Chapter-5, শিকার

ভোরের আকাশে একটি তারা বলতে কবি শুকতারার কথা বলতে চেয়েছেন।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় 'এখনও' বলতে রাতশেষের ভোরকে বোঝানো হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় 'এখনও' বলতে রাতশেষের ভোরকে বোঝানো হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় 'তারা'-টিকে প্রাথমিকভাবে পাড়াগাঁর বাসরঘরের সবথেকে 'গোধূলিমদির মেয়েটির সঙ্গে তুলনা করা

ভোরের আকাশে তারাটির উপস্থিতিকে কবি তুলনা করেছেন পাড়াগাঁর বাসরঘরের গোধূলিমদির মেয়েটির সঙ্গে কিংবা হাজার বছর আগের মিশরের মানুষীর বুকের থেকে কবির নীল মদের গেলাসে রাখা মুক্তার সঙ্গে।

কবি জীবনানন্দ দাশ রাতজাগা তারাটিকে পাড়াগাঁর বাসরঘরের সবথেকে গোধূলিমদির মেয়েটির এবং মিশরের মানুষীর বুকের মুক্তার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তারাটিকে দেখে কবির পাড়াগায়ের বাসরঘরের লজ্জাশীলা মেয়ে এবং মিশরের মানুষীর বুকের থেকে নীল মদের গেলাসে রাখা মুক্তো মনে হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় 'গোধূলিমদির মেয়েটির মতো' ভোরের আকাশে জেগে থাকা তারার কথা বলা হয়েছে।

'শিকার' কবিতায় উল্লিখিত গাছগুলির অন্যতম হল পেয়ারা ও নোনার গাছ।

পেয়ারা ও নোনার গাছের রংকে কবি টিয়াপাখির পালকের সবুজ রঙের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

গোধূলিমদির মেয়েটিকে পাড়াগাঁর বাসরঘরে দেখতে পাওয়া যায়।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় মিশরের মানুষীর সঙ্গে কবির সাক্ষাৎ হয়েছিল হাজার হাজার বছর আগের এক রাতে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় মিশরের মানুষীর বুকের মুক্তার কথা বলা হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় মিশরের মানুষী তার বুকের মুক্তাটি রেখেছিল কবির নীল মদের গেলাসে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় হাজার হাজার বছর আগের এক রাতে মিশরের মানুষী তার বুকের মুত্তা রেখেছিল কবির নীল মদের গেলাসে ।

মিশরের মানুষী তার বুক থেকে মুক্তা কবির নীল মদের গেলাসে রেখেছিল।

হাজার হাজার বছর আগে এক রাতে মিশরের মানুষী তার বুকের থেকে এক মুত্তা তুলে কবির নীল মদের গেলাসে রেখেছিল।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় সারারাত মাঠে যে আগুন জ্বালা হয় তাতে এখনও অর্থাৎ ভোরবেলায় শুকনো অশ্বত্থপাতা পুড়ছে।

জীবনানন্দ দাশের ‘শিকার' কবিতায় মোরগফুলের সঙ্গে সারারাত জ্বলতে থাকা লাল আগুনের তুলনা করা হয়েছে।

'শিকার' কবিতায় দেশোয়ালি মানুষেরা হিমের রাতে নিজেদের শরীর গরম রাখার জন্য মোরগফুলের মতো লাল আগুন জ্বালিয়েছিল।

এখানে হিমের রাতে শরীর গরম রাখার জন্য দেশোয়ালিদের জ্বালানো লাল আগুনের কথা বলা হয়েছে।

'শিকার' কবিতায় দেশোয়ালি মানুষেরা হিমের রাতে নিজেদের শরীর গরম রাখার জন্য মোরগফুলের মতো লাল আগুন জ্বালিয়েছিল।

এখানে হিমের রাতে শরীর গরম রাখার জন্য দেশোয়ালিদের জ্বালানো লাল আগুনের কথা বলা হয়েছে।

দেশোয়ালিরা শরীরকে গরম রাখার জন্য রাতে যে আগুন জালিয়েছিল, দোমড়ানো, শুকনো অশ্বথপাতা সেই আগুনকে তোর অবধি জ্বালিয়ে রেখেছিল।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় 'তার রং' বলতে দেশোয়ালিদের জ্বালানো আগুনের রঙের কথা বলা হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় সেলোয়ালিদের জ্বালা আগুনের রং সূর্যের আলোয় রোগা শালিকের বিবর্ণ ইচ্ছার মতো হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় সূর্যের আলোয় বিবর্ণ আগুনের রং আগে ছিল কুঙ্কুমের মতো।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় কবি সারারাত মাঠে দেশোয়ালিদের জ্বালানো আগুনের কথা বলেছেন।

কুঙ্কুম হল মেয়েদের কপালে টিপ পরার এক প্রসাধনসামগ্রী।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় সারারাত জ্বলতে থাকা কাকার মতো নেই।

আগুনের রং রোগা শালিকের বিবা ইচ্ছার মতো হয়ে গেছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় সারারাত জ্বলতে থাকা আগুনের রং সূর্যের আলোয় স্নান হয়ে যে বিবর্ণ রূপ ধারণ করেছে, তার কথাই এখানে বলা হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় 'সকালের আলোয় টলমল শিশিরে' চারদিকের বন ও আকাশ ময়ূরের সবুজ নীল ডানার মতো ঝিলমিল করছে।

শিকার' কবিতায় সকালের আলোয় টলমল করা শিশিরে, বন ও আকাশকে দেখে কবির মনে হয়েছিল তা ময়ূরের সবুজ নীল ডানার মতো। ঝিলমিল করছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় ময়ূরের ডানার রং ছিল সবুজ

