Chapter -7⇒জলদূষণ

উ:- জলদূষণের ফলাফলগুলি হল নিম্নলিখিত :

1)রোগ সৃষ্টি :

A জলবাহিত রোগসমূহ : (i) ব্যাকটেরিয়া থেকে প্যারাটাইফয়েড, কলেরা প্রভৃতি এবং জীবাণুঘটিত আন্ত্রিক, আমাশয় রোগ সৃষ্টি হয়। (ii) জলবাহিত ভাইরাস থেকে হেপাটাইটিস, টাইফয়েড প্রভৃতি রোগের সৃষ্টি হয়। (iii) জলবাহিত প্রোটোজোয়া থেকে অ্যামিবিয়া জাতীয় জীবাণুঘটিত জিয়ার্ডিয়া রোগের সৃষ্টি হয়।

B অজৈব রাসায়নিক পদার্থঘটিত রোগসমূহ : (i) জলবাহিত আর্সেনিক থেকে চর্মরোগ, রক্তাল্পতা, ত্বক, ফুসফুস, যকৃৎ-এ ক্যানসার হয়। (ii) পারদের ক্ষতিকারক প্রভাবে স্নায়ুতন্ত্রের রোগ; পেশির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা লোপ; হাত, পা, জিভ ও ঠোঁটের প্যারালাইসিস; অবসাদ; মানসিক দৌর্বল্য দেখা দেয়। (iii) পানীয় জলে অজৈব রাসায়নিক পদার্থ ক্লোরিন থাকলে তা মানব শরীরে বিষক্রিয়া ঘটায়। (iv) ক্যাডমিয়াম জলে সংক্রামিত হলে সন্ধিস্থলে তীব্র যন্ত্রণা, বিপাকীয় অস্বাভাবিকতা, রক্তচাপ বৃদ্ধি প্রভৃতি উপসর্গ এবং বৃক্ক ও ফুসফুসের রোগ হয়। (v) জলে সিসার বিষক্রিয়ায় রক্তাল্পতা, শিশুর বৃদ্ধি লোপ, মাথার চুল নষ্ট হয়ে যায়। (vi) শরীরে জলবাহিত নাইট্রেট ও নাইট্রাইটের মাত্রা বেড়ে গেলে রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ খুব কমে যায়, অন্ধ্রে ও যকৃৎ-এ ক্যানসার হয়। (vii) ফ্লুওরাইড থেকে হাড় ও দাঁতে ফ্লুরোসিস রোগ সৃষ্টি হয়। (viii) জলে ক্রোমিয়ামের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে চর্মরোগ ও ক্যানসার হয়। (ix) জলে লোহার পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে অম্ল, কোষ্ঠকাঠিন্য, পাইল্স প্রভৃতি রোগ হয়।

2)সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর প্রভাব : জলদূষণে সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের ওপর বিশেষ প্রভাব পড়ে বলে ক্ষুদ্র প্ল্যাংকটন থেকে শুরু করে বিভিন্ন আকৃতির মাছ এবং সামুদ্রিক পাখি এর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়।

3)কৃষিক্ষেত্রে প্রভাব : কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত দূষিত জল উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুদের ধ্বংস করে। ফলে মৃত্তিকার উর্বরতা বিনষ্ট হয়, যা ফসলের উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস করে।

4)জলজ বাস্তুতন্ত্রের ওপর প্রভাব : দূষিত জলে অক্সিজেন ও পুষ্টি মৌলের অভাব হলে জলজ প্রাণীসহ শৈবাল, কচুরিপানা ইত্যাদি জলজ উদ্ভিদের মৃত্যু ঘটে।

5)পাখিদের ওপর প্রভাব : দূষিত জলের মাছ, পোকামাকড় ভক্ষণ করলে পাখিদের ওড়ার ক্ষমতা নষ্ট হয়, পালক খসে যায় ও শীতে পাখি মারা যায়।

উ:- নিম্নলিখিত উপায় অবলম্বন করে জলদূষণ রোধ করা যায়, যেমন-

1)আবর্জনা নিক্ষেপ বন্ধ করা : পুকুর, নদী, হ্রদ, খাল, বিল বা অন্যান্য জলাশয়ে নোংরা আবর্জনা নিক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

2)ডিটারজেন্টের ব্যবহার বন্ধ করা : কোনো পুকুর বা জলাশয়ে ডিটারজেন্ট দিয়ে কাপড় কাচা বন্ধ করা দরকার।

