Chapter-6, মহুয়ার দেশ

সমর সেনের 'মহুয়ার দেশ' কবিতায় অলস সূর্য সন্ধ্যার জলস্রোতে এঁকে দেয়।

সমর সেনের 'ডুয়ার দেশ' কবিতায় সন্ধ্যার অন্তগামী সূর্য দিনের কাজ শেষ করে বিশ্রামের অপেক্ষায় থাকে বলে তাকে অলস বলা হয়েছে।

সমর সেনের 'মহুয়ার দেশ' কবিতায় জলের অন্ধকারে ধূসর ফেনায় আগুন লাগে।

সমর সেনের 'মহুয়ার দেশ' কবিতায় জলের অন্ধকারে ধূসর ফেনা অস্তগামী সূর্যের আলোয় লাল হয়ে ওঠে, দেখে মনে হয় আগুন লেগেছে।

সমর সেনের ‘মহুয়ার দেশ” কবিতায় অস্তগামী সূর্যের আলোয় জলের অন্ধকারে ধূসর ফেনায় যে আগুন লাগে, 'উজ্জ্বল স্তব্ধতা' বলতে তার কথাই বোঝানো হয়েছে।

একদিকে সূর্যের অন্ত যাওয়া অন্ধকারের আগমন ঘটিয়ে স্তব্ধতা এনেছে, অন্যদিকে তার রক্তিম আভা সৃষ্টি করেছে উজ্জ্বলতা—এ কারণেই 'উজ্জ্বল স্তব্ধতা' বলা হয়েছে।

সমর সেনের 'মহুয়ার দেশ' কবিতায় উজ্জ্বল মুগ্ধতায় ধোঁয়ার বঙ্কিম নিশ্বাস শীতের দুঃস্বপ্নের মতো ঘুরে-ফিরে ঘরে আসে ।

সমর সেনের 'মহুয়ার দেশ' কবিতায় 'ধোঁয়ার বঙ্কিম নিঃশ্বাস' তার দূষণকে বোঝানো হয়েছে।

সমর সেনের "মহুয়ার দেশ' কবিতায় 'ধোঁয়ার বঙ্কিম নিঃশ্বাস' কবির কাছে শীতের দুঃস্বপ্নের মতো ঘুরে-ফিরে আসে।

সমর সেনের 'মহুয়ার দেশ' কবিতায় 'ধোঁয়ার বঙ্কিম নিঃশ্বাস' অর্থাৎ শিল্পসভ্যতার দূষণের ঘুরে-ফিরে আসার কথা বলা হয়েছে।

সমর সেনের মছুয়ার দেশ' কবিতায় 'ধোঁয়ার বঙ্কিম নিঃশ্বাস' শীতের দুঃস্বপ্নের মতো ঘুরে-ফিরে আসে।

ধোঁয়ার বঙ্কিম নিশ্বাস শীতের দুঃস্বপ্নের মতো নেমে আসে।

কবি সমর সেন ধোয়ার বঙ্কিম নিশ্বাসকে শীতের দুঃস্বপ্ন বলেছেন ।

সমর সেনের 'মহুয়ার দেশ' কবিতায় মেঘমদির মহুয়ার দেশ অনেক দূরে আছে।

‘মহুয়ার দেশ' কবিতায় অনেক দূরে মহুয়ার দেশে পথের দু-ধারে দেবদারুর দীর্ঘ রহস্য ছায়া ফেলে। দূর সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাস রাতের নির্জন নিঃসঙ্গতাকে আলোড়িত করে।

মেঘমদির মছুয়ার দেশ কবির কাছে নাগরিক ক্লান্তি থেকে মুক্তির আশ্রয় হিসেবে উপলব্ধ হয়েছিল।

'মহুয়ার দেশ' কবিতায় কবি নিজেকে নগরজীবনের ক্লান্ত মানুষের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন।

সমর সেনের 'মহুয়ার দেশ' কবিতায় 'সেখানে' বলতে মহুয়ার দেশে পথের দু-ধারকে বোঝানো হয়েছে।

সমর সেনের "মহুয়ার দেশ' কবিতায় মহুয়ার দেশে সারাক্ষণ পথের দু ধারে দেবদারু গাছের দীর্ঘ রহস্য ছায়া ফেলে।

'সেখানে' বলতে মেঘমদির মহুয়ার দেশের কথা অর্থাৎ সাঁওতাল পরগনার কথা বলা হয়েছে।

সমর সেনের 'মহুয়ার দেশ' কবিতায় 'দেবদারুর দীর্ঘ রহস্য' বলতে দেবদারু গাছের দীর্ঘ ছায়াময় বিস্তারকে বোঝানো হয়েছে।

টাকি হাউস গভঃ স্পনসর্ড গার্লস হাই স্কুল ] উত্তর: কবি সমর সেন 'মহুয়ার দেশ' কবিতায় সুদূর মছুয়ার দেশে পথের দু ধারে 'দেবদারুর দীর্ঘ রহস্য" এর বিস্তার দেখেছেন।

সমর সেনের 'মহুয়ার দেশ' কবিতায় 'দূর সমুদ্রের।রাতের নির্জন নিঃসঙ্গতাকে আলোড়িত করা সমুদ্রের গর্জনকে বোঝানো হয়েছে।

সমর সেনের 'মহুয়ার দেশ' কবিতায় দূর সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাস নির্জন নিঃসঙ্গতাকে আলোড়িত করে।

দূর সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাস রাত্রের নির্জন নিঃসঙ্গতাকে আলোড়িত করে ।

 

বি সমর সেন তাঁর ক্লান্তির উপরে মহুয়া ফুলের ঝরে পড়া হয় মহুয়ার গন্ধ নেমে আসার প্রার্থনা করেছেন।

কবি সমর সেনের 'মহুয়ার দেশ' কবিতায় 'অলস সূর্য সন্ধ্যার জলস্রোতে এঁকে দেয় গলিত সোনার মতো উজ্জ্বল আলোর দত্ত।

