Chapter-4.4⇒সমুদ্রস্রোত

সমুদ্রস্রোত দুই প্রকার। যথা—উয় স্রোত ও শীতল স্রোত

দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত ব্রাজিলের অন্তরীপ কেপ ডি সাও রোক-এ বাধা পেয়ে ব্রাজিলের পূর্ব উপকূল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে উন্ন ব্রাজিল স্রোতের সৃষ্টি করে। এই স্রোত দক্ষিণে শীতল কুমেরু স্রোতের সাথে মিলিত হয়।

সমুদ্র উপকূলের মহীসোপানে হিমশৈল গলিত পদার্থ সঞ্চিত হয়ে যে অগভীর চড়ার সৃষ্টি হয় তাকে মগ্নচড়া বলে।

দুটি বিপরীত ভৌত গুণাগুণসম্পন্ন সমুদ্রস্রোত মিলিত হয়ে, মিলন সীমান্ত বরাবর যে সুস্পষ্ট সীমারেখা সৃষ্টি করে তাকে হিমপ্রাচীর বলে।

মৌসুমি স্রোত মৌসুমি বায়ু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

উষ্ণ স্রোত ও শীতল স্রোতের মিলনস্থলে মৎস্যক্ষেত্র গড়ে ওঠার দুটি কারণ হল—প্ল্যাঙ্কটন ও মগ্নচড়ার উপস্থিতি।

শীতল ল্যাব্রাডর ও উয় উপসাগরীয় স্রোতের সংযোগস্থলে গ্র্যান্ড ব্যাংক নামক মৎস্যচারণ ক্ষেত্র গড়ে উঠেছে।

সমুদ্রের ওপর অংশ দিয়ে প্রবাহিত উন্ন স্রোতকে বহিঃস্রোত বলে।

কানাডা ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বভাগের উপকূল বরাবর উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে উয় উপসাগরীয় স্রোত ও শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের মিলন ে হিমপ্রাচীরের সৃষ্টি হয়েছে।

উন্ন উত্তর আটলান্টিক স্রোতের প্রভাবে ব্রিটিশ  অধিকাংশ বন্দর সারাবছর বরফমুক্ত থাকে।

উষ্ণ কুরোশিয়া স্রোত ও শীতল কিউরাইল মোরে মিলনে জাপান উপকূলে মৎস্যক্ষেত্র গড়ে উঠেছে।

উন্ন উপসাগরীয় স্রোত পৃথিবীর আবর্তন গতীর গুপ্তহে ডানদিকে বেঁকে উত্তর আটলান্টিক থ্রোতের উৎপত্তি ঘটা।

উষ্ণ প্রশান্ত মহাসাগরের বিভিন্ন উন্ন স্রোতের নাম হল—পূর্ব অস্ট্রেলীয় স্রোত, উত্তর ও দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত, নিরক্ষীয়। প্রতিস্রোত, কুরোশিয়ো স্রোত, উত্তর প্রশান্ত মহাসা স্রোত, আলাস্কা স্রোত প্রভৃতি।

প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবাহিত বিভিন্ন শীতল স্রোতগুলি হল—কুমেরু স্রোত, হামবোল্ড স্রোত, ক্যালিফোর্নিয়া স্রোত, বেরিং স্রোত, কামচাটকা স্রোত প্রভৃতি।

ভারত মহাসাগরীয় উন্ন স্রোতগুলির নাম হল—উত্তর ও দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত, নিরক্ষীয় প্রতিস্রোত, মাদাগাস্কার স্রোত, আগুলহাস স্রোত, সোমালি স্রোত প্রভৃতি।

ভারত মহাসাগরীয় দুটি শীতল স্রোত হল—কুমেরু স্রোত ও পশ্চিম অস্ট্রেলীয় স্রোত।

 

উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্রোতের দক্ষিণমুখী শা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলের পাশ দিয়ে শীতল ক্যালিফোর্নিয়া প্রোত নামে প্রবাহিত হয়। এই ফোন উম্ন উত্তর নিরক্ষীয় স্রোতের সঙ্গে মিলিত হয়।

