Chapter-6, সামাজিক ঘটনাস্রোত

অক্ষ

গ্রিসের বেশিরভাগ ক্রীতদাস গৃহকাজে নিযুক্ত হত। অনেক ক্রীতদাসকে শ্রমিক হিসেবে বিভিন্ন প্রকার শিল্প-উৎপাদনের কাজে নিয়োগ করা হত। ছোটো ছোটো কারখানাগুলিতেও সমবেতভাবে বহু দাস নিযুক্ত হত। এ ছাড়া কৃষিকাজে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে করণিকের কাজে, দলিল রক্ষণাবেক্ষণ, রাস্তা তৈরির কাজে ক্রীতদাসরা যুক্ত থাকত।

গ্রিসে ক্রীতদাস ও তার প্রভুর মধ্যে আনুগত্য ও প্রভুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। প্রভু-ভৃত্যের এই সম্পর্ক কখনো কখনো মধুর হয়ে। উঠত। দাসরা প্রভুর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একত্রে বসবাস করত। তবে বাস্তবে দাসদের ওপর প্রভুর অত্যাচার, নির্যাতন, নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চনা ইত্যাদি কারণে দাস প্রভুর মধ্যে এক তিক্ত সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

প্রাচীন গ্রিসের স্পার্টায় ক্রীতদাসদের হেলট বলা হত। এরা ছিল। স্পার্টার সর্বাপেক্ষা নির্যাতিত ও শোষিত শ্রেণি। কৃষিকাজ এবং সামরিক দায়িত্বপালন ছাড়াও এদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাজে লাগানো হত।

স্পার্টার হেলট ক্রীতদাসদের প্রধান কাজ ছিল চাষবাস।এ ছাড়াও তাদেরকে সামরিক কাজে ব্যবহার করা হত। হেলটরা পরবর্তীকালে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সাহায্য করত।

 

সাধারণভাবে বলা যায় যে, সম্পত্তি বলতে যা বোঝায় তার সকল বা আংশিক বৈশিষ্ট্য যদি কোনো ব্যক্তির মধ্যে লক্ষ করা যায় তবে সেই ব্যক্তি ক্রীতদাস বা দাস বলে গণ্য হয়।

বাইরের থ্রেস, ইলিরিয়া, থেসালি, সিথিয়া, লিডিয়া, সিরিয়া, মিশর, আরব প্রভৃতি দেশ থেকে প্রাচীন গ্রিসে ক্রীতদাস আমদানি করা হত।

প্রাচীন এথেন্সের ক্রীতদাসদের থিটিস বলা হত।

গ্রিসের মধ্যে সর্বপ্রথম দাস বাজার গড়ে উঠেছিল 'কিওস'-এ।

দাসরা স্পার্টায় হেলট নামে, থেসালিতে পেনেসটাই নামে, সিসিলিতে কাইলিরি নামে ও ক্রীটে ক্লারোটাই নামে পরিচিত হত।

প্রাচীন গ্রিসে গৃহকার্যে নিযুক্ত ক্রীতদাসরা গৃহ পরিষ্কার, রান্নাবান্না, শস্য ঝাড়াই, কুয়ো থেকে জল তোলা, কাপড় বোনা, প্রভুর মালপত্র বহন করা, প্রভুর সেবা করা, প্রভুর ভ্রমণসঙ্গী হওয়া প্রভৃতি কাজ করত।

স্পার্টার সমাজ তিনটি স্তরে বিভক্ত ছিল। যথা—[1] স্প্যাটিয়েট, [2] হেলট ও [3] পেরিওকয়।

প্রাচীন গ্রিসের সমাজকে 'দাস সমাজ' হিসেবে অভিহিত করা সম্পর্কিত বিতর্ক

সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় যে, প্রাচীন গ্রিসে, বিশেষ করে ধ্রুপদি যুগের— গ্রিসের সমাজ ও অর্থনীতিতে ক্রীতদাসপ্রথা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছিল। এজন্য কোনো কোনো পণ্ডিত ও ঐতিহাসিক প্রাচীন গ্রিসের সমাজকে 'ক্রীতদাস সমাজ' (Slave Society) বলে থাকেন। আবার অন্য একদল ঐতিহাসিক গ্রিসে দাসপ্রথার অস্তিত্ব স্বীকার করলেও এই প্রথাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চান না বা প্রাচীন গ্রিসের সমাজকে 'ক্রীতদাস সমাজ' বলে চিহ্নিত করতেও চান না। এই পরস্পর-বিরোধী অভিমতের ফলে এ বিষয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

