Chapter -5⇒মুঘল সাম্রাজ্য

উত্তর:

ভূমিকা : ভারতের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট ছিলেন শের শাহ। ভারতের সম্রাট হিসেবে তিনি মাত্র ৫ বছর (১৫৪০-১৫৪৫ খ্রিস্টাব্দ) রাজত্ব করেছিলেন।

 শের শাহের দিল্লির সিংহাসনলাভের ক্রমপর্যায় :

1.প্রথম জীবন : শের শাহ ১৪৭২ খ্রিস্টাব্দে (মতান্তরে ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দে) পাঞ্চাবে জন্মগ্রহণ করেন। শের শাহের বালানাম ছিল ফরিদ খান। তাঁর পিতা শূরবংশীয় আফগান হাসান খান ছিলেন বিহারের সাসারামের জায়গিরদার।

  1. ফরিদ খান থেকে শের খান : শের খান বিহারে বাহার খান লোহানির অধীনে কাজ করার সময় নিজের হাতে একটি শের বা বাঘ হত্যা করেন। এজন্য বাহার খান তাঁকে ‘শের' উপাধি দেন। এর পর থেকে তিনি শের খান নামে পরিচিত হন।

3.মুঘল সম্রাট হুমায়ূন ও শের খান-এর লড়াই : মুছ্ল সম্রাট হুমায়ুন এই সময় শের খান-এর শক্তিবৃদ্ধিতে শঙ্কিত হয়ে তাঁকে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেন।

চৌসার যুদ্ধ : হুমায়ুন শের খান-এর চুনার দুর্গ দখল করে বাংলার দিকে অগ্রসর হন। শের খান তাঁর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধ এড়িয়ে উত্তরপ্রদেে দিকে চলে যান। এরপর হুমায়ুন বাংলা থেকে দিল্লি ফিরে যাওয়ার পথে ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে চৌসা নামক স্থানে শের খান-এর সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ = এই যুদ্ধে হুমায়ুন পরাজিত হয়ে পালিয়ে যান।

 বিলগ্রামের যুগ্ম ও দিল্লি বিজয় : পরের বছর ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে হুমায়ূন শের খান-এর বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধযাত্রা করেন। কনৌজ- কাছে বিলগ্রামে শের খান-এর সঙ্গে হুমায়ুনের যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধেও হুমায়ুন চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়ে পালিয়ে যান। ফলে ১৫৪০ খ্রিস্ট শের খান দিল্লি জয় করেন। শের খান দিল্লির সম্রাট হন এবং শের শাহ নামে খ্যাতি লাভ করেন।

উত্তর:

মুঘল সম্রাট আকবরের কূটনৈতিক বিচক্ষণতার শ্রেষ্ঠ পরিচয় ছিল তাঁর রাজপুত নীতি। ভারতীয় শৌর্যবীর্যের প্রতীক রাজপুতদের সঙ্গে সম্রাট আকবর মৈত্রীর সম্পর্ক তৈরি করতে সচেষ্ট ছিলেন। রাজপুতরাও মুঘল সাম্রাজ্যের শক্তিস্তম্ভে পরিণত হয়েছিল।

রাজপুতদের সম্পর্কে জকিবরের গৃহীত নীতি : রাজপুতদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সম্রাট আকবর কয়েকটি নীতি অনুসরণ করেছিলেন। যেমন—

1.বৈবাহিক সম্পর্কের নীতি,

2.উচ্চ রাজপদে নিয়োগের নীতি,

3.বিভিন্ন সুযোগসুবিধা প্রদানের নীতি এবং

4.যুদ্ধনীতি।

1.বৈবাহিক সম্পর্কের নীতি : সম্রাট আকবর অম্বরের রাজকন্যা যোধাবাঈ-কে, বিকানির ও যোধপুরের রাজপুত রাজকন্যাদের বিবাহ করেন। তা ছাড়া আকবর তাঁর পুত্র সেলিমের (জাহাঙ্গির) সঙ্গেও রাজপুত রাজকন্যার বিবাহ দেন।

2.উচ্চ রাজপদে নিয়োগ নীতি : সম্রাট আকবর রাজপুতদের উচ্চপদে নিয়োগ করে তাঁদের আনুগত্য লাভ করেছিলেন। রাজা বিহারীমল, ভগবানদাস, মানসিংহ প্রমুখ রাজপুতদের তিনি মনসবদার হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন।

3.বিভিন্ন সুযোগসুবিধা প্রদান নীতি : রাজপুতদের সাহায্য ও সহযোগিতা লাভের জন্য আকবর তাঁদের উপর থেকে তীর্থকর বা জিজিয়া কর তুলে দেন এবং তাঁদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত নেন।

