Chapter-5, অর্থনীতির বিভিন্ন দিক

রোমের ক্রীতদাসরা প্রভুর পরিবারের ঘরদোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, রান্নাবান্না করা, বাগান পরিচর্যা করা, জামাকাপড় কাচা প্রভৃতি কাজকর্ম করত। তারা উদয়াস্ত হাড়ভাঙা খাটুনির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যশস্য ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন করত।ক্রীতদাসরা তাদের প্রভুর ব্যাবসায়িক কাজকর্মেও সহায়তা করত।

খুবই দুঃখকষ্টের মধ্যে দিয়ে ক্রীতদাসদের জীবন কাটত। ক্রীতদাসরা ছিল তাদের প্রভুর সম্পত্তি। তাই প্রভু তার অধীনস্থ ক্রীতদাসদের বিক্রি করতে, ভাড়া খাটাতে বা হস্তান্তর করতে পারত।প্রভুরা প্রয়োজনে তাদের অধীনস্থ ক্রীতদাসদের প্রতি নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ করত।

কখনো কখনো দাসত্বের বিনিময়ে প্রাপ্ত অর্থ সঞ্চয় করে তা এককালীন প্রভুকে দিলে ক্রীতদাসরা মুক্তি পেত। অনেক সময় কোনো ক্রীতদাস সারাজীবন ধরে তার প্রভুর প্রতি গভীর আনুগত্য দেখানোর পুরষ্কার হিসেবে মুক্তি পেত। প্রভুর সেবাযত্ন বা প্রভুর প্রণরক্ষার বিনিময়েও ক্রীতদাসরা দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে পারত।

ক্রীতদাস প্রথার ফলে কৃষিজ ও খনিজ সম্পদের উৎপাদন বাড়ে।ক্রীতদাসদের পরিশ্রমে প্রচুর রাস্তাঘাট, সেতু ও স্থাপত্যকীর্তি নির্মিত হয়। ক্রীতদাসদের ওপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় স্বাধীন নাগরিকরা কর্মবিমুখ হয়ে পড়ে।

ক্রীতদাসদের যেসব সন্তান জন্মসূত্রে ক্রীতদাসে পরিণত হত তারা ‘ভানি’ নামে পরিচিত ছিল।

ক্রীতদাসদের লোহার শিকলে বেঁধে রাখা, চাবুক দিয়ে মারা, উত্তপ্ত লোহার ছ্যাঁকা দেওয়া প্রভৃতি শাস্তি দেওয়া হত।

রোমান ক্রীতদাসরা প্রাসাদ, সাধারণ গৃহ, অট্টালিকা, পাকা পয়ঃপ্রণালী, রাস্তাঘাট, সেতু, ক্রীড়াক্ষেত্র প্রভৃতি নির্মাণকার্যের সঙ্গে যুক্ত থাকত।

প্রভুর আশ্রয় থেকে পালিয়ে যাওয়া ক্রীতদাসকে ‘ম্যানুমিসিও' বলা হত।

প্রাচীন রোমে কোনো কোনো ক্রীতদাসকে হিংস্র পশুর সঙ্গে লড়াই করে নাগরিকদের আনন্দ দিতে হত। এই ক্রীতদাসরা গ্ল্যাডিয়েটর নামে পরিচিত ছিল।

স্পার্টাকাস ছিলেন রোমের একজন ক্রীতদাস ও গ্ল্যাডিয়েটর। তিনি রোমের বিরুদ্ধে সংঘটিত দাস বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

রোমান নাগরিকদের মনোরঞ্জনের অন্যতম উপায় ছিল ‘গ্ল্যাডিয়েটরের লড়াই’ নামে এক প্রকার নিষ্ঠুর খেলা দেখা।

প্রাচীন রোমে একধরনের উৎসবে প্রভু ও তার অধীনস্থ ক্রীতদাস তাদের নিজ নিজ অবস্থান পরিবর্তন করে সাময়িকভাবে প্রভু ক্রীতদাসের এবং ক্রীতদাস প্রভুর ভূমিকা পালন করত। এই অনুষ্ঠানকে সতুরনালিয়া উৎসব বলা হয়।

রোমের মুক্তিপ্রাপ্ত ক্রীতদাসকে বলা হত ‘লিবারটাস’।

রোমের ক্রীতদাসরা জলপাই, আঙুর, গম প্রভৃতি কৃষিপণ্য উৎপাদন করত।

প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যে বন্ধু সাধারণ মানুষ কোনো ধনী অভিজাত ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য জানাত এবং অভিজাত ব্যক্তি সেইসব সাধারণ মানুষের রক্ষার দায়িত্ব পালন করত। অভিজাত ব্যক্তির কাছ থেকে নিজেদের জীবনের সুরক্ষা লাভের বিনিময়ে সেইসব সাধারণ মানুষ অভিজাত ব্যক্তির প্রতি সীমাহীন আনুগত্য জানিয়ে তাকে সেবাদান করত। এই সম্পর্ক ‘অনুগত পৃষ্ঠপোষক সম্পর্ক' বা প্রথা নামে পরিচিত।

প্রাচীন মিশরীয় সমাজ তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। যেগুলি হল—
[1] অভিজাত শ্রেণি, [2] মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং [3] নিম্নশ্রেনি।

মিশরীয় সম্রাট, রাজপরিবার, ধনী ও সম্ভ্রান্ত পরিবার, পুরোহিত, ভিজিয়ার নামে উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসার ও অন্যান্য উচ্চবিত্তরা ছিল অভিজাত শ্রেণিভুক্ত। মিশরের বিভিন্ন ব্যবসায়ী, শিল্পী, কারিগর, নির্মাতা, শিক্ষিত সম্প্রদায় ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। নিম্নশ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিল দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক ও অন্যান্য মানুষ যারা
কায়ক্লেশে দিনযাপন করত।

মিশরীয় সেনারা পরাজিত শত্রু সৈন্যদের বন্দি করে ক্রীতদাসে পরিণত করত। এ ছাড়া দরিদ্র পিতামাতা অভাবের তাড়নায় নিজেদের অথবা নিজ সন্তানদের ক্রীতদাস হিসেবে ধনী ব্যক্তিদের কাছে বিক্রি করে দিত। ক্রীতদাসের সন্তানসন্ততিও জন্মসূত্রে ক্রীতদাসে পরিণত হত।

মিশরীয় ক্রীতদাসদের অবস্থা গ্রিস বা রোমের ক্রীতদাসদের চেয়ে অনেক বেশি সুখকর ছিল বলে কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন। মিশরীয় প্রভুরা তাদের অধীনস্থ ক্রীতদাসদের সঙ্গে যথেষ্ট সদয় ব্যবহার করত। কখনো কখনো তা সন্তানস্নেহের পর্যায়ে পৌঁছে যেত। ক্রীতদাসরা কখনো কখনো তাদের প্রভুর কন্যা বা অন্য কোনো মহিলাকে বিবাহ করতে পারত বলে জানা যায়।

মিশরের ক্রীতদাসদের মধ্যে বেশিরভাগই গৃহভৃত্য হিসেবে তাদের প্রভুর গৃহ পরিষ্কার, উদ্যান পরিচর্যা, রান্নাবান্না এবং পরিবারের নিত্যদিনের অন্যান্য যাবতীয় কাজকর্ম করত। ক্রীতদাসরা বিভিন্ন ধরনের কুটিরশিল্পের কাজেও নিযুক্ত থাকত। বহু ক্রীতদাসকে মিশরের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হয়েছিল।

মিশরের কৃষি, শিল্প ও পরিশ্রমসাধ্য নির্মাণ কাজগুলি ক্রীতদাসদের দ্বারাই সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছিল। ক্রীতদাসদের অক্লান্ত শ্রমের ফলে মিশরের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছিল । এর ফলে একদিকে যেমন মিশরের রপ্তানি বাণিজ্য বেড়েছিল, অন্যদিকে তেমনি সেদেশের আর্থিক শ্ৰীবৃদ্ধি ঘটেছিল।

লিবিয়া, মিরো, কুশ প্রভৃতি অঞ্চল থেকে মিশরে ক্রীতদাস আমদানি করা হত।

প্রাচীন রোমান, মিশরীয় ও ভারতীয় সভ্যতায় ক্রীতদাস প্রথা একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো লাভ করেছিল। এই সমস্ত অর্থনীতিতে ক্রীতদাস প্রথার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ক্রীতদাসদের শ্রমের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই অর্থনীতি দাস অর্থনীতি (Slave Economy) নামে পরিচিত।

প্রাচীন সভ্যতায় ক্রীতদাস প্রথার অস্তিত্ব
প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন সমাজব্যবস্থায় ক্রীতদাস প্রথার প্রসার ঘটেছিল বলে মনে করা হয়। পৃথিবীর প্রাচীনতম বিভিন্ন সভ্যতায় ক্রীতদাস প্রথার অস্তিত্ব থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে স্থান এবং কালভেদে ক্রীতদাসদের অবস্থার পার্থক্য ছিল।
[1] সুমেরীয় সভ্যতায়: খ্রিস্টপূর্ব ২১০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২০৫০ অব্দের মধ্যে খোদিত একটি প্রাচীন সুমেরীয় ফলকে (পৃথিবীর প্রাচীনতম ফলক) ক্রীতদাস সম্পর্কিত আইনবিধির (Code of Ur Nammu) উল্লেখ রয়েছে।
[2] ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় : হামুরাবির আইনবিধিতে প্রাচীন ব্যাবিলন সভ্যতায় ক্রীতদাস প্রথার অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
[3] মেসোপটেমীয় সভ্যতায়: সুপ্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতায় কৃষিকাজে ক্রীতদাসরা নিযুক্ত হত বলে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়।
[4] পারস্য সভ্যতায় : প্রাচীন পারস্যে যুদ্ধবন্দি ও বিদ্রোহী সেনাদের ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করা হত বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
[5] মিশরে: প্রাচীন মিশরে ক্রীতদাস প্রথার অস্তিত্ব ছিল। মিশরে অট্টালিকা ও পিরামিড নির্মাণে ক্রীতদাসরা নিযুক্ত হত।
[6] হিব্রু জাতির মধ্যে: প্রাচীন হিব্রু জাতির মধ্যেও ক্রীতদাস প্রথার প্রচলন ছিল বলে বাইবেল থেকে জানা যায়।
[7] গ্রিসে: প্রাচীন গ্রিসে ক্রীতদাস প্রথার অস্তিত্ব ছিল। গ্রিক নগর- রাষ্ট্রগুলির জনসংখ্যার একটি বড়ো অংশই ছিল ক্রীতদাস। সেখানকার গৃহ, কৃষিক্ষেত্রে, কারখানা প্রভৃতি কাজে তারা নিযুক্ত হত।
[৪] রোমে : প্রাচীন রোমে ক্রীতদাস প্রথা সবচেয়ে ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। রোমান অর্থনীতি মূলত ক্রীতদাস প্রথার ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।
[9] ভারতে : ঐতিহাসিকদের মতে, বৈদিক যুগে অনার্যরা ‘দাস’ বা ‘দস্যু’ বলে গণ্য হত। পরবর্তীকালে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে ও অশোকের লেখমালাতে দাসপ্রথার উল্লেখ পাওয়া যায়। কুষাণ ও গুপ্তযুগেও দাসব্যবস্থা চালু ছিল বলে বহু ঐতিহাসিক মনে করেন।
প্রাচীন রোমের ক্রীতদাস প্রথা
প্রাচীন রোমান সভ্যতায় ক্রীতদাস প্রথা সবচেয়ে ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। প্রাচীন রোমের ক্রীতদাস প্রথার বিভিন্ন দিকগুলি নীচে আলোচনা করা হল—
[1] ক্রীতদাস সৃষ্টি: রোমে যুদ্ধবন্দি, দারিদ্র্যের কারণে বিক্রীত বা পরিত্যক্ত শিশু, ঋণ পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তি এবং ক্রীতদাসদের সন্তানদের (জন্মসূত্রে) ক্রীতদাসে পরিণত করা হত।
[2] ব্যাপকতা : খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে সেখানকার কৃষিক্ষেত্রে ক্রীতদাসরা ব্যাপক পরিমাণে নিযুক্ত হতে থাকে। কোনো কোনো ধনী প্রভুর অধীনে ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ পর্যন্ত ক্রীতদাস থাকত বলে জানা যায়।
[3] নির্যাতন: রোমের ক্রীতদাসদের কোনো ধরনের আইনগত বা নাগরিক অধিকার ছিল না। প্রভুর ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে এই ক্রীতদাসরা সীমাহীন নির্যাতন ভোগ করতে বাধ্য হত। প্রভু তাদের বিক্রি করতে, এমনকি হত্যাও করতে পারত।

 [4] সাম্রাজ্যের পতনে ভূমিকা : নির্যাতিত ক্রীতদাসদের বারংবার বিদ্রোহের ফলে একসময় রোমান সাম্রাজ্য দুর্বল হতে শুরু করেছিল। ক্রীতদাসদের শ্রমে রোমের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটলেও শেষপর্যন্ত ক্রীতদাস প্রথা রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পথ প্রস্তুত করে দিয়েছিল।

