Chapter-5, মেঘ-বৃষ্টি

শরৎকালে পশ্চিমবঙ্গের আকাশে সিরোকিউমুলাস এবং কিউমুলাস মেঘ দেখতে পাওয়া যায় | সিরোকিউমুলাস মেঘের বৈশিষ্ট্য: পেঁজা তুলোর মতো হালকা সাদা রঙের এই মেঘ ঢেউয়ের আকারে যখন ভেসে বেড়ায় তখন আকাশটা দেখতে অনেকটা ম্যাকারেল মাছের পিঠের মতো লাগে । কিউমুলাস মেঘের বৈশিষ্ট্য: পুরু, ঘন এই মেঘের উল্লম্ব বিস্তৃতি যথেষ্ট এবং এইমেঘের নিম্নাংশের রং কালো হলেও উপরিভাগের রং সাদা ।

কালবৈশাখীর সময় আকাশে কালো বা সাদা ধূসর রঙের গম্বুজের মতো যে মেঘ দেখা যায়, তার নাম কিউমুলোনিম্বাস মেঘ | এই মেঘ থেকে বজ্রপাতসহ প্রবল ঝড়বৃষ্টি বা শিলাবৃষ্টি হয় বলে এই মেঘের অন্য নাম বজ্রমেঘ

কোনো নির্দিষ্ট উস্নতায় নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ুকে সম্পৃক্ত করতে যে পরিমাণ জলীয়বাষ্প প্রয়োজন হয় তার তুলনায় ওই বায়ুতে কম জলীয়বাষ্প উপস্থিত থাকলে তাকে অসম্পৃক্ত বায়ু বলে। উষ্ণতা বৃদ্ধি করলে অসম্পৃক্ত বায়ুর জলীয়বাষ্প ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

বর্ষাকালের মেঘে জলকণার পরিমাণ খুব বেশি থাকে। অধিক ঘনত্বযুক্ত এই মেঘ ধূলিকণা, লবণের কণাকে আশ্রয় করে ভেসে বেড়ায় | এই মেঘের মধ্য দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না বলে এই মেঘকে কালো দেখায় | অন্যদিকে শরতের মেঘের ঘনত্ব কম হওয়ায় এই মেঘে সূর্যালোক প্রতিফলিত হয়। স্বভাবতই শরতের মেঘ সাদা হয় ।

সূর্যের তাপে জলভাগ থেকে জল বাষ্পে পরিণত হয়। ওই জলীয়বাষ্প বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা, লবণের কণাকে আশ্রয় করে ভেসে বেড়ায় এবং ক্রমশ ওপরের দিকে উঠতে থাকে। ওপরের শীতল বাতাসের সংস্পর্শে জলীয়বাষ্প শীতল ও ঘনীভূত হয়ে ধূলিকণা ও লবণের কণাকে আশ্রয় করে মেঘ হিসেবে ভেসে বেড়ায়। পরবর্তী সময়ে, এইভাবে ভাসমান ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণাগুলি (মেঘ) পরস্পর যুক্ত হয়ে বড়ো ও ভারী জলকণায় পরিণত হয়ে বৃষ্টিরূপে ঝরে পড়ে। তাই বাতাসে ধূলিকণা না থাকলে মেঘের উৎপত্তি ও বৃষ্টিপাত সম্ভব হত না |

বাতাসের জলীয়বাষ্পের ঘনীভূত হয়ে জলকণায় পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ঘনীভবন বলে । বৃষ্টিপাত ঘটার জন্য ঘনীভবন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় |

মেঘ সাধারণত চার প্রকার যথা—

1 বেশি উচ্চতার মেঘ (গড় নিম্নতম উচ্চতা 20000 ফুট) : [i] সিরাস বা অলক মেঘ, [ii] সিরোকিউমুলাস বা অলকস্তূপ মেঘ, [iii] সিরোস্ট্র্যাটাস বা অলকস্তর মেঘ ।

