Chapter-7, ধর্ম

সূচনা: ইসলাম কেবলমাত্র একটি ধর্ম নয়, তা হল মানুষের পূর্ণাঙ্গ একটি জীবনব্যবস্থা, কেননা মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ইহলৌকিক এবং পারলৌকিক জীবনকে নিয়াগের বিধিবিধান দেন । বিধিবিধানগুলিকে ইসলামি পরিভাষায় বলা হল পরিযত। পরিয়তে মুসলমানদের অধিকার বা কর্তব্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে।

শরিয়ত নির্দেশিত অধিকার ও কর্তব্যসমূহ

[1] ধর্মীয় অধিকার: মুসলমানদের কাছে আল্লাহ্ একমাত্র উপাস্য।

এপ্রসঙ্গে কালেমায়ে তাইয়্যেবার প্রথম অংশে বলা আছে লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ (আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই)। মুসলমানরা কোরান বা সুন্নাহর বিধান মেনে চলেন। তাদের অন্যান্য কয়েকটি ধর্মীয় অধিকার হল-ইবাদত (উপাসনা), নামাজ, রোজা, জাকাত প্রভৃতি।

[2] ব্যক্তিগত অধিকার : শরিয়তের লক্ষ হল সমগ্র মানবজাতির কল্যাণসাধন। শরিয়তে প্রত্যেকটি মানুষের নিজের ওপর অধিকারের উল্লেখ রয়েছে। নিজের সম্ভ্রম রক্ষা প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত অধিকার। এ ছাড়া পারিবারিক উত্তরাধিকার, আইনগত নিরাপত্তা প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত অধিকারেরই অন্তর্ভুক্ত।

[3] অন্যের অধিকার : শরিয়তে নির্দেশ রয়েছে ব্যক্তি অধিকার সুরক্ষিত বা ভোগ করতে গিয়ে অন্যের অধিকার যেন ব্যাহত না হয়। নিজেদের ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা করতে গিয়ে অপরের স্বাধীনতা যেন বিপন্ন না হয়। জালিয়াতি বা প্রতারণা করা, অসাধু কাজে লিপ্ত হওয়া, শরিয়তে নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ এগুলির মধ্যে দিয়ে ব্যক্তি অনোর ক্ষতিসাধন করে নিজে লাভবান হয়। শরিয়তে জুয়া খেলা, লুঠতরাজ চালানো, মদ্যপান করা, ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া প্রভৃতি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বলে উল্লিখিত হয়েছে। পাশাপাশি একচেটিয়া ব্যাবসার দ্বারা মুনাফা অর্জন, মজুতদারি দ্বারা অবৈধ পথে অর্থ অর্জন বা চোরাই কারবার দ্বারা হঠাৎ করে বিত্তবান হয়ে ওঠাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

[4] সৃষ্ট জীবের অধিকার : আল্লাহ্র শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হল মানুষ। এই দুনিয়ায় আল্লাহ্ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন, সেগুলি সবই মানুষের প্রয়োজনে। কিন্তু জগতের এইসমস্ত ঐশ্বর্য শুধু ভোগ করেই মানুষ নিজেকে শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে প্রমাণ করতে পারে না। মানুষের সেবা করার জন্য আল্লাহ্ যে সমস্ত জিনিস সৃষ্টি করেছেন সেগুলিকে রক্ষা করাও মানুষের বিশেষ কর্তব্য। মানুষ গাছের ফল লাভের অধিকারী হলেও গাছ কাটা বা অকে বিনষ্ট করার অধিকারী কখনই নয়। বিশেষ উদ্দেশ্য ছাড়া পাখি ধরা বা তাকে খাঁচায় আটকে রাখাও নিষিদ্ধ।

আলাউদি খলজির মনোভাব

[1] শরিয়ত সম্পর্কে: শরিয়ত হল ইসলাম বিধিবিধান।  কিন্তু আলাউদ্দিন তাঁর পূর্ববর্তী সুলতানদের মতো শরিয়তের বিধান মেনে দেশশাসনে বিশ্বাসী ছিলেন না। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তিনি শরিয়তি করব্যবস্থা বাতিল করেন এবং বহু নতুন কর ধার্য করেন। আলাউদ্দিন "I am the state"—এই নীতিতে বিশ্বাসী হওয়ায় শরিয়তি বিষিকে অমান্য করার সাহস দেখান। রাষ্ট্রের যাবতীয় ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ রূপে কুক্ষিগত করেন। দিল্লির সুলতান হিসেবে আলাউদ্দিন-ই প্রথম খলিফার সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ জানান।