ক্রীতদাস প্রথার বৈশিষ্ট্য
রোমের ক্রীতদাস প্রথার কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। এগুলি হল—
[1] প্রভুর ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে জীবনধারণ: রোমে ক্রীতদাসদের জীবনে কোনো ধরনের স্বাধীনতা ছিল না। তারা ছিল তাদের প্রভুর একান্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি। ক্রীতদাসদের সন্তানসন্ততিরাও জন্মসূত্রে ক্রীতদাস হত। প্রভুর কাছে ক্রীতদাসের জীবনের মূল্য ছিল গৃহপালিত গোরু-ছাগলের মতোই।
[2] আইনি অধিকার থেকে বঞ্চনা: রামের ক্রীতদাসরা সমস্ত ধরনের আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। কোনো ক্রীতদাস আইনগতভাবে কোনো সম্পত্তির মালিক বা বিবাহ করার অধিকারী হতে পারত না। তারা রোমের নির্বাচনে প্রার্থী হতে বা সেনাবাহিনীতে উচ্চপদে অভিষিক্ত হতে পারত না।
[3] বেগার শ্রম: প্রভু তার অধীনস্থ ক্রীতদাসকে গৃহে, কৃষিক্ষেত্রে, ব্যবসায়, খামারবাড়িতে যাবতীয় কাজ এবং রাষ্ট্রের পরিশ্রমসাধ্য নির্মাণকার্যগুলি করতে বাধ্য করত। এর বিনিময়ে তাদের জন্য শুধু যৎসামান্য গ্রাসাচ্ছাদন ও নামমাত্র বিশ্রামের সুযোগ থাকত।
[4] শারীরিক নির্যাতন: ক্রীতদাসের কাছ থেকে অধিক শ্রম আদায় করতে বা ক্রীতদাস পালানোর চেষ্টা করলে তাকে চাবুকের তীব্র আঘাত, উত্তপ্ত লোহার ছ্যাঁকা প্রভৃতি অমানুষিক দৈহিক শাস্তি দেওয়া হত।
[5] বিক্রি ও হত্যা : প্রভুর কাছে তার অধীনস্থ ক্রীতদাসদের কোনোরকম মানবিক মূল্য ছিল না। প্রভু ইচ্ছা করলেই তার অধীনস্থ ক্রীতদাসকে বিক্রি করতে পারত, এমনকি তাদের হত্যাও করতে পারত।

রোমে ক্রীতদাস প্রথার ব্যাপকতা

প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যে ক্রীতদাস প্রথা সবচেয়ে ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। প্রাচীন রোমের সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি প্রভৃতি সবক্ষেত্রেই ক্রীতদাস প্রথার গভীর প্রভাব ছিল।
[1] ক্রীতদাসের সংখ্যা : প্রাচীন রোমে ক্রীতদাসের সংখ্যা যথেষ্ট পরিমাণেই ছিল। বহু রোমান নাগরিকই কিছু-না-কিছু সংখ্যক ক্রীতদাসের মালিক ছিলেন। জনৈক লেখকের মতে, কোনো কোনো ধনী ব্যক্তি ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার ক্রীতদাসের মালিক ছিলেন।
[2] ক্রীতদাসদের অমানুষিক শ্রম: সমগ্র রোমান সাম্রাজ্য জুড়ে প্রভুরা তাদের অধীনস্থ ক্রীতদাসদের শ্রম শোষণ করত। ক্রীতদাসদের শ্রমেই রোমের বেশিরভাগ গৃহকার্য, কৃষি উৎপাদন, প্রভুর ব্যাবসাবাণিজ্য, প্রাসাদ রাস্তাঘাট-সেতু নির্মাণ, জলপ্রণালী নির্মাণকার্য প্রভৃতি সম্পন্ন হত।
[3] নাগরিকদের ক্রীতদাস-নির্ভরতা : ইতিহাসবিদ গ্রান্ট বলেছেন যে, “স্বাধীন রোমান নাগরিকরা ক্রীতদাসদের শ্রমের ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন যে, তারা নিজেদের পোশাক পরা, স্নান করতে যাওয়ার সময় পোশাক বহন করা, রান্নাবান্না প্রভৃতি অতি সাধারণ কাজগুলিও ক্রীতদাসদের সহায়তায় সম্পন্ন করতেন।"
[4] রাষ্ট্রের ভূমিকা: ক্রীতদাসের মালিকের কাছ থেকে সরকার ক্রীতদাস রাখার কর হিসেবে প্রচুর অর্থ আদায় করত। সুতরাং, প্রচুর পরিমাণে কর আদায়ের উদ্দেশ্যে সরকার ক্রীতদাস প্রথাকে সমর্থন করত। এ ছাড়াও রাষ্ট্র, সেনাবাহিনীতে প্রচুর ক্রীতদাসকে সামরিক কাজে নিযুক্ত করত।
উপসংহার: প্রাচীনযুগে বিভিন্ন সভ্যতায় বা সাম্রাজ্যে ক্রীতদাস প্রথার প্রচলন থাকলেও অন্যান্য সভ্যতার তুলনায় রোমান সভ্যতায় ক্রীতদাসরা অনেক বেশি নির্যাতনের শিকার হত। সীমাহীন নির্যাতনের শিকার হয়ে
ক্রীতাদাসরা মাঝেমধ্যেই বিদ্রোহের পথে পা বাড়াত।

প্রাচীন রোমের ক্রীতদাসদের কাজ
প্রাচীন রোমে ক্রীতদাস ব্যবস্থা সেখানকার অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। রোমের ক্রীতদাসরা তাদের প্রভুর রাষ্ট্রেরও বিভিন্ন কাজ করত।
[1] গৃহকার্য: ক্রীতদাসরা তাদের প্রভুর পরিবারের যাবতীয় কাজ করে দিত। পরিবারের রান্নাবান্না, ঘরদোর পরিষ্কার, উদ্যান পরিচর্যা প্রভৃতি গৃহের যাবতীয় কাজ ক্রীতদাসদের করতে হত। ফলে প্রভুর পরিবারে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও বিলাসিতা বৃদ্ধি পেত।
[2] কৃষি ও খামারের কাজ : ক্রীতদাসরা তাদের প্রভুর কৃষিকাজে নিযুক্ত থেকে খাদ্যশস্য ও বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন করত। রোমান সাম্রাজ্যের শহরগুলি ক্রীতদাসদের উৎপাদিত পণ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
[3] ব্যাবসাবাণিজ্যের কাজ : ক্রীতদাসরা প্রভুর অনুপস্থিতিতে প্রভুর দোকান পরিচালনা করত, ক্ষৌরকর্ম করত, সুদে টাকা ধার দিত ইত্যাদি।
[4] নির্মাণকার্য : ক্রীতদাসদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল সাধারণ গৃহ, অট্টালিকা, পাকা পয়ঃপ্রণালী, রাস্তাঘাট, মল্লভূমি বা ক্রীড়াক্ষেত্র, সেতু প্রভৃতি নির্মাণ করা। এইসব পরিশ্রমসাধ্য কাজগুলি ক্রীতদাসরা সম্পন্ন
করার ফলে রোম সুন্দরভাবে সেজে উঠেছিল।
[5] কর্মকারের কাজ : ক্রীতদাসরা কাঠ মিস্ত্রি এবং কামার হিসেবেও কাজ করত। তারা বিভিন্ন ভাঙা সামগ্রী, ঠেলাগাড়ি ইত্যাদি সারাই করত এবং ভেড়ার লোম পাকিয়ে বিভিন্ন বস্তু উৎপাদন করত।
[6] সৈন্যবাহিনীতে কাজ: শত্রুপক্ষের বহু সৈন্য বন্দি হয়ে রোমে ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছিল। এরূপ ক্রীতদাসদের অনেককেই যোদ্ধা হিসেবে রোমান সেনাবাহিনীতে কাজ করতে হত।
ক্রীতদাসদের জীবনযাত্রা
অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য কাজ করা, প্রচণ্ড শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার ফলে ক্রীতদাসদের জীবন অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল।
[1] বিক্রি ও হত্যা: ক্রীতদাসরা ছিল তাদের প্রভুর ব্যক্তিগত সম্পত্তি। প্রভু ইচ্ছা করলে তাদের বাজারের পণ্যের মতো বিক্রি করতে বা পশুর মতো হত্যাও করতে পারত।
[2] শারীরিক নির্যাতন: ক্রীতদাসের মালিক তার অধীনস্থ ক্রীতদাসকে দিয়ে বেশি কাজ করানোর উদ্দেশ্যে তার ওপর সর্বদা শারীরিক নির্যাতন চালাত। এর ফলে ক্রীতদাসের দেহে সারা বছরই ঘা ও কালচে দাগ হয়ে থাকত।
[3] শৃঙ্খলিত পশুর জীবন: ক্রীতদাসরা যাতে পালাতে না পারে, সেজন্য বাড়ির গৃহপালিত পশুর মতো ক্রীতদাসের হাতে-পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হত।
[4] পতিতাবৃত্তিতে নিয়োগ : কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভুরা তাদের অধীনস্থ যুবতি ক্রীতদাসীদের পতিতালয়ে বিক্রি করে তাদের পতিতাবৃত্তির কাজে লাগিয়ে প্রভূত অর্থ উপার্জন করত।
[5] পালানোর চেষ্টার শাস্তি: কোনো ক্রীতদাস পালানোর চেষ্টা করলে তাকে চাবুক দিয়ে পেটানো বা উত্তপ্ত লোহার ছ্যাঁকা দেওয়া হত।
[6] গ্ল্যাডিয়েটরের জীবন: রোমের নাগরিকদের আনন্দ দানের উদ্দেশ্যে গ্ল্যাডিয়েটর নামের ক্রীতদাস যোদ্ধাদের ক্ষুধার্ত হিংস্র পশুর সঙ্গে লড়তে হত।অধিকাংশ ক্ষেত্রে গ্ল্যাডিয়েটরদের মৃত্যু হত।
[7] ক্রীতদাস পরিবারের দুর্ভোগ : ক্রীতদাসের পরিবারের সদস্যরাও প্রভুর দাসে পরিণত হত এবং তারাও একই ধরনের শাস্তি ও নির্যাতন ভোগ করত।
উপসংহার: সর্বদা অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার এসব ক্রীতদাসদের জীবন ছিল অন্ধকারে ঢাকা। তবে বিরল ক্ষেত্রে প্রভু ও ক্রীতদাসের ভালো সম্পর্কও দেখা যেত।

রোমে ক্রীতদাস ক্রয়বিক্রয়ের বাজার
প্রাচীন রোমে ক্রীতদাস ক্রয়বিক্রয়ের প্রথা বহুল প্রচলিত হয়ে উঠেছিল। গৃহপালিত পশু বিক্রির মতো দাস বাজারে পণ্য হিসেবে ক্রীতদাসদের ক্রয়বিক্রয় চলত।
[1] যুদ্ধবন্দিদের বিক্রি: একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারীর তদারকির ক্রীতদাস বিক্রির বিষয়টি সম্পন্ন হত। রোমান সেনারা পাইকারি। ব্যবসায়ীদের কাছে ক্রীতদাসদের বিক্রি করত।
[2] ক্রীতদাস বাজার: পাইকারি ব্যবসায়ীরা দাস বাজারে ক্রীতদাসদের বিক্রি করতে নিয়ে আসত। পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ডেলোস ছিল একটি বড়ো ক্রীতদাস বাজার।

