ কথা। ইসলাম ধর্মমত অনুসারে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় জীবনের একমাত্র নিয়ন্ত্রক হল— শরিয়তি আইন। রাজা যেহেতু ঈশ্বরের প্রতিনিধি এবং খলিফার হয়ে শাসন সম্পাদন করেন, তাই শরিয়তি আইন ঠিকমতো প্রযুক্ত হচ্ছে কিনা তা দেখা রাজার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

[2] রাষ্ট্রনীতি

i. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা : প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের রাষ্ট্রনৈতিক

ভাবনায় প্রভাবিত বারনি মনে করতেন রাজার প্রধান কর্তব্য হল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। এক্ষেত্রে তিনি ন্যায়বিচার বলতে সত্য ন্যায়, ধর্ম ইত্যাদির প্রতিষ্ঠা করাকে বুঝিয়েছেন। বারনি বলেছেন—ইসলাম ও শরিয়তের নিয়মকানুন কঠোরভাবে রাজাকে পালন করতে হবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে আগত যাবতীয় বাধা রাজাকে অপসারিত করতে হবে। যাবতীয় অন্যায় ও অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে রাজা কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।
ii. ইসলামের সুপ্রতিষ্ঠা: মুসলিম রাজার এক প্রধান কর্তব্য হল ইসলামের সুরক্ষাদান এবং তার প্রচার ও প্রসার ঘটানো। রাজাদের স্মরণ রাখতে হবে যে তারা কেবলমাত্র খলিফা (ঈশ্বরের প্রতিনিধি) দের অসমাপ্ত কাজগুলি সম্পাদন করেন। তাঁর শাসন যেহেতু ইসলাম অনুমোদিত, তাই নিষ্ঠা-সহ তিনি ইসলামি শরিয়তের বিধিবিধানগুলি অনুসরণ করবেন।

iii. প্রজাসাধারণের কল্যাণসাধন: বারনির মতে, ইসলামিক রাষ্ট্রের প্রজাদের কল্যাণসাধনে রাজাকে ব্রতী হতে হবে। প্রজাকল্যাণে ব্যর্থ হলে রাজা প্রজাদের আনুগত্য হারাবেন। রাজা পথিকদের জন্য রাজপথ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ-সহ নানা  জনকল্যাণমূলক কাজ করবেন। রাজা অমুসলিমদের নিরাপত্তা ও স্বাধীন ধর্মাচরণের অধিকার দেবেন।

সূচনা: সুলতানি রাষ্ট্রের প্রকৃতি বা চরিত্র নিয়ে আধুনিক ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ধর্মীয় দিক থেকে সুলতানি রাষ্ট্র ধর্মাশ্রয়ী না ধর্মনিরপেক্ষ ছিল বা শাসনতান্ত্রিক বিচারে সুলতানি রাষ্ট্র সামরিক না অভিজাততান্ত্রিক ছিল তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই।

সুলতানি রাষ্ট্রের প্রকৃতি

[1] ধর্মীয় দিক থেকে

(i) ধর্মাশ্রয়ী

[a] প্রবক্তাগণ: সুলতানি রাষ্ট্রের প্রকৃতিকে যে সমস্ত ঐতিহাসিক ধর্মাশ্রয়ী (Theocratic) বলে উল্লেখ করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন—ড. আর. পি. ত্রিপাঠী, ড. ঈশ্বরীপ্রসাদ, ড. শ্রীবাস্তব, ড. রামশরণ শর্মা, ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ।

[b] ধর্মাশ্রয়ী রাজাদর্শ: দিল্লির সুলতানরা ছিলেন একাধারে রাষ্ট্র ও ধর্মনেতা। ইসলামের বিধি মেনেই দিল্লির সুলতানগণ শাসনকাজ চালাতেন। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল 'দার-উল হার্ব' (অমুসলমানের দেশ)-কে 'দার-উল-ইসলাম" (মুসলমানের দেশ)-এ পরিণত করা।

[c] খলিফার অনুমোদন: খলিফা ছিলেন সমস্ত মুসলিম দুনিয়ার প্রধান ধর্মগুরু এবং শাসক। তাই প্রথমদিকের কয়েকজন সুলতান তাদের মুদ্রায় খলিফার নাম উৎকীর্ণ করান এবং খলিফার নামে খুৎবা পাঠ করান।

[d] উলেমাদের ওপর নির্ভরশীলতা: সুলতানি আমলে উলেমারা ছিলেন কোরান ও শরিয়তের ব্যাখ্যাকার। তাঁরা প্রয়োজনে সুলতানকে ধর্মীয় ব্যাপারে পরামর্শ দিতেন। আলাউদ্দিন খলজি ছাড়া অন্যসব সুলতানের আমলেই উলেমাদের যথেষ্ট প্রভাব ও প্রতিপত্তি বজায় ছিল।

[e] অমুসলমানদের অধিকারহীনতা: সুলতানি রাষ্ট্রে অমুসলমান শ্রেণির তেমন কোনো অধিকার ছিল না। জিজিয়া কর প্রদানের বিনিময়ে সুলতানি রাষ্ট্রে বসবাস করা ছাড়া তারা আর কোনো বিশেষ সুযোগসুবিধা ভোগের অধিকারী ছিলেন না।
(ii) ধর্মনিরপেক্ষ

[a] প্রবক্তাগণ: একদল আধুনিক ঐতিহাসিক মনে করেন সুলতানি রাষ্ট্রের প্রকৃতি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। এই মতের কয়েকজন প্রবক্তা হলেন—ড. হাবিবউল্লাহ, ড. মুজিব, ড. মহম্মদ হাবিব, ড. ইফতিকার আলম খান, ড. নিজামি, ড. সতীশ চন্দ্র প্রমুখ।

[b] ধর্মনিরপেক্ষ রাজাদর্শ: ড. হাবিবউল্লাহ মনে করেন সুলতানি রাষ্ট্র ধর্মাশ্রয়ী ছিল না। ধর্মনিরপেক্ষতাই ছিল এর মূলভিত্তি। তাঁর মতে দিল্লির সুলতানগণ রাষ্ট্রকে ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেননি। সুলতানগণ অমুসলমানদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার জন্যেও কোনো রাষ্ট্রীয় নীতি গ্রহণ করেননি।

[c] শরিয়ত থেকে বিচ্যুতি: দিল্লির সুলতানগণ শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বদা শরিয়ত নির্দেশিত বিধি মেনে চলেননি। ইসলামের বিধান অনুযায়ী মুসলিমদের প্রাণদণ্ড নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ফিরোজ তুঘলক ছাড়া অন্য কোনো সুলতানের আমলে হা মানা হয়নি। পরিষত বিধি অনুসারে ইসলামী রাষ্ট্রে পৌত্তলিকদের কোনো জায়গা নেই। কিন্তু সুলতানি শাসনে ভারতে হিন্দু পৌত্তলিকদের অস্তিত্ব ছিল।

(d) খলিফার কর্তৃত্ব অস্বীকার: দিল্লির সুলতানগণ বাস্তবে খলিফার নির্দেশ মেনে শাসন পরিচালনা করতেন না। চেঙ্গিজ যার পৌর হলাপু-র হাতে আববাসীয় খলিফা আল- মুস্তাসিম বিল্লাহ নিহত হলে দিল্লির সুলতানদের কাছে খলিফার অনুমোদন লাভ ঐচ্ছিক হয়ে পড়ে।

[e] উলেমাদের ক্ষমতা হ্রাস: সুলতানি রাষ্ট্রে মুসলিম ধর্মবিশারদ উলেমারা রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় ব্যাপারে সুলতানদের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু সুলতানরা উলেমাদের কথামতো দেশশাসন বা ধর্মনীতি প্রণয়ন করতেন না।

[2] রাষ্ট্রীয় দিক থেকে

(i). সামরিক : সুলতানি রাষ্ট্র সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছিল। এর স্থায়িত্বও সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল। কেউ কেউ মনে করেন সুলতানি রাষ্ট্র ছিল প্রকৃত অর্থে একটি পুলিশ-রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য ছিল— দেশরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং রাজস্ব আদায় করা।

(ii) অভিজাততান্ত্রিক: কারো কারো মতে সুলতানি শাসন ছিল একটি কেন্দ্রীভূত রাজ্য। এই রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় অভিজাতদের বিশেষ স্থান ছিল। সুলতান ইলতুৎমিস 'বন্দে গান-ই চাহেলগানি নামক অভিজাত তুর্কিগোষ্ঠীর হাতে প্রভূত ক্ষমতা দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে অ-তুর্কিরাও অভিজাততন্ত্রে স্থান পেয়েছিল।

মূল্যায়ন: সার্বিক বিচারে সুলতানি রাষ্ট্রকে ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্র বলা চলে না। কেন না সমন্বয়বাদী সুলতানি শাসনব্যবস্থায় একদিকে যেমন খলিফাতা উপেক্ষিত হয়েছিল অপরদিকে উলেমাদের প্রভাব নগণ্য হয়ে পড়েছিল। ড. সতীশ চন্দ্র বলেছেন, "প্রকৃতপক্ষে সুলতানি রাষ্ট্র ছিল সামরিক ও অভিজাততান্ত্রিক"।

সুলতানি যুগে নরপতিত্বের আদর্শ

দিল্লির সুলতানি শাসনের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সুলতান নানান দৃঢ় রাজতান্ত্রিক বা নরপতিত্বের আদর্শ গ্রহণ করেন। মূলত ইলতুৎমিস, গিয়াসউদ্দিন বলবন, আলাউদ্দিন খলজি ও মহম্মদ বিন তুঘলক সুলতানি নরপতিত্বের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন।
[1] ইলতুৎমিস : ইলতুৎমিস দিল্লির সুলতানি শাসনকে সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি মধ্য এশিয়ার গজনি ও ঘুর রাজ্যের প্রভাব মুক্ত করে দিল্লির সুলতানি রাষ্ট্রকে একটি সার্বভৌম শক্তি হিসেবে গড়ে তোলেন। তিনি ‘মুইজি' ও 'কুতবি' নামে আমলাদের সরিয়ে দাস-তুর্কি, স্বাধীন তুর্কি ও স্থানীয় হিন্দুদের নিয়ে নতুন আমলাতন্ত্র গড়ে তোলেন এবং শাসনকার্যে অভিজাতদের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করেন। তিনি সিংহাসনের মর্যাদা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বাগদাদের খলিফার কাছ থেকে ‘সুলতান-ই-আজম' উপাধি গ্রহণ করেন (১২২৯ খ্রি.)।

[2] বলবন : বলবন মনে করতেন যে, চরম স্বৈরতন্ত্রের দ্বারাই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা ও প্রজাদের আনুগত্য আদায় করা সম্ভব। তাই তিনি নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা অপছন্দ করতেন এবং বংশকৌলীন্য অনুযায়ী দেশে সরকারি কাজে কর্মী নিয়োগ করতেন। তিনি রাজদরবারে নতুন পারসিক আদবকায়দার প্রচলন করেন।

[3] আলাউদ্দিন খলজি: আলাউদ্দিন খলজি সুলতানের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও রাজার ঐশ্বরিক অধিকার তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষের চেয়ে অধিক জ্ঞানী বলে মনে করতেন। তাঁর ইচ্ছাই ছিল আইন। তিনি রাষ্ট্রনীতি থেকে ধর্মকে পৃথক করেন এবং প্রশাসনে অভিজাত ও উলেমাদের প্রভাব খর্ব করে রাজতন্ত্রের শক্তিবৃদ্ধি করতে সচেষ্ট হন।

[4] মহম্মদ বিন তুঘলক: মহম্মদ বিন তুঘলকের রাজতান্ত্রিক আদর্শের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ভারতের রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক ঐক্য স্থাপন। এই উদ্দেশ্যে তিনি দাক্ষিণাত্যে মুসলিম সংস্কৃতির প্রসারেও নজর দেন। তিনি বহির্বিশ্বের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় যত্নবান হন। তিনি তৎকালীন সমাজে বিদ্যমান অভিজাতদের ক্ষমতা খর্ব করে এক নতুন অভিজাত গোষ্ঠী তৈরি করেন।
সুলতানি রাষ্ট্রের প্রকৃতি

দিল্লির সুলতানি রাষ্ট্রের প্রকৃতি কীরূপ ছিল তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ড. এ. এল. শ্রীবাস্তব, ড. ঈশ্বরীপ্রসাদ, ড. রামশরণ শর্মা প্রমুখ মনে করেন যে, দিল্লির সুলতানি রাষ্ট্র ছিল 'ধর্মাশ্রয়ী'। অন্যদিকে, সুলতানি যুগের ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারনি দিল্লির সুলতানি রাষ্ট্রকে 'জাহান্দারি' বা 'ধর্মনিরপেক্ষ' বলে অভিহিত করেছেন। ড. সতীশ চন্দ্র, ড. মহম্মদ হাবিব প্রমুখ আধুনিক ঐতিহাসিক এই অভিমত সমর্থন করেন। [1] | ‘ধর্মাশ্রয়ী' বক্তব্যের সমর্থনে যুক্তি :

i. খলিফার প্রতি আনুগত্য : আলাউদ্দিন খলজি ছাড়া দিল্লির সব সুলতানই ইসলামি জগতের শাসক ও ধর্মগুরু খলিফার স্বীকৃতি গ্রহণ করেন এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য জানিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন।

ii. উলেমা ও শরিয়তের গুরত্ব: সুলতানি শাসনে উলেমাদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। ইসলামি আইন ‘শরিয়ত’-এর ব্যাখ্যাকর্তা এই উলেমারা আশা করতেন যে, সুলতান অমুসলিমদের বিনাশসাধনে উদ্যোগ নেবেন এবং শরিয়তের বিধান মেনে ভারতবর্ষকে দার-উল-ইসলাম অর্থাৎ ইসলামের পবিত্র ভূমিতে পরিণত করবেন।
iii. হিন্দুদের উপেক্ষা : সুলতানি রাষ্ট্রে অমুসলিম হিন্দুরা উপেক্ষিত ও দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছিল। তারা 'জিম্মি' হিসেবে গণ্য হত এবং তাদের কাছ থেকে জিজিয়া কর আদায় করা হত।

[2] 'ধর্মনিরপেক্ষ' বক্তব্যের সমর্থনে যুক্তি :

i. পৃথক রাজতন্ত্র: শরিয়তের বিধান অনুসারে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হলেন স্বয়ং ঈশ্বর। তাঁর প্রতিনিধি হলেন প্রথমে হজরত মহম্মদ এবং পরে খলিফা। কিন্তু ভারতের সুলতানি রাষ্ট্রে এই নিয়ম থেকে স্বতন্ত্র রাজতন্ত্র গড়ে উঠেছিল।

ii. খলিফার প্রতি আপাত আনুগত্য : কোনো কোনো সুলতান রাজনৈতিক প্রয়োজনে খলিফার অনুমতি নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেটা ছিল একান্তই সুলতানের ইচ্ছাধীন বিষয়।

iii. সুলতানের স্বাধীনতা : ইসলামি আইন অনুসারে খলিফা সমগ্র মুসলিম ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রধান হলেও ভারতে এই রীতি গুরত্ব পায়নি। এখানে সুলতানগণ খলিফার নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে শাসন চালাতে পারতেন ।

iv. হিন্দুদের গুরত্ব : সুলতানি আমলে হিন্দুদের গুরুত্ব একেবারে লুপ্ত হয়ে যায়নি। তখন বহু হিন্দু উচ্চ রাজকার্যে নিযুক্ত হতেন এবং দেশের নানা স্থানে বহু হিন্দু সামন্ত রাজ্যের অস্তিত্বও ছিল।

v. উলেমাদের সুলতান-নির্ভরতা : সুলতানি আমলে উলেমারা সুলতানদের প্রভাবিত করতে পারতেন না, বরং বাস্তবে উলেমারা সুলতানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে কাজ করতেন।

vi. শরিয়ত-বহির্ভূত নির্দেশ : সুলতানি আমলে শরিয়তের নির্দেশ লঙ্ঘন করে বহু কাজ সম্পন্ন হওয়ার উদাহরণও দেখা যায়।

vii. ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র : উপরোক্ত বিভিন্ন যুক্তির নিরিখে অধিকাংশ পণ্ডিত সুলতানি রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলেই অভিহিত করেন। তাই রাষ্ট্ররূপে দিল্লি সুলতানির প্রকৃতি নির্বাচন করা কিছুটা কঠিন, কারণ ধর্মাশ্রয়ী এবং ধর্মনিরপেক্ষ—এই দুই ধরনের রাজতান্ত্রিক প্রবৃত্তিই দেখা গেছে এর মধ্যে। রাজনৈতিক মাসগন্ডির বিচারেও কেউ কেউ দিল্লি সুলতানিকে কেন্দ্রীভূত এবং কেউ বা আবার বিকেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করেছেন।

মার্ক তুল্লি সিসেরো ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ রোমান বাগ্মী, রাষ্ট্রচিন্তাবিদ এবং আইনজ্ঞ। তিনি পূর্বপ্রচলিত রোমান রাষ্ট্রব্যবস্থার যাবতীয় রীতিনীতিকে সংশোধনের উদ্যোগ নেন এবং রোমান আইনতত্ত্বকে বিশ্বজনীনতার আদর্শে উত্তরণ ঘটান।