3)অতিরিক্ত কীটনাশকের প্রয়োগ কমানো : কৃষিক্ষেত্রে অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ রোধ করতে হবে পাশাপাশি সেই কীটনাশক মিশ্রিত জল যাতে কোনো জলাশয়ে না মেশে সেদিকেও নজর দিতে হবে।

4)জলাশয় ভরাট না করা: কোনো নোংরা আবর্জনা দিয়ে পুকুর বা জলাশয় ভরাট করা চলবে না।

5)তেলবাহী জাহাজ নিয়ন্ত্রণ : সমুদ্রে খনিজ তেলবাহী জাহাজ চলাচল যেমন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে তেমনি সেই জাহাজ নিঃসৃত তেল যাতে সমুদ্রে না মেশে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

6)মৃতদেহ নিক্ষেপ বন্ধ করা : জলাশয়ে বিভিন্ন জীবজন্তুর মৃতদেহ যাতে না ফেলা হয় সে বিষয়ে সকলকে নজর দিতে হবে।

7)শিল্পক্ষেত্রের বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ : কোনো শিল্পকেন্দ্র বা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের দূষিত বা উত্তপ্ত জল সরাসরি নদী বা সমুদ্রে নিক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

8)দূষিত জল শোধন করা : বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যে-কোনো অঞ্চলের দূষিত জলকে দ্রুত শোধন করতে হবে। যেমন- ভারতের পুণে শহরের পিম্পরি চিঞওয়াদ অঞ্চলে পানীয় জল ছাড়া অন্য সব কাজের আগে ব্যবহৃত জলকে পুনর্ব্যবহারের কাজে লাগাবার পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে।

9)আইন প্রণয়ন : পুকুর, নদী, হ্রদ, কিংবা অন্য কোনো জলাশয়ে আবর্জনা নিক্ষেপ, পশুস্নান, বাসনমাজা আইন করে বন্ধ করতে হবে এবং 1947 সালের জলদূষণ আইন মান্য করতে হবে।

10)সার্বিক সচেতনতা বৃদ্ধি : জলদূষণের ব্যাপারে স্ত্রী-পুরুষ, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলকে সচেতন করে তুলতে হবে।

11)অন্যান্য : (i) ভৌমজলের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি। (ii) পারমাণবিক ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্য উষ্ণ জল শীতল করার পর নদী বা সমুদ্রে নিক্ষেপ করলে জলের তাপীয় দূষণ রোধ করা যাবে।

উঃ-কয়েকটি সহজ উপায়ে অনায়াসেই জল পরিশ্রুত করা যায়। উপায়গুলি হল – 1)জলকে 100°C উন্নতায় 10-15 মিনিট ফুটিয়ে নিলে জলের অধিকাংশ জীবাণু নষ্ট হয়ে যায়। 2)নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্লোরিন জলে ব্যবহার করলেও জল জীবাণুমুক্ত হয়।3)নুড়িপাথর, কাঠকয়লা, সূক্ষ্ম বালি প্রভৃতি মাটির হাঁড়িতে দিয়ে ঘরেই ফিলটার তৈরি করে জল পরিসুত করা যায়।4 ) ঘোলা জল কয়েক ঘণ্টা রেখে। দিলে বালি, কাদা প্রভৃতি কণা নীচে থিতিয়ে পড়ে। তারপর ওপরের পরিষ্কার জল সাবধানে আলাদা পাত্রে ঢেলে নিয়ে ব্যবহার করা যায়। 5)মশুর ডাল, অড়হর ডাল, কড়াইশুঁটি প্রভৃতি গাছ জলভরতি পাত্রে রাখলে জলের নোংরা সহজেই নীচে থিতিয়ে পড়ে এবং ওপরে পরিষ্কার জল থেকে যায়।6)পাতলা প্লাস্টিকের বোতলে জল ভরে রোদে কয়েক ঘণ্টা রেখে দিলেও ফোটানো জলের প্রায় সমতুল্য বিশুদ্ধ জল পাওয়া যায়।7)অতিবেগুনি রশ্মির প্রয়োগযুক্ত পরিস্রাবক যন্ত্র বা জিওলিন জাতীয় তরল ব্যবহার করলে বিশুদ্ধ ও জীবাণুমুক্ত জল পাওয়া যায়।8)পানীয় জলে ফটকিরি মেশালে ভাসমান পদার্থ, যেমন— কাদামাটি, সূক্ষ্ম বালি, জীবাণু কিছু পরিমাণ দূর করা সম্ভব।