[3] ক্রীতদাসের বিবরণী : বিক্রির উদ্দেশ্যে বাজারে হাজির করা ক্রীতদাসের গলায় একটি বোর্ড ঝুলিয়ে তার বিবরণ দেওয়া হত। কেনার পর যদি ক্রীতদাসটির কোনো ত্রুটি ধরা পড়ত, তবে ছয় মাসের মধ্যে ক্রেতা তাকে বিক্রেতার কাছে ফেরত দিতে পারত।
[4] ক্রীতদাস ব্যাবসার আয়: ক্রীতদাস ক্রয়বিক্রয়ের ব্যাবসা অত্যন্ত লাভজনক ছিল। ক্রীতদাসদের বিক্রির ওপর থেকে সরকারও কর আদায় করত।
[5] ক্রীতদাসদের বাজারদর : রোমের বাজারে কখনো কখনো ক্রীতদাসের দামের ভীষণ তারতম্য হত। অশক্ত, অসুস্থ ও বৃদ্ধ ক্রীতদাসদের মূল্য কম হলেও শক্তসমর্থ ও শিক্ষিত ক্রীতদাস এবং সুন্দরী ক্রীতদাসীর মূল্য ছিল অত্যন্ত চড়া।
সাম্রাজ্যের দুর্বলতায় ক্রীতদাস প্রথার ভূমিকা
ক্রীতদাস প্রথা পরবর্তীকালে রোমের আপাত সমৃদ্ধি ঘটালেও এই প্রথা পরবর্তীকালে রোমান সভ্যতার ভিত্তি দুর্বল করে দিয়েছিল।
[1] সমাজের অগ্রগতিতে বাধা: উৎপাদনের সুফল না পাওয়ার ক্রীতদাসরা তাদের কাজে যথেষ্ট আন্তরিক হতে পারত না। ফরে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে রোমের অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছিল।
[2] কর্মবিমুখতা: ইতিহাসবিদ গ্রান্ট বলেছেন যে, “প্রাত্যহিক জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ কাজের ক্ষেত্রেও নাগরিকরা ক্রীতদাসদের ওপর নির্ভরশীর হয়ে পড়েছিল।" এভাবে রোমান নাগরিকরা সম্পূর্ণ কর্মবিমুখ হয়ে পড়েছিল।
[3] অর্থসংকট: ক্রীতদাসদের সহায়তায় ধনীদের জীবনে যে স্বাচ্ছন্দ এসেছিল, দরিদ্রদের সেই স্বাচ্ছন্দ্যের স্বাদ দিতে রোমান প্রজাতান্ত্রিক সরকার রাজকোশের বেশিরভাগ অর্থ ব্যয় করত। ফলে রাজকোশে অর্থসংকট দেখা দেয়।
[4] সামরিক দুর্বলতা: অর্থসংকটের ফলে রোমান সরকার সামরিক বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় বরাদ্দ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে যুবকরা সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বা যুদ্ধে অংশ নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। ক্রমে সামরিক দুর্বলতা প্রকট হলে প্রাচীন রোমান সভ্যতার পতন ঘটে।
উপসংহার: দাসব্যাবসা প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের সমাজ ও অর্থনীতির একটি স্বাভাবিক বিষয় হলেও তা পরবর্তীকালে সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ক্রীতদাসদের পালানোর চেষ্টার কারণ
প্রাচীন রোমের ক্রীতদাসরা দুর্বিষহ জীবন অতিবাহিত করত। তাই দাসত্বের জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তারা প্রায়শই পালিয়ে যাওয়ার বা আত্মহত্যার চেষ্টা করত।
[1] পরাধীনতার গ্লানি: রোমের সমাজজীবনে ক্রীতদাসদের কোনো ধরনের স্বাধীনতা ছিল না। তারা সব ধরনের রাষ্ট্রীয় আইনের সুযোগসুবিধা থেকেই বঞ্চিত ছিল। পণ্য কিংবা পশুর মতো প্রভু তাদের দেহ ও মন কিনে নিত। এই চরম পরাধীনতার গ্লানি ক্রীতদাসদের মনকে তিত্ত করে তুলত।
[2] পাশবিক পরিশ্রম : ক্রীতদাসকে তার প্রভুর যাবতীয় পরিশ্রমসাধ্য কাজগুলি সম্পন্ন করতে দিনরাত্রি পাশবিক পরিশ্রম করতে হত। রোমের বৃহদাকার অট্টালিকা, রাস্তা, সেতু, জলপ্রণালী প্রভৃতির পরিশ্রমসাধ্য
কাজগুলি ক্রীতদাসদের দিয়েই করানো হত। প্রভুর চাষের জমি, খামারবাড়ি ও অন্যান্য যাবতীয় ক্ষেত্রে পরিশ্রমের কাজও ক্রীতদাসদেরই করতে হত।
[3] ক্ষুধার জ্বালা: ক্রীতদাসরা অমানুষিক পরিশ্রম করা সত্ত্বেও প্রভুরা তাদের পর্যাপ্ত খাবার ও পোশাক দিত না। তারা প্রতিদিন অনাহারে, অধাহারে থেকে শ্রমদানে বাধ্য হত।
[4] মানুষের অধিকার থেকে বঞ্চনার জ্বালা: রোমান আইনে ক্রীতদাসদের সম্পত্তির মালিক হওয়ার বা বিবাহ করার কোনো অধিকার ছিল না। ফলে পারিবারিক জীবনের আস্বাদ থেকে বঞ্চিত ক্রীতদাসদের জীবনে বেঁচে থাকার কোনো আনন্দ ছিল না।
[5] কঠোর নির্যাতন ও নৃশংস হত্যার আতঙ্ক: কারণে-অকারণে ক্রীতদাসদের ওপর তীব্র শারীরিক নির্যাতন চালানো হত। প্রভু বাড়তি লাভের উদ্দেশ্যে তার অধীনস্থ ক্রীতদাসদের অন্যত্র ভাড়াও খাটাত। প্রভু তার মর্জিমতো অধীনস্থ ক্রীতদাসকে হত্যাও করত।
দাসত্বের জীবন থেকে মুক্তির উপায়
সবাই না হলেও রোমের কোনো কোনো ক্রীতদাস সে যুগের নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন উপায়ে দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করতে সক্ষম হত।
[1] ক্ষতিপূরণ: কোনো কোনো ক্রীতদাস দীর্ঘদিন ধরে বেশ কিছু পরিমাপ শর্থ সক্ষ্য করে তার প্রভুর হাতে তুলে দিলে প্রভুর যথেষ্ট আর্থিক সমৃদ্ধি ঘটত এবং এর বিনিময়ে ক্রীতদাসটি তার মুক্তি ভিক্ষা বা মুক্তি ক্রয় করতে পারত।
[2] প্রভুকে সেবা: অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন কর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রভুর সেবা করার পুরস্কার হিসেবে কোনো কোনো প্রভু তার অধীনস্থ ক্রীতদাসকে দাসত্ব থেকে কখনো কখনো মুক্তি দিত।
[3] আনুগত্য প্রদর্শন: প্রভুর প্রতি ক্রীতদাসের আজীবন গভীর আনুগত্যের প্রদর্শনের ফলে কোনো দয়াশীল প্রভু কখনো কখনো তার অধীনস্থ ক্রীতদাসকে মুক্তি দিত।
[4] প্রভুর প্রাণরক্ষা: ক্রীতদাস নিজের জীবন বিপন্ন করে কোনো বিপদসংকুল ঘটনা থেকে তার প্রভুর প্রাণরক্ষা করলে প্রভু খুশি হয়ে কখনো কখনো তার প্রাণরক্ষাকারী ক্রীতদাসটিকে মুক্তি দিত।
[5] গ্ল্যাডিয়েটরদের মুক্তি : মল্লভূমিতে হিংস্র পশুর সঙ্গে লড়াই করে জয়লাভ করা গ্ল্যাডিয়েটর নামের ক্রীতদাসদের বীরত্বের সম্মান হিসেবে অনেক সময় মুক্তি দেওয়া হত।
[6] ম্যাজিস্ট্রেটের ভূমিকা: রোমান সিনেটের অনুমোদন প্রদানের মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেটরা কোনো কোনো ক্রীতদাসকে মুক্তি দিতে পারতেন।
উপসংহার: রোমের ক্রীতদাসদের মুক্তির বিভিন্ন উপায় থাকলেও বাস্তবে সেগুলি কার্যকরী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম—সাগরের বিপুল জলরাশির মধ্যে একবিন্দু জলের মতোই।

ক্রীতদাস বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট

ক্রীতদাসদের জীবনযাত্রা
অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য কাজ করা, প্রচণ্ড শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার ফলে ক্রীতদাসদের জীবন অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল।
[1] বিক্রি ও হত্যা: ক্রীতদাসরা ছিল তাদের প্রভুর ব্যক্তিগত সম্পত্তি। প্রভু ইচ্ছা করলে তাদের বাজারের পণ্যের মতো বিক্রি করতে বা পশুর মতো হত্যাও করতে পারত।
[2] শারীরিক নির্যাতন: ক্রীতদাসের মালিক তার অধীনস্থ ক্রীতদাসকে দিয়ে বেশি কাজ করানোর উদ্দেশ্যে তার ওপর সর্বদা শারীরিক নির্যাতন চালাত। এর ফলে ক্রীতদাসের দেহে সারা বছরই ঘা ও কালচে দাগ হয়ে থাকত।
[3] শৃঙ্খলিত পশুর জীবন: ক্রীতদাসরা যাতে পালাতে না পারে, সেজন্য বাড়ির গৃহপালিত পশুর মতো ক্রীতদাসের হাতে-পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হত।
[4] পতিতাবৃত্তিতে নিয়োগ : কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভুরা তাদের অধীনস্থ যুবতি ক্রীতদাসীদের পতিতালয়ে বিক্রি করে তাদের পতিতাবৃত্তির কাজে লাগিয়ে প্রভূত অর্থ উপার্জন করত।
[5] পালানোর চেষ্টার শাস্তি: কোনো ক্রীতদাস পালানোর চেষ্টা করলে তাকে চাবুক দিয়ে পেটানো বা উত্তপ্ত লোহার ছ্যাঁকা দেওয়া হত।
[6] গ্ল্যাডিয়েটরের জীবন: রোমের নাগরিকদের আনন্দ দানের উদ্দেশ্যে গ্ল্যাডিয়েটর নামের ক্রীতদাস যোদ্ধাদের ক্ষুধার্ত হিংস্র পশুর সঙ্গে লড়তে হত।অধিকাংশ ক্ষেত্রে গ্ল্যাডিয়েটরদের মৃত্যু হত।
[7] ক্রীতদাস পরিবারের দুর্ভোগ : ক্রীতদাসের পরিবারের সদস্যরাও প্রভুর দাসে পরিণত হত এবং তারাও একই ধরনের শাস্তি ও নির্যাতন ভোগ করত।

প্রধান কয়েকটি ক্রীতদাস বিদ্রোহ
খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে গ্রিক ইতিহাসবিদ ডায়োডোরাস গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ক্রীতদাস বিদ্রোহের উল্লেখ করেছেন—
[1] প্রথম ক্রীতদাস বিদ্রোহ: রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম ক্রীতদাস বিদ্রোহ ইউনুস নামে জনৈক ক্রীতদাসের নেতৃত্বে সিসিলির এন্না অঞ্চলে শুরু হয়েছিল। ১৩৫ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ১৩২ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত এই বিছলেছি চলেছিল। প্রথম দিকে বিদ্রোহীরা কিছুটা সাফল্য পেলেও বিশাল রোমান সেনাবাহিনী শীঘ্রই বিদ্রোহীদের পরাজিত করে।
[2] দ্বিতীয় ক্রীতদাস বিদ্রোহ: রোমান সাম্রাজ্যের নির্যাতিত ক্রীতদাসরা দ্বিতীয়বার বিদ্রোহ শুরু করেছিল ১০৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।সিসিলি দ্বীপে ছড়িয়ে পড়া এই বিদ্রোহও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় (১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)।
[3] তৃতীয় ক্রীতদাস বিদ্রোহ: তৃতীয় ক্রীতদাস বিদ্রোহটি ছিল। রোমের সবচেয়ে বড়ো ও গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহ। ৭৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৭১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এই বিদ্রোহ চলেছিল। জেল থেকে পালিয়ে আসা ক্রীতদাসদের এই বিদ্রোহে নেতৃত্বে দিয়েছিলেন স্পার্টাকাস। দীর্ঘ দু-বছর ধরে চলা প্রায় ৭০,০০০ ক্রীতদাসের এই বিদ্রোহ শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
ক্রীতদাসদের অধিকারের স্বীকৃতি
রোমে বিভিন্ন সময়ে ক্রীতদাস বিদ্রোহের ফলে বিভিন্ন রোমান সম্রাট ক্রীতদাসদের কিছু কিছু অধিকার দেন।
[1] ক্লডিয়াসের ঘোষণা : রোমান সম্রাট ক্লডিয়াস ঘোষণা করেন যে, “যদি কোনো প্রভু তার ক্রীতদাসকে ক্রীতদাসদের আইনি পরিত্যাগ করে তবে সেই ক্রীতদাস স্বাধীন বা যুক্ত বলে বিবেচিত হবে।”

[2] নিরোর ঘোষণা: রোমান সম্রাট নিরো প্রভুর অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্রীতদাসকে আদালতে অভিযোগ জানানোর অধিকার দেন।
[3] আইনি সুরক্ষা: সাম্রাজ্যের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে রোমে সুরক্ষাও বৃদ্ধি পেতে থাকে।
[4] প্রভুর বিরুদ্ধে অভিযোগের সুযোগ লাভ: খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক থেকে রোমে নিষ্ঠুর প্রভুর বিরুদ্ধে ক্রীতদাসরা অভিযোগ জানানোর সুযোগ পায় ।
[5] খ্রিস্টধর্মের উদ্যোগ : পরবর্তীকালে খ্রিস্টধর্মের কোনো কোনো মহৎ মানুষ ক্রীতদাসদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া প্রদানের দাবিতে সরব হয়েছিল। এভাবেই ক্রীতদাসদের দাবিদাওয়া আস্তে আস্তে খ্রিস্টধর্মের স্বীকৃতি লাভ করতে থাকে।
উপসংহার: প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের শক্তির তুলনায় বিদ্রোহী ক্রীতদাসদের শক্তি ছিল মহাকাশের উল্কার মতো আলোকবিন্দু মাত্র।কিন্তু বিভিন্ন ক্রীতদাস বিদ্রোহের ফলে রোমান সম্রাটগণ ক্রীতদাসদের যেসব অধিকার দিয়েছিলেন তাতে তাঁদের জীবনে সামান্য হলেও কিছু সুপরিবর্তন এসেছিল।

 