রোমান রাষ্ট্রচিন্তাবিদ সিসেরোর লেখা দুটি রাজনৈতিক গ্রন্থ হল—[1] দ্য রিপাবলিক (The Republic) এবং [2] দ্য লজ (The Laws)।

সিসেরোর রাজনৈতিক মতবাদের ওপর প্রাচীন গ্রিক ভাবনা, পলিবিয়াস ও স্টয়িকদের মতবাদের প্রভাব পড়েছিল।

সিসেরো প্রধানত দুই প্রকার আইনের কথা বলেছেন। যথা— [1] প্রাকৃতিক আইন ও [2] রাষ্ট্রীয় আইন।

সিসেরোর মতে, “যেসব যুক্তি প্রকৃতির আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ তা ই হল প্রকৃত আইন। এই আইন সর্বজনীন, অপরিবর্তনীয় এবং চিরন্তন।”

সিসেরো তিন প্রকার সরকারের উল্লেখ করেছেন।যথা-

[1] রাজতন্ত্র. [2] অভিজাততন্ত্র ও [3] গণতন্ত্র।

সিসেরো বলেছেন, "সমগ্র প্রকৃতির রাজ্যে একটি আইন বিরাজ করে, যার দ্বারা সমগ্র বিশ্ব চালিত হয়। এই অপরিবর্তনীয়, শাশ্বত ও সর্বজনীন আইনই হল প্রাকৃতিক আইন।”

গেটেল, সিসেরোর রাষ্ট্রনৈতিক দর্শনকে তিনটি ভাগে করেছেন, যথা- [1] প্রাকৃতিক আইন, [2] প্রাকৃতিক সাম্য,  [3] রাষ্ট্র সম্পর্কিত ধারণা।

সিসেরো বলেছেন, “প্রাকৃতিক আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব। সিসেরোর ধারণায় সরকারের ভিত্তি হল ন্যায়বিচার। তাই সরকারের উচিত হল—প্রাকৃতিক মনুষ্যসৃষ্ট আইনের সাহায্য নিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।”

সিসেরো বলেছেন, রাষ্ট্র হল যুক্তিবোধ ও আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। এক সামাজিক সংগঠন। সিসেরোর ধারণায় রাষ্ট্র এমন এক নৈতিক সংস্থা, যা কিছু ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত। রাষ্ট্র একদিকে আইনি সংস্থা, অপরদিকে ন্যায়ের প্রতীক।

সিসেরোর রাষ্ট্রচিন্তা যে দুই লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল, সেগুলি হল— [1] সমকালীন রোমের জাতীয় জীবনের ক্রমিক অবনতি রোধ। [2] রোমান সমাজের নানান সমস্যা ও সংকটের সমাধান।

সিসেরোর রাষ্ট্রচিন্তার দুটি মূল বৈশিষ্ট্য হল — [1] মানুষের যুক্তি ও স্বাধীনতাকে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শের পরিবর্তে সমগ্র বিশ্বজগৎ ও মানবিকতার প্রেক্ষিতে বিচার করা উচিত। [2] মানুষের চিন্তা ও ভাবনাকে যদি যুক্তির পথে পরিচালিত করা যায়, তাহলে সমাজ এবং মানুষ উভয়েরই মঙ্গল।

সিসেরোর মতে, আইন হল ঈশ্বরের প্রাথমিক ও চূড়ান্ত মানসলোক, যা যুক্তি দিয়ে বাধা অথবা বাধ্যতার মাধ্যমে পরিচালিত করে।

প্রকৃতিগত বিচারে সিসেরোর আইনগত ধারণা ঐশ্বরিক তত্ত্বে ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁর মতে—সর্বকালে, সকলের ওপর প্রযোজ্য প্রাকৃতিক আইনের প্রভু হলেন ভগবান। ঈশ্বরই হলেন একাধারে এই -আইনের প্রণেতা, প্রয়োগকতা ও ব্যাখ্যাকার।

রোমের প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকরা মূলত দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল—[1] রাষ্ট্রীয় অধিকারভোগী প্যাট্রিসিয়ান বা অভিজাত শ্রেণি এবং [2] রাষ্ট্রীয় অধিকার বঞ্চিত গ্লেবিয়ান বা সাধারণ প্রজা।

টিউডর স্বৈরতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সপ্তম হেনরি।

ইংল্যান্ডের মন্ত্রী টমাস ক্রমওয়েল ১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দে 'অ্যাক্ট অব সুপ্রিমেসি’পাস করেন।

ইংল্যান্ডের টিউডর বংশীয় রাজা সপ্তম হেনরি নিজেকে 'Supreme Head of the Church' বলেছিলেন।

১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে সপ্তম হেনরি ইংল্যান্ডে নতুন রাজতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করেন।

টমাস ক্রমওয়েল কর্তৃক ইংল্যান্ডে ছোটো মঠগুলি ধ্বংস করার নীতির বিরুদ্ধে এক আন্দোলন গড়ে ওঠে। এর নাম 'পিলগ্রিমেজ অব 'গ্রেস'।

অ্যাক্ট অব সুপ্রিমেসি-র প্রস্তাবনায় টমাস ক্রমওয়েল ইংল্যান্ডকে এক সার্বভৌম সাম্রাজ্য হিসেবে ঘোষণা করেন। এর দ্বারা ইংল্যান্ডের সব চার্চকে রাজার নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেন। এর তাৎপর্য হল— ইংল্যান্ড এক স্বয়ংশাসিত স্বাধীন রাষ্ট্র, যার প্রধান হলেন রাজা। এই ইংল্যান্ড রাজ হলেন ইংল্যান্ডের সমস্ত ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক গোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রভু এবং বিচারক। রাজার প্রতি সমস্ত শ্রেণির নাগরিকদের আনুগত্য প্রদর্শন বাধ্যতামূলক।

টমাস ক্রমওয়েল ছিলেন ইংল্যান্ডে টিউডর রাজবংশের আমলের উল্লেখযোগ্য একজন মন্ত্রী। ইংল্যান্ডের চার্চের ক্ষমতা ধ্বংস করে রাজার ক্ষমতা বৃদ্ধিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।

টমাস ক্রমওয়েলই প্রথম পার্লামেন্টারি আইনের গুরুত্ব অনুভব করেন। তিনি সকলক্ষেত্রে পার্লামেন্টারি আইনের প্রাধান্য তুলে ধরতে শুরু করেন। তিনি রাজা অষ্টম হেনরিকে দিয়ে ঘোষণা করান যে, রাজার সার্বভৌম ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতেই নিহিত। রাজকীয় আদেশগুলিও যাতে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, তার জন্য তিনি পালামেন্টের অনুমোদন নেন। তাঁর এই প্রচেষ্ঠার ফলে ইংল্যান্ডের বিচারকগণ পার্লামেন্টে গৃহীত আইনকে প্রাধান্য দিতে শুরু করেন।

ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দে এক আইন প্রণয়ন করে রাজাকে ইংল্যান্ডের চার্চের প্রধান বলে ঘোষণা করেন। এই আইনটি 'অ্যাক্ট অব সুপ্রিমেসি' নামে পরিচিত।

রিফরমেশনের আগে ইংল্যান্ডে প্রশাসনের কেন্দ্রে ছিল রাজা ও তার প্রাসাদ কর্মচারীবৃন্দ। টমাস ক্রমওয়েল প্রথম এই ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটান এবং প্রশাসনের কেন্দ্রে মন্ত্রীসভাকে স্থাপন করেন। প্রশাসনের বিভিন্ন পদের প্রধান হিসেবে উনিশ জন মন্ত্রীকে নিয়োগ করা হয়। পাশাপাশি ক্রমওয়েলের উদ্যোগে রাজার সচিবালয় গঠন ও প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি পদ তৈরি হয়।

টমাস ক্রমওয়েলের পূর্বে ইংল্যান্ড রাজের আর্থিক কাজকর্ম দেখতে প্রাসাদের সার্ভেয়ার ও ট্রেজারারগণ। ক্রমওয়েল প্রথম অর্থবিভাগে নতু পদ সৃষ্টি করেন। চার্চের ওপর কর নির্ধারণের জন্য তৈরি হয় নতুন কোশাধাঙ্ক পদ।রাজস্ব বিভাগের দেখাশোনার জন্য তৈরি হয় রাজস্ব আদালত। রাজস্ব বিভাগকে ক্রমওয়েল নতুনভাবে গড়ে তোলেন।

ইংল্যান্ডের স্থানীয় শাসনের পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ঈমাস ক্রমওয়েল তিনটি কাউন্সিল গঠন করেন—[1] উত্তর ইংল্যান্ডের কাউন্সিল যার ওপর জমিদারি দেখাশোনার পরিবর্তে প্রশাসনিক ও বিচার বিষয়ক ক্ষমতা দেওয়া হয়। [2] স্কটল্যান্ডের ওয়েল্স প্রদেশে নবগঠিত কাউন্সিল, যার ওপর জমিদারদের অত্যাচার থেকে কৃষকদের রক্ষার ভার দেওয়া হয়। [3] পশ্চিম ইংল্যান্ডের কাউন্সিল, যা মূলত বিদেশ আক্রমণ প্রতিরোধের লক্ষ্যে গঠিত হয়।

টিউডর বংশীয় রাজা সপ্তম হেনরির আমলে (১৪৮৫-১৫০৯ খ্রি.) সর্বপ্রথম ইংল্যান্ডে এক নতুন প্রশাসনিক ধারণার উন্মেষ ঘটে। জন রিচার্ড গ্রিন তাঁর 'এ শর্ট হিস্ট্রি অব দ্য ইংলিশ পিপল' গ্রন্থে সর্বপ্রথম এই প্রশাসনকে নব্য রাজতন্ত্র আখ্যা দেন। পরবর্তীকালে আর. ষ্টোরি, এ. এফ. পোলার্ড, সি. এইচ. উইলিয়ামস-সহ অনেকেই এই মতকে সমর্থন করেন।

টমাস ক্রমওয়েল অষ্টম হেনরির আমলে মুখ্যসচিব পদটি মন্ত্রীপদে উন্নীত করেন। টমাস ক্রমওয়েল নিজে রাজস্ব, অর্থনীতি এই দুই দপ্তর ছাড়াও অভ্যন্তরীণ ও বিদেশ দপ্তরের দায়িত্ব নেন।

টমাস ক্রমওয়েল প্রথমেই অ্যাক্ট ফর দ্য সাবমিশন অব দা ক্লারজি'র দ্বারা যাজকদের রাজার অধীনে আনেন। 'অ্যাক্ট অব অ্যাপিল' প্রণয়নের দ্বারা তিনি ইংল্যান্ডের সমস্ত চার্চগুলির ওপর পোপের ক্ষমতা রদ করেন। এরপরেই 'অ্যাক্ট অব সুপ্রিমেসি'র দ্বারা রাজাকে চার্চের সর্বময় কর্তা হিসেবে স্বীকৃতি জানানো হয়। অষ্টম হেনরি ও অ্যানের সন্তানদের বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি জানানো হয়। 'অ্যাক্ট অব সাক্সেসানে'র মাধ্যমে। এভাবেই অষ্টম হেনরি সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন।

ইংল্যান্ডের টিউডর বংশের রাজা অষ্টম হেনরির মন্ত্রী টমাস ক্রমওয়েল ইংল্যান্ডের চার্চের ক্ষমতা ধ্বংস করে জাতীয় চার্চ প্রতিষ্ঠা, অষ্টম হেনরি ও ক্যাথারিনের বিবাহবিচ্ছেদ প্রভৃতি ঘটনার মাধ্যমে রাজার ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন। এই পদক্ষেপগুলিকে জিওফ্রে ওলটন প্রমুখ ঐতিহাসিক 'টিউডর বিপ্লব' বলে অভিহিত করেছেন।

অষ্টম হেনরির প্রধান উপদেষ্টা টমাস ক্রমওয়েলের প্রচেষ্টায় ইংল্যান্ডের রাষ্ট্র এবং চার্চ উভয়ের ওপরেই রাজার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্রমওয়েলের নেতৃত্বে রাজা ও পার্লামেন্টের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া সমঝোতা, সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়। রাজা এবং পার্লামেন্ট উভয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উভয়ের ওপরেই মিলিতভাবে জাতীয় সার্বভৌম ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

আধুনিক রাষ্ট্রের আদিকালে রাষ্ট্রচিন্তায় স্বতন্ত্র ধারণা রেখে গেছেন, এমন কয়েকজন বুদ্ধিজীবী বা রাষ্ট্রচিন্তাবিদ হলেন— নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি, জাঁ বোদা, টমাস হবস, জন লক, জা জ্যাক রুশো, জেরেমি বেস্থাম, জন স্টুয়ার্ট মিল, ইমানুয়েল কান্ট, যোহান গটলির ফিক্টে জর্জ উইলহেম ফ্রেডরিক হেগেল, থমাস হিল গ্রিন , বার্নাড বোসাঙকে প্রমুখ।

ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি ছিল মানুষ। মধ্যযুগীয় চিন্তাধারার কেন্দ্রবিন্দুতে ঈশ্বর থাকলেও আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় ম্যাকিয়াভেলি ঈশ্বরের পরিবর্তে মানুষকে স্থান দেন। ধর্মনিরপেক্ষ তথা মানবতন্ত্রের পথপ্রদর্শক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি।

নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি রচিত দুটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক গ্রন্থ হল—‘দ্য প্রিন্স' (The Prince) এবং 'ডিসকোর্সেস অন লিভি' (Discourses on Livy)।

নিকোলো ম্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক বলা হয়। সমগ্র মধ্যযুগ ধরেই ধর্মীয় আলোকে রাজনীতির বিচার করা হত।ম্যাকিয়াভেলি সর্বপ্রথম ধর্মীয় জীবন থেকে রাষ্ট্রজীবনকে মুক্ত করেন এবং আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন । তাই তাঁকে “আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক' বলা হয়।

ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জাঁ বোঁদা প্রথম চরম সার্বভৌমত্বের তত্ত্ব প্রচার করেন।

জাঁ বোঁদা রাষ্ট্রের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেছেন, “কয়েকটি পরিবার এবং তাদের যৌথ সম্পত্তির সমন্বয়ে গঠিত এক আইনসম্মত সরকার যখন সার্বভৌম ক্ষমতা লাভ করে, তখন তাকে রাষ্ট্র বলা হয়।”

রাষ্ট্রের আধুনিক সার্বভৌমিকতা তত্ত্বের প্রবক্তা হলেন ফরাসি রাষ্ট্রচিন্তাবিদ জাঁ বোঁদা।

জাঁ বোঁদার রাষ্ট্রভাবনা অনুযায়ী - [1] রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তিসমূহের নয়, পরিবারসমূহ ও পদের বিষয়সম্পত্তির সমষ্টি । [2] পাশবিক বল প্রয়োগের ফলে রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে।

জাঁ বোঁদার ধারণায় রাষ্ট্র শুধুমাত্র বস্তুগত লক্ষ্যপূরণ করবে না, তা আধ্যাত্মিক প্রয়োজনও মেটাবে। রাষ্ট্রের লক্ষ্যের ব্যাপারে ধারণা না দিলেও বোঁদা মনে করতেন, রাষ্ট্রের দেহ ও আত্মা দুই-ই আছে। দেহের প্রয়োজন জরুরি হলেও আত্মার স্থান তার ঊর্ধ্বে।

অ্যারিস্টলের অনুসরণে বোঁদা রাষ্ট্র ও সরকারকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন, যথা—রাজতান্ত্রিক, অভিজাততান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক। বোঁদার মতে—মিশ্র রাষ্ট্র সম্ভব না হলেও প্রশাসন মিশ্র হতে পারে। বোঁদার ধারণায়, এগুলির মধ্যে রাজতন্ত্র শ্রেষ্ঠ হলেও তিনি বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের বিপদ ও অসুবিধা সম্পর্কে সজাগ থাকার কথা বলে গেছেন।

বোঁদা তাঁর চরম সার্বভৌম তত্ত্বে বলেছেন যে, একমাত্র রাষ্ট্রই চরম সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। রাষ্ট্রের এই ক্ষমতাই অন্যান্য সংগঠন থেকে রাষ্ট্রকে পৃথক করেছে। তিনি নাগরিক ও প্রজাদের ওপর আইনের দ্বারা অনিয়ন্ত্রিত চরম ক্ষমতাকে সার্বভৌম ক্ষমতা বলে অভিহিত করেছেন।

টমাস হবসের ধারণায়—[1] অর্জিত এবং [2] প্রতিষ্ঠানগত, এই দুই পদ্ধতিতে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হতে পারে। হসের মতে, এই দুই পদ্ধতি চুক্তিগত হলেও প্রতিষ্ঠানগত পদ্ধতির মধ্যে চুক্তির সারবস্তু রয়েছে।

