Chapter-7, ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন

‘হিন্দ স্বরাজ' নামের একটি রচনায় ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে গান্ধিজি

'স্বরাজ' সম্পর্কে বলেছিলেন যে, বিদেশি আদর্শভিত্তিক শিল্পসমাজ সাধারণ ভারতবাসীর ক্ষতি করছে। ব্রিটিশ সরকারের পাশাপাশি এই আধুনিক সমাজও ভারতের শত্রু। কারণ- ব্রিটিশরা না থাকলেও তাদের তৈরি করা ভাবনাচিন্তা ভারতীয়দের মনে থেকে যাবে। তাই রাজনৈতিকভাবে স্বরাজের দাবি হল

অর্ধেক ব্রিটিশসুলভ মানসিকতাকে হিন্দু স্বরাজের ইংরেজি অনুবাদ সরিয়ে সরল সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে হবে। চরকা ছিল সাধারণ জীবনযাপনের প্রতীক স্বরূপ।

ভারতের ইতিহাসে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি একজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। পরাধীন ভারতবাসীর কাছে তিনি ছিলেন দেবতার মতো। কৃষকরা ভাবতেন তিনি জমিদারি শোষনকে বন্ধ করবেন। চা-শ্রমিকরাও গান্ধিজির আদর্শ মেনে চলতেন। কোনো কোনো মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ক্ষমতাবান সাধুর তুল্য। বাংলার উপজাতি শ্রেণির মানুষরা বিশ্বাস করতেন যে, শুধুমাত্র গান্ধিজির নাম নিলেই পুলিশ তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।

মহাত্মা গান্ধির পাশ্চাত্য ও যন্ত্র-নির্ভর-সভ্যতা বিরোধী ধারণাকে অনেকেই সমর্থন করেননি। কারণ গান্ধিজির এই ধারণার মধ্যে স্ব-বিরোধিতা ছিল।

একদিকে তিনি বিদেশি যন্ত্র-নির্ভর-সভ্যতার বিরোধী ছিলেন। অথচ এই বক্তব্য প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি সংবাদপত্রকে ব্যবহার করেছিলেন। এ ছাড়া গান্ধিজি রেলপথেও যাতায়াত করতেন। রামরাজ্যের মতো হিন্দু ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করার জন্য গান্ধিজির আদর্শ সার্বজনীনতা হারিয়েছিল।

সত্যাগ্রহ আদর্শের স্রষ্টা হলেন মহাত্মা গান্ধি।

সত্যাগ্রহ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে 'সত্য' ও 'আগ্রহ' থেকে। সত্যাগ্রহ বলতে বোঝায় সত্যের প্রতি আগ্রহ। মহাত্মা গান্ধির 'সত্যাগ্রহ' ও 'অহিংসা' এই আদর্শ দুটি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তাই গান্ধিজির আন্দোলনকে 'অহিংস সত্যাগ্রহ' বলা হয়।"

• মহাত্মা গান্ধি মনে করতেন মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হল সত্যের খোঁজ করা। তাই রাজনৈতিক আন্দোলনেরও চূড়ান্ত উদ্দেশ্য

ভারতের ওপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবগুলি ছিল নিম্নরূপ— [ 1 ভারতের ঔপনিবেশিক সরকারের সামরিক খাতে ব্যয় অনেক বেড়ে গিয়েছিল। ফলে প্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি

2 খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে যায়।

3 বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ভারতের অনেক মানুষ দুর্ভিক্ষ এবং সংক্রামক ব্যাধির কারণে প্রাণ হারান।

4 প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বহু ভারতীয় সৈন্য প্রাণ হারান। বিশ্বযুদ্ধের ফলে অর্থনীতিতে যে সংকট দেখা দিয়েছিল তা ভারতের সা সামাজিক জীবনকে বিপর্যন্ত করে দেয় এবং ব্রিটিশ শাসনের ওপর মানুষ আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ভারতের বৈপ্লবিক ও সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ ব্রিটিশ সরকারকে বিচলিত করেছিল। সরকার এই অবস্থার মোকাবিলা করার জন্য স্যার সিডনি রাওলাটের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে (ডিসেম্বর, ১৯১৭ খ্রি.)। এই রাওলাট কমিটি বা সিডিসন কমিটি ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে রিপোর্ট পেশ করে। এই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে সরকার ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৮ মার্চ যে আইন পাস করে তা ‘রাওলাট আইন' নামে পরিচিত।

পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগ নামক উদ্যানে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের ১০ এপ্রিল ১০ হাজার মানুষের এক করে। ফলে সহস্রাধিক লোক হতাহত হয়। এই ঘটনা ইতিহাসে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত।

১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার চৌরিচৌরা নামক স্থানে ভগবান আহির নামে এক স্বেচ্ছাসেবকের ওপর পুলিশ অকথ্য অত্যাচার করে এবং বিনা চৌরিচৌরা শহিদ স্মারক প্ররোচনায় জনতার ওপর গুলি বর্ষণ করে। এর ফলে জনতা উত্তেজিত হয়ে চৌরিচৌরা থানায় আগুন ধরিয়ে দেয়, এতে ২২ জন পুলিশকর্মী মারা যায়। এটি 'চৌরিচৌরা ঘটনা' নামে পরিচিত। এই ঘটনার জন্য গান্ধিজি অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেছিলেন।

অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারের কারণ হল

1 চৌরিচৌরার ঘটনা চৌরিচৌরায় ২২ জন পুলিশকর্মীকে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় গান্ধিজি মর্মাহত হয়ে আন্দোলন প্রত্যাহার করেন।

2 আন্দোলনে ভাটা আন্দোলনে ভাটা পড়েছিল স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় ছাত্র ও অভিভাবকরা ক্ষুব্ধ হয়েছিল, শ্রমিক, কৃষক। ও মধ্যবিত্তরা অধৈর্য হয়ে পড়েছিল।

অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ব্যর্থতা ও গান্ধিজির জেল হওয়ার ফলে কংগ্রেস সংগঠনের মধ্যে বিবাদ তৈরি হয় এবং চিত্তরঞ্জন দাশ ও মোতিলাল নেহৰুৱ নেতৃত্বে 'কংগ্রেস-খিলাফ স্বরাজ্য' দল তৈরি হয়। এই দলের অনুগামীদের স্বরাজ্যপন্থী বলা। স্বরাজ্যপন্থীদের আন্দোলনের মূল দাবিগুলি হল— আইন পরিষদ বয়কট না করে তাতে অংশ নেওয়া। আইনসভায় প্রবেশ করে সরকারের নীতি ও কাজে বাধা দেওয়া । ভারতীয়দের উন্নয়নে সহায়ক নানা প্রস্তাব ও বিল উত্থাপন করা।

গান্ধিজি ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১২ মার্চ গুজরাটের উত্তর সবরমতী আশ্রম থেকে ডান্ডির উদ্দেশ্যে পদযাত্রা শুরু করেন। গান্ধিজি ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৬ এপ্রিল ডান্ডির সমুদ্রতীর থেকে লবণ তুলে আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা করেন।

গান্ধিজি আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা করার জন্য তথা লবণ আইন ভঙ্গ করার জন্য ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১২ মার্চ সবরমতী আশ্রম থেকে ডান্ডির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এর ফলে সারা দেশে প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। ডান্ডি অভিযানে লবণ আইন ভঙ্গ করার কর্মসূচি গ্রহণ করায় সর্বস্তরের মানুষের সাড়া পাওয়া গিয়েছিল।

অসহযোগ আন্দোলনের তুলনায় আইন অমান্য আন্দোলনে যে নতুন বৈশিষ্ট্যগুলি দেখা গিয়েছিল তা হল 1 অসহযোগ আন্দোলনের মতো আইন অমান্য আন্দোলনে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য সেভাবে ছিল না।
2 আইন অমান্য আন্দোলনে শহরের শিক্ষিত মানুষের যোগদান ছিল কম। যদিও কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বেশি যোগদান করেছিল।

3 আইন অমান্য আন্দোলনের সময় কংগ্রেস সাংবিধানিক অধিকার পাবার জন্য উৎসাহী হয়ে উঠেছিল।

খান আবদুল গফফর খানকে সীমান্ত গান্ধি বলা হত।

খান আবদুল গফফর খান ছিলেন। গান্ধিবাদী স্বাধীনতা সংগ্রামী। তিনি ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অালে মহাত্মা গান্ধির আদর্শে আন্দোলন করেছিলেন বলে তাকে 'সীমান্ত গান্ধি বলা হত। তাঁর নেতৃত্বে উত্ত র-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে আইন অমান্য আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করেছিল।

মহাত্মা গান্ধি এবং লর্ড আরউইনের মধ্যে ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ৪ মার্চ যে চুক্তি হয়, তা 'গান্ধি-আরউইন চুক্তি' নামে পরিচিত। এই চুক্তির অপর নাম 'দিল্লি চুক্তি'। এই চুক্তি অনুযায়ী স্থির হয় গান্ধিজি এবং লর্ড আরউইন

1 ব্রিটিশ সরকার বন্দি সত্যাগ্রহীদের মুক্তি দেবে।
2 আন্দোলনকারীরা বিদেশি পণ্য বর্জন করা বন্ধ করবে।
3 সরকার দমনমূলক আইনগুলি তুলে নেবে।
4 জাতীয় কংগ্রেসও আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহার করবে এবং গান্ধিজি দ্বিতীয় গোল টেবিল বৈঠকে যোগদান করবেন। কিন্তু দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠক থেকে গান্ধিজি শূন্য হাতে ফিরে এলে নতুন করে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয়।

ভগৎ সিং 'কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলা' এবং 'লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা'র সাথে সম্পর্কযুক্ত।

কাকোরি স্টেশনে রেল ডাকাতিকে কেন্দ্র করে ভগৎ সিং এবং তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলা শুরু হয় ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে। এই মামলায় রামপ্রসাদ বিশমিল, আসফাকউল্লা সহ চারজনের ফাঁসি হয়।

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ৮ এপ্রিল ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত কর্তৃক কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়। লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা। এই মামলার রায়ে ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে ভগৎ সিং, বটুকেশ্বর দত্ত, সুখদেও ও রাজগুরুর ফাঁসি হয়।

সুভাষচন্দ্র প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় ইংরেজির অধ্যাপক ই. এফ. ওটেনকে কেন্দ্র করে একটি ছাত্র বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। তার ফলেই সুভাষচন্দ্র বসু সহ বেশ কিছু ছাত্রকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর সুভাষচন্দ্র নিজের উদ্যোগে পূর্ণ স্বরাজের পক্ষে যে বক্তব্য প্রচার করছিলেন, তার সাথে ব্রিটিশ সরকারের প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনের পার্থক্য থাকায় তিনি তা গ্রহণ করতে রাজি ছিলেন না। ফলে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের এ কলকাতা অধিবেশনে গান্ধিজির সাথে তাঁর বিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৮ ডিসেম্বর বিপ্লবী বিনয়কৃষ্ণ বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান করে কারাবিভাগের  ইন্সপেক্টর জেনারেল সিম্পসনকে হত্যা করেন। এরপর তাদের সঙ্গে রাইটার্স বিল্ডিং-এর অলিন্দে (বারান্দায়) ইংরেজ বাহিনীর যে যুদ্ধ হয়েছিল তা ‘অলিন্দ যুদ্ধ' নামে পরিচিত।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ইতিহাসে মাতঙ্গিনী হাজরার নাম স্মরণীয় হয়ে আছে। মেদিনীপুর জেলার তমলুকের ৭৩ বছরের বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা গান্ধিবাদী ছিলেন বলে তাঁকে ‘গান্ধি বুড়ি’ বলা হত।

• ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ২৯ সেপ্টেম্বর মাতঙ্গিনী হাজরার নেতৃত্বে অনেক লোক তমলুক থানায় বিক্ষোভ দেখাতে যায়। পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালালে নেত্রী মাতঙ্গিনী হাজরার বুকে গুলি লাগে এবং তিনি শহিদের মৃত্যুবরণ করেন।

ভারতীয় রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের

প্রভাবগুলি ছিল— 1 দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনকে সাহায্য প্রদানের পরিবর্তে যুদ্ধ শেষে ভারতকে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। গান্ধিজি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন।ভারতে খাদ্যসংকট ও মুদ্রাস্ফীতি চরম আকার ধারণ করেছিল।

১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের হরিপুরা কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্র বসু বামপন্থীদের সমর্থনে সভাপতি নির্বাচিত হন। গান্ধিজি এবং তাঁর অনুগামীদের সাথে তাঁর তিক্ততা চরম পর্যায়ে চলে যায়। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরি অধিবেশনে তিনি গান্ধিজির মনোনীত প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে হারিয়ে গান্ধিপন্থী কংগ্রেসী নেতাদের বিরোধিতায় ক্ষুব্ধ হয়ে সুভাষচন্দ্র সভাপতির পদে ইস্তফা দেন এবং ফরওয়ার্ড ব্লক' নামে নতুন দল গঠন করেন। পুনরায় সভাপতি নির্বাচিত হন। তবে পট্টভি সীতারামাইয়া

আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনাদের বিচারকে কেন্দ্র করে ভারতীয়দের মনে ব্রিটিশদের প্রতি তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনারা ভারতীয়দের কাছে ছিল বীরের মতো। ফলে তাঁদের বিচার বন্ধ করার দাবিতে ভারতের নানা জায়গায় জনসভা ও মিছিল সংগঠিত হয়েছিল। বন্দিপক্ষের উকিল হিসাবে কয়েকজন কংগ্রেসি নেতা আদালতে গিয়েছিলেন। বিভিন্ন জায়গায় ব্রিটিশ বিরোধী বিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করেছিল। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়ে তিনজন জনপ্রিয় বন্দিকে মুক্তি দিয়েছিল, যদিও বাকিদের শাস্তি বহাল ছিল।

মহম্মদ জিয়াউদ্দিন সুভাষচন্দ্র বসুর ছদ্মনাম।

• এই নাম নিয়ে সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জানুয়ারি মাঝরাতে তাঁর এলগিন রোডের বাড়ি থেকে গাড়ি করে পালিয়ে যান। পালানোর সময় তাঁর পরনে ছিল লম্বা, উঁচু গলা কোট, ঢিলে সালোয়ার। মাথায় ছিল কালো টুপি আর চোখে ছিল সরু সোনালি ফ্রেমের চশমা।

• তিনি ভারত থেকে পেশোয়ার, কাবুল, ইতালি ও মস্কো হয়ে জার্মানিতে পৌঁছেছিলেন।

সুভাষচন্দ্র বসু আজাদ হিন্দ বাহিনীতে নারীদের অংশগ্রহণের জন্য উদ্যোগী হয়েছিলেন। তাই আজাদ হিন্দ বাহিনীর একটি বাহিনীর নাম রেখেছিলেন রানি ঝাঁসি বাহিনী। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অংশ থেকে প্রায় ১৫০০ নারী ঝাঁসি বাহিনীতে যোগদান করে। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ইম্ফল অভিযানে এই বাহিনী সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। ভারতীয় নারীদের আত্মমর্যাদা প্রদান ও নিজ শক্তিতে বলীয়ান হবার ক্ষেত্রে রানি ঝাঁসি বাহিনী ছিল অন্যতম সেরা দৃষ্টাস্ত।

প্রথম জীবনে দক্ষিণ আফ্রিকার আন্দোলনে সাফল্য অর্জন করে মহাত্মা গান্ধি ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি আমেদাবাদে সবরমতী নদীর তীরে সবরমতী আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। আশ্রমে তিনি অনুগামীদের সত্যাগ্রহ, অহিংসা, স্বাবলম্বন ও গ্রামোন্নয়ন সম্পর্কে শিক্ষা দেন।
● ভারতীয় রাজনীতিতে গান্ধিজির উত্থান : মহাত্মা গান্ধি তখন দেশবাসীর নিকট খুব একটা পরিচিত ছিলেন না। কিন্তু ক্রমে তিনি কয়েকটি স্থানীয় আন্দোলনে যোগদান করে খ্যাতি লাভ করেন। ১৯১৭-১৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি তিনটি আঞ্চলিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
চম্পারন সত্যাগ্রহ (১৯১৭ খ্রিস্টাব্দ) বিহারের চম্পারন জেলায় নীলকর সাহেবরা চাষিদের জোর করে প্রতি ১ বিঘা জমির ৩ কার নীল চাষ করতে বাধ্য করত। আবার এই উৎপাদিত নীল চাষিরা কম দামে নীলকরদের বিক্রি করতেও বাধ্য ছিল। একে 'তিন কারি ব্যবস্থা' বলা হত। নির্যাতিত নীলচাষিদের এই অবস্থার প্রতিকারের জন্য ব্রজকিশোর প্রসাদ, রাজেন্দ্রপ্রসাদ, মহাদেব দেশাই, মহজর-উল-হক প্রমুখ তরুণ জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে নিয়ে গান্ধিজি চম্পারনে উপস্থিত হন। ব্রিটিশ সরকার মহাত্মা গান্ধিকে চম্পারন ত্যাগের নির্দেশ দেয় কিন্তু তিনি তা দৃঢ়তার সঙ্গে উপেক্ষা করেন। সরকার গান্ধিজিকে বন্দি করেও মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। শেষ পর্যন্ত সরকার ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে ‘চম্পারন কৃষি বিল' পাস করে চাষিদের রক্ষার ব্যবস্থা করে।
গুজরাটে খেড়া জেলায় কৃষক আন্দোলন (১৯১৮ খ্রি.) চম্পারন সত্যাগ্রহে সাফল্যের পর মহাত্মা গান্ধি গুজরাটের খেড়া জেলায় কৃষক আন্দোলন শুরু করেন। গুজরাটের খেড়া অঞ্চলে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে বারবার দুর্ভিক্ষ ও প্লেগের আক্রমণে মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। ১৯১৭-১৮ খ্রিস্টাব্দে শস্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এই অবস্থায় সরকার খাজনা আদায় অব্যাহত রাখে। এর প্রতিবাদে গান্ধিজি খেড়ায় সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন। এবং কৃষকদের খাজনা না দেওয়ার আহ্বান জানান। শেষ পর্যন্ত সরকার কিছু রাজস্ব ছাড় দেয় এবং যে সমস্ত কৃষকরা খাজনা দিতে সক্ষম একমাত্র তাদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের নির্দেশ দেয়।

