Chapter-6⇒সম্পদ

সম্পদ কথাটির আভিধানিক অর্থ হল—ঐশ্বর্য বা ধনসম্পত্তি।

জিমারম্যান-এর মতে, সম্পদ কোনো বস্তু বা পদার্থ নয়। কোনো বস্তু বা পদার্থ যে কাজ করে বা কোনো বস্তু বা পদার্থের মধ্যে যে কার্যকরী শক্তি লুকিয়ে রয়েছে তাই হল সম্পদ। সম্পদ মানুষের অভাব মোচন করে। মানুষকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যপূরণে সাহায্য করে। মানুষের চাহিদা মেটায়।

ম্পদের পরিবেশভিত্তিক সংজ্ঞা হল—যে-কোনো চিন যা মানুষের নির্দিষ্ট চাহিদা মেটানোর কাজে লাগে, শুরু নয় জীবমণ্ডলকে সংরক্ষণ করতেও সাহায্য ক সেগুলিকে সম্পদ বলে গণ্য করা উচিত।

সম্পদ সৃষ্টির উপাদানগুলি হল – (i) প্রকৃতি, (II) মনুষ (iii) সংস্কৃতি।

সম্পদের দুটি বৈশিষ্ট্য হল—সম্পদের কার্যকারিতা এব সম্পদের উপযোগিতা রয়েছে।

দৃষ্টির প্রধান বাধাগুলি হল- (i) প্রাকৃতিক, মানবিক এবং (iii) সাংস্কৃতিক।

সম্পদ  সংরক্ষণের উপায়গুলি হল—সম্পদের প্রয়োজনভিত্তিক ব্যবহার এবং পরিবর্ত দ্রব্যের ব্যবহার।

সম্পদ সৃষ্টির প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতার উদাহরণ হল খরা, বন্যা, ঝড় প্রভৃতি।

 

সম্পদ সৃষ্টির মানবিক প্রতিবন্ধকতার উদাহরণ হল— অস্বাস্থ্য, অপুষ্টি, স্বল্প জনসংখ্যা প্রভৃতি।

সম্পদ সৃষ্টির সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতার উদাহরণ হল অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অজ্ঞানতা, কুসংস্কার প্রভৃতি।

সম্পদের অনুভব বা উপলব্ধি অনুসারে সম্পদ দুই প্রকারের হয়। যথা—বস্তুগত সম্পদ ও অবস্তুগত সম্পদ।

সম্পদের কার্যকারিতার অর্থ হল—মানুষের চাহিদা পুরণ করার ক্ষমতা।

যেসব বস্তু প্রকৃতিতে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে, যা মানুষের কোনো উপকার বা অপকার করে না, সম্পূর্ণ কার্যকারীতাহীন এমন উপাদানকে নিরপেক্ষ উপাদান বলে।

অ্যান্টার্কটিকায় সঞ্চিত খনিজ পদার্থ হল একটি নিরপেক্ষ উপাদানের উদাহরণ।

অর্থবিদ্যায় সম্পদের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল— উপযোগিতা, সহজলভ্যতা এবং বিপণনযোগ্যতা।

প্রকৃতি থেকে যেসব সম্পদ পাওয়া যায় সেগুলিকে বস্তুগত সম্পদ বলে। যেমন—রাণিগঞ্জের কয়লা। মানুষ ও সংস্কৃতি মিলে যে গুণগত সম্পদের জন্ম দেয় তাকে অবস্থাত সলে যেমন অমিকের

জলবিদ্যুৎ শক্তি ও সৌরশক্তি হল পরিবেশমিত্র সম্পদের উদাহরণ ।

যেসব প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণ সীমিত, নির্দিষ্ট স্থানে সঞ্চিত বা গচ্ছিত থাকে এবং কুমার ব্যবহারের ফলে নিঃশেষ হয়ে যায়, তাদের গচ্ছিত সম্পদ বলে।

