Chapter-6⇒পরিবেশের সজীব উপাদানের গঠনগত বৈচিত্র্য ও কার্যগত প্রক্রিয়া

উঃ-একটি আদর্শ প্রধান মূল প্রধানত চারটি অংশ নিয়ে গঠিত, যথা – (i) মূলত্ৰ অঞ্চল, (ii) বর্ধনশীল অঞ্চল, (iii) মূলরোম অঞ্চল ও (iv) স্থায়ী অঞ্চল।

(i) মূলত্ৰ অঞ্চল : প্রধান মূল ও তার শাখাপ্রশাখা মূলগুলির অগ্রভাগে যে টুপির মতো ঢাকনা বা আবরণ থাকে, তাকে মূলত্র বলা হয়। মূলের যে অঞ্চলে মূলত্র থাকে তাকে মূলত্র অঞ্চল বলে। কেয়া গাছে বহুযোজী মূলত্র, কচুরিপানা উদ্ভিদের মূলের আগায় আলগা ধরনের টুপির মতো মূলজেব থাকে।

কাজ : (a) মূল যখন মাটি ভেদ করে মাটির নীচে প্রবেশ করে মূলত্র অংশ তখন মূলের নরম অগ্রভাগকে মাটির ঘর্ষণজনিত আঘাত থেকে রক্ষা করে। (b) মূলত্রের বাইরের অংশ থেকে নির্গত পিচ্ছিল রস মাটিকে নরম করে এবং মূলকে সহজে মাটির মধ্যে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।

(ii) বর্ধনশীল অঞ্চল বা বর্ধিষ্ণু অঞ্চল : মূলত্র অঞ্চলের ঠিক পিছনের দিকে নরম ও মসৃণ অংশ নিয়ে যে অঞ্চলটি গঠিত হয়, তাকে বর্ধনশীল অঞ্চল বলে।

কাজ : মূলের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি ঘটায়।

(iii) মূলরোম অঞ্চল : বর্ধিষ্ণু অঞ্চলের উপরের দিকে অবস্থিত এককোশী মূলরোমবিশিষ্ট অঞ্চলকে মূলরোম অঞ্চল বলে। এই অঞ্চলের চারপাশ থেকে অসংখ্য সরু সরু এককোশী মূলরোম জন্মায়।

কাজ : (a) মাটি থেকে জল ও খনিজ লবণ সংগ্রহ করে। (b) উদ্ভিদকে মাটির সঙ্গে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ রাখে।

(iv) স্থায়ী অঞ্চল : মূলরোম অঞ্চলের উপরের দিক থেকে শুরু করে কাণ্ডের নীচ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলকে স্থায়ী অঞ্চল বলে। এই অঞ্চলে শাখা ও প্রশাখা মূল থাকে।

কাজ : (a) শাখাপ্রশাখা মূল উৎপন্ন করা এর প্রধান কাজ। (b) শাখাপ্রশাখা মূল উদ্ভিদকে মাটিতে আবদ্ধ রাখতে সাহায্য করে। (c) এই অঞ্চলের মাধ্যমে মূল দ্বারা শোষিত জল কাণ্ডে পৌঁছোয়।

উঃ- মূল — ভ্রূণাক্ষের ভ্রূণমূল থেকে উৎপন্ন ও মাটির নীচে আলোর বিপরীত দিকে বর্ধিত উদ্ভিদ অংশকে মূল বলে। উদ্ভিদের অন্যান্য অংশ (যেমন পাতা , কাণ্ড প্রভৃতি) থেকেও মূল উৎপন্ন  হতে পারে।

মূল চেনার উপায় :

1) মূল অভিকর্ষের দিকে এবং আলোর বিপরীতে বৃদ্ধি পায়। 2) মূলের একেবারে ডগায় টুপির মতো অংশ থাকে, একে মূলত (Root cap) বলে। 3) মূলতের ঠিক ওপরে রোঁয়া ছাড়া অঞ্চল থাকে, একে বর্ধনশীল অঞ্চল (Growing Region) বলে। 4) বর্ধনশীল অঞ্চলের ওপরে থাকে রোঁয়াযুক্ত অঞ্চল, একে মূলরোম অঞ্চল (Root hair Region) বলে। 5) মূলরোমের ওপরে থাকে শক্ত অঞ্চল। এখান থেকে মূলের শাখাগুলি বের হয়। এই স্থানকে স্থায়ী অঞ্চল (Permanent Region) বলে।6) মূলে পর্ব, পর্বমধ্য, পাতা, ফুল, ফল প্রভৃতি থাকে না।

উঃ-আমাদের রোজকার জীবনে মূলের কাজ :

(i) খাদ্যের উৎস : গাজর, মুলো, বিট, রাঙাআলু প্রভৃতি মূলগুলিকে আমরা খাদ্যরূপে ব্যবহার করি।

