Chapter-6, জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ

ভারতে কোনো ভারতীয় বিচারকের ইউরোপীয়দের বিচার করার অধিকার ছিল না। এই বৈষম্য দূর করার জন্য গভর্নর জেনারেল লর্ড রিপনের আইনসভার সদস্য সি. পি. ইলবার্ট একটি বিল উত্থাপন করেন এটি ইলবার্ট বিল নামে পরিচিত। এই বিলের মূল বিষয় ছিল ভারতীয় বিচারকরা ইউরোপীয়দেরও বিচার করতে পারবে।

জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পিছনে হিউমের ভূমিকাকে নিয়ে যে অতিকথন তৈরি হয়েছিল তা হল যে, হিউম জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। হিউম সম্পর্কে এই অতিকথনের জন্য দায়ী ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে একজন প্রাক্তন সিভিল সার্ভেন্ট উইলিয়ম ওয়েডারবার্নের লেখা হিউমের জীবনী। ওয়েডারবার্ন বলেছিলেন যে, হিউম ও বড়োলাট লর্ড ডাফরিনের উদ্যোগেই জাতীয় কংগ্রেসের সৃষ্টি হয়েছে।

হিউম ছিলেন একজন ইংরেজ সিভিল সার্ভেন্ট, তাঁর পুরো নাম অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউম। ডাফরিন ছিলেন ভারতের  অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউম-কে ‘জাতীয় কংগ্রেসের জনক’ বলা হয়।

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বিভিন্ন দুর্বলতা ছিল। যেমন-
1 কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দরা সকলেই ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত এবং সম্মানীয় পেশার সাথে যুক্ত। ফলে তাঁরা সমাজের নীচু তলার মানুষদের অভাব-অভিযোগ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন
2 বোম্বাই ছিল কংগ্রেসের কার্যাবলির প্রধান কেন্দ্রস্থল। ফলে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় চরিত্র নিয়ে সন্দেহ আছে।
3 উচ্চবর্ণের হিন্দু নেতারাই ছিল কংগ্রেসের মূল চালিকাশক্তি।

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম দিকের নেতারা যারা ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অনুগত থেকে আবেদন-নিবেদনের আন্দোলনে বিশ্বাস করতেন তাদের নরমপন্থী বলা হয়।
• কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, দাদাভাই
নৌরজি প্রমুখ। এদের কার্যক্রম বার্ষিক কেন্দ্রিক ছিল বলে ব্যঙ্গ করে তিন দিনের তামাশা' বলা হত।

কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতৃবৃন্দ ভারতে ব্রিটিশ শাসনের পক্ষে ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের ছত্রছায়ায় থেকে আংশিক স্বায়স্বশাসন ভোগ করা— এই ছিল নরমপন্থীদের মূল উদ্দেশ্য। পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তাঁরা জানাননি। তাই তারা শুধুমাত্র কিছু গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্যই সোচ্চার হন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে, ব্রিটিশরা নিশ্চয় তাঁদের দাবিগুলি মেনে নেবেন।

নরমপন্থীদের কোনো দাবিই ব্রিটিশ সরকার মেনে নেয়নি। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভাকে সম্প্রসারিত করা হয়নি। আয়-ব্যয়ের হিসেব নিয়েও আইনসভায় কোনো ভোট গ্রহণ করা হত না। এ ছাড়া ব্রিটিশ সরকার আইনসভার অনুমতি ছাড়াই যে-কোনো আইন চালু করতে পারত। নরমপন্থীদের অন্যান্য সব দাবির প্রতিও ব্রিটিশ সরকার নির্বিকার ছিল।

নরমপন্থীদের কার্যাবলি নানাভাবে সমালোচিত হয়েছিল কারণ-
1 প্রথম ২০ বছরে জমিদার শ্রেণি কংগ্রেসকে আর্থিক দিক থেকে সাহায্য করত। ফলে কৃষকদের স্বার্থ সম্পর্কিত প্রকৃত কোনো কর্মসূচি কংগ্রেস নেয়নি।
2 অপরদিকে, ব্যবসায়ী ও মহাজনদের স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে কংগ্রেস তার দাবিগুলি থেকে শ্রমিকশ্রেণির অভাব-অভিযোগকে দূরে রেখেছিল।
3 নরমপন্থী রাজনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণ প্রায় ছিল না।

নরমপন্থীরা ব্রিটিশ সরকারের কাছে দাবি-দাওয়া আদায়ে ব্যর্থ হলেও ভারতীয় রাজনীতিতে নরমপন্থীদের অবদান অস্বীকার করা যায় না। তাঁরা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন। উচ্চশিক্ষিত নরমপন্থীরা যুক্তিনির্ভর সাংবিধানিক রাজনীতির দ্বারা ভারতীয় সমাজে রাজনৈতিক আধুনিকতার জন্ম দিয়েছিলেন।

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্বের নেতৃবৃন্দ নরমপন্থা নামে পরিচিত। নরমপন্থীরা আবেদন-নিবেদন নীতিতে বিশ্বাস করতেন। নরমপন্থীদের বিরোধীরা যারা আবেদন-নিবেদনের বদলে নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলনে বিশ্বাস করতেন তাদের 'চরমপন্থী' বলা হয়।
• কংগ্রেস চরমপন্থী নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- লালা লাজপত রাই, বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ। এঁরা লাল-বাল-পাল নামে পরিচিত।

কংগ্রেসের নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যেকার দুটি মূল
পার্থক্য হল- নরমপন্থীরা ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আবেদন-নিবেদন নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। নরমপন্থীদের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনেরআওতায় থেকে আংশিক স্বশাসন ভোগ করা।
চরমপন্থীরা আবেদন নিবেদনের পরিবর্তে নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধে বিশ্বাসী ছিলেন। অর্থাৎ তাঁরা সরকারের অন্যায্য আইনগুলি অমান্য করে ব্রিটিশ সরকারের বিরোধিতা করার
পক্ষপাতী ছিলেন। চরমপন্থীদের লক্ষ্য ছিল স্বরাজ অর্জন। চরমপন্থী নেতা বিপিনচন্দ্র পালের মতে স্বরাজ মানে চূড়ান্ত স্বাধীনতা।