যেসব সম্পদ বার বার ব্যবহারের ফলেও নিঃশোষিত হয় না, তাদের পুনর্ভর সম্পদ বলে।

কোনো বস্তুর সাথে কার্যকারিতাযুক্ত হলে তাকে সম্পদ বলা হয়।

যেসব প্রাকৃতিক সম্পদ পৃথিবীর সর্বত্র পাওয়া যায়, তাদের সর্বত্র প্রাপ্ত সম্পন বলে।

যেসব প্রাকৃতিক সম্পদ কেবল পৃথিবীর একটিমার স্থানেই পাওয়া যায়, তাদের অদ্বিতীয় সম্পন্ন বলে।

যেসব প্রাকৃতিক সম্পদ পৃথিবীর সর্বত্র পাওয়া না গেলেও বেশিরভাগ জায়গাতেই পাওয়া যায়, তাদের সহজলভ্য সম্পদ বলে।

যেসব প্রাকৃতিক সম্পদ মুষ্টিমেয় কয়েকটি স্থানেই পাওয়া যায়, তাদের দুষ্প্রাপ্য সম্পদ বলে।

যেসব প্রবহমান সম্পদ ব্যবহারের ফলে সাময়িকভাবে কমে গেলেও নির্দিষ্ট সময় পরে প্রকৃতিতে এগুলির ঘাটতি আপনা আপনি পুরণ হয়ে যায়, এদের পুনর্ভর প্রবহমান সম্পদ বলে।

দুটি পুনর্ভব প্রবহমান সম্পদ হল - কনভূমি, সমুদ্রের মাছ প্রভৃতি।

যেসব সম্পদ ব্যক্তির নিজস্ব অধিকারে থাকে, তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ বলে।

স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি হল ব্যক্তিগত সম্পদ।

যেসব সম্পদ মানুষের সামাজিক চাহিদা মেটায় তাদের সামাজিক সম্পদ বলে।

যেসব সম্পদ রাষ্ট্র বা সরকারের অধীনে থাকে, তাদের জাতীয় সম্পদ বলে।

জাতীয় সম্পদের একটি উদাহরণ হল — জাতীয় সড়কপথ।

যেসব সম্পদ কোনো ব্যক্তি, জাতি বা দেশের নিজস্ব সম্পদ নয়, সেগুলিকে আন্তর্জাতিক সম্পদ বলে।

যেসব সম্পদসমূহকে আবদ্ধ না রেখে ক্রমাগত ব্যবহার করা হয়, তাদের বিকশিত বা প্রকৃত সম্পদ বলে।

যেসব সম্পদের অবস্থান ও অস্তিত্ব জানা সত্ত্বেও প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণে তাদের পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হয়নি তাদের সম্ভাব্য সম্পদ বলে।

যেসব গচ্ছিত সম্পদ পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব, তাদের আবর্তনীয় গচ্ছিত সম্পদ বলে।

পুরোনো লৌহ ইস্পাত, তামা, আলুমিনিয়াম প্রভৃতি আবর্তনীয় গচ্ছিত সম্পদের উদাহরণ।

মানুষের জ্ঞান, নৈপুণ্য ইত্যাদির মাধ্যমে উদ্ভূত সাংস্কৃতিক উপাদানকে সাংস্কৃতিক সম্পদ বলে।

প্রকৃতি সৃষ্ট জীবজগৎ থেকে যেসব সম্পদ পাওয়া যায়। সেগুলিকে জৈব সম্পদ বলে।

যেসব সম্পদ স্পর্শযোগ্য, সেইসব সম্পদকে বস্তুগত সম্পদ বলে।

 

সম্পদের গুণগত পরিমাণ বৃদ্ধিকে কাল্পনিক স্তূপ বা অলীক পুও বলে।

যেসকল সম্পদসমূহকে আবদ্ধ না রেখে ক্রমাগত ব্যবহার করা হয়, তাদের বিকশিত সম্পদ বলে।

দুটি বিকশিত সম্পদ হল—ভারতের জলবিদ্যুৎ সম্পদ ও খনিজ তেল সম্পদ।

কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষকে যখন সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয় তখন তাকে মানবিক সম্পদ বলে।

জৈবিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে সম্পদ দুই প্রকার। যথা—জৈব সম্পদ ও অজৈব সম্পদ।