আমেদাবাদে শ্রমিক আন্দোলন (১৯১৮ খ্রি.) : আমেদাবাদের সুতাকল শ্রমিকরা মালিকদের কাছে ৫০ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির

জানায়। মহাত্মা গান্ধি শ্রমিক ও মালিকাদের মধ্যে মধ্যস্থতা করেন। কিন্তু মালিকরা রাজি না হলে গান্ধিজি শ্রমিকদের ধর্মঘট  পরামর্শ দেন। শেষ পর্যন্ত চতুর্থ দিনে মালিক পক্ষ ৩৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধিতে রাজি হয়। ফলে আমেদাবাদেও গান্ধিজির সত্য আন্দোলন সফল হয়।

ভারতের বৈপ্লবিক আন্দোলন দমনের জন্য ইংরেজ সরকার স্যার সিডনি রাওলার্টের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে (ডিসেম্বর, ১৯১৭ খ্রি.)। এটি রাওলাট কমিটি নামে পরিচিত। এই রাওলাট কমিটি ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে একটি রিপোর্ট পেশ করে। এই রিপর্টের ভিত্তিতে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৮ মার্চ যে আইন পাস হয় তা রাওলাট আইন নামে পরিচিত।

• পটভূমি: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ভারতের বৈপ্লবিক কার্যকলাপ ব্রিটিশ সরকারকে বিচলিত করেছিল, এই সময় ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের আন্দোলন স্তদ্ধ করার জন্য যে ভারতরক্ষা আইন পাস করেছিল, যুদ্ধশেষে তা বাতিল হয়ে গিয়েছিল। তাই যুদ্ধ পরবর্তীকালে বিপ্লবী আন্দোলন দমন করার জন্য ব্রিটিশ সরকার রাওলাট আইন পাস করেছিল। ধারা রাওলাট আইন ছিল একটি স্বৈরাচারী ও দমনমূলক আইন। এই আইনের ধারাগুলি

• রাওলাট আইনের হল--- 0 সন্দেহভাজন যে-কোনো ব্যক্তিকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করা যাবে, © যে-কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তির বাড়ি বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি করা যাবে, ও কোনোরকম যক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়াই বিশেষ আদালতে বিচার করে ধৃত ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া যাবে, @ বিশেষ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা যাবে না। এ ছাড়াও রাওলাট আইনে অন্যান্য কয়েকটি ধারার মাধ্যমে সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল।

• ভারতীয়দের প্রতিক্রিয়া কুখ্যাত এই রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে দেশবাসী বিক্ষোভ আন্দোলন শুরু করেছিল। এই আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ অনেকে আইনসভার সদস্যপদ ত্যাগ করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধি রাওলাট বিরোধী বিক্ষোভ আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। আন্দোলনের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে সত্যাগ্রহ সভা গঠিত হয়েছিল এবং মহাত্মা গান্ধির ডাকে ৬ এপ্রিল (প্রথমে ৩০ মার্চ ছিল) স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট পালিত হয়েছিল।

১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগে জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে ও শান্তিপূর্ণ জনসমাবেশের ওপর গুলি বর্ষণ করে। এই ঘটনা ইতিহাসে 'জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড' নামেপরিচিত।
1 জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড, 2 জালিয়ানওয়ালাবাগ সমাধিসৌধ, 3 জালিয়ানওয়ালাবাগে দেওয়ালের গায়ে গুলির দাগ ও 3 জেনারেল ডায়ার

পাঞ্জাবের পরিস্থিতি : ব্রিটিশ সরকার রাওলাট আইন জারি করলে সারা দেশে তীব্র বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। তা ছা মূল্যবৃদ্ধি এবং আর্য সমাজের প্রচারের ফলে পাঞ্জাবে এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। ইংরেজ সরকার পা নতা ড. সত্যপাল ও ড. সৈফুদ্দিন কিচলুকে রাওলাট আইনের বলে গ্রেপ্তার করলে জনগণ অসন্তুষ্ট হয় ও বিক্ষোভ ব্রিটিশ সরকার জনসাধারণের ওপর বিভিন্নভাবে অত্যাচার করে এই বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করে।