উত্তর নিরক্ষীয়স্রোত , উপসাগরীয় স্রোত এবং ক্যারি স্রোত মিলিত হয়ে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে শৈবাল সাগরের সৃষ্টি হয়েছে।

দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের শীতল কুমের স্রোতটি দুই ভাগে বিভক্ত। যথা—ফকল্যান্ড স্রোত ও দক্ষিণ আটলান্টিক স্রোত।

ঋতুপরিবর্তনের সাথে সাথে ভারত মহাসাগরের মৌসুমি স্রোতের অভিমুখ পরিবর্তিত হয়।

উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোত ও শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের মিলনের ফলে নিউফাউন্ডল্যান্ডের কাছে ঘন কুয়াশা ও ঘূর্ণিঝঝড়ের সৃষ্ট হয়।

পিকনোক্সাইন স্তর দিয়ে শীতল ও গভীর সমুদ্রস্রোত প্রবাহিত হয়।

উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে শৈবাল সাগর সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণত তিনটি স্রোতের মিলিত প্রভাবে, যথা—উন্ন উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত, উয় উপসাগরীয় স্রোত ও শীতল ক্যানারি স্রোত।

বেঙ্গুয়েলা স্রোত মহাসাগরে দেখা যায়।

সমুষস্রোতের মাধ্যমে প্রবাহিত প্রবাহিত জলের পরিমাণ সেন্ডেয়ারড্রোপ (Sverdrup)-এর সাহায্যে পরিমাপ করা।

সমুদ্রস্রোতের দুটি সুবিধা হল- (i) সমুদ্রস্রোতের ফলে নৌ-চলাচলের সুবিধা হয়, (ii) উন্ন ও শীতল সমুদ্রস্রোতের মিলনস্থলে মাছের খাদ্য প্লাঙ্কটন প্রচুর পরিমাণে জন্মায় বলে মৎস্যক্ষেত্র গড়ে ওঠে।

সমুদ্রস্রোতের দুটি অসুবিধা হল — (1) উষ্ম ও শীতল স্রোতের মিলনস্থলে উন্নতার পার্থক্যের জন্য ঘন কুয়াশা ও প্রবল ঝড়ঝঙ্কার সৃষ্টি হয়। এর ফলে জাহাজ বা বিমান চলাচলে অসুবিধা হয়। এ ছাড়া, (ii) শীতল সমুদ্রস্রোতের সঙ্গে হিমশৈল ভেসে আসে বলে জাহাজ চলাচলে বাধার সৃষ্টি হয়।

সমুদ্রস্রোতের নিয়ন্ত্রকগুলি হল—পৃথিবীর আবর্তন গতি, বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রজলের লবণতা, ঘনত্ব ও উন্নতা।

দুটি মগ্নচড়ার উদাহরণ হল—নিউফাউন্ডল্যান্ডের কাছে গ্র্যান্ড ব্যাংক এবং ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের সমুদ্রবক্ষে ডগার্স ব্যাংক।

উন্ন কুরোশিয়ো স্রোত ও শীতল বেরিং স্রোতের মিলনের ফলে জাপান উপকূলে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়।

উপসাগরীয় স্রোতের উত্তর-পূর্বমুখী উন্ন শাখা ইরমিঙ্গার স্রোত নামে প্রবাহিত হয়।

বায়ু সমুদ্রের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় সমুদ্রের উপরিপৃষ্ঠের জলরাশিকে নিজের গতিপথের দিকে চালিত করে। এর ফলে জলরাশি বায়ুপ্রবাহের দ্বারা প্রভাবিত হয় ও সমুদ্রস্রোত সৃষ্টি করে।

পৃথিবীর আবর্তন গতির ফলে সমুদ্রস্রোত সোজাপথে প্রবাহিত হতে পারে না। ফেরেলের সূত্রানুসারে, উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে যায়।

জায়র বা চক্রগতির প্রকারভেদ দুটি হল – (i) উপক্রান্তীয় চক্রগতি (I) উপমেরুদেশীয় চক্রগতি।

প্রতিটি মহাসাগরের সমুদ্রস্রোতগুলির গতিপথ অনুসরণ করলে সমুদ্রের জলরাশির যে চক্রাকার গতি দেখা যায় তাই জায়র বা চক্রগতি।