* সন্ধ্যার অন্তগামী সূর্য কবির কল্পনায় হয়েছে 'অলস সূর্য'। কবির মনে হয়েছে দিনের অবসান যেন সূর্যের আলস্যকেই নিশ্চিত করেছে। নদীর জলে প্রতিফলিত সূর্যের রশ্মিকে কবির মনে হয়েছে গলিত সোনার মতো উজ্জ্বল। আলোর দত্ত। সূর্যের এই আলো যেন জলের অন্ধকারের ধূসর ফেনায় আগুন লাগিয়ে দেয়। এইভাবে নাগরিক জীবনের ধূলিধূসর পরিবেশেও অস্তগামী সূর্য তৈরি করে সৌন্দর্যের মায়াময় আবেশ।

* শহরজীবনে সৌন্দর্যের এই পরিবেশ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। দূষণক্লান্ত শহরে তাই শীতের দুঃস্বপ্নের মতো ঘুরে-ফিরে আসে ধোয়ার বঙ্কিম নিশ্বাস। আর এর সূত্র ধরেই কবির মন পৌঁছে যায় অনেক, অনেক দূরে মেঘমদির মৃতয়ার। দেশে। সেখানে পথের দু-ধারে ছায়া-ফেলা দেবদারুর দীর্ঘ রহস্য আর রাজে নির্জন নিঃসঙ্গতাকে আলোড়িত করা দূর সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাস কবিকে আচ্ছা করে রাখে। নগরজীবনে ক্লান্ত-অবসন্ন কবি কামনা করেন— "আমার ক্লান্তির উপরে ঝরুক মছুয়া-ফুল,/ নামুক মহুয়ার গন্ধ।

সমর সেনের "মহুয়ার দেশ' কবিতায় প্রশ্নোধৃত অংশে অস্তগামী সূর্যের কথা। বলা হয়েছে। কবির কথায়, অলস সূর্য সন্ধ্যার জলস্রোতে যে গলিত সোনা মতো উজ্জ্বল আলোর স্তম্ভ আঁকে তারই আগুন লাগে জলের অন্ধকারে ধূসর ফেনায় ।
কবিতা মহুয়ার দেশ সন্ধ্যার জলস্রোতে অন্তগামী সূর্যের আলো তৈরি করে দেয় এক উজ্জ্বল। সুস্থতা। একদিকে সূর্যের বিদায়মুহূর্তে অধকারের আগমন স্তব্ধতা ডেকে আনে, অন্যদিকে তার রক্তিম আভা সৃষ্টি করে এক মায়াময় উজ্জ্বলতার। কিন্তু সেই মায়াময়তার আবেশ যেন ছিন্ন হয়ে যায় নাগরিক পরিবেশের প্রতিকূলতায়। শীতের দুঃস্বপ্নের মতো সেখানে ঘুরে-ফিরে আসে ধোঁয়ার বঙ্কিম নিশ্বাস। নগরজীবনের বিষাক্ত পরিবেশে খণ্ডিত হয় সৌন্দর্যের বাতাবরণ।

। এই অবস্থায় কবির চেতনায় আসে অনেক দূরের মেঘমদির মছুয়ার দেশ'। সেখানে সারাক্ষণ পথের দু-ধারে ছায়া ফেলে দেবদারুর দীর্ঘ রহস্য আর দূর সমুদ্রের গর্জন রাত্রের নির্জন নিঃসঙ্গতাকে আলোড়িত করে। সেই নির্মল প্রকৃতির সান্নিধ্যে কবি নাগরিক জীবনের অবসাদ থেকে মুক্তি চান। তাই কবি কামনা করেন—"আমার ক্লান্ডির উপরে ঝরুক মহুয়া-ফুল,/নামুক চুয়ার গদ্ধ।” কবি চান তাঁর শরীরে মহুয়ার মাদকতা আবেশ ছড়াক, চেতনায় থাক মছুয়ার গন্ধ।

সমর সেনের 'মহুয়ার দেশ' কবিতা নগরজীবনের ধূসর পটভূমিতে শান্তির নিশ্চিত আশ্রয়-সন্ধানের কথাই তুলে ধরেছে। এই নগরজীবনের চারপাশেও সূর্য অস্ত্র যাওয়ার সময়ে প্রকৃতির অসামান্য প্রকাশ ঘটে। সন্ধ্যার জলস্রোতে তখন অলস সূর্য এঁকে দেয় 'গলিত সোনার মতো উজ্জ্বল আলোর স্তম্ভ'। জলের অন্ধকারে ধূসর ফেনায় অস্তগামী সূর্যের মৃদু আলো যেন আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে যায়। কিন্তু নগরজীবনের ধূসর পরিবেশে এই সৌন্দর্য চিরস্থায়ী হয় না, অত্যন্ত ক্ষণিকের এই মায়াময় পরিবেশের পরেই সেখানে ঘুরে-ফিরে আসে বিষাক্ত ধোঁয়ার আবরণ। কবির কাছে তা শীতের দুঃস্বপ্নের মতো। এই নগরজীবনের ভয়াবহতা থেকে কবি মুক্তি চান। এই মুক্তির সন্ধানেই কবি তাঁর চেতনার মধ্যে মহুয়ার দেশকে খোঁজেন। তিনি প্রার্থনা করেন—"আমার ক্লান্তির উপরে ঝরুক মহুয়া-ফুল।" কিন্তু এই প্রার্থনা তাঁর জীবনের বাস্তবতাকে পালটায় না। সর্বগ্রাসী যন্ত্রসভ্যতা মছুয়ার দেশেও প্রভাব ফেলে। শিশিরভেজা সকালে মানুষের শরীরে লেগে থাকে ধুলোর কলঙ্ক। ক্লান্ত দুঃস্বপ্ন ঘিরে থাকে তাদের। এভাবেই কবি 'মহুয়ার দেশ' কবিতায় নাগরিক জীবনের বিবর্ণতা আর হতাশার ছবি তুলে। ধরেছেন। কল্পনাবিলাস আর স্বপ্নময়তা এভাবেই রুক্ষ বাস্তবের আঘাতে বাধাপ্রাপ্ত হয়।

