Chapter -6⇒নগর, বণিক ও বাণিজ্য

উত্তর:

মধ্যযুগে ভারতে দিল্লির শাসক ছিলেন সুলতান ও মুঘল বাদশাহগণ। মধ্যযুগে দিল্লির অনেক শাসক তাঁর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা অনেক শহর গড়ে

কুতুবউদ্দিন আইবক: দিল্লির সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবক দিল্লি শহর তৈরি করেছিলেন। তাঁর আমলে দিল্লি শহর তৈরি হয়েছিল চৌহান রাজপুত শাসকদের দুর্গ কিলা রাই পিথোরাকে কেন্দ্র করে। একে সুলতানি আমলের প্রথম দিল্লি বা ‘কুতুব দিল্লি' বলা হত।

গিয়াসউদ্দিন বলবন (তুঘলকাবাদ) : সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন যমুনা নদীর তীরে গিয়াসপুর নামে একটি নতুন শহরতলি তৈরি করেছিলেন।

কায়কোবাদ (কিলোঘড়ি) : সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের নাতি (পৌত্র) কায়কোবাদ যমুনা নদীর তীরে কিলোঘড়ি প্রাসাদ তৈরি করেন। পরবর্তীকালে এখানে শহর তৈরি হয়।

আলাউদ্দিন খলজি (সিরি-১৩০৩ খ্রিস্টাব্দ) : সুলতান আলাউদ্দিন খলজি কায়কোবাদের তৈরি কিলোঘড়ি প্রাসাদকে কেন্দ্র করে নতুন শহর (শহর-ই নও) তৈরি করেছিলেন।

তিনি সাম্রাজ্যের সুরক্ষার জন্য সিরিতে শক্তপোক্ত কেন্দ্রা বানিয়ে একে কেল্লা শহর হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।

 গিয়াসউদ্দিন তুঘলক (তুঘলকাবাদ-১৩২১ খ্রিস্টাব্দ) : সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক ‘তুঘলকাবাদ' নামে একটি নতুন শহর তৈরি করে সেখানে বসবাস শুরু করেছিলেন।

 মহম্মদ বিন তুঘলক (জাহানপনাহ-১৩২৫ খ্রিস্টাব্দ) : সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলক জাহানপনাহ নামে একটি নতুন শহর তৈরি করেছিলেন। তিনি কুতুব দিল্লি, সিরি ও জাহানপনাহ শহরকে প্রাচীর দিয়ে ঘিরে একটি বড়ো শহর গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু তিনি তা শেষ করতে পারেননি।

ফিরোজ শাহ তুঘলক (ফিরোজাবাদ-১৩৫৪ খ্রিস্টাব্দ) : সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক ফিরোজ শাহ কোটলা (দুর্গ)-কে কেন্দ্ৰ করে ফিরোজাবাদ শহর তৈরি করেছিলেন।

উত্তর:

দিল্লিতে সুলতানি শাসনের সূচনা হয় সুলতান কুতুবউদ্দিন জাইংকের সময় (১২০৬ খ্রিস্টাব্দ) থেকে। এই সময় থেকে রাজধানী হিসেবে ও ধর্মীয় কারণে দিল্লির গুরুত্ব বেড়েছিল। দিল্লি শহরের একটি প্রধান সমস্যা ছিল জলের অভাব। দিল্লির সুলতানরা দিল্লিবাসীর সুবিধার জন্য বিভিন্নভাবে জল সংরক্ষণ ও জল সরবরাহের ব্যবস্থা করেছিল।

 জল সংকটের কারণ : দিল্লির জল সংকটের কারণ হল-

  1. আরাবল্লির পাথুরে এলাকায় দিল্লির অবস্থান।
  2. দিল্লির জনসংখ্যা বৃদ্ধি।
  3. যমুনা নদীর ঘন ঘন খাত পরিবর্তন করা প্রভৃতি।

জল সংরক্ষণ ও সরবরাহে সুলতানদের গৃহীত ব্যবস্থা :