সপ্তদশ শতকে ইংল্যান্ডে গৃহযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে রাজা প্রথম চার্লসের শিরচ্ছেদ (১৬৪৮ খ্রি.) করে পিউরিটান বিপ্লব সম্পন্ন হয় সমকালীন ইংল্যান্ডের সমাজে নৈরাজ্য ও শৃঙ্খলা রাজনীতিতে যে অস্থিরতা এনেছিল তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পরেছিল হসের রাষ্ট্রচিন্তায়। ইংল্যান্ডে পিউরিটানজনিত গৃহযুদ্ধে জীবন ও সম্পত্তির ধ্বংসসাধন তার অন্তরে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল তারই ফসল ছিল লেভিয়াথান গ্রন্থটি।

রাষ্ট্রের উৎপত্তি প্রসঙ্গে টমাস হবসের সামাজিক চুক্তি মতবাদের দুটি বৈশিষ্ট্য হল— [1] রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে চুক্তি হয়, তাতে অংশগ্রহণকারীরা ছিল আদিম মানুষসমূহ। [2] শান্তি প্রতিষ্ঠা ও নিরাপত্তা রক্ষার লক্ষ্যেই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। মানুষের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই চুক্তি হয়।

টমাস হবসের ধারণায় জনগণের কল্যানসাধনে এবং শান্তি শৃঙ্খলার রক্ষণাবেক্ষণে সার্বভৌম শক্তি সমস্ত সম্প্রদায়ের হয়ে যে ব্যবস্থা নিত, তা হল সার্বভৌমিকতা।

'লেভিয়াথান' গ্রন্থের রচয়িতা হলেন ইংরেজ রাষ্ট্রচিন্তাবিদ টমাস হবস।

টমাস হবস রচিত 'লেভিয়াথান' গ্রন্থটি চার অংশে বিভক্ত। এই চারটি অংশ হল— [1] মানুষ [2] রাষ্ট্র

[3] খ্রিস্টীয় রাষ্ট্র [4] তমসার রাজ্য। ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত এই গ্রন্থে রাজনীতি ও রাষ্ট্র সম্পর্কিত হবসের পূর্ণাঙ্গ তত্ত্ব পরিবেশিত হয়েছে।

জন লকের ধারণায় রাষ্ট্র তিনটি ক্ষমতার সমন্বয়ে গঠিত। এই তিনটি ক্ষমতা হল— আইনগত ক্ষমতা, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। এগুলির মধ্যে লক আইনগত ক্ষমতাকে সর্বোৎকৃষ্ট বলে উল্লেখ করেছেন।

লকের ধারণায় জনগণ ভোটাধিকারের মাধ্যমে সংসদের প্রতিনিধিদের নির্বাচিত বা ক্ষমতাচ্যুত করার অধিকারী। লকের মতে, কেবলমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা ও মতামতের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের সার্বভৌম শক্তির প্রকাশ ঘটে।

জন লক ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে আইনের শাসনাধীনে নিয়ে আসার সমর্থক ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রীয় আইনের নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হোক। লকের ধারণায় আইন বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধিত্ব করে। এই বিভাগটি জনগণের সাধারণ অধিকারগুলি সুরক্ষিত করার পাশাপাশি তার নিরাপত্তাও রক্ষা করে।

পুরসমাজ ধারণাটির মধ্যে রয়েছে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বাভাবিক অধিকারের স্বীকৃতি, ব্যক্তিগত অধিকার ও স্বাধীনতার স্বীকৃতি, ব্যক্তি স্বতন্ত্রবাদ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি জন লক পুরসমাজ ধারণাটিকে প্রকৃতির রাজত্বের বিপরীত অবস্থার প্রতীক বলে উল্লেখ করেছেন। লকের ধারণায় সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণের বাইরে ব্যক্তির যে অধিকার রয়েছে, অর্থাৎ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত ব্যক্তি অধিকারের ক্ষেত্র হল পুরসমাজ।

রুশোর রাষ্ট্রদর্শনের মূল বিষয় ছিল সামাজিক চুক্তিতত্ত্ব, যাতে বলা হয় প্রকৃতির রাজ্যের মানুষেরা চুক্তি সম্পাদনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে। রুশোর ধারণায় রাষ্ট্র হল এক উন্নয়নশীল, সুসভ্যকারী, যাবনিক (Hellenising) এবং শিক্ষাদায়ী শক্তি।

জাঁ জ্যাক রুশোর সামাজিক চুক্তিতত্ত্বের প্রধান আলোচিত বিষয় হল সাধারণ ইচ্ছা। রুশোর ধারণায় সামাজিক চুক্তির মধ্য দিয়ে যে মিলিত শক্তি গড়ে ওঠে তা হল সাধারণ ইচ্ছা। এধরনের ইচ্ছা সমাজের প্রত্যেকের মধ্যে রয়েছে যা সকলে মেনে চলতে বাধ্য।

মন্তেঙ্কুর ধারণায় প্রতিটি সরকারের তিনপ্রকার ক্ষমতা আছে, যথা— আইনবিভাগীয়, শাসনবিভাগীয় ও বিচারবিভাগীয়। প্রথম ক্ষমতা বলে শাসক আইন প্রণয়ন, সংশোধন বা বাতিল করেন। দ্বিতীয় ক্ষমতা বলে শাসক যুদ্ধ বা শান্তি ঘোষণা করেন। আর তৃতীয় ক্ষমতা বলে রাজা অপরাধীদের শাস্তি দেন বা ব্যক্তি বিরোধ মেটান।

হিতবাদ'-এর মূলকথা হল — সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের সর্বাধিক সুখলাভ। এই মতবাদ অনুযায়ী বিভিন্ন ব্যক্তির ইচ্ছার মধ্যে দ্বন্দ্ব বাঁধলে রাষ্ট্রের কর্তব্য হল — সর্বাধিক মানুষের সর্বোচ্চ পরিমাপ হিতসাধন নীতি কার্যকর করা।

কয়েকজন হিতবাদী রাষ্ট্রদার্শনিক হলেন বিশ্বাস, জেম্স মিল ও তাঁর পুত্র জন স্টুয়ার্ট দিল, জন অনি, হাস প্রমুখ। এই সমস্ত হিতবাদীদের ধারণায়, রাষ্ট্র হল মানুষের দারিপুরণ ও ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর প্রতিষ্ঠান।

'The Law' গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন ক্লড ফ্রেডরিখ বাসতিয়াৎ।

ফ্র্যাগমেন্ট অব গভর্নমেন্ট, ডিফেন্স অব ইউজুয়ারি, ম্যানুয়াল অব পলিটিক্যাল ইকনমি, কনস্টিটিউশনাল কোড  গ্রন্থগুলিতে বেন্থামের রাষ্ট্রধারণার উল্লেখ মেলে।

বেন্থামের ধারণায় মানুষ নিজেদের সুখ বা আনন্দকে বাড়ানোর লক্ষ্যে জোটবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছিল।  জনগনের সুখ বা আনন্দ বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকে।

জন স্টুয়ার্ট মিলের মতে, উদারনৈতিক সমাজে রাষ্ট্রের কাজ হল ইতিবাচক, নেতিবাচক নয়। কম বলপ্রয়োগের দ্বারা অধিক সংখ্যক মানুষের জীবনকে মানবিক করে তোলার কাজে রাষ্ট্র আইনকে ব্যবহার করবে।

হেগেলের ধারণায় রাষ্ট্র এক অভিমানবীয় নৈতিক সংগঠন, যা অন্যান্য সমস্ত সংস্থার ঊর্ধ্বে। রাষ্ট্র চুক্তির ফলস্রুতি নয়, তা হল চেতনার বিবর্তন। রাষ্ট্র আসলে ব্যক্তির প্রকৃত ব্যক্তিত্বের স্রষ্টা ও রক্ষাকর্তা। হেগেলের মতে—“রাষ্ট্রের ভিত্তি বলপ্রয়োগ নয়, শাসিতের ইচ্ছা।''

সূচনা: রোমান রাষ্ট্রচিন্তাবিদ মধ্যে এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হলেন মার্ক তুল্লি সিসেরো (১০৬-৪৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)। তিনি পূর্বপ্রচলিত রোমান রাষ্ট্রব্যবস্থার যাবতীয় রীতিনীতিকে সংশোধনের উদ্যোগ নেন এবং রোমান আইনতত্ত্বকে বিশ্বজনীনতার আদর্শে উত্তরণ ঘটান।
সিসেরোর রাষ্ট্রচিন্তা
[1] উৎস: প্লেটো, অ্যারিস্টটল, পলিবিয়াস এবং স্টইকদের মতবাদ সিসেরোর রাষ্ট্রচিন্তাকে সব থেকে বেশি প্রভাবিত করে। পাশাপাশি সমকালীন রোমের সমাজজীবন এবং রাজনীতির গতিপ্রকৃতি তার রাষ্ট্রচিন্তার মূল উৎস ছিল।
[2] সরকার: সিসেরো রাজতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র এবং গণতন্ত্র এই তিন ধরনের সরকারের উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন - একজনের শাসন হল রাজতন্ত্র, কয়েকজনের শাসন হল প্রজাতন্ত্র, বহুজনের বা সমাজের সকলের শাসন হল গণতন্ত্র। এই তিন ধরনের সরকারের গুণাবলির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মিশ্র সরকার হল সর্বোৎকৃষ্ট।
[3] আইনগত ধারণা
i. মূল বক্তব্যসমূহ : [a] সিসেরোর মতে, আইন মানবিক চিন্তার ফসল নয়, তা হল শাশ্বত, সনাতন। [b] বাস্তব নীতির ওপর গড়ে ওঠে আইন, যা সমগ্র বিশ্বকে চালনা করে। [c] আইন হল ঈশ্বরের প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ইচ্ছা, যা যুক্তি দিয়ে বাধা ও বাধ্যতার দ্বারা সমস্ত কিছুকে পরিচালিত করে। [d] সিসেরোর ধারণায় পশুজগৎ আইনের তাৎপর্য বোঝে না, কিন্তু তারাও সহজাত প্রকৃতি গুণে আইন মেনে চলে। [e] পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব মানুষই কেবলমাত্র তার চিন্তা শক্তির দ্বারা আইনের প্রয়োজনীয়তা বা তাৎপর্য বুঝতে পারে।

ii. প্রাকৃতিক আইন: সিসেরোর ধারণায় প্রাকৃত আইন ভগবানের তৈরি, তাই একে লঙ্ঘন করা যায় না। বিশ্বের সর্বত্র এই প্রাকৃতিক আইনের অস্তিত্ব রয়েছে।
[4] ন্যায়বিচার: সিসেরোর ধারণায় প্রাকৃত আইনের যথার্থ প্রয়োগ ঘটলে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হতে পারে। সিসেরোর ধারণায় রাষ্ট্রের সমস্ত আইন ও সমাজের সমস্ত প্রথা যখন যুক্তিবাদী আইন দ্বারা পরিচালিত
হবে, তখন সমাজে ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠা ঘটবে।
[5] প্রাকৃতিক সাম্য: সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতি জুড়ে প্রাকৃতিক সাম্যের অস্তিত্ব বিদ্যমান।সমতার নীতি মেনেই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবন পরিচালিত হয়। সিসেরো প্রাকৃত সামনীতির সাহায্যে ক্রীতদাস-সহ সমাজের সমস্ত শ্রেণির
মানুষকে সমান সুযোগসুবিধাদানের পক্ষপাতী ছিলেন।
সমালোচনা; সিসেরোর রাষ্ট্রচিন্তা পরবর্তীকালে বিভিন্ন দার্শনিকের কাছে সমালোচিত হয়েছে। গেটেল বলেছেন— সিসেরোর রাষ্ট্রতত্বে তেমন কোনো মৌলিকতা ছিল না । সমালোচকদের মতে—সিসেরো উদ্ভাবনশীল
চিন্তাবিদ ছিলেন না। সিসেরোর আইনি ভাবনাও মৌলিক ছিল না, তা ছিল গ্রিক ও নির্বিকারবাদী ধারণার অনুসারী।
সিসেরোর রাষ্ট্রীদর্শ
[1] বিশ্বসমাজ গঠন: সিসেরোর রাষ্ট্রাদর্শের ধারণা মেলে তার দুই রাজনৈতিক গ্রন্থ ‘দ্য রিপাবলিক’ (The Republic) এবং ‘দ্য লজ' (The Laws) থেকে। সিসেরো এই বিশ্বের সমস্ত রাষ্ট্রকে নিয়ে একটি আদর্শ রাষ্ট্রসমবায় বা কমনওয়েলথ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
[2] উৎপত্তির কারণ : সিসেরোর ধারণায় ব্যক্তির স্বাভাবিক সামাজিক প্রবণতা এবং তাদের সম্মিলিত ইচ্ছার কারণেই রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। সিসেরো মনে করতেন কোনো আবেগ বা স্বার্থ নয়, সাধারণ যুক্তি দ্বারা পরিচালিত
হয়েই বিবর্তনের পথ ধরে রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে।
[3] রাষ্ট্রতত্ত্বের মূলকথা : সিসেরোর রাষ্ট্রতত্ত্বের মূল কথা হল—[i] রাষ্ট্র এমন এক নৈতিক সংস্থা যা কিছু ব্যক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে গড়ে উঠেছে। [ii] রাষ্ট্র হল আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি সামাজিক সংগঠন যা বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণে নিয়োজিত | [iii] রাষ্ট্র একদিকে আইনি সংস্থা অপরদিকে ন্যায়ের প্রতীক। তাই শাসক ও শাসিত উভয়ই রাষ্ট্রকে মেনে চলতে বাধ্য। [iv] রাষ্ট্র একটি যৌথ সংস্থা। প্রতিটি নাগরিকই এর সদস্য।
মূল্যায়ন: পাশ্চাত্য রাষ্ট্রচিন্তার প্রাচীন ব্যাখ্যাকারদের মধ্যে প্লেটো ও অ্যারিস্টলের পরেই সিসেরোর স্থান। বিশ্বজনীন আদর্শের প্রেক্ষাপটে বিশ্বসমাজ (Commonwealth) বা রাষ্ট্র সমবায় (Confederation) গঠনের তত্ত্ব রাষ্ট্রচিন্তার জগতে এক নবদিগন্তের উন্মোচন ঘটায়।

সূচনা: প্রাচীন রোমান রাষ্ট্রচিন্তা মৌলিক ছিল না, তাদের রাষ্ট্রভাবনায় প্রাচীন গ্রিসের যথেষ্টই প্রভাব ছিল। রোমের রাষ্ট্রদর্শন আসলে তাত্ত্বিক দর্শন নয়, তা হল ব্যাবহারিক জীবনদর্শন। রাষ্ট্রচিন্তায় রোমানদের অবদান
প্রসঙ্গে ম্যাক্সি লিখেছেন—“রোম সারা বিশ্বকে সরাসরি কোনো রাষ্ট্রতত্ত্ব না দিয়ে গেলেও রাষ্ট্রতত্ত্বের নানা উপাদান দিয়ে গেছে, যেগুলি রয়েছে তাদের আইন বিষয়ক বিভিন্ন তত্ত্ব ও ধারণার মধ্যে।”

রোমান রাষ্ট্রচিন্তা
[1] উৎস : রোমের ইতিহাস, ভৌগোলিক পরিবেশ, আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এই সমস্ত কিছুই রোমান রাষ্ট্রচিন্তাকে প্রভাবিত করেছিল। পাশাপাশি অখণ্ড সাম্রাজ্য গঠনের পরিকল্পনাও রোমান রাষ্ট্রচিন্তার উৎস হিসেবে কাজ করেছিল। সর্বোপরি আইন ও নাগরিকত্ব সম্পর্কে রোমানদের বাস্তব চিন্তা ও উদার চেতনা রোমান রাষ্ট্রচিন্তার প্রেক্ষিত রচনা করে।
[2] আইনতত্ত্ব : প্রকৃত অর্থে রোমান সাম্রাজ্যেই সর্বপ্রথম সঠিক আইনের ধারণা গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীকালে বিশ্বের অন্যান্য দেশের আইনব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। রোমানরাই সর্বপ্রথম আইনকে লিখিত আকারে নথিভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ধর্মের সংকীর্ণ গণ্ডি ছাড়িয়ে তারা আইনকে প্রাকৃতিক জগতের বাস্তব প্রকাশ হিসেবে তুলে ধরেন। বিশ্বসভ্যতায় রোমান আইনের তিনটি দান হল –[i] পৌর আইন, [ii] সর্বজনীন আইন, [iii] প্রাকৃতিক আইন।
[3] রোমান নাগরিকতার তত্ত্ব: রোমান রাষ্ট্রচিন্তাবিদগণ নাগরিকত্বের ধারণাকে সর্বজনীন আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন । রোমান নাগরিকতা তত্ত্বের মূল দুটি নীতি হল –[i] ‘জন্মসূত্রে মানুষ স্বাধীন’, [ii] ‘মানুষে মানুষে সমতার অধিকার হল প্রাকৃতিক অধিকার’ । রোমান রাষ্ট্রচিন্তাবিদ সিসেরো বলেছেন, “সমগ্র বিশ্ব হল এমন একটি কমনওয়েল্থ, যেখানে সমস্ত মানুষ সমান।” স্টয়িক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রোমান রাষ্ট্রচিন্তাবিদগণ বিশ্বমানবতা তথা সকলের সমতার ধারণা প্রচার করেন। সমালোচনা: কিছু অসংগতির কারণে রোমান আইনতত্ত্ব সামঞ্জস্যহীন বলে সমালোচিত হয়েছে । রোমান রাষ্ট্রচিন্তাবিদগণ যে বিশ্বজনীন আইনের উল্লেখ করেছেন তার সঙ্গে বাস্তবের খুব একটা মিল নেই। তা ছাড়া মিশ্র শাসনব্যবস্থাও ভ্রান্তিকর, কেননা রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র ও গণতন্ত্রের মধ্যে মিশ্রণ সম্ভব নয়।
রোমান রাষ্ট্রচিন্তার প্রকৃতি ও গুরুত্ব
[1] প্রকৃতি: রোমান রাষ্ট্রচিন্তায় আইনতত্ত্বের ধারণা মেলে। পাশাপাশি এই রাষ্ট্রচিন্তা মিশ্র শাসনব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সার্বভৌমিকতারও স্বরূপ উন্মোচন করে। রোমান রাষ্ট্র ধারণায় চুক্তির মাধ্যমে শাসক-শাসিতের
সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। রোমান রাষ্ট্রচিন্তা অনুসারে রাজতন্ত্রের যুগে রাজা, প্রজাতন্ত্রের যুগে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, সাম্রাজ্যবাদের যুগে সম্রাট তাদের কাজের জন্য জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন।
[2] গুরুত্ব: রাষ্ট্রতত্বকে আইনের ধারণায় প্রতিষ্ঠিত করাই ছিল তাদের বড়ো অবদান। আইন, সংবিধান, সরকার এবং শাসননীতি, রাষ্ট্রসমবায়, বিশ্বনাগরিকত্ব, শৃঙ্খলাবাদ, সমাজজীবন সম্পর্কে তারা যে ধারণা দিয়ে
গেছেন ব্যাবহারিক রাজনীতির বিকাশে তার গুরত্ব অসীম।