সূচনা: আকবরের ধর্মচিন্তার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে 'দীন-ই-ইলাহি' নামে সমন্বয়ী ধর্মাদর্শ প্রচারের মাধ্যমে (১৫৮১ খ্রি.)। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সেতুকধনের উদ্দেশ্যে আকবর এই ধর্মমত প্রবর্তন করেন। বদাউনির বিবরণ থেকে জানা যায় যে, সুফি সাধক শেখ তাজউদ্দিন আকবরকে এই নতুন ধর্মাদর্শ প্রবর্তনে উদ্‌বুদ্ধ করেন।

দীন ই-ইলাহির পরিচয়

[1] শব্দার্থ ও তাৎপর্য: ফারসি শব্দ 'সীন-ই-ইলাহি'র অর্থ হল ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস (মতভেদে পবিত্র)। আবুল ফজল ও বদাউনি এই ধর্মমতকে “তৌহিদ-ই-ইলাহি' বা স্বগীয় একেশ্বরবাদ বলে উল্লেখ করেছেন। সমস্ত ধর্মের সারবস্তু নিয়ে গঠিত হয় এই ধর্মমত।

[2] মূলনীতি: 'দীন-ই-ইলাহি'-র মূল কয়েকটি নীতি ছিল—

[i] নিরামিষ আহার, [ii] দানধ্যান ও সমাজসেবা, [iii] একে অপরকে আল্লাহ্ আকবর (ঈশ্বর মঙ্গলময়) বলে সম্বোধন করা এবং প্রত্যুত্তরে জাল্লা জালাল্লাহ্ (তাঁর মহিমার বিকাশ হোক) বলা, [iv] অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করা। [v] সম্রাটের কাছে জীবন, ধর্ম, সম্পদ, মান বিসর্জনের প্রতিশ্রুতিদান করা।

[3] প্রকৃতি: 'দীন-ই-ইলাহি' ছিল একটি সমন্বয়ী ধর্মমত। এখানে উপনিষদের একেশ্বরবাদ, বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের অহিংস নীতি, পারসিকদের সূর্য ও অগ্নি উপাসনা এবং খ্রিস্টধর্মের সৌভ্রাতৃত্ববোধ গৃহীত হয়েছিল।
[4] বৈশিষ্ট্য: [1] দীন-ই ইলাহি ছিল সমস্ত ধর্মমতের একটি সংমিশ্রণ। [IH] এই ধর্মমতে কোনো দেবদেবীর স্থান ছিল না। সম্রাট নিজেই ছিলেন। পির বা গুরু। [iii] এতে পার্থিব উদারতা ও চারিত্রিক পবিত্রতার ওপর বেশি [জোর দেওয়া হয়েছে। [iv] উদারতা, আত্মত্যাগ, মোহমুক্তি, নম্র বাক্যালাপ, নিরামিষ ভোজন, মদ্যপান ত্যাগ প্রভৃতি দীনই ইলাহির অনুগামীদের পালনীয় কর্তব্য ছিল।

[5] ফলাফল: [1] আকবর এই ধর্মমতের মাধ্যমে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐক্য গড়ে তুলে সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব রক্ষার চেষ্টা করেন। [ii] সমস্ত ধর্মের সার নিয়ে গড়ে ওঠা এই ধর্মমতের দ্বারা আকবর ভারতবর্ষকে সর্বধর্মসমন্বয়বাদী দেশ হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস নেন। [iii] আকবরের এই নতুন ধর্মমতের সুফল হিসেবে[a] হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক উন্নত হয়। [b] রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে উল্লেখা ও মোল্লাদের প্রভাব খর্ব হয়।

[c] সম্রাটের সর্বময় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

[6] অবসান: দীন-ই-ইলাহির আয়ু ছিল খুবই স্বয়। আকবরের মৃত্যুর আগেই এর অবক্ষয় শুরু হয়। আকবরের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই এই ধর্মাদর্শের অবসান ঘটে।

