Chapter-5 ➤ পরিবেশ ও উৎপাদন

উঃ-জমি চষা বা মাটি কর্ষণের আধুনিক যন্ত্র পাওয়ার টিলার। এর সাহায্যে ছোটো-বড়ো যে-কোনো জমি তাড়াতাড়ি চষে আলগা ও ঝুরঝুরে করে ফেলা যায়। ওই কাজে সবথেকে পুরোনো যন্ত্র হল লাঙল।

উঃ-হারভেস্টার একটি অত্যাধুনিক যন্ত্র। এই যন্ত্রের সাহায্যে একইসঙ্গে ধান কাটা, মাড়াই, ধান ঝাড়া ও ঝাড়া ধানকে একজায়গায় জড়ো করে সহজেই রাখা যায়। ফসল তোলার ক্ষেত্রে খুব কম সময়ে ও কম পরিশ্রমে হারভেস্টার এই কাজগুলি করে।

উঃ-গোরু দিয়ে লাঙল টানতে গিয়েই তারা এ কথা বুঝতে পারল। হাল টানার পরে গোরুরা কোথাও গিয়ে বিশ্রাম নিত এবং সেইসব জায়গায় গোবর পড়ত। পরে সেখানে চাষ করতে গিয়ে দেখা গেল সে স্থানে ফলন ভালোই হয়েছে। এইভাবে মানুষ বুঝতে শিখল জমিতে গোবর দিলে ফলন বাড়ে।

উঃ-মেয়েরা ঘরের কাজ সামলাতে সামলাতে একদিন দেখল বীজ পড়া জায়গা থেকে কচি কচি গাছ বেরোচ্ছে। তারা তখন ভাবল গাছ লাগিয়ে যত্ন করে বড়ো করা দরকার। তাহলে খাওয়ার শস্য পাওয়া যাবে। এভাবে মেয়েদের বুদ্ধিতে চাষ শুরু হল ।

উঃ-যেসব জৈব ও অজৈব পদার্থ মাটিতে থেকে অথবা বাইরে থেকে আলাদা করে প্রয়োগ করে উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি মিটিয়ে উদ্ভিদের বৃদ্ধি ঘটায় এবং ফসলের উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে, তাকে সার বলে।

উঃ-সার সাধারণত তিন প্রকার, যথা— i. জৈবসার, ii. অজৈব সার বা রাসায়নিক সার এবং iii. অণুজীব সার।

উঃ-কৃত্রিম উপায়ে কলকারখানাতে যেসব সার প্রস্তুত হয় এবং যা শস্যের ফলন ব্যাপক হারে বাড়ানোর জন্য প্রয়োগ করা হয়, তাকে রাসায়নিক সার বলে।

উদাহরণ: ইউরিয়া, সুপার ফসফেট, পটাশ ইত্যাদি।

উঃ-উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ, বর্জ্যপদার্থ, আণুবীক্ষণিক জীব ইত্যাদি পচে যে-সারে পরিণত হয়, তাকে জৈবসার বলে।

উদাহরণ: সবুজ সার, খামারের সার, গোবর সার ইত্যাদি।

উঃ- i. শস্যের ফলন ব্যাপক হারে বাড়ানো যায়। ii. জমিতে পরিপোষকের পরিমাণ বাড়ে।

উঃ-মৌমাছি মৌচাক বানায়, যা থেকে আমরা মধু, মোম ইত্যাদি পাই, আবার রেশমপোকা রেশমগুটি তৈরি করে, যা থেকে আমরা রেশম পাই, তাই মৌমাছি ও রেশমপোকাকে অর্থকরী পোকা বলে।

উঃ-স্বাধীনতার পর ভারতবর্ষে ছয়-এর দশকে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে কৃষিক্ষেত্রে ফসল উৎপাদনের ব্যাপক উন্নতি ঘটেছিল, ফলে জমিতে সার-কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ল। কিছু অব্যবহৃত জমিতেও চাষের কাজ শুরু হল। ফলে প্রচুর পরিমাণে ফসল উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে আমরা খাদ্যের ব্যাপারে স্বাবলম্বী হলাম। এই ঘটনাকে ভারতের সবুজ বিপ্লব বলে ।