উঃ-নিম্নলিখিত উপায়ে জলকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলা যাবে – 1)বাড়িতে ব্যবহৃত জল (ডিটারজেন্ট মুক্ত জল) কৃষিক্ষেত্রে এবং কলকারখানার মেশিন ঠান্ডা করতে ব্যবহার করা যায়। 2)কলকারখানা থেকে নির্গত গরম জল নিকটস্থ জলাশয়ে সংরক্ষণ প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে। 3)ড্রেনের জল সংরক্ষণ ও পরিস্রত করে ঠান্ডা করতে হবে, সেই ঠান্ডা জল পুনরায় কারখানার মেশিনের (Filter) করে কৃষিক্ষেত্রে, যানবাহন (ট্রেন, বাস, বাইক) ধোয়ার কাজে ব্যবহার করতে হবে। 4)নোংরা ময়লা জল কোনো জলাশয়ে সঞ্চয় করে সেখানে মাছ চাষ করা যায়। উল্লেখ্য ক্ষারযুক্ত জলে অনেক মাছ স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারে। 5)বৃষ্টির জলকে টিন বা প্লাসটিকের শেড ব্যবহার করে উপযুক্ত ভাবে ট্যাংক-এ জমা করে পুনর্ব্যবহার করা যেতে পারে।6)সবজি ধোয়া ও হাত ধোয়ার জলকে শুদ্ধিকরণ (Refine) করে পুনরায় গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করা যায়।7)নদনদী, জলাশয়, সমুদ্রের জলকে বিশুদ্ধ (Purify) করে পুনরায় পানীয় জল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

 

 

উ:- সামুদ্রিক জল দূষিত হওয়ার কারণগুলি হল- 1)কোনো শিল্পক্ষেত্রে দূষিত বর্জ্য সরাসরি সমুদ্রে নিক্ষেপ করলে সামুদ্রিক জল দূষিত হয়। 2)সমুদ্র সন্নিকটে কোনো পারমাণবিক কেন্দ্র থাকলে স্থানীয় সমুদ্রের জল দূষিত হয়।3)গৃহস্থালির নোংরা আবর্জনা কোনো নদীর মাধ্যমে সমুদ্রে পতিত হলে সামুদ্রিক জল দূষিত হয়।4) বিভিন্ন তেলবাহী জাহাজ নিঃসৃত তেল সমুদ্রের জলে মিশে সেই জলকে দূষিত করে তোলে।

উ:- ভারতের জাতীয় সম্পদ তথা সবচেয়ে দীর্ঘতম নদী গঙ্গা। বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে গঙ্গার জল দূষিত হচ্ছে, যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধি সপ্তম পরিকল্পনায় 1986 সালের 14 জুন গঙ্গার তীরে বারাণসী শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গঙ্গা উন্নয়ন প্রকল্পের’ (Ganga Action Plan) শুভ সূচনা করেন।

কর্মসূচি : এই প্রকল্পের কর্মসূচিগুলি হল –1) নর্দমার ও খালের দূষিত জল সরাসরি গঙ্গায় না ফেলা, 2) দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত জল ও শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য জল দূষণমুক্ত করে গঙ্গায় ছাড়তে হবে, 3)স্নানের ঘাট মেরামত ও সৌন্দর্যায়ন করা, 4)শ্মশান ঘাটে বৈদ্যুতিক চুল্লি নির্মাণ করা, 5)স্যানিটারি-শৌচাগার নির্মাণ করা, 6)গঙ্গার ভাঙন প্রতিরোধ করা ও গঙ্গার পাড় বাঁধানো, 7)শিল্পকেন্দ্রগুলির দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা, 8)গঙ্গায় ন্যূনতম জলপ্রবাহের ব্যবস্থা করা, 9)জনমত গঠন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা, 10)উপযুক্ত কঠোর ‘পরিবেশ আইন প্রণয়ন ‘ ও আইনের বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

উ:- পুকুরের মাছ মাঝে মাঝে মরে যেতে দেখা যায়। তার কারণ হল-

1)জলে অক্সিজেনের অভাব : কোনো উন্মুক্ত পুকুরে ক্রমাগত পলি জমতে থাকলে জল খোলা হয়ে যায় ও পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাব দেখা যায়।