মানুষের শ্রমশক্তি এবং কর্মক্ষমতা হল দুটি মানবিক সম্পদের উদাহরণ।

একটি অদ্বিতীয় সম্পদের উদাহরণ হল গ্রিনল্যান্ডের ক্রায়োলাইট।

 

মানুষের গুণাবলি অবস্তুগত বা অস্পর্শযোগ্য সম্পদের উদাহরণ।

সম্পদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে সূর্যালোককে সাধারণত প্রাকৃতিক সম্পদ, প্রবাহমান বা অক্ষয়িষ্ণু সম্পদ এবং সর্বত্রপ্রাপ্ত সম্পদ বলা যাবে।

 

গ্রিনল্যান্ডে প্রাপ্ত ক্রায়োলাইট খনিজটি অদ্বিতীয় সম্পদের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

পুরোনো লৌহ-ইস্পাত, তামা, অ্যালুমিনিয়াম প্রভৃতি  আবর্তনীয় গচ্ছিত সম্পদের উদাহরণ।

পমতে সম্পদের পরিমাণ যেহেতু সীমিত তাই প্রয়োজনভিত্তিক উপাদান ব্যবহার করলে গচ্ছিত সম্পদকে বহুকাল সংরক্ষণ করা যাবে।

 

সম্পদ কথাটির আভিধানিক অর্থ হল—ঐশ্বর্য বা ধনসম্পত্তি।

সম্পদের সাপেক্ষে মানুষের দ্বৈত ভূমিকা লক্ষণীয়— (i) সম্পদের সৃষ্টিকর্তা এবং (ii) সম্পদের ভোগকর্তা।

মানুষের স্বাস্থ্য হল অবস্তুগত বা অস্পর্শযোগ্য সম্পদ।

বস্তুগত সম্পদ এবং অবস্তুগত সম্পদের প্রধান পার্থক্যটি হল—বস্তুগত সম্পদ স্পর্শযোগ্য কিন্তু অবস্তুগত সম্পদ

অস্পর্শযোগ্য।

দুটি আন্তর্জাতিক সম্পদের উদাহরণ হল – বায়ুমণ্ডলের ওজোনস্তর এবং সমুদ্রের তলদেশের খনিজ দ্রব্য।

মানুষের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য হল অবস্তুগত সম্পদের উদাহরণ।

 

সম্পদের কার্যকারিতা বলতে সম্পদের কাজ করার ক্ষমতাকে বোঝায়।

সম্পদের কার্যকারিতা তত্ত্ব' ধারণাটির প্রবক্তা হলেন জিমারম্যান ।

 

অপুনর্ভব বা গচ্ছিত সম্পদ ও পুনর্ভর বা অবাদ সম্পদের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হল অপুনর্ভব সম্পদের পরিমাণ সীমিত বলে নিশেষ হয়ে যায়

সম্পদের উপযোগিতা বলতে মানুষের অভাব মোচনের ক্ষমতাকে বোঝায়, অর্থাৎ মানুষের চাহিদা পূরণ করার ক্ষমতাকে বোঝায়।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদা পূরণ ও দীর্ঘস্থায়ী উন্নতির উদ্দেশ্যে সম্পদকে মিতব্যয়ীভাবে, যথোপযুক্তভাবে ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যবহার, অপচয় রোধ, রক্ষণাবেক্ষণ ও দূষণের কবল থেকে রক্ষা করাকে সম্পদ সংরক্ষণ বলে।

(1) ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদা পূরণের জন্য সম্পদের সরবরাহ অক্ষুণ্ণ রাখা, এবং (II) পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা।

লোহা ও ইস্পাত শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে বর্জ্য লোহার ব্যবহার আকরিক লোহা সংরক্ষণে সাহায্য করে। এইভাবে পুনর্ব্যবহারের ফলে সম্পদ সংরক্ষণ সম্ভব হয়।

প্রকৃতিতে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা কার্যকারিতাহীন বস্তুকে নিরপেক্ষ বস্তু বলে।