একটি কবিতায় সমর সেন লিখেছিলেন— “বৃষ্টির আভাসে করুণ পথে ধুলো উড়ছে, এমন দিনে সে-ধুলো মনে শুধু আনে / সাঁওতাল পরগণার মেঘমদির আকাশ ।” আলোচ্য কবিতাতেও দেখা যায় কবির কাছে 'মহুয়ার দেশ' হল "মেঘমদির'। সেখানে সবসময় পথের দু-পাশে ছায়া ফেলে রহস্যময় দেবদার গাছেরা। রাত্রির নিঃসঙ্গ নির্জনতাকে আলোড়িত করে দূর সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাস'। → ‘মহুয়ার দেশ' কবিতায় কবি সমর সেন নগরজীবনের ক্লান্তিকর অবসন্নতা থেকে মুক্তি খোঁজেন। কবির চেতনায় আসে মেঘমদির সুদূর মছুয়ার দেশ। গ্রামজীবনের নির্মল প্রকৃতির অনুষঙ্গ হিসেবে কবির কল্পনায় মাদকতাময় মহুয়া ফুলের আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে। যে কবি লিখেছিলেন—“একদা শালবনে কেটেছে রোমান্টিক দিন”, তাঁর কবিতায় ‘মহুয়ার দেশ' হয়ে ওঠে বিবর্ণ শহরজীবনে ক্লান্ত মানুষের বেঁচে থাকার আশ্রয়। তাঁর ক্লান্তির উপরে মছুয়া ফুল ঝরে পড়ুক, “নামুক মহুয়ার গল্প”—এটাই কবির আকাঙ্ক্ষা হয়ে ওঠে। কিন্তু তাঁর স্বপ্নের মহুয়ার দেশেও হানা দেয় যন্ত্রসভ্যতা। কবির কানে আসে মহুয়া বনের ধারের কয়লাখনির প্রবল শব্দ, শিশিরভেজা সবুজ সকালেও কবি দেখতে পান মানুষের শরীরে লেগে থাকা ধুলোর কলঙ্ক। নিদ্রাহীন এইসব মানুষের চোখে ভিড় করে আসা যন্ত্রসভ্যতার বিপন্নতাই কবির কাছে চূড়ান্ত সত্য হয়ে দেখা দেয়।

সমর সেনের 'মহুয়ার দেশ' কবিতার প্রশ্নোদ্ধৃত অংশে কবি অনেক অনেক দূরের 'মহুয়ার দেশ'-এর কথা বলেছেন। » নাগরিক জীবনের ‘শীতের দুঃস্বপ্নের মতো' ধোঁয়ার বিষাক্ত নিশ্বাস থেকে অনেক দূরে আছে কবিকল্পনার মেঘমদির মছুয়ার দেশ। প্রকৃতি সেখানে বাধাহীনভাবে নিজেকে মেলে দেয়। সেখানে পথের দু-ধারে যেমন দেবদারু গাছের ছায়া রহস্যময়তার সৃষ্টি করে, ঠিক তেমনই 'দীর্ঘশ্বাস' -এর মতো দূর সমুদ্রের গর্জন রাতের নির্জন নিঃসঙ্গতাকে আলোড়িত করে। এভাবেই কবি নাগরিক জীবনের ক্লান্তির বিপরীতে প্রকৃতির অবাধ উম্মোচনকে খুঁজে পান । → নাগরিক জীবনের অবসাদ ও ক্লান্তির বিপরীতে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে কবি সমর সেন এই 'মহুয়ার দেশ'-এর সন্ধান করেছেন। অস্তগামী সূর্যের আলো সংখ্যার জলস্রোতে যখন গলিত সোনার মতো উজ্জ্বল স্বর্ণালি আভা রচনা করে, তখন সাময়িকভাবে শহুরে প্রকৃতিতেও মায়াময় আবেশ তৈরি হয়। কিন্তু তা চিরস্থায়ী হয় না। নাগরিক জীবনের দূষণের বিষাক্ত ধোঁয়ার নিশ্বাসে সেই সৌন্দর্য হারিয়ে যায়। সেইসময় মহুয়ার দেশের শাস্ত নির্মলতাকেই কবি আশ্রয় করতে চান। তিনি চান তাঁর ক্লান্তির উপরে ঝরুক মহুয়ার ফুল, আবেশ ছড়াক মহুয়ার গন্ধ। মহুয়ার দেশের সজীবতার স্পর্শে তিনি নিজেকে প্রাণবন্ত করে তুলতে চান। তাই নগরজীবন থেকে দূরবর্তী ‘মহুয়ার দেশ' হয়ে ওঠে কবির আকাঙ্ক্ষিত প্রিয়তম আশ্রয়স্থল।

"আমার বলতে 'মহুয়ার দেশ' কবিতার কবি সমর সেনের কথা বলা হয়েছে । কবি সমর সেন নাগরিক ক্লান্তি থেকে মুক্তির জন্য 'মহুয়ার দেশ'-এর কথা ভেবেছেন। প্রকৃতির সেই বাধাহীন বিস্তারে, মেঘমদিরতায় কবি 'শীতের দুঃস্বপ্নের মতো' নগরজীবনের দূষণ 'ধোঁয়ার বঙ্কিম নিঃশ্বাস'-কে ভুলে থাকতে চেয়েছেন। মহুয়ার দেশে পথের দু-ধারে ছায়া ফেলা দেবদারু গাছের রহস্যময়তা বা দূর সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাসরূপী গর্জন কবিকে আকৃষ্ট করে । প্রকৃতির এই নির্মলতাকে আশ্রয় করেই কবি নাগরিক অবসন্নতা থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছেন। তাই হৃদয়ের গভীরতম আকাঙ্ক্ষায় তিনি উচ্চারণ করেন— “আমার ক্লান্তির উপরে ঝরুক মহুয়া-ফুল,/ নামুক মহুয়ার গন্ধ।” কিন্তু কবির এই ভাবনাবিলাস বা ইচ্ছাপূরণের আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থেকে যায় | নগরজীবনে বসে রাত্রির অসহ্য নিবিড় অন্ধকারে কবি শোনেন মহুয়া বনের
ধারের কয়লাখনির গভীর বিশাল শব্দ । নাগরিক যন্ত্রসভ্যতার শব্দনিনাদ মহুয়ার দেশের মেঘমদির রহস্যময়তার অবসান ঘটিয়ে কয়লাখনির শব্দকে মনে করায় | যন্ত্রসভ্যতা এভাবেই সর্বগ্রাসী হয়ে থাকে কবির চেতনায়। এ কথা হয়তো ঠিক যে, ‘ক্লান্তির উপরে ঝরুক মহুয়া-ফুল—এটাই কবির নিবিড় চাওয়া | কিন্তু বাস্তব হল যন্ত্রসভ্যতার আগ্রাসন, বিবর্ণতার সীমাহীন বিস্তার, যা কবির স্বপ্নের মহুয়ার দেশকেও নিস্তার দেয় না |