2 মাঝারি উচ্চতার মেঘ (গড় উচ্চতা 6500 ফুট-20000 ফুট): [i] অল্টোকিউমুলাস বা মাঝারি উঁচু স্তূপ মেঘ, [ii] অল্টোস্ট্র্যাটাস বা মাঝারি উঁচু স্তর মেঘ

ও নিম্ন উচ্চতার মেঘ (গড় সর্বোচ্চ উচ্চতা 6500 ফুট): [i] স্ট্র্যাটো কিউমুলাস বা নীচু স্তর মেঘ, [ii] স্ট্র্যাটাস বা স্তর মেঘ, [iii] নিম্নোস্ট্র্যাটাস বা বাদল স্তর মেঘ।

4 উল্লম্ব মেঘ (গড় নিম্নতম উচ্চতা 1600 ফুট) : [i] কিউমুলাস বা স্তূপ মেঘ,[ii] কিউমুলোনিম্বাস বা বাদল স্তূপ মেঘ |

সিরাস (Cirrus): এটি বায়ুমণ্ডলের সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থানরত অলক মেঘ। O বৈশিষ্ট্য: [i] ঘোড়ার লেজের মতো এই মেঘের আকৃতি হওয়ায় একে mare's tail বলে। [ii] এটি অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তুষারকণা দ্বারা গঠিত হওয়ায় এই মেঘ সাদা ও স্বচ্ছ পেঁজা তুলার মতো দেখতে হয়। [iii] সূর্যাস্তের আলোয় এই মেঘ অপূর্ব বর্ণচ্ছটা সৃষ্টি করে। আবহাওয়ার ওপর প্রভাব: সিরাস মেঘ সাধারণত পরিষ্কার আবহাওয়া নির্দেশ করে। সারা আকাশ এই মেঘে ঢাকা থাকলেও তার মধ্য দিয়ে সূর্যকে দেখা যায়। এরা যখন একে অপরের সাথে মিশে কখনী তৈরি করে, তখন আবহাওয়া খারাপ হয়ে পড়ে।

সিরোকিউমুলাস (Cirrocumulus) : এই মেঘের অপর নাম অলকস্তূপ মেঘ। বৈশিষ্ট্য: [1] এটি ছায়াবিহীন হালকা সাদা মেঘের স্তর। [ii] অতি সূক্ষ্ম তুষারকণা দিয়ে গঠিত ছোটো ছোটো সাদা মেঘ ঢেউ-এর মতো আকাশে ভেসে বেড়ায় । [iii] পেঁজা তুলোর মতো এই মেঘে আবৃত আকাশ দেখতে অনেকটা ম্যাকারেল মাছের পিঠের মতো। তাই এই মেঘে আকাশ ছেয়ে গেলে তাকে ম্যাকারেল আকাশ (mackerel sky) বলে।

মন্টোস্ট্রাটাস মেঘ (Altostratus) : এই মেঘের অন্য নাম সরু স্তরবিশিষ্ট মেঘ।  বৈশিষ্ট্য : [i] এই মেঘ সাধারণত ধূসর বা নীলচে রঙের হয়। [ii] এই মেঘ দেখতে অনেকটা তন্তুর মতো। [iii] এই মেঘের মধ্য দিয়ে সূর্যকে অনুজ্জ্বল দেখায়।  আবহাওয়ার ওপর প্রভাব : এই মেঘ ঝড়ের সূচনা করে এবং সাধারণত একটানা বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেয় | অল্টোকিউমুলাস মেঘ ( Altocumulus) : এটি একধরনের মাঝারি উচ্চতার মেঘ।

বৈশিষ্ট্য: [i] এই মেঘ সূক্ষ্ম ও মসৃণ গোলাকার পশমের গুচ্ছের মতো দেখতে। [ii] এই মেঘের ফাঁক দিয়ে নীল আকাশ দেখা যায়। [iii] এই মেঘ আকারে চ্যাপটা, গোলাকার প্রকৃতির হয়। [iv] আকাশে এই মেঘ রেখা কিংবা ঢেউ-এর মতো অবস্থান করে।