(ii) ওষুধরূপে : সর্পগন্ধা গাছের মূলে থাকে রেসারপিন যা থেকে উচ্চরক্তচাপের ওষুধ তৈরি হয়। এ ছাড়া নিমগাছের মূল, বেলগাছের মূল থেকেও ওষুধ তৈরি হয়।

(iii) মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি : প্রধানত শিম্বি ও কিছু অশিম্বি গোত্রীয় উদ্ভিদের মূলে নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী ব্যাকটেরিয়া বসবাস করে। এর ফলে এইসমস্ত উদ্ভিদ মাটিতে জৈবসার রূপে ব্যবহৃত হয়।

(iv) ভূমিক্ষয় রোধ : বট, অশ্বত্থ, ছাতিম, রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া, শিরীষ প্রভৃতি বৃক্ষজাতীয় গাছ ভূমিক্ষয় রোধ করে।

(v) বন্যা ও ঝঞ্ঝা কমানো : বৃক্ষজাতীয় এবং অধিক ডালপালাযুক্ত গাছ বাতাসকে ভেঙে দেয় এবং জলের বেগকে কমিয়ে দিয়ে বন্যা ও ঝঞ্ঝার হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করে।

 

উঃ-(i) মাটির কণাগুলিকে আঁকড়ে ধরে রাখে ফলে ভূমিক্ষয় রোধ হয়। (ii) মাটিকে নরম করে। (iii) মাটি ছিদ্রযুক্ত ও ঝুরঝুরে হয় ফলে মাটি অনেকবেশি উর্বর হয়ে ওঠে। (iv) মাটি ভিজে ভিজে থাকে ফলে বহুরকমের প্রাণী মাটিতে আশ্রয় নেয়। (v) মাটি দুপুরবেলাতেও ঠান্ডা ও আর্দ্র থাকে ফলে মাটি কখনও রুক্ষ, শুকনো হয়ে যায় না।

উঃ-গাছের বিটপতন্ত্রের প্রধান অক্ষ হল কাণ্ড

একটি আদর্শ কাণ্ডের বৈশিষ্ট্য —

(i) পর্ব : প্রতিটি কাণ্ডে গাঁটের ন্যায় যে অংশ দেখা যায় তাদের বলা হয় পর্ব। সাধারণত পর্বগুলি সমান দূরত্বে অবস্থান করে।

কাজ : পর্ব থেকে পাতা, মুকুল, শাখা ইত্যাদি সৃষ্টি হয়।

(ii) পর্বমধ্য : দুটি পর্বের মধ্যবর্তী শাখাপ্রশাখাবিহীন অংশকে বলা হয় পর্বমধ্য।

কাজ : এই অংশ কাণ্ডকে সোজা রাখতে সাহায্য করে।

(iii) পাতা : পর্ব থেকে উৎপন্ন চ্যাপটা, প্রশস্ত সবুজ পার্শ্বীয় অঙ্গকে বলা হয় পাতা

কাজ : খাদ্য উৎপাদন, শ্বসন, বাষ্পমোচনে অংশগ্রহণ করা এর প্রধান কাজ।

(iv) কক্ষ : পাতা ও কাণ্ডের মধ্যে যে কোণের মতো অংশ সৃষ্টি হয়, তাকে বলা হয় কক্ষ

কাজ : কক্ষ থেকে ফুল, মুকুল ইত্যাদি উৎপন্ন হয়।

(v) মুকুল : কাণ্ডের শীর্ষভাগে বা পাতার কক্ষে যে অপরিণত শাখা বা বিটপ উৎপন্ন হয়, তাকে বলা হয় মুকুল। কাণ্ডে সাধারণত অগ্রমুকুল ও কাক্ষিক মুকুল দেখা যায়।

কাজ : অগ্রমুকুল কাণ্ডকে দৈর্ঘ্যে বৃদ্ধি করে, কাক্ষিক মুকুল শাখাপ্রশাখা ও ফুল সৃষ্টি করে।

 

উঃ-কাণ্ডের কাজ প্রধানত দু-প্রকারের হয় — (i) যান্ত্রিক কাজ(ii) শারীরবৃত্তীয় কাজ

(i) যান্ত্রিক কাজ : কাণ্ড শাখাপ্রশাখা, পাতা, ফুল, ফল প্রভৃতিকে ধারণ করে। পাতাকে আলোর দিকে মেলে ধরে।

(ii) শারীরবৃত্তীয় কাজ : মাটি থেকে মূল দ্বারা শোষিত জল ও লবণকে কাণ্ড পাতা অভিমুখে পাঠিয়ে দেয় এবং পাতায় উৎপন্ন খাদ্যকে সারা দেহে পরিবাহিত করে।