প্রাচীন মিশরীয় সমাজের শ্রেণিবিন্যাস
মিশর হল সুপ্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি।রাজতন্ত্রের যুগে প্রাচীন মিশরের সমাজ সমাজ প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। এগুলি হল—
[1] অভিজাত শ্রেণি: মিশরের সম্রাট, রাজপরিবার, ধনী ভূস্বামী, পুরোহিত, উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা (ভিজিয়ার) ও অন্যান্য উচ্চবিত্তদের নিয়ে মিশরের সমাজে অভিজাত শ্রেণি গড়ে উঠেছিল। সমাজে তারা সর্বাধিক প্রভাব-প্রতিপত্তি ও বিশেষ সুযোগসুবিধা ভোগ করত।
[2] মধ্যবিত্ত শ্রেণি : ব্যবসায়ী, নির্মাতা, শিল্পী, কারিগর ও শিক্ষিতদের নিয়ে মিশরের মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছিল। এই শ্রেণি মোটামুটি স্বাচ্ছন্দ্যেই জীবন কাটাত।
[3] নিম্নশ্রেণি: মিশরীয় সমাজব্যবস্থায় ক্ষুদ্র কৃষক, শ্রমিক, অন্যান্য দরিদ্র শ্রেণি ও বিপুল সংখ্যক ক্রীতদাসদের নিয়ে সমাজের নিম্নশ্রেণি গড়ে উঠেছিল।
মিশরের ক্রীতদাস প্রথা
প্রাচীন রোমান সভ্যতার মতো প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায়ও ক্রীতদাস প্রথার অস্তিত্ব ছিল। তবে মিশরের ক্রীতদাসদের বাস্তব অবস্থা প্রাচীন গ্লিস বা রোমের ক্রীতদাসদের থেকে আলাদা ছিল।
[1] প্রাচীন মিশরে 'ক্রীতদাস' শব্দের অর্থ: প্রাচীন মিশরের ‘ক্রীতদাস’ ছিলেন তারা, যারা কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের সম্পত্তি হিসেবে তার মালিকের গোলামি বা দাসত্ব করত। এই অর্থে মিশরের ক্রীতদাসরা তাদের মালিকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল। তবে মিশরে তারা কিছু কিছু নাগরিক অধিকারও ভোগ করত।
[2] ক্রীতদাস প্রথার ব্যাপকতা: প্রাচীন মিশরে ক্রীতদাস প্রথার ব্যাপকতা ছিল। মিশরীয় ফ্যারাও তৃতীয় থুটমোস একটি প্রতিবেদনে জানাচ্ছেন যে, ক্যানান অভিযান থেকে ফেরার সময় তিনি প্রায় ৯০ হাজার যুদ্ধবন্দিকে এনে ক্রীতদাসে পরিণত করেন। এ থেকেই সেদেশে ক্রীতদাস প্রথার ব্যাপকতার আভাস পাওয়া যায়।
[3] ক্রীতদাস সংগ্রহ: মিশরে বিভিন্ন উপায়ে ক্রীতদাস সংগ্রহ হত— [i] শত্রুপক্ষের সৈন্যদের পরাজিত ও বন্দি করা। [ii] অভাবের তাড়নায় দরিদ্র পিতামাতাদের নিজেদের বা তাদের সন্তানদের ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া। [iii] মহাজন কর্তৃক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ ব্যক্তিকে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া। [iv] কোনো ক্রীতদাসের সপ্তানসন্ততিও জন্মসূত্রে পিতামাতার প্রভুর ক্রীতদাসে পরিণত হত। [v] কেউ কেউ আবার দেবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতে স্বেচ্ছায় ক্রীতদাসত্ব বরণ করত।
[4] ক্রীতদাস ব্যাবসা: মিশরে ক্রীতদাস ব্যাবসার প্রচলন হয়েছিল। দাস ক্রয়বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে সেদেশে দাস বাজার গড়ে উঠেছিল। ক্রীতদাস বাজারে পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি মূল্যে বিক্রি হত।
উপসংহার: ক্রীতদাস প্রথা প্রাচীন মিশরের সমাজ ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হয়ে উঠেছিল ঠিকই, তবে পরবর্তীকালের রোমান সাম্রাজ্যে ক্রীতদাস প্রথার যে ব্যাপকতা দেখা গিয়েছিল ততটা ব্যাপকতা মিশরে দেখা যায়নি।

প্রাচীন মিশরে ক্রীতদাস প্রথার অস্তিত্ব সম্পর্কে বিতর্ক
প্রাচীন মিশরের ক্রীতদাসদের প্রকৃত অর্থে ক্রীতদাস পর্যায়ভুক্ত করা যায় কি না বা তাদের ক্রীতদাসের পর্যায়ভুক্ত করলেও সেখানে ক্রীতদাস প্রথা কতটা ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল, মিশরে ক্রীতদাস প্রথার স্বরূপ কেমন ছিল প্রভৃতি বিষয়ে যথেষ্ট বিতর্ক লক্ষ করা যায়।
[1] ভৃত্য ও দাসদের সাদৃশ্য সম্পর্কিত বিতর্ক: বিভিন্ন ঐতিহাসিক উপাদানে মিশরীয় ক্রীতদাসদের ভূতাদের থেকে পৃথক করার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট পরিচয় বা চিহ্ন পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের সাধারণ স্বাধীন মানুষের পর্যায়ভুক্ত বলেই মনে হয়। একারণেই অনেক ঐতিহাসিক প্রাচীন মিশরের ক্রীতদাসদের আসলে একপ্রকার ভৃত্য বলেই মনে করেন।
[2] নির্মাণকার্যে ক্রীতদাসদের ভূমিকার বিষয়ে বিতর্ক: একসময় মনে করা হত যে, মিশরের পিরামিড ও অন্যান্য বিশালাকার অট্টালিকাগুলি ক্রীতদাসরাই নির্মাণ করত। কিন্তু সাম্প্রতিক কালের ঐতিহাসিকরা এই নির্মাণে ক্রীতদাসদের ভূমিকার কথা স্বীকার করেন না। কেননা, যে সময় পিরামিডগুলি নির্মিত হয়েছিল তার পরবর্তীকালেই মিশরে ক্রীতদাস প্রথার প্রসার ঘটে বলে মনে করা হয়।
সিদ্ধান্ত: প্রাচীন মিশরের অর্থনীতিতে ক্রীতদাসদের ভূমিকা সম্পর্কে উপরোক্ত বিরোধিতাগুলি লক্ষ করা যায়। তবুও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, প্রাচীন মিশরে ক্রীতদাস প্রথার প্রচলন ছিল না।
প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় ক্রীতদাসদের জীবন
প্রাচীন মিশরে ক্রীতদাসদের অবস্থা কতটা দুর্বিষহ ছিল তা নিয়ে বিতর্ক লক্ষ করা যায়। কেন না, কোনো কোনো সূত্র থেকে মিশরে ক্রীতদাসদের দুর্বিষহ জীবনের চিত্র পাওয়া গেলেও তাদের কিছুটা স্বাভাবিক
জীবনচিত্রের সন্ধানও পাওয়া যায়।
[1] কঠোর পরিশ্রমের জীবন: কোনো কোনো সূত্র থেকে মিশরের ক্রীতদাসদের করুণ জীবনচিত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। মিশরে তাদের গৃহভৃত্য হিসেবে, বিপদসংকুল খনিগর্ভে, বিশালকায় অট্টালিকার বিভিন্ন কাজে ও অন্যান্য পরিশ্রমসাধ্য নির্মাণকার্যে নিযুক্ত থাকতে হত।
[2] অপেক্ষাকৃত সহনীয় জীবন: বহু উদাহরণ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, মিশরে ক্রীতদাস প্রথার তীব্রতা রোম বা গ্রিসের ক্রীতদাসদের তুলনায় কম ছিল। প্রাচীন মিশরে অধিকাংশ ক্রীতদাসই গৃহভৃত্য হিসেবে কাজ করত এবং তার প্রভু ইচ্ছা করলে অর্থ দিয়ে সেই ক্রীতদাসকে পরিবর্তন করতে পারত। মিশরের প্রাচীন শিলালিপির মানবিক চিত্রগুলিতেও ক্রীতদাসদের দুর্বিষহ জীবনের সন্ধান পাওয়া যায় না।
[3] প্রভুর আচরণ: কখনো কখনো মিশরের ক্রীতদাসদের সঙ্গে তাদের প্রভুরা সদয় আচরণও করত বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। মিশরে কোনো কোনো ক্রীতদাস তার প্রভুর কন্যাকে বা কোনো স্বাধীন মহিলাকে বিবাহ করতে
পারত।

মিশরে ক্রীতদাস সৃষ্টির উপায়
প্রাচীন মিশরে বিভিন্ন উপায়ে ক্রীতদাস সৃষ্টি হত--
[1] যুদ্ধে বন্দি হওয়া: মিশরের ফ্যারাওরা বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শত্রুপক্ষের বহু সৈন্য ও সাধারণ নাগরিককে বন্দি করত। বন্দিদের ক্রীতদাসে পরিণত করা হত। বন্দিদের স্ত্রী এবং সন্তানরাও ক্রীতদাসে পরিণত হত।
[2] ঋণ পরিশোধে অক্ষমতা: কখনো কখনো ঋণের দায়ে বাধা পড়া ব্যক্তিটিকে ঋণদাতা ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দিতে পারত।
[3] দারিদ্র্যের তাড়না: কেউ কেউ অত্যন্ত দারিদ্র্যের তাড়নায় নিজেদের ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দিত। কখনো কখনো দরিদ্র পিতামাতা তাদের সন্তানদেরও ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দিত।
[4] স্বেচ্ছায় দাসত্ববরণ: কোনো কোনো নারী ক্রীতদাসী হিসেবে দেবমন্দিরে নিজেদের উৎসর্গ করত।
[5] অপহরণের মাধ্যমে: কখনো কখনো কোনো পুরুষ বা মহিলাকে এবং মিশর ভ্রমণে আসা বিদেশিদের অপহরণ করে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হত।
[6] জন্মসূত্রে : কোনো ক্রীতদাসের সন্তানসন্ততি জন্মসূত্রে তাদের প্রভুর ক্রীতদাসে পরিণত হত।
[7] আইনভঙ্গ দ্বারা: মিশরের রাষ্ট্রীয় আইনভঙ্গকারীকে অনেক ক্ষেত্রে কঠোর শান্তি হিসেবে ক্রীতদাসে পরিণত করা হত।
মিশরের ক্রীতদাস ব্যাবসার নানা দিক
প্রাচীন মিশরে দাস ব্যাবসা ততটা ব্যাপক আকার ধারণ করেনি। ফ্যারাওদের যুগে মিশরে সম্ভবত কোনো ক্রীতদাস বাজারের অস্তিত্ব ছিল না। তবে মিশরে নয়া রাজ্যের যুগ থেকে ক্রীতদাস ব্যাবসার গতি বৃদ্ধি পেতে থাকে।
[1] ক্রীতদাসের বাজারদর: মিশরে ক্রীতদাসের মূল্য ধনী পরিবারগুলির আয়ত্তের মধ্যেই থাকত। পুরুষ ক্রীতদাসদের চেয়ে মহিলা ক্রীতদাসীদের মূল্য বেশি হত।
[2] আন্তর্জাতিক ক্রীতদাস বাজার: মিশরের ক্রীতদাস ব্যাবসা আন্তর্জাতিক চরিত্র লাভ করেছিল। বিশেষ গুণাগুণবিশিষ্ট ক্রীতদাসদের মিশর থেকে বিদেশেও চালান করা হত। বিদেশের বাজারে মিশরের ক্রীতদাসদের যথেষ্ট চাহিদা ও বাজারদর ছিল।

[3] ক্রীতদাসের চাহিদা: যুদ্ধে শত্রুপক্ষের সৈনিক ও সাধারণ মানুষ - উভয়ই বন্দি হত। তবে মিশরীয়রা শরূপক্ষের সাধারণ বন্দিদের চেয়ে সব বন্দি সৈনিকদেরই বেশি পছন্দ করত। কারণ, তারা অন্য ক্রীতদাসদে
তুলনায় বেশি পরিশ্রমসাধ্য কাজ করতে পারত।
[4] ক্রীতদাস ব্যাবসায় লাভ: মিশরের ক্রীতদাস কেনাবেচা খুব লাভজনক হওয়ায় ধনী ব্যবসায়ীরা অনেকেই এই ব্যাবসার দিকে ঝুঁকেছিল।
উপসংহার: মিশরের ক্রীতদাসরা সেদেশের ধনী প্রভুদের যাবতীয় কাজকর্ম করার মাধ্যমে তাদের পারিবারিক জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসত। এর ফলে মিশরে ক্রীতদাসদের চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং সেই চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই সেদেশে দাস ব্যাবসার প্রচলন হয়।

প্রাচীন মিশরে ক্রীতদাসদের কাজ
প্রাচীন মিশরে নাগরিকদের জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি করতে ক্রীতদাসদের বিভিন্ন পরিশ্রমসাধ্য এবং সাধারণ কাজকর্মে নিযুক্ত করা হত।
[1] গৃহভৃত্যের কাজ: মিশরের অধিকাংশ ক্রীতদাস গৃহভৃত্য হিসেবে গৃহের রান্নাবান্না, গৃহ পরিষ্কার, উদ্যান পরিচর্যা ইত্যাদি কাজ সম্পন্ন করে তাদের প্রভুর পারিবারিক জীবনে অধিক বিলাসিতা নিয়ে আসত।
[2] শ্রমিকের কাজ: মিশরের অনেক ক্রীতদাসকে বিভিন্ন খনিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হত। বহু ক্রীতদাসকে নুবিয়া ও সিনাই-এর বিপদসংকুল সোনার ও তামার খনির কাজে নিযুক্ত করা হয়েছিল।
[3] অভিজাতদের সম্পত্তি তদারকির কাজ : বহু ক্রীতদাস ফ্যারাও, অভিজাত ও পুরোহিতদের স্থাবর সম্পত্তিতে মজুরের কাজে নিযুক্ত হত ও তার তদারকি করত।
[4] সেনাবাহিনীতে কাজ : সৈনিক হিসেবে অভিজ্ঞতা থাকার কারণে কোনো কোনো যুদ্ধবন্দি ক্রীতদাসকে সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত করা হত।
[5] করণিকের কাজ : কোনো কোনো ক্রীতদাস তার প্রভুর ব্যাবসা বা অন্যান্য কাজে হিসাবরক্ষক বা করণিক হিসেবে কাজ করত।
[6] বিনোদন শিল্পীর কাজ : ক্রীতদাসদের মধ্যে অনেকে নৃত্যশিল্পী, সংগীতশিল্পী প্রভৃতি হিসেবেও কাজ করত।
[7] বিশেষ সুবিধাজনক কাজ: তবে ক্রীতদাসদের বিভিন্ন কাজের মধ্যে বিশেষ সুবিধাজনক ছিল অভিজাত ও ধনী পরিবারের কাজে নিযুক্ত থাকা। অভিজাতদের পারিবারিক কাজে নিযুক্ত ক্রীতদাসদের সন্তানরা বিশেষ মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে প্রভুর প্রিয় পাত্র হয়ে উঠতে পারত। সেক্ষেত্রে তার পক্ষে উচ্চ সরকারি পদলাভ, দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভের পর পূর্বতন প্রভুর পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কস্থাপন প্রভৃতিও সম্ভব হত।
প্রাচীন মিশরীয় অর্থনীতিতে ক্রীতদাস প্রথার প্রভাব
মিশরীয় অর্থনীতির কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্রীতদাসদের ভূমিকা যথেষ্ট ছিল।
[1] শ্রমিকের ভূমিকায়: বিভিন্ন খনি থেকে ক্রীতদাসদের দ্বারা উৎপাদিত মূল্যবান ধাতু দেশের আর্থিক সমৃদ্ধি ঘটায়। ক্রীতদাসদের অমানুষিক পরিশ্রম ছাড়া প্রচন্ড প্রতিকূল পরিবেশে এই খনিজ উৎপাদন কখনোই সম্ভব হত না।