স্ট্র্যাটোকিউমুলাস মেঘ (Stratocumulus) : এই মেঘ ‘নিম্ন উচ্চতার মেঘ' শ্রেণির অন্তর্গত
বৈশিষ্ট্য: [i] এই মেঘ ধূসর কিংবা কালো রঙের হয়। [ii] মাঝ আকাশের অল্টোকিউমুলাস মেঘ আরও ভারী হয়ে নীচে নেমে এই মেঘ তৈরি করে। [iii] এই মেঘ স্তরে স্তরে স্তূপাকারে সজ্জিত থাকে। [iv] এই মেঘ সর্বদা গতিশীল থাকে ।

2) আবহাওয়ার ওপর প্রভাব : স্ট্র্যাটোকিউমুলাস মেঘ সাধারণত পরিষ্কার আকাশ নির্দেশ করে কিন্তু শীতকালে নাতিশীতোয় অঞ্চলে এই মেঘ সমস্ত আকাশ আবৃত করে এবং বৃষ্টিপাত ঘটায় |

স্ট্র্যাটাস মেঘ (Stratus): এই মেঘের অপর নাম স্তর মেঘ। 0 বৈশিষ্ট্য: এই মেঘ সাদা ও ধূসর বর্ণের হয়। [ii] ভূপৃষ্ঠের সাপেক্ষে 16000 ফুট থেকে 6500 ফুট উচ্চতার মধ্যে এই মেঘ অবস্থান করে। [iii] এই মেঘ ঘন কুয়াশার মতো স্তর তৈরি করে বলে এর উপস্থিতিতে বিমান চালকদের অসুবিধা হয় । আবহাওয়ার ওপর প্রভাব: এই মেঘ থেকে অনেক সময় গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিপাত হয় | নিস্তোস্টাটাস মেঘ (Nimbostratus) : একে বাদল স্তর মেঘও বলে।বৈশিষ্ট্য : [i] এই মেঘ গাঢ় ধূসর বা কালো বর্ণের হয়। [ii] বর্ষাকালে এই মেঘে আকাশ ঢেকে থাকে। [iii] এই মেঘ এত ঘন ও গভীর যে সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলে। [iv] এই মেঘে বজ্রপাত হয় না | 2 আবহাওয়ার ওপর প্রভাব : এই মেঘ থেকে প্রচুর শিলাবৃষ্টি ও অবিরাম বৃষ্টিপাত হয় ।

কিউমুলাস মেঘ (Cumulus) : এই মেঘের অন্য নাম স্তূপ মেঘ ↑ বৈশিষ্ট্য: [i] জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু ওপরে উঠে ঘনীভূত হলে কিউমুলাস মেঘের সৃষ্টি হয় [ii] এই মেঘের ওপরের অংশ অনেকটা ফুলকপির মতো হলেও তলদেশ সমতল। এই মেঘের শীর্ষদেশ খুব উঁচু, নিম্নাংশের রং কালো হলেও উপরিভাগের রং সাদা। [iii] মেঘের শীর্ষদেশ দিয়ে উজ্জ্বল সূর্যালোক দেখা যায় | 2 আবহাওয়ার ওপর প্রভাব: কিউমুলাস মেঘের উপস্থিতি সাধারণত পরিষ্কার আবহাওয়া নির্দেশ করে।

কিউমুলোনিম্বাস মেঘ (Cumulonimbus) : এই মেঘের অন্য নাম বাদল স্তূপ মেঘ |

বৈশিষ্ট্য: [i] কিউমুলাস মেঘ যখন আরও ওপরে উঠে যায় তখন তাকে কিউমুলোনিম্বাস মেঘ বলে। [ii] এই মেঘ ভূপৃষ্ঠ থেকে 12000 ফুটের বেশি উচ্চতায় অবস্থান করে। [iii] এই প্রকার মেঘের নীচের অংশ কালো কিন্তু পার্শ্ববর্তী অংশ ধূসর হয়। [iv] কালবৈশাখীর সময় এই মেঘ উত্তর পশ্চিম আকাশে দেখা যায়। [v] এই মেঘ থেকে প্রচণ্ড বজ্র-বিদ্যুৎসহ বৃষ্টিপাত হয় বলে এই মেঘকে বজ্রমেঘ (thunder cloud)-ও বলে।