সুলতান ইলতুৎমিশের উদ্যোগ : সুলতান ইলতুৎমিশ দিল্লিবাসীর প্রয়োজনীয় জলের চাহিদা মেটানোর জন্য একটি জলাধার- হৌজ-ই শামসি’ বা ‘হৌজ-ই  সুলতানি' খনন করেছিলেন। ইবন বতুতার বর্ণনায় আটকোণবিশিষ্ট এই জলাধারটির বর্ণনা আছে।

সুলতান আলাউদ্দিন খলজির উদ্যোগ : সুলতান আলাউদ্দিন খলজি একটি চারকোণা বড়ো অলাধার খনন করে জল সংরক্ষণ ও সরবরাহে ব্যবস্থা করেছিলেন। এটি ‘হৌজ-ই আলাই' নামে পরিচিত ছিল। পরে এর নাম হয়েছিল 'হৌজ-ই খাস'।

সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের উদ্যোগ : গিয়াসউদ্দিন তুঘলক তুঘলকাবাদে উঁচু বাঁধ দিয়ে জল ধরে রেখে একটি জলাধার তৈি করেছিলেন।

 সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের উদ্যোগ : সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক খাল কেটে শহরে জল সরবরাহের ব্যবস্থা করেছিলেন। তি পুরোনো কিছু নালার সংস্কার করে শহরে জল সরবরাহ স্বাভাবিক করেছিলেন।

উত্তর:

শাহজাহানাবাদে মিশ্র প্রকৃতির নাগরিক বসতি গড়ে উঠেছিল। এখানে নানা ধরনের বাড়িতে নানা শ্রেণির মানুষ বসবাস করত।

বিভিন্ন ধরনের বাড়িঘর :

 বাগানবাড়ি : শাহজাহানাবাদের বাগানবাড়িগুলিতে রাজপুত্র ও উচ্চপদস্থ আমিররা বসবাস করতেন।

পাথর ও টালির বাড়ি : এখানের পাথর ও টালি দিয়ে তৈরি বাড়িগুলিতে ধনী বণিকরা বসবাস করতেন।

 দোকান ও পিছন দিকের ঘর : শহরের সাধারণ ব্যবসায়ীরা দোকানের উপরে বা তার পিছন দিকের ঘরগুলিতে থাকতেন।

 কুঁড়েঘর : শহরের বড়ো বড়ো বাড়ির পাশে মাটি ও খড় দিয়ে তৈরি অনেকগুলি ছোটো ছোটো কুঁড়েঘর ছিল। এই কুঁড়েঘরগুলিতে

সনিক, কারিগর, দাসদাসী প্রভৃতি নানান শ্রেণির লোক বসবাস করত। কুঁড়েঘরগুলি মাটি ও খড় দিয়ে তৈরি হত।

 আকৃতি ও প্রকৃতি অনুসারে বাড়ির বিভিন্ন নাম:

 হাভেলি : শহরের সবচেয়ে বড়ো ও সুন্দর বাড়িগুলিকে হাভেলি বলা হত।

মকান বা কোঠি: হাভেলি থেকে ছোটো ও নীচুস্তরের বাড়িগুলিকে মকান বা কোঠি বলা হত।

 কোঠরি : শহরের সবচেয়ে ছোটো ছোটো ঘরগুলিকে কোঠরি বলা হত। শাহজাহানাবাদে উচ্চপদস্থ আমির ও গরিব মানুষ পাশাপাশি বসবাস করত।

উত্তর:

মুঘল সম্রাট শাহ জাহান যমুনা নদীর পশ্চিমে শাহজাহানাবাদ শহরটি গড়ে তোলেন (১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে)। এখানে বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করত।

নাগরিকদের বসতি : শাহজাহানাবাদের নাগরিকদের বসতি ছিল মিশ্র প্রকৃতির। এখানে বিভিন্ন ধরনের বাড়িতে নানা শ্রেণির লোক বসবাস করত। শহরের ধনী ব্যক্তিরা টালি দেওয়া ইট-পাথরের বাড়িতে বসবাস করত। ধনসম্পদের তারতম্য অনুসারে বাড়িরও তারতম্য হত। তবে বড়ো বড়ো বাড়ির পাশে মাটি ও খড়ের ছোটো ছোটো কুঁড়েঘরও থাকত। বসতি এলাকার কোনো বিভাজন থাকত না।