4.যুদ্ধনীতি : অনেক রাজপুত রাজ্য আকবরের বশ্যতাস্বীকার করলেও মেওয়াড়, রণথস্কোর প্রভৃতি রাজপুত রাজ্যগুলি কোনোভাবেই আকবরের বশ্যতাস্বীকার করতে রাক্তি হয়নি। তাই আকবর মেওয়াড়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধনীতি অনুসরণ করেন। মেওয়াড়ের রানা উদ্যা সিংহ ও তাঁর পুত্র রানা প্রতাপ সিংহ আকবরের বিরুদ্ধে বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেন। রানা প্রতাপ সিংহ ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে হলদিঘাটির যুদ্ধে আকবরের বাহিনীর হাতে পরাজিত হলেও তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেননি। আকবর মৈত্রী ও যুদ্ধনীতি অনুসরণ করে রাজপুতদের নিজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন এবং মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত সুদৃঢ় হয়।

 উত্তর:

কৃতিত্ব : মুঘল সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সেলিম 'নূরউদ্দিন মহম্মদ জাহাঙ্গির বাদশাহ গাজি' 'উপাধি নিয়ে ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গির নামে অধিক পরিচিত।

1.রাজ্যজয় : সিংহাসনে বসার পর জাহাঙ্গির পিতা আব্বরের মতো সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করেন।

2.শিল্প স্থাপত্যের পৃষ্ঠপোষকতা : সম্রাট জাহাঙ্গির ছিলেন শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক। তিনি তুর্কি ভাষায় 'তুজুক-ই জাহাঙ্গিরি' নামে একটি আত্মজীবনী রচনা করেন। তাঁর দরবারে ছিলেন প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ জগন্নাথ, জনার্দন ভট্ট প্রমুখ। তাঁর দরবারে বিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বিষেণ দাস, কেশব, মহম্মদ নাদির, মহম্মদ মুরাদ প্রমুখ। তাঁর আমলে সম্রাট আকবরের সমাধি, ইতিমাদ উদ্ দৌলার সমাধি ও বহু মসজিদ নির্মিত হয়েছিল।

3.ইউরোপীয় বণিকদের সঙ্গে সম্পর্ক : জাহাঙ্গিরের আমলে পোর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ইংরেজ প্রভৃতি বণিকরা ভারতে এসেছিলেন। ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের পত্র নিয়ে ক্যাপ্টেন হকিন্স তাঁর দরবারে এসেছিলেন। ১৬১৫ খ্রিস্টাব্দে স্যার টমাস রো জাহাঙ্গিরের কাছ থেকে কিছু বাণিজ্যিক সুযোগসুবিধা লাভ করেছিলেন।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, সম্রাট জাহাঙ্গির ছিলেন ভারতের ইতিহাসে এক উচ্চমানের সম্রাট।

উত্তর:

ভারতে মুঘল সম্রাটদের কোনো নির্দিষ্ট উত্তরাধিকার নীতি ছিল না।

মুঘল শাসনে উত্তরাধিকার নীতির প্রভাব :

তৈমুরীয় নীতি : মুঘল সম্রাটগণ ছিলেন তুর্কি নেতা তৈমুর লঙের বংশধর। তৈমুরীয় নীতি অনুসারে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সাম্রাজ্য ভাগ করার প্রথা ছিল। কিন্তু ভারতের মুঘল সম্রাটগণ তা মানেননি।

বাবরের পর হুমায়ূন যখন দিল্লির সম্রাট হন তখন তিনি তৈমুরীয় উত্তরাধিকার নীতি মানেননি। হুমায়ুন সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন এবং তাঁর বাকি তিন ভাই কামরান, আসকারি ও হিন্দালকে কিছু অঞ্চালের দায়িত্ব দেন।

রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ : এক মুঘল সম্রাটের পর কে সম্রাট হবেন তা নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়। কারণ সম্রাটের সব পুত্রই সিংহাসনের দাবিদার হতেন। সম্রাটের সব পুত্রদেরই লক্ষ্য ছিল – 'তত আউর তখতা' অর্থাৎ হয় সিংহাসন, নইলে কফিন'। শাহ জাহানের রাজত্বের শেষদিকে ঔরঙ্গজেব তাঁর তিন ভাই দারা, সুজা ও মুরাদকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করেন। ঔরঙ্গজেবের পর ভ্রাতৃহত্যা প্রবল আকার ধারণ করে।

অভিজাতদের ক্ষমতা বৃদ্ধি : মুঘল সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে অভিজ্ঞাতরা বিভিন্ন রাজপুত্রের সমর্থক হয়ে ওঠে। যিনি সম্রাট হতেন। তার সমর্থক অভিজাতদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেত। ফলে অভিজাতরাও ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠত।

মুঘল সাম্রাজ্যের অবক্ষয় : মুঘল সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে সাম্রাজ্যে গৃহযুদ্ধ হত, ফলে মুঘল সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এর ফলে সম্রাটের ক্ষমতা কমে যায়, অর্থসংকট সৃষ্টি হয় এবং মুঘল সাম্রাজ্যের অবক্ষয় ঘটে।