‘স্বরাজ’ সম্পর্কে বিভিন্ন চরমপন্থী নেতার বিভিন্ন মত ছিল। বিপিনচন্দ্র পালের মতে, স্বরাজ মানে চূড়ান্ত স্বাধীনতা। অরবিন্দ ঘোষও একই মত পোষণ করতেন। বাল গঙ্গাধর তিলক অবশ্য মনে করতেন যে, স্বরাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রশাসনকে ভারতীয় নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তবে বেশিরভাগ নেতাই ব্রিটিশ শাসনের মধ্যে থেকে স্বশাসনের অধিকারকেই স্বরাজ বলে মনে করতেন।

ভারতের ভাইসরয় লর্ড লিটন ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে দেশীয় মুদ্রন আইন বা দেশীয় ভাষা সংবাদপত্র আইন জারি করেন। ● এই আইনে বলা হয় যে দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রে ব্রিটিশ সরকারের বিরোধী কোনো লেখা প্রকাশ করা যাবে না। যদি দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত কোনো সংবাদপত্রে ব্রিটিশ সরকার বিরোধী বক্তব্য প্রকাশ ও প্রচার করা হয় তবে ওই সংবাদপত্রের ছাপাখানা বাজেয়াপ্ত হবে। • ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে লর্ড রিপন এই আইন প্রত্যাহার করেন।

ভারতের ভাইসরয় লর্ড লিটন ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে অস্ত্র আইন জারি করেন
● অস্ত্র আইনে বলা হয় যে, কোনো ভারতীয় আত্মরক্ষার জন্যও অস্ত্র রাখতে পারবে না। অন্যদিকে ইউরোপীয়রা তাদের প্রয়োজনে অস্ত্র রাখতে পারবে। অর্থাৎ অস্ত্র আইন ইউরোপীয়দের ক্ষেত্রেপ্রযোজ্য হবে না।
• লর্ড লিটন ভারতীয়দের ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপ বন্ধ করার জন্য অস্ত্র আইন জারি করেন।

১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে সারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিদের নিয়ে কলকাতায় একটি সম্মেলন আহুত হয়। এই সম্মেলনকে জাতীয় সম্মেলন বা ন্যাশনাল কনফারেন্স বলা হয়।
• এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলেন রামতনু লাহিড়ি।
• এই সম্মেলনে ভারতের সাংবিধানিক ও শাসনতান্ত্রিক বিভিন্ন দাবি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। ও পেশ করা হয়েছিল। জাতীয় সম্মেলনকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অগ্রদূত বলা হয়।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে যে জাতীয়তাবাদী নেতাগণ ভারতের অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য ব্রিটিশ সরকারকে দায়ী করে সমালোচনা করেছিলেন, তাদের এই বক্তব্য অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ বলে পরিচিত।
• ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতৃবৃন্দ অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের কথা প্রচার করেন।
• অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন দাদাভাই নৌরজি, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে, রমেশচন্দ্র দত্ত প্রমুখ।

প্রধানত বাংলা, মহারাষ্ট্র ও পাঞ্জাব – এই তিন অঞ্চলে চরমপন্থী আন্দোলনের বিকাশ ঘটে। 1 এই তিন অঞ্চলের তিন জন প্রধান নেতা ছিলেন পাঞ্জাবের লালা লাজপত রাই,
2 মহারাষ্ট্রের বাল গঙ্গাধর তিলক ও 3 বাংলার বিপিনচন্দ্র পাল। এঁদের তিন জনকে একসঙ্গে লাল-বাল-পাল বলে অভিহিত করা হত।
• লালা লাজপত রাই-এর সংগ্রামী চরিত্রের জন্য তাঁকে ‘পাঞ্জাব কেশরী' বলা হয়।
● বাল গঙ্গাধর তিলক ‘লোকমান্য’ নামেও পরিচিত।

১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে সুরাটে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন বসেছিল। ভারতের ইতিহাসে এই অধিবেশন বিভিন্ন দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
1  নরমপন্থী-চরমপন্থী বিচ্ছেদ : সুরাট অধিবেশনে কংগ্রেসের নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটেছিল।
2 জাতীয় আন্দোলনের ক্ষতি কংগ্রেসে নরমপন্থী ও চরমপন্থীরা দুই ভাগে ভাগ হওয়ার জন্য জাতীয় আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ভাইসরয় লর্ড কার্জন বাংলা প্রেসিডেন্সিকেদুভাগে ভাগ করেন। একে ‘বঙ্গভঙ্গ’ বলা হয়। বঙ্গভঙ্গের বা বাংলা ভাগের ফলে দুটি প্রদেশ গড়ে ওঠে। 1 পূর্ববঙ্গ ও আসাম, যাররাজধানী হল ঢাকা এবং ও বাংলা প্রদেশ, যার রাজধানী থাকলকলকাতা।
• ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়।

বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন প্রকৃত গণ আন্দোলন ছিল না।
কারণ-
1 নেতৃবৃন্দদের বেশিরভাগই ছিলেন শিক্ষিত ভদ্রলোক। ফলে তাঁরা সমাজের অন্যান্য শ্রেণির মানুষদের কথা ভাবতেন না।
2 বিদেশি দ্রব্যের তুলনায় স্বদেশি দ্রব্যের দাম ছিল বেশি। ফলে সমাজের দরিদ্র শ্রেণির মানুষ তা কিনতে না চাইলে তাদের উপর স্বদেশিরা জোরজুলুম করতেন।
3 স্বদেশি আন্দোলনে ধর্মীয় প্রতীক ও দেবদেবীর প্রসঙ্গ ব্যবহার করার ফলে অধিকাংশ মুসলিম ও বৈয়ব জনগণ আন্দোলনকে মন থেকে মেনে নিতে পারেনি।
4 শ্রমিক ধর্মঘটগুলিতে হিন্দুস্তানি শ্রমিক ও বাগিচা শ্রমিকরা যোগ দিতে পারতেন না।