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় সকালের আলোয় টলমল করা শিশিরে চারদিকের বন ও আকাশকে ময়ূরের সবুজ নীল ডানার মতো ঝিলমিল করতে দেখেছেন কবি।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় চিতাবাঘিনির হাত থেকে সুন্দর বাদামি হরিশটি নিজেকে বাঁচিয়েছিল সারারাত সুন্দরী আর অর্জুনের বনে ঘুরে ঘুরে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় চিতাবাঘিনির হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে সুন্দর বাদামি হরিণটি ভোরের জন্য অপেক্ষা করেছিল।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় চিতাবাঘিনির হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে হরিণটি নদীর জলে নেমেছিল তার ঘুমহীন ক্লান্ত শরীরে স্রোতের আবেশ দেওয়ার জন্য।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় হরিণটি চিতাবাঘিনির হাত থেকে বাঁচলেও শিকারির গুলি শেষপর্যন্ত তাকে বাঁচতে দেয়নি।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় মেহগনির মতো অন্ধকারে বলতে গভীর অন্ধকার বোঝানো হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় মেহগনির মতো অন্ধকারে সুন্দরীর বন থেকে অর্জুনের বনে ঘুরে ঘুরে সুন্দর বাদামি হরিণটি ভোরের জন্য অপেক্ষা করেছিল।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় হরিণটি চিতাবাঘিনির হাত। থেকে বাঁচতে সুন্দরী গাছের বন থেকে অর্জুন গাছের বনে সারারাত ঘুরে। বেড়িয়েছিল।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় সুন্দর বাদামি হরিণটি সুন্দরীর বন থেকে অর্জুনের বনে ঘুরছিল।

সুন্দর বাদামি হরিণটি সুন্দরীর বন থেকে অর্জুনের বনে ঘুরেছিল চিতাবাঘিনির হাত থেকে নিজেকে বাচানোর জন্য।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় 'সুন্দর বাদামি হরিণ'-টি চিতাবাঘিনির হাত থেকে বাঁচতে সুন্দরীর বন থেকে অর্জুনের বনে ঘুরেছিল।

এখানে কচি বাতাবিলেবুর মতো সবুজ, সুগন্ধি ঘাস ছিঁড়ে যাওয়ার জন্য সুন্দর বাদামি হরিণের নেমে আসার কথা বলা হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় কচি বাতাবিলেবুর মতো সবুজ সুগদ্ধি ঘাসের কথা বলা হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় কচি বাতাবিলেবুর সঙ্গে। ঘাসের তুলনা করা হয়েছে তার সবুজ রং ও সুগশ্বের জন্য।

চিতাবামিনির হাত থেকে রক্ষা পেতে সারারাত ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ায় হরিণটি ডোরে সবুজ, সুগন্ধি ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছিল।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় সুন্দর বাদামি হরিণটি কচি বাতাবিলেবুর মতো সবুজ, সুগন্ধি ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছিল।

'শিকার' কবিতায় হরিণটি তার ক্লান্তি কাটানোর জন্য কনকনে ঠান্ডা জলে পা ডুবিয়েছিল।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় নদীর তীক্ষ্ণ শীতল চেউয়ে হরিণটি নেমেছিল তার সারারাত জেগে থাকার ক্লান্তি দূর করে শরীরকে আবেশ দেওয়ার জন্য ।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় তীক্ষ্ণ শীতলতা ঠান্ডার তীব্রতাকে নির্দেশ করে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় সুন্দর বাদামি হরিণের ঘুমহীন শরীরের কথা বলা হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় সারারাত জেগে চিতাবাঘিনির হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর কারণে সুন্দর বাদামি হরিণের শরীর ঘুমহীন এবং ক্লান্ত।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় ঘুমহীন ক্লান্ত শরীর নিয়ে • হরিণটি নদীর তীক্ষ্ণ শীতল ঢেউয়ে নেমে গিয়েছিল।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় সুন্দর বাদামি হরিণের ক্লান্ত, ঘুমহীন শরীরে স্রোতের মতো আবেশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় 'স্রোতের মতো আবেশ বলতে স্বাভাবিক গতিশীলতাকে বোঝানো হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় 'অন্ধকারের হিম কুণ্ঠিত জরায়ু ছিঁড়ে ভোরের রোদ বেরিয়ে আসে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় বিস্তীর্ণ উল্লাস পাওয়ার জন্য সুন্দর বাদানি হরিণ নদীর তীক্ষ্ণ শীতল ঢেউয়ে তার ক্লান্ত, বিহবল শরীরকে ভাসিয়ে দেয়।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় সুন্দর বাদামি হরিণটি সাহসে, সাথে ও সৌন্দর্যে অন্য হরিণীদের চমক লাগানোর জন্য জেগে উঠতে চায়।

নীল আকাশের নীচে সূর্যের সোনার বর্ণার মতো জেগে উঠে হরিণটি সাহসে, ইচ্ছাশক্তিতে এবং সৌন্দর্যে অন্য হরিণীদের চমক লাগিয়ে দিতে চায়।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় সুন্দর বাদামি হরিণটি অন্য হরিণীদের চমক লাগিয়ে দিতে চেয়েছিল।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় সুন্দর বাদামি হরিণ নীল আকাশের নীচে সূর্যের সোনার বর্ণার মতো জেগে উঠে চমক লাগিয়ে দিতে।

'সোনার বর্গার মতো জেগে উঠে হরিণটি সাহসে -সাথে-সৌন্দর্যে হরিণীর পর হরিণীকে চমক লাগিয়ে দিতে চেয়েছিল।

'একটা অদ্ভুত শব্দ' বলতে শিকারির বন্দুকের গুলির শব্দের কথা বলা হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় যে শব্দ হয় তা 'অদ্ভুত', কারণ নির্মল প্রকৃতির বুকে তেমন আওয়াজ সচরাচর হয় না।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় অদ্ভুত শব্দটি হয় ভোরবেলায়।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় 'শব্দ'-টি হওয়ার পরে দেখা গেল, নদীর জল মচকাফুলের পাপড়ির মতো লাল হয়ে উঠেছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় ভোরবেলা শিকারির গুলিতে বিশ্ব হরিণের রক্তে নদীর জল মচকাফুলের পাপড়ির মতো লাল হয়ে উঠেছিল।