ভারত মহাসাগরের উন্ন দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত বিভক্ত হয়ে মোজাম্বিক, মাদাগাস্কার এবং আগুলহাস স্রোতের উৎপত্তি হয়।

আগুলহাস স্রোতটি আরও দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে শীতল কুমেরু স্রোতের সাথে মিলিত হয়।

উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের বিশেষ কিছু উন্ন স্রোত হল—উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত, ক্যারিবিয়ান স্রোত, উপসাগরীয় স্রোত, ইরমিঙ্গার স্রোত, উত্তর আটলান্টিক স্রোত, নরওয়ে স্রোত প্রভৃতি।

দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের বিশেষ কিছু উন্ন স্রোত হল—দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত, ব্রাজিল স্রোত, গিনি স্রোত প্রভৃতি।

উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের শীতল স্রোতগুলি হল—ল্যাব্রাডর স্রোত, পূর্ব গ্রিনল্যান্ড স্রোত, ক্যানারি স্রোত, সুমেরু স্রোত প্রভৃতি।

দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে প্রবাহিত শীতল স্রোতগুলি। হল—কুমেরু স্রোত, বেগুয়েলা স্রোত, ফকল্যান্ড স্রোত প্রভৃতি।

অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূল দিয়ে উত্তরদিকে প্রবাহিত শীতল স্রোতটি হল পশ্চিম অস্ট্রেলীয় স্রোত।

উত্তর ও দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতের মাঝখান দিয়ে নিরক্ষীয় প্রতিস্রোত বা নিরক্ষীয় বিপরীত স্রোত প্রবাহিত হয়।

 

উম্ন নিরক্ষীয় স্রোতের বিস্তৃতি উভয় গোলার্ধে প্রায় থেকে 20° অক্ষাংশ পর্যন্ত।

সমুদ্রস্রোত সমুদ্রতরঙ্গের প্রধান পার্থক্য হল—সমুদ্রস্রোতের ক্ষেত্রে সমুদ্রের জলরাশির অনুভূমিক স্থানান্তর ঘটে। অপরদিকে, সমুদ্রতরঙ্গের ক্ষেত্রে সমুদ্রের জলরাশির উল্লম্বভাবে ওঠা-নামা হয়।

জাপান বা কুরোশিয়ো স্রোতের প্রভাবে জাপানের পূর্ব উপকূলের উন্নতা বৃদ্ধি পায়।

আয়ন বায়ুর প্রভাবে সমুদ্রস্রোত পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে যায়।

পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে সমুদ্রস্রোত পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে যায়।

নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের উয় জল হালকা বলে বহিঃস্রোতরূপে শীতল মেরু অঞ্চলের দিয়ে যায় এবং জলের ওই শূন্যতা পূরণের জন্য মেরু অঞ্চলের শীতল ও ভারী জল অন্তঃস্রোতরূপে নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়।

সমুদ্রস্রোত

পৃথিবীর আবর্তন গতি, বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রজলের লবণতা, ঘনত্ব ও তার তারতম্যের জন্য সমুদ্রের কয়েকটি নির্দিষ্ট অংশের জল প্রতিনিয়ত নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত হয়। সমুদ্রজলের এই অনুভূমিক প্রবাহ বা গতিকেই সমুদ্রস্রোত বলে।

সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির কারণ

সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির উল্লেখযোগ্য কারণগুলি হল

1. বায়ুপ্রবাহ: নিয়ত বায়ুপ্রবাহগুলি সমুদ্রের ওপর দিয়ে। প্রবাহিত হওয়ার সময় সমুদ্রের ওপরের জলরাশিকে নিজের প্রবাহের দিকে চালিত করে। এইভাবে বায়ুপ্রবাহ সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি করে। যেমন— যেসব স্থানে আয়ন বায়ু প্রবাহিত হয়, সেখানে পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে সমুদ্রস্রোত আসে। আবার, যেসব স্থানে পশ্চিমা বায়ু প্রবাহিত হয়, সেখানে সমুদ্রস্রোত পশ্চিমদিক থেকে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়।