মছুয়ার দেশ' কবিতায় মহুয়ার দেশের নিস্তব্ধতাকে যেহেতু কয়লাখনির শব্দ ভেঙে দেয়, তাই তাকে 'গভীর' ও 'বিশাল' বলা হয়েছে।

'শিশির-ভেজা সবুজ সকালে' কবি কয়লাখনির অবসন্ন শ্রমিকদের শরীরে ধুলোর কলঙ্ক দেখেন।

কবি সমর সেন অবসন্ন মানুষের শরীরে ধুলোর কলঙ্ক দেখেন।

কবি সমর সেন মছুয়ার দেশে শিশির-ভেজা সবুজ সকালে অবসন্ন মানুষের শরীরে ধুলোর কলঙ্ক দেখেন ।

কয়লাখনির অবসন্ন শ্রমজীবী মানুষদের চোখে ক্লান্ত দুঃস্বপ্ন হানা দেয়।

'ছুয়ার দেশ' কবিতায় 'মহুয়ার দেশ' বলতে কবি সাঁওতাল পরগনাকে বুঝিয়েছেন।

মহুয়ার দেশের নৈঃশব্দের পটভূমিতে কয়লাখনির শব্দ ছিল গভীর এবং সেখানে কয়লাখনির গভীর, বিশাল শব্দ হয়।

সমর সেন তাঁর 'মহুয়ার দেশ' কবিতায় নগরজীবনের ধূসরতা ও যান্ত্রিকতায় ক্লান্ত মানুষের যন্ত্রণাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রকৃতির নির্মল পটভূমিকে এখানে বিবর্ণ করে দেয় ধোয়ার বঙ্কিম নিঃশ্বাস'। এখান থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই কবিকে আকর্ষণ করে মেঘমদির মহুয়ার দেশ, যেখানে পথের দু পাশে ছায়া ফেলে রহস্যময় দেবদারু গাছের সারি। কবি আকাঙ্ক্ষা করেন যে, তাঁর ক্লান্তির উপরে ঝরুক মহুয়া ফুল। তাঁর চেতনায় ছড়াক স্নিঃধ আবেশ। কিন্তু নগরজীবনের সর্বগ্রাসী যান্ত্রিকতায় তার কোনো সন্ধানই পান না কবি। বরং তাঁর কানে আসে মহুয়া বনের ধারে কয়লাখনির প্রবল শব্দ। শিশিরে ভেজা সবুজ সকালেও মহুয়ার দেশের অবসন্ন মানুষদের শরীরে লেগে থাকে ধুলোর কলঙ্ক। তাদের ঘুমহীন চোখে আজও ক্লান্ত দুঃস্বপ্ন জেগে থাকে। 'কীসের' শব্দটি উল্লেখের দ্বারা কবি অনিশ্চয়তাকে বোঝাতে চাইলেও এটা স্পষ্ট যে, তাঁর স্বপ্নের মছুয়ার দেশও আজ যন্ত্রসভ্যতার শিকার। আর তারই বিপন্নতা হানা দেয় সেখানকার মানুষদের দুঃস্বপ্নে। যন্ত্রসভ্যতার ক্ষয়, বিকৃতি আর যান্ত্রিকতার ক্লান্তি থেকে মুক্তি পায় না স্বপ্নের মহুয়ার দেশও। সেই পরিত্রাণহীন জীবনকেই সমর সেন তাঁর 'মহুয়ার দেশ' কবিতায় তুলে ধরেছেন।

সমর সেনের 'মহুয়ার দেশা কবিতা থেকে উদ্ধৃত এই উক্তিটিতে মহুয়ার দেশের কয়লাখনির অবসন্ন শ্রমিকদের কথা বলা হয়েছে।

→ সমর সেন তাঁর 'মহুয়ার দেশ" কবিতায় নগরজীবনের ধূসরতা ও যান্ত্রিকতায় ক্লান্ত মানুষের যন্ত্রণাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এখান থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই কবিকে আকর্ষণ করে মেঘমদির মহুয়ার দেশ, যেখানে পথের দু-পাশে ছায়া ফেলে রহস্যময় দেবদারু গাছের সারি। কবি আকাঙ্ক্ষা করেন যে, তাঁর ক্লান্তির উপরে মহুয়া ফুল ঝরে পড়ুক। তাঁর চেতনায় ছড়াক স্নিগ্ধ আবেশ। কিন্তু এখানকার সর্বগ্রাসী যান্ত্রিকতায় তার কোনো সন্ধানই পান না কবি। বরং তাঁর কানে আসে মহুয়া বনের ধারে কয়লাখনির প্রবল শব্দ। শিশিরে ভেজা সবুজ সকালে মহুয়ার দেশের অবসন্ন মানুষদের শরীরেও লেগে থাকে ধুলোর কলঙ্ক। তাঁর স্বপ্নের মছুয়ার দেশও যে আজ যন্ত্রসভ্যতার শিকার। আর তারই বিপন্নতা হানা দেয় সেখানকার মানুষদের দুঃস্বপ্নে। যন্ত্রসভ্যতার ক্ষয়, বিকৃতি আর যান্ত্রিকতার ক্লান্তি থেকে মুক্তি পায় না স্বপ্নের মহুয়ার দেশও। একারণেই তাদের ঘুমহীন চোখে ক্লান্ত দুঃস্বপ্ন হানা দেয়।