নাগরিক সম্প্রীতি : শাহজাহানাবাদের বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের নাগরিকগণ বিভিন্ন ধর্মের উৎসব সমবেতভাবে পালন করত। দিল্লির বিখ্যাত সুফি সাধক শেখ নাসিরউদ্দিনের (চিরাগ-ই দিল্লি বা দিল্লির প্রদীপ) দরগায় আলোর উৎসব হিন্দু-মুসলমানরা একসঙ্গে পালন করত। মহরমে শিয়া ও সুন্নি গোষ্ঠীর লোকেরা যৌথভাবে অংশগ্রহণ করত।

উত্তর :

১২০৬ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ ঘুরির মৃত্যুর পর তাঁর সেনাপতি কুতুবউদ্দিন আইবক দিল্লিতে স্বাধীন সুলতানির প্রতিষ্ঠা করেন। ৩২০ বছর ধরে দিল্লির সুলতানদের আমলে ব্যাবসাবাণিজ্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটে।

দিল্লির সুলতানদের আমলে বাণিজ্যের বিস্তারের কারণ :

আইনশৃঙ্খলার উন্নতি : সুলতানি আমলে ভারতে সুদৃঢ় শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দিল্লির সুলতানদের আমলে দেশের আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ঘটেছিল – যা ব্যাবসাবাণিজ্যের বিস্তারে সহায়ক হয়।

নতুন নতুন শহরের পত্তন : সুলতানি আমলে অনেক নতুন নতুন শহরের পত্তন হয়েছিল। পুরোনো শহরগুলিতে নতুন করে লোকবসতি শুরু হয়েছিল। ফলে শহরের পত্তন ও বিকাশ বাণিজ্যের বিস্তারে সহায়ক হয়।

 যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি : সুলতানি যুগে রাস্তাঘাট, সরাইখানা প্রভৃতি নির্মাণের ফলে বাণিজ্যের প্রসার ঘটে।

শহরবাসী ও সেনাবাহিনীর প্রয়োজন মেটানো: শহরগুলিতে ব্যবসায়ী, রাজকর্মচারী, শ্রমিক, কারিগরসহ প্রচুর লোক বসবাস করত। তা ছাড়া থাকত বিশাল সেনাবাহিনী। এদের জন্য এবং সুলতান ও অভিজাতদের বিলাসব্যসন এবং মূল্যবান জিনিসের প্রয়োজন মেটানোর জন্য সুলতানি আমলে ব্যবসায়ীদের উৎসাহ দেওয়া হত।

উত্তর:

ব্যাবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারতের ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। মুঘল আমলে এই ব্যাবসাবাণিজ্যের প্রসার ঘটে।

বাণিজ্যের প্রসারের কারণ : মুঘল আমলে ভারতে ব্যাবসাবাণিজ্যের প্রসারের কারণগুলি হল-

মুঘল আমলে ভারতের আইনশৃঙ্খলার উন্নতি : মুঘল আমলে ভারতের আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ব্যাবসাবাণিজ্য প্রসারের সহায়ক হয়েছিল।

সম্রাটদের সহযোগিতা : মুঘল সম্রাটগণ ব্যাবসাবাণিজ্যের প্রসারে বিভিন্নভাবে সাহায্য করতেন। তাঁরা বণিকদের কাছ থেকে মাত্র ২.৫০ শুল্ক আদায় করতেন। 'রাহাদারি' করের বিনিময়ে বাণিজ্যে বণিকদের নিরাপত্তা প্রদান করতেন।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি : মুঘল আমলে ভারতে অনেক রাস্তা নির্মিত হয়েছিল। এই রাস্তাগুলি বাণিজ্যের প্রসারের সহায়ক হয়েছিল

ইউরোপীয় বণিকদের আগমন : মুঘল আমলে ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে পোর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা ভারতে আসার জলপথ আবি করেন। এর পরবর্তীকালে ইউরোপীয় বণিকদের ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়, ফলে বাণিজ্যের প্রসার ঘটে।