উঃ-জৈবসার ব্যবহারের সুবিধা :

i. জৈবসার মাটির জলধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

ii. জৈবসার মাটি সচ্ছিদ্র রাখে, ফলে মাটির মধ্যে গ্যাসীয় আদানপ্রদান ভালো হয়।

iii. জৈবসার জমিতে প্রয়োগ করলে মাটিতে থাকা উপকারী জীবাণু, কেঁচো ও অন্যান্য বন্ধুপোকাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

iv. মাটির বিভিন্ন খনিজ উপাদানের পরিমাণ স্বাভাবিক রাখে।

উঃ-জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে নেই, তার কারণ :

i. এই সার প্রয়োগে মাটিতে জৈব উপাদানগুলির মাত্রা কমে যায় এবং মাটিতে ছিদ্রের সংখ্যা কমে যায়, ফলে মাটিতে বায়ু চলাচল ব্যাহত হয়।

ii. ফসল খেতে প্রয়োগ করা অতিরিক্ত এই সার বৃষ্টির জলে ধুয়ে জলাশয়ে আসে এবং জল দূষিত করে। এই সার মেশানো জল গাছপালা ব্যবহার করে বেড়ে ওঠে। এই গাছপালাগুলি মরে গেলে জলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। অক্সিজেনের অভাবে জলের প্রাণীদের মৃত্যু ঘটে।

iii. অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটির অম্লত্ব বৃদ্ধি পায়, ফলে মাটিতে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য উপকারী জীবাণুদের মৃত্যু ঘটে। এর ফলে মাটি অনুর্বর হয়ে পড়ে।

iv. রাসায়নিক সার মাটির নীচের জলে মেশে, যা পানীয় জলের মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে জটিল রোগ ঘটায়।

V. এ ছাড়া অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ বাড়ে, তাই ফসলের স্বাভাবিক স্বাদ নষ্ট হয়।

উঃ-চা চাষের জন্য পাহাড়ি ঢালু জমি ভালো। চা চাষের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত দরকার হয়, কিন্তু জমিতে জল জমে থাকা চলে না। মাটি একটু আম্লিক হলে ভালো হয়। এ ছাড়া সারাবছর ঠান্ডা আবহাওয়া থাকা দরকার। পর্বতের পাদদেশের বিস্তীর্ণ ঢালু জমি যেখানে জল দাঁড়ায় না এবং আবহাওয়া ঠান্ডা কিংবা নাতিশীতোষ্ণ এরকম অঞ্চলে (তরাই) প্রচুর চা চাষ হয়।

উঃ-দার্জিলিং-এর পাহাড়ি অঞ্চলে ধাপ চাষের মাধ্যমে গম, ভুট্টা, আলু, আদা, সয়াবিন চাষ হয়, এ ছাড়া পেঁপের মতো একরকম সবজি স্কোয়াশ চাষ হয়। চা এখানকার প্রধান ফসল। এ ছাড়া কমলালেবু চাষ হয়। আমাদের সমতলে যে-সময় গরমকাল তখন ওখানে শীতের সবজি, যেমন—ফুলকপি, বাঁধাকপি, পালং, মুলো সবই চাষ হয়।

উঃ-তরাই পর্বতের পাদদেশের ঠান্ডা আবহাওয়ায় চা -এর চাষ হয়। আর পলিজমা উর্বর সমভূমি অঞ্চলে ধান, পাট, গম, বাদাম ও নানারকম সবজির চাষ হয়। এ ছাড়া ফলের মধ্যে প্রচুর আনারস ও কলা চাষ হয়।

উঃ-গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চল বা ভাগীরথীর দু-পাশ-এর রাঢ় অঞ্চল উর্বর পলিযুক্ত দোআঁশ মাটি দিয়ে গঠিত হওয়ায় এবং এসব অঞ্চলে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হওয়ায় শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সবসময়ই কৃষিকাজ হয়। গ্রীষ্মকালে প্রচুর ধান, পাট, তিল প্রভৃতি চাষ হয়। দামোদরের দু-পাশে শীতকালে আলু ও সাথী ফসল হিসেবে সরষের চাষ হয়। এ ছাড়া শীতের সবজি কপি, মুলো, পালং চাষও হয়। সারাবছরই বেগুন, লংকা, শশা চাষ হয়। এসব অঞ্চলে সব ঋতুতেই উচ্চফলনশীল ধান চাষ করা হয়।