[2] প্রযুক্তির উন্নতিতে : খনি থেকে প্রাপ্ত ধাতু দিয়ে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও গৃহস্থালির সামগ্রী তৈরি হত। প্রযুক্তির এই উন্নতির ফলে শিল্পদ্রব্যের উৎপাদন যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল।

[3] কৃষিকাজে : ক্রীতদাসরা মিশরের উর্বর জমিতে প্রচুর ফসল ফলাত এবং নদী থেকে মাছ ধরত। উদ্‌বৃত্ত অংশ বৈদেশিক বাজারে রপ্তানি করে যথেষ্ট মুনাফা আসত ।

[4] মজুরের কাজে : নীলনদের নুড়ি-পাথর পরিষ্কার করে নদীকে নৌ চলাচলের উপযোগী করে তুলেছিল ক্রীতদাসরা ফলে সেই সময় পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে সুবিধা হয়।

[5] কুটিরশিল্পে: ক্রীতদাসদের মধ্যে পুরুষরা শপের চাষ করত এবং মহিলারা সুতো কাটা ও বস্ত্র বোনার কাজে নিযুক্ত থাকত। এ ছাড়া ক্রীতদাসরা অন্যান্য কুটিরশিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত ছিল।

উপসংহার: প্রাচীন মিশরের ক্রীতদাসরা তাদের প্রভুর পরিবারের যাবতীয় কাজকর্ম সম্পন্ন করে প্রভুর পারিবারিক জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসত। পাশাপাশি ক্রীতদাসদের শ্রমে মিশরে কৃষি উৎপাদনে যেমন গতি এসেছিল তেমনি গতি এসেছিল শিল্পক্ষেত্রেও। ফলে প্রাচীন মিশরীয় অর্থনীতিতে জোয়ার এসেছিল।

প্রাচীন মিশরে ক্রীতদাসদের কাজ
প্রাচীন মিশরে নাগরিকদের জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি করতে ক্রীতদাসদের বিভিন্ন পরিশ্রমসাধ্য এবং সাধারণ কাজকর্মে নিযুক্ত করা হত।
[1] গৃহভৃত্যের কাজ: মিশরের অধিকাংশ ক্রীতদাস গৃহভৃত্য হিসেবে গৃহের রান্নাবান্না, গৃহ পরিষ্কার, উদ্যান পরিচর্যা ইত্যাদি কাজ সম্পন্ন করে তাদের প্রভুর পারিবারিক জীবনে অধিক বিলাসিতা নিয়ে আসত।
[2] শ্রমিকের কাজ: মিশরের অনেক ক্রীতদাসকে বিভিন্ন খনিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হত। বহু ক্রীতদাসকে নুবিয়া ও সিনাই-এর বিপদসংকুল সোনার ও তামার খনির কাজে নিযুক্ত করা হয়েছিল।
[3] অভিজাতদের সম্পত্তি তদারকির কাজ : বহু ক্রীতদাস ফ্যারাও, অভিজাত ও পুরোহিতদের স্থাবর সম্পত্তিতে মজুরের কাজে নিযুক্ত হত ও তার তদারকি করত।
[4] সেনাবাহিনীতে কাজ : সৈনিক হিসেবে অভিজ্ঞতা থাকার কারণে কোনো কোনো যুদ্ধবন্দি ক্রীতদাসকে সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত করা হত।
[5] করণিকের কাজ : কোনো কোনো ক্রীতদাস তার প্রভুর ব্যাবসা বা অন্যান্য কাজে হিসাবরক্ষক বা করণিক হিসেবে কাজ করত।
[6] বিনোদন শিল্পীর কাজ : ক্রীতদাসদের মধ্যে অনেকে নৃত্যশিল্পী, সংগীতশিল্পী প্রভৃতি হিসেবেও কাজ করত।
[7] বিশেষ সুবিধাজনক কাজ: তবে ক্রীতদাসদের বিভিন্ন কাজের মধ্যে বিশেষ সুবিধাজনক ছিল অভিজাত ও ধনী পরিবারের কাজে নিযুক্ত থাকা। অভিজাতদের পারিবারিক কাজে নিযুক্ত ক্রীতদাসদের সন্তানরা বিশেষ মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে প্রভুর প্রিয় পাত্র হয়ে উঠতে পারত। সেক্ষেত্রে তার পক্ষে উচ্চ সরকারি পদলাভ, দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভের পর পূর্বতন প্রভুর পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কস্থাপন প্রভৃতিও সম্ভব হত।

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় ক্রীতদাসদের জীবন
প্রাচীন মিশরে ক্রীতদাসদের অবস্থা কতটা দুর্বিষহ ছিল তা নিয়ে বিতর্ক লক্ষ করা যায়। কেন না, কোনো কোনো সূত্র থেকে মিশরে ক্রীতদাসদের দুর্বিষহ জীবনের চিত্র পাওয়া গেলেও তাদের কিছুটা স্বাভাবিক
জীবনচিত্রের সন্ধানও পাওয়া যায়।
[1] কঠোর পরিশ্রমের জীবন: কোনো কোনো সূত্র থেকে মিশরের ক্রীতদাসদের করুণ জীবনচিত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। মিশরে তাদের গৃহভৃত্য হিসেবে, বিপদসংকুল খনিগর্ভে, বিশালকায় অট্টালিকার বিভিন্ন কাজে ও অন্যান্য পরিশ্রমসাধ্য নির্মাণকার্যে নিযুক্ত থাকতে হত।
[2] অপেক্ষাকৃত সহনীয় জীবন: বহু উদাহরণ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, মিশরে ক্রীতদাস প্রথার তীব্রতা রোম বা গ্রিসের ক্রীতদাসদের তুলনায় কম ছিল। প্রাচীন মিশরে অধিকাংশ ক্রীতদাসই গৃহভৃত্য হিসেবে কাজ করত এবং তার প্রভু ইচ্ছা করলে অর্থ দিয়ে সেই ক্রীতদাসকে পরিবর্তন করতে পারত। মিশরের প্রাচীন শিলালিপির মানবিক চিত্রগুলিতেও ক্রীতদাসদের দুর্বিষহ জীবনের সন্ধান পাওয়া যায় না।
[3] প্রভুর আচরণ: কখনো কখনো মিশরের ক্রীতদাসদের সঙ্গে তাদের প্রভুরা সদয় আচরণও করত বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। মিশরে কোনো কোনো ক্রীতদাস তার প্রভুর কন্যাকে বা কোনো স্বাধীন মহিলাকে বিবাহ করতে
পারত।

 

প্রাচীন ভারতে হরপ্পা সভ্যতার যুগে কৃষিজমিতে আবাদকারী কৃষকরা নগরের শাসকদের দ্বারা ভূমিদাসে পরিণত হয়েছিল বলে ইতিহাসবিদ মার্টিমার হুইলার মনে করেন। ঋগ্‌বৈদিক যুগে ‘দস্যু’-রা আর্যদের কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে 'দাস'-এ পরিণত হত। মৌর্য যুগে দাসরা বিভিন্ন সরকারি শিল্পসংস্থা, ধনীদের গৃহ ও খামার, রাজপরিবারের অন্দরমহল প্রভৃতি স্থানে কাজ করত।

কৌটিল্য দাসপ্রথাকে 'স্লেচ্ছপ্রথা' বলে উল্লেখ করেছেন।

গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস তাঁর 'ইন্ডিকা' গ্রন্থে বলেছেন যে, প্রাচীন ভারতে দাসপ্রথার অস্তিত্ব ছিল না।

বৈদিক যুগের অনার্য ব্যবসায়ীরা 'পনি' নামে পরিচিত ছিল।

সুলতানি যুগে দুধরনের দাসব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, যথা—বন্দগান ই-খাস এবং বুরদা ও কানিজক। বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা সুলতানের খাস দাস ছিল বন্দগান-ই-খাস। আর বিভিন্ন উচ্চবংশীয় অভিজাত এবং সাধারণ পরিবারের অধীনস্থ দাসরা ছিল বুরদা ও কানিজক।

সুলতানি আমলে বিভিন্ন উচ্চবংশীয়, অভিজাত এবং সাধারণ পরিবারের অধীনেও প্রচুর সংখ্যক ক্রীতদাস থাকত। এরা বুরদা ও কানিজক নামে পরিচিত ছিল।

প্রাচীন ভারতে ক্রীতদাস প্রথার অস্তিত্ব বিষয়ক বিতর্ক

প্রাচীন ভারতে, বিশেষ করে মৌর্য শাসনকালে (৩২৪-১৮৭/১৮৫ খ্রি.পূ.) মগধে প্রাচীন গ্রিসের বা রোমের মতো ক্রীতদাস প্রথার অস্তিত্ব ছিল কি না। তা নিয়ে বিতর্ক আছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ইউরোপীয় প্রেক্ষাপে ইংরেজি শব্দ 'Slave'-এর বাংলা প্রতিশব্দ করা হয় 'ক্রীতদাস কিন্তু প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপটে তাদের 'দাস' বলেই অভিহিত করা হয়।

[1] মেগাস্থিনিসের অভিমত: মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনকালে গ্রিক রাজা সেলুকাসের দূত মেগাস্থিনিস ৩০৫ খ্রিস্টপূর্বাে ভারতে আসেন। তিনি লিখেছেন যে, "ভারতে কোনো ক্রীতদাস নেই, এখানে সবাই স্বাধীন।... ভারতীয়রা তাদের দেশবাসীদের সঙ্গে তো নমঃ এমনকি বিদেশিদের সঙ্গেও ক্রীতদাসের মতো ব্যবহার করে না।

[2] মেগাস্থিনিসের মতের গুরুত্ব: মেগাস্থিনিস ভারতে আসার কিছুকাল আগে গ্রিক রাজা সেলুকাস মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের কাছে। সম্ভবত পরাজিত হয়েছিলেন। তখন যদি ভারতে ক্রীতদাস ব্যবস্থার অস্তিত্ব থাকত তবে নিশ্চয়ই সেলুকাসের অসংখ্য সৈন্য ভারতে ক্রীতদাসে পরিণত হত। কিন্তু তা যখন হয়নি তখন মেগাস্থিনিসের বক্তব্য সত্য বলে মনে করা অস্বাভাবিক নয়।

[3] ক্রীতদাস প্রথার অস্তিত্বের প্রমাণ: মেগাস্থিনিস ভারতে ক্রীতদাস প্রথার অস্তিত্ব অস্বীকার করলেও বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাচীন ভারতে ক্রীতদাস বা দাসপ্রথার অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়।

[i] বৈদিক সাহিত্যে দাসদের উল্লেখ পাওয়া যায়। বহিরাগত আর্যরা ভারতের আদিম উপজাতিদের পরাজিত করে দাসে পরিণত করেছিল। [ii] বৌদ্ধ জাতকে দাসত্ব গ্রহণের বিভিন্ন কারণের উল্লেখ আছে। চতুস্পদ জন্তু থেকে পৃথক করার জন্য বৌদ্ধগ্রন্থে দাসদের 'দ্বি-পদ' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। [iii] 'মনুস্মৃতি'তে সাত, 'অর্থশাস্ত্রে' আট ও 'নারদস্মৃতি তে পনেরো ধরনের দাসের কথা জানা যায়। [iv] "মহাভারত" ও অশোকের লেখতেও এদের উল্লেখ আছে।

সিদ্ধান্ত: অধিকাংশ ইতিহাসবিদ প্রাচীন ভারতে দাসপ্রথার অস্তিত্ব স্বীকার করে নিয়েছেন। ইতিহাসবিদ রিস ডেভিডস্, মোনাহান প্রমুখ মনে করেন যে, "প্রাচীন ভারতে ক্রীতদাস প্রথার অস্তিত্ব ছিল, তবে মেগাস্থিনিস দাসদের চিনতে ভুল করেছিলেন।"

প্রাচীন ভারতে দাসদের পেশা

ভারতীয় দাসরা বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত হত। এই কাজগুলি হল—

[1] গৃহভৃত্যের কাজ: ভারতের দাসরা তাদের প্রভুর পরিবারের গৃহস্থালির কাজ, রান্নাবান্না, এই পরিবারের সদস্যদের শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের বন্দোবস্ত প্রভৃতি কাজ করত। দাসদের পরিশ্রমে তার প্রভুর পরিবারে অতিরিক্ত সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য আসত।

[2] কৃষকের কাজ: দাসদের একটি বড়ো অংশ প্রভুর কৃষিজমিতে ফসল উৎপাদন করত এবং তা মালিকের ঘরে পৌঁছে দিত। প্রভু তার দাসদের অর্থের বিনিময়ে অন্যের জমিতে ভাড়া খাটাতে পারত।