[1] প্রাচীন গ্রিসের সমাজকে 'ক্রীতদাস সমাজ' বলার পক্ষে অভিমত

i. প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের অভিমত : প্রাচীন গ্রিসের পণ্ডিত প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের লেখাতেও সেখানকার ক্রীতদাসপ্রথাকে সমর্থন এবং সেখানকার সমাজে দাসদের ভূমিকার গুরুত্বকে স্বীকার করা হয়েছে। এদের মতে, গ্রিকরা কায়িক শ্রমকে ঘৃণা করত বলে নিজেদের যাবতীয় কাজ ক্রীতদাসদের দিয়ে করাত।

ii. জর্জ টমসনের অভিমত: দাসপ্রথা-বিরোধী ঐতিহাসিক জর্জ টমসন মনে করেন যে, যতক্ষা ক্রীতদাসদের ওপর নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখা গিয়েছিল, ততক্ষণ দাসগ্রমের ওপর নির্ভরশীলতা এথেন্সের মানুষের কাছে বিপজ্জনক বা অসুবিধাজনক হয়ে ওঠেনি। তাঁর মতে, প্রাচীন গ্রিকসমাজ সম্পূর্ণরূপে ক্রীতদাসপ্রথার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
iii. পেরি অ্যান্ডারসনের অভিমত: মার্কসবাদী ঐতিহাসিক পেরি অ্যান্ডারসন বলেছেন যে, প্রাচীন গ্রিক নগর-রাষ্ট্রগুলিই সর্বপ্রথম ক্রীতদাসপ্রথাকে একটি সর্বাত্মক চরিত্র দান করে এবং সুপরিকল্পিতভাবে একে উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত করে। তাঁর মতে, গ্রিসের উৎপাদনের কাজে স্বাধীন কৃষক, কারিগর ও ভাড়াটে চাষিরা নিযুক্ত থাকলেও উৎপাদনের কাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান নি কাদের।

[2] প্রাচীন গ্রিসের সমাজকে 'ক্রীতদাস সমাজ' বলার বিপক্ষে অভিমত

i. উইলিয়াম ওয়েস্টারম্যান-এর অভিমত: উইলিয়াম ওয়েস্টারম্যান মনে করেন যে, প্রাচীন গ্রিসে কোনো ধরনের সংস্কার এবং সংঘাত ছাড়াই স্বাধীন নাগরিক ও ক্রীতদাসরা একই কাজে পাশাপাশি নিযুক্ত হত। তাই একথা বলা যায় না যে, গ্রিক সমাজ ক্রীতদাসপ্রথার ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

ii. ভিক্টর ইরেনবার্গ-এর অভিমত: ভিক্টর হরেনবার্গ মনে করেন যে, প্রাচীন গ্রিসে ক্রীতদাস শ্রমের বিশেষ প্রয়োজন থাকলেও তা কখনোই গ্রিসের অর্থনৈতিক জীবনের মূলভিত্তি ছিল না।

iii. জোন্স-এর অভিমত: ঐতিহাসিক এ এইচ এম জোন্‌স মনে করেন যে, প্রাচীন গ্রিসের ক্রীতদাসপ্রথা ছিল একটি দীর্ঘ প্রচলিত ব্যবস্থা এবং বেশিরভাগ মানুষ একে স্বাভাবিক বলেই মেনে নিয়েছিল। এথেন্সের স্বাধীন নাগরিক এবং ক্রীতদাসদের মধ্যেকার সম্পর্কে তিক্ততার পরিবর্তে বরং সহমর্মিতাই লক্ষ করা যেত বলে তিনি মনে করেন।