সূচনা: আকবরের 'সুল-ই-কুল' আদর্শ গ্রহণের ক্ষেত্রে নানা প্রভাব কাজ করেছিল। এক্ষেত্রে পারিবারিক প্রভাব ছাড়াও আকবরের ওপর নানা প্রস্তাব পড়ে।

আকবরের 'সূলই কুল' নীতি গ্রহণের কারণসমূহ

[1] উদার ধর্মসহিষ্ণু পরিবেশের প্রভাব: আকবর যে সময়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই সময়ে ভারতে উদার ও ধর্মসহিন্ন পরিবেশ বিরাজমান ছিল। ইতিপূর্বে সুফি ও ভক্তিবাদী সাধকদের উদার ধর্মপ্রচার এই পরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করেছিল। এই পরিবেশ আকবরের অন্তরে উদারতার বীজ বপন করে।

[2] উদার ধর্মীয় পরিবারের প্রভাব: আকবর ধর্মীয় দিক থেকে উদার এক পরিবারে জন্ম নেন। আকবরের পিতা হুমায়ুন এবং পিতামহ বাবর ছিলেন সুন্নী সম্প্রদায়ভুক্ত, আর মাতা হামিদা বানু বেগম ছিলেন পারস্যের উদারমনা সিয়া মৌলবি মির বাবাদোস্ত-এর কন্যা। আকবরের পিতা ও মাতা উভয়েই ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে মুক্ত ছিলেন, যার প্রভাব পড়েছিল আকবরের ওপর।

[3] গৃহশিক্ষকের প্রভাব: আকবরের গৃহশিক্ষক ছিলেন মির আবদুল লতিফ, যিনি শৈশবেই আকবরের মনে ধর্মীয় উদারতার বীজ বপন করেন। শিক্ষাদানের সুযোগে তিনি আকবরকে সর্বজনীন শান্তি ও সহিঞ্চুতার আদর্শে দীক্ষিত করেন।

[4] পণ্ডিত ও ধর্মজ্ঞানী ব্যক্তিবর্গের সান্নিধ্য : আকবর শৈশব থেকেই বিভিন্ন যোগী, সাধুসন্ত ও ফকিরদের সান্নিধ্য লাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি শেখ মুবারকের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পান। এ ছাড়াও মুবারকের দুই পুত্ৰ
আবুল ফজল ও ফৈজির সঙ্গেও আকবরের গভীর নম্বর গড়ে ওঠে।সকলের সম্মিলিত প্রভাবে তিনি উদার ও সহিষ্ণু হয়ে ওঠেন।

[5] রাজপুত মহিষীদের প্রভাব: আকবরের সুল-ই-কুল আদর্শ গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজপুত মহিষীদের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। এঁদের ধর্মীয় রীতিনীতি আচার-আচরণ প্রভৃতি আকবরকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ক্রমশ আকবর হিন্দুদের ধর্মীয় আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন।

[6] রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: ভিনসেন্ট স্মিথ, পার্সিভ্যাল স্পিয়ার, জান রিচার্ডস প্রমুখ মনে করেন যে, আকবর রাজনৈতিক কারণে সুল-ই-কুল আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন। এঁদের ধারণায় আকবর সঠিকভাবেই অনুধাবন করেছিলেন যে, মোগল সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব বৃদ্ধির জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের সমর্থন প্রয়োজন।

সূচনা: মধ্যযুগের ইউরোপে পোপতন্ত্রের ইতিহাসে এক আগন সৃষ্টিকারী চরিত্র হলেন প্রথম গ্রেগরি (৫৯০-৬০৪ খ্রি. পর্যন্ত পোন পদে আসীন ছিলেন)। তিনি গ্রেগরি দ্য গ্রেট নামেও পরিচিত ছিলেন। পোপতন্ত্রের বিকাশে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য মধ্যযুগের পোপদের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ বলে বন্দিত হন।

গোপতন্ত্রের বিকাশে প্রথম গ্রেগরির অবদান

[1] মানবমুক্তির আদর্শ প্রতিষ্ঠায়: পোপতন্ত্রের ইতিহাসে প্রথম গ্রেগরি একমাত্র পোপ যিনি সর্বপ্রথম মানবমুক্তিকেই জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। এই আদর্শের দ্বারা তিনি পোপতন্ত্রকে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার উদ্যোগ নেন। তিনি মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির বিধানও দেন।