 প্রাসাদ শাসনকে জাতীয় শাসনে রূপান্তরে ক্রমওয়েলের উদ্যোগ
ইউরোপের সংস্কার আন্দোলন বা রিফরমেশনের পূর্ব পর্যন্ত ইংল্যান্ডের রাজা ও তাঁর নিকটাত্মীয়রা যাবতীয় শাসন ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতেন। যোগ্যব্যক্তির পরিবর্তে তাদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই শাসন ইতিহাসে ‘প্রাসাদ শাসন’ নামে পরিচিত। অষ্টম হেনরির আমলে তাঁর প্রধান পরামর্শদাতা টমাস ক্রমওয়েল এই প্রাসাদ শাসনকে জাতীয় শাসনে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নেন।

[1] সংসদীয় আইনের প্রাধান্য: টমাস ক্রমওয়েল সর্বপ্রথম সংসদীয় আইনের গুরুত্ব অনুভব করেন। সংসদ অনুমোদিত আইনগুলিকে তিনি জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে শুরু করেন। ফলে সংসদীয় আইনের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

[2] সরকারি প্রশাসনের পুনর্গঠন: রিফরমেশনের আগে পর্যন্ত রাজা এবং তাঁর প্রাসাদের কর্মচারীরা ছিলেন প্রশাসনিক প্রধান। কিন্তু ক্রমওয়েল এই ব্যবস্থা বদলে দিয়ে প্রশাসনিক কেন্দ্রে মন্ত্রীসভাকে স্থান দেন। উনিশজন মন্ত্রী নিয়ে তিনি গঠন করেন প্রিভি কাউন্সিল। ক্রমওয়েল রাজার একটি সচিবালয় গড়ে তোলেন এবং একটি প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি পদ সৃষ্টি করে নিজে সেই পদে বসেন।
[3] স্থানীয় শাসনের পুনর্গঠন: জনগণের আন্দোলন মোকাবিলার জন্য ক্রমওয়েলের উদ্যোগে উত্তর ইংল্যান্ডের কাউন্সিলকে নতুনভাবে গঠন করা হয়। এই নবগঠিত কাউন্সিলকে প্রশাসনিক ও বিচারক্ষমতা দান করা হয়। এই কাউন্সিলের সক্রিয় ভূমিকায় উত্তর ইংল্যান্ডে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরে আসে। একইভাবে স্কটল্যান্ডের ওয়েলস প্রদেশে এবং পশ্চিম ইংল্যান্ডে ক্রমওয়েল আর-একটি কাউন্সিল গঠন করেন।
[4] আর্থিক বিভাগের পুনর্গঠন: টমাস ক্রমওয়েল আর্থিক ব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করেন। তিনি অর্থবিভাগের নতুন পদ সৃষ্টি করেন (১৫৩৪ খ্রি.) । পাশাপাশি চার্চের কর নির্ধারণ ও কর আদায়ের জন্য নতুন কোশাধ্যক্ষ পদ সৃষ্টি করেন। রাজস্ব বিষয়ক বিভিন্ন মামলার নিষ্পত্তির জন্য গঠিত হয় রাজস্ব আদালত।

চার্চতন্ত্রের প্রাধান্য রোধে ক্রমওয়েলের উদ্যোগ 

টমাস ক্রমওয়েল ইংল্যান্ডেচার্চতন্ত্রের প্রাধান্য প্রতিরোধের লক্ষ্যে একাধিক উদ্যোগ নেন।

[1] ধর্মসংস্কার আন্দোলনে সমর্থন: চার্চ ও পোপতন্ত্রের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ইংল্যান্ডের ধর্মসংস্কার আন্দোলনের প্রতি ক্রমওয়েল সমর্থন জানান। শুধু তাই নয়, তিনি উলসির বিপরীত নীতি গ্রহণের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের ধর্মসংস্কার আন্দোলনকে সফল করার উদ্যোগ নেন। পার্লামেন্টের আইন মেনে তিনি পোপের প্রাধান্য হ্রাস করেন। ইংল্যান্ডের চার্চগুলিতে পোপের প্রাধান্য বাতিল করে তিনি রাজার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেন।
[2] অ্যাক্ট অব সুপ্রিমেসি আইন: টমাস ক্রমওয়েল ইংল্যান্ডের মুখ্য ধর্মীয় আধিকারিকের পদ গ্রহণ করেন। এই পদে থাকাকালীন তিনি। ‘অ্যাক্ট অব সুপ্রিমেসি' নামে এক আইন পাস করান (১৫৩৪ খ্রি.)। এই আইনের দ্বারা তিনি ইংল্যান্ডের চার্চগুলিকে রাজার নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেন। পাশাপাশি চার্চের যাবতীয় সম্পত্তি রাজার অধীনে আনা হয়।
[3] মঠগুলির বাজেয়াপ্তকরণ ও নিয়ন্ত্রণ: ক্রমওয়েল রাষ্ট্রীয় তরফে ইংল্যান্ডের ছোটো ছোটো মঠগুলি বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নেন, আর বড়ো মঠগুলির ওপর রাষ্ট্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। এভাবে তিনি রাজকোশের আর্থিক আয় বৃদ্ধি করেন।

সূচনা: ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসে টমাস ক্রমওয়েল এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব।তাঁকে আধুনিক ইংল্যান্ডের রূপকার হিসেবে সম্মান দেওয়া হয়।

টমাস ক্রমওয়েল ও ইংল্যান্ডের নব্য রাজতন্ত্র
[1] নব্য রাজতন্ত্রের ধারা: ইংল্যান্ড রাজ সপ্তম হেনরি প্রতিষ্ঠিত টিউডর রাজতন্ত্রকে ঐতিহাসিক জন রিচার্ড গ্রিন সর্বপ্রথম ‘নব্য রাজতন্ত্র' (New Monarchy) আখ্যা দেন। ঐতিহাসিক ডি. এল. কেয়ার লিখেছেন
যে, “সপ্তম হেনরির রাজত্বকালে রাজতন্ত্রের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়।” এই রাজতান্ত্রিক ধারা পরবর্তী রাজা অষ্টম হেনরির সময়কাল পর্যন্ত বজায় থাকে । অষ্টম হেনরির শাসনকালে রাজার প্রধান উপদেষ্টা এবং
সচিব টমাস ক্রমওয়েলের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড এক আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
[2] জাতীয় সার্বভৌমত্ব ধারণার প্রতিষ্ঠা: রিফরমেশন পার্লামেন্টে টমাস ক্রমওয়েল দুটি আইন পাস করিয়ে ইংল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। অ্যাক্ট অব অ্যাপিলস (Act of Appeals) নামে প্রথম আইনটি পাসের (১৫৩৩ খ্রি.) মাধ্যমে ইংল্যান্ডের রাজাকে সার্বভৌম বলে ঘোষণা করা হয়। বলা হয়, রাজা হলেন সমস্ত ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক গোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রভু। অ্যাক্ট অব সুপ্রিমেসি নামে দ্বিতীয় আইনটি পাস (১৫৩৪ খ্রি.) করিয়ে রাজার প্রতি আনুগত্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়।
[3] চার্চের ওপর রাজার অধিকার তত্ত্ব: টমাস ক্রমওয়েল বলেন রাজা হলেন চার্চের (ইতিহাস ও বাইবেল অনুসারে) প্রশাসনিক প্রধান। এই ঘোষণার পর চার্চের প্রধান হিসেবে অষ্টম হেনরি চার্চের ওপর যাবতীয়
প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। চার্চের ওপর কর স্থাপন, যাজকদের নিয়োগ, বিচার ব্যবস্থা প্রভৃতি তিনি নিজের হাতে তুলে নেন।
[4] সংসদীয় আইনের প্রাধান্য: টমাস ক্রমওয়েল সর্বপ্রথম সংসদীয় আইনের গুরুত্ব অনুভব করেন। সংসদ অনুমোদিত আইনগুলিকে তিনি জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে শুরু করেন। ফলে সংসদীয় আইনের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
[5] জাতীয় রাষ্ট্র গঠন: ক্রমওয়েল জাতীয় প্রশাসন গঠনের মাধ্যমে জাতীয় রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপট রচনা করেন। জাতীয় সার্বভৌমত্বের ধারণা, চার্চের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, সংসদীয় আইনের প্রবর্তন, আর্থিক ও প্রশাসনিক বিভাগের পুনর্গঠন— এই সমস্ত কিছুর সম্মিলিত প্রভাবে ইংল্যান্ড অচিরেই এক জাতীয় রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ক্রমওয়েলের পুনর্গঠন প্রচেষ্টা
[1] সরকারি প্রশাসনের পুনর্গঠন: রিফরমেশনের আগে পর্যন্ত রাজা এবং তাঁর প্রাসাদের কর্মচারীরা ছিলেন প্রশাসনিক প্রধান। কিন্তু ক্রমওয়েল এই ব্যবস্থা বদলে দিয়ে প্রশাসনিক কেন্দ্রে মন্ত্রীসভাকে স্থান দেন। উনিশজন মন্ত্রী নিয়ে তিনি গঠন করেন প্রিভি কাউন্সিল। ক্রমওয়েল রাজার একটি সচিবালয় গড়ে তোলেন এবং একটি প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি পদ সৃষ্টি করে নিজে সেই পদে বসেন।
[2] স্থানীয় শাসনের পুনর্গঠন: জনগণের আন্দোলন মোকাবিলার জন্য ক্রমওয়েলের উদ্যোগে উত্তর ইংল্যান্ডের কাউন্সিলকে নতুনভাবে গঠন করা হয়। এই নবগঠিত কাউন্সিলকে প্রশাসনিক ও বিচারক্ষমতা দান করা হয়। এই কাউন্সিলের সক্রিয় ভূমিকায় উত্তর ইংল্যান্ডে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরে আসে। একইভাবে স্কটল্যান্ডের ওয়েলস প্রদেশে এবং পশ্চিম ইংল্যান্ডে ক্রমওয়েল আর-একটি কাউন্সিল গঠন করেন।
[3] আর্থিক বিভাগের পুনর্গঠন: টমাস ক্রমওয়েল আর্থিক ব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করেন। তিনি অর্থবিভাগের নতুন পদ সৃষ্টি করেন (১৫৩৪ খ্রি.) । পাশাপাশি চার্চের কর নির্ধারণ ও কর আদায়ের জন্য নতুন কোশাধ্যক্ষ পদ সৃষ্টি করেন। রাজস্ব বিষয়ক বিভিন্ন মামলার নিষ্পত্তির জন্য গঠিত হয় রাজস্ব আদালত।

সূচনা: ইটালির একজন বিখ্যাত রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ছিলেন নিকোলো ডি বার্নাডো ম্যাকিয়াভেলি (১৪৬৯-১৫২৭ খ্রি.)।আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বের ভিত নির্মাণের কারণে তাকে ‘আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক’, ‘রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নিউটন’ প্রভৃতি আখ্যা দেওয়া হয়।
ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তা
[1] রচিত রাষ্ট্রগ্রন্থসমূহ: ম্যাকিয়াভেলি রচিত কয়েকটি গ্রন্থ হল— ‘দ্য প্রিন্স’, ‘দ্য ডিসকোর্সেস অন দ্য ফার্স্ট ডিকেড অব লিভি', ‘মান্ড্রোগোলা’, ‘আর্ট অব ওয়ার' প্রভৃতি। তবে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ভাবনার প্রতিফলন মেলে ‘দ্য প্রিন্স' গ্রন্থে। এই গ্রন্থে ম্যাকিয়াভেলি রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিচালনার বিধিনিষেধগুলি আলোচনা করেছেন।
[2] রাষ্ট্রের শ্রেণিবিভাগ: ম্যাকিয়াভেলি রাষ্ট্র ও সরকারকে রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র এবং নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্র—এই তিনভাগে ভাগ করেছেন। তিনি ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থে রাজতন্ত্র এবং ‘দ্য ডিসকোর্সেস অন দ্য ফার্স্ট ডিকেড
অব লিভি’ গ্রন্থে প্রজাতন্ত্রের স্বরূপ তুলে ধরেছেন।
[3] রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্ব: আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার বিকাশে ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রভাবনা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রথমত, তিনিই হলেন প্রথম ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তাবিদ, যিনি রাষ্ট্রভাবনাকে ধর্ম ও নীতিশাস্ত্রের কবল থেকে মুক্ত
করতে পেরেছিলেন। দ্বিতীয়ত, তিনিই প্রথম রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার উপাদানগুলিকে বাস্তব তথ্যের কষ্টিপাথরে যাচাই করে নেওয়ার কথা বলেছেন। তৃতীয়ত, তিনিই প্রথম ক্ষমতা রাজনীতির প্রবক্তা, যা আজও
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিভিন্ন রাষ্ট্র অনুসরণ করে চলেছে।
ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তার বৈশিষ্ট্য ও ত্রুটিবিচ্যুতি
[1] বৈশিষ্ট্য : সাধারণভাবে ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তার কিছু বৈশিষ্ট্য হল-
i. ধ্রুপদি চিন্তায় গুরুত্ব: ম্যাকিয়াভেলি বিশ্বাস করতেন গ্রিস এবং রোমের ধ্রুপদি বা সনাতন ঐতিহ্য ইউরোপে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে পারলে মধ্যযুগীয় অসাড় ও স্থবির রাষ্ট্রচিন্তা থেকে ইউরোপ মুক্ত হবে।
ii. আধুনিক জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণা প্রবর্তন: তিনিই সর্বপ্রথম রাষ্ট্রচিন্তাক্ষেত্রে আধুনিক জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণা পেশ করেন। তিনি বলেন জাতীয় রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল সার্বভৌমত্ব।
iii. ধর্ম ও নীতিবোধের মধ্যে পৃথকীকরণ: ম্যাকিয়াভেলি বলেন যে, ব্যক্তিগত নীতিবোধ রাজার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। রাজাকে ব্যক্তিধর্ম ও নীতিবোধের উে উঠে কঠোরভাবে শাসন চালাতে হবে।
iv. রাজনৈতিক সমস্যা নির্ধারণ পদ্ধতি : রাজনৈতিক সমস্যাগুলি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ম্যাকিয়াভেলি অভিনব পদ্ধতির উল্লেখ করেছেন—
[a] সদর্থক (Positive): সমকালীন সমাজের ঘটনাবলি থেকে অভিজ্ঞতা অর্জনের উপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
[b] নঞর্থক (Negative): এটি মূলত ঈশ্বরের অস্তিত্ব, চার্চের একচেটিয়া কর্তৃত্ব এবং প্রাকৃতিক আইনের একাধিপত্য অস্বীকার করাকে বোঝায়।
[2] ত্রুটিবিচ্যুতি: সমালোচকদের দৃষ্টিতে ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তার কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি ধরা পড়ে। যেমন—[i] ম্যাকিয়াভেলি সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক ক্ষমতাতত্ত্ব এবং যুদ্ধনীতি ছাড়া আর অন্য কিছুর ওপর তেমন স্পষ্টভাবে আলোকপাত করেননি। [ii] ম্যাকিয়াভেলির ধারণায় আগে রাষ্ট্রীয় পরে সামাজিক কাঠামো গঠিত হয়েছে। কিন্তু তাঁর এই ধারণা ভুল, কেন না আগে সমাজ তৈরি হয়েছে, পরে রাষ্ট্রীয় কাঠামো। [iii] রাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষার জন্য সমস্ত ক্ষমতা রাজার হাতে থাকা উচিত—তাঁর এই ধারণাও ত্রুটিপূর্ণ, কেননা এক্ষেত্রে প্রজার স্বার্থ লঙ্ঘিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। [iv] সর্বোপরি অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি যেভাবে মানবচরিত্রকে শ্রেণিভুক্ত করেছেন, তাও ভ্রান্ত ছিল। তাই অধ্যাপক অ্যালেন বলেছেন—“ন্যাকিয়াভেলির মানবপ্রকৃতি সম্পর্কিত ধারণা ছিল ত্রুটিপূর্ণ।”