[3] শ্রমিকের কাজ: অনেক দাস শিল্প-কারখানায় শ্রমিক হিসেবে বিভিন্ন সামগ্রী উৎপাদনের কাজে নিযুক্ত থাকত।

[4] পতিতাবৃত্তির কাজ: বেশি উপার্জনের উদ্দেশ্যে কোনো কোনো দাসীকে পতিতাবৃত্তির পেশা গ্রহণে বাধ্য করা হত।

[5] খনিশ্রমিকের কাজ: কোনো কোনো দাস মাটির গভীর থেকে বিভিন্ন খনিজ সম্পদ উত্তোলনের কাজে নিযুক্ত হত।
উপসংহার: প্রাচীন ভারতে দাসপ্রথার অস্তিত্ব থাকলেও তা কোনো সময়ই ইউরোপের, বিশেষ করে রোমান সভ্যতার মতো ব্যাপক আকার ধারণ করেনি। দাসপ্রথা প্রাচীন ভারতে কখনোই অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেনি।

প্রাচীন ভারতে ক্রীতদাস প্রথা

মেগাস্থিনিস লিখেছেন যে, “ভারতে কোনো ক্রীতদাস নেই, এখানে সবাই স্বাধীন।" কিন্তু অন্যান্য বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় যে, প্রাচীন ভারতে দাসপ্রথার অস্তিত্ব ছিল।

[1] বৈদিক যুগ : বৈদিক যুগে ভারতে দাসপ্রথার অস্তিত্ব ছিল বৈদিক সাহিত্যে ভারতের আদিম উপজাতিদের 'দাস' বা 'দস্যু' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর্যরা ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে এই দাসদের কৃষিকাজে নিয়োগ করত। এ ছাড়া বৈদিক যুগে— [i] অনেকে জন্মসূত্রে দাসে পরিণত হত. [ii] কেউ কেউ ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি হয়ে যেত এবং [ii] কেউ কেউ স্বেচ্ছায় দাসত্ব বরণ করত।

[2] মৌর্যযুগ : মৌর্যযুগে দাসদের অধিকাংশই ছিল শূদ্র। দাসদের শ্রমের ওপরেই কৃষি উৎপাদন নির্ভর করত। এযুগে বহু ক্ষেত্রে দাসদের প্রতি অমানবিক ব্যবহারের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। কৌটিলা দাসপ্রথাকে 'ম্লেচ্ছপ্রথা' বলে অভিহিত করেছেন। তবে এযুগে দাসরা কিছু কিছু আইনি অধিকারও ভোগ করতে পারত।

[3] মৌর্য-পরবর্তী যুগ: মৌর্য পরবর্তী যুগে ভারতে দাসদের সংখ্যা এবং তাদের প্রতি কঠোরতা বৃদ্ধি পায়। এই সময় মনুসংহিতার দাস ব্যবস্থার প্রশংসা করা হয়েছে। প্রভুর ঔরসজাত দাসীর সন্ধানও এযুগে দাস বলেই গণ্য হত।

[4] গুপ্তযুগ : গুপ্তযুগেও দাসপ্রথা অব্যাহত ছিল। তবে আগের মতোই ব্রাহ্মণদের দাসপ্রথার বাইরে রাখা হয়। কাত্যায়ণস্মৃতি-তে বলা হয় যে, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যরা সন্ন্যাস ধর্ম পালন না করলে তাদের দাসত্ব বরণের শান্তি ভোগ করতে হবে। গুপ্ত-পরবর্তী যুগেও ভারতীয় সমাজে এই দাসপ্রথার প্রচলন অব্যাহত ছিল।

[5] পাল ও সেনযুগ : পাল এবং সেনযুগেও ভারতে দাসপ্রথার অস্তিত্ব ছিল। 'আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প'-এ পালবংশকে 'দাসজীবিগঃ ' বা দাসবংশীয় শূদ্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেনযুগেও শূদ্রদের জীবন দাসদের থেকে পৃথক ছিল না।

মৌর্যযুগে দাসপ্রথার বৈশিষ্ট্য

মৌর্যযুগে ভারতীয় দাসপ্রথার কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল—

[1] উৎস: মৌর্যযুগে দাসত্বের প্রধান উৎসগুলি ছিল যুদ্ধবন্দিত্ব দারিদ্র্যা, আত্ম বিক্রয়, জন্মসূত্র ও অপরাধের শাস্তি।

[2] গুরুত্বহীনতা: যৌর্যযুগের সমাজ ও অর্থনীতিতে দাসদের সংখ্যা ও ব্রির উভয়ই ছিল সামান্য। তখন উৎপাদন-কার্য ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি দাসদের ওপর নয়, স্বাধীন শ্রমিক, কৃষক ও কারিগরদের ওপরই নির্ভরশীল ছিল।

[3] প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি:  মৌর্যযুগে দাসপ্রথা পরিণত হয়েছিল এবং সেসময় মালিকের সঙ্গে দাসদের আইনগত সম্পর্ক।

[4] দাসদের শ্রেণিবিভাজন: এযুগে ভারতে দুই শ্রেণির দাসের অভি লক্ষ করা যায়—[I] শান্তি ভোগকারী দাস এবং [ii] গৃহকার্যে নিযুক্ত করার উদ্দেশ্যে ক্রয় করা দাস।

[5] দাসদের অধিকার: মৌর্যযুগে দাস উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তির মালিক হতে পারত এবং সম্পত্তি ভোগদখল করতে পারত। তারা অর্থ প্রদানের বিনিময়ে দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন জীবনে ফিরে আসতে পারত।

[6] পেশা: এযুগে অধিকাংশ দাস ধনী পরিবারগুলির গৃহকার্যে নিযুক্ত হত। তা ছাড়া কৃষিক্ষেত্রে ও খনিতে শ্রমিক হিসেবেও তারা কাজ করত।

উপসংহার: প্রাচীন ভারতে বিভিন্ন যুগেই দাসপ্রথা কোনো না কোনোভাবে অস্তিত্বশীল ছিল। কিন্তু তাদের অবস্থা প্রাচীন রোমের ক্রীতদাসদের মতো এতটা করুণ ছিল না। মৌর্যযুগে ভারতে দাসপ্রথার অস্তিত্বটি ছিল অতি ক্ষীণ।

প্রাচীন ভারতের ক্রীতদাসদের সামাজিক অবস্থান ও অধিকার

প্রাচীন ভারতের ক্রীতদাস বা দাসদের জীবন কখনোই রোমের ক্রীতদাসদের মতো দুঃসহ ছিল না। ভারতের দাস ব্যবস্থায় অনেক কঠোরতা ও নিষ্ঠুরতা থাকলেও তা রোমের ক্রীতদাসদের প্রতি অমানবিক ব্যবহারের সমতুল্য ছিল না।

[1] নাগরিক ও সামাজিক নৈকট্য: ভারতীয় সমাজে স্বাধীন নাগরিক ও দাসদের মধ্যে ভেদরেখা ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। এ থেকে সমাজে দাসদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রারই আভাস পাওয়া যায়। ভারতীয় দাসরা এক হিসেবে গৃহভৃত্যের সমগোত্রীয় ছিল।

[2] মানবিক আচরণ : সমকালীন বিভিন্ন ধর্মীয় সাহিত্যে দাসদের প্রতি উদার ও মানবিক আচরণ করার কথা বলা হয়েছে। গৌতম বুদ্ধ, সম্রাট অশোক, মনু—সকলেই দাসদের রক্ষা ও তাদের প্রতি মানবিক আচরণের কথা বলেছেন। প্রভু তার অধীন অসুস্থ ও বৃদ্ধ দাসদের দেখাশোনার দায়িত্ব নেবেন বলে মনু বলেছেন।

[3] যুক্তি: ভারতীয় দাসদের মুক্তির বিভিন্ন পদ্ধতিগুলি ছিল--

[i] ঋপদাতার ঋণের অর্থ পরিশোধ। [ii] প্রভুকে ক্ষতিপূরণের অর্থমূল্য প্রদান করে মুক্তি ক্রয়। [iii] নিজের জীবন বিপন্ন করে হলেও পাস কর্তৃক তা প্রভুর জীবন রক্ষা করা প্রভৃতি। [iv] তা ছাড়া ষাবন্ধা লিখেছেন, ''বলপূর্বক কাউকে দাসে পরিণত করা হলে রাজার কর্তকা হল সেই দাসের মুক্তির ব্যবস্থা করা।''

[4] বিশেষ অধিকার: কৌটিলা তার অর্থশাস্ত্রে দাসদের তিনটি বিশেষ অধিকারের উল্লেখ করেছেন।এগুলি হল-  [i] প্রভুর কোনো ক্ষতি না করে অর্থ উপার্জন ও সঞ্ছয়ের অধিকার। [ii] উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির ভোগ-দখলের অধিকার। [iii] প্রভুকে অর্থ দিয়ে মুক্তি পাওয়ার অধিকার।

প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিতে দাসপ্রথার ভূমিকা

প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিতে দানরমার বিশেষ কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা কারণ হল -

[1] ভৃত্য-দাস সাদৃশ্য: প্রাচীন দাস ও তাদের মধ্যে তেমন কোনো ভেদরেখা বাইরে থেকে বোঝার উপায় । ভারতের অর্থনৈতিক বিকাশে কমার দাসদের নয়, তাদেরও বড়ো ভূমিকা ছিল।

[2] সংখ্যার স্বল্পতা দাসদের সংখ্যা তৎকালীন ভারতীয় শ্রমিকদের সংখ্যার অনুপাতে খুবই কম ছিল। তাই কালীন অর্থনৈতিক উৎপাদনে দাসদের তুলনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিকদেরই বেশি অবদান ছিল।

[3] হীন কাজে নিয়োগ : ভারতে দাসদের যে ধরনের হীন কাজে নিয়োগ করা হয় সেসব কাজে দাসদের সহযোগী হিসেবে বা আলাদাভাবে প্রচুর সংখ্যক ভাড়াটে স্বাধীন শ্রমিক ও নিম্নবর্ণের মানুষকেও নিযুক্ত করা হত।

সুলতানি আমলে ক্রীতদাসদের কাজ

সুলতানি যুগে ক্রীতদাসদের বিভিন্ন ধরনের কাজে নিযুক্ত করা হত।
[1] গৃহকার্য: সুলতানি যুগে বেশিরভাগ পাস গৃহকার্যে নিযুক্ত হত। দাসরা গৃহের রান্নাবানা, গৃহ পরিষ্কার রাখা, উদ্যান পরিচর্যা প্রভৃতি কাজকর্ম করত।

[2] হারেমের দেখভাল: কিছু কিছু মাস হারেমের (অন্দরমহল) দেখাশোনা করত। এদের বলা হত 'খোজা'। বিদেশ থেকেও 'খোজা' দাস  আমদানি করা হত।

[3] কারিগরের কাজ: কিছু দাস সুদক্ষ কারিগর হিসেবে বিভিন্ন শিল্প কারখানায় শিল্পসামগ্রী উৎপাদনের কাজে নিযুক্ত ছিল। অলংকার শিল্প, কাঠের আসবাবপত্র, গৃহস্থালির টুকিটাকি প্রভৃতি প্রস্তুতিতে দাসরা নিযুক্ত হত।

[4] প্রশাসন পরিচালনার কাজ: সুলতানগণ বিশেষ যোগ্যতা-সম্পন্ন দাসদের প্রশাসনের কাজে নিযুক্ত করতেন। কোনো কোনো যোগ্যতাসম্পন্ন দাস তার প্রভুর মৃত্যুর পরে সুলতান হিসেবেও নিযুক্ত হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে কুতুবউদ্দিন আইবক ও ইলতুৎমিসের নাম উল্লেখ করা যায়।

[5] ধর্মীয় কাজ: কোনো কোনো দাসকে ধর্মীয় কাজে নিয়োগ করা হত। ধর্মীয় কাজের প্রচার, ধর্মীয় সেবাকার্য প্রভৃতিতে দাসরা নিযুক্ত হত।

[6] মালিকের মনোরগুনের কাজ: মালিকের সঙ্গদান এবং মনোরঞ্জনের জন্যও কোনো কোনো দাম নিয়োজিত হত। প্রভুর সঙ্গে ভ্রমণে বা শিকারে সঙ্গ দেওয়া, গৃহে সঙ্গদান প্রভৃতি কাজে তাদের নিযুক্ত করা হত।

ভারতের সুলতানি আমলের অর্থনীতিতে ক্রীতদাস প্রথার ভূমিকা

সুলতানি যুগের অর্থনীতিতে ক্রীতদাস প্রথার কিছু কিছু প্রভাব পড়েছিল।

[1] কৃষির বিকাশে: সুলতানি আমলে কৃষিক্ষেত্রে প্রচুর ক্রীতদাস নিযুক্ত হয়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করেছিল। ফলে কৃষি উৎপাদন দেশের অর্থনীতিকে মজবুত করেছিল।

[2] প্রযুক্তির উন্নতিতে : ক্রীতদাসদের প্রচেষ্টায় কৃষিভিত্তিক শিল্প ও কারিগরি শিল্প—উভয় ক্ষেত্রেই উন্নতি ঘটেছিল।

[3] শাসকদের সম্পত্তি বৃদ্ধিতে: সুলতানি আমলে শাসকরা তাদের খাসজমিতে ক্রীতদাসদের নিয়োগ করে উৎপাদন কার্য সচল রাখত। ক্রীতদাসদের শ্রমের ফসল হিসেবে শাসকদের হাতে প্রচুর সম্পদ সঞ্ছিত হয়েছিল।