'শিকার' কবিতায় নদীর জলের রং মচকাফুলের পাপড়ির মতো লাল হয়েছিল।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় 'আবার আগুন জ্বালিয়েছিল শিকারি মানুষের দল |

: জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় প্রথমবার আগুন জ্বালিয়েছিল দেশোয়ালিরা, তাই "আবার" শব্দটির সাহায্যে শিকারিদের আগুন জ্বালানোকে বোঝানো হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় ঘুমকে 'নিস্পন্দ' বলা হয়েছে, কারণ তা হরিণের চিরনিদ্রা অর্থাৎ মৃত্যুকে নির্দেশ করে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় সকালবেলায় হরিণের মৃত্যুর পরে যখন তার মাংস রান্না করা হচ্ছিল, সেই সময়ের কথা বলা হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় 'নক্ষত্রের নীচে ঘাসের বিছানায়' সিগারেটের ধোঁয়ায় অনেক পুরোনো শিশিরভেজা গল্প হয় ।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় 'নক্ষত্রের নীচে ঘাসের বিছানায়' বসেছিল টেরিকাটা শিকারি মানুষের দল।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় নক্ষত্রের নীচে ঘাসের বিছানায় শিকারিদের খাওয়া সিগারেটের ধোঁয়া উঠছিল।

কিনারেটের ধোঁয়া, রিকাটা কয়েকটা মানুষের কয়েকটা কদুকই ছিল শিকারি মানুষদের উপস্থিতির চিহ্ন।

জীবনানন্দ দাশের শিকার কবিতা "নিষ্পন্দ নিরপরাধ ঘুম" বলা হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় আবার আগুন হারিয়ে মৃত হরিণের মাংস রান্না করা হল।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় ঘুমকে হয়েছে, কারণ হরিণের মৃত্যু তার নিজের অপরাধের কারণে মানুষের লালসার কারণে।

জীবনানন্দ দাশের মহাপৃথিবী কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত 'শিকার' কবিতাটি রচিত হয়েছে একটি 'ভোর'-এর পটভূমিতে। অন্ধকারের জরায়ু থেকে জন্ম নেওয়া ভোরে যখন আকাশের রং পালটে যায়, পেয়ারা এবং নোনার গাছের সবুজ ফুটে ওঠে—তখনই আকাশে দেখা যায় একটি তারাকে। যেন রাতের বিদায়ী অস্তিত্বকে সে ধারণ করে রাখে। ভোরের এই তারাকে কবি তুলনা করেন "পাড়াগাঁর বাসরঘরে সব চেয়ে গোধূলিমদির" মেয়েটির সঙ্গে। অর্থাৎ, তারাটির উপস্থিতির সঙ্গে কবি গ্রামবাংলার বাসরঘরের মেয়েটির মতো লজ্জা আর কুন্ঠাকে তুলনা করেছেন। 'বাসরঘরে' আর 'মদির' শব্দের ব্যবহারে কবি সেই সলজ্জ স্বভাবকে আরও গভীর করে তোলেন। এরপরেই তারাটির উপস্থিতিকে কবি তুলনা করেন 'মিশরের মানুষী'-র সঙ্গে, যে হাজার হাজার বছর আগে এক রাতে তার বুকের থেকে মুক্তা নিয়ে রেখেছিল কবির নীল মদের গেলাসে। একটু আগে গ্রাম্য মেয়ের সঙ্গে তুলনায় যে সহজতা ছিল তা ভেঙে যায় ঐতিহাসিক আড়ম্বরে। নীল আকাশের ক্যানভাসে রাত জাগা তারা আর নীল মদের পাত্রে রাখা মুক্তা যেন কবিতা শিকার মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ‘মিশরের মানুষী' আর ‘হাজার হাজার বছর' মিলে ছবিটি দেশকালের সীমা অতিক্রম করে চিরকালীন বিস্তৃতি পায়। ভোরের আকাশের তারা কবির চেতনায় অসামান্য শিল্পরূপ লাভ করে। প্রকৃতির যে স্নিগ্ধ, অমলিন পটভূমি তৈরি করা এখানে কবির লক্ষ্য ছিল, ভোরের তারা তাতে যেন এক নতুন মাত্রা যোগ করে।

জীবনানন্দ দাশের মহাপৃথিবী কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া 'শিকার' কবিতার প্রথম অংশে কবি ভোরের আগমনে প্রকৃতির যে রূপান্তর ঘটে তার বর্ণনা দিয়েছেন। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে আকাশের রং যেমন পালটে যায়, প্রকৃতি হয়ে ওঠে সবুজ—ঠিক সেভাবেই হিমের রাতে দেশোয়ালি মানুষরা তাদের শরীর গরম রাখার জন্য সারারাত মাঠে যে আগুন জ্বেলেছিল—

“মোরগফুলের মতো লাল আগুন”—সে আগুনও নিভে আসে। শুকনো অশ্বত্থপাতায় সে আগুনের অবশেষ জ্বলতে থাকে, কিন্তু তার তেজ আর রং আগের মতো থাকে না। কবির কথায়, সূর্যের আলোয় সেই আগুনের রং আর কুঙ্কুমের মতো থাকে না, হয়ে যায় “রোগা শালিকের হৃদয়ের বিবর্ণ ইচ্ছার মতো।” একটি অসাধারণ উপমানের ব্যবহার করেছেন কবি এখানে, যার সম্পূর্ণটাই আসলে এক অসামান্য চিত্রকল্প রাতের অবসানে আগুন নিভে আসে, সূর্যের আলোয় তা ম্লান হয়ে যায়, আর তাকে কবি মিলিয়ে দেন অল্পপ্রাণ এক শালিকের হৃদয়ের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া ইচ্ছার সঙ্গে। সামান্য একটি স্পর্শযোগ্য বিষয় এখানে অনুভূতির বিষয় হয়ে ওঠে। আর তার থেকে অনেক দীপ্তিমান হয়ে ওঠে চারদিকের বন ও আকাশ, যা সকালের আলোয় টলমল শিশিরে ময়ূরের সবুজ-নীল ডানার মতো ঝিলমিল করে।