মরুভূমির বালি মানুষের অভাব পুরণ করে না বলে, একে সম্পদ বলা যায় না।

মানুষের শারীরবৃত্তীয় কাজে অক্সিজেন বিশেষ উপযোগী। শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য বায়ুর অক্সিজেন ব্যবহৃত হয় এবং এটি হল মুখ্য কার্যকরী উপাদান। উপযোগিতা ও কার্যকারিতা উভয়ই থাকায় অক্সিজেন হল সম্পদ।

বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে, কয়লার ব্যবহার কমিয়ে জলস্রোতকে কাজে লাগিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। যার ফলে কয়লা সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে।

অভ্রের অপচয় রোধ করার জন্য অভ্র উত্তোলনের সময় লক্ষ রাখতে হয়, যাতে অস্ত্র ভেঙে না যায়।

সম্পদের ধারণা

সম্পদের সাধারণ ধারণা: সম্পদ শব্দটি এসেছে ইংরেজি দুটি শব্দ Re + Source থেকে, এখানে Re মানে বারংবার এবং Source মানে উৎস। অর্থাৎ মানুষের চাহিদা যে যে উৎস থেকে বারংবার পূরণ করা হয় তাকে Resource বা সম্পদ বলে। আবার, সম্পদ কথাটির অভিধানিক অর্থ ঐশ্বর্য বা ধনসম্পত্তি। সাধারণভাবে সম্পদ বলতে মূল্যবান কোনো কিছুকে বোঝায়, যেমন—টাকা-পয়সা, সোনাদানা, জমি-বাড়ি ইত্যাদি। কিন্তু অর্থবিদ্যায় সম্পদ বলতে সেইসব উপাদানকে বোঝায়, যার নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি রয়েছে, যেমন—

1. যার উপযোগিতা আছে অথবা, যা মানুষের অভাব দূর করতে পারে।

2. যা সহজে পাওয়া যায় না, অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় কম পাওয়া যায়।
3. যার বিপণনযোগ্যতা আছে অর্থাৎ, বাজারে বিক্রি করা যেতে পারে, বা যার বিক্রয়মূল্য আছে।

অর্থনৈতিক ভূগোলে সম্পদের ধারণা: অর্থনৈতিক ভূগোলে বা সম্পদ শাস্ত্রে সম্পদের ধারণা ব্যাপক। এখানে বস্তু ও অবস্তু সব কিছুকেই সম্পদ বলা যায়, যদি তাদের দুটি গুণ— কার্যকারিতা এবং ও উপযোগিতা থাকে। কার্যকারিতা বলতে কাজ করার ক্ষমতাকে বোঝায়, অর্থাৎ কোনো উপাদানকে তখনই সম্পদ বলা হবে, যখন তার কাজ করার ক্ষমতা থাকবে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়— পেট্রোলিয়ামের কার্যকারিতা আছে, কারণ এটি আধুনিক যানবাহনের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের উল্লেখযোগ্য কাঁচামাল হিসেবে কাজ করে। মাটির গভীরে সঞ্চিত খনিজ দ্রব্য যতক্ষণ না মানুষের কাজে আসছে ততক্ষণ আমরা তাকে সম্পদ বলতে পারি না। কিন্তু সেই খনিজই যখন কারখানার শিল্পজাত দ্রব্য উৎপাদনের কাজে লাগে, অভাব মেটায় তখনই তা সম্পদে পরিণত হয়। কার্যকারিতাইন কোনো বস্তু সম্পদ নয়। যেমন— মরুভূমির বালি সম্পদ নয়, কারণ তা মানুষের অভাবপূরণে সাহায্য করে না। অর্থাৎ ওই বস্তুর কোনো কার্যকারিতা নেই। কিন্তু নদীর বালি ঘরবাড়ি নির্মাণের কাজে লাগে, তাই তা সম্পদ। সম্পদের এই বৈশিষ্ট্যের জন্য জিমারম্যান বলেছেন—“সম্পদের ধারণাটি পুরোপুরি কার্যকারিতা-নির্ভর, যা মানুষের চাহিদা ও যোগ্যতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য।"
অন্যদিকে, উপযোগিতা বলতে মানুষের অভাবমোচে ক্ষমতাকে বোঝায় অর্থাৎ মানুষের চাহিদা পূরণ করার ক্ষম বোঝায়। যেমন—সুর, পেট্রো লোহা, শিক্ষা, জ্ঞান, আইন প্রভৃতি উপাদানের উপরোলে অভাবপূরণের ক্ষমতা আছে। অর্থাৎ যে সম্পদের কার্যকারি যত বেশি হবে, সেই সম্পদ তত বেশি পরিমাণে মানুষের চা পূরণে সক্ষম হবে। অতএব সম্পদের কার্যকারিতা বাড়লে ত উপযোগিতা বাড়ে এবং কার্যকারিতা কমলে উপযোগিতাও পায়। সম্পদের কার্যকারিতা ও উপযোগিতা আন্তঃসম্পর্কযুক্ত। সম্পদ সৃষ্টি হয় প্রকৃতি, মানুষ ও সংস্কৃতি ঘাত-প্রতিঘাতে, এখানে মানুষ অনুঘটকের কাজ করে এবং প্রতি হল সম্পদ সৃষ্টির ভিত।