2 আবহাওয়ার ওপর প্রভাব : কিউমুলোনিয়াস মেঘ থেকে বজ্র-বিদ্যুৎসহ প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত হয় এবং মাঝেমাঝে শিলাবৃষ্টিও হয় ।

 

লিউক হাওয়ার্ড 1803 সালে প্রথম মেঘের শ্রেণিবিভাগ করেন। আন্তর্জাতিক আবহবিদ্যা সংস্থা (International Meteorological Organization) 1956 সালে এই শ্রেণিবিভাগকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে গ্রহণ করে। উচ্চতা অনুসারে মেঘের শ্রেণিবিভাগ: ভূপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা অনুযায়ী মেঘকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা — নিম্ন উচ্চতার মেঘ (গড়
সর্বোচ্চ উচ্চতা 6500 ফুট), 2 মাঝারি উচ্চতার মেঘ (গড় উচ্চতা 6500 ফুট 20000 ফুট), 3 বেশি উচ্চতার মেঘ (গড় নিম্নতম উচ্চতা 20000 ফুট) এবং 4 উলম্ব মেঘ (গড় নিম্নতম উচ্চতা 1600 ফুট)। আকৃতি ও চেহারা অনুযায়ী মেঘের শ্রেণিবিভাগ: লিউক হাওয়ার্ড আকৃতি ও চেহারা অনুযায়ী মেঘকে তিনভাগে ভাগ করেন, যথা— ↑ সিরাস বা অলক মেঘ, 2 স্ট্র্যাটাস বা স্তর মেঘ এবং 3 কিউমুলাস বা স্তূপ মেঘ |

 

মেঘ: বায়ুর মধ্যে থাকা জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে ধূলিকণাকে আশ্রয় করে অতি ক্ষুদ্র জলকণা ও তুষারকণারূপে ভেসে বেড়ায়। একে মেঘ বলে। এককথায় বাতাসে ভাসমান জমাটবাঁধা জলকণার সমষ্টিকে মেঘ বলা হয়।

মেঘের সৃষ্টি : আবহবিজ্ঞানীদের মতে কয়েকটি পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে মেঘের উৎপত্তি হয়। এই পর্যায়গুলি হল— 0 প্রথম পর্যায় : এই পর্যায়ে সূর্যের উত্তাপে জলভাগের জল বাষ্পীভূত হয়। জলীয়বাষ্প সাধারণ বাতাসের তুলনায় হালকা হওয়ায় তা ওপরে উঠে

বায়ুমণ্ডলে জমা হয়। 2 দ্বিতীয় পর্যায় : ওপরে উঠে চাপ হ্রাসের কারণে জলীয়বাষ্প ক্রমশ শীতল হয়। তাপমাত্রা শিশিরাঙ্কের নীচে নেমে গেলে ঘনীভবন পদ্ধতি কার্যকরী হয়।

এই পর্যায়ে জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে অতি ক্ষুদ্র জলকণা এবং তুষারকণায় পরিণত হয়। 3 তৃতীয় পর্যায়: এইসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণা এবং তুষারকণাগুলি বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা, ছাই, লবণের কণা, ফুলের রেণু, কার্বন কণাকে অবলম্বন করে ঘুরে বেড়ায়। এরূপ অসংখ্য ভাসমান জলকণা বা তুষারকণা সম্মিলিতভাবে মেঘ সৃষ্টি করে ।

 

 