নগরজীবন ও তার যান্ত্রিকতা, প্রাণহীনতা, ভণ্ডামি ইত্যাদি বারবার সমর সেনের কবিতার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। “তিলে তিলে মৃত্যু সুদ্ধশ্বাস মৃত্যু আমাদের প্রাণ, / দিকে দিকে আজ হানা দেয় বর্বর নগর" এটাই ছিল কবি সমর সেনের উপলব্ধি। 'মহুয়ার দেশ" কবিতাতেও এই নগরজীবনই পটভূমি হিসেবে উঠে এসেছে। যখন সন্ধ্যার জলস্রোতে অলস সূর্য এঁকে দেয় গলিত সোনার মতো উজ্জ্বল আলোর স্তম্ভ তখনই নগরজীবনে সেই উজ্জ্বল স্তব্ধতার মধ্যে 'ধোঁয়ার বঙ্কিম নিঃশ্বাস ঘুরে ফিরে ঘরে
আসে/শীতের দুঃস্বপ্নের মতো।

নগরজীবনের এই ক্লান্তি থেকে মুক্তির জন্যই কবি যেতে চেয়েছেন অনেক দূরের মেঘমদির মছুয়ার দেশে, যেখানে পথের দু-ধারে সমস্তক্ষণ ছায়া ফেলে 'দেবদারুর দীর্ঘ রহস্য'। কবি চান, মহুয়া ফুলের মাদকতাময় গন্ধে তাঁর যাবতীয় ক্লান্তি মুছে যাক। কিন্তু তার বদলে মহুয়া বনের ধারের কয়লাখনির প্রবল শব্দই শুধু শোনা যায়। শিশিরে ভেজা সবুজ, সতেজ সকালেও অবসন্ন মানুষদের শরীরে ধুলোর কলঙ্ক লেগে থাকে। ঘুমহীন সেইসব মানুষের চোখে ক্লান্ড দুঃস্বপ্নই একমাত্র সত্য হয়ে হানা দেয়। অর্থাত্ নগরজীবন থেকে কবি কোনোভাবেই যুক্ত হতে পারেন না। মছুয়ার দেশ"-কে নিয়ে ভাবতে গিয়েও যন্ত্রসভ্যতাই তাঁর চেতনাকে অধিকার করে নেয়। নগরজীবনের ব্যাপ্তি আর বিবর্ণতাকে এভাবেই কবি তাঁর ‘মহুয়ার দেশ” কবিতায় ধরে রাখেন।

সমর সেনের 'মহুয়ার দেশ' কবিতাটি নগরজীবনের ক্লান্তি, বিষণ্ণতা আর কৃত্রিমতা নিয়ে কবির অনুভবের প্রকাশ। এখানে সন্ধ্যার চিরন্তন অনাবিল পটভূমিতে 'ধোঁয়ার বঙ্কিম নিঃশ্বাস' ঘুরে-ফিরে আসে। এই আসা কবির কাছে একেবারেই কাম্য নয়, তাই তা শীতের দুঃস্বপ্নের মতোই মনে হয়। এই নাগরিক ক্লান্তি থেকে মুক্তির জন্য কবির চেতনা জুড়ে থাকে মহুয়ার দেশ, যা রাত্রির নির্জন নিঃসঙ্গতাকেও আলোড়িত করে। কবি চান তাঁর ক্লান্তির ওপরে ঝরুক মছুয়া ফুল, আবেশ ছড়াক তার মাদকতাময় গন্ধ। কিন্তু নগরজীবন এই রোমান্টিক বিলাসিতাকে লালন করে না। তাই নাগরিক জীবনের প্রবল কোলাহলের মধ্যে কবি শুধু মহুয়ার দেশের কয়লাখনির প্রবল আওয়াজটুকুই পান, পান না কোনো স্নিগ্ধতা অথবা নির্মলতা, পান না দেবদারু গাছের দীর্ঘ রহস্যময় ক্লান্তিদূরকারী ছায়া। শিশির মাখা সবুজ সকালেও তাই তাঁর চোখে ভেসে ওঠে মহুয়ার দেশের মানুষদের ধুলোর কলঙ্কমাখা অবসন্ন মুখ। গদ্য লেখায় সমর সেন বলেছিলেন — “রিয়ালিটির থেকে নিষ্কৃতির চেষ্টা পরাজয়ের দুর্বল ভঙ্গি, প্রকৃতির স্বপ্নলোক ক্লীবের অলীক স্বর্গ।" তাই পালিয়ে না গিয়ে নগরজীবনের সর্বগ্রাসী চেহরাকে কবি তুলে ধরেন 'মহুয়ার দেশ' কবিতায়।