সম্পদের সংজ্ঞা

সম্পদের প্রকৃত সংজ্ঞা সম্পর্কে প্রথম আলোকপাত করেন বিশিষ্ট জার্মান সম্পদ শাস্ত্রকার জিমারম্যান (E. W. Zimmermann) | তাঁর লেখা 'World Resources and Industries' বইটিতে সম্পদের আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন—“সম্পদ কোনো বস্তু বা পদার্থ নয়। কোনো বস্তু বা পদার্থ যে কাজ করে বা কোনো বস্তু বা পদার্থের মধ্যে যে কার্যকারী শক্তি লুকিয়ে রয়েছে তাই হল সম্পদ। সম্পদ মানুষের অভাব মোচন করে। মানুষকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যপূরণে সাহায্য করে। মানুষের চাহিদা মেটায়।” অর্থাৎ সম্পদ হল বস্তু বা অবস্তুর কার্যকারিতা, যা মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক চাহিদা এবং উদ্দেশ্যপূরণের একটি মাধ্যম। সম্পদ হল মানুষের অর্থনৈতিক বিকাশের ভিত্তি।

Encyclopedia of the Social Sciences-এর একাদশ খণ্ডে বলা হয়েছে যে “সম্পদ হল মানুষের পরিবেশের সেই সমস্ত বিষয় যেগুলি মানুষের চাহিদা পূরণ ও সামাজিক উদ্দেশ্যসাধন করে অথবা উদ্দেশ্যসাধনে সাহায্য করে।”

সম্পদের এই দুটি সংজ্ঞা থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে, সম্পদ কোনো স্থূল বস্তু নয়। তাকেই সম্পদ বলা যায় যার কার্যকারিতা ও উপযোগিতা আছে এবং যা দিয়ে ব্যক্তি কিংবা সমাজের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।

সম্পদের সংজ্ঞাকে আরও অর্থবহ করেছে 1992 খ্রিস্টাব্দে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো শহরে অনুষ্ঠিত বসুন্ধরা সম্মেল (Earth Summit )। ওই সম্মেলনে সম্পদ সম্পর্কে বলা হয়—“যে-কোনো জিনিস যা মানুষের নির্দিষ্ট চাহিদা মেটানোর কাজে লাগে, শুধু তাই নয়, জীবমণ্ডলকে সংরক্ষণ করতেও সাহায্য করে, সেগুলিকে সম্পদ বলে গণ্য করা উচিত”। এখানে উল্লেখ্য, বসুন্ধরা সম্মেলনেই সর্বপ্রথম সম্পদের সঙ্গে জীবমণ্ডলের নিবিড় সম্পর্কের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আলোচ্য সংজ্ঞাটিকে সম্পদের পরিবেশভিত্তিক সংজ্ঞা বলা হয়।