যে-কোনো বায়ুর জলীয়বাষ্প ধারণ বা গ্রহণ করার একটি নির্দিষ্ট সীমা
আছে। এই সীমা নির্ভর করে ওই বায়ুর উষ্ণতার ওপর। উন্নতা বাড়লে জলীয়বাষ্প গ্রহণ করার ক্ষমতা বাড়ে, উন্নতা কমলে জলীয়বাষ্প গ্রহণ করার ক্ষমতাও কমে। সুতরাং, নির্দিষ্ট উন্নতায় নির্দিষ্ট পরিমাণ বায়ু নির্দিষ্ট পরিমাপ জলীয়বাষ্প গ্রহণ করতে পারে। অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট উন্নতায় নির্দিষ্ট
পরিমাণ বায়ু যতটা পরিমাণ জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে, সেই পরিমাণ জলীয়বাষ্প ওই বায়ুতে উপস্থিত থাকলে বায়ুটি সম্পৃক্ত বায়ুতে পরিণত হবে। ধরা যাক, 25° সে উন্নতায় এক ঘন মিটার বায়ু সর্বোচ্চ 30 গ্রাম জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে। কিন্তু ওই বায়ুতে ওই সময় যদি 15 গ্রাম জলীয়বাষ্প থাকে তবে তখন তাকে অসম্পৃক্ত বায়ু বলে। ওই বায়ু যখন 30 গ্রাম জলীয়বাষ্প গ্রহণ করবে তখন তা সম্পৃক্ত বায়ুতে পরিণত হবে ।
বৈশিষ্ট্য: 0 সম্পৃক্ত বায়ু সর্বোচ্চ পরিমাণ জলীয়বাষ্প ধারণ করে। 2 সম্পৃক্ত বায়ুর উন্নতা হঠাৎ বেড়ে গেলে তার জলীয়বাষ্প ধারণ ক্ষমতাও বেড়ে যায়, অর্থাৎ বায়ু অসম্পৃক্ত হয়ে যায়। ও সম্পৃক্ত বায়ুর উন্নতা কমে গেলে বা ওই বায়ুর সঙ্গে আরও জলীয়বাষ্প যুক্ত হলে অতিরিক্ত জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘ ও বৃষ্টিপাত হয় ।

 

 

ভূপৃষ্ঠ দিনেরবেলা সৌরতাপ গ্রহণ করে উত্তপ্ত হতে থাকে পরিবহণ, পরিচলন ও বিকিরণ পদ্ধতির মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের উন্নতা দিনেরবেলা বাড়ে । রাতে পৃথিবীপৃষ্ঠ ও বায়ুমণ্ডল থেকে বিকিরিত তাপ দীর্ঘ তরঙ্গরূপে মহাশূন্যে ফেরত যায় এবং বায়ুমণ্ডল শীতল হয় । কিন্তু রাত্রে যদি আকাশ মেঘে ঢাকা থাকে তবে ওই তাপ বিকিরিত হতে না পেরে পুনরায় পৃথিবীপৃষ্ঠে ফেরত আসে বা বায়ুমণ্ডলে থেকে যায়। তাই মেঘাচ্ছন্ন রাত্রি গরম হয় |

 

 

সাধারণ অবস্থায় বায়ুতে যে পরিমাণ জলীয়বাষ্প থাকে তাতে ওই বায়ু সম্পৃক্ত হয় না। কোনো কারণে ওই বায়ু ধীরে ধীরে শীতল হলে তার জলীয় বাষ্প ধারণ ক্ষমতা কমে যায়। এই অবস্থায় ওই বায়ু আরও ঠান্ডা হলে তার জলধারণ ক্ষমতাও কমতে কমতে এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, তা উপস্থিত জলীয়বাষ্প দ্বারা সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। এই সময় বায়ু তার ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত জলীয়বাষ্প ত্যাগ করে এবং ওই জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে শিশিরে পরিণত হয় যে নির্দিষ্ট উন্নতায় বায়ুতে শিশির জমতে শুরু করে, সেই উন্নতাকে বলা হয় শিশিরাঙ্ক। অন্যভাবে বলা যায়, যে উন্নতায় বায়ু ওর মধ্যে উপস্থিত জলীয়বাষ্প দ্বারা সম্পৃক্ত হয় তাকে ওই বায়ুর শিশিরাঙ্ক বলে।