উপসংহার: প্রাচীন গ্রিকরা যে ক্রীতদাসপ্রথার মতো একটি অমানবিক প্রথাকে টিকিয়ে রেখেছিল সে কথাও ঐতিহাসিকভাবে সত্য। একথাও সত্য যে, প্রাচীন গ্রিকদের সার্বিক উন্নতির পেছনে ক্রীতদাসদের অবদানকে অস্বীকার করা চলে না। আর তাই প্রাচীন গ্রিসের সমাজকে 'দাস সমাজ' বলে অভিহিত করাকে একেবারে অযৌক্তিক মনে করা যায় না।

বৈদিক সমাজব্যবস্থায় পেশাগত ভিত্তিতে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশা শূদ্র এই চারটি পৃথক বর্ণের সূচনা হয়। আর্যরা ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈ এই তিনটি বর্ণে বিভক্ত হয় এবং অনার্যরা শূদ্র বলে পরিচিত হয় চতুর্বর্ণ কাঠামোর বাইরেও বহু অস্পৃশ্য মানুষ বাস করত, যারা সমাজের পঞ্চম শ্রেণি বলে পরিচিত হত।

আর্য সমাজে বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণদের কাজ ছিল যাগযজ্ঞ, পূজার্চনা ও অধ্যায়ন-অধ্যাপনা করা। ক্ষত্রিয়দের কাজ ছিল দেশশাসন ও দেশ রক্ষা করা, বৈশ্যদের কাজ ছিল ব্যাবসাবাণিজ্য, কৃষি ও পশুপালন করা এবং শূদ্রদের কাজ ছিল উপরোক্ত তিন শ্রেণির সেবা করা।

মৌর্য-পরবর্তী যুগ থেকে যবন, শক, হুন, কুষাণ ও অন্যান্য বিদেশি জাতিগুলি ভারতে এসে দীর্ঘকাল ধরে ভারতীয় সমাজে বসবাস করে। ক্রমে তারা এখানকার সমাজের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়।তাদের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতিও ভারতীয় সংস্কৃতিতে যুক্ত হলে এক মিশ্র সংস্কৃতির উদ্ভব হয়।

ব্রাত্য হল ভারতের একটি প্রাচীন জনগোষ্ঠী। 'ব্রত' থেকে ব্রাত্য কথাটি এসেছে যার অর্থ হল পতিত বা বিধিবিরোধী গোষ্ঠী। ব্রাত্য জনগোষ্ঠীর মানুষ প্রাকৃত ভাষায় কথা বলত, পশুপালন ও জীবনকে তারা জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করে।

ব্রাহ্মণ কবি চাঁদ বরদাই তাঁর ‘পৃথ্বিরাজ রাসো' কাব্যে বলেছেন যে, বশিষ্ট মুনি মাউন্ট আবু পাহাড়ে চোদ্দো দিন ধরে যজ্ঞ করে বীরের প্রার্থনা করেছিলেন। তাঁর লেখা থেকে জানা যায় যজ্ঞের অগ্নিকুণ্ড থেকেই প্রতিহার, চৌহান, পারমার, চালুক্য, কলচুরি, শোলাঙ্কি প্রভৃতি রাজপুত বীরের জন্ম হয়। রাজপুত জাতির উৎপত্তি সংক্রান্ত এই মতবাদ ‘অগ্নিকুল তত্ত্ব' নামে পরিচিত।

হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পরবর্তীকালে ভারতের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রাজপুত রাজবংশ ছিল আজমির ও দিল্লির চৌহান বংশ, গুজরাটের চালুক্য বংশ, কনৌজের গাহড়বাল বংশ, বুন্দেলখণ্ডের চান্দের বংশ, মালবের পারমার বংশ, গোদাবরীর তীরবর্তী চেদী বংশ, জব্বলপুরের কলচুরি বংশ প্রভৃতি।

ঋগ্‌বৈদিক ও পরবর্তী বৈদিক যুগে নারীশিক্ষারও যথেষ্ট সুযে ছিল। মৌর্য যুগে অভিজাত নারীরা শিক্ষালাভের যথেষ্ট সুযো পেতেন এবং শিক্ষিত নারীরা রাজকার্যেও অংশ নিতেন। গুপ্তযুদ্ধে নারীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ ও প্রশাসনিক কার্য পরিচালনা করতেন। পরবর্তী যুগে নারীশিক্ষা কিছুটা হলেও ব্যহত হয়েছিল।