♦ এ ছাড়াও কাণ্ডের কিছু বিশেষ কাজ আছে —

(iii) বিশেষ কাজ : (a) সবুজ কাণ্ড সালোকসংশ্লেষ করতে পারে। কাণ্ডকোশে শ্বসন এবং কাণ্ডত্বকে বাষ্পমোচনও হয়। (b) কোনো কোনো কাণ্ড ভবিষ্যতের জন্য খাদ্য সঞ্চয় করে রাখে। যেমন— আলু, ওল ইত্যাদি। (c) ফণীমনসা গাছের কাণ্ড খাদ্য প্রস্তুত করে। (d) মরুভূমির উদ্ভিদ কাণ্ডে জল সঞ্চয় করে রাখে।

উঃ-পরিবেশে গাছের কাণ্ডের অবদান :

(i) বিভিন্ন প্রাণীর আশ্রয়স্থল : (a) পাখি, কাঠবেড়ালি, বাদুড়, বাঁদর, গোরিলা প্রভৃতি প্রাণীরা রাতে গাছের ডালে আশ্রয় নেয়। (b) লাল পিঁপড়ে, কালো পিঁপড়ে, জাবপোকা প্রভৃতি ছোটো ছোটো প্রাণীরা গাছের ওপরেই নির্ভর করে বেঁচে থাকে।

(ii) অক্সিজেনের উৎস : আমাদের প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের উৎস হল গাছ।

(iii) পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ : বাতাস থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও অন্যান্য বিষাক্ত ধোঁয়া টেনে নিয়ে গাছ পরিবেশকে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করে।

(iv) পরিবেশদূষণ নির্দেশক : লাইকেন নামক একপ্রকার উদ্ভিদ (ছত্রাক ও শৈবালের মিথোজীবী সম্পর্ক) গাছের গুঁড়িতে জন্মায়। বাতাসে সালফার ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গেলে লাইকেন ধ্বংস হয় অর্থাৎ, পরিবেশদূষণকে নির্দেশ করে।

(v) পরিবেশ ঠান্ডা রাখা : বৃক্ষজাতীয় গাছ গরমকালে পরিবেশকে ঠান্ডা রাখে। এই সময় বাষ্পমোচনের মাধ্যমে গাছ প্রচুর জলীয়বাষ্প বাতাসে ত্যাগ করে।

 

উঃ-পাতার কাজ : (i) খাদ্য তৈরি : ক্লোরোফিলযুক্ত হওয়ায় পাতা সালোকংসশ্লেষ প্রক্রিয়ায় সরল জৈব শর্করা তৈরি করে। (ii) বাষ্পমোচন : পত্ররন্ধ্রের সাহায্যে উদ্ভিদ দেহের অতিরিক্ত জল বাষ্পাকারে দেহের বাইরে বের করে দেয়। অতিরিক্ত জল পরিত্যাগ করা ছাড়া এই প্রক্রিয়ার সাহায্যে প্রখর রৌদ্রতাপেও উদ্ভিদদেহ ঠান্ডা থাকে। (iii) গ্যাসীয় পদার্থের আদানপ্রদান : পাতায় উপস্থিত পত্ররন্ধ্রের সাহায্যে গাছ খাদ্য তৈরির জন্য বাতাস থেকে CO2 গ্যাস শোষণ করে এবং খাদ্য তৈরির সময় বাতাসে O2 গ্যাস ত্যাগ করে। শ্বসনকালে বাতাস থেকে O, গ্রহণ করে বাতাসে CO, পরিত্যাগ করে। (iv) খাদ্য ও জল সঞ্চয় করা : পেঁয়াজের শঙ্কপত্র, পুঁইশাকের পাতা, ঘৃতকুমারীর পাতা প্রভৃতি ভবিষ্যতের জন্য খাদ্য ও জল সঞ্চয় করে রাখে। (v) আরোহণ : সমগ্র খেসারি পাতা, মটরের শীর্ষ যৌগপত্রক, উলটচন্ডালের পত্রাগ্র, কুমারিকা পাতার উপপত্র আকর্ষে পরিণত হয়ে গাছকে কোনো কিছু অবলম্বন করে বা জড়িয়ে উপরে উঠতে সাহায্য করে। (vi) আত্মরক্ষা : ফণীমনসার পত্রকণ্টক, খেজুর পাতার অগ্রভাগ কন্টকে পরিণত হয়ে গাছকে আত্মরক্ষায় সাহায্য করে। (vii) প্রোটিনজাতীয় খাদ্য সংগ্রহ : কলসপত্রী, সূর্যশিশির প্রভৃতি উদ্ভিদরা পতঙ্গদের দেহ থেকে প্রোটিন রস সংগ্রহ করে। (viii) বংশবিস্তার : পাথরকুচির পাতা অঙ্গজ জননের মাধ্যমে গাছের বংশবিস্তারে সাহায্য করে। (ix) রেচন : শিমুল, শিরিষ, আমড়া প্রভৃতি গাছ পত্রমোচনের দ্বারা রেচন পদার্থ ত্যাগ করে। (x) সঞ্জয় : পত্রফলকে সাময়িকভাবে খাদ্য সঞ্জিত থাকে।