আবহাওয়ার উপাদান হিসেবে মেঘ খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ সব সময়ের এবং সব মেঘ থেকে বৃষ্টিপাত না হলেও মেঘ ছাড়া বৃষ্টিপাত অসম্ভব। 2 দিনেরবেলা আকাশে মেঘ থাকলে সৌররশ্মি সরাসরি ভূপৃষ্ঠে আপতিত হতে পারে না ফলে দিনের তাপমাত্রা কমে যায়। ও দিনেরবেলা পরিষ্কার মেঘমুক্ত আকাশ ও রাতে আকাশে মেঘ থাকলে সেখানকার তাপমাত্রা বেড়ে যায় | কিন্তু দিন ও রাত উভয় সময়ই আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে, দিনেরবেলা তাপমাত্রা বাড়লেও রাতে উষ্ণতা হ্রাস পায়। 4 বায়ুমণ্ডলে তাপের সমতা রক্ষায় মেঘের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

পরিশেন বৃষ্টিপাতের প্রধান হল উন্নত। গ্রীষ্মকালে শ্ম এইভাবে পড়ায় উষ্ণতা খুব বেশি হয়। অধিক উন্নতার কারণে জলভাগ থেকে অধিক পরিমাণ জলীয়বাষ্প বাতাসে মেশে। এই জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু শীত বাতাসের সংস্পর্শে ঘনীভূত হয়ে প্রথমে মেঘ ও পড়ে বৃষ্টিরূপে নীচে নেমে আসে অর্থাৎ পরিচলন বৃষ্টিপাত ঘটে। তাই গ্রীষ্মকালে পরিচলন বৃষ্টি বেশি হয়।

 

নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলে সারাবছর পরিচলন প্রক্রিয়ায় বৃষ্টিপাত হয়। পরিচলন বৃষ্টিপাত বেশি হয় এমন দুটি অঞ্চল হল- দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলের আমাজন অববাহিকা ও ঔ আফ্রিকা মহাদেশের জাইরে অববাহিকা।

 

পরিচলন বৃষ্টিপাতে সাধারণত পরিচলন পদ্ধতিতে বায়ু উত্তপ্ত হয়।

বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে নীচের স্তরের বায়ু উত্তপ্ত হয়ে প্রসারিত ও হালকা হয়ে ওপরে ওঠে। তখন পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের শীতল বাতাস ওই স্থান পূরণ করার জন্য ছুটে আসে। পরে সেই বায়ুও উত্তপ্ত হয়ে ওপরে ওঠে। এভাবে নীচের জলকণাসমৃদ্ধ হালকা বাতাস ওপরে উঠে যায় ও মেঘ সৃষ্টি করে বৃষ্টিপাতে  সহায়তা করে।

পূর্ব ভারতে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওডিশা, অসম প্রভৃতি স্থানে মার্চ-এপ্রিল (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ) মাসে সন্ধের দিকে যে প্রবল বিদ্যুৎসহ ঝড়বৃষ্টি হয় তাকে কালবৈশাখীর ঝড় বলে। এটি প্রকৃতপক্ষে একপ্রকার পরিচলন বৃষ্টিপাত।

 

কোনো নির্দিষ্ট উন্নতায় নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ুতে যে পরিমাণ জলীয়বাষ্প উপস্থিত এবং উক্ত উন্নতায় ওই বায়ুকে সম্পৃক্ত করতে যে পরিমাণ জলীয়বাষ্প প্রয়োজন—এই দুই এর অনুপাতকে আপেক্ষিক আর্দ্রতা বলে। সম্পৃক্ত বায়ুর আপেক্ষিক আর্দ্রতা 100 শতাংশ ।

 

→ বায়ুর উন্নতা বেড়ে গেলে তার জলীয়বাষ্প ধারণ ক্ষমতা বেড়ে যায়, ফলে বায়ুর আপেক্ষিক আর্দ্রতা কমে যায়। আবার বায়ুর উচ্চতা কমে গেলে তার জলীয়বাষ্প ধারণ ক্ষমতাও কমে যায়। ফলে বায়ুর আপেক্ষিক আর্দ্রতা বেড়ে যায়। সুতরাং, বায়ুর উন্নতা এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতার মধ্যে একটি বিপরীতধর্মী সম্পর্ক আছে।