2. সমুদ্রজলে উচ্চতার তারতম্য: নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলে বেশি উন্নতার জন্য সমুদ্রজল বেশি উয় হয় এবং বাষ্পীভবন বেশি হয়। এ ছাড়া, এই উন্ন জল হালকা বলে সমুদ্রের ওপরের অংশ দিয়ে পৃষ্ঠস্রোত বা বহিঃস্রোতরূপে শীতল মেরু অঞ্চলের দিকে বয়ে যায়। জলের এই শূন্যতা পূরণের জন্য তখন মেরু অঞ্চলের শীতল ও ভারী জল সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অন্যদের দিকে অন্তঃস্রোতরূপে বয়ে যায়।

3. সমুদ্রজলে লবণতার তারতম্য: সমুদ্রজলে লবণতার পরিমাণ কোথাও বেশি, আবার কোথাও কম। কম লবণাক্ত জল হালকা বলে সমুদ্রের ওপরের অংশ দিয়ে পৃষ্ঠস্রোত বা বহিঃস্রোতরূপে বেশি লবণাক্ত ভারী জলের দিকে বয়ে যায়। মনের এই শূন্যতা পুরণ করার জন্য তখন বেশি লবণাক্ত ভারী জল সমুদ্রের নিম্নাংশ দিয়ে অন্তঃস্রোতরূপে ওই কম লবণাক্ত হালকা জলের দিকে বয়ে যায়। এইভাবে লবণতার তারতম্যের হ্য সমুদ্রস্রোতের উৎপত্তি হয়।

4. পৃথিবীর আবর্তন গতি: পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য হিংস্রোত সোজাপথে প্রবাহিত হতে পারে না। ফেরেলের ত্রানুসারে, উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে । দিদিকে বেঁকে যায়। এভাবে নতুন সমুদ্রস্রোতের উৎপত্তি হয়। দাহরণ : উপসাগরীয় স্রোত আবর্তন গতির প্রভাবে ডানদিকে। কে উত্তর আটলান্টিক স্রোতের উৎপত্তি ঘটায়।

5. মহাদেশসমূহের অবস্থান ও আকৃতি: প্রবহমান সমুদ্রস্রোত দেশের যে প্রান্তে বা দ্বীপপুঞ্জে বাধা পায়, সেখানকার গঠন বা আকৃতি অনুসারে সমুদ্রস্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হয় বা বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়। এভাবেও নতুন নতুন সমুদ্রস্রোতের উৎপত্তি ঘটে।

উদাহরণ : আটলান্টিক মহাসাগরে দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত ব্রাজিলের অন্তরীপ কেপ ডি সাও রোক-এ বাধা পেয়ে ব্রাজিল স্রোত নামে একটি নতুন স্রোতের উৎপত্তি ঘটায় ।

6. বরফের গলন: সমুদ্রে বরফ যেখানে গলে যায়, সেখানে জলরাশির পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধি পায় এবং ওই জলরাশি স্বল্প জলরাশি সমন্বিত অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়, ফলে সমুদ্রস্রোতের উৎপত্তি ঘটে।

7. সামুদ্রিক শৈলশিরার উপস্থিতি: সমুদ্রস্রোতের গতিপথে সামুদ্রিক শৈলশিরা থাকলে তাতে স্রোত প্রতিহত হয়ে তার গতিবিক্ষেপ বা দিক পরিবর্তন হয়।

৪. অভিকর্ষজ বল : পৃথিবীর অভিগত গোলাকৃতির জন্য (দুই মেরু চাপা এবং মধ্যভাগ বা নিরক্ষীয় অঞ্চল স্ফীত) মেরু অঞ্চলের অভিকর্ষ বলের মান নিরক্ষীয় অঞ্চলের চেয়ে বেশি। ফলে দেখা যায় অভিকর্ষ বলের উপাংশ সমুদ্রস্রোতকে নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে চালিত করে।

9 . বায়ুচাপের তারতম্য: যেখানে বায়ুর চাপ বেশি সেখানে জলতল কিছুটা নীচে থাকে এবং যেখানে বায়ুর চাপ কম সেখানে