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড : সরকারের জনবিরোধী এই আইন ও অত্যাচারের প্রতিবাদে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের নমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে একটি নিরস্ত্র শাস্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়েছিল। এই সভায় শিশু ও নার ন যোগদান করেছিল। সভা চলার সময় আত্মরক্ষার কোনো সুযোগ না দিয়ে জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে পুলিশ জন রে। পুলিশের গুলিতে শিশু ও নারী সহ প্রায় এক হাজার নির্দোষ ভারতীয় নিহত হয়। ইতিহাসে এই কুখ্যাত ঘটনা হত্যাকাণ্ড ' নামে পরিচিত।

ভারতীয়দের প্রতিক্রিয়া এই অমানবিক ও নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তো নাথ ঠাকুর প্রতিবাদস্বরূপ ব্রিটিশদের দেওয়া 'স্যার' উপাধি ত্যাগ করেন। এই ঘটনার বিক্ষুদ্ধ হয়ে গান্ধিি এতান সরকার সংশোধনের অতীত, এর ধ্বংসসাধনই কাম্য।”

পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরে জালিয়ানওয়ালাবাগ অবস্থিত। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবা া ১০,০০০ (দশ হাজার) জনতা একটি শান্তিপূর্ণ সভায় সমবেত হয়েছিল। এই সভায় জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে ১৬০০ রাউন্ড গুলি চালিয়ে ৩৭১ জনকে (সরকারি মতে) হত্যা করে। ব্রিটিশ আমলের এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড 'জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড' নামে পরিচিত।
হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া:
জনগণের প্রতিক্রিয়া জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে দেশবাসী ক্ষোভ ও ঘূর্ণায় ফেটে পড়েছিল। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন যে, এই ঘটনা সমস্ত ভারতবাসীর হৃদয়ে ক্রোধের সম্ভার করেছে।
জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া: জাতীয় কংগ্রেস তাঁর ভাষায় এই হত্যকাণ্ডের প্রতিবাদ। জানিয়েছিল। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় কংগ্রেস দীর্ঘ ৩৫ বছরের রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তি' ছেড়ে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল। বিশ্বকবির প্রতিক্রিয়া। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ইংরেজ সরকার প্রদত্ত সার' (নাইট) উপাধি ত্যাগ করেন।

মহাত্মা গান্ধির প্রতিক্রিয়া। এই ঘটনায় প্রতিবাদী শান্তির পূজারি গান্ধিজি তাঁর ইয়ং ইন্ডিয়া"পত্রিকায় লিখেছিলেন- “এই শয়তান সরকারের সংশোধন অসম্ভব, একে ধ্বংস করতে ইয়া ইন্ডিয়া পত্রিকা।

হবে।” জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের ফলে দেশবাসীর কাছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভয়াবহ কদর্য রূপটি উদ্ঘাটিত হয়েছিল।

খিলাফৎ আন্দোলন মুসলমান ধর্মজগতের প্রধান গুরু হলেন খলিফা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তুরস্কের সুলতান খলিফার মর্যাদা ভোগ করতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক ইংল্যান্ডের বিরোধী জার্মানির পক্ষে যোগদান করেছিল। অন্যদিকে ভারতীয় মুসলমানরা ইংল্যান্ডের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করে । এই অবস্থায় ইংরেজ সরকার ভারতীয় মুসলমানদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, খলিফার অবমাননা করা হবে না। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে সেভরের সদি তারা তুরান্ত সাম্রাজ্যের অচ্ছেদ করা হয় এবং তুরস্কের সুলতান তথা খলিফার ক্ষমতাও খর্ব করা হয়। খলিফার হত মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্য ভারতীয় মুসলমানরা যে আন্দোলন করেছিল তা 'খিলাফৎ আন্দোলন' নাহে পরিচিত।

আন্দোলনের নেতা। খিলাফৎ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন মহম্মদ আলি, সৌকত আলি, হাকিম আঞ্জুমল খান, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ বাপ্তি।

• বিলাফৎ আন্দোলনে গান্ধিজির নেতৃত্ব গ্রহণ গান্ধিজি মুসলমানদের দ্বারা সংগঠিত খিলাফত আন্দোলনকে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেন। তিনি বলেন যে, হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের এমন সুযোগ একশো বছরেও আর আসবে না। সুতরাং, তিনি মনে করেন অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গো খিলাফৎ আন্দোলনকে যুক্ত করতে পারলে একদিকে যেমন জাতীয় আন্দোলন। জোরদার হবে, অপরপক্ষে ব্রিটিশ সরকারের অনুসৃত বিভেদনীতি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে। এইসব কারণে গান্ধিজি খিলাফৎ আন্দোলনকে সমর্থন করেন। তিনি ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ নভেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় খিলাফৎ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। মুসলমানদের দাবি সমর্থন করে। মহাত্মা গান্ধি অসহযোগ আন্দোলনের পরিকল্পনা করেন।

কর্মসূচি ও আন্দোলনের অবস্থান। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। © সরকারি খেতাব বর্জন, @ চাকরি থেকে ইস্তফা, খাজনা বন্ধ প্রভৃতি সহ হরতাল পালিত হয়। এই সময় ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে মুস্তাফা কামাল পাশার নেতৃত্বে তুরস্কের খলিফা পদের অবলুপ্তি ঘটলে ভারতেও খিলাফৎ আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যায়।

সমালোচনা: হিন্দু-মুসলিম ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ক্ষেত্রে খিলাফৎ আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে অনেক ঐতিহাসিক গান্ধিজির নেতৃত্বে পরিচালিত খিলাফৎ-অসহযোগ যৌথ আন্দোলনের সমালোচনা করেছেন।

প্রথমত, কংগ্রেস একটি ধর্মনিরপেক্ষ দল। সুতরাং কংগ্রেস একটি ধর্মীয় আন্দোলনকে সমর্থন করে সাম্প্রদায়িকতাকেই প্রশ্রয় দিয়েছে।