জন মর্লে ছিলেন ভারত সচিব এবং লর্ড মিন্টো ছিলেন জন মলে।
ভারতের ভাইসরয় ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার যে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্ট পাশ করে তা মলে-মিন্টো সংস্কার আইন নামে। পরিচিত।
• উদ্দেশ্য : মলে-মিন্টো সংস্কার আইনের উদ্দেশ্য ছিল—
ভারতীয়দের প্রতি উদার মনোভাব দেখিয়ে নরমপন্থীদের কাছে লর্ড মিন্টো টেনে ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করা।

বিংশ শতকের প্রথম দিকে বাংলায় বিভিন্ন গুপ্ত সমিতি গড়ে উঠেছিল। এই গুপ্ত সমিতিগুলির মধ্যে বিখ্যাত ছিল অনুশীলন
সমিতি।
» গুপ্ত সমিতি গড়ে ওঠার কারণ :
১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে স্বদেশি আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ার ফলে বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী ধারা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদীরা ব্রিটিশ সরকারের হাত থেকে নিরাপদ দূরত্বে
থাকার জন্য গুপ্ত সমিতি গঠন করেছিল।
2 বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদীরা জনগণের জন্য প্রকাশ্য আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারেনি। ফলে তারা জনগণ থেকেও বিচ্ছিন্ন ছিল এবং গুপ্ত সমিতি গড়ে তুলেছিল।

ভারতের প্রথম পর্বের গুপ্ত বৈপ্লবিক কার্যকলাপ ব্যর্থ হয়েছিল, কারণ—
1 অধিকাংশ বিপ্লবী পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিল অথবা তাদের কার্যকলাপ ফাঁস হয়ে গিয়েছিল।
2 বিপ্লবীরা গোপনে কাজকর্ম করত বলে সামাজিক আন্দোলনের কর্মসূচি তারা গ্রহণ করতে পারেনি। ফলে তারা জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।

বাসুদেও বলবন্ত ফাদকে মহারাষ্ট্রে প্রথম গুপ্ত সমিতি গড়ে তুলেছিলেন। তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ডাকাতির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতেন। ফাদকে ব্রিটিশ সরকারের হাতে বন্দি হলে সশস্ত্র বিদ্রোহের পরিকল্পনাও ব্যর্থ হয়ে যায়। তবে তিনি ছিলেন ‘ভারতের বৈপ্লবিক জাতীয়তাবাদের জনক

বাংলায় বিপ্লবীদের মধ্যে যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনি ‘বাঘা যতীন’ নামে বেশি পরিচিত। বাঘা যতীন জার্মানি থেকে অস্ত্র এনে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সংঘর্ষের পরিকল্পনা করেন। উড়িষ্যার বালেশ্বরে বুড়িবালামের তীরে যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ইংরেজদের সাথে যুদ্ধে তিনি প্রাণ হারান। তাঁর শৌর্য-বীর্যের জন্যই তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

ভারতের ভাইসরয় লর্ড রিপন-এর আমলে ইলবার্ট বিল আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল।
* ইলবার্ট বিলের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কারণ : ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের ফৌজদারি আইনবিধি অনুসারে কোনো ভারতীয় দায়রা জজ বা ম্যাজিস্ট্রেট ইউরোপীয়দের বিচার করতে পারতেন। না। সমান যোগ্যতাসম্পন্ন ইউরোপীয় ও ভারতীয় বিচারকদের মধ্যে এই বৈষম্য দূর করার জন্য বড়োলটি লর্ড রিপন সচেষ্ট হয়েছিলেন।

লর্ড রিপন এই বৈষম্যমূলক সমস্যার সমাধানের জন্য আইনসচিব স্যার ইলবার্টের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন। ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে স্যার ইলবার্ট ইউরোপীয়দের বিশেষ সুবিধা প্রত্যাহার করে একটি আইনের খসড়া বা বিল তৈরি করেন। এটি 'ইলবার্ট বিল' নামে পরিচিত। । এই বিলের বিরুদ্ধে ইউরোপীয়রা আন্দোলন করেছিলেন।
ইলবার্ট বিলের খবর প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয়রা বড়োলাট লর্ড রিপন ও ভারতীয়দের তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে।
স্যার ইলবার কলকাতা হাইকোর্টের ব্যারিস্টার ব্রানসনের নেতৃত্বে 'ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন' প্রতিষ্ঠা করে ইউরোপীয়রা এই বিলের
করেছিল। কারণ ইউরোপীয়রা মনে করেছিল এই বিল তাঁদের আত্মমর্যাদায় আঘাত করেছে।

১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে বড়োলার্ট লর্ড রিপনের আইনসচিব ইলবার্ট বিচারব্যবস্থায় ইউরোপীয়দের করে একটি বিল বা আইনের খসড়া রচনা করেন। এটি ইলবার্ট বিল' নামে পরিচিত।
ইলবার্ট বিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন : ইলবার্ট বিলের খবর প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয়রা বড়োলাট লর্ড রিপন ও ভারতীয়দের তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে। তারা বলেন ‘রিপন হলেন জাতিশত্রু'। তাদের মতে, ভারতীয় বিচারকরা ইউরোপীয়দের বিচার করার অযোগ্য। তারা ইলবার্ট বিল প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য ব্রানসনের নেতৃত্বে ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন' প্রতিষ্ঠা করে আন্দোলন। পরিচালনা করেন।

• ইলবার্ট বিলের পক্ষে ভারতীয়দের আন্দোলন : এই বিলের পক্ষে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ভারতসভা প্রতি-আন্দোলন গড়ে তোলে। বিলের পক্ষে মিটিং মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।

• বিল প্রত্যাহার : ইউরোপীয়দের প্রতিবাদের চাপে ব্রিটিশ সরকার আসল বিল প্রত্যাহার করে। নেয়। পরিবর্তিত বিলে স্থির হয় যে, ভারতীয় বিচারকদের আদালতে বিচারপ্রার্থী যে-কোনো ইউরোপীয়। শ্বেতাঙ্গ জুরির সাহায্য নিতে পারবে।