2)ইউট্রোফিকেশন : ইউট্রোফিকেশনের ফলে পুকুরে কচুরিপানা সহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদে পূর্ণ হলে জল পড়ে যায় ও দুর্গন্ধ হয়।

3)কৃষিকার্যের দ্বারা দূষণ: কৃষিজমির মধ্যে যেসব পুকুর থাকে সেইসব পুকুরের জলে কৃষিজমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মিশে যায়।

4)শিল্পকার্যের দ্বারা দূষণ: কোনো শিল্প কলকারখানার নিকটবর্তী পুকুরে শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য পদার্থ ও গরম জল ক্রমাগত পড়তে থাকলে পুকুর দুষিত হয়ে পড়ে।

উ:-সমুদ্রের জলদূষণের কয়েকটি কুপ্রভাব হল- 1)1932 সালে জাপানের মিনামাটা উপসাগরে রং কারখানা থেকে নিঃসৃত পারদ দ্বারা জলদূষণের ফলে প্রায় 30 বছর ধরে বহু মানুষ ও জীবজন্তু মারা গেছে।2)উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ে কুয়েতের খনিজ তেলের কূপ জ্বালিয়ে দেওয়ার ফলে প্রচুর খনিজ তেল পারস্য উপসাগরে মিশে অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে।3)হলদিয়ায় পেট্রোরসায়ন শিল্প গড়ে ওঠায় হলদি নদীর মোহানায় ইলিশ মাছের আগমণ কমে গেছে।4)কেরালার কুটুনারে, ওড়িশার চিল্কায়, অন্ধ্রপ্রদেশের কোলেরুতে কীটনাশক থেকে প্রচুর মাছ মরে গেছে।

উ:- জীবাশ্ম জ্বালানির (কয়লা, খনিজ তেল প্রভৃতি) দহনের ফলে উৎপন্ন কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2), নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড (NO2), সালফার ডাইঅক্সাইড (SO2) প্রভৃতি দুষিত গ্যাস বায়ুতে মিশে বায়ুদূষণ ঘটায়। এই দুষিত গ্যাস বায়ুমণ্ডল, জলীয় বাষ্পের সঙ্গে মিশে যথাক্রমে কার্বনিক অ্যাসিড (N2CO3), নাইট্রিক অ্যাসিড (HNO3) ও সালফিউরিক অ্যাসিড (N2SO4) তৈরি হয়। এই অ্যাসিড বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে অ্যাসিড বৃষ্টি বা অম্লবৃষ্টির সৃষ্টি করে। এই অম্লবৃষ্টি জলের সঙ্গে মিশে জলদূষণ ঘটায়।

জলদূষণের ওপর অম্লবৃষ্টির প্রভাব : 1)অ্যাসিড বৃষ্টি হ্রদ, নদী, পুকুরের জলে মেশার ফলে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ আক্রান্ত হয়। অধিক অম্লত্বের ফলে রুই, মৃগেল, চিংড়ি, ইলিশ প্রভৃতি মাছ মারা যায়।2)জলের অধিক অম্লত্বের কারণে জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের উপযোগী সবুজ শৈবাল এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া মারা যায়। ফলে জলাশয়ের সমগ্র বাস্তুতন্ত্রের বিনাশ ঘটতে পারে।3)অধিক অম্লবৃষ্টি মেশার ফলে জলাশয়ের জৈব বস্তুর বিয়োজন কমে যায়। এই কারণে, হ্রদ, নদী বা অন্যান্য জলাশয়ে সঞ্চিত জৈববস্তুর পরিমাণ বাড়ে এবং জলদূষণ সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে জলাশয় বন্ধ্যা হয়ে যেতে পারে।4)জলের অম্লত্ব বৃদ্ধি পেলে তামা, দস্তা, সিসা, ক্যাডমিয়াম প্রভৃতি ভারী ধাতুর ঘনত্বের সহনমাত্রা হ্রাস পায়। ফলে জলদূষণ ঘটে।

উঃ- যে তিনটি জরুরি বিষয় মেনে চললেই জলবাহিত সংক্রমণ প্রায় আটকানো যায় তা হল– 1)বিশুদ্ধ পানীয়জল পান করা। 2)সাধারণ কিছু পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা। যেমন— খাবার আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, পরিষ্কার পাত্রে, জল রাখা ইত্যাদি। 3)শৌচাগার ব্যবহার করা এবং নোংরা আবর্জনা সঠিক স্থানে ফেলা।