জীবনানন্দ দাশের লেখা 'শিকার' কবিতার প্রশ্নোদ্ধৃত অংশে হিমের রাতে শরীর গরম রাখার জন্য দেশোয়ালি মানুষেরা সারারাত মাঠে যে আগুন জ্বেলেছিল, সেই আগুনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মোরগফুলের মতো সেই লাল আগুন সূর্যের আলোয় ঔজ্জ্বল্য হারিয়েছে । শুকনো অশ্বত্থপাতায় আগুন জ্বলতে থাকলেও সূর্যের আলোয় সে আগুনের কুঙ্কুমের মতো অসাধারণ দীপ্তি ম্লান হয়ে গেছে। ভোরের আলোয় বিবর্ণ হয়ে যাওয়া সেই আগুনের কথাই এখানে বলা হয়েছে।

» সারারাত জ্বলতে থাকা আগুনের ম্লান হয়ে যাওয়া আসলে ভোর হওয়ার ইঙ্গিত। তখনই সকালের আলোয় টলমল করা শিশিরে চারদিকের বন আর আকাশ ঝিলমিল করে ওঠে। যেন রাতের অস্পষ্টতা থেকে গভীর নিশ্চিন্তে জীবনের জাগরণের পটভূমি রচিত হয় । কিন্তু সবটাই কাল্পনিক ধারণা মাত্র কবিতার শেষে তার নির্মম বাস্তবতা নৃশংস রূপ প্রকাশ করে। সারারাত চিতাবাঘিনির হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা সুন্দর বাদামি হরিণ যেন এই ভোরের কাছ থেকে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা পেয়েছিল। ভোরের আলোয় তাই সে কচি বাতাবিলেবুর মতো সবুজ, সুগন্ধি ঘাস ছিঁড়ে খাচ্ছিল । তারপর যখন সে নদীর জলে নামে ক্লান্তি কাটানোর জন্য, তখনই শিকারির বন্দুকের গুলিতে মৃত্যু হল তার। নদীর জল মচকাফুলের মতো লাল হয়ে উঠল। এক আগুন নিভে গিয়ে আর-এক আগুন জ্বলল, হরিণের মাংস তৈরির জন্য। তাই প্রশ্নোদ্ভূত মন্তব্যটি যেন হয়ে ওঠে এই নৃশংসতার এক বৈপরীত্যময় প্রতীক।

চিত্ররূপময় কবি জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতাটির সূচনা হয়েছে একটি ডোরের দৃশ্যকে পটভূমি করে। সেই ভোরবেলায় আকাশের রং ঘাসফড়িঙের শরীরের মতো কোমল নীল ঘাসফড়িঙের সঙ্গে ভোরের আকাশকে তুলনা করায় প্রকৃতির মধ্যে প্রাণের একটি চাঞ্চল্য স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায় | এই ভোরবেলায় চারদিকের পেয়ারা আর নোনার গাছ টিয়ার পালকের মতো সবুজ। গাছের পাতাকে পাখির পালকের সঙ্গে তুলনা করার মধ্য নিয়ে প্রকৃতিরাজ্যে প্রাণের স্পর্শ এবং গতিশীলতাকে তুলে ধরা হয়েছে। একটি তারা তখনও আকাশে জেগে রয়ে গেছে—যেন সে রাতের বিদায়ী অস্তিত্বকে নিজের মধ্যে ধারণ করে রেখেছে। ভোরের এই তারাকে কবি তুলনা করেছেন পাড়াগাঁর বাসরঘরে "সব চেয়ে গোধূলিমন্দির মেয়েটির" সঙ্গে। অর্থাৎ তার উপস্থিতির মধ্যে কবি লক্ষ করেন গ্রামবাংলার মেয়েদের মতো লজ্জা এবং কুণ্ঠাকে। ‘বাসরঘরে' আর ‘মদির' শব্দের ব্যবহারে কবি সেই লজ্জাকে আরো গভীর ও জীবন্ত করে তুলতে চান এরপরে তারাটির উপস্থিতিকে কবি তুলনা করেছেন "মিশরের মানুষী'-র সঙ্গে, যে হাজার হাজার বছর আগে এক রাতে তার বুকের থেকে মুক্তা নিয়ে রেখেছিল কবির নীল মদের গেলাসে। একটু আগে গ্রাম্য মেয়ের সঙ্গে তুলনায় প্রকৃতির যে সহজতা ছিল, তাও ভেঙে যায় এই মিশরের মানুষীর ঐতিহাসিক আড়ম্বরে। মিশরের মানুষী' আর 'হাজার হাজার বছর' মিলে ছবিটি এভাবেই দেশের সীমা অতিক্রম করে এক চিরকালীন বিস্তৃতি পায়।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় 'ডোর'-এর পটভূমিতে যখন চারপাশ উদ্ভাসিত, সকালের আলোয় শিশিরভেজা চারদিকের বন ও আকাশ যখন ‘ময়ূরের সবুজ নীল ডানার মতো ঝিলমিল করছে'— সেই সময় একটি সুন্দর বাদামি হরিণকে ভোরের আলোয় নেমে আসতে দেখা যায়। সমস্ত রাত চিতাবাঘিনির হাত থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য হরিপটি 'নক্ষত্রহীন, মেহগনির মতো অন্ধকারে সুন্দরীর বন থেকে অর্জুনের বনে ঘুরে বেড়িয়েছিল। তার

ভোরের জন্য অপেক্ষার কারণ ছিল যুক্তির পরিসর খুঁজে পাওয়া।

* হরিণটির পরিণতি ছিল মর্মান্তিক। প্রথমে বন্দুকের গুলির শব্দ শোনা যায়। তারপরই নদীর জল যেন মচকাফুলের পাপড়ির মতো লাল হয়ে ওঠে। যে হরিণটি ভোরের আলোয় নদীতে নেমেছিল নিজের ঘুমহীন ক্লান্ত শরীরকে স্রোতের মতো একটা আবেশ দেওয়ার জন্য, তাকেই দেখা যায় গুলিবিদ্ধ হয়ে "উন্ন লাল মাংসপিণ্ডে রূপান্তরিত হতে।