[2] পোপের সার্বিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠায় : পোপ প্রথম গ্রেগরি যাজক বা গৃহী উভয়কে পোপের অনুশাসন মেনে চলার কথা বলেন। এই অনুশাসন বা নির্দেশ অগ্রাহ্য করলে তাদের সমাজচ্যুত হতে হবে বলে তিনি প্র করেন। তিনিই প্রথম এই ধারণার জন্ম দেন যে রোমান চার্চের ধর্মপু পোপই হলেন খ্রিস্টান সমাজের কাছে লৌকিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের একমাত্র অবলম্বন ।

[3] চার্চের ক্রমোন্নতিতে : প্রথম গ্রেগরি চার্চের বিভিন্ন পদের শ্রেণিবিভাগ করেন। তিনি যোগ্যতা অনুসারে চার্চের বিভিন্ন পদাধিকারীদের নিয়োগ ও তাদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করেন। এভাবে চার্চ সংগঠনে পোপ, আর্চ বিশপ, বিশপ ইত্যাদি স্তরবিভাগ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

[4] খ্রিস্টান সমাজের ঐক্য গঠনে: প্রথম গ্রেগরি সর্বপ্রথম খ্রিস্টান সমাজকে ‘বিশ্ব খ্রিস্টীয় সমাজ' আখ্যায় ভূষিত করেন। তিনি বলেন যে, একমাত্র পোপই যাজকদের সাহায্যে খ্রিস্টান সমাজকে নিয়ন্ত্রণের অধিকারী। পোপের এই প্রচেষ্টার ফলশ্রুতি হিসেবে সমস্ত খ্রিস্টান সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।

[5] খ্রিস্টধর্মের প্রতিষ্ঠা ও প্রসারে: প্রথম গ্রেগরির অসামান্য প্রচেষ্টার ফলে ভিসিগথদের চার্চ অ্যারিয়ানধর্মের প্রভাবমুক্ত হয়। তাঁর উদ্যোগেই ইটালির বিধর্মী লোম্বার্ডরা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে। এ ছাড়াও তার প্রতিনিধি হিসেবে সেন্ট অগাস্টাইন পেগান ইংল্যান্ডকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করেন।

পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট এর ভূমিকা 

গোপতন্ত্রের ক্ষমতা বিস্তারে পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। ইনোসেন্ট বিশ্বাস করতেন, কেবলমাত্র রোমান চার্চ মানুষের পবিত্র দায়িত্ব পালনে সক্ষম।

[1] স্বাধীন রাজ্য গঠনের উদ্যোগ : তৃতীয় ইনোসেন্ট মনে করতেন যে, গোপের সর্বময় কর্তৃত্বকে বাস্তবায়িত করতে গেলে তাঁর শাসনাধীন এক স্বাধীন রাজ্য দরকার। তাই তিনি সর্বপ্রথম মধ্য ইটালির ওপর পোপের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

[2] অন্যান্য উদ্যোগ: [i] জার্মানির রাজপদ ও পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাটপদের মনোনয়ন বিষয়ক সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে ইনোসেন্ট তিনটি নীতি নেন। প্রথমত, জার্মান রাজপদের জন্য উত্তরাধিকারের পরিবর্তে নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেন। দ্বিতীয়ত, পোপের নিরাপত্তার স্বার্থে সিসিলি ও জার্মানিকে আলাদা রাখার কথা ঘোষণা করেন। তৃতীয়ত, জার্মানির সিংহাসনে আপন অনুগত ব্যক্তিকে বসানোর উদ্যোগ নেন। [ii] ১২০১ খ্রিস্টাব্দে ব্রান্সউইকের ডিউক অটো (চতুর্থ অটো) কর্তৃক প্রদত্ত যাবতীয় সুযোগসুবিধা দ্বিতীয় ফ্রেডারিক পোপ তৃতীয় ইনোসেন্টকে দিতে রাজি হন। বিনিময়ে পোপ ইনোসেন্ট চতুর্থ অটোর পরিবর্তে দ্বিতীয় ফ্রেডারিককে জার্মানির রাজা বলে স্বীকৃতি দেন। [iii] তিনি চতুর্থ ক্রুসেডের আহ্বান জানিয়ে পোপতন্ত্রের মর্যাদা বৃদ্ধির চেষ্টা করেন।