 উত্তর:

রাজপুতরা ছিল ভারতের শৌর্য ও বীরত্বের ঐতিহ্যপূর্ণ জাতি। দিল্লির মুখল সম্রাটগণ রাজপুতদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও শত্রুতার নীতি গ্রহণ করেছিল। মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব রাজপুতদের সম্পর্কে যে নীতি গ্রহণ করেছিল তা সম্রাট আকবরের রাজপুত নীতির সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে মিল ও অমিল ছিল।

ঔরঙ্গজেবের রাজপুত নীতি :

রাজপুত মনসবদার নিয়োগ : মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের আমলে রাজপুতরা বেশি সংখ্যায় মুঘল মনসবদারি ব্যবস্থার আওতায় এসেছিল। ঔরঙ্গজেবের বিশ্বস্ত অভিজাতদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন মির্জা রাজা জয়সিংহ। ৫) মারওয়াড়ের রাঠোর বংশের রাজপুত রানা যশোবন্ত সিংহ বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের বিরোধী হলেও পরে তিনি মুঘল মনসবদার নিযুক্ত হয়েছিলেন। 2

 জিজিয়া কর আরোপ : জিঞ্জিয়া হল এক প্রকার ধর্মকর। এটি ভারতে বসবাসকারী অমুসলমান প্রজাদের কাছ থেকে আদায় করা হত। মুঘল সম্রাট আকবর রাজপুতদের কাছ থেকে জিজিয়া কর নিতেন না। কিন্তু ঔরঙ্গজেব আবার রাজপুতদের উপর জিজিয়া কর চাপিয়ে দিয়েছিলেন। এতে রাজপুতরা ঔরঙ্গজেবের প্রতি ক্ষুদ্ধ হয়েছিলেন।

 উত্তর :

মুঘল আমলে রাজপুতরা ছিল ভারতের অন্যতম প্রধান শক্তি। তাই প্রত্যেক মুঘল সম্রাট রাজপুতদের সম্পর্কে বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করেন। তবে বাবর, হুমায়ুন, আকবর থেকে ঔরঙ্গজেব পর্যন্ত সবার নীতি এক ছিল না। তাই মুঘল শাসকদের রাজপুত নীতিতে অনেক মিল ও অনেক অমিল লক্ষ করা যায়।

মিল :   

1.আকবর থেকে ঔরষ পর্যন্ত সকল মুঘল সম্রাটগণ রাজপুতদের মনসব প্রদান করে মনসবদারি প্রথার আওতায় আনতে চেয়েছিলেন।

2.আকবর থেকে শাহ জাহান পর্যন্ত মুঘল সম্রাটগণ রাজপুত পরিবারে বিবাহ করে উভয়ের সম্পর্ককে সুদৃঢ় করেছিলেন।

 অমিল :

1.মুঘল সম্রাট আকবর রাজপুতদের উপর থেকে জিজিয়া কর ও তীর্থকর আদায় নিষিদ্ধ করেছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গির ও শাহজাহান আকবরের রাজপুত নীতিকে অনুসরণ করেছিলেন। কিন্তু মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব পুনরায় রাজপুতদের উপর জিজিয়া কর আরোপ করেছিলেন।

2.ঔরঙ্গজেবের পূর্ববর্তী মুঘল সম্রাটগণ রাজপুতদের প্রতি ধর্মীয় সহিঞ্চুতার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ঔরঙ্গজেব রাজপুতানা অঞ্চলে প্রায় ২০০টি মন্দির ধ্বংস করে তাদের শত্রুতে পরিণত হয়েছিলেন। ঔরঙ্গজেবের ভ্রান্ত রাজপুত নীতি মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের জন্যও দায়ী ছিল।

 উত্তর :

মুঘল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সম্রাট আকবর একটি সুদক্ষ শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। এই শাসনকাঠামো পরবর্তী মুঘল বাদশাহদের আমলেও চালু ছিল। মুঘল শাসনকাঠামোকে দুভাগে ভাগ করা যায় কেন্দ্রীয় প্রাদেশিক।

কেন্দ্রীয় শাসনকাঠামো :

সম্রাট ছিলেন শাসনব্যবস্থার সর্বেসর্বা। তিনি ছিলেন অসীম ক্ষমতার অধিকারী। কেন্দ্রীয় শাসনে সম্রাটকে সাহায্য করতেন কয়েকজন মন্ত্রী; তাঁরা হলেন-1.ডকিল-প্রধানমন্ত্রী, 2.দেওয়ান—অর্থমন্ত্রী, 3.  মির বক্‌সি—যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী, 4.সদর-উস্ সুদুর – ধর্ম ও দাতবা প্রতিষ্ঠানবিষয়ক মন্ত্রী, 5.কাজি-উৎ কাজাৎ- প্রধান বিচারক। এ ছাড়া ছিলেন মির সামান, মুহতসিব, দারোগা-ই গুসলখানা, আরিজ-ই মুবারক প্রমুখ।