সম্পদের প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য

যেসব বৈশিষ্ট্যের জন্য কোনো বস্তু বা অবস্তু সম্পদরূপে গণ্য হয়, সেগুলি হল

[1]কার্যকারিতা: কার্যকারিতা সম্পদের একটি প্রধান গুণ।এর ফলে সম্পদ পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে মানুষের চাহিদা বা অভাবপূরণ করে। সম্পদের কার্যকারিতা সম্পূর্ণ গতিশীল প্রকৃতির (Dynamic in nature)। প্রকৃতি, মানুষ ও সংস্কৃতির পারস্পরিক প্রভাবে সম্পদের কার্যকারিতা বদলে যায়। তাই | সম্পদের কার্যকারিতা পরিবর্তনশীল বা গতিশীল। দৈহিক শ্রম, ম্লান, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও কারিগরি দক্ষতার সাহায্যে প্রয়োজন মতো পরিবর্তন করে নতুন নতুন সম্পদ তৈরি করা হয়। আগে যেসব বস্তু সম্পদ বলে বিবেচিত হত না, সেগুলি আজ সম্পদে পরিণত হয়েছে। কিংবা আগে যেসব বস্তুর কার্যকারিতা কম ছিল, সেগুলি আজ মানুষের দক্ষতার গুণে কয়েক গুণ বেশি কার্যকরী হয়েছে। যেমন—নদীর জলের ব্যবহার ছিল সীমিত। কিন্তু প্রবহমান জলকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে ও সেচের কাজে লাগিয়ে নদীর কার্যকারিতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মানুষের সৃষ্ট সংস্কৃতির সৌজন্যে সম্পদে গতিশীলতা এসেছে।

[2] উপযোগিতা : সম্পদের অন্যতম দ্বিতীয় গুণটি হল এর উপযোগিতা অর্থাৎ, এটি মানুষের প্রয়োজন মেটায়, মানুষ | পরিতৃপ্তি লাভ করে। যেমন—এক গ্লাস ঠান্ডা জল গরমে তৃয়ার্ত ব্যক্তির যে প্রয়োজন মেটায় বা তাকে যে তৃপ্তি প্রদান করে, সেটাই হল জলের উপযোগিতা।

[3]বস্তুগত ও অবস্তুগত চরিত্র: সম্পদ পাওয়া যায় দুটি উৎস থেকে প্রকৃতি এবং মানুষ ও মানুষের সৃষ্ট সংস্কৃতি থেকে। প্রকৃতি থেকে যেসব সম্পদ পাওয়া যায়, সেগুলি সবই বস্তুগত সম্পদ। যেমন—গঙ্গা নদীর জল, রানিগঞ্জের কয়লা, দক্ষিণাত্যের কৃয় মৃত্তিকা প্রভৃতি। অন্যদিকে, মানুষ ও সংস্কৃতি যে গুণগত সম্পদের জন্ম দেয়, তাকে অবস্তুগত সম্পদ ल বল। যেমন—মানুষের প্রযুক্তিগত জ্ঞান, শ্রমিকের কর্মকুশলতা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি।
[4]সর্বজনীন চাহিদা : সম্পদের নিজস্ব গুণাবলির জন্য এর ব্যাপক বা সর্বজনীন চাহিদা আছে। যেমন জল, আলো, বাতাস, জ্বালানি খনিজ ইত্যাদি। আবার যেসব বস্তু মানুষের চাহিদা পূরণ করে না, যেগুলি সম্পদ বলে গণ্য হয় না।

[5] গ্রহণযোগ্যতা: সম্পদকে সকলে গ্রহণ করে—এটাই সম্পদের বিশেষত্ব। কিন্তু সব সম্পদ সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। জাতিধর্মের নিরিখে সম্পদের গ্রহণযোগ্যতার পরিবর্তন ঘটে। যেমন—হিন্দুদের কাছে গো-মাংস সম্পদ না হওয়ায় এর গ্রহণযোগ্যতা নেই।

[6] প্রয়োগযোগ্যতা : যে বস্তু বা দ্রব্য যত বেশি মানুষের চাহিদা পূরণে সক্ষম, সেই বস্তু বা দ্রব্য তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সেই সম্পদ থেকে তত বেশি পরিসেবা বা কাজ পাওয়া যায়। যেমন—14 ইঞ্চি রঙিন টিভির চেয়ে 30 ইঞ্চি রঙিন টিভির প্রয়োগযোগ্যতা বেশি কিংবা ডিজেল বিদ্যুতের চাইতে আণবিক বিদ্যুৎ থেকে অনেক বেশি কাজ পাওয়া যায়।