উত্তর:

মধ্যযুগে ভারতে ব্যাবসাবাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল। এ যুগের বাণিজ্যকে দু-ভাগে ভাগ করা যায়— 1. গ্রাম ও শহরের বাণিজ্য এবং 2. একাধিক শহরের মধ্যে বাণিজ্য

 গ্রাম ও শহরের বাণিজ্য : গ্রামে কৃষকরা বিভিন্ন শস্য ও সবজি চাষ করত। বিভিন্ন পেশার কারিগররা প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস তৈরি করত। শহরের অধিবাসীদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য গ্রাম থেকে খাদ্যশস্য, সবজি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস আনা হত। গ্রাম থেকে শহরে যেসব জিনিস আসত তার মধ্যে ছিল বিভিন্ন খাদ্যশস্য, তেল, ঘি, মাছ, মাংস, লবণ, সবজি, ফল, মাটির হাঁড়ি-কলসি প্রভৃতি। গ্রামে ব্যবসায়ীরা এইসব জিনিসপত্র এনে শহরের বাজারে বা বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিক্রি করত। আলাউদ্দিন খলজির আমলে দিল্লিতে চারটি বড়ো বড়ো বাজার ছিল। এখানে শস্য, কাপড়, ঘোড়া প্রভৃতি বিক্রি হত। সুলতানি যুগে প্রথম চরকায় সুতো কেটে কাপড় বোনার কাজ শুরু হয়।

একাধিক শহরের মধ্যে বাণিজ্য : আবার অনেক দ্রব্যসামগ্রী ছিল যেগুলি এক শহর থেকে অন্য শহরে বিক্রি হত। এইসব জিনিসপত্রের মধ্যে প্রধান ছিল দামি ও শৌখিন জিনিস, যেগুলি ধনী ও অভিজাত পরিবারের লোকজন ব্যবহার করত। বিশেষত দামি মদ, সূক্ষ্ম মসলিন বস্ত্র, দামি আসবাবপত্র প্রভৃতি শহরের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি হত।

উত্তর:

ইউরোপীয়দের মধ্যে পোর্তুগিজরা প্রথম জলপথে ব্যাবসার জন্য ভারতে আসে। তারপর ভারতে ব্যাবসা করার জন্য ইউরোপের অনেক দেশের ব্যবসায়ীরা কোম্পানি গড়ে তোলে। এদের মধ্যে ইংরেজ, ডাচ, ফরাসি, দিনেমার প্রভৃতি ইউরোপীয় বণিকরা ভারতে ব্যাবসাবাণিজ্য করত।

ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির আমদানি দ্রব্য : ভারত থেকে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি যেসব দ্রব্যসামগ্রী নিয়ে যেত সেগুলির মধ্যে প্রধান ছিল – সুতিবস্ত্র, আফিম, গোলমরিচ, নীল, সোরা, কাঁচা রেশম, রেশমবস্ত্র প্রভৃতি।

যেসব দেশে বিক্রি করা হত: এই দ্রব্যগুলির মধ্যে সুতিবন্ত্র ও আফিম ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির মাধ্যমে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে বিক্রি হত। গোলমরিচ, নীল, সোরা, সুতিবস্ত্র, কাঁচা রেশম ও রেশমবস্ত্র ইউরোপের বাজারে বিক্রি হত।

ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির রপ্তানি দ্রব্য : ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি ভারতে যেসব জিনিস রপ্তানি করত বা ভারত যেসব জিনিস কিনত তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলমশলা, টিন, তামা, রুপো, সোনা, পশমের বজ্র, সুগন্ধি দ্রব্য প্রভৃতি। ভারত।

যেসব দেশ থেকে পণ্য আনা হত : পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থেকে ভারতে মশলা, টিন, তামা প্রভৃতি আসত। আর ভারতের প্রয়োজনীয় রুপো আসত আমেরিকা থেকে ইউরোপ এবং ইউরোপ থেকে ভারতে। তা ছাড়া পশমবস্ত্র ও সুগন্ধি দ্রব্য আসত ইউরোপ থেকে।