 প্রাদেশিক শাসনকাঠামো : সম্রাট আকবর শাসনকার্যের সুবিধার জন্য তার সাম্রাজ্যকে ১৫টি (মতান্তরে ১২টি) সুবা বা প্রদেশে ভাগ করেছিলেন।

সুবা: সুবার শাসনকর্তাকে বলা হত সুবাদার। সুবাদার ছাড়াও প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে দেওয়ান থাকতেন। দেওয়ানের কাজ ছিল। রাজস্ব সংক্রান্ত বিষয়ে তদারকি করা।

সরকার : প্রত্যেক সুবা কয়েকটি সরকার-এ বিভক্ত থাকত। সরকার বা জেলার শাসন পরিচালনা করত ফৌজদার, দেওয়ান প্রভৃতি উচ্চপদস্থ কর্মচারীগণ।

পরগনা: প্রত্যেকটি সরকার বা জেলা কয়েকটি পরগনায় বিভক্ত ছিল। পরগনার প্রধান ছিলেন শিকদার ও রাজস্ববিভাগের ভারপ্রাপ্ত আমিল প্রভৃতি কর্মচারী। পরগনাগুলি আবার গ্রামে বিভক্ত ছিল।

উত্তর :

মুঘল সম্রাটদের প্রশাসনিক আদর্শ ছিল মূলত যথার্থ ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষ ও পিতৃসুলভ প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

যথার্থ ভারতীয় সাম্রাজ্য গড়ে তোলা : ভারতের মুঘল সম্রাটদের প্রধান প্রশাসনিক আদর্শ ছিল ভারতের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করে যথার্থ ভারতীয় সাম্রাজ্য গড়ে তোলা।

 বিদেশি ও ভারতীয় রাজতন্ত্রের সংমিশ্রণ : মুঘল সম্রাটদের প্রশাসনিক আদর্শ ছিল বিদেশি তৈমুরীয় ও পারসিক আদর্শের সঙ্গে ভারতীয় রাজতান্ত্রিক আদর্শের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এক নতুন সময়োপযোগী প্রশাসনিক আদর্শ গড়ে তোলা। তাই মুঘল সম্রাটদের প্রশাসনিক আদর্শনে তৈমুরীয়, পারসিক ও ভারতীয় আদর্শের সংমিশ্রণ বলা যায়।

 বাদশাহের পিতৃসুলভ আচরণ : মুঘল বাদশাহরা একদিকে মনে করতেন যে, তাঁরা ঈশ্বরের ইচ্ছায় বাদশাহ হয়েছেন। অপরদিকে তা প্রজাদের প্রতি পিতৃসুলভ আচরণ করতেন। সকলের প্রতি সহনশীলতার এই পথকেই ‘সুলহ-ই-কুল’ বলা হয়।

ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসন : বেশিরভাগ মুঘল সম্রাট ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে বিশ্বাসী। সম্রাট আকবর এই আদর্শের উপর ি করে ‘দীন-ই ইলাহি’ মতাদর্শ গড়ে তুলেছিলেন।

উত্তর :

 মনসবদারি প্রথা : মুঘল সম্রাট আকবর ভারতে মনসবদারি প্রথা প্রবর্তন করেছিলেন। ভারতে মনসবদারি প্রথা মুঘল শাসনব্যব মূল ভিত্তিতে পরিণত হয়েছিল।

অর্থ : ‘মনসব’ কথার অর্থ হল পদমর্যাদা। মনসব পদমর্যাদার অধিকারী কর্মচারীদের মনসবদার বলা হত। প্রত্যেক মনসবদার সরকার নিয় বেতনের পরিবর্তে সেনা ও ঘোড়া রাখতেন এবং সরকারের অনুগত থাকতেন। এই প্রথাকে 'মনসবদারি প্রথা' বলা হত।

মনসবদার নিয়োগ : মনসবদারদের নিয়োগ ও পদোন্নতি ছিল সম্পূর্ণভাবে সম্রাটের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। এই পদ বংশানুক্রমিক ছিল না। মনসবদারদের মৃত্যুর পর সম্রাট তাঁর সম্পত্তি দখল করতেন।

বেতন ও কাজ : মুঘল যুগে মনসবদারদের যথেষ্ট বেতন দেওয়া হত। এক হাজারি মনসবদারের মাসিক বেতন ছিল ৪৪০০ টাকা। পাঁচ হাজারি মনসবদারের মাসিক বেতন ছিল ৩০০০০ টাকা। মনসবদারদের নির্দিষ্ট সেনাবাহিনী রাখতে হত এবং সম্রাটকে সেনা দিয়ে সাহায্য করতে হত। অনেক মনসবদারকে বেতনের পরিবর্তে জায়গির দেওয়া হত।