 

উ:- আর্সেনিক একপ্রকার বিষাক্ত ধাতব যৌগ পদার্থ। প্রতি লিটার জলে 0-05 মিলিগ্রামের বেশি আর্সেনিক থাকলে জলটি আর্সেনিক দূষিত বলে গণ্য করা হয়।

দূষণ প্রক্রিয়া : মাটির অগভীর স্তর থেকে অবৈজ্ঞানিক প্রথায় ক্রমাগত জল তুললে মাটিতে ফাঁকা জায়গা সৃষ্টি হয়। ফলে মাটির এই স্তরে থাকা নানারকম আর্সেনিক ও ক্লোরাইড যৌগ বাতাসের সংস্পর্শে এসে আর্সেনিক, আর্সেনাইট ইত্যাদি জলে দ্রবণীয় বিষাক্ত যৌগে পরিণত হয় এবং পানীয় জলের সঙ্গে মিশে জলদূষণ ঘটায়।

প্রভাব : 1)মানুষের ত্বক, স্নায়ুতন্ত্র ও রক্তনালিতে অস্বাভাবিকতা, 2) হাতের চেটো, পায়ের তলায় কালো ছোপ (ব্ল্যাকফুট ব্যাধি), 3)বুকে, পিঠে, হাত-পায়ের স্থানে স্থানে চামড়ার ওপর শুকনো ঘা, 4)ফুসফুসে প্রদাহ, ব্রংকাইটিস, অ্যাজমা, 5)যকৃতের পচন, ত্বক, মূত্রথলির ক্যানসার ইত্যাদি।

উ:- প্লাস্টিক কার্বনের পলিমার যৌগ থেকে তৈরি হয়। এই যৌগ কখনোই অন্য উপাদানের সঙ্গে মিশতে পারে না তাই বহুদিন প্লাস্টিক অপরিবর্তিত থাকে। বহুল ব্যবহৃত এই প্লাস্টিক পরিবেশ দূষণ ঘটায়।

প্লাস্টিক দূষণের প্রভাব :  1)রাস্তায় বা নর্দমায় ফেলে। দেওয়া প্লাস্টিক জলপ্রবাহে বাধা দেয়। ফলে ওই জমা জলে মশার উপদ্রব বাড়ে।2)জলাশয় বা পুকুরে ভাসা প্লাস্টিক জলের মধ্যে সূর্যালোক প্রবেশে বাধা দেয় ফলে জলে বসবাসকারী উদ্ভিদ ও প্রাণী। মারা যায়। 3)নদীর স্বাভাবিক গতিপথে প্লাস্টিক বাধা দেয় ফলে জলে জমে থাকা জৈব বস্তুর পচন ঘটে জলদূষণ ঘটায়।

প্লাস্টিক দূষণ রোধে গৃহীত ব্যবস্থা : 1)আইন করে প্লাস্টিক উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।2)প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাগজ, চটের ব্যাগ ব্যবহার করতে রাস্তাঘাট,নর্দমায় প্লাস্টিক দ্রব্য না ফেলে নির্দিষ্ট ফেলতে হবে।3)প্লাস্টিকের ক্ষতিকারক প্রভাব সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে।

উ:- যে পদ্ধতিতে কোনো জলাশয়ে রাসায়নিক পদার্থ প্রধানত ফসফেট মেশার ফলে জলজ উদ্ভিদের (মূলত শৈবাল) বৃদ্ধি ঘটে এবং জলে অক্সিজেনের পরিমাণ হ্রাস পায়, তাকে ইউট্রোফিকেশন বলে। মূলত ঘনবসতিযুক্ত অঞ্চল থেকে নির্গত বর্জ্য জলে প্রচুর পরিমাণে সাবান বা ডিটারজেন্ট থাকে যার অন্যতম উপাদান হল ফসফেট যৌগ। জলজ উদ্ভিদ সেগুলোকে পুষ্টিদ্রব্য হিসেবে কাজে লাগায়। ফলে জলে আগাছা ও শৈবাল বৃদ্ধি পায়। এতে জলে 02 হ্রাস পায় ও CO2 বৃদ্ধি পায়। ফলস্বরূপ জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ মারা যায় এবং জলাশয় ভরাট হয়ে অগভীর জলাভূমিতে পরিণত হয়।