উঃ-ডিভিসি গঠনের মাধ্যমে পাহাড় থেকে নেমে আসা বর্ষার জল দামোদর নদী দিয়ে গড়িয়ে সমতলে আসে। এই বর্ষার জল জমিয়ে রাখার জন্য আমাদের রাজ্যের সীমান্তের কাছে অনেকগুলি জলাধার নির্মাণ করা হয়েছে। ওইসব জলাধারে জল আটকে রেখে বন্যা বন্ধ করা হয়েছে। পরে সেই জল অল্প অল্প করে ছাড়া হবে ও তাতে সারাবছর চাষ করার জল পাওয়া যাবে এ কথা ভাবা হয়েছিল।

উঃ-আমাদের লোকালয়ে বা গ্রামে খেতি ফসল ও জমির সমস্ত ফসলের উৎপাদনকে ঋতু অনুযায়ী (শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা তিনটি প্রধান ঋতু) ব্যাপকভাবে ও সংক্ষেপে বোঝানোর জন্য ফসল মানচিত্র তৈরি করা হয়।

উঃ- i.শহরের কাছাকাছি অঞ্চলে ফুলের চাষ বেশি হয়, কারণ শহরে ফুলের চাহিদা বেশি, এবং সেই তুলনায় বাজারদরও বেশি হয়।

ii. ফুল খুব তাড়াতাড়ি শুকিয়ে ও পচে নষ্ট হয়ে যায়। শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় সহজেই তা বাজারে আনা সম্ভব হয়।

iii. এ ছাড়া শহরেই ফুলের বাজার হওয়ায় শহরের কাছাকাছি অঞ্চলে ফুলের চাষ হয়।

উঃ-পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গের পশ্চিম দিকে পাহাড়ি কাঁকুরে লালমাটিতে কম বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে মূলত ডালশস্য, যেমন— মটর, অড়হর, মসুর, বিউলি, বরবটি, ভুট্টা, বাদাম প্রভৃতি চাষ হয়। এই অঞ্চলে বিভিন্ন শাকসবজি ছাড়াও আতা, মুসম্বি লেবু, আম, বেল প্রভৃতি ফল চাষ হয়। এই অঞ্চলে আগে ধান চাষ কম হলেও বর্তমানে মানুষ মাটি কেটে ঢালের দিকে ফেলে ছোটো ছোটো চাষের জমি তৈরি করে সেই জমিতে আল দিয়ে বর্ষার জল ধরে রেখে উচ্চফলনশীল ধান এবং শীতকালে কপি ও আলু চাষ করছে।

উঃ-কাঁকুরে লালমাটি অঞ্চলে মানুষ উঁচু জায়গার মাটি কেটে ঢালের দিকে দিচ্ছে। এর ফলে ছোটো ছোটো চাষের জমি তৈরি হচ্ছে। জমির চারপাশে আল দিয়ে বর্ষার জল আটকে রেখে উচ্চ ফলনশীল ধান চাষ হচ্ছে, তাই ইদানীং কাঁকুরে লালমাটি অঞ্চলে ধান চাষ কিছুটা বেড়েছে।

উঃ-দক্ষিণের লবণাক্ত জমি সবরকম চাষের পক্ষে উপযুক্ত না হওয়ায় এখানকার মানুষ জমিতে জল ধরে রেখে মাছ চাষ করেন। দক্ষিণ 24 পরগনা ও পূর্ব মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এভাবে ভেড়িতে জল আটকে পারশে, ট্যাংরা, ভেটকি, পাবদা, তোপসে প্রভৃতি মাছ চাষ হয়; নানারকম চিংড়ির চাষ হয়। এ ছাড়া পোনা জাতীয় মাছ রুই, কাতলা, মৃগেল, সরপুঁটিরও চাষ হয়। উপকূলের কাছাকাছি থাকা মানুষজন সমুদ্রেও মাছ ধরতে যান।