এই পরিণতি এক গভীর সমাজবাস্তবতাকে নির্দেশ করে। প্রকৃতির বুকে নাগরিক সভ্যতার আগ্রাসনের নিদর্শন হয়ে থাকে হরিণের এই মৃত্যু। 'নক্ষত্রের নীচে ঘাসের বিছানায় সিগারেটের ধোঁয়া আর 'টেরিকাটা কয়েকটা মানুষের মাথা নিশ্চিত করে দেয় নগরসভ্যতার বিকৃত লালসা মেটাতেই প্রাণ দিতে হয়েছে হরিণটিকে। হরিণটি আসলে সমগ্র প্রকৃতির প্রতীক, আসলে প্রকৃতিকেই এভাবে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে উদ্ধৃত মানবসভ্যতার কাছে।

জীবনানন্দ দাশের লেখা 'শিকার' কবিতায় সারারাত চিতাবাঘিনির হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে গভীর অন্ধকারে সুন্দরীর বন থেকে অর্জুনের বনে ঘুরে ঘুরে একটি সুন্দর বাদামি হরিণ চলে এসেছিল ভোরের আলোয়। ঝলমল করে ওঠা সকালের কাছে সে খুঁজেছিল নিশ্চয়তার প্রতিশ্রুতি। ছিঁড়ে খেয়েছিল বাতাবিলেবুর মতো সবুজ সুগন্ধি ঘাস। তারপরে গা ভাসিয়েছিল। নদীর কনকনে ঠান্ডা জলে। ঘুমহীন, ক্লান্ত, বিহবল শরীরকে সে দিতে চেয়েছিল স্রোতের আবেশ। অন্ধকারের জরায়ু থেকে জন্ম নেওয়া ভোরের রোদের মতোই জীবনের উল্লাস খুঁজে নিতে চেয়েছিল হরিণটি। নীল আকাশের নীচে সে জেগে উঠতে চেয়েছিল সূর্যের "সোনার বর্ণার মতো।" অন্যান্য হরিণীকে চমকে দেওয়ার জন্য নিজেকে এভাবেই যেন সাজিয়ে তুলতে চেয়েছিল সেই সুন্দর বাদামি হরিণটি।

। তথাকথিত সভ্যসমাজ হরিণের এই আকাঙ্ক্ষাকে পূরণ করতে দেয়নি | প্রকৃতির কোমলতার মাঝে হঠাৎ ভেসে এসেছিল এক অদ্ভুত শব্দ। আর তারপরই নদীর জল হয়ে উঠেছিল মচকাফুলের মতো লাল। প্রাণবন্ত হরিণটি পরিণত হল নিষ্প্রাণ মাংসপিণ্ডে। ঘুমের দেশেই যেন হারিয়ে গেল সে। সিগারেটের ধোঁয়ায় আর গল্পে মশগুল নাগরিক সমাজের বিকৃত জীবন উদযাপনে হরিণের সাধ ও আহ্লাদের অবসান ঘটে। হয়তো নাগরিক জীবনের কাছে প্রকৃতির পরাজয়ের প্রতীক হয়ে। থাকে হরিণের এই মৃত্যু।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় আগুনের চিত্রকল্পটি দু-বার করা হয়েছে প্রথমবার দেশোয়ালি মানুষেরা শীতের রাতে শরীর গরম জন্য আগুন জ্বালিয়েছিল। মোরগফুলের মতো লাল আগুন হওয়ার পরেও জ্বলছিল। কিন্তু সকালের আলোয় “রোগা শালিকের বিবর্গ ইচ্ছার ম্লান হয়ে সেই আগুনেই ছিল ভোরের ইঙ্গিত, জীবনের জেগে আভাস দ্বিতীয়বার আগুনের প্রসঙ্গ ফিরে কবিতার শেষে। বাদামি হরিণ সারারাত চিতাবাঘিনির হাত নিজেকে বাঁচিয়ে নিশ্চিন্ত ভোরে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু শিকারির নদীর জলে আবেশ খোঁজা তার শরীরকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল। এরপরেই আবার আগুন জ্বলেছিল কিন্তু সেখানে জীবনের জাগরণ ছিল ছিল জীবন নাশের আয়োজন। জ্বলন্ত আগুনে লাল হরিণের মাংস হয়ে বলা

দ্বিতীয়বার আগুন জ্বলার ঘটনা শুধু একটা হরিণশিকারের কাহিনি নির্মল প্রকৃতির বুকে নাগরিক সমাজের আগ্রাসন তারও প্রতীক তার সঙ্গে সিগারেটের ধোঁয়া, টেরিকাটা মাথা—এসব মিলে নাগরিক নৃশংসতার আয়োজন হয়, প্রকৃতির আর নিজস্বতা হারিয়ে সেই

জীবনানন্দ 'শিকার' কবিতার পটভূমিতে আছে এক নির্মল 'ভোর'। সেখানে 'আকাশের রং ঘাসফড়িঙের দেহের মতো কোমল নীল। পালকের মতো সবুজ পেয়ারা নোনার গাছ। সকালের আলোয় টলমলে শিশিরে চারদিকের বন আকাশ ঝিলমিল করছে। অসামান্য ভোরেই বেঁচে থাকার খুঁজেছিল সুন্দর বাদামি হরিণ সারারাত এক বন অন্য বনে পালিয়ে চিতাবাঘিনির থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে এই আলোয় হরিণটি চেয়েছিল বেঁচে থাকার নিশ্বাস। সে ভোরের আলোয় ছিঁড়ে খেয়েছিল কচি বাতাবিলেবুর মতো সুগন্ধি ঘাস ‘নদীর  নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ভেসে আসে। পুলিশ আর নদীর ভাগ হরিণের রক্তে হয়ে ওঠে "মচকাফুলের "রিক মানুষের লালসা মেটাতে নিষ্পাপ হরিণটি 'উন্ন ' পরিণত হয়। পক্ষদের নীচে ঘাসের বিছানায় বসে অনেক পুরোনো শিশিরভেজা পর আর সিগারেটের ধোয়ায় সভ্যতার যে চিহ্ন দেখা সত্যসমাজের নৃশংসতায় চিরকালের ঘুমের দেশে বিলাপ জীবনের হারিয়ে যাওয়ার কাহিনিই ।