জলতল তুলনামূলকভাবে উঁচুতে থাকে। ফলে উচ্চ জলতল থেকে নিম্ন জলতলের দিকে বায়ুচাপের ঢাল অনুযায়ী সমুদ্রস্রোতের সঞ্চালন হয়।

10. অধঃক্ষেপণ : সমুদ্রে যেখানে অধঃক্ষেপণের পরিমাণ বেশি সেখানে জলের লবণতা কম হবে ও জলের ঘনত্বও কমে যাবে। ঘনত্ব কম হলে জলতল উচ্চ হবে। ফলে সেইদিক থেকে সমুদ্রস্রোত নিম্ন জলতলের দিকে সঞ্চালিত হয়।

ল্যাব্রাডর স্রোত

সুমেরু মহাসাগর থেকে মেরু বায়ুর প্রভাবে যে শীতল স্রোতটি 3 গ্রিনল্যান্ডের মধ্যভাগ দিয়ে) দক্ষিণদিকে এগিয়ে আসে এবং গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণে এসে ল্যাব্রাডর উপদ্বীপের পূর্ব উপকূল দিয়ে আরও দক্ষিণে প্রবাহিত হয়, সেই স্রোতকেই বলা হয় ল্যাব্রাডর স্রোত।

বৈশিষ্ট্য

1.প্রকৃতি: এটি প্রকৃতিতে শীতল স্রোত এবং অন্তঃস্রোত রূপে প্রবাহিত হয়।
2. বর্ণ: এটি গাঢ় সবুজ বর্ণের হয়।
3. উৎপত্তি: সুমেরু মহাসাগর থেকে এই শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের উৎপত্তি হয়।
4. প্রবাহপথ: সুমেরু মহাসাগর থেকে উৎপন্ন একটি শীতল স্রোত গ্রিনল্যান্ডের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূল দিয়ে ল্যাব্রাডর দ্বীপের কাছে মিলিত হয়।
5.প্রভাব: (i) এটি নিউফাউন্ডল্যান্ডের নিকট উন্ন

উপসাগরীয় স্রোতের সঙ্গে মিলিত হয়ে ঘন কুয়াশা ও ঝড়ঝঞ্ঝা সৃষ্টি করে। (ii) দক্ষিণমুখী শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত উত্তরমুখী উয় উপসাগরীয় স্রোতের সঙ্গে যেখানে মিলিত হয়, সেখানে এক সুস্পষ্ট বিভাজন রেখা তৈরি করে। এই বিভাজন রেখাকে হিমপ্রাচীর বলে। (iii) শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত যে হিমশৈলগুলিকে সুমেরু মহাসাগর থেকে দক্ষিণে বয়ে নিয়ে আসে, সেগুলি উয় উপসাগরীয় স্রোতের প্রভাবে গলে যায় ও তার নুড়ি, বালি, পাথর সমুদ্রগর্ভে সঞ্চিত হয়৷ এভাবে ক্রমশ মগ্নচড়ার সৃষ্টি হয়। নিউফাউন্ডল্যান্ডের গ্র্যান্ড ব্যাংক। যেমন—

জায়র

প্রতিটি মহাসাগরেই সমুদ্রস্রোতগুলির গতিপথ অনুসরণ করলে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। এই বৈশিষ্ট্যটিই হল জায়র

নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূল মৎস্যক্ষেত্রের জন্য বিখ্যাত হওয়ার কারণ

কানাডার পূর্ব উপকূলের অদুরে নিউফাউন্ডল্যান্ড দ্বীপ অবস্থিত। এই দ্বীপটির পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে দুটি বিপরীতধর্মী স্রোত-শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত ও উয় উপসাগরীয় স্রোত। এই দুই স্রোতের মিলনের ফলে নিউফাউন্ডল্যান্ডের কাছে আটলান্টিক মহাসাগরের অগভীর অংশে সৃষ্টি হয়েছে গ্র্যান্ড ব্যাংক নামে একটি বিশাল ম্যাচড়া, যা মৎস্যচাষের জন্য বিখ্যাত। এই মাচড়া মৎস্যক্ষেত্র হিসাবে বিখ্যাত হওয়ার কারণগুলি হল——