স্তর বিভাগ : 'আইন-ই আকবরি’ গ্রন্থে মনসবদারদের ৬৬টি স্তরের উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে মনসবদাররা ৩৩টি স্তরে বিভক্ত ছিলেন। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্তর হল— পাঁচ হাজারি, সাত হাজারি, আট হাজারি, দশ হাজারি মনসবদার প্রভৃতি।

গুরুত্ব : মুঘল যুগের ইতিহাসে মনসবদারি প্রথার গুরুত্ব অপরিসীম। মনসবদারি প্রথা মুঘল রাজতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছিল।

উত্তর :

মুঘল শাসনব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিল জায়গিরদারি ব্যবস্থা। মুঘল আমলে অনেক মনসবদারকে নগদ বেতনের পরিবর্তে জায়গির দেওয়া হত, এই ব্যবস্থাকে জায়গিরদারি ব্যবস্থা বলা হত। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গিরের আমলে এই জায়গিরনারি ব্যবস্থায় অনেক সমস্যা বা সংকট সৃষ্টি হয় এবং সম্রাট ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে এই জায়গিরদারি সংকট চরম আকার ধারণ করে।

জায়গিরদারি সংকটের কারণ :

জায়গিরদারের সংখ্যা বৃদ্ধি : সম্রাট জাহাঙ্গিরের সময় থেকে মুঘল সম্রাটগণ যথেচ্ছভাবে জায়গিরদারের সংখ্যার বৃদ্ধি ঘটান। ফলে উর্বর জায়গির পাওয়ার আশায় জায়গিরদারদের মধ্যে দলাদলি শুরু হয়।

হিসাবের গরমিল : জায়গিরদারি সংকটের অন্যতম কারণ ছিল রাজস্বের হিসাবে গরমিল বা জমা ও হাসিলের মধ্যে ফারাক। 'জমা' বলতে বোঝায় জায়গির থেকে যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় হবে তার সরকারি হিসাব। আর 'হাসিল' বলতে বোঝায় বাস্তবে যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় হত। জায়গিরদাররা ঊর্বর জায়গির পাওয়ার জন্য নানা অনাচার ও দুর্নীতির আশ্রয় নিতেন। এই জায়গিরদারি সংকট মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ডেকে এনেছিল।

 ফলাফল : জায়গিরদারি সংকটের ফলে মুঘল সম্রাটগণ আর্থিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিলেন। আয়ের অনিশ্চয়তার জন্য মনসবদাররা নির্দিষ্ট পরিমাণ সৈন্য রাখতেন না। এর ফলে মুঘল সাম্রাজ্য দুর্বল হয় এবং তার পতন ত্বরান্বিত হয়।

উত্তর :

জাবতি : মুঘল যুগে ভারতবর্ষের অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষিপ্রধান। তাই মুঘল সম্রাট আকবর বুঝেছিলেন যে ভালোভাবে শাসন পরিচালনা করতে হলে ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। সম্রাট আকবর নতুনভাবে জমি জরিপ করান এবং তার ভিত্তিতে রাজস্ব নির্ধারণ করেন। জমি জরিপ করে রাজস্ব ধার্য করার পদ্ধতিকে 'জাতি' বলা হয়।

করোরি : সম্রাট আকবর লক্ষ করেছিলেন যে, রাজধানী শহরের সাথে সাম্রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলের শস্যের মূল্যের পার্থক্য আছে। অন্যান্য জায়গার তুলনায় রাজধানীতে শস্যের মূল্য বেশি থাকত। তাই আকবর প্রতি বছর প্রত্যেক এলাকার আলাদা আলাদা রাজস্বের হিসাব করার ব্যবস্থা করলেন। মুঘল সরকারের অধীন কর্মচারী কানুনগোরা প্রত্যেক এলাকার উৎপাদন ও বাজারে শস্যের মূলো হিসাব রাখত। যেসব মুঘল সরকারের কর্মচারীরা রাজস্ব আদায় করত এবং কানুনগো নামক কর্মচারীদের তথ্য মিলিয়ে দিত, তাদের ‘করোরি' বলা হত। ৫) মুঘল সম্রাট আকবরের রাজস্বমন্ত্রী ছিলেন টোডরমল।

উত্তর :

শের শাহের রাজস্ব সংস্থার ব্যবস্থা : শের শাহ রাজস্ব সংস্কারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। যথা—

  1. উৎপাদন ক্ষমতা অনুসারে জমির শ্রেণিবিভাগ : শের শাহ সাম্রাজ্যের সমস্ত জমি জরিপ করেন এবং উৎপাদনশক্তি অনুসারে জমিকে তিন ভাগে ভাগ করেন। এই তিনটি ভাগ হল-A. ভালো, B.মাঝারি এবং C. মন্দ।
  2. ‘পাট্টা’ ও ‘কবুলিয়ত’ ব্যবস্থার প্রচলন : শের শাহ 'পাট্টা' ও 'কবুলিয়ত' ব্যবস্থার প্রচলন করেছিলেন।