কবিতার শুরুতে হরিণটির বন্যজীবনের বর্ণনা দিয়েছেন কবি। সারারাত হরিণটি রাতের গভীর অন্ধকারে সুন্দরীর বন থেকে অর্জুনের বনে ঘুরে ঘুরে নিজেকে চিতাবাঘিনির হাত থেকে রক্ষা করেছিল আর অপেক্ষা করেছিল ভোর হওয়ার জন্য সূর্য উঠলে হরিণটি ভোরের আলোয় বেরিয়ে আসে। খিদে মেটাতে কচিবাতাবিলেবুর মতো সবুজ সুগন্ধি ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়। তারপরে হরিণটি গা ভাসায় নদীর শীতল জলে তার শরীরের ক্লান্তি দূর করার জন্য কিংবা নীল আকাশের নীচে জেগে উঠে 'সাহসে সাথে সৌন্দর্যে' হরিণীদের চমকে দেওয়ার জন্য। অথচ এইসব আকাঙ্ক্ষার অবসান হয়ে যায় শিকারির গুলিতে বিদ্ধ হলে হরিণের রক্তে নদীর জল আচমকা মচকাফুলের পাপড়ির মতো লাল হয়ে যায়। তৈরি হয় 'উয় লাল হরিণের মাংস" । মানুষের পাশবিক সুধার কাছে বলি হতে হয় প্রকৃতির নিরপরাধ হরিণটিকে।

জীবনানন্দ দাশ তাঁর 'শিকার' কবিতায় একটি বাদামি হরিণের হত্যার পটভূমিতে ডোরের এক বিপরীত রূপ তুলে ধরেছেন | ভোরের আকাশের রং ঘাসফড়িঙের দেহের মতো কোমল নীল। চারদিকের পেয়ারা আর নোনার গাছ টিয়ার পালকের মতো সবুজ। একটি তারা তখনও আকাশে ছিল। হিমের রাতে শরীর গরম করার জন্য দেশোয়ালিরা রাতে মাঠে যে আগুন জ্বেলেছিল, শুকনো অশ্বথপাতায় তা তখনও জ্বলছিল। ভোরের সূর্যের আলোয় আগুনের শিখাও তার আগের জ্যোতি হারিয়ে ম্লান হয়ে গিয়েছিল। সকালের আলোয় শিশিরভেজা বন ও আকাশ যেন ময়ূরের সবুজ নীল ডানার মতো ঝিলমিল। করছিল। সূর্যের প্রথম আলোয় উদ্ভাসিত প্রকৃতির ছবি জীবনানন্দ তুলে ধরেছেন তাঁর কবিতায়। কিন্তু পরে শিকারির বন্দুকের গুলিতে সুন্দর বাদামি হরিণের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে নৃশংস দৃশ্য তৈরি হয়, তার পটভূমিতে প্রকৃতির এই নিমল ছবি যেন সেই নৃশংসতাকে আরও নির্মম করে তোলে। এই ঘটনা প্রকৃতির বুকে মানুষের হৃদয়হীনতার স্বরূপকেই প্রকাশ করে। প্রাশবন্ত হরিণের 'উর লাল' মাংসে রূপান্তর, নাগরিক সভ্যতার হাতে প্রকৃতির ইয়ংসের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।

মহাপৃথিবী কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া 'শিকার' কবিতায় অরণ্যের বুকে মানুষের হরিণণিকার বা অমানবিক আত্মপ্রকাশকে বোঝাতে গিয়ে জীবনানন্দ অসাধারণ রচনাশৈলীর আশ্রয় নিয়েছেন। প্রথমেই লক্ষ করার মতো বিষয় হল চিত্রকল্পের অসামান্য প্রয়োগ। “আকাশের রং ঘাসফড়িঙের দেহের মতো কোমল নীল” কিংবা “চারি দিকে পেয়ারা ও নোনার গাছ টিয়ার পালকের মতো সবুজ" এ যেন কথা দিয়ে ক্যানভাসে ছবি এঁকেছেন জীবনানন্দ। কখনও চিত্রকল্পেরই বিপরীত ভাবের মিশ্রণ ঘটিয়ে কবিতায় সৌন্দর্য সৃষ্টি করা হয়। ভোরবেলা আকাশে থাকা তারার সঙ্গে কবি মিলিয়ে দেন পাড়াগাঁর বাসরঘরে থাকা 'গোধুলিমদির মেয়েটি - কে কিংবা মিশরের মানুষী-কে যে তার বুকের থেকে মুক্তা নিয়ে রেখেছিল কবির নীল মদের গেলাসে। একদিকে নির্জনতা এবং অন্যদিকে বৈভবের মধ্যে ভোরের একটি মাত্র তারাই যেন ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে। চিত্রকল্পের পাশাপাশি শব্দ সৃষ্টির দ্বারা ব্যঞ্জনা তৈরিতেও জীবনানন্দ অসাধারণ। একটা অদ্ভুত শব্দ’—এখানে শব্দটি যে গুলির তার সরাসরি কোনো উল্লেখ নেই এবং সেই শব্দ 'অদ্ভুত' কারণ নির্মল অরণ্যে তা বেমানান। তারপরেই কবি হরিণের মৃত্যুকে স্পষ্ট করেছেন সংকেতময় ভাষা প্রয়োগে—"নদীর জল মচকাফুলের পাপড়ির মতো লাল।" এইভাবে চিত্রকল্প, শব্দ এবং অন্তর্নিহিত তাৎপর্য সৃষ্টির দক্ষতায় 'শিকার' কবিতাটি কবির অসাধারণ রচনাভঙ্গির পরিচায়ক হয়ে উঠেছে।