দ্বিতীয়ত, খিলাফৎ আন্দোলন ছিল তুরস্কের স্বার্থ নিয়ে পরিচালিত। একটি বহির্ভারতীয় সমস্যাকে কংগ্রেস নিজেদের মধ্যে যুক্ত করে ঠিক করেনি।

গুরুত্ব : সমালোচনা সত্ত্বেও বলা যায়, গান্ধিজির লক্ষ্য ছিল জাতীয় সংহতি প্রদর্শন এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। খিলাফ

আন্দোলন তা পূরণ করেছিল। তা ছাড়া বলতেই হয়, কংগ্রেস যেহেতু সমগ্র দেশবাসীর প্রতিনিধিত্ব করত, তাই তার পক্ষে মুসলমানদের স্বার্থ উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না।

অহিংস সত্যাগ্রহ অহিংস সত্যাগ্রহ আদর্শের স্রষ্টা হলেন মহাত্মা গান্ধি। সত্যাগ্রহ শব্দটি তৈরি হয়েছে সত্য' ও 'আগ্রহ' শব্দের সমন্বয়ে। সত্যাগ্রহ বলতে বোঝায় সত্যের প্রতি আগ্রহ। গান্ধিজির 'অহিংসা' ও 'সত্যাগ্রহ' আদর্শ দুটি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। তাই একে একসঙ্গে অহিংস সত্যাগ্রহ বলা হয়। গান্ধিজি বলতেন, মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হল সত্যের খোঁজ করা।
মহাত্মা গান্ধির আদর্শের সাথে নরম পর্থীদের আদর্শের সাদৃশ্য :
মহাত্মা গান্ধির আদর্শের সঙ্গে কংগ্রেসের প্রথম দিকের নরমপন্থীদের আদর্শের তুলনামূলক আলোচনা উভয় আদর্শের মধ্যে সাদৃশ্য হল

অহিংস আন্দোলন : মহাত্মা গান্ধি ও কংগ্রেসের নরমপন্থীরা অহিংস আন্দোলনের আদর্শে বিশ্বাস করতেন।

সশস্ত্র আন্দোলনের বিরোধী : মহাত্মা গান্ধি ও কংগ্রেসের নরমপন্থীরা ছিলেন সশস্ত্র আন্দোলনের বিরোধী।

অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য :ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতা অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি অনুসারে স্কুল-কলেজ, অফিস, আদালত, কলকারখানা "ছেড়ে হাজার হাজার ছাত্র-শিক্ষক, চাকরিজীবী, উকিল-ব্যারিস্টার আন্দোলনে যোগদান করে। তা ছাড়া এই আন্দোলনে যোগদানকারী শ্রমিক, কৃষক, সাধারণ মানুষ সকলেই ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতা করেছিল।

বিদেশি দ্রব্য বয়কট অসহযোগ আন্দোলনে বিদেশি দ্রব্য বয়কটের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল।

গঠনমূলক কর্মসূচি গ্রহণ : এই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল 'চরকা', 'খাদি', 'জাতীয় শিক্ষা' প্রভৃতি গঠনমূলক কর্মসূচি গ্রহণ।

হিন্দু-মুসলিম ঐক্য : হিন্দু ও মুসলমানরা একজোট হয়ে ব্রিটিশ বিরোধী অসহযোগ আন্দোলনে সামিল হয়েছিল। অসহযোগ আন্দোলন রদ করা বিষয়ে পানিবডির সিশান্ত
১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার চৌরিচৌরা নামক স্থানে উত্তেজিত জনতা থানায় আগুন লাগিয়ে দিলে ২২ জন পুলিশ মারা যান। এটি 'চৌরিচৌরা ঘটনা' নামে পরিচিত। এই ঘটনায় মর্মাহত হয়ে মহাত্মা গান্দি অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।
অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে মহাত্মা গান্ধির সঙ্গে আমি একমত। কারণ

1 গান্ধিজির আন্দোলন ছিল অহিংস আন্দোলন, কিন্তু টোরিটোরা ঘটনায় হিংসার প্রবেশ ঘটেছে।

2 নিরস্ত্র দেশবাসী হঠাৎ হিংসার আশ্রয় নিয়ে আন্দোলন শুরু করালে ব্রিটিশ সরকার ও দমননীতি অনুসরণ করত। ফলে দেশ হিংসার রত্নে নিমজ্জিত হত।

3 আন্দোলনের ফলে স্কুলকলেজ বন্ধ থাকায় অভিভাবকরা রুদ্ধ হচ্ছিলেন। সরকারি চাকরি ও অন্যান্য পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও অধৈর্য হয়ে পড়েছিলেন।

4 অসহযোগ আন্দোলনের ফলে গড়ে ওঠা জাতীয় বিদ্যালয় ও দেশীয় কাপড়ের জনপ্রিয়তা কমে আসছিল। 15 তুরস্কে কামাল পাশার নেতৃত্বে খলিফাতন্ত্রের অবসান ঘটার ফলে মুসলিম সমাজের খিলাফৎ আন্দোলন ধীরে ধীরে থেমে গিয়েছিল।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অসহযোগ আন্দোলন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ জাতীয় কংগ্রেস এই সময় দীর্ঘ ৩৫ রের রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তি' বা আবেদন-নিবেদন নীতি পরিত্যাগ করে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের আহ্বান জানায়। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণের পশ্চাতে নানা কারণ ছিল।

পটভূমি:

স্বায়ত্তশাসন লাভে ব্যর্থতা : প্রথম বিশ্বযুদ্ধে গান্ধিজির ডাকে ভারতীয়রা ব্রিটিশের পক্ষে যোগ দিয়েছিল এবং যুদ্ধ তহবিলে প্রচুর অর্থ দান করেছিল। বিনিময়ে ভারতীয়রা আশা করেছিল যে, যুদ্ধশেষে ভারত স্বায়ত্তশাসন লাভ করবে। কিন্তু যুদ্ধপরবর্তী মন্টেগু-চেমসফোর্ড' শাসনসংস্কার ভারতীয়দের কাছে তুচ্ছ, বিরক্তিকর ও নৈরাশ্যজনক' বলে পরিত্যক্ত হয়েছিল। ফলে। স্বায়ত্তশাসন লাভে ব্যর্থ ভারতীয়রা আন্দোলনের পথে পা বাড়িয়েছিল।

অর্থনৈতিক সংকট: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতবর্ষে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, খাদ্যাভাব, বেকার সমস্যা চরম আকার ধারণ করে। এই সময় অসহযোগ আন্দোলন ভূমিরাজস্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকদের অবস্থা সঙ্গিন হয়ে ওঠে। ফলে ভারতীয়রা আরও ক্ষুব্ধ হয়। রাওলাট আইন* : ব্রিটিশ সরকার 'রাওলাট আইন' পাস করে বৈপ্লবিক আন্দোলনের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছিল। রাওলাট কমিটির সুপারিশে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে দমনমূলক এই বিলটি আইনে পরিণত হয়। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড : রাওলাট আইনের প্রতিবাদে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৩ এপ্রিল অমৃতসর শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগ নামক জায়গায় কয়েক হাজার নিরস্ত্র জনতা শান্তিপূর্ণভাবে এক সভায় যোগ দিয়েছিল। জেনারেল ডায়ার বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে সভাস্থলে হাজির হন। জনগণকে বিন্দুমাত্র সতর্ক না করে পুলিশ তার নির্দেশে গুলি বর্ষণ করে। এতে শিশু, নারী, বৃদ্ধসহ সহস্রাধিক লোক নিহত হয়। এরপর ভারতবাসী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ে।
খিলাফৎ আন্দোলন : তুরস্কের সুলতান ছিলেন মুসলমান জগতের ধর্মগুরু বা “খলিফা’। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক জার্মানির পক্ষে যোগ দেয় ফলে ইংল্যান্ড তুরস্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। কিন্তু ভারতীয় মুসলমানরা ইংল্যান্ডের পক্ষেই যোগ দিয়েছিল। যুদ্ধশেষে সেভরের সন্ধিতে খলিফার ক্ষমতাও খর্ব করা হয়। ফলে ভারতীয় মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয়।

• আন্দোলনের প্রস্তাব গ্রহণ : গান্ধিজি এই ব্রিটিশবিরোধী ক্ষোভকে বৃহত্তর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করেন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে গান্ধিজি অসহযোগ আন্দোলনের পরিকল্পনা পেশ করেন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে কংগ্রেসের নাগপুর অধিবেশনে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। মহাত্মা গান্ধিকে এই আন্দোলনের নেতৃত্বভার অর্পণ করা হয়। এরপর মহাত্মা গান্ধি অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন।

অসহযোগ আন্দোলন : ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ এক স্মরণীয় বছর। এই বছর প্রথম পরিচালনাকালে কংগ্রেস তার 'আবেদন-নিবেদন' নীতি বা ‘রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তি' পরিত্যাগ করে সক্রিয় আন্দোলনের পথে অগ্রসর হয়। মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে জাতীয় কংগ্রেস অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করে।

• আন্দোলনের লক্ষ্য : ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে গান্ধিজি অসহযোগ আন্দোলনের পরিকল্পনা পেশ করেন এবং তা পাস হয়। অতঃপর ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে কংগ্রেসের নাগপুর অধিবেশনে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব পুনরনুমোদিত হয়। এই আন্দোলনের মূললক্ষ্য স্থির হয় – 0 স্বরাজ অর্জন, ও জালিয়ানওয়ালাবাগ অন্যায়ের প্রতিকার ও ও খিলাফৎ সমস্যার সমাধান।

গান্ধিজি বলেন, “ভারতবাসীর মর্যাদা ও দাবির প্রতি উদাসীন হৃদয়হীন বিদেশি সরকারের সঙ্গে কোনোরকম সহযোগিতা করা পাপ।” তিনি বিশ্বাস করতেন যে, যদি তাঁর নির্দেশিত অহিংস অসহযোগ নীতি অনুসরণ করা হয় তবে এক বছরের মধ্যে স্বরাজের লক্ষ্যে

• আন্দোলনের কর্মসূচি অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ছিল - 1 সরকারি খেতাব ও উপাধি বর্জন, ও সরকার অনুমোদিত স্কুল, কলেজ বয়কট, ও সরকারি অনুষ্ঠান বর্জন, @ আইনসভা, আদালত বয়কট, © বিদেশি দ্রব্য বর্জন করা প্রভৃতি। এই আন্দোলনের গঠনমূলক কর্মসূচি ছিল স্বদেশি দ্রব্য উৎপাদন, স্বদেশি বিদ্যালয় স্থাপন, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ ইত্যাদি।