1● গ্র্যান্ড ব্যাংক মগ্নচড়াটির ক্ষেত্রফল প্রায় 96,000 বর্গকিমি এবং এখানে জলের গভীরতা 90 মিটারের কম।
2. নাতিশীতোয়মণ্ডলে অবস্থিত হওয়ার এখানে মাছের বসবাসের উপযোগী অনুকূল তাপমাত্রা পাওয়া যায়।
3. উয় ও শীতল স্রোতের মিলনের ফলে এখানে মাছের খাদ্য প্ল্যাঙ্কটনও প্রচুর পরিমাণে জন্মায়।
4.• গ্র্যান্ড ব্যাংককে কেন্দ্র করে নিউফাউন্ডল্যান্ডের উপকূলে বিভিন্নপ্রকার সামুদ্রিক মাছ (যেমন—কড, হেরিং, ম্যাকারেল, হ্যাডক, হ্যালিবাট প্রভৃতি) ভিড় করে। এর ফলে সমগ্র এলাকাটি মৎস্যক্ষেত্র হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

উপকূলীয় অঞ্চলে উয় ও শীতল স্রোতের প্রভাব

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সৃষ্টি: সাধারণত যেসব অঞ্চলে উষ্ণ ও শীতল স্রোতের মিলন ঘটে, সেখানে উয়তার পার্থক্যের জন্য ঘন কুয়াশা এবং প্রবল ঝড়ঝঞ্ঝা হয়। ফলে জাহাজ বা বিমান চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি হয়। যেমন— নিউফাউন্ডল্যান্ড সংলগ্ন সমুদ্র।

মগ্নচড়ার সৃষ্টি: শীতল স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা হিমশৈল উয় স্রোতের সংস্পর্শে এলে গলে যায়। ফলে হিমশৈলের মধ্যে থাকা পাথর, নুড়ি, বালি প্রভৃতি সমুদ্রবক্ষে দীর্ঘকাল ধরে জমতে জমতে উঁচু হয়ে মগ্নচড়ার সৃষ্টি করে। যেমন—নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলের অদূরে গ্র্যান্ড ব্যাংক সৃষ্টি হয়েছে।

সমুদ্রস্রোতের প্রভাব

মানবজীবনের ওপর সমুদ্রস্রোতের প্রভাবগুলি হল—

[1] বরফমুক্ত বন্দর: উয় সমুদ্রস্রোতের প্রভাবে শীতপ্রধান ও নাতিশীতোয় অঞ্চলের উপকূলের বন্দরগুলি শীতকালেও বরফমুক্ত থাকে। যেমন—উয় উত্তর আটলান্টিক স্রোতের প্রভাবে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের অধিকাংশ বন্দর বরফমুক্ত থাকায় সারাবছরই এগুলি ব্যবহার করা যায়।

[2] নৌ-চলাচলের সুবিধা: উয় সমুদ্রস্রোতের অনুকূলে জাহাজ চলাচল সহজতর হয়। এর ফলে জ্বালানির সাশ্রয় হয়। আটলান্টিক মহাসাগরের অনুকূল উয় স্রোতকে অনুসরণ করে পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক জাহাজ যাতায়াত করে।'

[3] জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ: কোনো অঞ্চলের পাশ দিয়ে উয় সমুদ্রস্রোত প্রবাহিত হলে সেখানকার জলবায়ু উঘ্ন হয়। আবার বিপরীতভাবে শীতল স্রোত প্রবাহিত হলে সেখানকার জলবায়ু ও নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলে বায়ুর উন্নতা কমে এবং উয় শীতল হয়। যেমন—শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের প্রভাবে | কুরোশিয়ো স্রোতের প্রভাবে জাপানের পশ্চিম উপকূলে বায়ুর উন্নতা বাড়ে।