বেদ শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে যিনি গুরুকুল আশ্রম প্রতিষ্ঠা করছে। তিনি ‘আচার্যা' নামে পরিচিত। পাণিনি এবং কাত্যায়ণ মৌর্য যুদ্ধে নারী শিক্ষিকা বা অধ্যাপিকাকে ‘উপাধ্যায়া' বলে উল্লেখ করেছেন। মনুস্মৃতি অনুসারে, যিনি বেদ শিক্ষাদানের বিনিময়ে প্রাপ্ত বেতন্তে দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি হলেন ‘উপাধ্যায়া'।

মৌর্য যুগে চার প্রকার শাস্ত্রীয় ও চার প্রকার অশাস্ত্রীয় বিবাহরীতি প্রচলন ছিল।

অর্থশাস্ত্রে আট প্রকার বিবাহরীতির উল্লেখ আছে। যথা [1] ব্রাহ্ম, [2] দৈব, [3] আর্য, [4] প্রাজাপত্য, [5] অসুর, [6] গান্ধব [7] রাক্ষস এবং [8] পৈশাচ।

No Content

মৌর্য পরবর্তী যুগে উচ্চবর্ণের পুরুষ ও নিম্নবর্গের নারীর মধে সংঘটিত বিবাহকে ‘অনুলোম’ বিবাহরীতি বলা হত ।

ঋগ্‌বৈদিক ও পরবর্তী বৈদিক যুগে গৃহস্থালির পরিচালনায় নারীর একাধিপত্য ছিল। মৌর্য যুগে নারীরা গৃহস্থালি সামলানোর পাশাপাশি নৃত্য ও সংগীতের শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ পেত গুপ্তযুগে গুরুজনদের সেবা, স্বামীর বন্ধুবান্ধবকে আপ্যায়ন, ভৃত্যদের পরিচালনা, গৃহ পরিষ্কার, গবাদি পশুর দেখাশোনা, প্রাত্যহিক খরচের হিসাব রাখা, সুতো কাটা, কাপড় বোনা প্রভৃতি ছিল নারীদের দৈনন্দিন কাজ ।

 

মনুসংহিতায় ও যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ছয় প্রকার স্ত্রীধনের উল্লেখ রয়েছে। যথা— [1] অধ্যগ্নি, [2] অধ্যবাহনিক, [3] প্রীতিদত্ত, [4] পিতৃদত্ত, [5] মাতৃদত্ত এবং [6] ভ্রাতৃদত্ত অর্থশাস্ত্রে চার প্রকার স্ত্রীধনের উল্লেখ আছে। যথা— [1] শুল্ক, [2] অধিবেদনিক, [3] অন্বাধেয় এবং [4] বন্ধুদত্ত।

স্ত্রীর সম্পত্তিতে স্বামীর কিছু কিছু অধিকার ছিল। স্ত্রী নিজের সম্পত্তি যথেচ্ছভাবে দান করতে চাইলে স্বামী তাতে বাধা দিতে পারত। স্ত্রীর কাছে ২০০০ পণের বেশি অর্থ সঞ্চিত হয়ে গেলে। অতিরিক্ত অর্থ স্ত্রীর হয়ে স্বামী রাখত। স্বামীর অত্যন্ত প্রয়োজনের মুহূর্তে স্ত্রীর সম্পত্তি নিজের হাতে নিতে এবং তা বিক্রি করতে পারত।

 সূচনা: প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায় বিভিন্ন যুগের সমাজে নারীর মর্যাদার উন্নতি বা অবনতি যাই ঘটুক না কেন, প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন যুগে ভারতীয় নারীর শিক্ষাগ্রহণের বিষয়টি মোটামুটিভাবে অব্যাহত ছিল। বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে পরবর্তী দীর্ঘ সময়ের ভারতের নারীশিক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।