গুরুত্বঃ ইলবার্ট বিল প্রত্যাহারের ঘটনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কারণ
1. এতে ভারতীয়রা বুঝতে পেরেছিল যে, ব্রিটিশরা ভারতীয়দের ঘৃণা করে। ফলে জাতিবিদ্বেষ আরও বৃদ্ধি পায়।
2 ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ছাড়া কোনো দাবি আদায় করা যে সম্ভব নয়, তাও ভারতীয়রা উপলব্ধি করে।

ভারতের বড়োলাট লর্ড রিপন-এর আমলে তাঁর আইনসচিব ইলবার্ট রচিত বিলকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন হয়েছিল তা ছিল বল আন্দোলন' নামে পরিচিত। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে ইলবার্ট বিল আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম।

গুরুত্ব : ইলবার্ট বিল আন্দোলনের গুরুত্ব হল—

1 ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি : এই আন্দোলনের ফলে ভারতীয়রা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা উপ করেছিল। কারণ, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফলে ইলবার্ট বিল, আন্দোলনে ইউরোপীয়রা সাফল্য লাভ করেছিল।

2 জাতিবিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ: ইউরোপীয়রা যে ভারতীয়দের সমমর্যাদা দিতে রাজি নয় তা আবার প্রকাশিত হয়েছিল। এর ফলে। ইউরোপীয় ও ভারতীয়দের মধ্যে জাতিবিদ্বেষ বৃদ্ধি পেয়েছিল।

3 ভারতীয়দের জাতীয়তাবোধের বিকাশ : ইলবার্ট বিল আন্দোলনের ফলে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবোধের বিকাশ ঘটেছিল।

4. আন্দোলন পরিচালনায় তহবিল গঠনের প্রয়োজনীয়তা: ইলবার্ট ইলবার্ট বিলের পক্ষে ভারতীয়দের আন্দোলন বিল আন্দোলন পরিচালনার জন্য ইংরেজরা প্রায় ১ লক্ষ টাকা। আন্দোলন পরিচালনা করতে শিখেছিল। সংগ্রহ করে আন্দোলন পরিচালনা করেছিল। এর থেকে ভারতীয়রা পরবর্তীকালে আন্দোলন পরিচালনায় অর্থ-তহবিল

ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার ইলবার্ট বিল আন্দোলনের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন, “ইলবার্ট বিল আন্দোলন ছিল
জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।”

১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দমোহন বসু, শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমুখের প্রচেষ্টায় কলকাতার এলবার্ট ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন' বা 'ভারতসভা' প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ভারতসভার প্রাণপুরুষ ছিলেন 'রাষ্ট্রগুরু' সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।
তাবাদের উন্মেষে ভারতসভা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ভারতসভা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য: ভারতসভা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল মূলত
হরেজ শাসনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জনমত গঠন করা। ভারতীয়দের গণ আন্দোলনে সামিল করা। পাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করা।
ভারতসভার আন্দোলন :

ভারতসভার দেশীয় ভাষা সংবাদপত্র আইন' ও 'অস্ত্র আইন'-এর বিরোধিতা করে এবং ইলবার্টল' সহ বহু জনস্বার্থ সম্পর্কিত বিষয়ের সমর্থনে আন্দোলন করে।
৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার্থীর বয়স ২১ বছর থেকে কমিয়ে ১৯ বছর করা হয়। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় রিতসভা এই পরীক্ষার্থীদের বয়স ২২ বছর করার জন্য দাবি জানায়। ইংল্যান্ড ও ভারতে একসঙ্গে পরীক্ষা গ্রহণের জন্যও দারি নানো হয়। রিতসভার আদর্শ প্রচার করার জন্য সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সমগ্র ভারতবর্ষে পরিভ্রমণ করেন। এ প্রসঙ্গে স্যার হেনরি কটন ন যে, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ঢাকা থেকে মুলতান পর্যন্ত যুবসমাজের মনে প্রেরণা জাগিয়েছিল।

১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দের ১৪ মার্চ ভারতের ভাইসরয় লর্ড লিটন ‘দেশীয় ভাষা সংবাদপত্র আইন' বা 'ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট' প্রবর্তন করেন। দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলি সরকারি নীতির সমালোচনা করছিল বলে, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করার জন্য এই আইন জারি করা হয়। একে শ্বাসরোধক আইন' বলেও চিহ্নিত করা হয়।

• আইনের বিষয়বস্তু ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট-এর বিনা হল— দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রে সরকারের স্বার্থবিরোধী কোনো লেখা প্রকাশ করলে এই পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক শাস্তি। পাবেন এবং ছাপাখানা বাজেয়াপ্ত করা হবে।

• ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট প্রবর্তনের কারণ। তৎকালীন সংবাদপত্রগুলি লর্ড লিটনের শাসনকালে ভারতের আর্থিক দুর্গতি, দাক্ষিণাত্যের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে জনগণের দুর্দশা, দুর্ভিক্ষ তহবিলের অর্থ আফগানিস্তানের যুদ্ধে ব্যয়, মহারানি ভিক্টোরিয়াকে 'ভারতেশ্বরী' খেতাব প্রদানে প্রচুর অর্থ ব্যয় প্রভৃতির তীব্র সমালোচনা করেছিল। এমতাবস্থায় লর্ড লিটন সংবাদপত্রগুলির কণ্ঠরোধ করার জন্য এই আইন প্রবর্তন করেন।

• আইনের প্রয়োগ : এই আইনের ফলে সোমপ্রকাশ’, ‘সহচর' প্রভৃতি পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হয়। ইংরেজি-বাংলা দ্বিভাষী সাপ্তাহিক ‘অমৃতবাজার পত্রিকা'-র বাংলা প্রকাশন বন্ধ হয়ে যায় ৷

• ভারতীয়দের প্রতিক্রিয়া এই আইনের বিরুদ্ধে বহু প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ভারতসভা' সক্রিয় বিরোধিতা করে। ভারতসভার উদ্যোগে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রতিবাদপত্র পাঠানো হয়।