• আন্দোলন* : গান্ধিজির আহ্বানে দেশবাসী অভূতপূর্ব সাড়া দেয়। অসহযোগ আন্দোলন ক্রমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, সরকারি চাকুরে, আইনজীবী সকলেই এই আন্দোলনে যোগদান করেন।
চৌরিচৌরার ঘটনা ও আন্দোলন প্রত্যাহার অহিংস অসহযোগ আন্দোলন যখন চরম আকার ধারণ করে তখন উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার চৌরিচৌরা নামক স্থানে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি শান্তিপূর্ণ নিরস্ত্র মিছিলের ওপর পুলিশ গুলি চালালে একদল উত্তেজিত জনতা থানায় অগ্নিসংযোগ করে। এর ফলে ২২ জন পুলিশকর্মী অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায়। গান্ধিজি চৌরিচৌরা ঘটনানা হিংতায় মর্মাহত হয়ে ২৫ ফেব্রুয়ারি আন্দোলন প্রত্যাহার করেন।
আন্দোলন প্রত্যাহারের প্রতিক্রিয়া গান্ধিজির এই আকস্মিক আন্দোলন বন্ধের সিদ্ধান্তে দেশবাসী হতাশ হয়। চিত্তরঞ্জন দাশ, মোতিলাল নেহরু, নেতাজি প্রমুখ এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা করেন।
গুরুত্ব : ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন একটি স্মরণীয় অধ্যায়— প্রথমত, এই আন্দোলন গ্রামাঞ্চলসহ সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল। দ্বিতীয়ত, সমস্ত শ্রেণির মানুষকে সংগঠি…১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি স্বরাজ্য দল গঠনের কথা ঘো © কাসিটি। স্বরাজ্য দলের কর্মসূচিগুলি ছিল
আইনসভায় প্রবেশ করে সরকারি কাজের বিরোধিতা করা, জাতীয় স্বার্থের পরিপুরক প্রস্তাব ও বিল উত্থাপন করে জাতীয়তাবাদের গতিতে সহায়তা করা, নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করে বিদেশি শোষণ বন্ধ করা। ●ল্য। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে স্বরাজ্য দল অংশগ্রহণ করে এবং ব্যাপক সাফল্য
অর্জন করে। কেন্দ্রীয় আইনসভায় ১০১টি আসনের মধ্যে স্বরাজ্য দল পেয়েছিল ৪৫টি আসন। প্রাদেশিক আইনসভাতেও তারা চমকপ্রদ সাফল্য লাভ করেছিল। বাংলার ৮৫টি আসনের মধ্যে তারা পেয়েছিল ৪৭টি এবং মধ্যপ্রদেশের ৫৪টির মধ্যে ৪১টি। তা ছাড়া বোম্বাই-এ ৩২টি, মুক্তপ্রদেশে ২৯টি, আসামে ১৩টি আসন লাভ করেছিল।।
কেন্দ্রীয় আইনসভায় স্বরাজ্য দল লিমাহ, মদনমোহন মালব্য প্রমুখ নেতার সঙ্গে জোট বেঁধে ৭০ জন সদস্যের একটি জাতীয় দল গঠন করে। মোতিলাল নেহরু এর নেতা হয়েয়ছিলেন। দলের গুরুত্ব ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে স্বরাজ্য দলের অবদান অনস্বীকার্য। কারণ প্রথমত: অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারের পর জনগণের মনে যখন হতাশা ও অবসাদ সৃষ্টি হয়েছিল সেই সময় স্বরাজ্য দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের কর্মসূচি গ্রহণ করে জাতীয় আন্দোলনকে পুনরায় প্রাণবন্ত ও গতিশীল করে তুলেছিল। দ্বিতীয়ত: স্বরাজ্য দলের আন্দোলনের ফলে ব্রিটিশ সরকার সাংবিধানিক সংস্কার করতে বাধ্য হয়েছিল।
তৃতীয়ত : আইনসভায় প্রবেশ করে সরকারের বিরোধিতা করায় জনগণ উদ্‌বুদ্ধ হয়েছিল।।
চতুর্থত: স্বরাজ্য দলের আন্দোলনের ফলেই সরকার সাইমন কমিশন নিয়োগ করতে বাধ্য হয়েছিল। তাই ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনেস্বরাজ্য দলের অবদান ছিল অপরিসীম।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে উদারপন্থী স্যার জন সাইমনের নেতৃত্বে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ৭ জন সদস্য নিয়ে এই কমিশন গঠিত হয়েছিল। ভারতীয়রা এই কমিশনের বিরোধিতা করে আন্দোলন করেছিল। স্বরাজ্য দলের পতনের পর সাইমন কমিশন
বিরোধী আন্দোলন ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনকে নবরূপে উদ্দীপ্ত করেছিল।

» সাইমন কমিশন গঠনের উদ্দেশ্য : ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে সাইমন কমিশন গঠনের উদ্দেশ্য ছিল - O ভারতীয়দের সাংবিধানিক অধিকার খতিয়ে দেখা, @ ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসনসংস্কারের কার্যকারিতা বিচার করা।

সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন

কমিশনের বিরুদ্ধে ভারতীয়রা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল, কারণ— 0 সাইমন কমিশনে কোনো ভারতীয় সদস্য ছিলেন না, সকলেই ছিলেন শ্বেতাঙ্গা সদস্য। তাই আন্দোলনকারী ভারতীয়রা একে ‘All white. commission' বলে নিন্দা করেছিল। ও একটি অ-ভারতীয় কমিশন ভারতীয়দের শাসনতান্ত্রিক যোগ্যতা বিচার করবে- এটি ভারতীয়দের পক্ষে খুবই লজ্জাজনক ব্যাপার বলে মনে হয়েছিল।
সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের আন্দোলন :

১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ৩ ফেব্রুয়ারি সাইমনের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের কমিশন বোম্বাই বন্দরে পদার্পণ করলে বিপুল গণবিক্ষোভ দেখা দেয়— 1 কমিশনের বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে হরতাল শুরু হয়, © কমিশনকে জাতীয় অপমান' মনে করে জনগণ 'Go back Simon' (সাইমন ফিরে যাও) ফানি দেয়, ও জাতীয় কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা, লিবারেল ফেডারেশন পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি এই কমিশনের বিরোধিতা করেছিল।

ভারতীয়দের মাধ্যে সাইমন কমিশনের বিরোধী আন্দোলনের মানসিকতা পরবর্তীকালে মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে আইন অমান্য আন্দোলনের পটভূমি রচনা করেছিল।