উ:- অ্যালগাল ব্লুম প্রকৃতপক্ষে জলে বিভিন্ন আণুবীক্ষণিক শৈবালের দ্রুত বংশবৃদ্ধিকে বলা হয়। অ্যালগাল ব্লুম স্বচ্ছ পরিষ্কার জলে এমনকি সামুদ্রিক পরিবেশেও দেখা যেতে পারে। স্বল্প সংখ্যক ফাইটোপ্ল্যাংকটন এই প্রজাতির অন্তর্গত। স্বচ্ছ জলে ও সমুদ্রে যে শৈবালের আধিক্য দেখা যায় তা কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত কীটনাশক ও সারের দূষণের ফলে সৃষ্টি হয়। অ্যালগাল ব্লুম বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের জীবনে কুপ্রভাব সৃষ্টি করে। এর বর্ণ সাধারণত সবুজ হয় তবে শৈবালের প্রজাতির উপর ভিত্তি করে এর বর্ণ হলদে-বাদামি বা লাল হতে পারে। উজ্জ্বল সবুজ ব্লুম প্রকৃতপক্ষে সায়ানোব্যাকটেরিয়া নামক আণুবীক্ষণিক জীব।

উ:- বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণের জন্য ভারতে

জলসংকট দেখা দিয়েছে। কারণগুলি হল –

1)বিশ্ব উষ্ণায়নজনিত কারণে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে, ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু আগমনের অনিশ্চয়তা হেতু বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে।2)ভারতে জনবিস্ফোরণ হওয়ায় মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মের জন্য জলের ব্যবহার অত্যধিক বেড়েছে।3)জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত কারণে বনভূমি হ্রাসের ফলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। 4)কৃষিক্ষেত্রের সম্প্রসারণ এবং একই জমিতে সারা বছর ধরে মরশুমি ফসল ফলানোর জন্য অত্যধিক জল উত্তোলিত হচ্ছে। 5)বিশ্ব উষ্ণায়নজন্য হিমালয় পার্বত্য উপত্যকার তুষার স্তূপের গভীরতা ও প্রসার হ্রাস পেয়েছে। ফলে তুষারগলা জলের সরবরাহ হ্রাস পেয়েছে। 6)ভারতে জলের পুনর্ব্যবহারের পরিকল্পনা তেমন নেই।7)নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে জলের চাহিদাও অত্যধিক বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং উন্মুক্ত ভূপৃষ্ঠ কংক্রিট দিয়ে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে, ফলে জলের প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভূগর্ভে জল সঞ্চিত হতে পারছে না।

উ:- পরিবেশের অবাঞ্ছিত পদার্থ জলে মিশে তার ভৌত, রাসায়নিক ও জৈব বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন ঘটায় এবং ফলস্বরূপ উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা যায়, তবে জলের ওই অবস্থাকে জলদূষণ বলে। বিজ্ঞানী স্যাডউইক-এর মতে “মানুষের কর্মকাণ্ড ও প্রাকৃতিক কারণে জলের প্রাকৃতিক, রাসায়নিক এবং জৈব উপাদানগুলির গুণমান নষ্ট হওয়াকে জলদূষণ বলে”।

উ:- ভূপৃষ্ঠীয় দূষিত জল অনুস্রাবণের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ জলের সঙ্গে মিশে গিয়ে নানা ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক, জৈব, অজৈব দূষক ভৌমজলে মিশে গিয়ে ভৌমজলকে দূষিত করে তোলে। শিল্পকেন্দ্রের বর্জ্য পদার্থ, আবর্জনা, তৈলকূপ, কৃষিক্ষেত্রে কীটনাশক, রাসায়নিক সার, ময়লা জলের কূপ, সেপটিক ট্যাংক ভৌমজল দূষণের প্রধান উৎস। মানুষের পানীয় জলের প্রধান উৎস ভৌমজল, তাই ভৌমজল দূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।

উ:- দূষণের ফলে জলের রং বদলে যায়, জল ঘোলাটে হয়, স্বাদ বদলে যায়, দুর্গন্ধ তৈরি হয়। যেমন— খুব দূষিত জলের রং লাল আর কিছুটা কম দূষিত জল সবুজ হয়। জৈব অ্যামাইন মিশ্রিত জলে আঁশটে গন্ধ, হিউমাস মিশ্রিত জলে সোঁদা গন্ধ, হাইড্রোজেন সালফাইড, অতিমাত্রায় ফসফরাস মিশ্রিত জলে পচা ডিমের গন্ধ পাওয়া যায়।