পরিশেষে বলা যায়, ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট ভারতের জাতীয় জাগরণে বিশেষ সহায়ক হয়। ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি লর্ড রিপন এই আইন প্রত্যাহার করে নেন।

১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাই শহরে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে স্বাধীনতালাভ পর্যন্ত (১৮৮৫-১৯৪৭)খ্রি.) জাতীয় কংগ্রেস ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ভরকেন্দ্র। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। এই উদ্দেশ্যগুলিকে আমরা দু-ভাগে ভাগ করে আলোচনা করতে পারি।

জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য
1 ভারতীয় নেতৃবৃন্দের উদ্দেশ্য
2 ইংরেজদের উদ্দেশ্য
1 হিউমের উদ্দেশ্য (সেফটি ভালব তত্ত্ব)
2 লর্ড ডাফরিনের উদ্দেশ্য

● ভারতীয় নেতৃবৃন্দের উদ্দেশ্য: জাতীয় কংগ্রেস কী উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে তা জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেন- © ভারতীয় বিভিন্ন অঞ্চলের দেশপ্রেমিক নেতা-কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করা, জাতি, ধর্ম, ভাষা ও প্রাদেশিকতার ঊর্ধ্বে উঠে ভারতীয়দের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা, ভারতের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক সমস্যাগুলি সমাধানের উপায় নির্ধারণ করা, @ ভারতীয়দের রাজনৈতিক অগ্রগতির কর্মসূচি গ্রহণ করা।

ইংরেজদের উদ্দেশ্য : হিউমের উদ্দেশ্য- O হিউমকে 'জাতীয় কংগ্রেসের জনক' বলা হয়। জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায়

হিউমের উদ্দেশ্য ছিল— জাতীয় কংগ্রেসের মাধ্যমে ভারতীয়দের ক্ষোভের নির্গমন ঘটানো বা সেফটি ভাল্‌ব তত্ত্ব, ও শিক্ষিত ভারতীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে ভারতীয়দের সমস্যার সমাধান করা।

লর্ড ডাফরিনের উদ্দেশ্য: ভারতের বড়োলার্ট লর্ড ডাফরিনের উদ্দেশ্য ছিল -- 0 জাতীয় কংগ্রেসের মাধ্যমে ভারতীয়দের সমস্যা সম্পর্কে অবহিত হওয়া, @ ব্রিটিশ অনুগতদের কাছে টেনে বিরোধীদের দুর্বল করা।

জাতীয়তাবাদী ভারতীয়দের রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত পরিণতি হল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর বোম্বাইয়ের গোকুলদাস তেজপাল সংস্কৃত কলেজে ৭২ জন প্রতিনিধি নিয়ে জাতীয় কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক উদবোধন হয়। এই সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন প্রখ্যাত ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। অতঃপর ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন কংগ্রেসের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় এবং তা স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। • জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য

• ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন। জনগণের বিভিন্ন দাবি সম্মিলিতভাবে সরকারের কাছে পেশ করা।

ও জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে মতামত: জাতীয় কংগ্রেসের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। বিভিন্ন মতামতগুলি হল—

1 ড. পট্টভি সীতারামাইয়ার মত : বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী, জাতীয় কংগ্রেসের ইতিহাস প্রণেতা ড পট্টভি সীতারামাইয়া বলেছেন যে, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ সিভিলিয়ান অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউম বড়োলাট লর্ড ডাফরিনের পরামর্শে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন।
2 উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত : জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত সীতারামাইয়ার সমতুল তিনিও মনে করেন হিউম ডাফরিনের প্রস্তাবে জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
• হিউমের ভূমিকা : অবসরপ্রাপ্ত ইংরেজ সিভিলিয়ন অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউম জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বলে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি অভিমত প্রকাশ করেছেন।

• হিউমের উদ্দেশ্য বা সেফটি ভাল্ভ তত্ত্ব - হিউম লিখেছেন, “আমাদের কাজের জন্য ভারতীয়দের মনে যে ব্রিটিশ-বিদ্বেষ পুঞ্জীভূত হয়েছে তার নির্গমনের জন্য একটি 'নিরাপত্তা মুখ' বা 'সেফটি ভাল্‌ব' (Safety Valve) প্রয়োজন এবং এ কাজে কংগ্রেস সবথেকে উপযোগী হতে পারে।” অর্থাৎ হিউম শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে মৃদু রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে প্রকৃত গণবিদ্রোহ

থেকে সরিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন।

3 ঐতিহাসিক বিপানচন্দ্রের মতামত: ঐতিহাসিক বিপানচন্দ্র লিখেছেন, “১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না।” ঊনবিংশ শতকের ছয় ও সাতের দশকে যে রাজনৈতিক জাগরণের সূচনা হ আটের দশকে তা একটি নির্দিষ্ট রূপ নিয়ে জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা করে।

উপসংহার: ভারতের ইতিহাসে জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে একটি সাংগঠনিক কাঠামোর প্রতিষ্ঠিত করেছিল। পরবর্তীকালে এই জাতীয় কংগ্রেস ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছিল।

জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে হিউমের ভূমিকার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ : উইলিয়ম ওয়েডারবার্ন হিউমের জীবনীগ্রন্থে বলেছেন যে, হিউমের উদ্যোগেই জাতীয় কংগ্রেস সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁর এই তত্ত্ব নেকে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার অতিকথন বলে মনে করেন। তবে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় হিউমের ভূমিকা ছিল না তা নয়।
প্রথমত হিউম ছিলেন উদারমনা। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে উঠুক যা ভারতীয়দের স্বার্থ রক্ষা করবে।
দ্বিতীয়ত । তখন ভারতীয়দের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধিতার প্রবণতা বেড়েছিল। নানা ঘটনার মধ্যে তার প্রকাশও ঘটেছিল। হিউম ছাড়া জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা :
হিউম যদি উদ্যোগ নাও নিতেন তবু জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা হত বা জাতীয় কংগ্রেসের মতো একটি সংগঠন গড়ে উঠত। কারণ এই রকম একটি রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠার পটভূমি আগে থেকে তৈরি হয়েছিল। প্রথমত : কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ শহরের শিক্ষিত ভারতীয়রা নানা রাজনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং তাঁরা একজোট হওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছিলেন।