উত্তর:

ইউরোপীয় বণিকদের ভারতে আসার প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে ভৌগোলিক আবিষ্কার বা সমুদ্রপথ আবিষ্কারের সূচনা হয়। এই অভিযানের সূত্র ধরে ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে পোর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা আবিষ্কৃত পথ ধরেই পোর্তুগিজ, ইংরেজ, ফরাসি, ওলন্দাজ প্রভৃতি বণিকগণ ভারতবর্ষে আসতে শুরু করেন। ইউরোপীয় বণিকদের মধ্যে পোর্তুগালের বণিকরা প্রথম ভারতবর্ষে আসেন।

 পোর্তুগিজ বণিকদের বিবরণ :

 ভাস্কো দা গামা : পোর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে মহাসমুদ্র অতিক্রম করে ভারতের পশ্চিম উপকূলের কালিকট বন্দরে এসে উপস্থিত হন। তিনিই প্রথম ইউরোপের সঙ্গে ভারতের জলপথে যোগাযোগের পথ আবিষ্কার করেন। পরের বছর ১৪৯৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি জাহাজ ভরতি ভারতীয় পণ্যসামগ্রী নিয়ে পোর্তুগালে ফিরে যান। ১৫০২ খ্রিস্টাব্দে ভাস্কো দা গামা দ্বিতীয়বার ভারতে আসেন এবং কোচিনে একটি বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করেন। কালিকটের রাজা জামোরিনের সঙ্গে তাঁর বিরোধ হলে তিনি কালিকট ত্যাগ করে কোনোরে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করেন।

পেড়ো কেন্ট্রাল : পৌতুগিজ নাবিক পেড্রো কেক্ট্রাল ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে ভারতে এসে কালিকটে একটি বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করেন।

আলমিডা : ভারতে বাণিজ্যের বিপুল সম্ভাবনা লক্ষ করে পোর্তুগালের সরকার ১৫০৫ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সিস্কো আলমিডাকে ভারতে প্রথম পোর্তুগিজ গভর্নর নিযুক্ত করে। আলমিডা কোচিন ও কেন্নানোরে দুর্গ নির্মাণ করেন। তিনি রাজা জামোরিনের নৌবহর ধ্বংস করে ভারতে পোর্তুগিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন।

আলবুকার্ক : আলফাসো দ্য আলবুকার্ক ১৫০৯ খ্রিস্টাব্দে ভারতে পরবর্তী পোর্তুগিজ শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তিনি ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে। বিজাপুরের কাছ থেকে গোয়া দখল করে নেন। তিনি দমন, দিউ ও কোচিনে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করেন। এইভাবে তিনি ভারতে পোর্তুগিজ শাসনের সূচনা করেছিলেন। তাই তাঁকে 'প্রাচ্যদেশে পোর্তুগিজ শাসনের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা’ বলা হয়।

উত্তর:

মুল যুগের একটি প্রধান বন্দরের নাম হল সুরাট। এই বন্দরের মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকাইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমুদ্রবাণিজ্য চলত।

মুঘল আমলে ভারতের একটি প্রধান আমদানি এব্য হল ঘোড়া

মুঘল আমলে ভারতের একটি প্রধান রপ্তানি দ্রব্য হল বজ্র

ঘুঘল আমিলে ভারতে বাণিজ্য বিস্তারের দুটি কারণ হল :

 মুঘল সম্রাটদের সহযোগিতা : মুঘল সম্রাটগণ বণিকদের উৎসাহিত করার জন্য মাত্র ২.৫% হারে শুল্ক আদায় করতেন।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি : মুঘল আমলে সড়ক-ই আজম (জি.টি. রোড—গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড) এবং অসংখ্য সড়ক নির্মিত হওয়ায় ব্যাবসাবাণিজ্যের বিস্তারে সহায়ক হয়েছিল।

উত্তর:

খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকে ইউরোপীয় বণিকরা বাণিজ্য করার জন্য অনেক কোম্পানি তৈরি করেছিল। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশরা লন্ডনে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বণিকরা ভারতে মুঘল সম্রাটদের আমলে ব্যাবসাবাণিজ্য শুরু করেছিল।

ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের দূত হয়ে স্যার টমাস রো ভারতে এসেছিলেন। তখন ভারতের মুঘল সম্রাট ছিলেন জাহাঙ্গির। টমাস রো জাহাঙ্গিরের রাজসভায় এসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যকুঠি স্থাপনের আবেদন জানান।

 ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যকুঠি : ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথমদিকে যে বাণিজ্যকুঠি স্থাপিত হয়েছিল সেগুলি ছিল মুসলিপটনমসুরাটে। টমাস রোর চেষ্টায় আগ্রা, পাটনা বুরহানপুরে ইংরেজদের বাণিজ্যকুঠি স্থাপিত হয়েছিল।

পোর্তুগিজদের বিতাড়নে ব্রিটিশ কোম্পানির সুবিধা : পোর্তুগিজ বণিকরা ভারতীয়দের ধরে নিয়ে গিয়ে বিদেশে দাস হিসেবে বিক্রি করত। মুঘল বাদশাহ শাহ জাহান এতে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তিনি দাসব্যাবসা করার অপরাধে পোর্তুগিজ বণিকদের হুগলি থেকে বিতাড়িত করেছিলেন। এর ফলে ভারতে ব্যাবসা করার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ কোম্পানির সুবিধা হয়েছিল এবং তাঁরা বাংলায় বাণিজ্য করার সুযোগ পেয়েছিল।

উত্তর :

নগর : নগর শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ থেকে।

 শহর : শহর শব্দটি এসেছে ফারসি শব্দ থেকে।

মধ্যযুগে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে ওঠা কয়েকটি শহর:

পূর্ব ভারত : মধ্যযুগে পূর্ব ভারতে বিশেষত বাংলায় গড়ে ওঠা শহরগুলি হল— পাণ্ডুয়া, গৌড়, নবদ্বীপ, চট্টগ্রাম।

পশ্চিম ভারত : মধ্যযুগে পশ্চিম ভারতে আহমেদাবাদ, সুরাট ও পাঞ্জাব অঞ্চলে শহর গড়ে উঠেছিল।

উত্তর ভারত : মধ্যযুগে উত্তর ভারতে আগ্রা, আকবর প্রতিষ্ঠিত ফতেহপুর সিকরি ও দিল্লি গড়ে ওঠে।

 দক্ষিণ ভারত : মধ্যযুগে দক্ষিণ ভারতে বুরহানপুর, গোলকোণ্ডা, বিজাপুর প্রভৃতি শহর গড়ে উঠেছিল।

উত্তর:

মধ্যযুগে ভারতে অনেক শহর গড়ে উঠেছিল। ‘শহর’ শব্দটি ফারসি শব্দ। মধ্যযুগ বা সুলতানি ও মুঘল যুগে ভারতে বিভিন্নভাবে শহর গড়ে উঠেছিল।

  1. অর্থনৈতিক কারণ : মধ্যযুগে অনেক শহর গড়ে উঠেছিল যেগুলি ছিল ব্যাবসাবাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র।
  2. রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণ : মধ্যযুগে রাজধানীকে কেন্দ্র করে শহর গড়ে উঠত। সুলতান বা বাদশাহগণ অনেক সময় নতুন নতুন রাজধানী শহর তৈরি করতেন। সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলক দিল্লি থেকে দৌলতাবাদে রাজধানী স্থানান্তর করেছিলেন। মুঘল যুগে গড়ে উঠেছিল আগ্রা, ফতেহপুর সিকরি, শাহজাহানাবাদ প্রভৃতি শহর।
  3. ধর্মীয় কারণ : মধ্যযুগে ধর্মীয় স্থান, মন্দির বা মসজিদকে ঘিরে প্রচুর তীর্থযাত্রী আসার ফলে শহর গড়ে উঠত। আবার অনেকগুলি 'গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি। পাঠ্যবইয়ের অনুশীলনী এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি ওকারণ একসঙ্গে যুক্ত হয়েও অনেক শহর গড়ে উঠত।