সমর সেন তাঁর একটি কবিতায় লিখেছিলেন - "কালক্রমে টেকনিক নিয়ে যাবে নব্যকাব্যলোকে” | সমর সেনের কবিতার আঙ্গিকের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হল সংক্ষিপ্ত আয়তনে গম্ভীর বক্তব্যকে তুলে ধরা। এই বিশেষত্ব 'মহুয়ার দেশা কবিতাতেও প্রকাশ পায়। মাত্র বহিলটি পঙ্ক্তিতে কবি নগরজীবনের ক্লান্তি আর শূন্যতাকে তুলে ধরেন, সঙ্গে থাকে এক আশ্চর্য রোমান্টিকতা—যা এই ক্লান্ত জীবনের বহু আকাঙ্ক্ষিত রোমান্টিকতা হিসেবে উঠে আসে। বিষয়কে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ভাষা হয়ে ওঠে কবির অস্ত্র। মাঝেমধ্যে তির্যক কথ্য শব্দের ব্যবহার, সমর সেনের রচনাশৈলীর বৈশিষ্ট্য হলেও 'মহুয়ার দেশা এ সেই ধরন নেই। পরিবর্তে রয়েছে কাব্যিক শব্দের প্রয়োগ। চিত্রকল্পগুলি ভাষার এবং বর্ণনার সহজতার কারণে নিটোল হয়ে ওঠে। “মাঝে মাঝে সন্ধ্যার জলস্রোতে/ অলস সূর্য দেয় এঁকে/গলিত সোনার মতো উজ্জ্ব আলোর স্তম্ভ"—সান্ধ্য প্রকৃতির একটা গোটা ছবিকে তার রং-সহ এভাবেই এঁকে দেন সমর সেন। ‘অলস সূর্য', 'উজ্জ্বল স্তব্ধতা', 'মেঘ-মদির মহুয়ার দেশ'—নন্দবন্ধগুলি তৈরি করে দেয় অপরূপ কাব্যময়তা। আবার • যন্ত্রসভ্যতার ক্লান্তিকে বোঝাতে কবি যখন লেখেন – “ঘুমহীন তাদের চোখে হানা দেয়/কীসের ক্লান্ত দুঃস্বপ্ন।"— ক্লান্তির ব্যঞ্জনা যেন সীমাহীন হয়ে যায়। এভাবেই সমগ্র কবিতাটি কবির সৃষ্টিশীলতার অসামান্য উদাহরণ হয়ে থাকে।

সমর সেনের 'মহুয়ার দেশ' কবিতাটি নাগরিক জীবনের যান্ত্রিকতা অস্ত্র। একঘেয়েমিতে ক্লান্ত কবির আশ্রয়-সন্ধানের কথাই তুলে ধরে। কোলাহলমুখর জনজীবনের বাইরে প্রাপ্তিক ভূখণ্ড দুয়ার দেশই কবির কাছে সেই আশ্রয়। যখন 'ধোঁয়ার বঙ্কিম নিঃশ্বাস' 'শীতের দুঃস্বপ্নের যন্ত্রে। কবিকে তাড়া করে, তখনই কবির চেতনাকে অধিকার করে মেঘমদির। মহুয়ার দেশ। নাগরিক ক্লান্তি, বিবর্ণতা আর দূষণকে অতিক্রম করে প্রকৃতি। সেখানে অবাধে নিজেকে মেলে দিয়েছে। সমস্তক্ষণ পথের দু-ধারে সেখানে ছায়াময় হয়ে থাকে দেবদারুর 'দীর্ঘ রহস্য। অরণ্যের নিবিড়তা ই রহস্যময়তার জন্ম দেয়। আগ্রাসী নগরসভ্যতায়, যেখানে সবই অনাবৃত সেখানে এই রহস্যের খোঁজ পাওয়া যায় না। মহুয়ার দেশে দূর সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাসে রাত্রের নির্জন নিঃসঙ্গতা আলোড়িত হয়। প্রকৃতি যেখানে আপন স্বভাবে নিজেকে মেলে দেয়—মহুয়ার দেশ তার পটভূমি | নাগরিক ক্লান্তিতে বিপন্ন কবির স্বপ্নকল্পনার আশ্রয় এই মহুয়ার দেশ। তাই তাঁর আকাঙ্ক্ষা হয়—“আমার ক্লান্তির উপরে ঝরুক মহুয়া ফুল,/ নামুক মহুয়ার গ যদিও কবির এই প্রিয় আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘস্থায়ী হয় না, যন্ত্রসভ্যতা ক্রমশ গ্রাস। করে সুন্দর প্রকৃতিকে। মহুয়ার দেশেও তাই শোনা যায় কয়লাখনির শব্দ, দেখা যায় দুঃস্বপ্নপীড়িত অবসন্ন মানুষের মুখ। তবুও ‘মহুয়ার দেশ” হয়ে থাকে কবিচেতনার এক গভীরতম, তীব্রতম আকাঙ্ক্ষা।

বুদ্ধদেব বসু সমর সেন সম্পর্কে লিখেছিলেন— "সমর সেন শহরের কবি, কলকাতার কবি, আমাদের আজকালকার জীবনের সমস্ত বিকার, বিক্ষোভ ও ক্লান্তির কবি।” নাগরিক জীবনের ক্লান্তি, অবসন্নতাকে সমর সেন ধরে রাখেন তাঁর কবিতায় | ‘মহুয়ার দেশ' কবিতাটিও তার ব্যতিক্রম নয়। সংখ্যার জলস্রোতে যখন অলস সূর্য এঁকে দেয় 'গলিত সোনার মতো উজ্জ্বল আলোর স্তম্ভ', তখন মুগ্ধতার সেই আবেশ শীতের দুঃস্বপ্নের মতো ধোঁয়ার বঙ্কিম নিঃশ্বাস'-এ আক্রান্ত হয়। এটাই নগর সভ্যতার বাস্তবতা এবং ট্র্যাজেডিও যে, সুন্দরের প্রকাশ এখানে ঘটলেও তা ক্ষণস্থায়ী। সমর সেন এই যন্ত্রসভ্যতারই নিপুণ ভাষ্যকার। কিন্তু তিনি এর সমর্থক নন। তাই তাঁকে 'মেঘ-মদির মছুয়ার দেশ' হাতছানি দিয়েছে। সেখানে পথের দু-ধারে ছায়া ফেলা দেবদারুর রহস্য, রাত্রের নির্জন নিঃসঙ্গতাকে আলোড়িত করা সমুদ্রের গর্জন কবির চেতনাকে অধিকার করে থেকেছে। কিন্তু নগরজীবনের বিবর্ণতা ও | যান্ত্রিকতা থেকে কবি মুক্তি পাননি, তাই মহুয়া বনের নির্মল প্রকৃতির মধ্যেঃ কবি কয়লাখনির শব্দ শুনতে পান। শিশিরভেজা সকালকে গ্রাস করে মানুষের শরীরের ধুলোর কলঙ্ক। গদ্য লেখায় সমর সেন বলেছিলেন "রিয়ালিটির থেকে নিষ্কৃতির চেষ্টা পরাজয়ের দুর্বল ভঙ্গি, প্রকৃতির স্বপ্নলোক ক্লীবের অলীক স্বর্গ।" তাই কল্পনার আশ্রয় না নিয়ে যন্ত্রসভ্যতার সর্বগ্রাসী চেহারাকেই কবি মহুয়ার দেশ' কবিতায় তুলে ধরেছেন।