সূচনা: খ্রিস্টধর্মের পবিত্র প্রতীক ক্রুস থেকেই ক্রুসেড নামের উৎপত্তি ঘটেছে। প্রাচ্যের মুসলিমধর্মাবলম্বী তুর্কি ও পশ্চিম ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের মধ্য প্রায় দুশো বছর ধরে যে যুদ্ধ হয় তা ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ নামে পরিচিত। ব্রুসেডের পশ্চাতে নানান কারণ ছিল।

ক্রুসেডের কারণসমূহ

[1] ধর্মীয় কারণ

i. রোমান চার্চের হৃতগৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠা: ১০৫৪ খ্রিস্টাব্দে গ্রিক (বা পূর্ব ইউরোপীয়) চার্চের সঙ্গে রোমান চার্চের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ঐক্য পোপ দ্বিতীয় আরবান রোমান চার্চের হৃত গৌরব ও ক্ষমতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা চেয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড আন্দোলনে জয়ী হলে খ্রিস্টানদের ওপর নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা অনেক সহজ হবে।

ii. জেরুজালেমের পবিত্রতা রক্ষা

[a] খ্রিস্টানদের প্রচেষ্টা: জিশুখ্রিস্টের জন্মভূমি প্যালেস্টাইনের অন্তর্গত জেরুজালেম ছিল খ্রিস্টানদের পবিত্র তীর্থস্থান। ১০৭১ খ্রিস্টাব্দে সেলজুক তুর্কিরা জেরুজালেমের দখল নেয় খ্রিস্টান যাজক, অভিজাত এবং রাজাগণ সংঘবদ্ধ হন ও সেলজুক তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করেন।

[b] মুসলিমদের প্রচেষ্টা: আবার মুসলমানদের কাছে জেরুজালেম ছিল হজরত মহম্মদ (সাঃ), হজরত মুসা ও হজরত দাউদের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্রভূমি। তাই মুসলিমরাও জেরুজালেমের পবিত্রতা রক্ষায় উদ্যত হলে ক্রুসেডের প্রেক্ষাপট রচিত হয়।
[2] রাজনৈতিক কারণ

i. ইসলামের অগ্রগতি রোধ: হজরত ওমরের আমল থেকে, রাজ্যবিজয় ও ধর্মপ্রচারের মধ্যে দিয়ে ইসলামের সম্প্রসারণ শুর হয়। রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত মিশর, সিরিয়া, স্পেন, উত্তর আফ্রিকা, দক্ষিণ ইটালি, সিসিলি সহ সমগ্র পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল মুসলমানদের অধিকারে আসে। খ্রিস্টানরা ইসলামের এই অগ্রগতি রোধে সচেষ্ট হয়।

ii. দক্ষতা প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা: অষ্টম শতকের মাঝামাঝি সময়কালে ফ্রাঙ্করাজ চার্লস মার্টেল আরবদের আক্রমণ রোধের লক্ষ্যে এক সুনিপুণ যোদ্ধাবাহিনী গড়ে তোলেন। খ্রিস্টধর্মের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের একটা সুযোগ পাওয়ার জন্য তারা ক্রুসেডের প্রেক্ষাপট রচনায় সাহায্য করে।

[3] অর্থনৈতিক কারণ

i. সামন্তপ্রথার বিস্তার: একাদশ শতকে ইউরোপের সামন্তপ্রভুরা প্রাচ্যে ভূখণ্ড দখল করে সামন্তপ্রথার বিস্তারে উদ্যোগী হন। তারা সেখানে সামন্তপ্রথা প্রবর্তন ও পরাজিতদের শোষণের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্রুসেডে যোগ দেন।

ii. অভিজাতদের লোভ: যে সমস্ত অভিজাতের ম্যানরের আয় কমে গিয়েছিল, তারা এবং লোভী অভিজাতরা লুঠতরাজের মাধ্যমে ধন উপার্জনের লক্ষ্যে ধর্মযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল।

iii. বাণিজ্যিক স্বার্থ: পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ব্যাবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রে খ্রিস্টান বণিকগণ কোণঠাসা হয়ে পড়ে। একাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে পরিস্থিতি বদলায়। নর্ম্যানরা মুসলমানদের কাছ থেকে সিসিলি কেড়ে নেয় এবং খ্রিস্টান শক্তি স্পেন অধিকার করে। ইটালির বণিকরা প্রাচ্য দেশগুলির সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। এই বাণিজ্যিক সম্পর্কের টানাপোড়েনে খ্রিস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে ক্রুসেডের প্রেক্ষাপট রচিত হয়।