উত্তর:

বর্তমান সময় পর্যন্ত মধ্যযুগীয় দিল্লির সাতটি নাগরিক বসতির চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে। বহু প্রাচীনকাল থেকে এই শহরের উল্লেখ পাওয়া যায়।

মহাভারতে : মহাভারতে ‘ইন্দ্রপ্রস্থ’ নামে একটি নগরের উল্লেখ রয়েছে। কোনো কোনো ঐতিহাসিক ইন্দ্রপ্রস্থ’-কেই আধুনিক দিল্লি শহরের আদিরূপ বলে মনে করেছেন।

মৌর্যযুগে : খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে মৌর্য শাসকদের জনৈক বংশধরের আমলে দিল্লি' নামটির উল্লেখ পাওয়া যায়।

রাজপুতদের সময়ে : খ্রিস্টীয় একাদশ শতকে রাজপুত শাসকদের একটি গোষ্ঠী দিল্লিতে শাসন করত। তাদের সরিয়ে দিয়ে খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকে চৌহানরা দিল্লি দখল করে নেয়।

মুসলিম শাসনের সময়ে : কুতুবউদ্দিন আইবক খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে দিল্লিতে সুলতানি শাসনের প্রতিষ্ঠা করেন। মধ্যযুগে দিল্লি শহরের বিকাশের ক্ষেত্রে দুটি পর্যায় লক্ষণীয়। প্রথম পর্যায় হল খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতকের দিল্লি আর দ্বিতীয় পর্যায়টি হল সপ্তদশ শতকে শাহ জাহানের তৈরি শাহজাহানাবাদ। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত দিল্লি শহরটি তার মর্যাদা ও গুরুত্ব অক্ষুণ্ন রেখেছে।

উত্তর:

শাহজাহানাবাদ শহর প্রতিষ্ঠার কারণ : মুঘল সম্রাট শাহজাহান শাহজাহানাবাদ শহরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি সুলতানি আমলে গড়ে ওঠা ধ্বংসপ্রাপ্ত দিল্লি শহরে রাজধানী গড়ে তুলতে চাননি। তাই তিনি নতুন এলাকায় শাহজাহানাবাদ শহরটি প্রতিষ্ঠা করেন। (১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে)।

শাহজাহানাবাদ শহরটির অবস্থান : সম্রাট শাহজাহান

প্রতিষ্ঠিত শাহজাহানাবাদ শহরটি গড়ে উঠেছিল যমুনা নদীর পশ্চিমে একটি উঁচু জায়গায়। এটি পুরোনো দিল্লি থেকে খানিকটা দূরে অবস্থিত ছিল।

উত্তর:

কুতুবউদ্দিন আইবক দিল্লিকে কেন্দ্র করে সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।

কুতুবদিল্লি: সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবকের সময়ে দিল্লি শহর তৈরি হয়েছিল রাজপুত রাজাদের শহর কিলা রাই পিথোরাকে কেন্দ্র করে। কুতুবউদ্দিন আইবকের আমলে প্রতিষ্ঠিত দিল্লি শহরকে কুতুব দিল্লি' বলা হত। এরপর থেকে দিল্লি শহর সুলতানি আমলে ভারতের রাজধানী শহর হিসেবে গড়ে ওঠে। এটি সুলতানি আমলের ‘প্রথম দিল্লি’ বা ‘পুরোনো দিল্লি’ নামে পরিচিত।

উত্তর:

সুলতানি আমলে দিল্লির নাম হয়েছিল 'হজরত-ই দিল্লি'।

কারণ :

 দিল্লির গুরুত্ব বৃদ্ধি : ইরাকের বাগদাদ শহর ছিল মুসলমান সভ্যতার একটি বড়ো কেন্দ্র। কিন্তু মোঙ্গলরা বাগদাদ আক্রমণ করে এই শহরের অনেক ক্ষতি করেছিল। এর ফলে বাগদাদ শহরের গুরুত্ব কমে গিয়েছিল। বাগদাদের এই দুরবস্থার সময় দিল্লির গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছিল।