পাঁঠা : কত রাজস্ব দিতে হবে তা উল্লেখ করে সরকার প্রজাকে যে জমির স্বত্ব প্রদান করত, তাকে পাট্টা বলা হত।

কবুলিয়ত: প্রজারা রাজস্ব প্রদানের শর্ত স্বীকার (কবুল) করে সরকারকে যে দলিল দিত, তা কবুলিয়ত নামে পরিচিত।

টেডিরমলের বন্দোবস্তু: টোডরমল ছিলেন মুঘল সম্রাট আকবরের রাজস্ববিষয়ক প্রধান পরামর্শদাতা। ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে টোডরমল রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রে যে ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, তা ঢোডরমলের বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থায় তিন ধরনের রাজস্ব সংগ্রহের পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়; যথা- 1. জাবৎ বা জাবতি প্রথা, 2.গন্নাবক্স প্রথা, এবং 3.নাস্ক প্রথা।

উত্তর:

ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বা প্রথম বাদশাহ ছিলেন জহিরউদ্দিন মহম্মদ বাবর (১৫২৬-১৫৩০ খ্রি.)। ভারতে বাবরের বংশধরগণ মুঘল নামে পরিচিত।

বাবর ছিলেন তুর্কি নেতা তৈমুর লঙ এবং মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিজ খানের বংশধর। বাবর চেঙ্গিজ খানের বা মোঙ্গলদের জীবনযাত্রাকে ঘৃণা করতেন এবং তৈমুর লঙের বংশধর বলে গর্ব করতেন। তা সত্ত্বেও বাবর ও তাঁর বংশধরগণ ভারতের ইতিহাসে মুঘল নামে পরিচিত।

উত্তর:

১৩৩৬ খ্রিস্টাব্দে তৈমুর লঙ সমরখন্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আমির তার্মি ছিলেন চাঘতাই তুর্কি গোষ্ঠীর লোক। যুদ্ধের সময় তৈমুরের একটি পা নষ্ট হয়েছিল বলে তাঁকে লঙ বা খোঁড়া বলা হত। তৈমুরের আত্মজীবনী গ্রন্থের নাম 'তুজুক-ই-তৈমুরি'।

সিংহাসনলাভের পর তিনি মধ্য এশিয়ার ইরাক, ইরান, খোরাসান এবং তুরস্কের কিছু অঞ্চল জয় করেন। ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে তৈমুর লঙ ভারত আক্রমণ করেন। ভারতের মুঘল সম্রাট বাবর ছিলেন তৈমুর লঙের বংশধর।

উত্তর:

মধ্য এশিয়ার সমরখন্দের যোদ্ধা নেতা তৈমুর লঙ ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভারত আক্রমণ করেন। ভারতে তখন তুঘলক বংশের সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ রাজত্ব করছিলেন।

ভারত আক্রমণের কারণ : তৈমুর লঙের ভারত আক্রমণের কারণ ছিল—

1. ভারতের ধনসম্পদ লুঠ করা,

2. বহু দেবতায় এবং পৌত্তলিকতায় বিশ্বাসী ভারতে ইসলাম ধর্মের বিস্তার ঘটানো।

অভিযান : ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির উপকণ্ঠে তৈমুর লঙ উপস্থিত হলে সুলতান নাসিরউদ্দিন তাঁকে বাধা দেন। কিন্তু সুলতান পরাজিত হয়ে পালিয়ে যান। তৈমুর নির্বিচারে হত্যা ও লুঠ করে দেশে ফিরে যান।

ফল : তৈমুরের ভারত আক্রমণের ফলে সুলতানি সাম্রাজ্য পতনের দিকে এগিয়ে যায়।

উত্তর:

ভারতে মুঘল সম্রাটদের উপাধি ছিল ‘বাদশাহ’ বা পাদশাহ'। ‘বাদশাহ’ বা ‘পাদশাহ’ শব্দের অর্থ হল শাসক বা সম্রাট। মূল শব্দ বাদশাহ, পাদশাহ, পাদশাহি শব্দগুলি হল ফারসি শব্দ।

অর্থ : ফারসি ‘পাদ’ শব্দের অর্থ প্রভু এবং শাহ’ শব্দের অর্থ শাসক বা রাজা। এখানে ‘পাদ’ ও ‘শাহ’ শব্দ দুটি পাশাপাশি একসাথে ব্যবহার করা হয়েছে খুব শক্তিশালী শাসক বোঝানোর জন্য। ১৫০৭ খ্রিস্টাব্দে বাবর কাবুলে থাকার সময় পাদশাহ' উপাধি নিয়েছিলেন।

উত্তর:

সার্বভৌম বলতে বোঝায় সর্বভূমিসার্বভৌম শাসক বলতে বোঝায় যে শাসকের সর্বভূমি বা গোটা পৃথিবীর উপর আধিপত্য আছে। কিন্তু কোনো একজন মানুষের সমগ্র পৃথিবীর উপর আধিপত্য থাকে না। আসলে একজন শাসক নিজের ক্ষমতায় যে অঞ্চল বা দেশশাসন করেন তিনি সেখানের সার্বভৌম শাসক

উত্তর:

বাবর পানিপতের যুদ্ধ, খানুয়ার যুদ্ধ ও ঘর্ঘরার যুদ্ধে জয়লাভ করে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন ও সুদৃঢ় করেন। তিনি এই যুদ্ধে যে রণকৌশল অনুসরণ করেন তা ছিল ভারতে প্রচলিত রণকৌশল থেকে উন্নত রণকৌশল।

 ` মুঘল রণকৌশল :

1.মুঘল ঘোড়সওয়ার বাহিনীর একটি অংশ শত্রু সৈন্যদলকে দুই পাশ ও পিছন থেকে আক্রমণ করত।

  1. কামান ও বন্দুকধারী সৈন্যরা সামনে থেকে গোলাগুলি বর্ষণ করত।
  2. ঘোড়সওয়ার বাহিনীর একটি অংশ। সামনে থেকে দিশাহারা শত্রুদের আক্রমণ করে ছত্রভঙ্গ করে দিত।

 উত্তর:

 খানুয়ার যুদ্ধ : খানুয়ার যুদ্ধ ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে হয়েছিল। ৫) দিল্লির মুঘল বাদশাহ বাবর ও মেওয়াড়ের রানা সংগ্রাম সিংহের (রানা সঙ্গ) মধ্যে খানুয়ার যুদ্ধ হয়েছিল।

` খানুয়ার যুদ্ধের ফল :

বাবরের জয়লাভ : খানুয়ার যুদ্ধে মুঘল বাদশাহ বাবর মেওয়াড়ের রানা সংগ্রাম সিংহকে পরাজিত করে জয়লাভ করেছিলেন।

উত্তর:

খানুয়ার যুদ্ধ (১৫২৭ খ্রি.) হয়েছিল দিল্লির মুঘল বাদশাহ বাবর ও মেওয়াড়ের রানা সংগ্রাম সিংহের মধ্যে।

 ধর্মযুদ্ধ :

  1. খানুয়ার যুদ্ধের প্রধান দুই প্রতিপক্ষ ছিলেন ভিন্ন ধর্মের। বাবর ছিলেন মুসলমান এবং রানা সংগ্রাম সিংহ ছিলেন হিন্দু
  2. তা ছাড়া যুদ্ধ শুরুর আগে বাবর মুঘল যোদ্ধাদের বলেছিলেন এই যুদ্ধ হল ধর্মের যুদ্ধ। আর যোদ্ধারা সবাই হবেন ধর্মযোদ্ধা বা গাজি

ধর্মযুদ্ধ নয় : খানুয়ার যুদ্ধ ধর্মযুদ্ধ ছিল না। কারণ—

1.এই যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধ বলে বাবর মুসলমান সৈন্যদের জোটবদ্ধ ও শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন।

2.খানুয়ার যুদ্ধে অনেক মুসলমান বাবরের বিরুদ্ধে রাজপুতদের পক্ষে যোগ দিয়েছিল।

উত্তর:

  ঘর্ঘরার যুগ্ম : ১৫২৯ খ্রিস্টাব্দে ঘর্ঘরার যুদ্ধ হয়েছিল।

ঘর্ঘরার যুদ্ধ হয়েছিল দিল্লির মুঘল বাদশাহ বাবরের সঙ্গে বিহার ও বাংলার আফগান শক্তিজোটের। আফগান শক্তিজোটে ছিলেন সুলতান ইব্রাহিম লোদির ভাই মাহমুদ লোদি, বিহারের শের খান এবং বাংলার শাসক নসরৎ শাহ

ঘর্ঘরার যুদ্ধের ফল : ঘর্ঘরার যুদ্ধের ফলে

বাবরের জয়লাভ : ঘর্ঘরার যুদ্ধে বাবর জয়লাভ করেন।

মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি : বাবর প্রতিষ্ঠিত মুঘল সাম্রাজ্য কাবুল থেকে ঘর্ঘরা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

উত্তর:

অভিজাত বলতে বোঝায় উচ্চবংশজাত ধনী পরিবার। সামরিক অভিজাত বলতে বোঝায় যে অভিজাত গোষ্ঠী বংশগতভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করে।

সামরিক অভিজাতরা রাজদরবারে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতেন। রাজপরিবারের সঙ্গে তাদের পারিবারিক যোগাযোগও গড়ে উঠত।

মুঘল সম্রাট বাবরের সঙ্গে সামরিক অভিজাতদের পারিবারিক যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল।