দ্বিতীয়ত: ১৮৬৭ থেকে ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নানা প্রকার প্রতিবাদ। আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল। সরকারের আয়করনীতি, বৈষম্যমূলক ভায়-ব্যয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আইন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানে ভারতীয়দের মর্যাদা বৃদ্ধি প্রভৃতি বিষয়ে একজোট হয়ে আন্দোলন করেছিল।

তৃতীয়ত: তখন ব্রিটিশ বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন আঞ্চলিক বোধ পেরিয়ে অনেক বেশি জাতীয় বোধে উন্নীত হয়েছিল। তখনকার প্রতিবাদ আন্দোলনগুলি প্রধান প্রেসিডেন্সি শহরগুলির গণ্ডি ছাড়িয়ে পাটনা, কানপুর, আলিগড়, অমৃতসর, লাহোর প্রভৃতি প্রাদেশিক শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল।

১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে ২৮-৩০ ডিসেম্বর ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। বোম্বাই শহরে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

» ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্বের নেতৃবৃন্দের মধ্যে যাঁরা ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে শান্তিপূর্ণভাবে আবেদন-নিবেদন নীতির মাধ্যমে দেশবাসীর জন্য অধিকার আদায়ের পক্ষপাতী ছিলেন, তাদের নরমপন্থী' বলা হয়।

নরমপন্থী নেতৃবৃন্দ : দাদাভাই নৌরজি, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, মদনমোহন মালব্য, আনন্দমোহন বসু, মহাদের গোবিন্দ রানাডে প্রমুখ নরমপন্থী নেতা নামে পরিচিত।

* নরমপন্থী বলার কারণ : কংগ্রেসের প্রথম পর্বের নেতৃবৃন্দকে 'নরমপন্থী' বলা হয়, কারণ— 1 এই সময়ের কংগ্রেস নেতারা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলনের পক্ষপাতী ছিলেন। না।

2 তাঁরা ইংরেজদের সততা, ন্যায়বিচারের আদর্শ এবং সাংবিধানিক পদ্ধতির প্রতি আস্থাবান ছিলেন। পাশ্চাত্য শিক্ষা ও ইউরোপীয় জ্ঞানভাণ্ডার তাদের আদর্শ ও প্রেরণার উৎস ছিল। ভারতে ইংরেজ শাসনকে তারা মঙ্গলজনক বলে মনে করতেন।
3 কংগ্রেস নেতাদের উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করা এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সংস্কারসাধনের চেষ্টা করা ভারত থেকে ইংরেজ শাসন উচ্ছেদ করা নয়।

১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর বোম্বাই শহরের গোকুলদাস তেজপাল কলেজের হলঘরে ৭২ জন সদস্য নিয়ে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এই প্রথম অধিবেশনের (২৮-৩০ ডিসেম্বর ১৮৮৫ খ্রি.) সভাপতি ছিলেন কলকাতার বিশিষ্ট আইনজীবী উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৮৮৫-১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রথম ২০ বছরে প্রতিবছর ভারতের বিভিন্ন শহরে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন বসেছিল। কংগ্রেসের প্রথম ২০ বছরের কার্যাবলি মূলত সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা এবং সাংবিধানিক প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও নাগরিক অধিকার-সংক্রান্ত দাবি পেশ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কার্যাবলি : নরমপন্থী নেতৃগণ ও আবেদন-নিবেদন নীতি কংগ্রেসের প্রথম পর্বের নেতাগণ বিশ্বাস করতেন যে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী।

ইংরেজরা ভারতীয়দের ন্যায্য দাবি অবশ্যই মেনে নেবে। তাই দাবি আদায়ের জন্য তাঁরা ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সংঘাতের পক্ষপাতী ছিলেন। কংগ্রেসের প্রথম বা আদিপর্বের নেতারা 'নরমপন্থী' (Moderate) নামে পরিচিত ছিলেন। তাদের আন্দোলন 'আবেদন-নিবেদন'-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কয়েকজন নরমপন্থী নেতা প্রথম পর্বের কয়েকজন উল্লেখযোগ্য নরমপন্থী নেতা হলেন- উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, দাদাভাই নৌরজি, বদরুদ্দিন তৈয়াবজি, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ।

[1] সাংবিধানিক দাবি : কংগ্রেসের রাজনৈতিক দাবির মূললক্ষ্য ছিল শাসন পরিচালনায় ভারতীয়দের হাতে অধিক ক্ষমতা আদায়। এই প্রসঙ্গে কংগ্রেসের দাবিগুলি ছিল—

• ভারত-সচিবের কাউন্সিলের বিলুপ্তি ঘটানো,

• প্রতি প্রদেশ থেকে অন্তত দুজন করে ভারতীয় প্রতিনিধি ব্রিটিশ কমন্সসভায় গ্রহণ, বাৎসরিক ব্যয়বরাদ্দ প্রাদেশিক আইন পরিষদে পেশ করা এবং বাজেট নিয়ে বিতর্ক করা।