জীবনানন্দ দাশ তাঁর মহাপৃথিবী কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া 'শিকার' কবিতায় রাত্রিশেষে 'ভোর' হওয়ার ঘটনাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে ব্যবহার করেছেন। কবিতার প্রথম অংশে 'ভোর' যেন নির্মল প্রকৃতির আত্মপ্রকাশের উপযুক্ত পটভূমি। তখন আকাশের রং “ঘাসফড়িঙের দেহের মতো কোমল নীল", চারদিকের পেয়ারা ও নোনার গাছের রং "টিয়ার পালকের মতো সবুজ"। সেই ভোরেই আকাশে জেগে থাকা একমাত্র তারাটি কবির মনে বিপরীত অনুভবের ভালো লাগা তৈরি করে। এই ভোরেই অল্পপ্রাণ শালিকের হৃদয়ের বিবর্ণ ইচ্ছার মতো স্নান হয়ে যায় হিমের রাতে দেশোয়ালিদের জ্বালানো আগুনের শিখা। সকালের আলোয় টলমল শিশিরে ঝিলমিল করে ওঠে চারপাশের বন ও আকাশ।

এই ভোরের পটভূমিতেই আগমন ঘটে একটি সুন্দর বাদামি' হরিণের। তার কচি বাতাবিলেবুর মতো সবুজ, সুগন্ধি ঘাস ছিঁড়ে খাওয়া বা নদীর জলে ঘুমহীন, ক্লান্ত শরীর ভেজানোর মধ্য দিয়ে জীবনের স্বচ্ছন্দ বিচরণকেই প্রত্যক্ষ করা যায়। কিন্তু সুন্দরের এই সহজ প্রকাশকে ছিন্নভিন্ন করে দেয় 'একটা অদ্ভুত শব্দ'। নদীর জল এরপর মচকাফুলের মতো লাল হয়ে ওঠে হরিণের রক্তে। শিকারি মানুষের লোভের শিকার হয়ে হরিণটিকে চলে যেতে হয় 'নিষ্পন্দ নিরপরাধ ঘুম'-এর দেশে। তৈরি হয় 'ভোর'-এর আর-এক ছবি। এই ভোরকে প্রকৃতি লালন করেনি; কিংবা সারারাত চিতাবাঘিনির হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে হরিণও এই ভোরের জন্য অপেক্ষা করেনি। মানুষের ক্ষুধার ও হিংস্রতার সাক্ষী হয়ে থাকে এই ভোর।

'শিকার' কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ মানবসভ্যতার স্বার্থপরতা, কুটিলতা এবং নৃশংসতাকে তুলে ধরেছেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ছারা বাংলা শিক্ষক পৃথিবীতে মানুষের নির্মম করে। কবিতার এই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটেছে। প্রকৃতিপ্রীতিকে কোনো অবস্থাতেই বিসর্জন দেননি তিনি, বরং বক্তব্য বিষয়কে তুলে ধরার জন্য প্রকৃতির নানা উপাদানের মধ্যেই তিনি উপনা প্রয়োগ করেছেন। যেমন বাতাবিলেবুর মতো সবুজ সুগন্ধি ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। জীবনানন্দ দাশের অন্যতম কারাবৈশিষ্ট্য হল ত্রিরূপময়তা। অপূর্ব করেছেন 'শিকার' কবিতায়। তিনি এই কবিতায় নিরাশাবাদী নন, কবিতার সূচনাতেই 'ভোরা শব্দটি দু-বার প্রয়োগ করে কবি আশাজনক। জীবনের কথা বলেছেন। আলোচ্য কবিতার তাঁর উপস্থাপনাটি নাটকীয়। ভোরের দৃশ্যন্তি ঘটনাবিরল, উপমার পর উপমা সাজিয়ে ডোরের চিত্রটিকে স্পষ্ট করে তুলেছেন কবি। আকাশের রং মাসফড়িঙের দেহের মতো কোম নীল, পেয়ারা ও নোনার গাছ টিয়াপাখির পালকের মতো সবুজ। কবির প্রবল। উৎকণ্ঠা এবং আবেগের সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে কবিতার বাস্তব পটভূমি, যেখানে প্রকৃতি স্বাভাবিক ও সুন্দর কিন্তু মানুষ হৃদয়হীন ও যান্ত্রিক।

জীবনানন্দ দাশ মহাপৃথিবী কাব্যগ্রন্থের 'শিকার' কবিতায় তথাকথিত সভ্যসমাজের ছবি তুলে ধরেছেন। মুখে সিগারেটের ধোঁয়া, টেরিকাটা মাথা, হাতে বন্দুক নিয়ে মানুষেরা তাদের নির্মমতার প্রকাশ ঘটায়। সারারাত চিতাবাঘিনির হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে একটি বাদামি হরিণ ভোরবেলা বেঁচে থাকার তাগিদে কচি বাতাবিলেবুর মতো সবুজ সুগন্ধি ঘাস ছিঁড়ে যায়।। আর যখন ক্লান্ত শরীরটাকে সে নদীর জলে এলিয়ে দেয়, ঠিক তখনই একটা অদ্ভুত শব্দ হয়। নির্মল প্রকৃতির বুকে বন্দুকের গুলির এই শব্দ যেন বাদামি হরিণের মৃত্যুর শব্দ | হরিণের ট্র্যাজিক পরিণতি ঘটল, মানুষের হাতে। ধোঁয়া সেবনকারী, টেরিকাটা মানুষের দল তাদের রসনাতৃপ্তির জন্য বন্দুকের গুলিতে সৌন্দর্যের প্রতীক হরিণকে বিশ্ব করে। জীবনসংগ্রামে হরিণটিও বাঁচতে চেয়েছিল। ভোর হলে যখন সে ভাবে চিতাবাঘিনির ভয় আর নেই, ঠিক তখনই তথাকথিত সভ্য মানুষের হাতে ঘটল তার জীবনের করুণ পরিণতি। অন্ধ মানবসভ্যতার বিকৃত ইচ্ছার বলি হতে হল তাকে। যাদের উচিত ছিল হরিণটিকে রক্ষা করা তারাই তার মৃত্যুর কারণ হল। 'শিকার' কবিতাটিতে মানুষের চেতনায় আঘাত করতে চেয়েছেন কবি। আলোচ্য কবিতায় জীবনানন্দ দাশ মানুষের চেতনাহীনতার এই নির্মম সত্যকেই তুলে ধরেছেন।