সূচনা: ফরাসি রাষ্ট্রচিন্তাবিদ জাঁ বোঁদা (১৫৩০-১৫৯৬ খ্রি.) ছিলেন রাষ্ট্রচিন্তার আকাশে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। ঐতিহাসিক অ্যালেন বলেছেন—“বোঁদা ষোড়শ শতকের ফ্রান্স, তথা সমকালীন বিশ্বের রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন।"
জী বৌদা-র রাষ্ট্রতত্ত্ব
[1] রাষ্ট্রগ্রন্থসমূহ: জাঁ বোঁদার রাষ্ট্রচিন্তার ধারণা মেলে যে দুটি গ্রন্থ থেকে সেগুলি হল –[i] ‘মেথড ফর দ্য ইজি কম্প্রিহেনশন অব হিস্ট্রি এবং [ii] 'সিক্স বুকস্ অব দ্য কমনওয়েলথ'। প্রথম বইটিতে রয়েছে মূল রাষ্ট্রের প্রকৃতি বিষয়ক প্রবন্ধ।
[2] রাষ্ট্রচিন্তার ধারা
i. রাষ্ট্রের সংজ্ঞা : রাষ্ট্রের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বোঁদা বলেছেন—কয়েকটি পরিবার ও তাদের যৌথ সম্পত্তির সমন্বয়ে যখন কোনো আইনসম্মত সরকার সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে, তখন তাকে রাষ্ট্র বলে।
ii. রাষ্ট্রের লক্ষ্য: বোঁদার ধারণায় একটি রাষ্ট্র শুধুমাত্র মানুষের বস্তুগত লক্ষ্যই চরিতার্থ করবে না, তার আধ্যাত্মিক প্রয়োজনও মেটাবে। রাষ্ট্রের দেহ ও আত্মা দুই-ই আছে। দেহের প্রয়োজন জরুরি হলেও আত্মার স্থান তার ঊর্ধ্বে।
iii. রাষ্ট্রের শ্রেণিবিভাগ: বোঁদা বলেছেন— সরকার হবে তিন ধরনের যথা—রাজতান্ত্রিক, অভিজাততান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক। জাঁ বোঁদার ধারণায় মিশ্র রাষ্ট্র কাম্য নয়, কেন-না তা হল নৈরাজ্যেরই নামান্তর। তাঁর মতে প্রশাসন মিশ্র হলেও রাষ্ট্র মিশ্র হতে পারে না।
iv. রাষ্ট্রের কাজ: বোঁদা মনে করেন রাষ্ট্রকে সবার আগে সাধারণের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে হবে। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দান, সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশাসনের সুষ্ঠু পরিচালনা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করা ইত্যাদি হল রাষ্ট্রের কাজ।
v. সার্বভৌমত্ব : বোঁদা বলেছেন রাষ্ট্র চরম সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন- “সার্বভৌমত্ব হল রাষ্ট্রের আদেশ প্রদানকারীর এক চরম ক্ষমতা যা নাগরিক তথা প্রজাদের ওপর ব্যবহার করা হয় এবং আইন দ্বারা যা অনিয়ন্ত্রিত থাকে।”
vi. বিপ্লবতত্ত্ব : জাঁ বোঁদা স্বৈরতন্ত্র যখন রাজতন্ত্রে এবং রাজতন্ত্র যখন অভিজাততন্ত্রে পরিণত হয় সেই আমূল পরিবর্তনই হল বিপ্লব। বিপ্লব দু ধরনের যথা- (a) পরিবর্তনমুখী (Alteratio) বিপ্লব, [b] বিরুদ্ধ বা বিপরীতধর্মী (Conversio) বিপ্লব। তিনি বিপ্লবের কারণগুলিকে তিনভাগে ভাগ করেছেন যথা—ঐশ্বরিক,
প্রাকৃতিক ও মানবিক।
বোঁদার রাষ্ট্রতত্ত্বের সীমাবদ্ধতা ও গুরুত্ব
[1] সীমাবদ্ধতা : বোদার রাষ্ট্রচিন্তার কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। প্রথমত, বোঁদা সমকালীন বুর্জোয়াদের সমর্থনে নিজের রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি নির্মাণ করেন। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা দিলেও তিনি তাঁর বিশ্লেষণ
করে যাননি। তাঁর সার্বভৌমত্ব তত্ত্ব ঐশ্বরিক এবং স্বাভাবিক আইন দ্বারা সংযত। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রের আদর্শ এবং লক্ষ্য সম্পর্কে বোঁদা সুস্পষ্ট কোনো মতাদর্শ দিয়ে যেতে পারেননি। চতুর্থত, রাষ্ট্রকে শুধুমাত্র পরিবারগুলির
সমষ্টি বলে বর্ণনা করে বোঁদা ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন।
[2] গুরুত্ব : বোঁদার রাষ্ট্রতত্ত্বের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও তা একেবারে গুরুত্বহীন নয়। রাষ্ট্রের সঙ্গে পরিবারের সম্পর্ক, রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য, রাষ্ট্রের শ্রেণিবিভাগ, নাগরিকতা, সার্বভৌমত্ব, বিপ্লবতত্ত্ব বিষয়ক বোঁদার চিন্তাধারা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় নতুন দিশা দেখিয়েছে। তাই অধ্যাপক গেটেল লিখেছে —“বোঁদার চিন্তাধারা ফ্রান্সের ও ইংল্যান্ডের সমকালীন চিন্তাদর্শনের ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল।”

সূচনা: ইংরেজ দার্শনিক টমাস হব্‌স (১৫৮৮-১৬৭৯ খ্রি.) আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তাবিদদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। সামাজিক চুক্তি মতবাদের অন্যতম সার্থক প্রবক্তা ছিলেন তিনি। তিনি বলেন—“রাষ্ট্র হল যন্ত্র এবং রাষ্ট্রে বসবাসকারীরা নিয়মশৃঙ্খলায় আবদ্ধ।” যন্ত্রের গতি নিয়ে রাষ্ট্র চলমান আর তার সঙ্গে সঙ্গে চলমান মানুষ এবং তার কর্মকাণ্ড।
হবসের রাষ্ট্রদর্শন
[1] রচিত রাষ্ট্রগ্রন্থসমূহ: হব্‌সের লেখা সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থটি হল ‘লেভিয়াথান' (Leviathan), যা তিনি ফ্রান্সে নির্বাসনে থাকাকালীন রচনা করেছিলেন। এ ছাড়াও তার উল্লেখযোগ্য আরও দুটি গ্রন্থ ছিল ‘ডি করপোরে' (De Corpore) এবং 'ডি হোমাইন' (De Homine)। লেভিয়াথান গ্রন্থে হবসের রাষ্ট্রচিন্তার বিশদ বিবরণ রয়েছে।
[2] রাষ্ট্রচিন্তার ধারা
i. সামাজিক চুক্তি মতবাদ
[a] মূল বক্তব্য: হব্‌সের ধারণায় সামাজিক চুক্তির মধ্যে দিয়েই রাষ্ট্র নামে যন্ত্রের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন সমাজ গড়ে ওঠার আগে মানুষ প্রকৃতির কোলে জীবন কাটাত। কিন্তু প্রকৃতির রাজ্যের অনিশ্চয়তা এবং দুর্বিষহ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় মানুষ চুক্তির দ্বারা সমাজ গঠন করল। যাবতীয় প্রাকৃতিক অধিকার সার্বভৌষ শাসকের হাতে অর্পণ করল।
[b] প্রকৃতির রাজ্য: হসের সামাজিক চুক্তি মতবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল প্রকৃতির রাজা (State naturর মতে, প্রাকৃতিক আইন হল পারস্পরিক বিবেচনাপ্রসূত স্বাভাবিক কিছু পরামর্শ। অসহনীয় জীবনযাপন থেকে মুক্তির লক্ষ্যে পারস্পরিক বিবেচনার মাধ্যমে মানুষ কিছু আইন তৈরি করে।
ii. সার্বভৌমিক তত্ত্ব: হব্‌সের ধারণায় সার্বভৌম ক্ষমতা হল, মানুষের এমন এক চূড়ান্ত ক্ষমতা, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রের এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা রক্ষা করেন। সার্বভৌমত্বের প্রধান উদ্দেশ্য হল- জনস্বার্থ রক্ষা করা।
iii. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ :  হবসের চিন্তায় ব্যক্তি তার নিজের স্বার্থসিস্থির জন্য সদা সচেষ্ট। রাষ্ট্র ব্যক্তির জন্য সৃষ্টি হয়েছে। ব্যক্তি রাষ্ট্রের জন্য নয়। ব্যক্তির নিরাপত্তা ও মঙ্গল সাধনই রাষ্ট্রের অন্যতম উদ্দেশ্য।
হবসের রাষ্ট্রদর্শনের সীমাবদ্ধতা ও গুরুত্ব
[1] সীমাবন্ধতা: পাশ্চাত্য রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ডন, মারে, গেটেল প্রমুখ বসকে রক্ষণশীল, যান্ত্রিক, গণতন্ত্র বিরোধী তত্ত্বের রূপকার বলেছেন। হবসের রাষ্ট্রতত্ত্বের সামাজিক চুক্তি ভ্রান্ত এবং তাঁর প্রকৃতির রাজ্যতত্ত্ব কাল্পনিক। কেন- না হবসের চুক্তিতত্বে চুক্তি সম্পাদনকারী শুধুমার একটি পক্ষ আছে, তা হল সাধারণ মানুষ বা জনসাধারণ। এতে শাসক বা অন্য কোনো পক্ষ নেই। কিন্তু বাস্তবে চুক্তি হয় দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে।
তাই হবসের এই চুক্তিতত্ব অবাস্তব।
[2] গুরুত্ব : টমাস হবস ঐশ্বরিক তত্ত্বকে অস্বীকার করে রাষ্ট্রকে মানবিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়ে গেছেন হবস। তাই লিও সহসকে  "The originator of modern political philosophy” বলে উল্লেখ করেছেন।

সূচনা: রাষ্ট্রচিন্তার জগতে এক অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব হলেন—ফরাসি চিন্তাবিদ জ্যাঁ জাঁক রুশো। রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে রুশোর স্থান নির্ণয় করতে গিয়ে অধ্যাপক হার্নশ বলেছেন—“রাজনৈতিক আদর্শবাদীদের মধ্যে রুশো উচ্চ স্থানের অধিকারী।”
রুশোর রাষ্ট্রদর্শন
[1] রাষ্ট্রাদর্শ: রুশোর রাষ্ট্রাদর্শের মূল তিনটি বিষয় হল—প্রকৃতির রাজ্য (State of Nature), সামাজিক চুক্তি (The Social Contract) ও সাধারণ ইচ্ছা (General Will)। রুশোর রাষ্ট্রাদর্শে গণতন্ত্র ও সাম্যের প্রতিফলন মেলে।
[2] রচনাসমূহ: রুশো রচিত উল্লেখযোগ্য তিনটি গ্রন্থ হল – আ ডিসকোর্স অন দ্য মরাল এফেক্টস অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সস', 'আ ডিসকোর্স অন দি অরিজিন অব ইনইকুয়ালিটি’ ও ‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট'।
[3] গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বের ব্যাখ্যা
i. প্রকৃতির রাজ্য: রুশোর ধারণায় প্রকৃতির রাজ্য ছিল ভূস্বর্গসম (Farthly Heaven), যেখানে মানুষদের মধ্যে মধুর ও আন্তরিক সম্পর্ক, সুখ-শান্তি বজায় ছিল। রুশো বলেছেন—“মানুষের মধ্যে চিন্তা ও বিচারশক্তির উন্মেষ ঘটলে পারস্পরিক ভেদাভেদ গড়ে ওঠে ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব ঘটে। ফলে প্রকৃতির রাজ্যের যাবতীয় সুখশান্তির অবসান হয়।”
ii. সামাজিক চুক্তি মতবাদ: প্রকৃতির রাজ্যে ঘনিয়ে ওঠা অশান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে মানুষ এক চুক্তি সম্পাদন করে। এই চুক্তির মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠে রাজনৈতিক বা পৌরসমাজ। রুশোর ধারণায় এই চুক্তিই হল সামাজিক চুক্তি।‘সামাজিক চুক্তি' (The Social Contract) গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে রুশো লিখেছেন—“মানুষ
স্বাধীনভাবে জন্মায়, কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলাবদ্ধ”।
iii. সাধারণ ইচ্ছা তত্ত্ব: রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদের প্রধান অঙ্গ হল—সাধারণ ইচ্ছা তত্ত্ব। সামাজিক চুক্তির মধ্যে দিয়ে যে মিলিত শক্তি গড়ে ওঠে তা হল সাধারণ ইচ্ছা। রুশোর ধারণায় ব্যক্তিমানুষের ইচ্ছা দু-ধরনের একটি হল প্রকৃত ইচ্ছা, অপরটি হল বাস্তব ইচ্ছা। রুশোর মতে,সাধারণ ইচ্ছা হল প্রকৃত ইচ্ছাগুলির
গুণফল।
 মন্তেস্কুর রাষ্ট্রদর্শন
ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম মানবতাবাদী রাষ্ট্রচিন্তাবিদ হলেন চার্লস লুই দা মন্তেস্কু (১৬৮৯-১৭৫৫ খ্রি.)। তিনিই প্রথম রাষ্ট্রচিন্তাবিদ যিনি সমাজবিজ্ঞানী হিসেবেও খ্যাতি লাভ করেছেন।
[1] রাষ্ট্রাদর্শ: মন্তেঙ্কুর রাষ্ট্রাদর্শের মূল কয়েকটি বিষয় ছিল রাষ্ট্রতত্ত্ব ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি, আইনের ধারণা, স্বাধীনতার তত্ত্ব প্রভৃতি।
[2] রচনাসমূহ: মন্তেঙ্কু রচিত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হল—দ্য পারসিয়ান লেটারস’, ‘গ্রেটনেস অ্যান্ড ডেকলাইন অব দ্য রোমান্স', 'দ্য স্পিরিট অব দ্য লজ’ প্রভৃতি।
[3] রাষ্ট্র সম্পর্কিত ধারণা: মন্তেঙ্কুর ধারণায় রাষ্ট্র একটি আইনসম্মত সংগঠন। তাঁর চিন্তায় রাষ্ট্রের কাজ হল—ব্যক্তির নৈতিক জীবনের চলার পথের বাধাগুলিকে দূর করে তাদের মঙ্গলসাধনে ব্রতী হওয়া। মন্তেস্কু তিন ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থার উল্লেখ করেছেন, যথা—
i. প্রজাতন্ত্র: প্রজাসাধারণের হাতে যেখানে সমস্ত ক্ষমতা থাকে, তা হল প্রজাতন্ত্র।
ii. রাজতন্ত্র : নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত আইন মেনে রাজা তার অধীনস্থ কর্মচারীদের নিয়ে যে শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেন, তা হল রাজতন্ত্র।
iii. স্বৈরতন্ত্র: আইনের তোয়াক্কা না করে, কোনো একজন ব্যক্তি নিজের খেয়ালখুশিমতো যে শাসনব্যবস্থা কায়েম করেন, তা হল স্বৈরতন্ত্র।
[4] মন্তেস্কুর রাষ্ট্রতত্ত্ব
i. ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি: মন্তেঙ্কুর ধারণায় আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ (প্রশাসন) এবং বিচার বিভাগকে আলাদা করে দেওয়া উচিত। তিনি মনে করতেন এই তিনটি বিভাগের ক্ষমতা কোনো একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হলে সাম্য ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি এবং এর উপাদান। স্বাধীনতা বিঘ্নিত হবে। মন্তেস্কু বলেন—“পৃথিবীতে যত অশান্তি ও নিপীড়ন বা শোষণের ঘটনা রয়েছে তার মূলে আছে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন।”
ii. আইনের ধারণা: মন্তেস্কু মনে করতেন সমস্ত বস্তুরই নিজ নিজ আইন রয়েছে। দেবতাকুল, মনুষ্য জগৎ এমনকি পশুদেরও নিজস্ব আইন রয়েছে। তাঁর ধারণায় যেখানেই সম্পর্ক রয়েছে সেখানেই আইন রয়েছে। সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আইনের প্রয়োজন।
iii. স্বাধীনতার তত্ত্ব: মন্তেঙ্কুর স্বাধীনতা সম্পর্কিত ধারণা রয়েছে ‘দ্য স্পিরিট অব দ্য লজ’ গ্রন্থে। মন্তেঙ্কুর ধারণায় চরম বা অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা স্বাধীনতার পরিপন্থী। মন্তেঙ্কু মূলত স্বাধীনতা বলতে রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে বোঝাতে চেয়েছেন।