[4] সুলভ শ্রমিকের জোগানের ক্ষেত্রে : ভারতের মতো বিশাল দেশে উৎপাদন কার্য অব্যাহত রাখার জন্য কৃমি, কারিগরি শিল্প, বন্দর প্রভৃতি ক্ষেত্রগুলিতে সভায় সহজলভ্য প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল।

[5] দাসব্যাবসায় অর্থাগমে : পশ্চিম এশিয়ায় উচ্চমূল্যে ভারতীয় ক্রীতদাস বিক্রি হত। এর ফলে বৈদেশিক অর্থ ভারতে এলে দেশের অর্থনীতি মজবুত হয়েছিল।

উপসংহার: নহিবুয়র লিখেছেন যে, “সুলতানি যুগের কঠোর ও ব্যাপক দাসপ্রথা সামাজিক অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করেছিল।" দীর্ঘদিন ধরে পরাধীন দাস হিসেবে জীবন কাটানোর ফলে তাদের স্বভাব বুক্ষ ও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে।

প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে ক্রীতদাস প্রথার বিরোধিতা

প্রাচীন ভারতীয় সমাজে যে অমানবিক ক্রীতদা বা দাসপ্রথা ছিল দাসদের যেভাবে বাণিজ্য পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হত, তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রাচীন সাহিত্য ও ধর্মগ্রন্থে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছিল। তবে এবিষয়ে উল্লেখযোগ্য হল কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র। ইতিহাসবিদ ড. এ. বাসায় মনে করেন যে, “অর্থশাস্ত্রে দাসদের প্রতি যে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া হয়েছে তা এক বিরল দৃষ্টান্ত।" প্রাচীন ধর্মশাস্ত্র, শাস্ত্রকারদের রচনা ও টীকাভাষা এবং অন্যান্য গ্রন্থে দাসপ্রথার বিরুদ্ধে মনোভাব ব্যক্ত হয়েছে।

[1] দাসপ্রথায় নিষেধাজ্ঞা ও দাসদের মুজিকে সমর্থন: বৈদিক ও বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে দাসপ্রথার বিপক্ষে মনোভাব ব্যক্ত করা হয়েছে। বৈদিক সাহিত্যে দাসব্যাবসা এবং ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের যারা দাসদের নিয়োগ- গর্হিত কর্ম বলে ঘোষণা করা হয়। বৌদ্ধ ধর্মেও দাসদের মুক্তির পক্ষে অভিমত, ব্যক্ত করা হয়।

[2] দাসপ্রথার নিন্দা : কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্রে' দাস ব্যবস্থাকে নিন্দা করে একে মোহদের বিষয় বলে অভিহিত করা হয়েছে এবং দাসদের প্রতি সদয় ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। অর্থশাস্ত্রে আরও বলা হয়েছে যে, "দাসপ্রথাকে সংকুচিত করতে হবে এবং কোনো আর্যকে দাসে পরিণত করা চলবে না।" দাস-কন্যার সতীত্ব রক্ষার কথাও এখানে বলা হয়েছে।
[3] দাস বিক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা: অর্থশাস্ত্রে দাস হিসেবে শিশুসন্তান বিক্রির ঘটনাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, কে নিজেকে দাস হিসেবে বিক্রি করলে সেই ক্রীতদাসের সন্তানরা। উত্তরাধিকারসূত্রে এই ফল ভোগ না করে সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকবে।

[4] সম্পত্তির উত্তরাধিকার স্বীকার: দাসদের উত্তরাধিকার সম্পত্তি লাভ করা, ভোগ দখল করা ও সম্পত্তির মালিক হওয়ার অধিকারকে 'অর্থশাস্ত্রে' স্বীকার করা হয়েছে।

[5] নবজাতকের স্বাধীনতার অধিকারকে স্বীকার: কোনো দাসের সঙ্গে কোনো স্বাধীন ব্যক্তির মিলনে জন্ম নেওয়া সন্তান 'অর্থশাস্ত্রে' স্বাধীন নাগরিক বলে ঘোষিত হয়েছে।

প্রাচীন ভারতীয় সমাজে দাসত্ব থেকে মুক্তির উপায়

প্রাচীন ভারতীয় সমাজে দাসরা কখনোই আজীবন দাসত্ব করতে বাধা ছিল না। তাদের দাসত্ব থেকে মুক্তির প্রধান কয়েকটি উপায়ও ছিল-

[1] প্রভুর জীবন রক্ষা: কোনো দাস যদি কোনো বিপদে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তার প্রভুর জীবন রক্ষা করত তবে প্রভু সেই দাসকে সাধারণত মুক্তি দিত।

[2] ঋণের অর্থ পরিশোধ: ঋণের দায়ে দাসত্ব গ্রহণে বাধ্য কোনো ব্যক্তি যদি ঋণের অর্থ মিটিয়ে দিত, তাহলে সে দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে পারত।

[3] মুক্তিমূল্য প্রদান: যারা নিজেদের দাস হিসেবে বিক্রি করে দিত বা যুদ্ধবন্দি হিসেবে দাস হত তারাও মুক্তিমূল্য দিয়ে স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার অধিকারী ছিল।

উপসংহারঃ প্রাচীন ভারতে দাসপ্রথা তেমন প্রবলভাবে ছিল না, যেমন ছিল প্রাচীন গ্রিসে ও রোমে। ভারতীয় দাসদের নিয়ে আলোচনা তাই অনেকটাই তাত্ত্বিক আলোচনা। কেন-না, প্রাচীন গ্রিস বা রোমের ক্রীতদাস প্রথার ব্যাপকতার সঙ্গে প্রাচীন ভারতীয় দাসপ্রথার তুলনা করা চলে না।

সুলতানি যুগে ভারতে ক্রীতদাস প্রথা

ভারতে ইসলামের প্রতিষ্ঠার অনেক আগে থেকেই দাসপ্রথার প্রচলন ছিল। পরে তুর্কি আমলে ভারতে দাসের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এই সময় ক্রীতদাস প্রথা সামাজিক জীবনের অঙ্গ হয়ে ওঠে।

[1] দাসপ্রথার চাহিদা : সুলতানি আমলে অভিজাত মুসলিম পরিবারে প্রভুর সংসার দেখাশোনা-সহ নানান সাংসারিক কাজের জন্য এবং প্রভুর নিজের বিলাসিতার জন্য দাসের প্রয়োজন হত। ক্রমে অভিজাত ও উচ্চবিত্ত পরিবারে দাসদের দ্বারা নিজেদের কাজকর্ম সম্পন্ন করা সমাজে মর্যাদার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

[2] দাসপ্রথার প্রাবল্য: সুলতানি আমলে তুর্কি সমাজে দাসপ্রথা একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। সুলতান এবং অভিজাত শ্রেণি থেকে শুরু করে একজন সাধারণ কেরানিও এই সময় ক্রীতদাস রাখত।

[3] দাসদের শ্রেণিবিভাগ: সুলতানি যুগে প্রধানত দুই শ্রেণির দাস ছিল--

i. কদখান-ই-খাস: যুদ্ধ রাজ্য পরিচালনা প্রভৃতি কাজের জন্য সুলতান যোগ্যতাসম্পন্ন এইসব ক্রীতদাসকে ক্রয় করতেন। বিভিন্ন দেশে থেকে তাদের আনা হত। কুতুবউদ্দিন আইবক এবং ইলতুৎমিসও প্রথম জীবনে দাসই ছিলেন।

ii. বুরদা ও কানিজক: এরা ছিল সাধারণ দাস। এদের অধিকাংশই গৃহে পরিচারকের কাজ করত।

[4] দাসদের জীবনযাত্রা: সুলতান বা অভিজাতদের অধীনস্থ দাসরা স্বাচ্ছন্দ্যে থাকলেও সাধারণ ক্রীতদাসদের অবস্থা মোটেই ভালো ছিল । তারা ছিল মালিকের বাক্তিগত সম্পত্তি। মালিক ইচ্ছামতো তার অধীন দাসদের ভাড়া খাটাতে, উপঢৌকন দিতে বা বিক্রয় করতে পারতেন।

সুলতানি ভারতে ক্রীতদাস সৃষ্টির প্রক্রিয়া ও ক্রীতদাসদের অবস্থা

[1] সুলতানি আমলে ক্রীতদাস সৃষ্টির প্রক্রিয়া: সুলতানি যুগে নানান প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ ক্রীতদাসে পরিণত হত। যেমন—

i. পরাজিতকে বন্দি করে: শত্রু দেশের সৈন্য ও সাধারণ নাগরিক যুদ্ধবন্দি হয়ে ক্রীতদাসত্ব বরণে বাধ্য হত। আরবের ঐতিহাসিক আল-উবী উল্লেখ করেছেন যে, গজনীর সুলতান মাসুদ ১০০১ খ্রিস্টাব্দে ভারত অভিযান করে ভারতের ১ লক্ষ যুবক-যুবতিকে বন্দি করে ক্রীতদাসে পরিণত করেন।

ii. দাস ক্রয়ের মাধ্যমে: পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে मान ব্যাবসার প্রসার ঘটেছিল। সেখানকার দাস বাজার থেকে দাসদের ক্রয় করে ভারতে আনা হত।

iii. উপঢৌকনের মাধ্যমে: সুলতানি আমলে অভিজাত তুর্কি মুসলিমদের মধ্যে উপঢৌকন হিসেবে দাসদাসী প্রদান করার চল ছিল। প্রভাবে অনেকে দাসদাসী লাভ করত।

[2] সুলতানি আমলে ক্রীতদাসদের অবস্থা: সাধারণভাবে সুলতানি আমলে ক্রীতদাসদের অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। [i] তারা ছিল মালিকের ব্যক্তিগত অস্থাবর সম্পত্তি। মালিক ইচ্ছামতো তার অধীনস্থ দাসদের ভাড়া খাটাতে, উপঢৌকন দিতে বা বিক্রয় করতে পারত। [ii] দাসরা সব ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। [iii] তারা মালিকের কাছ থেকে খাদ্য, পোশাক ও আশ্রয় লাভ করত। [iv] তা ছাড়া সুলতান বা অভিজাতদের অধীনে থাকা দাসরা সাধারণের অধীনে থাকা দাসদের চেয়ে তুলনামূলকভাবে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকত। ফিরোজ তুঘলক দাসদের জন্য শিক্ষাদান ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন।

সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশের সর্বত্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য স্থানীয় সামন্তপ্রভু বা ভূস্বামীদের আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হত। সামন্তপ্রভুদের দ্বারা তাদের অধীনস্থ কৃষক শ্রেণি বা ভ্যাসাল এবং ভূমিদাসদের শোষণ করার বিষয়টি সামন্ততন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বলে মার্ক ব্লখ মনে করেন। কার্ল মার্কস সামন্ততন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে ম্যানর ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন।

কৃষক তার উৎপাদনের একটি বড়ো অংশ টাইলে বা মেটায়েজ নামে সম্পত্তি কর হিসেবে দিতে বাধ্য ছিল। সামন্তবাবস্থায় কৃষককে বেনালিতে নামে একপ্রকার মজুরি কর প্রদান করতে হত। উক্ত বিভিন্ন ধরনের কর ছাড়াও ম্যনর-প্রভুরা কৃষকের কাছ থেকে জনকর, বনকর, বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষ্যে কর প্রভৃতি আদায় করতেন।

নিম্ন সামন্ত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার ঊর্ধ্বতন সামন্তপ্রভুর প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করতেন, এর বিনিময়ে ঊর্ধ্বতন সামন্তপ্রভু তাঁর অধীন নিম্ন সামন্তকে 'ফি' বা জমি দান করতেন। সামন্তপ্রভু প্রজার জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করতেন এবং তাকে যাবতীয় নিরাপত্তা প্রদান করতেন। রাজা ও সামন্তপ্রভুরা কৃষকদের নিরাপত্তা প্রদান করতেন এবং তাদের জীবন ও সম্পতি রক্ষা করতেন।

সামন্তপ্রভুরা নিজ এলাকার শাসন পরিচালনা করতেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতেন। সামন্তপ্রভুরা তাদের শাসনাধীন এলাকার রাস্তাঘাট, খাল, সাঁকো প্রভৃতি নির্মাণ ও সংস্কার করতেন। তাঁরা তাঁদের অধীনস্থ এলাকায় বসবাসকারী প্রজাদের ওপর ঘা অন্যায়-অবিচারের প্রতিকার করতেন।

সামন্ততন্ত্র সম্পর্কে 'রোমান তত্ত্ব'-এর প্রবক্তা ছিলেন আবে দুবো।

সামন্ততন্ত্র সম্পর্কে 'জার্মান তত্ত্ব'-এর প্রবক্তা ছিলেন বোলাঁভিয়ের।

মধ্যযুগে ইউরোপের সামন্ততান্ত্রিক সমাজে অল্প কিছু মানুষ ছিল। যাজক সম্প্রদায়ভুক্ত এবং যাজক শ্রেণির পরেই প্রতিপত্তিশালী শ্রেণি। হিসেবে অভিজাত শ্রেণি অবস্থান করত। সমাজের তৃতীয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিল বিপুল সংখ্যক কৃষক।

নিম্নসামন্ত ঊর্ধ্বতন সামন্তপ্রভুর সংকটকালে প্রভুকে 'স্কুটেজ' নামে কর প্রদান করতেন।

ক্যারোলিঞ্জীয় সাম্রাজ্য তিনটি অংশে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার পর সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে স্থানীয় প্রভুরা অর্থাৎ বৃহৎ জমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের জমি ও জনগণের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন। এভাবে সামন্ততন্ত্রের উত্থানের পটভূমি তৈরি হয়।