প্রাচীন ভারতে নারীশিক্ষা

[1] ঋগ্‌বৈদিক যুগঃ ঋবেদিক যুগে নারীশিক্ষারও যথেষ্ট সুযোগ ছিল। ধর্মচর্চা, চরিত্রগঠন, ব্যক্তিত্বের বিকাশ প্রভৃতি ছিল এই যুগের শিক্ষার উদ্দেশ্য। এযুগে মমতা, ঘোষা, লোপামুদ্রা, বিশ্ববারা, বিশাখা প্রমুখ বিদুষী নারীর কথা জানা যায়। এযুগের নারীরা বেদের অনেক স্রোতও রচনা করেছিলেন।

[2] পরবর্তী বৈদিক যুগ : সামগ্রিকভাবে পরবর্তী বৈদিক যুগে নারীর মর্যাদা হ্রাস পেলেও নারীশিক্ষা ভালোভাবেই চালু ছিল। এযুগে কোনো কোনো নারী উচ্চশিক্ষায় অগ্রণী ছিলেন। যুগের যে সকল নারী বিবাহের আগে পর্যন্ত বিদ্যাচর্চা করতেন, তাঁদের সদ্যোদ্বাহা এবং যাঁরা আজীবন অবিবাহিত থেকে ধর্ম ও দর্শন চর্চা করে জীবন কাটিয়ে দিতেন, তাঁদের ব্রহ্মবাদিনী' বলা হত। এযুগের বিখ্যাত বিদুষী নারী ছিলেন গার্গী, মৈত্রেয়ী প্রমুখ।

[[3] মহাকাব্য ও প্রতিবাদী ধর্মের যুগ: মহাকাব্যের যুগে নারীর মর্যাদা হ্রাস পেলেও এযুগের বহু নারী বিদ্যাতো করতেন। মহাভারতে দ্রৌপদীকে 'পন্ডিতা' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এযুগের অনেক নারী সামরিক শিক্ষাগ্রহণ করতেন। বিনয়পিটকে বৌদ্ধ ভিক্ষুসীদের অক্ষর জ্ঞান অর্জনকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। এযুগের নারীরা সংস্কৃত কাব্য ও নাটকও রচনা করেছেন। ভিন্নসীদের রচিত সংগীতগুলি 'মেরীগাথা' গ্রন্থে সংকলিত আছে। চন্দনা, জয়ন্তী প্রমুখ ছিলেন এযুগের উচ্চশিক্ষিতা নারী।

[4] মৌর্য যুগ : মৌর্য যুগে শিক্ষিত নারীরা রাজকার্যেও অংশ নিতেন। সমকালীন সংস্কৃত সাহিত্যে এমন বহু নারীর উল্লেখ আছে যাঁরা লিখতে, পড়তে ও সংগীত রচনা করতে পারতেন। কোনো কোনো নারী চিত্রশিল্পেও দক্ষ ছিলেন।

[5] মৌর্য-পরবর্তী যুগ: মৌর্য পরবর্তী যুগে অনেক মহিলা উচ্চশিক্ষা লাভ করতেন। পাণিনি বলেছেন যে, এ সময় নারীরা বেদ অধ্যয়ন। করতেন। কাত্যায়ণ তাঁর 'কার্তিক' গ্রন্থে অধ্যাপিকা বোঝাতে 'উপাধ্যায়া' বা 'উপাধ্যায়ী শব্দ ব্যবহার করেছেন। এই সময়ে অনেক অভিজাত মহিলা বৈদিক স্তোত্র, সংস্কৃত কাব্য ও নাটক রচনা করতেন।