সূচনা: আধুনিক বস্তুনিষ্ঠ ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র পূর্ণতা পায় ব্রিটিশ রাষ্ট্রচিন্তাবিদ জন লকের রচনাগুলির মধ্যে। তিনি ছিলেন উদারনীতিবাদের জন্মদাতা তথা সার্থক প্ৰৰস্তা।
জন লকের রাষ্ট্রচিন্তা
[1] রাষ্ট্রদর্শ: সমকালীন ইংল্যান্ডের সমাজজীবনের প্রেক্ষিতেই গড়ে উঠেছিল লকের রাষ্ট্রদর্শন। লকের রাষ্ট্রাদর্শের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিষয় ছিল—অভিজ্ঞতাবাদ, প্রকৃতির রাজ্য, প্রাকৃতিক আইন ও প্রাকৃতিক অধিকার, সামাজিক চুক্তি, সম্পত্তি তত্ত্ব প্রভৃতি।
[2] রচনাসমূহ: 'টু ট্রিটিজেস্ অব গভর্নমেন্ট' (১৬৯০ খ্রি.) গ্রন্থে লক রাষ্ট্র ভাবনার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর লেখা অন্যান্য কয়েকটি গ্রন্থ হল— ‘কনসার্নিং হিউম্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং’, ‘হিস লেটারস্ অন টলারেন্স' প্রভৃতি।
[3] গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বের ব্যাখ্যা
1. সামাজিক চুক্তি : জন লক বলেছেন প্রকৃতির রাজ্যে প্রতিটি ব্যক্তি প্রত্যেকের সঙ্গে চুক্তি করে এই রাষ্ট্রসমাজ গড়ে তুলেছে। এই চুক্তির উদ্দেশ্য হল জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির অধিকারকে রক্ষা করা।
ii. ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ : জন লক ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। ক্ষমতার ভিত্তিতে তিনি সরকারকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন যথা- আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ এবং ফেডারেটিভ (Federative) বিভাগ। তিনি মনে করতেন সরকারের এই তিনটি বিভাগকে আলাদা করে দিলে স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ থাকবে না।
iii. প্রকৃতির রাজ্য প্রকৃতির রাজ্য প্রাকৃতিক আইন দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় প্রত্যেকে সমান অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগ করে। লক প্রকৃতির রাজ্যকে এক শান্তির রাজ্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে মানুষ পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্যে দিয়ে বাস করত।
iv. অভিজ্ঞতাবাদ লক বলেন যে জগৎ সংসারে সমস্ত কিছুকেই অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার করা উচিত। লকের ধারণা জন্মানোর পর প্রথমে মানুষের মন থাকে সাদা কাগজের মতো, যাতে কোনো দাগ থাকে না। কিন্তু যতদিন যায় মানুষ অভিজ্ঞতা লাভ করে, যা তার চিন্তা ও জ্ঞানের জগতের প্রসার ঘটায়।
v. প্রাকৃতিক ভাইন ও অধিকার : লক বলেছেন প্রকৃতির রাজ্য পরিচালনা করত প্রাকৃতিক আইন। এই প্রাকৃতিক আইন ছিল বলেই কেউ কারও জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারত না। লকের ধারণায় এই প্রাকৃতিক আইন ছিল সর্বজনীন।
vi. সম্পত্তি, তত্ত্ব: লকের ধারণায় সম্পত্তির অধিকারের মধ্যেই রয়েছে মানুষের জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার। লক বলেছেন সমস্ত মানুষ প্রকৃতিগতভাবে সমান প্রাকৃতিক সম্পদ ভোগ করার অধিকারী।
সমালোচনা: লকের রাষ্ট্রচিন্তা সমালোচনার ঊর্ধ্বে ছিল না। প্রথমত, লকের বেশ কয়েকটি তত্ত্বে স্ববিরোধিতা লক্ষ করা যায় । লক একদিকে আইনসভা অপরদিকে রাষ্ট্রসমাজকে চরম ক্ষমতার আধার বলে উল্লেখ করছেন। আবার কখনও বা রাজাকে ক্ষমতার বিশেষ অধিকারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয়ত, লক শ্রমজীবীদের ওপর মালিকপক্ষের শোষণগত ভূমিকাকে তিনি এড়িয়ে গেছেন। তৃতীয়ত, লক তার
রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে যুক্তিবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদের মধ্যে মিলন ঘটাতে চেয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে লকের কয়েকটি অবদান হল—
[1] প্রাকৃতিক অধিকার তত্ত্ব: তিনিই প্রথম স্পষ্ট ভাষায় বলেন— জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির অধিকার হল মানুষের স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক অধিকার।
[2] ক্ষমতা-পৃথকীকরণ তত্ত্ব: লকই প্রথম স্পষ্টভাবে ক্ষমতা-বিভাজন নীতির ব্যাখা দেন।
[3] ঐশ্বরিক অধিকার তত্ত্বের বিরোধিতা: ঐশ্বরিক তত্ত্বের বিরোধিতা করে লক বলেন—রাষ্ট্র হল মানবীয় প্রতিষ্ঠান, কোনো ঐশ্বরিক প্রতিষ্ঠান নয়।
[4] বিপ্লবের তত্ত্ব: বিপ্লবের তত্ত্বে লক স্বৈরাচারিতার অবসানের ক্ষমতা জনগণের হাতে দেন। তাঁর এই তত্ত্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে অনুসৃত হয়।

প্রাচীন পারসিক ব্যাখ্যা অনুসারে ‘স্যাট্রাপ' শব্দটির অর্থ হল ‘সাম্রাজ্যের রক্ষাকর্তা'।

পারস্যের আকিমেনীয় সাম্রাজ্যের প্রাদশিক শাসনকর্তাদের স্যাট্রাপ বলা হত। এরা সাম্রাজ্যের সংকট মোকাবিলায় এবং সাম্রাজ্যের বিস্তার ও উন্নতিতে প্রধান দায়িত্ব পালন করত। প্রকৃত অর্থে স্যাট্রাপরা সমগ্র আকিমেনীয় সাম্রাজ্যের ওপর শাসন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করত।

সাট্রাপদের প্রধান কাজ ছিল—ট্যাক্স আদায় ও জমা দেওয়াশ সেনাদের নিয়োগ করা, আঞ্চলিক আমলাদের নিয়োগ করা, পৌর ও ফৌজদারি অপরাধের বিচার করা, অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বা সমস্যার মোকাবিলা করা, বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিরোধ করা ইত্যাদি।

স্যাট্রাপীয় প্রশাসনিক কাঠামোর ধারণা মেলে এমন তিনটি উৎস হল – [1] ন্ত্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাসের তথাকথিত নোয়াই তালিকা (Nomai List), [2] ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের বিভাগ সম্পর্কে আলেকজান্ডারের আমলের ঐতিহাসিকদের বিবরণ এবং [3] আকিযেনীয় সাম্রাজ্যের লিপিসমূহ।

স্যাট্রাপিগুলিকে মূলত তিনভাগে বিভক্ত করা হয়—[1] কেন্দ্রীয় বৃহৎ স্যাট্রাপি—উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হল ব্যাবিলনিয়া, ব্যাকট্রিয়া ইত্যাদি। [2] কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্র স্যাট্রাপি–উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হল পার্থিয়া, আর্মেনিয়া, আসিরিয়া ইত্যাদি।[3] প্রাদেশিক ক্ষুদ্রস্যাট্রাপি— উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হল হিরকানিয়া, প্যাফলাগোনিয়া ইত্যাদি।

পারস্য (Persia) শব্দের উৎস 'pars' শব্দ থেকে। পার্স প্রাচীন পারসিয়দের ব্যবহৃত ভাষা। পারস্যে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী পারসি (Persians) নামে পরিচিত। আধুনিক পারসিয়দের ফার্স (Fars) বা ফার্সিন্তান (Farsistans)-এর গোষ্ঠীবাসী বলা হয়। তাই এরা ফারসি বা পারসি।

পারসিকরা প্রথমে আধুনিক ইরানের দক্ষিপ-পশ্চিম অংশে বসবাস করত। এখানে পাসারগ্যাডে ও পার্সেপলিস নামে দুটি নগর গড়ে ওঠে, যেগুলি গ্রিকদের কাছে পারসা ও পারসিস নামে পরিচিত ছিল। এদের পূর্বপুরুষ ছিলেন একেমেনিস (Achaemenes)। তাই এরা আকিমেনীয় নামে পরিচিত ছিল।

চিনে তাং বংশের (৬১৮-৯০৭ খ্রি.) আমলে প্রবর্তিত নতুন আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এক ধরনের নতুন কর্মচারী নিয়োগ করা হয়। এরা ম্যান্ডারিন নামে পরিচিত।

প্রাচীন চিনে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী বা আমলারা অনেক সময় সম্রাটকে এড়িয়ে জনগণকে বেশি গুরুত্ব দিত। তাই এই আমলাতন্ত্রের পরিবর্তে চিনা সম্রাট ম্যান্ডারিন ব্যবস্থার প্রচলন ঘটান।

ম্যান্ডারিনদের শাসনতান্ত্রিক বিষয় অপেক্ষা ধ্রুপদি চিনা ঐতিহ্য সম্পর্কে অধিকতর জ্ঞানী হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। ম্যান্ডরিনকে একজন বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার হত না, কাম্য ছিল তিনি একজন পণ্ডিত ব্যক্তি হবেন।

চিনের উচ্চপদস্থ আমলাদের ব্যবহৃত একগুচ্ছ বৈচিত্রপূর্ণ ভাষা ছিল ম্যান্ডারিন, যা মিং ও কিং আমলের একটি চিনা ভাষাকে বোঝায়। উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিম চিনে এক উপভাষা হিসেবেও এর প্রচলন ছিল। অন্য ভাষার তুলনায় এই ভাষাই সাহিত্যে অধিক ব্যবহৃত হয় এবং চিনারাও এই ভাষাতেই অধিক কথা বলা শুরু করে।

'ম্যান্ডারিন' শব্দটি আসলে সাম্রাজ্যবাদী চিনের উচ্চপদস্থ অফিসারদের বোঝাত। ইংরেজি ‘ম্যান্ডারিন’ শব্দটি এসেছে পোর্তুগিজ 'mandarim', মালয়দের menteri, হিন্দির mantri, সংস্কৃত man- trin অর্থাৎ 'minister on counsellor' প্রভৃতি শব্দ থেকে।

ষোড়শ শতকে জেসুইট মিশনারীরা এই ভাষাটি শেখার পর এর নাম দিল ম্যান্ডারিন। ইতিপূর্বে এর প্রাচীন চিনা নাম ছিল গুয়ানচুয়া (Guanhua) অর্থাৎ চিনা উচ্চপদস্থ অফিসারদের ভাষা।

মহম্মদ ঘুরির আমলে উত্তর ভারতের অধিকৃত অঞ্চলগুলি থেকে কর গ্রহণের বিনিময়ে সেনাপতিদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। আইন-শৃঙ্খলার অভাবে এদের হাতে কিছু প্রশাসনিক দায়িত্বও দেওয়া হয়। এই সমস্ত অঞ্চলগুলি ইত্তা এবং এর দায়িত্বপ্রাপ্তরা ‘ইত্তাদার' বা 'মাকৃতি' নামে পরিচিত হয়। সুলতান ইলতুৎমিস ভারতে ইত্তা ব্যবস্থার প্রচলন করেন।

আবুল হাসান মাওয়ারদি ইত্তাকে দু-ভাগে বিভক্ত করেন, যথা— ‘ইন্ডা-ই-তমলিক্‌’ এবং 'ইত্তা-ই-ইন্ডিয়লাল'। প্রথমটি সরকারি প্রশাসন, রাজস্ব বস্টন ও তা আদায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তার দ্বিতীয়টি ছিল সরকারি অনুদান।

ইক্তাদারের ফাঁকি রোধের লক্ষ্যে বলবন প্রতিটি ইত্তায় একশ্রেণির হিসাব পরীক্ষক নিয়োগ করেন, এদের নাম হল খোয়াজা। এদের কাজ ছিল ইত্তার আয়, ব্যয় ও উদ্বৃত্ত অর্থের হিসাব রাখা।

ভারতে সুলতানি শাসকদের আমলে কৃষকদের কাছ থেকে উদ্বৃত্ত শস্য ও ভূমিরাজস্ব সংগ্রহ করা এবং শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে বণ্টনের যে রীতি প্রবর্তিত হয়, তাকে ইত্তা ও সেই ইত্তার প্রাপককে বলা হত ইক্তাদার বা মাকৃতি।

[1] কৃষকদের কাছ থেকে নিয়মিত রাজস্ব আদায় করা।
[2] ইক্তার আয় থেকে সেনাবাহিনী পোষণ করা এবং প্রয়োজনে সুলতানকে সেনা সরব্রাহ করা।

[3] উদবৃত্ত অর্থ সরকার কোশাগারে জমা দেওয়া।

সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর স্বশাসিত অঞ্চলগুলি ধীরে। ধীরে ইত্তায় পরিণত হয়। ইলতুৎমিসের আমল থেকেই ইক্তাদারদের বদলির নীতি চালু হয়। সুলতানের নির্দেশে উদ্বৃত্ত রাজস্ব ইন্ডার প্রকৃত আয় নির্ধারণের জন্য আলাদা হিসাবরক্ষক নিয়োগ করা হয়। সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে দূরবর্তী অঞ্চলগুলিকে ইক্তা দেওয়া হলেও নিকটবর্তী অঞ্চলগুলিকে খালিসাভুক্ত করা হয়।

গঙ্গা-যমুনার মধ্যবর্তী উর্বর দোয়াব অঞ্চলে ইলতুৎমিস প্রায় ২ হাজার জন তুর্কি সেনাকে ইত্তা দান করেন। এরা ইত্তা গ্রহণের বিনিময়ে আঞ্চলিক সুরক্ষা এবং কৃষি কাজের নিশ্চয়তা দেয়। এইভাবে সূচনা ঘটে ইত্তা প্রথার।

ভারতে ইক্তা প্রথার প্রবর্তন করেন সুলতান ইলতুৎমিস। ইত্তার প্রাপককে বলা হত ‘ইক্তাদার’ বা ‘মাকৃতি’।

ম্যান্ডারিন চিনের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে এবং ইক্তা প্রথা সুলতানি যুগে ভারতের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

মোগল সম্রাট আকবর ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে মনসবদারি প্রথার প্রবর্তন ঘটান। মনসবদারি প্রথা ছিল একটি পারসিক প্রথা। ‘মনসব’ শব্দের অর্থ হল সরকারি পদমর্যাদা। বিভিন্ন স্তরের মনসব গ্রহীতাগণ ‘মনসবদার' নামে পরিচিত ছিলেন।

মোগল সম্রাট আকবর ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে মনসবদারি প্রথা চালু করেন। 'মনসব’ শব্দের অর্থ হল ‘পদমর্যাদা’।

‘মনসব’ শব্দের অর্থ হল পদমর্যাদা।

 

এমনসব কথার অর্থ হল ‘পদমর্যাদা' বা 'rank'। মোগল সম্রাট আকবর সাম্রাজ্যের সামরিক ও বেসামরিক কাজকর্মের ভিত্তি হিসেবে ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে বিভিন্ন পদমর্যাদার পদাধিকারীদের নিয়ে যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলেন তা মনসবদারি প্রথা নামে পরিচিত।

মোগল সম্রাট আকবর মনসবদারকে নগদ বেতনের পরিবর্তে জায়গির দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এই জায়গিরদারি ব্যবস্থায় স্থায়ী জায়গিরকে বলা হয় 'তনখা জায়গির'।

মনসবদারদের বৈশিষ্ট্য হল-(১) প্রতিটি মনসবদার নিণীড়ডীশ সংখ্যক সেনা রাখত এবং প্রয়োজনে সম্রাটকে সৈন্যের জোগান দিত। (২) যোগ্যতা অনুযায়ী মনসবদার নিযুক্ত হতেন। (৩) মনসবদারদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বরখাস্ত সবই সম্রাটের ইচ্ছাধীন ছিল।

মনসবদাররা নগদে এবং জমি বন্দোবস্তের মাধ্যমে বেতন পেতেন। একশত জাঠবিশিষ্ট গনসবদারদের বেতন ছিল পাঁচশো টাকা। প্রাপ্য বেতন থেকে মনসবদারগণ তাদের অধীনস্থ সেনাবাহিনীর ব্যয় নির্বাহ করতেন। কোনো মনসবদার পদমর্যাদা অনুযায়ী কাজ করতে না পারলে তার পদ কেড়ে নেওয়া হত।

অশ্ব ও সেনা সংখ্যার ভিত্তিতে মনসবদারি ব্যবস্থা ৩০টি স্তরে বিভক্ত ছিল। সর্বনিম্ন স্তর ছিল দশ আর সর্বোচ্চ স্তর ছিল বারো হাজার। তবে সম্রাটের নিকট আত্মীয়েরা ও চরম বিশ্বাসভাজন ব্যক্তিরাই সর্বোচ্চ স্তরের মনসবদারি পেতেন।