 ইসলামের পীঠস্থান : বাগদাদ শহরের অবক্ষয়ের ফলে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া থেকে অনেক লোক দিল্লিতে এসে বসবাস শুরু করে। দিল্লি সুফি সাধকদের অন্যতম পীঠস্থান হয়ে ওঠে।

উত্তর:

মহম্মদ ঘুরি মারা যাওয়ার পর (১২০৬ খ্রিস্টাব্দ) কুতুবউদ্দিন আইবক দিল্লিকে রাজধানী করে সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুলতানদের দিল্লিকে রাজধানী করার কারণ হল-

1.দিল্লির সুরক্ষিত ভৌগোলিক অবস্থান : দিল্লি ছিল আরাবল্লি শৈলশিরার এক প্রান্তে ও যমুনা নদীবিধৌত সমতলের সংযোগস্থলে অবস্থিত। আরাবল্লি পর্বতের ঢালে পাথর দিয়ে সুরক্ষিত দুর্গ নির্মাণ করা সহজ হয়েছিল।

শহরের পূর্বদিকে যমুনা নদী, যা ছিল শহরের পূর্বদিকের প্রাকৃতিক সুরক্ষিত সীমানা।

 

2.দিল্লির ঐতিহ্য : সুলতানি যুগের আগেও দিল্লি ছিল একটি ঐতিহ্যপূর্ণ শহর।

মহাভারতে ইন্দ্রপ্রস্থ নামে যে নগরের কথা জানা যায় তা ছিল দিল্লির আদিরূপ। তা ছাড়া প্রাচীনকাল থেকে রাজা ও বণিকদের কাছে এই অঞ্চলটি ছিল বিশেষ আকর্ষণের জায়গা।

উত্তর:

ভারতের প্রাণকেন্দ্র দিল্লি শহরকে নিয়ে নানান গল্প প্রচলিত। তবে সেগুলির মধ্যে শেখ নিজামউদ্দিন আউলিয়াসুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলককে কেন্দ্র করে যে গল্পটি রয়েছে সেটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য।

দিল্লি এখনও অনেক দূর’-গল্প : সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক সুফি সম্ভ নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে শহরের বাইরে নির্বাসন দিয়েছিলেন। কিন্তু নিজামউদ্দিন তা অগ্রাহ্য করেন। এরপর সুলতান গিয়াসউদ্দিন বাংলাদেশে যুদ্ধযাত্রায় যাবার সময়ে আদেশ করেন যে, তিনি রাজধানীতে প্রত্যাবর্তনের আগেই যেন নিজামউদ্দিন চিরদিনের মতো দিল্লি ছেড়ে চলে যান। ফলত, নিজামউদ্দিনের শিষ্যরা গুরুর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তান্বিত হয়ে পড়লে নিজামউদ্দিন তাদের শুধু বলেছিলেন— 'হনুজ দিল্লি দূর অস্ত’ বা দিল্লি এখনও অনেক দূর। যুদ্ধযাত্রা থেকে ফেরার পথে এক দুর্ঘটনায় গিয়াসউদ্দিন মারা যান, ফলে সুলতানের নিজেরই আর দিল্লিতে ফেরা হল না। এই ঘটনায় দিল্লিতে নিজামউদ্দিনের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।

উত্তর:

ফিরোজ শাহ কোটলা : দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক ফিরোজ শাহ কোটলা (দুর্গ) নির্মাণ করেছিলেন। ‘কোটলা’ শব্দের মানে দুর্গ

ফিরোজাবাদ শহর প্রতিষ্ঠা : দিল্লির তুঘলক বংশের সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক ফিরোজাবাদ শহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

অবস্থান : ফিরোজাবাদ শহরটি গড়ে উঠেছিল যমুনা নদীর পাড় বরাবর।

প্রতিষ্ঠার কারণ : যমুনা নদীর তীরে ফিরোজাবাদ শহর গড়ে তোলার কারণ—

জলের সুবিধা : শহরের প্রয়োজনীয় জল যমুনা নদী থেকে পাওয়া