[6] গুপ্তযুগঃ বিভিন্ন সাহিত্য থেকে গুপ্তযুগের নারীরা, ইতিহাস ও কাবাচ্চা করত বলে সমকালীন সাহিত্য থেকে জানা যায়। পান প্রযুগের নারীর বোধবুদ্ধিকে তীক্ষ্ণ করত বলে ব্যাৎসায়ন উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, আদর্শ পত্নীকে সুশিক্ষিতা হতে হবে এবং তাঁকে সাংসারিক আয়বায়ের হিসাব রাখতে হবে। গুপ্তযুগে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কন্যা প্রভাবতী গুপ্তার মতো কাশ্মীর, উড়িষ্যা ও অম্লের নারীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ ও প্রশাসনিক কার্য পরিচালনা করতেন। অবশ্য এযুগে সাধারণ দরিদ্র নারীদের শিক্ষার সুযোগ বিশেষ ছিল না। [7] হর্ষবর্ধনের আমল : হর্ষবর্ধনের আমলে চিত্রকলা, নৃত্য, সংগ প্রভৃতি শিক্ষার প্রচলন ছিল। হর্ষবর্ধনের ভগ্নি রাজ্যশ্রী নিয়মিত সংগীত, নৃত্য ও অন্যান্য কলার চর্চা করতেন বলে বানড উল্লেখ করেছেন। নারীরা সাধারণত পিতৃগৃহেই শিক্ষালাভ করত। উপসংহার: ঋগ্‌বৈদিক যুগে নারীরা যে মর্যাদার অধিকারী ছিলেন, তা পরবর্তী বিভিন্ন যুগে বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছিল। নারীসমাজে শিক্ষাগ্রহণের ধারা অব্যহত থাকলেও মযাদায় তারা পুরুষের সমকক্ষ হতে পারেনি। তা ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণ নারীরা বিশেষত দরিদ্র ঘরের নারীরা। শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিতই থেকে গিয়েছিল।

 সূচনা: এম. উইন্টারনিজ, আর ফিক, রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ মনে করেন যে, প্রতিটি যুগের ধর্মব্যবস্থা নারীর তৎকালীন সামাজিক অবস্থানকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছিল।

প্রাচীন ভারতীয় সমাজে নারীর বিবাহরীতি

[1] ঋবৈদিক যুগ : ঋগ্‌বৈদিক যুগের সমাজে নারী যথেষ্ট মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত ছিল। সাধারণভাবে এযুগে নারীর বহুবিবাহ এবং বাল্যবিবাহ প্রচলিত ছিল না। নারীরা স্বাধীনভাবে নিজেদের পতি নির্বাচন করতে পারত। বিধবা নারীদের ক্ষেত্রে দেবরকে বিবাহ করার রীতিও প্রচলিত ছিল। বহু নারী বিবাহ না করে বিদ্যাচর্চা এবং শায়ালোচনার মধ্য জীবন কাটাতেন।

[2] পরবর্তী বৈদিক যুগ : পরবর্তী বৈদিক যুগের সমাজে বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ প্রভৃতির প্রচলন নারীর মর্যাদা হ্রাসের প্রমাণ দেয়। এযুগে নারীর বিবাহ পদ্ধতি ক্রমশ জটিল হয় এবং বিধবাবিবাহের প্রচলন ঘটে। ওষুগে উচ্চ সম্প্রদায়ে বিশেষত রাজপরিবারে বহুবিবাহের রীতি ছিল। উচ্চবর্ণের সঙ্গে সঙ্গে নিম্নবর্ণের অথবা একই বর্ণ বা জাতির মধ্যে বিবাহের রীতি প্রচলিত ছিল। স্বগোত্রে বিবাহের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ ছিল।

[3] মৌর্য যুগ : মৌর্য যুগে চার ধরনের বৈধ বা শাস্ত্রীয় এবং চার ধরনের অশাস্ত্রীয় বিবাহরীতি প্রচলিত ছিল। মেগাস্থিনিসের লেখা থেকে জানা যায়, এসময়ে নিজ জাতি এবং নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাহের প্রচলন ছিল। 'অর্থশাস্ত্র' থেকে জানা যায় যে, এসময় আট ধরনের বিবাহরীতি এবং বিধবা বিবাহের প্রচলন ছিল। 'পরাশর সংহিতা'-য় উল্লেখ করা হয়েছে যে, এযুগে স্বামী সন্ন্যাস নিলে বা নিরুদ্দিষ্ট হলে নারী পুনরায় বিবা করতে পারত।