মনসবদারি প্রথার দুটি গুরূত্ব হল – [1] সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে: গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকে মনসবদাররা সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেন। তাই পর্যটক বার্নিয়ে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন মনসবদারদের যোগল সাম্রাজ্যের স্তম্ভ বলে বর্ণনা করেছেন।

[2] সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণে: মনসবদারদের দক্ষতা ও সেবার (Service) ফলে ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মোগল সাম্রাজ্য সম্প্রসারিত হয়।

মনসবদারি প্রথার দুটি বৈশিষ্ট্য হল – [1] শ্রেণিবিভাগ: দশজন থেকে বারো হাজার সেনার অধীশ্বর মনসবদাররা তেত্রিশটি স্তরে বিভক্ত ছিল। সাত হাজারি, আট হাজারি ও দশ হাজারি মনসব সাধারণত রাজপরিবারের সদস্যরাই লাভ করত।

[2] জায়গির প্রদান: মনসবদাররা সেনাবাহিনীর ব্যয় নির্বাহের জন্য নগদ বেতন বা জায়গির পেতেন।বিনিময়ে তাদের নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনা নিয়ে যুদ্ধের সময় মোগল বাহিনীতে যোগ দিতে হত।

‘জাঠ’-এর অর্থ হল পদমর্যাদা এবং মনসবদারের অধীনস্থ অশ্বারোহী ও পদাতিক সেনার মিলিত যোগফল। অর্থাৎ জাঠ পদের ভিত্তিতে একজন মনসবদারের বেতন, মর্যাদা ও দায়িত্ব নির্দিষ্ট হত।

‘সওয়ার’-এর অর্থ হল, একজন মনসবদার তাঁর অধীনে প্রকৃত অর্থে যতজন অশ্বারোহী সেনা পোষণ করতেন তার হিসাব। অর্থাৎ সওয়ার পদ দ্বারা মনসবদারদের অধীনস্থ অশ্বারোহী বাহিনীর সংখ্যা নির্দিষ্ট হত।

আকবরের আমলে স্থির হয়েছিল মনসবদাররা নিজ নিজ পশু দাগ দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। কোনো অশ্বারোহী 'সিহ-অস্প' অর্থাৎ ৩টি ঘোড়ার সওয়ার হলে, তাকে ৩ট, 'দো-অম্প’ অর্থাৎ ২টি ঘোড়ার সওয়ার হলে, তাকে ২টি এবং 'ইয়াক-অস্প' অর্থাৎ ১টি ঘোড়ার সওয়ার হলে তাকে ১টি অশ্ব দাগ-এর জন্য পেশ করতে হবে।

'সিহ-অস্প' কথাটির অর্থ হল তিন ঘোড়ার সওয়ারি।

সূচনা: পারস্যের আকিমেনীয় সাম্রাজ্য বৃহৎ ও ক্ষুদ্র কয়েকটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল যেগুলির নাম ছিল স্যাট্রাপি। স্যাট্রাপিগুলির শাসনকর্তা ছিলেন স্যাট্রাপ, যারা রাজার কাছে প্রত্যক্ষভাবে দায়বদ্ধ ছিলেন।
স্যাট্রাপদের পরিচয়
[1] অর্থ: প্রাচীন পারসিক অর্থে স্যাট্রাপ বলতে সাম্রাজ্যের রক্ষাকর্তাকে বোঝাত। এক কথায় আকিমেনীয় সাম্রাজ্যের একটি প্রশাসনিক বিভাগ ছিল স্যাট্রাপি আর এই বিভাগের প্রধান ছিলেন স্যাট্রাপ।
[2] উৎস: 'Satrap' শব্দটির উদ্ভব ঘটেছে গ্রিক শব্দ 'Satrapeia' থেকে Satrapy শব্দটির আভিধানিক অর্থ হল প্রাচীন পারস্যের প্রদেশ। আর Satrap শব্দের আভিধানিক অর্থ হল প্রাচীন পারস্যের প্রাদেশিক শাসনকর্তা।
[3] আত্মপ্রকাশ: বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত আকিমেনীয় সাম্রাজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করার প্রয়োজনীয়তা থেকেই পারসিক সম্রাট কাইরাস আনুমানিক ৫৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পারস্যের আকিমেনীয় সাম্রাজ্যে প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা চালু করেন। ফলে প্রদেশ বা সাট্র্যাপিগুলিতে স্যাটাপদের নিয়োগ করা শুরু হয়।
[4] কার্যাবলি: স্যাট্রাপির প্রধান শাসনকর্তা হিসেবে স্যাট্রাপদের বেশকিছু কাজ করতে হত। যেমন-
i. কর আদায় ও জমা: ট্যাক্স আদায় করা ও তা সরকারি কোণাগারে জমা দেওয়া।
ii. সেনা নিয়োগ : যুদ্ধে পারদর্শী ব্যক্তিকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা।
iii. আমলা নিয়োগ : আঞ্চলিক প্রশাসনিক স্তরে আমলাদের নিয়োগ করা।
iv. বিদ্রোহ দমন: অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহগুলির অবসান ঘটানো।
v. সমস্যার মোকাবিলা: প্রদেশগুলির বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বা নানাবিধ সমস্যার মোকাবিলা কর।
vi. বৈদেশিক আক্রমণ রোধ: বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিরোধ করা।
vii. সমরবাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণ : সামরিক শক্তির রক্ষণাবেক্ষণ করা।
viii. বিচারকাজ : স্যাট্রাপ ছিলেন প্রদেশের বিচার বিভাগের প্রধান। পৌর এবং ফৌজদারি অপরাধের তিনি বিচার করতেন।
ix. বাৎসরিক খতিয়ান পেশ: সঠিক সময়ে খতিয়ান পেশ-এ ব্যর্থ হলে স্যাট্রাপদের মহান রাজা প্রথমে সতর্ক করতেন এবং পরে তার পদ কেড়ে নিতেন।
[5] স্যাট্রাপের সঙ্গে সম্রাটের সম্পর্ক
i. দায়বদ্ধতার: পারস্যের বিভিন্ন প্রদেশে নিয়োজিত স্যাট্রাপগণ ছিলেন মূলত সম্রাটের প্রতিনিধি। তারা নিজেদের কাজের জন্য সম্রাটের কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন।
ii. কর্তব্যগত: স্যাট্রাপদের প্রদেশগুলিতে বিভিন্ন কর্তব্য পালন করতে হত। যেমন— কর আদায় ও জমা, বিদ্রোহ দমন, বাৎসরিক খতিয়ান পেশ প্রভৃতি।
iii. প্রতিনিধিত্বগত: সামরিক শক্তি প্রদর্শন এবং রাজকীয় কর্তৃত্ব পালনের মধ্যে দিয়েই তারা নিজেদেরকে সম্রাটের সফল প্রতিনিধি হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন।
iv. নিয়োগ ও পদচ্যুতিগত: নিয়োগ থেকে শুরু করে পদচ্যুতি পর্যন্ত স্যাট্রাপদের ভাগ্য নির্ভরশীল ছিল সম্রাটের ওপর দায়িত্বে অবহেলা দেখালে তারা সম্রাট কর্তৃক পদচ্যুত হতেন।
[6] স্যাট্রাপগুলির বিদ্রোহ: পরবর্তী সময়ে পারস্যের কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়লে সেই সুযোগে বিভিন্ন পারসিক স্যাট্রাপির শাসক স্যাট্রাপগণ স্বাধীনতাকামী হয়ে ওঠেন। পারসিক সম্রাট দ্বিতীয় ফিলিপ ও তৃতীয় আলেকজান্ডারের শাসনকালে এশিয়া মাইনর ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে স্যাট্রাপগণ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
গঠনকাঠামো
স্যাট্রাপিগুলি মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত ছিল- এগুলি হল—
[1] কেন্দ্রীয় বৃহৎ স্যাট্রাপি: কয়েকটি কেন্দ্রীয় বৃহৎ স্যাট্রাপি ছিল— [i] পারসা/পারসিস, [ii] মাড়া/মিডিয়া, [iii] পাড়া/লিডিয়া, [iv] ব্যাবিরাস/ব্যাবিলনিয়া, [v] মুদ্রায়া/ইজিপ্ট, [vi] আরাকোসিয়া, [vii] ব্যাক্ট্রিস/ব্যাকট্রিয়া ইত্যাদি।
[2] কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্র স্যাট্রাপি: কয়েকটি কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্র স্যাট্রাপি ছিল— পার্থিয়া, আরমেনিয়া, কাপাডোসিয়া, লিভিয়া, আসিরিয়া, নিম্ন ইজিপ্ট, হারভাসিয়া, স্যাট্রাজিডিয়া ইত্যাদি।
[3] প্রাদেশিক ক্ষুদ্র স্যাট্রাপি: কয়েকটি প্রাদেশিক ক্ষুদ্র স্যাট্রাপি ছিল হিরকানিয়া, কোলচিস, সিরিয়া, সিটামিন, আরবেলিটিস, কারিয়া, ফ্রিজিয়া, ওরিটাস্, অ্যারিয়াসপে ইত্যাদি।

সূচনা: ম্যান্ডারিনরা ছিলেন সাম্রাজ্যবাদী চিনের আমলা। চিনা শাসনতন্ত্রে এদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারে তারা সম্রাটের সহযোগী ছিলেন।
চিনের ম্যান্ডারিন ব্যবস্থা
[1] ম্যান্ডারিনদের যোগ্যতা: চিনা উচ্চপদস্থ আমলা অর্থাৎ ম্যান্ডারিনদের বেশ কিছু যোগ্যতার অধিকারী হতে হত।
i. প্রশাসনিক দক্ষতা: ম্যান্ডারিন পদপ্রার্থীকে প্রশাসনের কাজ চালানোর মতো দক্ষতা দেখাতে হত।
ii. শিক্ষাদীক্ষা: নিয়োগের আগে ম্যান্ডারিন পদপ্রার্থীর শিক্ষাদীক্ষ বিচার করা হত।
ii. রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা: প্রার্থী ইতিপূর্বে স্থানীয় বা প্রাদেশিক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কার্যাবলির সঙ্গে যুক্ত থেকে কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন কি না তাও দেখা হত।
iv. ধ্রুপদি চিনের ঐতিহ্যের ধারণা: ম্যান্ডারিন পদপ্রার্থীর ধ্রুপদি চিনের ঐতিহ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার ছিল।
v. অন্যান্য যোগ্যতা : জেলখাটা আসামি, শ্রমিক, অভিনেতা, গায়ক, পাহারাদার, ক্রীতদাস, ভিক্ষুক প্রমুখ ম্যান্ডারিন পদপ্রার্থী হতে পারতেন না।
[2] নিয়োগ ও পদচ্যুতি : ম্যান্ডারিন পদপ্রার্থীদের নিয়োগ করার আগে যোগ্যতা নির্ণায়ক পরীক্ষা নেওয়া হত। এই পরীক্ষায় কনফুসীও আদর্শ, তাওবাদ, সাহিত্য, কাব্য, সাধারণজ্ঞান, রাজনীতি এবং ধ্রুপদি চিনের ঐতিহ্য সম্পর্কে প্রশ্ন রাখা হত। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের প্রথমে স্থানীয়, প্রাদেশিক বা কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ করা হত। সাধারণত ম্যান্ডারিনদের একই জায়গায় দীর্ঘদিন না রেখে বিভিন্ন জায়গায় বদলি করে দেওয়া হত। ম্যান্ডারিনরা তাদের কাজে অবহেলা দেখালে বা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়লে বা সাম্রাজ্য বিরোধী কাজে লিপ্ত হলে প্রমাণ সাপেক্ষে তারা সম্রাট কর্তৃক পদচ্যুত হতেন।
[3] মর্যাদা ও বেশভূষী : চিনের সমাজে উচ্চস্তরের ম্যান্ডারিনগণ যথেষ্ট সম্মানের অধিকারী ছিলেন। বিশেষত চিনের কিং বংশের রাজাদের আমলে চিনের সমাজে রাজপরিবার ও প্রধানমন্ত্রীর পরেই মর্যাদা ভোগ করতেন উচ্চস্তরের ম্যান্ডারিনগগ উচ্চস্তরের ম্যান্ডারিনগণ মূল্যবান ধাতুর অলংকারযুক্ত ও রত্নখচিত পোশাক পরতেন। তারা দামি পদ্মরাগমণিযুক্ত টুপি মাথায় দিতেন।  মধ্য ও নিম্ন স্তরের ম্যান্ডারিনগণও যথেষ্ট ব্যয়বক্কুল জীবন যাপন করতেন। তারাও জমকালো পোশাক পরতেন এবং প্রবাল, লাপিস-গাজুলি, সোনা, রুপা প্রভৃতি রত্নখচিত টুপি মাথায় দিতেন।
[4] অবসান: ঊনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষাধারার অনুপ্রবেশ ঘটলে চিনে ম্যান্ডারিনদের নিয়োগ পরীক্ষা পদ্ধতি তুলে দেওয়া হয় (১৯০৫) খ্রি.)। চিনে কিং রাজবংশের পতন ঘটার (১৯১১ খ্রি.) পর সামগ্রিকভাবে ম্যান্ডারিন ব্যবস্থার অবলুপ্তি ঘটে।
ম্যান্ডারিনদের কার্যাবলি ও গুরূত্ব
[1] কার্যাবলি: চিনের কেন্দ্রীয় সরকারের মুখ্যসচিবালয়ের অধীনে ম্যান্ডারিনদের একাধিক কাজ করতে হত। যেমন—
i. প্রশাসন পরিচালনায় সাহায্য : চিনের ম্যান্ডারিনরা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মেনে যাবতীয় কাজ পরিচালনা করতেন।
ii. রাজকার্যে সাহায্য : সর্বোচ্চ স্তরের ম্যান্ডারিনগণ যেহেতু চিনা সম্রাটের প্রধানমন্ত্রীর সমগোত্রীয় ছিলেন, তাই তাঁরা প্রত্যক্ষভাবে রাজাকে সহায়তা করার সুযোগ পেতেন।
iii. সাম্রাজ্যে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা : মধ্য ও নিম্ন স্তরের ম্যান্ডারিনগণ প্রদেশ বা স্থানীয় অঞ্চলগুলিতে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতেন।
iv. অন্যান্য কাজ : ম্যান্ডারিনরা ব্যাবসাবাণিজ্যে তদারকি করা, আর্থিক ক্ষেত্রে সচলতা রক্ষা করা, সাহিত্য-সংস্কৃতির দিকটি দেখাশোনা করা প্রভৃতি কাজও করতেন।
[2] গুরুত্ব
i. প্রশাসনিক : চিনের প্রশাসনিক সাফল্য ম্যান্ডারিন ব্যবস্থার ওপরে অনেকাংশে নির্ভরশীল ছিল।
ii. সাম্রাজ্যের যুগের স্থায়িত্ব বৃদ্ধিতে : চিনের সাম্রাজ্যের যুগের স্থায়িত্ব বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন ম্যান্ডারিনগণ। খ্রিস্টপূর্ব একবিংশ শতক থেকে সিয়া রাজবংশের মাধ্যমে চিনে যে রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু হয়েছিল তাকে দীর্ঘস্থায়ী করার ক্ষেত্রে পরবর্তীকালে ম্যান্ডারিন ব্যবস্থা বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল।
iii. জেন্ট্রি সম্প্রদায়ের উত্থানে : চিনের সমাজে ম্যান্ডারিনগণ বিশেষ সুবিধাভোগী এবং বিশিষ্ট সম্প্রদায় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। এই ম্যান্ডারিনদের থেকেই পরবর্তীকালে চিনে জেন্ট্রি সম্প্রদায়ের উত্থান ঘটেছিল।

সূচনা: দিল্লির সুলতানি শাসনকালে প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ছিল ইব্রাদারদের দ্বারা পরিচালিত ইক্কা প্রথা। ইক্তা গ্রহণকারীরা মাকৃতি বা ইক্তাদার নামে পরিচিত ছিল।
 ইন্ডা প্রথার বিবরণ
[1] অর্থ: 'ইত্তা' শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হল একটি অংশ বা এলাকা। রাজস্ব ব্যবস্থার বিচারে ‘ইক্তা ’ শব্দের সহজ অর্থ হল ভূমি থেকে উৎপাদিত শস্যের ওপর বিশেষ কোনো ব্যক্তিবর্গকে সরকার কর্তৃক অধিকারদান।
[2] প্রবর্তন: কে. এম. আশরফের ধারণায় সম্ভবত খলিফা মুক্তাদি ইক্তা ব্যবস্থার উদ্ভাবন ঘটান। একাদশ শতকে নিজাম-উল-তুসি নামে এক সেলজুক তুর্কি ঐতিহাসিক তাঁর ‘সিয়াসৎ নামা’ গ্রন্থে ইত্তা প্রথার প্রচলনের কথা উল্লেখ করেন। ভারতে প্রয়োদশ শতকের সূচনা পর্বে দিল্লির সুলতান ইলতুৎমিস ইত্তা প্রথার প্রবর্তন করেন।
[3] উদ্দেশ্য: ইক্তা ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে দিল্লির সুলতানরা কয়েকটি উদ্দেশ্য পূরণ করতে চেয়েছিলেন। যেমন—[i] সুলতানগণ ইত্তা প্রদানের মধ্যে দিয়ে আসলে আমির-ওমরাহদেরই সন্তুষ্ট করতে চেয়েছিলেন। [ii] সুলতানি সাম্রাজ্যসীমা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় দূরবর্তী অঞ্চলগুলির ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং যোগাযোগে অসুবিধা দেখা দেয়। ইক্তাদারদের নিয়োগের মধ্যে দিয়ে এই অসুবিধা দূর করার চেষ্টা শুরু হয়। [iii] নতুন নতুন বিজিত অঞ্চলগুলি থেকে রাজস্ব আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এই অনিশ্চয়তা দূরীকরণের লক্ষ্যে ইত্তাদারদের নিয়োগ করা হয়। [iv] দিল্লি সুলতানিকে সুরক্ষিত ও দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য সামন্ততন্ত্রের ধ্বংসসাধন প্রয়োজন ছিল।
[4] বৈশিষ্ট্য: ‘ইক্তা' ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল –[i] ‘ইত্তা’ গ্রহীতাগণ পরিচিত ছিলেন মাকৃতি বা মুক্তি বা ইন্ডাদার নামে । [ii] ইত্তাদাররা কৃষকদের কাছ থেকে নিয়মিত রাজস্ব আদায় করতেন। [iii] রাজস্ব পরিশোধকারী প্রজাদের জীবন, সম্পত্তি ও পরিবারের ওপর ইন্ডাদারদের কোনো অধিকার ছিল না।