[7]পরিবেশ মিত্রতা: যেসব সম্পদ ব্যবহার করলে পরিবেশের ক্ষতি হয় না বা সামান্য ক্ষতি হয়, কিংবা বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট হয় না, তাকে পরিবেশমিত্র (Eco-Friendly) সম্পদ বলে। উদাহরণ—জলবিদ্যুৎ শক্তি, সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জোয়ারভাটা শক্তি ইত্যাদি।উপযোগিতা—একমুখী অথবা বহুমুখী হতে পারে।

[8]একমুখী ও বহুমুখী ব্যবহার: সম্পদের কার্যকারিতা ও পেট্রোলিয়ামকে যেমন জ্বালানির কাজে লাগানো যায়, আবার এদের থেকে বহু উপজাত দ্রব্যও পাওয়া যায়।

[9] সংকোচনশীলতা ও প্রসারণশীলতা: মানুষের জ্ঞানবুদ্ধি, কর্মকুশলতা প্রভৃতি সম্পদ সৃষ্টি করে। এগুলির উন্নতি ও বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সম্পদের প্রসার ঘটে। আবার এগুলির অভাবে সম্পদের সংকোচন ঘটে।

[10] সসীমতা: প্রকৃতিদত্ত সম্পদগুলি অসীম বা সীমাহীন (Unlimited) নয়। গচ্ছিত সম্পদগুলি (Fund Resources) সীমিত। যেমন—কয়লা, খনিজ তেল, ধাতব খনিজ ইত্যাদি। প্রবহমান সম্পদগুলিকে (Flow Resources) অফুরন্ত ধরা হলেও দীর্ঘকালের বিচারে এরা সীমাবদ্ধ। যেমন—বাতাস একটি প্রবহমান সম্পদ। কিন্তু বাতাস দূষিত হলে বিশুদ্ধ বাতাসের পরিমাণ কমে যায়।

সম্পদ সংরক্ষণ

বিধান প্রজন্মের চাহিদা পূরণ ও দীর্ঘস্থায়ী উন্নতির উদ্দেশ্যে | প্রফের সম্পদকে মিতব্যয়ীভাবে, যথোপযুক্তভাবে ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যবহার, অপচয়রোধ, রক্ষণাবেক্ষণ ও দূষণের কাল থেকে রক্ষা করাকে সম্পদ সংরক্ষণ বলে।

সংরক্ষণের উপায় বা পদ্ধতিসমূহ

সম্পদ সংরক্ষণের নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি বা উপায় নেই। সম্পদের চরিত্র অনুসারে তার সংরক্ষণ পদ্ধতি স্থির করা হয়। হল সংরক্ষণে যে পদ্ধতিগুলি প্রচলিত, সেগুলি হল
[1]প্রয়োজনভিত্তিক ব্যবহার: অতি মাত্রায় সম্পদ ব্যবহার কালে সম্পদের পরিমাণ খুব তাড়াতাড়ি কমে যায়। তাই প্রয়োজনভিত্তিক উৎপাদন ও ব্যবহার সম্পদের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি ।

[2] পরিবর্ত দ্রব্যের ব্যবহার : ক্ষয়িষ্ণু সম্পদের ব্যবহার কমিয়ে প্রবহমান সম্পদের ব্যবহার বাড়ালে সম্পদ সংরক্ষিত হয়। যেমন—বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার কমিয়ে জলস্রোত ব্যবহার করলে কয়লা সংরক্ষিত হবে।

[3] অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যবহার: যেভাবে ও যে কাজে সম্পদকে ব্যবহার করলে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার হবে, এইভাবে সম্পদকে ব্যবহার করা দরকার। যেমন—বিদ্যুৎ উৎপাদনে খনিজ তেল ব্যবহার না করে পরিবহণের কাজে বেবহার করলে খনিজ তেলের সাশ্রয় হয়।