[4] মৌর্য-পরবর্তী যুগেঃ মৌর্য-পরবর্তী যুগের সমাজে নারীর বিবাহরীতি নিয়ে 'মনুসংহিতাস্মৃতি'-তে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, নারী প্রথম জীবনে পিতার অধীনে, বিবাহের পর স্বামীর অধীনে এবং পরবর্ত জীবনে পুত্রের অধীনে বার্ধক্য জীবন কাটাবে। ‘মনুসংহিতাস্মৃতি রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিবাহিত নারী একান্তভাবেই স্বামীর ওপর নির্ভরশীল। মৌর্যোত্তর সমাজে 'অনুলোম' ও 'প্রতিলোম' —এই দুই বিবাহরীতিরই প্রচলন ছিল।

[5] গুপ্তযুগ : গুপ্তযুগে যৌবনপ্রাপ্তির আগে ও পরে, এই দুই অবস্থাহে নারীদের বিবাহ দেওয়ার রীতি ছিল। পুরুষপ্রধান সমাজে পুরুষরা একাধিক পত্নী গ্রহণ করতে পারতেন। স্মৃতিশাস্ত্রের বিধান অমান্য করেও এযুগে অনুলোম ও প্রতিলোম বিবাহরীতি চালু ছিল। কন্যাদের বিবাহের সাক্ষ্য পাওয়া যায়। সাধারণত ব্রাহ্ম, প্রাজাপত্য, আর্য ও দৈব—এই চার ধরনের বিবাহরীতি অধিক প্রচলিত ছিল। তবে রাজপরিবারগুলির মধ্যে গান্ধর্ব মতে বিবাহ হত বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

[6] গুপ্ত-পরবর্তী যুগ: এযুগে সাধারণত ১২ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মেয়েদের বিবাহের আয়োজন করা হত। উচ্চবিত্ত সমাজে বিধবাদের পুনরায় বিবাহের রীতি প্রচলিত ছিল। গুজর প্রতিহার সমাজে সাধারণত নারীদের বিবাহ হত স্ববর্ণে, কিন্তু ভিন্ন গোত্রে । পাল-সেন যুগে বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ, বর্ণ ও অক্ষবণ বিবাহরীতি (অনুলোম ও প্রতিলোম) প্রচলি ছিল। বিবাহে যৌতুক দানের প্রথা ছিল। কৌলিন্য প্রথার সুযোগ নিয়ে কুলীন ব্রাহ্মণরা একাধিক বিবাহ করত।

উপসংহার: পরবর্তী বিশেষত নি আমলে হিন্দু-মুসলম সমাজে মেয়েদের কম বয়সে বিয়ে দেওয়া হত। তুর্কি অভিজাতদের নানান গোষ্ঠীর মুসলমানরা হিন্দু নারীদের বিবাহ করেছিলেন।

সূচনা: প্রাচীন ভারতে নানা সময়ে নারীর সামাজিক অবস্থান বদলেছে। প্রাচীনকালে রচিত প্রাচীন সাহিত্যেও নারীর সামাজিক অবস্থানের পরিচয় মেলে।

প্রাচীন ভারতে নারীর সামাজিক অবস্থান

[1] বৈদিক সমাজেঃ ঋবৈদিক সমাজে বিয়ের আগে বাবা বা ভাই আর বিয়ের পর স্বামী বা ছেলের তত্ত্বাবধানে মেয়েদের জীবন কাটত। ঋগ্‌বৈদিক সমাজে পতি নির্বাচনে মেয়েরা স্বাধীনতা ভোগ করত। স্বামীর মৃত্যুতে নিঃসন্তান স্ত্রী দেওরকে বিয়ে করতে পারতেন। গৃহস্থালির ব্যাপারে স্ত্রীই ছিলেন সর্বময় কর্ত্রী। সেই যুগে সামাজিক উৎসব-অনুষ্ঠানে অবাধে যোগ দেওয়ার, এমনকি যুদ্ধে অংশগ্রহণের অধিকারও তাঁদের ছিল। ধর্মীয় কাজে স্ত্রীরা স্বামীকে সাহায্যে করতেন। ঋগ্‌বৈদিক যুগে শিক্ষাক্ষেত্রেও মেয়েদের ভূমিকা ছিল উজ্জ্বল। ঘোষা, অপালা, বিশ্ববারা প্রমুখ মহিলার বিভিন্ন শাস্ত্রে বিশেষ জ্ঞান ছিল। তাঁদের কেউ কেউ বৈদিক মন্ত্রও রচনা করে ছিলেন।