2 প্রশাসনিক দাবি প্রশাসনের ভারতীয়করণ' করার উদ্দেশ্য নিয়ে জাতীয় কংগ্রেস দাবি। করেছিল ইংল্যান্ড ও ভারতে একই সঙ্গে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা গ্রহণ, সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার্থীর বয়সের ঊর্ধ্বসীমা ২১ বছর করা, শাসনবিভাগ থেকে বিচারবিভাগকে আলাদা করা প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগে অধিক সংখ্যক ভারতীয় নিয়োগ করা প্রভৃতি।
3 অর্থনৈতিক দাবি কংগ্রেস নেতারা মনে করতেন ভারতীয়দের ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্যের মূল কারণ ব্রিটিশ সরকারের অর্থনৈতিক শোষণ। জাতীয়তাবাদী অর্থনীতিবিদগণ সম্পদ নিষ্কাশন তত্ত্ব' (Drain Theory) দিয়ে বুঝিয়েছেন যে, ভারতের সম্পদ নির্গমনের ফলে ভার দরিদ্র এবং ইংল্যান্ড সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হয়েছে। কংগ্রেস নেতাদের অর্থনৈতিক দাবি ছিল দেশীয় শিল্পের সংরক্ষণ বিদেশি দ্রব্যের ওপর শুল্ক আরোপ, ভূমি ও আয়কর হ্রাস, বন সংরক্ষণ ও আদিবাসীদের ক্ষেত্রে আইনের সরলীকরণ প্রভৃতি। এজন্য বলা হয় কংগ্রেসী নেতারা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে 'নরমপন্থী' হলেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যথেষ্ট চরমপন্থী ছিলেন।
4 নাগরিক অধিকার-সংক্রান্ত দাবি কংগ্রেস নেতাদের নাগরিক অধিকার-সংক্রান্ত দাবিগুলি ছিল— মত প্রকাশের ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, দমনমূলক আইন প্রত্যাহার, প্রাথমিক, উচ্চ ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার, জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে উন্নত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রভৃতি।

প্রথম পর্বের কংগ্রেসের কার্যাবলির মধ্যে ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বলা যায় যে, কংগ্রেস জাতীয় ঐক্য ও জাতীয় চেতনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ড রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন, “কংগ্রেস সদাজাগ্রত প্রহরীর মতো জাতীয় স্বার্থের প্রতি লক্ষ রেখেছিল"। পরবর্তীকালে এই কংগ্রেস নরমপন্থী মোড়ক থেকে বেরিয়ে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল।

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্যের জন্য দুটি গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছিল — নরমপন্থী ও চরমপন্দী। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। তার পরবর্তীকালে শাসক ইংরেজদের কাছ থেকে দাবি আদায়ের মত ও পথ (পদ্ধতি) নিয়ে কংগ্রেস সদস্যদের মধ্যে বিরোধের ফলে নরমপন্থী ও চরমপন্থী গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছিল। নরমপন্থী : ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্বের (১৮৮৫-১৯০৫ খ্রি.) নেতৃবৃন্দের মধ্যে যাঁরা ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন-নিবেদন নীতির মাধ্যমে দাবিদাওয়া আদায়ের পক্ষপাতী ছিলেন তাঁদের নরমপন্থী বলা হয়। ৬ নেতা। কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন- উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, দাদাভাই নৌরজি, বদরুদ্দিন।

তৈয়াৰজি, গোপালকৃষ্ণ গোখলে, ফিরাজশাহ মেহতা প্রমুখ। উদ্দেশ্য : কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতাদের উদ্দেশ্য ছিল - O জাতি, ধর্ম, ভাষা, প্রাদেশিকতার ঊর্ধ্বে উঠে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবোধ গড়ে তোলা, @ সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকারের শোষণ ও অপশাসনের চরিত্র জনগণের কাছে উন্মোচন করা। চরমপন্থী : নরমপন্থী নেতাদের আবেদন-নিবেদন নীতির ব্যর্থতা ও কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কংগ্রেসেরই একদল নেতা প্রতিবাদ করেন।

ভারতের স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ গড়ে তোলার পক্ষপাতী ছিলেন। কংগ্রেসের এই গোষ্ঠী চরমপন্থী নামে পরিচিত।

নেতা : কংগ্রেসের চরমপন্থী নেতারা হলেন— লালা লাজপত রাই, বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ।
উদ্দেশ্য : কংগ্রেসের চরমপন্থী নেতাদের উদ্দেশ্য ছিল স্বদেশি, বয়কট-সহ সক্রিয় আন্দোলন করা, @ পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করা।

ভারতের জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ ভারতের আর্থিক দুরবস্থার জন্য ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন একে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ বলা হয়। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন দাদাভাই নৌরজি, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে, রমেশচন্দ্ৰ দত্ত প্রমুখ।

» অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের মূল কথা: অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের মূল কথা হল— • ভারত ব্রিটেনের কাঁচামাল সংগ্রহের ভূমিতে পরিণত হয়েছে। ব্রিটিশরা বিভিন্নভাবে ব্রিটেনের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের চাষ করতে চাষিদের বাধ্য করে।আবার ব্রিটেনে তৈরি প্রবাগুলি বিক্রির জন্য ভারতের বাজারকে ঔপনিবেশিক সরকার ব্যবহার করে। অর্থাৎ ভারতের অর্থনীতিতে ব্রিটেনের অর্থনেতিক স্বার্থেই ব্যবহার করা হয়। ফলে ভারতের সম্পদ বিদেশে চলে যায়। কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতারা একেই সম্পদের নির্গমন বলেছেন।

সম্পদের নির্গমনের ফলে ভারতের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে পড়েছে।

» অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ ও বয়কট স্বদেশি আন্দোলনের যোগাযোগ : অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বয়কট স্বদেশি আন্দোলনের যোগাযোগ ছিল। তাই
[1] বয়কট ও স্বদেশি আন্দোলনে দেশের সম্পদ যাতে বিদেশিদের হাতে না যায় তার জন্য বিদেশি দ্রব্য বয়কট করা হয়।

[ 2 বিদেশি দ্রব্য বয়কট করার ফলে ভারতীয়দের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের যে চাহিদা তৈরি হয় তার জোগান দেওয়ার জন্য স্বদেশে দ্রব্য। উৎপাদন করার উপর জোর দেওয়া হয়। আন্দোলনকারীরা বয়কট ও স্বদেশি আন্দোলনের মাধ্যমে সম্পদের নির্গমন বন্ধ করতে সচেষ্ট হয়েছিল।