[iv] ইক্তাদারদের নিজস্ব সেনাবাহিনী রাখতে হত। প্রয়োজনে সুলতানকে সেই সেনা সরবরাহ করতে হত।
ইন্ডা প্রথার বিবর্তন ও ফলাফল
[1] বিবর্তন
i. ইলতুৎমিসের আমলে: ইত্তা প্রথা প্রবর্তনের পর সুলতান ইলতুৎমিস তাকে এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে উদ্যোগী হন। কোনো ইক্তার ওপর বংশানুক্রমিক অধিকার যাতে গড়ে না ওঠে, তার জন্য তিনি ইন্ডাদারদের বদলির নীতি নেন।
ii. বলবনের আমলে: যে সমস্ত ইত্তাদার ভাতা ও জমি ভোগদখল করলেও প্রয়োজেনের সময় সামরিক সাহায্য দিতেন না, বলবন তাদের তালিকা তৈরি করান। ইত্তাদাররা যাতে সুলতানের প্রাপ্য রাজস্ব ফাঁকি দিতে না পারে, তার জন্য বলবন প্রতিটি ইক্তায় ‘খোয়াজা' নামে এক ধরনের হিসাবপরীক্ষক নিয়োগ করেন।
iii. আলাউদ্দিন খলজির আমলে: আলাউদ্দিন খলজি সেনাদের ইক্তাদানের পরিবর্তে নগদ বেতনদানের প্রথা চালু করেন।
iv. ফিরোজশাহ তুঘলকের আমলে: ফিরোজশাহ তুঘলক ব্যাপকভাবে ইত্তা বিতরণ করলে খালিসা জমির পরিমাণ কমে। তিনি ইত্তা ব্যবস্থাকে বংশানুক্রমিক করে দেন। সেনাদলকে নগদ বেতনের পরিবর্তে ইক্তাদানের রীতি পুনঃপ্রবর্তিত হয়।
[2] ফলাফল : ইক্তা প্রথা প্রবর্তনের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী।
i. শহরের শ্রীবৃদ্ধি: ইত্তাদারদের অনেকেই তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ শহরে ব্যাবসাবাণিজ্যে বিনিয়োগ করত। ব্যাবসাবাণিজ্যের সুবাদে শহরের অর্থনীতি সুদৃঢ় হলে, শহরগুলির শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে থাকে।
ii. কৃষক শ্রেণির দুর্দশা বৃদ্ধি: অনেকসময় অতিরিক্ত অর্থের লোভে ইত্তাদাররা নিজের নির্দিষ্ট ইত্তাটি অপরকে ইজারা দিত। ইজারাদাররা অধিক মুনাফার লক্ষ্যে কৃষক সমাজের ওপর আর্থিক শোষণ চালাত।
iii. পূর্ববর্তী শাসকদের মর্যাদা হ্রাস: ইক্তা ব্যবস্থা পূর্ববর্তী গ্রামীণ শাসকশ্রেণির সামাজিক মর্যাদা হ্রাস করে। তাই গ্রামের নিম্নতর অভিজাতরা কৃষক বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেয়।

সূচনা: আকবর মোগল প্রশাসনের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে তিনি ভারতে প্রথম মনসবদারি প্রথা চালু করেন (১৫৫৭ খ্রি.)। সামরিক- অসামরিক যে-কোনো কর্মচারী মনসবদার হতে পারতেন।
মনসবদারি ব্যবস্থা
[1] অর্থ: ‘মনসব' কথাটির আক্ষরিক অর্থ ‘পদমর্যাদা’, মতভেদে উচ্চপদ বা অবস্থান। এই অর্থে মনসবদার
হলেন প্রশাসনের উচ্চপদাধিকারী। মোগল যুগে ‘মনসব’ শব্দটি একটি পদকে বোঝাত। ধীরে ধীরে এই পদের সঙ্গে দায়িত্ব, মর্যাদা প্রভৃতি যোগ হয়।
[2] প্রেক্ষাপট: আকবরের আগে পর্যন্ত মোগল প্রশাসনের সামরিক, বেসামরিক সমস্ত উচ্চপদস্থ কর্মচারীকে বেতনের বদলে জায়গির প্রদান করা হত। কিন্তু ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থায় নানা দুর্নীতির অনুপ্রবেশ ঘটলে
নতুন এক প্রথা প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। অপরদিকে যথেষ্ট হারে জায়গির বিতরণ করায় ‘খালিসা’ জমির পরিমাণ কমে যায়। এই প্রেক্ষাপটে প্রবর্তিত হয় মনসবদারি প্রথা।
[3] বিভিন্ন স্তর: আবুল ফজল তাঁর ‘আইন-ই-আকবরী' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, আকবর মনসবদারদের ৬৬টি Rank বা পদমর্যাদার স্তর ধার্য করেন সর্বনিম্ন স্তরে ছিল ১০ জন অশ্বারোহী সেনাবিশিষ্ট সনাপতি এবং সর্বোচ্চ স্তরে ছিল ১০ হাজার অশ্বারোহী সেনাবিশিষ্ট সেনাপতি।তবে আবুল ফজলের ধারণায় কাগজে কলমে ৬৬টি স্তর দেখানো হলেও প্রকৃত অর্থে মনসবদারি ব্যবস্থায় ৩৩টি স্তর ছিল বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন।
[4] বেতন: মোগল যুগে মনসবদারদের বেতন খুব একটা কম ছিল না। স্তরভিত্তিক মনসবদারগণ বেতন পেতেন। মনসবদারদের যা বেতন দেওয়া হত, সমস্ত খরচ মেটানোর পরেও তাদের হাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে টাকা
অবশিষ্ট থাকত।
[5] জাঠ ও সওয়ার: মনসবদার নামকরণের সঙ্গে জাঠ ও সওয়ার নামে দুটি পদ যুক্ত ছিল। এই দুই পদের স্বরূপ ও অর্থ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবু বলা হয় যে, জাঠ হল মনসবদারের ব্যক্তিগত পদমর্যাদা ও তার প্রাপ্ত
বেতনের পরিচয়। আর সওয়ার হল মনসবদারের অধীনস্থ সেনার পরিচয়। আকবর তাঁর রাজত্বকালের ৪০তম বর্ষে (১৫৯৫-৯৬ খ্রি.) জাঠ ও সওয়ার পদ দুটি চালু করেন।
[6] মনসবদারি প্রথার ফলাফল : [i] আকবর ও তাঁর পরবর্তী সম্রাটগণ মনসবদারি প্রথার সাহায্যে এক বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। [ii] মনসবদার পদ এবং এর সঙ্গে যুক্ত জায়গির বংশানুক্রমিক না হওয়ায় মোগল যুগে সামন্তপ্রথার উদ্ভব ঘটেনি। [iii] মনসবদারি প্রথার ফলেই মোগল প্রশাসনে বিদেশি অভিজাত শ্রেণি,
যথা— উজবেগি, আফগানি, তুরানি, ইরানি, এদের প্রাধান্য খর্ব হয়। [iv] মনসবদারি প্রথার ফলে মোগল রাজতন্ত্র শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
[7] ত্রুটি: মনসবদারি প্রথা ত্রুটিমুক্ত ছিল না। [i] মনসবদারি প্রথা ছিল এক জটিল ও অস্থায়ী পদ্ধতি। সময়ের সাথে সাথে এই প্রথার মধ্যে প্রশাসনিক জটিলতা বাড়তে থাকে। [ii] বেশিরভাগ মনসবদারদের অধীনস্থ সেনারা ছিল অদক্ষ ও অযোগ্য। [iii] বহু ক্ষেত্রে মনসবদারদের অধীনস্থ সেনাদের সঙ্গে সম্রাটের তরফে কোনো যোগসূত্র না থাকায়, তাদের মধ্যে সম্রাট বা মোগল সাম্রাজ্যের প্রতি কোনো আনুগত্য গড়ে ওঠেনি। এজন্য ঐতিহাসিক উইলিয়াম আরভিন বলেছেন—“মোগল সামরিক ব্যবস্থার মধ্যেই মোগলদের ধ্বংসের বীজ লুকিয়েছিল।”
উপসংহার: আকবর প্রবর্তিত মনসবদারি প্রথা ছিল সম্পূর্ণ নতুনভাবে উপস্থাপিত পুরানো একটি প্রথা। আকবরের নিজ দক্ষতা গুণে এই প্রথায় সম্মিলিতভাবে সেনানায়ক, অভিজাতশ্রেণি ও আমলা সম্প্রদায় রাষ্ট্রের
সেবায় নিয়োজিত ছিল।

সূচনা: পারস্যের আকিমেনীয় সাম্রাজ্য বৃহৎ ও ক্ষুদ্র কয়েকটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল যেগুলির নাম ছিল স্যাট্রাপি। স্যাট্রাপিগুলির শাসনকর্তা ছিলেন স্যাট্রাপ, যারা রাজার কাছে প্রত্যক্ষভাবে দায়বদ্ধ ছিলেন।
স্যাট্রাপদের পরিচয়
[1] অর্থ: প্রাচীন পারসিক অর্থে স্যাট্রাপ বলতে সাম্রাজ্যের রক্ষাকর্তাকে বোঝাত। এক কথায় আকিমেনীয় সাম্রাজ্যের একটি প্রশাসনিক বিভাগ ছিল স্যাট্রাপি আর এই বিভাগের প্রধান ছিলেন স্যাট্রাপ।
[2] উৎস: 'Satrap' শব্দটির উদ্ভব ঘটেছে গ্রিক শব্দ 'Satrapeia' থেকে Satrapy শব্দটির আভিধানিক অর্থ হল প্রাচীন পারস্যের প্রদেশ। আর Satrap শব্দের আভিধানিক অর্থ হল প্রাচীন পারস্যের প্রাদেশিক শাসনকর্তা।
[3] আত্মপ্রকাশ: বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত আকিমেনীয় সাম্রাজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করার প্রয়োজনীয়তা থেকেই পারসিক সম্রাট কাইরাস আনুমানিক ৫৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পারস্যের আকিমেনীয় সাম্রাজ্যে প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা চালু করেন। ফলে প্রদেশ বা সাট্র্যাপিগুলিতে স্যাটাপদের নিয়োগ করা শুরু হয়।
[4] কার্যাবলি: স্যাট্রাপির প্রধান শাসনকর্তা হিসেবে স্যাট্রাপদের বেশকিছু কাজ করতে হত। যেমন-
i. কর আদায় ও জমা: ট্যাক্স আদায় করা ও তা সরকারি কোণাগারে জমা দেওয়া।
ii. সেনা নিয়োগ : যুদ্ধে পারদর্শী ব্যক্তিকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা।
iii. আমলা নিয়োগ : আঞ্চলিক প্রশাসনিক স্তরে আমলাদের নিয়োগ করা।
iv. বিদ্রোহ দমন: অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহগুলির অবসান ঘটানো।
v. সমস্যার মোকাবিলা: প্রদেশগুলির বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বা নানাবিধ সমস্যার মোকাবিলা কর।
vi. বৈদেশিক আক্রমণ রোধ: বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিরোধ করা।
vii. সমরবাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণ : সামরিক শক্তির রক্ষণাবেক্ষণ করা।
viii. বিচারকাজ : স্যাট্রাপ ছিলেন প্রদেশের বিচার বিভাগের প্রধান। পৌর এবং ফৌজদারি অপরাধের তিনি বিচার করতেন।
ix. বাৎসরিক খতিয়ান পেশ: সঠিক সময়ে খতিয়ান পেশ-এ ব্যর্থ হলে স্যাট্রাপদের মহান রাজা প্রথমে সতর্ক করতেন এবং পরে তার পদ কেড়ে নিতেন।

সূচনা: ম্যান্ডারিনরা ছিলেন সাম্রাজ্যবাদী চিনের আমলা। চিনা শাসনতন্ত্রে এদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারে তারা সম্রাটের সহযোগী ছিলেন।
চিনের ম্যান্ডারিন ব্যবস্থা
[1] ম্যান্ডারিনদের যোগ্যতা: চিনা উচ্চপদস্থ আমলা অর্থাৎ ম্যান্ডারিনদের বেশ কিছু যোগ্যতার অধিকারী হতে হত।
i. প্রশাসনিক দক্ষতা: ম্যান্ডারিন পদপ্রার্থীকে প্রশাসনের কাজ চালানোর মতো দক্ষতা দেখাতে হত।
ii. শিক্ষাদীক্ষা: নিয়োগের আগে ম্যান্ডারিন পদপ্রার্থীর শিক্ষাদীক্ষ বিচার করা হত।
ii. রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা: প্রার্থী ইতিপূর্বে স্থানীয় বা প্রাদেশিক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কার্যাবলির সঙ্গে যুক্ত থেকে কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন কি না তাও দেখা হত।
iv. ধ্রুপদি চিনের ঐতিহ্যের ধারণা: ম্যান্ডারিন পদপ্রার্থীর ধ্রুপদি চিনের ঐতিহ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার ছিল।
v. অন্যান্য যোগ্যতা : জেলখাটা আসামি, শ্রমিক, অভিনেতা, গায়ক, পাহারাদার, ক্রীতদাস, ভিক্ষুক প্রমুখ ম্যান্ডারিন পদপ্রার্থী হতে পারতেন না।
[2] নিয়োগ ও পদচ্যুতি : ম্যান্ডারিন পদপ্রার্থীদের নিয়োগ করার আগে যোগ্যতা নির্ণায়ক পরীক্ষা নেওয়া হত। এই পরীক্ষায় কনফুসীও আদর্শ, তাওবাদ, সাহিত্য, কাব্য, সাধারণজ্ঞান, রাজনীতি এবং ধ্রুপদি চিনের ঐতিহ্য সম্পর্কে প্রশ্ন রাখা হত। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের প্রথমে স্থানীয়, প্রাদেশিক বা কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ করা হত। সাধারণত ম্যান্ডারিনদের একই জায়গায় দীর্ঘদিন না রেখে বিভিন্ন জায়গায় বদলি করে দেওয়া হত। ম্যান্ডারিনরা তাদের কাজে অবহেলা দেখালে বা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়লে বা সাম্রাজ্য বিরোধী কাজে লিপ্ত হলে প্রমাণ সাপেক্ষে তারা সম্রাট কর্তৃক পদচ্যুত হতেন।
[3] মর্যাদা ও বেশভূষী : চিনের সমাজে উচ্চস্তরের ম্যান্ডারিনগণ যথেষ্ট সম্মানের অধিকারী ছিলেন। বিশেষত চিনের কিং বংশের রাজাদের আমলে চিনের সমাজে রাজপরিবার ও প্রধানমন্ত্রীর পরেই মর্যাদা ভোগ করতেন উচ্চস্তরের ম্যান্ডারিনগগ উচ্চস্তরের ম্যান্ডারিনগণ মূল্যবান ধাতুর অলংকারযুক্ত ও রত্নখচিত পোশাক পরতেন। তারা দামি পদ্মরাগমণিযুক্ত টুপি মাথায় দিতেন।  মধ্য ও নিম্ন স্তরের ম্যান্ডারিনগণও যথেষ্ট ব্যয়বক্কুল জীবন যাপন করতেন। তারাও জমকালো পোশাক পরতেন এবং প্রবাল, লাপিস-গাজুলি, সোনা, রুপা প্রভৃতি রত্নখচিত টুপি মাথায় দিতেন।
[4] অবসান: ঊনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষাধারার অনুপ্রবেশ ঘটলে চিনে ম্যান্ডারিনদের নিয়োগ পরীক্ষা পদ্ধতি তুলে দেওয়া হয় (১৯০৫) খ্রি.)। চিনে কিং রাজবংশের পতন ঘটার (১৯১১ খ্রি.) পর সামগ্রিকভাবে ম্যান্ডারিন ব্যবস্থার অবলুপ্তি ঘটে।

 

No Content