[2] পরবর্তী বৈদিক সমাজেঃ পরবর্তী বৈদিক যুগে নারীর সামাজিক মর্যাদা অনেকখানি হ্রাস পেয়েছিল। পরিবারে কন্যাসন্তানের জন্ম কেউ চাইত না। অনেকক্ষেত্রে তাদের সম্পত্তির অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হত। 'ঐতরেয় ব্রাহ্মণ'- উল্লেখ রয়েছে যে, কন্যা হল অভিশাপ। নারীদের কাছে শিক্ষার দ্বার কিছুটা সংকুচিত হলেও সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে যায়নি। সেই যুগে গাগী ও মৈত্রেয়ী উচ্চশিক্ষায় পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন।বাল্যবিবাহ,পুরুষের বহুবিবাহ ও পণপ্রথা নারীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। নারীরা বেদ পাঠের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।

[3] মৌর্য যুগে : মৌর্য যুগে অভিজাত বংশীয় নারীরা লেখাপড়া শিখত। এযুগে নারীরা সামরিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারত। ব্রাহ্মণ পরিবারের। মেয়েদের বিদ্যা অর্জনের যথেষ্ট সুযোগ ছিল। মৌর্য যুগে নারীরা সম্পত্তির অধিকার পেত। 'অর্থশাস্ত্র' তে দুই ধরনের স্ত্রীধনের কথা বলা হয়েছে। যথা— বৃত্তি (জীবিকা চালানোর উপায়) এবং আকথা (আস্তরণ ও অলংকারাদি)। এযুগে স্বামী মারা গেলে স্ত্রী শ্বশুরের অনুমতি না নিয়ে: দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে পারতেন। স্বামী দুশ্চরিত্র বা চিরপ্রবাসী বা ক্লাব হলে নারী সেই স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করতে পারতেন। তোরা বিভিন্ন হস্তশিল্পের কাজও করত। গৃহে অতিথি এলে তার সেবা করা ছিল। নারীর প্রধান কর্তব্য। গৃহলক্ষ্মীর ভূমিকা সামলানোর পাশাপাশি নারীরা স্বামীর সঙ্গে বিভিন্ন যজ্ঞানুষ্ঠানেও যোগ দিতে পারত।

[4] মৌর্য-পরবর্তী যুগেঃ যৌথ-পরবর্তী যুগে অনেক মহিলা উচ্চশিক লাভ করতেন। পাণিনি বলেছেন যে, এই সময় নারীরা বেদ অধ্যয়ন করতেন। সমাজে নারীর বিবাহরীতি নিয়ে বেশকিছু পরস্পরবিরোধী হা রয়েছে। সমাজে 'অনুলোম' ও 'প্রতিলোম’—এই দুই বিবাহরীতির প্রচলন ছিল। এযুগে স্ত্রীকে সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে আনতে হয়। স্বামী ছাড়াও শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা, দাসদাসীদের কাজের তদারবি করা, গৃহ পরিষ্কার রাখা তাদের অন্যতম কর্তব্য ছিল।

[5] গুপ্তযুগেঃ গুপ্তযুগে কেবল স্বামীর অনুমতি সাপেক্ষে স্ত্রী বিন্নি সামাজিক অনুষ্ঠান, উৎসব ও ধর্মীয় শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে পারত। মেয়েদের সবর্ণে বিবাহের পাশাপাশি স্বামী নির্বাচনেরও অধিকার ছিল। মনুস্মৃতি এবং মহাকাব্য দৃষ্টিতে নারীর সম্পত্তির অধিকার স্বীকা করা হলেও সামগ্রিকভাবে এযুগে নারীর সামাজিক অবস্থানের প্রকল ঘটেছিল। ওযুগে দেবদাসীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। যুগে য মহিলাদের উচ্চশিক্ষালাভের সুযোগ ছিল। "অমরকোষ প্রশ্নে শিক্ষিকাদে 'উপাধ্যায়া' ও 'আচার্যা' বলা হত বলে উল্লেখ রয়েছে।