[4] সামাজিক কারণ

i. ভূমিদাসদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা: ক্রুসেডে অংশগ্রহণ করলে ভূমিদাসদের দাসত্ব থেকে মুক্তি দেওয়ার ও ঋণগ্রহণকারীদের সুদের হার কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তাই ক্রুসেডে যোগ দিয়ে ভূমিদাসত্ব থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিল হাজার হাজার সার্ফ বা ভূমিদাস।

ii. জনসংখ্যার আধিক্য: মধ্যযুগে জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে জমির পরিমাণ বাড়েনি। ফলে জমির ওপর নির্ভরশীলদের একাংশ নতুন ভূখণ্ডে শান্তিতে বসবাসের লক্ষ্যে ক্রুসেডের সঙ্গে নিজেদেরকে যুক্ত করে।

iii. তীর্থযাত্রীদের ক্ষোভ: একাদশ শতকে জেরুজালেম সেলজুক তুর্কিদের অধিকৃত হওয়ার পরও বহু খ্রিস্টান তীর্থযাত্রী জেরুজালেম ভ্রমণে আসতে থাকেন। তীর্থযাত্রাকালীন তাদের অনেকেই দস্যুদের কবলে পড়েন ও আক্রান্ত হন। ফলে খ্রিস্টানগণ মুসলিমদের বিরুদ্ধে দারুণ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

ক্রুসেডের উদ্দেশ্যসমূহ

মূল উদ্দেশ্য: জিশুখ্রিস্টের জন্মভূমি প্যালেস্টাইনের জেরুজালেম ছিল খ্রিস্টানদের পবিত্র তীর্থস্থান। ১০৭১ খ্রিস্টাব্দে সেলজুক তুর্কিরা জেরুজালেমের দখল নেয়। তুর্কিরা খ্রিস্টানদের চার্চের পাশে মসজিদ তৈরি করে। অপরদিকে মুসলমানদের কাছে জেরুজালেম ছিল হজরত মহম্মদ (সাঃ), হজরত মুসা ও হজরত দাউদের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্রভূমি। তাই খ্রিস্টান ও মুসলিম উভয় জাতিই জেরুজালেমের পবিত্রতা রক্ষায় উদ্যত হয় ।

অন্যান্য উদ্দেশ্য

i. বাইজানটাইন সাম্রাজ্য রক্ষা : একাদশ শতকে সেলজুক তুর্কিরা ইউরোপের দিকে বিজয়াভিযান শুরু করে। পশ্চিমে বাইজানটাইন সাম্রাজ্যভুক্ত এশিয়া মাইনরের একাংশ তারা দখল করে। এরপর তারা কনস্ট্যান্টিনোপলের দিকে অগ্রসর হলে পূর্ব রোমের বাইজানটাইন সম্রাট আলেক্সিয়াস ভীত হয়ে পড়েন।

ii. পোপের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার: একাদশ শতকে রোমান ক্যাথলিক চার্চ ও গ্রিক চার্চের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ফলে উভয় চার্চের মধ্যে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন হয়। এর ফলে পোপের ক্ষমতা ও মর্যাদা অনেকটাই হ্রাস পায়। এই হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারে পোপ ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের আহ্বান জানান।

iii. নতুন স্থান দখল: সেলজুক তুর্কিদের আক্রমণের ফলে আরব দুনিয়ায় বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হয়। এই সুযোগে বাইজানটাইন শাসকগণ আরব ভূখণ্ডের কিছুটা অংশ দখলের জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে ওঠে। এ ছাড়াও বাণিজ্যের সমৃদ্ধির জন্য ক্রুসেডের মাধ্যমে নতুন স্থান দখলের প্রয়োজন ছিল। তাই ইটালির বণিকরা আরব বণিকদের হটিয়ে তাদের স্থান দখলের উদ্দেশ্যে ক্রুসেডে যোগ দেয়।