উ:-প্লাস্টিক জৈব অবিশ্লেষ্য হওয়ায় নষ্ট হয় না। মানুষের ব্যবহৃত এই প্লাস্টিক নর্দমার তলদেশে ও মুখে জমতে থাকে। ফলে নর্দমার বর্জ্য পদার্থ মিশ্রিত জল নিষ্কাশিত হতে পারে না। এই ঘটনাকে ক্লগিং বা নর্দমার বাধা বলে।

প্রভাব : 1)নর্দমায় নোংরা জল, মল মূত্র জমে পরিবেশ দূষণ ঘটায়।2)বর্ষায় নর্দমার বর্জ্য জল ছাপিয়ে গিয়ে রাস্তায় বাড়িতে প্রবেশ করে।3)নর্দমায় জল আবদ্ধ হয়ে থাকার ফলে মশা মাছির উপদ্রব বৃদ্ধি পায় এবং মানুষ নানান রোগে আক্রান্ত হয়।

উ:- সামুদ্রিক তৈলখনি অঞ্চলে বা সমুদ্রে খনিজ তেল পরিবহনকারী জাহাজ বা ট্যাঙ্কারগুলিতে দুর্ঘটনা ঘটলে অথবা খনিজ তেল পরিবহনকারী পাইপ ফেটে গেলে খনিজ তেল সমুদ্রের জলে মিশে জলকে দূষিত করে। খনিজ তেল জলের সঙ্গে অক্সিজেনকে ভালোভাবে মিশতে দেয় না। ফলে সামুদ্রিক জীবেরা মারা যায়। এই ঘটনা Oil Spilling নামে পরিচিত। প্রসঙ্গত, বিশ্বব্যাপী সমুদ্রে প্রতিবছর প্রায় 3.2 মিলিয়ন মেট্রিকটন খনিজতেল দ্বারা সমুদ্রে Oil Spilling সংক্রমণ ঘটে থাকে।

উ:- 1932 সালে জাপানের মিনামাটা উপসাগরে একটি রং কারখানা থেকে পারদ দূষণের জন্য ওই পারদ সামুদ্রিক মাছের দেহে কেন্দ্রীভূত হয়। উপকূলের অধিবাসীরা ওই মাছ খাওয়ার ফলে এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় এবং তাদের মধ্যে অনেকের মৃত্যু হয় ও অনেকে বিকলাঙ্গ হয়ে যায়। একে মিনামাটা ব্যাধি বলা হয়।

উ:- আর্সেনিকের প্রভাবে দূষিত জল পানীয় ও খাদ্যের মাধ্যমে আমাদের দেহে প্রবেশ করার ফলে হাতের চেটো ও পায়ের পাতায় কালো ছোপ ছোপ দাগের সৃষ্টি হয়। একেই ব্ল্যাকফুট রোগ বলে। এই রোগে আক্রান্ত মানুষের ত্বকের উদ্দীপনা ধীরে ধীরে কমে যায়।

 উ:-জলে ক্যাডমিয়ামের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে মানবদেহে ক্যাডমিয়ামের সংক্রমণ হয়। এর ফলে যে রোগ সৃষ্টি হয় তাতে অস্থি ভঙ্গুর হয়ে যায় ও অস্থিমজ্জার সমস্যা ঘটে। বসতে গেলে বা উঠে দাঁড়াতে মানুষের অস্থিসন্ধিতে অসহ্য যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়। এই রোগটিকে ইতাই-ইতাই’ বা ‘আউচ-আউচ’ রোগ বলে।

 উ:-আর্সেনিক দূষণের কারণগুলি হল ↑ অতিরিক্ত ভৌমজল উত্তোলন, ও অতিরিক্ত পরিমাণে অ্যামোনিয়া, ফসফেট, সালফেট সমৃদ্ধ রাসায়নিক সারের ব্যবহার, ও অতিরিক্ত কীটনাশক, আগাছানাশক, ছত্রাকনাশক ব্যবহার, ও অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, সিসা, সোনা নিষ্কাশনের সময় এবং সাবান, ব্যাটারি, রং ও ওষুধ তৈরির কারখানা থেকেও আর্সেনিক দূষণ ঘটে।