সমর সেন আধুনিক গচুরে কবি। নগরজীবনের যান্ত্রিকতা, প্রাপহীনতা বারবার তাঁর কবিতার প্রতিপাদ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু কবির নাগরিক কবিতা মহুয়ার দেশ সত্তার বাইরেও একটি পৃথক সত্তা আছে। সেটি হল রোমান্টিক পতা, যার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর 'মহুয়ার দেশ' কবিতাটিতে। রুক্ষ, কঠিন নাগরিক জীবনের দুঃখকষ্ট থেকে মুক্তি পেতে কবি সেথমদির, ভালোবাসার ভরা মহুয়ার দেশের কল্পনা করেছেন। ধূসর, বান, একসেসের আর কাফিকর যান্ত্রিক জীবন থেকে নিজেকে টেনে নিয়ে গেছেন স্বপ্নময় মধুয়ার দেশে, সুন্দর প্রকৃতির সান্নিধ্যে। তাই আমরা কবিতার প্রথমেই প্রকৃতির নির্মল-বি উজ্জ্বল-সৌন্দর্যের বর্ণনা পাঠ "মাঝে মাঝে সন্ধ্যার অগস্রোতে অলস সূর্য দেয় এঁকে....।"

কবির এই সৌন্দর্যচেতনা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। নাগরিক সন্ত্রাণা, 'ধোয়ার বঙ্কিম নিঃশ্বাস' শীতের দুঃস্বপ্নের মতো জেগে ওঠে। শিশিরভেজা হিল সকালে নিদ্রাহীন খনির শ্রমিকদের দেহে ধুলোর কালিনা রোমান্টিকতাকে ভ দেয়। কবি লেখেন—

"ঘুমহীন তাদের চোখে হানা দেয় কীসের ক্লান্ত পুষের এই কবিতায় রোমান্টিকতা বাস্তবের সঙ্গে সংঘাতে স্বপ্নের মতো মারানর হয়ে থাকে।

সমর সেনের "সন্তুয়ার দেশ' কবিতার পটভূমিতে রয়েছে নাগরিক জীবনের ক্লান্তি যন্ত্রসভ্যতা এখানে মানুষের সৌন্দর্য উপভোগের ক্ষেত্রকে করুণ ছোটো করে দিচ্ছে। অস্তগামী সূর্যের আলোয় যখন জলে তৈরি হয় 'গলিত সোনার মতো উজ্জ্বল আলোর যত্ত তা কবিকে মুগ্ধ করে। কিন্তু দূষিত নগরসভ্যতার এই মুগ্ধতার আবেশ দীর্ঘসারী হতে পারে না। তাই শীতের ব্রাহ্মপ্নের মতো কবিকে গ্রাস করে 'ধোঁয়ার বঙ্কিম নিঃশ্বাস করি নগরজীবন থেকে বেরিয়ে গিয়ে এই ক্লান্তি আর বিবর্ণতা থেকে মুক্তির সন্ধান করেন। দূরের মেঘমদির মহুয়ার দেশ, যেখানে প্রকৃতির নিশ্চিন্ত বিস্তার তা কবিকে আকৃষ্ট করে। সেখানে পথের দুধারে ছারা ফেলা দেবদারুর দীর্ঘ রহস্য আর রাত্রের নির্জনতাকে আলোড়িত করা দূর সমুদ্রের প কবিচেতনাকে অধিকার করে নেয়। যদিও আগ্রাসী তাকে বুঝি দেন না। তাই বস্তুসভ্যাতার শব্দদৈত্য মনে করার করলাবনির শব্দকে, প্রকৃ আড়ালে চলে যেতে বাধ্য হয়। তবুও "মধুয়ার দেশ হয়ে থাকে কবির প্রিয়ত আक- “ानর ক্লান্তি A - ফুল / নামুক মধুয়ার গল্প" স্বপ্নের "ব্রুয়ার দেশ" বা বিশুদ্ধ প্রকৃতির হয়ে

“কালক্রমে টেকনিক নিয়ে যাবে নব্যকাব্যলোকে।” কবিতার আঙ্গিক সম্পর্কে এরকমটাই ভাবতেন সমর সেন। জীবনের ক্লান্তি, অবসন্নতা, নাগরিক হতাশাকে প্রকাশ করতে গিয়ে গদ্যকবিতাই বারবার তাঁর অবলম্বন হয়েছে। সম্ভবত অন্ত্যমিলের লঘু চলনে জীবনের ব্যাপ্তিকে যথাযথভাবে ধরা যাবে না বলেই কবি মিলহীনতার দিকে ঝুঁকেছিলেন। এই কবিতায় মাত্র বাইশটি পতি রয়েছে। দীর্ঘতম পক্তি কুড়ি এবং হ্রস্বতম পক্তি ছ-মাত্রার| গদ্যকবিতার রীতি মেনে যতিচিহ্নের প্রয়োগেও কোনো সুনির্দিষ্ট রীতি কবি মানেননি। কখনও তিনটি পত্তির পরে যেমন পূর্ণযতি ব্যবহার করেছেন, তেমনই কখনও পূর্ণয়তি দিতে সময় নিয়েছেন আটটি পঙ্ক্তি। মাত্র পাঁচটি পূর্ণমতিতে সমগ্র কবিতাকে বেঁধেছেন কবি। অর্থাৎ স্পষ্টতই বোঝা যায়, প্রতিটি পূর্ণয়তি কখনও একটি বক্তব্য, কখনও একটি চিত্রকল্পকে নির্মাণ করেছে। সমর সেনের বিশিষ্টতা হল তাঁর কবিতা নিছক বক্তব্যধর্মী হয়নি। একদিকে তিনি তৈরি করেছেন অসাধারণ চিত্রকল্প, যেমন—“মাঝে মাঝে সন্ধ্যার জলস্রোতে/ অলস সূর্য দেয় এঁকে/গলিত সোনার মতো উজ্জ্বল আলোর স্তম্ভ”, অন্যদিকে সেই চিত্রকল্পের আশ্রয়ে কবিতাকে করে তোলেন ব্যঞ্জনাধর্মী। সমর সেন সহজ শব্দের প্রয়োগ যেমন করেন, পাশাপাশি অসাধারণ কাব্যিক শব্দকধও তৈরি করেন, যেমন— 'অলস সূর্য', 'উজ্জ্বল স্তব্ধতা', 'সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাস' ইত্যাদি। এভাবেই নাগরিক ক্লান্তি আর তা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে কবি শিল্পসম্মতভাবে গদ্যকবিতার আশ্রয়ে অনবদ্যভাবে ফুটিয়ে তোলেন |