পর্বতের বৃষ্টিপাতহীন, অনুবাত ঢালকে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল বলে। উদাহরণ-ভারতের মেঘালয় মালভূমি পর্বতের অনুবাত ঢালে অবস্থিত হওয়ায় এটি বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল।

 

সাম্প্রতিক ভারতে ঘটে যাওয়া দুটি ঘূগবাত হল- 2009 সালের
নামে পরিচিত। ঘূর্ণবতি, যা আয়লা নামে পরিচিত। 2 2013 সালের ঘূর্ণবাত, যা ফাইলিন নামে পরিচিত ।

 

শরৎকালে পশ্চিমবঙ্গ ও সন্নিহিত বঙ্গোপসাগরীয় উপকূল অঞ্চলে সৃষ্ট
ঘূর্ণিঝড়কে আন্বিনের ঝড় বলে। এটি একপ্রকার ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাতজনিত
বৃষ্টিপাত ।

আশ্বিন-কার্তিক (অক্টোবর-নভেম্বর) মাসে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গসহ
ভারতের পূর্বাঞ্চলে যে প্রবল ঘূর্ণবৃষ্টির সৃষ্টি হয় তাকে আগ্নিনের ঝড় বলে।
মৌসুমি বায়ুর দিকপরিবর্তন বা প্রত্যাবর্তনের ফলে বঙ্গোপসাগর উপকূলে
এটি সৃষ্টি হয়।

ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি মাসে সূর্যের দক্ষিণায়নের সময় ভারতে শীতকাল
চলাকালীন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে উদ্ভূত ঘূর্ণবাতের অনুপ্রবেশ ঘটে ও বৃষ্টিপাত
হয় | পশ্চিমদিক থেকে এই বায়ুর আগমন ঘটে বলে এর নাম পশ্চিমি ঝঞ্ঝা।

আমাদের দেশে বর্ষাকালে সাধারণত দুই ধরনের বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে-
1 ভারতের পার্বত্য অঞ্চলগুলিতে শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত হয়। ২ পূর্ব ও
পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের বহুস্থানে পরিচলন প্রক্রিয়ায় বৃষ্টিপাত ঘটে।

যে তাপে উন্নতার পরিবর্তন না মোর পদার্থের কথা কেঠিন--তরুণ, তরুণ-গী, গায়, কঠি পরিবর্তন ঘটে তাকে লীনতাপ বলে। জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে জলকণার পরিণত হওয়ার সময় লীনতাপ ভাগ করে।

 

কোনো নির্দিষ্ট উচ্চতায় নির্দিষ্ট আয়তন বায়ুকে সম্পৃক্ত করতে যে পর্যাপ্ত
পরিমাণ জলীয়বাষ্প প্রয়োজন, বায়ুতে যদি তার তুলনায় অধিক পরিমা
জলীয়বাষ্প উপস্থিত থাকে, তবে তাকে অভিসম্পৃক্ত বা অতিপরিপৃক্ত বায়ু
বলে। এই বায়ুর অতিরিক্ত জলীয়বাষ্প ধারণ করার ক্ষমতা থাকে না।

জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে অনেক সময় ধোঁয়ার সৃষ্টি করে। এই ধোঁয়া যখন
ভূপৃষ্ঠের ওপর দেখা যায় তখন তাকে মিস্ট বলে।

 

শীতপ্রধান দেশে ও উমণ্ডলের উঁচু পর্বতশিখরে রাতে উন্নতা খুব কমে
গেলে সেখানে শিশির বিন্দু জমাট বেঁধে যায়। ওই কঠিন জমাট বাঁধ
শিশিরকে তুহিন বলে।

যখন কোনো নির্দিষ্ট স্থানে জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু উন্ন ভূপৃষ্ঠের সংস্পর্শে হয়ে। উন্ন হয়ে সোজা ওপরে উঠে যায় এবং ওপরে শীতল ও ঘনীভূত হয়ে সেই স্থানেই বৃষ্টিপাত ঘটায়, তখন তাকে পরিচলন বৃষ্টি বলে। যেমন—নিরক্ষীয়অঞ্চলে এই পদ্ধতিতে বৃষ্টিপাত হয়।