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্বের নরমপন্থী নেতৃবৃন্দ ব্রিটিশ সরকারের মহানুভবতার প্রতি আস্থাবান ছিলেন এবং আবেদন-নিবেদন নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু তাঁদের আবেদন নিবেদন নীতি ব্যর্থ হলে ভারতীয় রাজনীতিতে চরমপন্থী মতবাদের উদ্ভবের পটভূমি রচিত হয়। ভারতীয় রাজনীতিতে চরমপন্থার উদ্ভবের কারণগুলি হল

1 নরমপন্থী নেতাদের আবেদন নিবেদন নীতির ব্যর্থতা - কংগ্রেসের প্রথম পর্বের নেতারা ইংরেজ সরকারের শুভবুদ্ধি ও ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থাবান ছিলেন। তাঁরা বিভিন্ন অধিকার আদায়ের জন্য আবেদন-নিবেদন নীতির পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার নরমপন্থীদের সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছিল। তাদের এই আবেদন-নিবেদন নীতির ব্যর্থতায় কংগ্রেসের তরুণ নেতারা হতাশায় পড়ে এবং বলিষ্ঠ কর্মপন্থা নিয়ে চরমপন্থী আন্দোলনের পথে পা বাড়ায়।

2 লর্ড কার্জনের প্রতিক্রিয়াশীল নীতি ও বলাতলা : সাম্রাজ্যবাদী বড়োলাট লর্ড কার্জনের প্রতিক্রিয়াশীল নীতি চরমপন্থী মতবাদের উদ্ভবের প্রত্যক্ষ কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। লর্ড কার্জন ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা পৌরসভা আইন, ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস করে ভারতীয়দের স্বায়ত্তশাসন ও শিক্ষার অধিকার খর্ব করেন।
সর্বোপরি ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকরী করলে দেশবাসীর ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করে এবং চরমপন্থী মতবাদের উদ্ভব হয়।

3 কংগ্রেসের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ ও ক্ষমতা দখলের লড়াই: কেম্‌ব্রিজ ঐতিহাসিকদের মতে, চরমপন্থী মতবাদের উদ্ভবের কারণ হল কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও ক্ষমতা দখলের লড়াই। তাঁরা বলেছেন যে, লাজপত রাই, বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিনচন্দ্র পাল, চিদাম্বরম পিল্লাই প্রমুখরা কংগ্রেসের প্রতিপক্ষ গোষ্ঠীকে ক্ষমতাচ্যুত করতে না পেরে চরমপন্থা গ্রহণ করেছিলেন। ড. সুমিত সরকার বলেছেন যে, কংগ্রেসের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বা বিরোধ ছিল কিন্তু তা ছিল সম্পূর্ণ আদর্শগত বিরোধ।

4 নেতৃবৃন্দের প্রভাব : কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দের মধ্যে চরমপন্থী মতবাদের উদ্ভব ও বিকাশে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন পাঞ্জাবের লালা লাজপত রাই, মহারাষ্ট্রের বাল গঙ্গাধর তিলক, বাংলার বিপিনচন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ প্রমুখ। তিলক দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, “স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার এবং আমি তা অর্জন করবই” (“Swaraj is my birth right and I must have it.”)। তাঁদের প্রচার এবং সম্পাদিত পত্রিকাগুলি জনমত গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল।

পরিশেষে বলা যায়, নরমপন্থীদের বিরোধিতা করে চরমপন্থী মতবাদের উদ্ভব হলেও চরমপন্থীরাও বিশেষ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। চরমপন্থীদের আবেগ, সাহস ও দৃঢ়তা থাকলেও তাঁরা কংগ্রেসে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। তবে এই ব্যর্থতা সত্ত্বেও তাঁরা ভারতের জাতীয় আন্দোলনে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিল। তাঁরা দেশবাসীকে আপসহীন সংগ্রামের পথ দেখিয়েছিল।

চরমপন্থী আন্দোলনের মূল বক্তব্য :

- স্বরাজ অর্জন করা : চরমপন্থীদের মূল বক্তব্য ছিল স্বরাজ অর্জন করা। স্বরাজ বিষয়ে তাদের মধ্যে বিভিন্ন ধারণা থাকলেও অনেকে মনে করতেন স্বরাজ মানে চূড়ান্ত স্বাধীনতা।

= নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলন করা চরমপন্থীরা আবেদন-নিবেদন। নীতির বদলে নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলনে বিশ্বাস করত। তাঁরা ঔপনিবেশিক সরকারের অন্যায্য আইনগুলি অমান্য করে ব্রিটিশ সরকারের বিরোধিতা করার পক্ষপাতী ছিলেন।

ভারতের ঐতিহাসিক ব্যক্তি ও পৌরাণিক চরিত্রকে জাতীয় আদর্শ । নিম্ন বলে তুলে ধরা । চরমপন্থীরা ভারতের ঐতিহাসিক ব্যক্তি ও পৌরাণিক চরিত্রগুলিকে জাতীয় আদর্শ হিসেবে তুলে ধরেন। এজন্য তিলক মহারাষ্ট্রে 'শিবাজি উৎসব' চালু করেন।

চরমপন্থী আন্দোলনে ধর্মীয় প্রতীকের ব্যবহার:

• চরমপন্থীরা ঔপনিবেশিক শাসনের সার্বিক বিরোধিতা করার।

নির্বিচারে ভারতের অতীত ইতিহাসের বিখ্যাত ব্যক্তি ও পৌরাণিক

রিত্রকে আদর্শ বলে প্রচার করেন। এজন্য তিলক শিবাজি উৎসব গণপতি উৎসবের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তারা ভারতীয় তিহাসের সবকিছুকেই গৌরবময় বলে প্রচার করতেন। এক্ষেত্রে রা মূলত হিন্দুদের গুনকীর্তন করতেন। হিন্দুদের ধ্যানধারণাকেই তাঁরা জাতীয় ধারণা বলে প্রচার করতেন। ভারত বহু ধর্মের দেশ। জাতীয় -গ্রেস একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল। তাই জাতীয় কংগ্রেসের চরমপন্থী নেতাদের বিশেষ কোনো ধর্মীয় প্রতীককে ব্যবহার যুক্তিযুক্ত নয়।