সমর সেনের 'মহুয়ার দেশ' কবিতাটি নাগরিক জীবনের যান্ত্রিকতা অস্ত্র। একঘেয়েমিতে ক্লান্ত কবির আশ্রয়-সন্ধানের কথাই তুলে ধরে। কোলাহলমুখর জনজীবনের বাইরে প্রাপ্তিক ভূখণ্ড দুয়ার দেশই কবির কাছে সেই আশ্রয়। যখন 'ধোঁয়ার বঙ্কিম নিঃশ্বাস' 'শীতের দুঃস্বপ্নের যন্ত্রে। কবিকে তাড়া করে, তখনই কবির চেতনাকে অধিকার করে মেঘমদির। মহুয়ার দেশ। নাগরিক ক্লান্তি, বিবর্ণতা আর দূষণকে অতিক্রম করে প্রকৃতি। সেখানে অবাধে নিজেকে মেলে দিয়েছে। সমস্তক্ষণ পথের দু-ধারে সেখানে ছায়াময় হয়ে থাকে দেবদারুর 'দীর্ঘ রহস্য। অরণ্যের নিবিড়তা ই রহস্যময়তার জন্ম দেয়। আগ্রাসী নগরসভ্যতায়, যেখানে সবই অনাবৃত সেখানে এই রহস্যের খোঁজ পাওয়া যায় না। মহুয়ার দেশে দূর সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাসে রাত্রের নির্জন নিঃসঙ্গতা আলোড়িত হয়। প্রকৃতি যেখানে আপন স্বভাবে নিজেকে মেলে দেয়—মহুয়ার দেশ তার পটভূমি | নাগরিক ক্লান্তিতে বিপন্ন কবির স্বপ্নকল্পনার আশ্রয় এই মহুয়ার দেশ। তাই তাঁর আকাঙ্ক্ষা হয়—“আমার ক্লান্তির উপরে ঝরুক মহুয়া ফুল,/ নামুক মহুয়ার গ যদিও কবির এই প্রিয় আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘস্থায়ী হয় না, যন্ত্রসভ্যতা ক্রমশ গ্রাস। করে সুন্দর প্রকৃতিকে। মহুয়ার দেশেও তাই শোনা যায় কয়লাখনির শব্দ, দেখা যায় দুঃস্বপ্নপীড়িত অবসন্ন মানুষের মুখ। তবুও ‘মহুয়ার দেশ” হয়ে থাকে কবিচেতনার এক গভীরতম, তীব্রতম আকাঙ্ক্ষা।

"আমার বলতে 'মহুয়ার দেশ' কবিতার কবি সমর সেনের কথা বলা হয়েছে । কবি সমর সেন নাগরিক ক্লান্তি থেকে মুক্তির জন্য 'মহুয়ার দেশ'-এর কথা ভেবেছেন। প্রকৃতির সেই বাধাহীন বিস্তারে, মেঘমদিরতায় কবি 'শীতের দুঃস্বপ্নের মতো' নগরজীবনের দূষণ 'ধোঁয়ার বঙ্কিম নিঃশ্বাস'-কে ভুলে থাকতে চেয়েছেন। মহুয়ার দেশে পথের দু-ধারে ছায়া ফেলা দেবদারু গাছের রহস্যময়তা বা দূর সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাসরূপী গর্জন কবিকে আকৃষ্ট করে । প্রকৃতির এই নির্মলতাকে আশ্রয় করেই কবি নাগরিক অবসন্নতা থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছেন। তাই হৃদয়ের গভীরতম আকাঙ্ক্ষায় তিনি উচ্চারণ করেন— “আমার ক্লান্তির উপরে ঝরুক মহুয়া-ফুল,/ নামুক মহুয়ার গন্ধ।” কিন্তু কবির এই ভাবনাবিলাস বা ইচ্ছাপূরণের আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থেকে যায় | নগরজীবনে বসে রাত্রির অসহ্য নিবিড় অন্ধকারে কবি শোনেন মহুয়া বনের
ধারের কয়লাখনির গভীর বিশাল শব্দ । নাগরিক যন্ত্রসভ্যতার শব্দনিনাদ মহুয়ার দেশের মেঘমদির রহস্যময়তার অবসান ঘটিয়ে কয়লাখনির শব্দকে মনে করায় | যন্ত্রসভ্যতা এভাবেই সর্বগ্রাসী হয়ে থাকে কবির চেতনায়। এ কথা হয়তো ঠিক যে, ‘ক্লান্তির উপরে ঝরুক মহুয়া-ফুল—এটাই কবির নিবিড় চাওয়া | কিন্তু বাস্তব হল যন্ত্রসভ্যতার আগ্রাসন, বিবর্ণতার সীমাহীন বিস্তার, যা কবির স্বপ্নের মহুয়ার দেশকেও নিস্তার দেয় না |