[4 ]বৃষ্টিপাত ও তুষারপাত সৃষ্টি: উম্ন স্রোতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ুতে জলীয় বাষ্প থাকে বলে ওই বায়ু স্থলভাগের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু শীতল স্রোতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ু শুষ্ক বলে বৃষ্টিপাত হয় না, তবে মাঝে মাঝে তুষারপাত হয়। আফ্রিকার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে নামিবিয়া উপকূলে এই কারণে মরুভূমির সৃষ্টি হয়েছে।

[5]দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সৃষ্টি: সাধারণত যেসব অঞ্চলে উষ্ণ ও শীতল স্রোতের মিলন ঘটে, সেখানে উয়তার পার্থক্যের জন্য ঘন কুয়াশা এবং প্রবল ঝড়ঝঞ্ঝা হয়। ফলে জাহাজ বা বিমান চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি হয়। যেমন— নিউফাউন্ডল্যান্ড সংলগ্ন সমুদ্র।

[6] মৎস্যক্ষেত্র সৃষ্টিঃ উয় ও শীতল স্রোতের মিলনস্থলে মাছের খাদ্য প্ল্যাঙ্কটন প্রচুর পরিমাণে জন্মায়, এর ফলে মৎস্যক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। যেমন—নিউফাউন্ডল্যান্ড বা জাপানের উপকূল থেকে এই কারণে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়।

[7]মগ্নচড়ার সৃষ্টি: শীতল স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা হিমশৈল উয় স্রোতের সংস্পর্শে এলে গলে যায়। ফলে হিমশৈলের মধ্যে থাকা পাথর, নুড়ি, বালি প্রভৃতি সমুদ্রবক্ষে দীর্ঘকাল ধরে জমতে জমতে উঁচু হয়ে মগ্নচড়ার সৃষ্টি করে। যেমন—নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলের অদূরে গ্র্যান্ড ব্যাংক সৃষ্টি হয়েছে।

[8]হিমশৈলজনিত বিপদ: শীতল সমুদ্রস্রোতের সঙ্গে যেসব বড়ো বড়ো হিমশৈল ভেসে আসে, সেগুলি জাহাজ চলাচলে বাধার সৃষ্টি করে। এই হিমশৈলের জন্যই বিখ্যাত জাহাজ টাইটানিক ডুবে গিয়ে প্রচুর মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।

আটলান্টিক মহাসাগরে হিমপ্রাচীরের গঠন

উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে, কানাডা ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে নিউফাউন্ডল্যান্ডের কাছে দক্ষিণদিক থেকে আগত উন্ন উপসাগরীয় স্রোত এবং উত্তরদিক থেকে আগত শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের মিলনস্থলে তাপমাত্রার পরিবর্তনের ফলে সুস্পষ্ট বিভাজনকারী সীমারেখা হিসেবে হিমপ্রাচীর গঠিত হয়।

সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির কারণ

সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির উল্লেখযোগ্য কারণগুলি হল

1. বায়ুপ্রবাহ: নিয়ত বায়ুপ্রবাহগুলি সমুদ্রের ওপর দিয়ে। প্রবাহিত হওয়ার সময় সমুদ্রের ওপরের জলরাশিকে নিজের প্রবাহের দিকে চালিত করে। এইভাবে বায়ুপ্রবাহ সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি করে। যেমন— যেসব স্থানে আয়ন বায়ু প্রবাহিত হয়, সেখানে পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে সমুদ্রস্রোত আসে। আবার, যেসব স্থানে পশ্চিমা বায়ু প্রবাহিত হয়, সেখানে সমুদ্রস্রোত পশ্চিমদিক থেকে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়।

2. সমুদ্রজলে উচ্চতার তারতম্য: নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলে বেশি উন্নতার জন্য সমুদ্রজল বেশি উয় হয় এবং বাষ্পীভবন বেশি হয়। এ ছাড়া, এই উন্ন জল হালকা বলে সমুদ্রের ওপরের অংশ দিয়ে পৃষ্ঠস্রোত বা বহিঃস্রোতরূপে শীতল মেরু অঞ্চলের দিকে বয়ে যায়। জলের এই শূন্যতা পূরণের জন্য তখন মেরু অঞ্চলের শীতল ও ভারী জল সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অন্যদের দিকে অন্তঃস্রোতরূপে বয়ে যায়।