iv. অর্থলাভ: অভিজাতদের মধ্যে যে অংশ তুলনায় আর্থিকভাবে দুর্বল ছিল, তাঁরা ক্রুসেডের মধ্য দিয়ে আরও ধনী হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা করেছিল। ইটালির বণিকরা ক্রুসেডের মাধ্যমে কনস্ট্যান্টিনোপল ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এলাকার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা দেখেছিল।

v. অন্যান্য: ক্রুসেডে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকের আলাদা আলাদা উদ্দেশ্য ছিল। [a] সামন্তপ্রভুরা চেয়েছিল প্রাচ্যে নতুন ভূখণ্ড দখলের মাধ্যমে সেখানে সামন্তপ্রথার প্রবর্তন ঘটাতে। [b] সার্ফরা (ভূমিদাস) চেয়েছিল ক্রুসেডে যোগ দিয়ে পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেত। [c] বেকার ও ভবঘুরেরা প্রাচ্য দেশে কর্মসংস্থানের আশায় বুক
বেঁধেছিল। [d] নাইটদের অন্তরে ছিল দক্ষতা প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষ [e] ধর্মযুদ্ধে শহিদ হলে স্বর্গলাভের প্রত্যাশা দেওয়া হয় ক্রুসেডারদের।

পোপের ক্ষমতা বৃদ্ধি

ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের আগে রোম সাম্রাজ্যে পোপের ক্ষমতা খুব বেশি ছিল না। ক্রুসেডগুলিতে নেতৃত্বদানের মধ্য দিয়ে পোপের ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও আত্মসম্মান বেড়ে যায় ।

[1] ক্রুসেডের নেতৃত্বের মাধ্যমে: পোপের আহবানে সাড়া দিয়ে সম্রাট, সামন্ত, বণিক ও কৃষক শ্রেণি ক্রুসেডে যোগ দেয় ও পোপের পরোক্ষ নেতৃত্ব মেনে নেয়। আর ধর্মযুদ্ধে অংশ না নেওয়া সমাজের অবশিষ্টরাও পোপের এই ভূমিকায় শ্রদ্ধাবনত হয়। পোপ খ্রিস্টান জগতের কাছে সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন।

[2] সামন্তদের ক্ষমতা হ্রাসের সুবাদে: সামন্তপ্রভুরা ক্রুসেড যাত্রার আগে তাদের সব ভূসম্পত্তি ধর্মীয় সংগঠনের নামে উইল করে দিয়ে যায়। ক্রুসেডে যোগদানের ফলে এই সামন্ত শ্রেণি সর্বস্বান্ত হন। এ ছাড়াও ক্রুসেডে বহু সামন্তের মৃত্যু হয়। এর ফলে ইউরোপে সামন্ত শ্রেণি দুর্বল হয়ে পোপের ক্ষমতা বৃদ্ধির পথকে প্রশস্ত করে।

[3] পূর্বাঞ্চলীয় চার্চের প্রতিপত্তি হ্রাসের সূত্রে: বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের চার্চ বা গ্রিক চার্চ অনেকটাই বাইজানটাইন রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ক্রুসেডের যুদ্ধগুলির ফলে বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের অবক্ষয় শুরু হয় এবং গ্রিক চার্চের প্রতিপত্তিও কমে যায়।পক্ষান্তরে রোমান চার্চ তথা পোপের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়।

 [4] অর্থ ও সম্পদ লাভের মাধ্যমে: পোপের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বা পুণ্যলাভের আশায় ইউরোপের নানা প্রান্তের মানুষ যুদ্ধের খরচ জোগানের জন্য সস্তায় তাদের ভূসম্পত্তিগুলি চার্চ বা মঠের কাছে বিক্রি বা দান করে দেয়। এ ছাড়াও, ক্রুসেডের খরচ তোলার দোহাই দিয়ে পোপ ইনডালজে বিক্রি করে বা নানা কর ধার্য করে প্রচুর অর্থ লাভ করে।