মুঘল শাসনব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল শাসকশ্রেণির সঙ্গে সামরিক অভিজাতদের যোগাযোগ।

উত্তর:

সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারে তৈমুরীয় নীতি : সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে তৈমুরীয় নীতি হল— শাসকের উত্তরসূরিদের মধ্যে সাম্রাজ্য ভাগ করে দেওয়া।

সম্রাট হুমায়ুনের তৈমুরীয় নীতি না মানার ফল : মুঘল সম্রাট বাবর তাঁর চার পুত্রের মধ্যে উত্তরাধিকারী হিসেবে হুমায়ুনকে মনোনীত করেছিলেন।

হুমায়ুন সম্রাট হয়ে সাম্রাজ্যের শাসনভার নিজের হাতেই রেখেছিলেন। তিনি তাঁর ভাইদের কিছু অঞ্চলের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। অর্থাৎ হুমায়ুন তৈমুরীয় নীতি মানেননি। এর ফলে—

1.ভাইদের অসহযোগিতা : হুমায়ুনের বিপদের দিনে তাঁর ভাইরা তাঁকে সাহায্য করেনি।

2.মুঘল সাম্রাজ্য রক্ষায় অনীহা : সরাসরি শাসনের দায়িত্ব না পাওয়ার জন্য হুমায়ুনের ভাইয়েরা মুঘল সাম্রাজ্য রক্ষা করার তাগিদ অনুভব করেননি।

উত্তর:

হুমায়ুন বদখশান থেকে ভারতে ফিরে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এই খবরে বাবর খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন। জনশ্রুতি অনুযায়ী, বাবরকে তখন কোনো একজন পরামর্শ দেন যে, হুমায়ুনের খুব প্রিয় কোনো জিনিস যদি ঈশ্বরকে উৎসর্গ করা যায়, তাহলে হয়ত তাঁকে বাঁচানো যাবে। সেই কথা শুনে বাবর নিজের জীবন উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন। বাবরের প্রার্থনায় হুমায়ুন আরোগ্য লাভ করলেন কিন্তু বাবর মারা যান। অর্থাৎ হুমায়ুন যে বাবরের প্রিয় ছিলেন তা এই কাহিনির মাধ্যমে বোঝা যায়।

উত্তর:

মুঘল সম্রাট বাবরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র হুমায়ুন দিল্লির বাদশাহ হন (১৫৩০ খ্রি.)। হুমায়ুন তাঁর ভাইদের কিছু অঞ্চল ছেড়ে দিয়ে সাম্রাজ্যের ভার নিজের হাতেই রেখেছিলেন। তাঁর ভাই কামরান, আসকারি হিন্দাল সাম্রাজ্যের সমান ভাগ ও শাসন পরিচালনায় অধিকার না পাওয়ার জন্য তারাও শত্রুদের হাত থেকে মুঘল সাম্রাজ্যকে রক্ষা করার কোনো তাগিদ অনুভব করেনি। তাই আফগানরা যখন হুমায়ুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তখন হুমায়ুন ভাইদের সাহায্য পাননি, ফলে তিনি হেরে যান।

উত্তর:

শের শাহ দিল্লির শাসক হওয়ার পর রাজস্ব ব্যবস্থা, সামরিক ব্যবস্থা, জনহিতকর কাজের ক্ষেত্রে অনেক সংস্কার করেছিলেন।

 রাজস্ব সংস্কার : রাজস্ব ব্যবস্থার ক্ষেত্রে শের শাহ ‘পাট্টা’ ও ‘কবুলিয়ত’ ব্যবস্থা চালু করেছিলেন।

 সামরিক সংস্কার : শের শাহ সেনাবাহিনীকে সুগঠিত করার জন্য ‘দাগ’ ও ‘হুলিয়া’ ব্যবস্থা চালু করেছিলেন।

জনহিতকর কাজ : শের শাহ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য সড়ক-আজম’ (গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড) নির্মাণ করেছিলেন।

ঘোড়ার মাধ্যমে ডাক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করেছিলেন।

পথিক বণিকদের সুবিধার জন্য তিনি রাস্তার ধারে অনেক সরাইখানা তৈরি করেছিলেন।

উত্তর:

প্রশাসনিক এবং জনহিতকর কাজের পাশাপাশি শের শাহ ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থায় কিছু সংস্কার করেছিলেন।

ভূমিরাজস্ব সংস্কার :

  1. শের শাহ জমি জরিপ করে জমির উর্বরতার উপর ভিত্তি করে সমগ্র চাষযোগ্য জমিকে তিনভাগে ভাগ করেন।
  2. উর্বরতা অনুসারে ১/৩ থেকে ১/৪ ভাগ রাজস্ব ধার্য করা হয়। রাজস্ব নগদ অর্থে অথবা শস্যের মাধ্যমে প্রদান করা যেত। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় রাজস্ব মকুবের ব্যবস্থা ছিল।