3. সমুদ্রজলে লবণতার তারতম্য: সমুদ্রজলে লবণতার পরিমাণ কোথাও বেশি, আবার কোথাও কম। কম লবণাক্ত জল হালকা বলে সমুদ্রের ওপরের অংশ দিয়ে পৃষ্ঠস্রোত বা বহিঃস্রোতরূপে বেশি লবণাক্ত ভারী জলের দিকে বয়ে যায়। মনের এই শূন্যতা পুরণ করার জন্য তখন বেশি লবণাক্ত ভারী জল সমুদ্রের নিম্নাংশ দিয়ে অন্তঃস্রোতরূপে ওই কম লবণাক্ত হালকা জলের দিকে বয়ে যায়। এইভাবে লবণতার তারতম্যের হ্য সমুদ্রস্রোতের উৎপত্তি হয়।

4. পৃথিবীর আবর্তন গতি: পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য হিংস্রোত সোজাপথে প্রবাহিত হতে পারে না। ফেরেলের ত্রানুসারে, উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে । দিদিকে বেঁকে যায়। এভাবে নতুন সমুদ্রস্রোতের উৎপত্তি হয়। দাহরণ : উপসাগরীয় স্রোত আবর্তন গতির প্রভাবে ডানদিকে। কে উত্তর আটলান্টিক স্রোতের উৎপত্তি ঘটায়।

5. মহাদেশসমূহের অবস্থান ও আকৃতি: প্রবহমান সমুদ্রস্রোত দেশের যে প্রান্তে বা দ্বীপপুঞ্জে বাধা পায়, সেখানকার গঠন বা আকৃতি অনুসারে সমুদ্রস্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হয় বা বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়। এভাবেও নতুন নতুন সমুদ্রস্রোতের উৎপত্তি ঘটে।

উদাহরণ : আটলান্টিক মহাসাগরে দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত ব্রাজিলের অন্তরীপ কেপ ডি সাও রোক-এ বাধা পেয়ে ব্রাজিল স্রোত নামে একটি নতুন স্রোতের উৎপত্তি ঘটায় ।

6. বরফের গলন: সমুদ্রে বরফ যেখানে গলে যায়, সেখানে জলরাশির পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধি পায় এবং ওই জলরাশি স্বল্প জলরাশি সমন্বিত অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়, ফলে সমুদ্রস্রোতের উৎপত্তি ঘটে।

7. সামুদ্রিক শৈলশিরার উপস্থিতি: সমুদ্রস্রোতের গতিপথে সামুদ্রিক শৈলশিরা থাকলে তাতে স্রোত প্রতিহত হয়ে তার গতিবিক্ষেপ বা দিক পরিবর্তন হয়।

৪. অভিকর্ষজ বল : পৃথিবীর অভিগত গোলাকৃতির জন্য (দুই মেরু চাপা এবং মধ্যভাগ বা নিরক্ষীয় অঞ্চল স্ফীত) মেরু অঞ্চলের অভিকর্ষ বলের মান নিরক্ষীয় অঞ্চলের চেয়ে বেশি। ফলে দেখা যায় অভিকর্ষ বলের উপাংশ সমুদ্রস্রোতকে নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে চালিত করে।

9 . বায়ুচাপের তারতম্য: যেখানে বায়ুর চাপ বেশি সেখানে জলতল কিছুটা নীচে থাকে এবং যেখানে বায়ুর চাপ কম সেখানে

জলতল তুলনামূলকভাবে উঁচুতে থাকে। ফলে উচ্চ জলতল থেকে নিম্ন জলতলের দিকে বায়ুচাপের ঢাল অনুযায়ী সমুদ্রস্রোতের সঞ্চালন হয়।

10. অধঃক্ষেপণ : সমুদ্রে যেখানে অধঃক্ষেপণের পরিমাণ বেশি সেখানে জলের লবণতা কম হবে ও জলের ঘনত্বও কমে যাবে। ঘনত্ব কম হলে জলতল উচ্চ হবে। ফলে সেইদিক থেকে সমুদ্রস্রোত নিম্ন জলতলের দিকে সঞ্চালিত হয়।