কমিটেটাস প্রথা থেকে ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের উৎপত্তি ঘটেছিল বলে বোলাঁভিয়ের মনে করেন।

মধ্যযুগের ইউরোপের সমাজে মানুষ প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। যথা- [1] যাজক শ্রেণি, [2] অভিজাত শ্রেণি এবং [3] কৃষক ও সাধারণ মানুষ।

ইউরোপের সামন্ততান্ত্রিক সমাজে ক্ষুদ্র কৃষকরা 'ভিলেইন' নামে পরিচিত ছিল।

মধ্যযুগের ইউরোপে যে দরিদ্র কৃষকরা জমি ছেড়ে বাইরে যাওয়ার অধিকারী ছিল না, তারা 'সাফ' বা ভূমিদাস নামে পরিচিত।

ক্রফটার ও করাট ছিল মধ্যযুগের ইউরোপের ভূমিহীন কৃষক।

ক্রফটার ও করাট ছিল মধ্যযুগের ইউরোপের ভূমিহীন কৃষক।

প্রাচীন জার্মানিতে প্রচলিত এক প্রথা অনুসারে, স্বাধীন যোদ্ধারা। স্বেচ্ছায় কোনো সামরিক নেতা বা সেনাপতির প্রতি আনুগত্য জানিয়ে তাঁর স্বার্থপূরণের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দান করত। এটি 'কমিটেটাস প্রথা' নামে পরিচিত।

ইউরোপের সামন্ততান্ত্রিক স্তরবিন্যাসটি ছিল পিরামিডের মতো। এই পিরামিডের সর্বোচ্চ স্তরে রাজা ও সর্বনিম্ন স্তরে অগণিত দরিদ্র কৃষক অবস্থান করত। সামন্ততান্ত্রিক পিরামিড স্তরে রাজা ও দরিদ্র কৃষকদের মধ্যবর্তী স্তরে অবস্থান করত ডিউক ও আর্ল, ব্যারন, নাইট প্রমুখ।

ইউরোপের সামন্ততান্ত্রিক সমাজ মূলত ক্রমনিম্ন ৫টি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। এগুলি হল— [1] রাজা, [2] ডিউক ও আর্ল, [3] ব্যারন, [4] নাইট এবং [5] ভ্যাসাল।

সামন্ততান্ত্রিক পিরামিডের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থানকারী অগণিত দরিদ্র কৃষকদের ভ্যাসাল বলা হত।

ইউরোপের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে নিম্ন সামন্ত, ঊর্ধ্বতন সামন্তপ্রভুর প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করত এবং বিনিময়ে ঊর্ধ্বতন সামন্তপ্রভু তার অধীনস্থ নিম্ন সামন্তকে জমি দান করত। এই জমি দানকে ফিফ বলা হত।

ইনভেস্টিচার হল একধরনের অনুষ্ঠান যেখানে ঊর্ধ্বতন সামন্তপ্রভুর প্রতি আনুগত্য প্রদানের মাধ্যমে তার অধীনস্থ নিম্ন সামন্ত জমি লাভ করত।

শিভালরি কথাটির উৎপত্তি হয়েছে ফরাসি শব্দ শিভেলিয়ার  থেকে, যার অর্থ হল অশ্বারোহী।

 

নর্মান্ডির ডিউক উইলিয়াম ১০৬৬ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে সামন্থপ্রথার প্রবর্তন করেন।

ইউরোপের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় কৃষকদের প্রদেয় কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কর ছিল টাইলে, শিভাজ, বেনালিতে, ক্যাপিটাশিও, প্রেসটেশন প্রভৃতি।

সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় টাইলে বলতে সম্পত্তি করকে বোঝায়।

প্রভুর হাতে পণ্য বিক্রির জন্য কৃষককে বেনালিতে কর দিতে হত।

খ্রিস্টান চার্চ দরিদ্র কৃষকদের কাছ থেকে যে ধর্মকর (১/১০ অংশ) আদায় করত তা 'টাইদ' নামে পরিচিত।

ভূমিদাসের পুত্র উত্তরাধিকারসূত্রে পিতার জমি লাভ করার জন্য প্রভুকে যে কর দিতে বাধ্য ছিল তা 'হেরিয়ট' নামে পরিচিত।

নিকোলাস জানেকিন-এর নেতৃত্বে ১৩২৩ খ্রিস্টাব্দে বেলজিয়ামের ফ্ল্যান্ডার্সে কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল।

গিয়োম কালে ছিলেন ১৩৫৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের জাকেরি কৃষক বিদ্রোহের নেতা।

ওয়াট টাইলার ছিলেন ১৩৮১ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে সংঘটিত কৃষক বিদ্রোহের নেতা।

বীরত্ব প্রদর্শনের অঙ্গ হিসেবে দুজন সামন্তপ্রভুর মধ্যে যে তলোয়ার যুদ্ধ হত তাকে 'ডুয়েল' বলা হত।

একজন প্রভুর অধীনে ম্যানর এলাকায় একটি অনুগত মানবগোষ্ঠী বসবাস করত। প্রতিটি ম্যানরে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি, পশুচারণ ভূমি, পতিতজমি, জঙ্গল, জলাভূমি, বনভূমি, কৃষকের বাসগৃহ, শ্রমিক ও কারিগরদের বাসগৃহ, গির্জা ইত্যাদি থাকত। ম্যানরগুলি ছিল এক একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম।

মধ্যযুগের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় ইউরোপের বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে বাস করত। এই গ্রামগুলিকেই 'ম্যানর' বলা হত।

সামন্তপ্রভুর বসবাসের জন্য ম্যানরে দুর্গ পরিবেষ্টিত সুরক্ষিত একটি প্রাসাদোপম সুবিশাল বাড়ি থাকত। একে 'ম্যানর হাউস' বলা হত।

ম্যানর হাউসে সামন্তপ্রভু, তার আত্মীয়পরিজন ও কর্মচারীরা বসবাস করত।

ম্যানর হাউসে প্রাসাদের দেয়ালে নানা ধরনের কারুকার্যময় ভারী কাপড়ের পর্দা ঝোলানো থাকত। একে 'ট্যাপেস্ট্রি' বলা হত।

ম্যানরের প্রশাসন পরিচালনার জন্য নিযুক্ত কয়েকজন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কর্মচারীর নাম হল স্টুয়ার্ড, বেইলিফ, রিভি প্রমুখ।

ম্যানরে প্রভুর খাস জমি 'ডিমিন' নামে পরিচিত ছিল।

ইউরোপে ত্রয়োদশ শতকে সামন্ত ব্যবস্থায় বিশেষ একধরনের বীরত্বের আদর্শ গড়ে ওঠে। এই ব্যবস্থা সাধারণভাবে শিভালরি নামে পরিচিত।

সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাইটদের 'শিভালরি' আদর্শের পালন মধ্যযুগে ইউরোপে শৃঙ্খলা স্থাপন করতে সাহায্য করে।

ইউরোপের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় উচ্চবংশীয় যোদ্ধাদের নিয়ে সামন্তপ্রভুর জন্য প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠিত হত। এই যোদ্ধারা 'নাইট" নামে পরিচিত ছিল। একুশ বছর বয়সে একজন যুবক 'নাইট' হিসেবে গণ্য হতে পারত।

নাইটদের প্রধানত তিনটি আচরণবিধি মেনে চলতে হত। যথা—

[1] যুদ্ধ করা, [2] ধর্মপালন করা এবং [3] নারীজাতির মর্যাদা রক্ষা করা।

মধ্যযুগে নাইটদের বীরত্ব, আদর্শ ও প্রেমের কাহিনি ইউরোপে একদল চারণকবি গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করে, জমিদার ও কৃষকের বাসস্থানে গিয়ে গেয়ে শোনাতেন। এই সকল চারণকবিরা দক্ষিণ ফ্রান্সে 'ট্রুবাদুর' বলা হত।

ইউরোপে একদল চারণকবি মধ্যযুগে নাইটদের বীরত্ব, আদর্শ ও প্রেমের কাহিনি গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করে গেয়ে শোনাতেন। এই সমস্ত চারণকবিরা জার্মানিতে 'মিনেসিঙ্গার' নামে পরিচিত।

ট্রুবাদুর নামে চারণকবিরা ইংল্যান্ডে 'মিনস্ট্রেল এবং জার্মানিতে 'মিনেসিঙ্গার' নামে পরিচিত ছিল।

ল্যাটিন শব্দ 'ফিওডালিস' (Feodalis) এবং ফরাসি শব্দ 'ফোডালীটে' (Féodalité) থেকে ইংরেজি 'Feudalism' কথাটি এসেছে যার বাংলা অর্থ হল 'সামন্ততন্ত্র'। সাম্যতন্ত্রের সংজ্ঞা নিয়ে বিভিন্ন অভিমত লক্ষ করা যায়।

[1] বোলাভিয়ের-এর মত: প্রথম ১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে 'ফোডালিতে শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। তবে শব্দটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য সর্বপ্রথম উপলব্ধি করেছিলেন বোলাতিনিয়ের (Boulainvilliers)। न সামন্ততন্ত্র বলতে বুঝেছিলেন "সার্বভৌম অধিকারের বিভাজন, যেখানে প্রশাসনকে খণ্ডিত ও বিকেন্দ্রীভূত করে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।”

[2] মন্তেন্ধুর মত মন্তেস্কু মনে করেন যে, “ওপর থেকে নীচের দিকে

ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকা সরকারি অধিকার ও ক্ষমতার বিভাজিত

কাঠামোই ছিল সামন্ততন্ত্র "

[3] কার্ল মার্কসের মত: কার্ল মার্কসের মতে, “স্বাধীনতাহীন শ্রমজীবী মানুষের দ্বারা বৃহৎ ভূসম্পত্তিতে কৃষি ও হস্তশিল্পজাত পণ্যসামগ্রী উৎপাদন করার ব্যবস্থাই হল সামন্তব্যবস্থা।"

[4] সর্বজনগ্রাহ্য ধারণা: মোটামুটিভাবে খ্রিস্টীয় নবম শতক থেকে চয়োদশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে ইউরোপে জমির বিশেষ ধরনের মালিকানার ওপর ভিত্তি করে একপ্রকার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও
[13:24, 9/29/2022] Debendu Dada: রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে। এই ব্যবস্থাকে সামন্ততন্ত্র বা 'Feudal

Ism' বলে।

ইউরোগে সামন্ততন্ত্রের উত্থান ও বিকাশ

কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন যে, প্রাচীন রোমান সাম্রাজে সামন্ততন্ত্রের উত্থান ঘটেছিল। তবে মধ্যযুগীয় সামন্ততন্ত্রের উত্থান শুরু হ

খ্রিস্টীয় নবম শতকের মধ্যভাগ থেকেই। [1] সামরতন্ত্রের উত্থানের পটভূমি: ৮১৪ খ্রিস্টাব্দে শার্লামেনের

মৃত্যুর পর ৮৪০ খ্রিস্টাব্দে ক্যারোলিণ্ডীয় সাম্রাজ্য তিনটি অংশে বিভ হয়ে যায়। সাম্রাজ্যের এই দুর্বলতার সুযোগে স্থানীয় প্রভুরা অর্থাৎ বৃহৎ জমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের জমি ও জনগণের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন। এভাবে সামন্ততন্ত্রের উত্থানের পটভূমি তৈরি হয়।

[2] সামন্ত্রের বিকাশ : ক্যারোলিঞ্জীয় সাম্রাজ্যের অবক্ষয় শুরু হলে

বিভিন্ন প্রান্ডের ও বিভিন্ন স্তরের সামন্তপ্রভুরা শীঘ্রই নিজেদের অধীন তালুকদারকে জমির বন্দোবস্ত দিতে থাকেন। এভাবে একটি ক্রমোচ্চ প্রভু ভৃত্যের সম্পর্ক তৈরি হয়। সর্বনিম্ন জোতদাররা সরাসরি কৃষকের সঙ্গে জমির বদোর করত। এভাবে নবম শতকে ইউরোপে সামন্ত বিকাশ লাভ করে।

[3] সামগ্রতন্ত্রের চূড়ান্ত বিকাশ : খ্রিস্টীয় নবম থেকে প্রয়োদশ শতক

পর্যন্ত সময়ে ইউরোপে সামন্ততন্ত্র প্রসারের প্রক্রিয়া চললেও এর পরিপূর্ণ বিকাশের যুগ ছিল খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতক।

[4] সম্পর্কের প্রতিষ্ঠা ছোটো ভূস্বামীরা নিজেদের সুরক্ষার জন্য তাদের ঊর্ধ্বতন বড়ো ভূস্বামীদের আশ্রয় গ্রহণ করে। বড়ো ভূস্বামীরা তাদের অধীনস্থ ছোটো ভূস্বামীদের সুরক্ষা দেয়। এভাবে একদিকে বিভিন্ন স্তরের সামন্তপ্রভুর মধ্যে এবং অন্যদিকে কৃষক ও সামন্তপ্রভুর মধ্যে সুরক্ষার বিনিময়ে সেবা ও আনুগত্যের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়।

উপসংহার: পশ্চিম ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের বিকাশলাভের পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে এই প্রথাই হয়ে ওঠে ইউরোপের সমাজ ও অর্থনীতির চালিকাশক্তি। দেশের সর্বোচ্চ শাসক অর্থাৎ রাজা থেকে শুরু করে কমনিম্ন বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে তা গ্রামের হতদরিদ্র কৃষক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।