উঃ-বর্ষাকালে মাছ পুকুর থেকে মাঠে চলে আসে। বর্ষাকালে খুব বৃষ্টি হলে মাঠ থেকে পুকুরে জল ঢোকে। স্রোতের উলটো দিকে সাঁতার কেটে মাছ পুকুর থেকে মাঠে চলে যায়। এভাবে ধানখেত মাছে ভরে যেত।

উঃ-সরপুঁটি, ন্যাদোশ, খরশুলা প্রভৃতি মাছ বর্ষাকালে ডোবা পুকুরে বা জলাজমিতে বা ধানখেতে ডিম পাড়ত ও বংশবৃদ্ধি করত। বর্তমানে জমিতে ব্যাপকভাবে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহার করার ফলে এদের প্রজননক্ষেত্র দূষিত হচ্ছে। ডিম ও মাছের বাচ্ছা মারা যাচ্ছে। এ ছাড়া জলাভূমি, ডোবা, পুকুর বুজিয়ে ঘরবাড়ি, রাস্তঘাট তৈরি করার ফলে এদের বাসস্থান ধ্বংস হচ্ছে। সেজন্য এসব মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এবং প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে বসেছে।

উঃ-যে-সকল মাছের সংখ্যা বর্তমানে খুবই কমে গেছে এবং তাদের সংরক্ষণ না করলে অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবী থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, তাদের লুপ্তপ্রায় মাছ বলে। উদাহরণ : ন্যাদোশ, খরশুলা, বেলে, তেচোখা, সরপুঁটি, বোরেলি ইত্যাদি মাছ ।

উঃ- i.লুপ্তপ্রায় মাছগুলির নামের তালিকা ছবিসহ প্রকাশ করে স্থানীয় পঞ্চায়েত বা ব্লকের মাধ্যমে এসব মাছ ধরা, বাজারে কেনাবেচা করা সম্বন্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে।

ii. লুপ্তপ্রায় মাছ স্থানীয় পুকুরে সংরক্ষণ করে চাষ করতে হবে।

iii. চাষি জাল ফেলে পোনামাছের সঙ্গে লুপ্তপ্রায় মাছ পেলে তার অর্ধেক সে জলে ছেড়ে দেবে—এরকম নিয়ম বলবৎ হলে লুপ্তপ্রায় মাছেদের বাঁচানো যাবে।

উঃ- i. জলজ পরিবেশের বাস্তুতন্ত্র ও খাদ্যশৃঙ্খলের ব্যাঘাত ঘটবে।

ii. ন্যাদোশ, বোরেলি, বেলে, মৌরলা, সরপুঁটি ইত্যাদি লুপ্তপ্রায় মাছগুলি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ছোটো ছেলেমেয়েরা আর দেখতে ও খেতে পারবে না।

iii. পরিবেশের জীববৈচিত্র্য হ্রাস পাবে।

উঃ-মাছ ধরার নানান পদ্ধতি:

i. মাছ ধরার জন্য আমাদের দেশে, ছোটো বড়ো ফাঁদিযুক্ত নানারকম জাল ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ফাঁদির জাল ব্যবহার করে বড়ো জলাশয়, ভেড়ি, খাঁড়ি, সমুদ্র থেকে একসঙ্গে অনেক মাছ ধরা হয়।

ii. ঘুনি দিয়ে স্রোতযুক্ত জলাশয়, নালা, নর্দমার স্রোতযুক্ত জলের উৎসমুখ থেকে মাছ ধরা হয়, এর সাহায্যে সাধারণত ছোটো মাছ ধরা হয়।

iii. ছিপ দিয়ে এক-একবারে একটি বা দুটি মাছ ধরা হয়।

iv. পোলো বা ফলুই দিয়ে অগভীর কাদাজলে মাছ ধরা হয়।

v. সূত, শটকা, লড়কা প্রভৃতি জিনিস (বাঁশের বা কঞি আটকানো সুতো যার আগায় কাঁটা লাগানো থাকে) দিয়েও মাছ ধরা হয়।