[4]প্রযুক্তির সাহায্যে উৎকর্ষ বৃদ্ধি : কোনো বস্তু বা সম্পদের কার্যকারিতা বা উৎকর্ষ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে করানো সম্ভব। এভাবে সম্পদের আয়ুষ্কাল বাড়ে ও সম্পদ প্রকালীন মেয়াদে সংরক্ষিত হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, | চাটন ইস্পাত উৎপাদনে 2 টন আকরিক লোহা ব্যবহৃত হত। বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে 1 টন ইস্পাত উৎপাদনে। 1 টন আকরিক লোহা ব্যবহৃত হয়।

[5]অপচয় রোধ: সম্পদ উৎপাদন ও ব্যবহারের সময় অপচয় বন্ধ করা সম্ভব হলে সম্পদ সংরক্ষণের কাজ সহজ হয়।-অভ্র উত্তোলনের সময় লক্ষ রাখতে হবে যাতে তা ভেঙে না হয়।
[6] গুণর্ব্যবহার: একই বস্তু উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে বার বার ব্যবহার করলে সম্পদের সাশ্রয় ঘটে। যেমন—লোহা ও ইস্পাত শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে বর্জ্য লোহার ব্যবহার আকরিক লোহার সংরক্ষণে সাহায্য করে।

[7]কারিগরি উৎকর্ষ বৃদ্ধিঃ কারিগরি উৎকর্ষ বাড়লে কম কাচামাল দিয়ে বেশি পরিমাণ শিল্পদ্রব্য উৎপাদন করা সম্ভব। যেমন—পূর্বে প্রায় 4 টন কয়লা দিয়ে মাত্র 1 টন লোহা ও ইস্পাত উৎপাদন করা যেত, কিন্তু বর্তমানে উন্নত দেশগুলিতে মাত্র 1 টন কয়লা দিয়ে ৷ টন ইস্পাত উৎপাদন করা যায় বলে কয়লার সাশ্রয় 1 ঘটে।

[8] উৎপাদনের বিশেষীকরণ : উৎপাদনে বিশেষীকরণের জন্য শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে সম্পদের গুণগত মান ও স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পায়। এটি সম্পদ সংরক্ষণের সহায়ক।

[9] সম্পদের পুন: কিছু কিছু সম্পদ, যেগুলি পুরণশীল, সেগুলি ভোগের সঙ্গে সঙ্গে পুনরায় উৎপাদনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেমন—গাছ কাটার পাশাপাশি নতুন নতুন চারাগাছ রোপণ করলে, মাছ ধরার পাশাপাশি জলাশয়ে মাছ ছাড়লে, মাংসের জন্য প্রাণীহত্যার পাশাপাশি প্রাণী প্রজননের ব্যবস্থা করলে সম্পদের সংরক্ষণ হয়।

[10] সম্পদ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি: সম্পদ-সচেতনতা বাড়লে সম্পদের সংরক্ষণ ও উৎকর্ষ সাধিত হয়।

[11] সামাজিক প্রকল্প গ্রহণ: সামাজিক প্রকল্পগুলির মাধ্যমে সম্পদ সংরক্ষণ করা যায়। যেমন—অরণ্য সৃজন করলে একদিকে যেমন কাঠের জোগান বৃদ্ধি পায়, অন্য দিকে তেমনি ভূমিক্ষয়া বন্ধ হয়ে জমির উর্বরতা ও ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, খরা-প্রবণতা হ্রাস পায়।

[12] সরকারি নীতি: জাতীয় সম্পদ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে অনেক দেশ নিজস্ব সম্পদ কম ব্যবহার করে অন্য দেশ থেকে সম্পদ আমদানি করে। যেমন—আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর পরিমাণে খনিজ তেল সজ্জিত থাকা সত্ত্বেও ওই দেশ নিজস্ব ভাণ্ডার থেকে কম পরিমাণ খনিজ তেল উত্তোলন করে এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি থেকে খনিজ তেল আমদানি করে। এভাবে জাতীয় সম্পদের আয়ুষ্কাল কিছুটা বাড়লেও প্রকৃত অর্থে সম্পদ সংরক্ষিত হয় না।