জীবনানন্দ 'শিকার' কবিতার পটভূমিতে আছে এক নির্মল 'ভোর'। সেখানে 'আকাশের রং ঘাসফড়িঙের দেহের মতো কোমল নীল। পালকের মতো সবুজ পেয়ারা নোনার গাছ। সকালের আলোয় টলমলে শিশিরে চারদিকের বন আকাশ ঝিলমিল করছে। অসামান্য ভোরেই বেঁচে থাকার খুঁজেছিল সুন্দর বাদামি হরিণ সারারাত এক বন অন্য বনে পালিয়ে চিতাবাঘিনির থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে এই আলোয় হরিণটি চেয়েছিল বেঁচে থাকার নিশ্বাস। সে ভোরের আলোয় ছিঁড়ে খেয়েছিল কচি বাতাবিলেবুর মতো সুগন্ধি ঘাস ‘নদীর  নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ভেসে আসে। পুলিশ আর নদীর ভাগ হরিণের রক্তে হয়ে ওঠে "মচকাফুলের "রিক মানুষের লালসা মেটাতে নিষ্পাপ হরিণটি 'উন্ন ' পরিণত হয়। পক্ষদের নীচে ঘাসের বিছানায় বসে অনেক পুরোনো শিশিরভেজা পর আর সিগারেটের ধোয়ায় সভ্যতার যে চিহ্ন দেখা সত্যসমাজের নৃশংসতায় চিরকালের ঘুমের দেশে বিলাপ জীবনের হারিয়ে যাওয়ার কাহিনিই ।

কবিতার শুরুতে হরিণটির বন্যজীবনের বর্ণনা দিয়েছেন কবি। সারারাত হরিণটি রাতের গভীর অন্ধকারে সুন্দরীর বন থেকে অর্জুনের বনে ঘুরে ঘুরে নিজেকে চিতাবাঘিনির হাত থেকে রক্ষা করেছিল আর অপেক্ষা করেছিল ভোর হওয়ার জন্য সূর্য উঠলে হরিণটি ভোরের আলোয় বেরিয়ে আসে। খিদে মেটাতে কচিবাতাবিলেবুর মতো সবুজ সুগন্ধি ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়। তারপরে হরিণটি গা ভাসায় নদীর শীতল জলে তার শরীরের ক্লান্তি দূর করার জন্য কিংবা নীল আকাশের নীচে জেগে উঠে 'সাহসে সাথে সৌন্দর্যে' হরিণীদের চমকে দেওয়ার জন্য। অথচ এইসব আকাঙ্ক্ষার অবসান হয়ে যায় শিকারির গুলিতে বিদ্ধ হলে হরিণের রক্তে নদীর জল আচমকা মচকাফুলের পাপড়ির মতো লাল হয়ে যায়। তৈরি হয় 'উয় লাল হরিণের মাংস" । মানুষের পাশবিক সুধার কাছে বলি হতে হয় প্রকৃতির নিরপরাধ হরিণটিকে।

জীবনানন্দ দাশের 'শিকার' কবিতায় 'ডোর'-এর পটভূমিতে যখন চারপাশ উদ্ভাসিত, সকালের আলোয় শিশিরভেজা চারদিকের বন ও আকাশ যখন ‘ময়ূরের সবুজ নীল ডানার মতো ঝিলমিল করছে'— সেই সময় একটি সুন্দর বাদামি হরিণকে ভোরের আলোয় নেমে আসতে দেখা যায়। সমস্ত রাত চিতাবাঘিনির হাত থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য হরিপটি 'নক্ষত্রহীন, মেহগনির মতো অন্ধকারে সুন্দরীর বন থেকে অর্জুনের বনে ঘুরে বেড়িয়েছিল। তার

ভোরের জন্য অপেক্ষার কারণ ছিল যুক্তির পরিসর খুঁজে পাওয়া।

* হরিণটির পরিণতি ছিল মর্মান্তিক। প্রথমে বন্দুকের গুলির শব্দ শোনা যায়। তারপরই নদীর জল যেন মচকাফুলের পাপড়ির মতো লাল হয়ে ওঠে। যে হরিণটি ভোরের আলোয় নদীতে নেমেছিল নিজের ঘুমহীন ক্লান্ত শরীরকে স্রোতের মতো একটা আবেশ দেওয়ার জন্য, তাকেই দেখা যায় গুলিবিদ্ধ হয়ে "উন্ন লাল মাংসপিণ্ডে রূপান্তরিত হতে।

এই পরিণতি এক গভীর সমাজবাস্তবতাকে নির্দেশ করে। প্রকৃতির বুকে নাগরিক সভ্যতার আগ্রাসনের নিদর্শন হয়ে থাকে হরিণের এই মৃত্যু। 'নক্ষত্রের নীচে ঘাসের বিছানায় সিগারেটের ধোঁয়া আর 'টেরিকাটা কয়েকটা মানুষের মাথা নিশ্চিত করে দেয় নগরসভ্যতার বিকৃত লালসা মেটাতেই প্রাণ দিতে হয়েছে হরিণটিকে। হরিণটি আসলে সমগ্র প্রকৃতির প্রতীক, আসলে প্রকৃতিকেই এভাবে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে উদ্ধৃত মানবসভ্যতার কাছে।