Chapter-7, মানুষের কার্যাবলি ও পরিবেশ অবনমন

প্রকৃতি-নির্ভর কার্যাবলি: মানুষ যখন প্রকৃতি থেকে সম্পদ সংগ্রহ করে তার
অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ গড়ে তোলে, তখন তাকে প্রকৃতি-নির্ভর কার্যাবলি
বলে। এই প্রক্রিয়াকে প্রাথমিক অর্থনৈতিক কার্যাবলিও বলা হয়। যেমন—
বন থেকে কাঠ সংগ্রহ, নদী বা জলাশয় থেকে মাছ সংগ্রহ, কৃষিকাজ,
বন্যপ্রাণী শিকার, বন থেকে ফলমূল সংগ্রহ ইত্যাদি এই প্রকার কার্যাবলির
অন্তর্গত।
প্রযুক্তি-নির্ভর কার্যাবলি: প্রাথমিক অর্থনৈতিক কার্যাবলি থেকে প্রাপ্ত
উপাদানগুলিকে যখন মানুষ উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগ করে আরও বেশি
উপযোগী দ্রব্যে পরিণত করে, তখন তাকে প্রযুক্তি-নির্ভর কার্যাবলি বলে।
এখানে মানুষ যে কেবল প্রকৃতির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর তা-ই নয়, বরং ওই সব
প্রাকৃতিক দ্রব্যকে আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহারের জন্য প্রযুক্তিকে হাতিয়ার
করেছে। যেমন— কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, ও বনের কাঠ থেকে
জাহাজ নির্মাণ বা আসবাবপত্র তৈরি, ও লোহার আকরিক থেকে লৌহইস্পাত
এবং তা থেকে যানবাহন, যন্ত্রপাতি তৈরি ইত্যাদি।

পরিবেশ: পরিবেশ বলতে কোনো জীবের পার্শ্ববর্তী সকল জৈব এবং অজৈব উপাদানের সমন্বয়কে বোঝায়। যেখানে উদ্ভিদ ও প্রাণী সকলেই সুস্থ
ও স্বাভাবিকভাবে জীবনধারণ করতে পারে। অর্থাৎ পরিবেশ বলতে মানুষ ছাড়া তার পার্শ্ববর্তী জৈব, অজৈব, ভৌত সকল বিষয়কেই বোঝায় এবং এরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সাথে সম্পর্কযুক্ত। প্রাকৃতিক পরিবেশ: প্রকৃতির তৈরি পরিবেশকে প্রাকৃতিক পরিবেশ বলে। আলো, বাতাস, বৃষ্টিপাত, বায়ুমণ্ডল, আর্দ্রতা, কীটপতঙ্গ, নদনদী, পাহাড় সবই প্রাকৃতিক পরিবেশের অন্তর্গত। এই পরিবেশ সৃষ্টিতে মানুষের কোনো ভূমিকা নেই।

সনাতনের দাদা এবং সাহিলের বাবা যে ধরনের কাজ করেন সেগুলি প্রকৃতি-নির্ভর কাজ। এগুলি হল মূলত প্রকৃতি থেকে সরাসরি সম্পদ সংগ্রহ করার পদ্ধতি। এ ধরনের আরও কয়েকটি কাজ হল -0 বন থেকে কাঠ, ফুল, ফল, পাতা সংগ্রহ করা, 2 নদী থেকে মাছ ধরা, 3 বন থেকে বন্যপ্রাণী শিকার করা, @ সাধারণভাবে প্রাচীন পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করা ইত্যাদি।

এগুলি প্রকৃতিতে অপরিবর্তিতভাবে পাওয়া সম্ভব। এই ধরনের কাজে নদীতে মাছ কমে গেলে মাছ চাষের সুযোগ নেই বা উর্বরতা কমে গিয়ে ফসল উৎপাদন কম হলে রাসায়নিক সার, কীটনাশকের ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানোরও কোনো সুযোগ নেই।

মানুষ তার উন্নত মেধা, বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা, প্রযুক্তির ব্যবহারের  মাধ্যমে নানা ধরনের কাজকর্ম করে থাকে। গুলিই হল প্রযুক্তি নির্ভর কাজ। যেমন- প্রকৃতির কালা মানুষের উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে তাপবিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়। 2 জমিতে আরও ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ করা। 3 মাটির নীচের আকরিক লোহা থেকে লৌহ ইস্পাত বানানো। © মাটির তলায় খনিজ তেলকে ব্যবহারের উপযোগী জ্বালানিতে রূপান্তর করা। ৫ নানা ধরনের যন্ত্রশিল্প ও পরিকাঠামো উন্নয়ন ইত্যাদি হল প্রযুক্তি-নির্ভর কাজের উদাহরণ।

প্রযুক্তি নির্ভর কাজের জন্য মানুষের যেমন উপকৃত হয়েছে তেমনি প্রযুক্তিগত প্রায়ন পরিবেশের অবনমন ও ঘটিয়েছে। যেমন -0 কয়লা, খনিজ তেল পুড়িয়ে তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় বায়ুতে প্রচুর SO2, CO2 ও অন্যান্য গ্যাস মিশে যায়। এতে ব্যাপক বায়ুদূষণ ঘটে। রাস্তাঘাট নির্মাণের সময় বাতাসে গুলো ওড়ে, পিচ গলানোর জন্য বায়ুতে SO, CO, ইত্যাদি গ্যাসের মাত্রা বেড়ে যায়। পাহাড়ি রাস্তা নির্মাণে পরিবেশের ভারসাম্য হারিয়ে যায়। 3) বাঁধ নির্মাণ করে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকালে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। O কলকারখানার ধোঁয়া বায়ুমণ্ডলকে এবং নোংরা জল নদী, সাগর, দূষিত করে। পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য খুব দূষিত হয়।

যে ধরনের কার্যাবলি মানুষকে সেবা বা পরিসেবা প্রদান করে সেটি সেবামূলক কার্যাবলির অন্তর্গত। এই ধরনের কার্যাবলি বৃদ্ধি পেলে সামাজিক উন্নয়ন বৃদ্ধি পায়। যেমন—ব্যাংক, বিমা, শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহণ এই জাতীয় কার্যাবলির অন্তর্গত। উন্নত দেশগুলিতে এ কার্যাবলি বেশি দেখা যায়।

1 পরিবেশ দূষণ: বামচাষ, ভোপালের গ্যাস দুর্ঘটনা, বিমানবন্দরে ধোঁয়ালা, মাছের বাজারে দুর্গ ।

2 পরিবেশর অবনমন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, মরুভূমির প্রসার, অরণ্য বিনাশ, পুকুরে মাছ মরে যাওয়া, বন্যপ্রাণীদের খাদ্য সংকট, নদী বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ, সুন্দরবনে আয়লার প্রভাব।

প্রাকৃতিক পরিবেশের বিভিন্ন ভৌত এবং জৈব  করে যে পরিবেশের কোনো প্রাকৃতিক অংশের ক্ষতি হলে তা প্রকৃতি নিজে থেকেই পূরণ করে ফেলে, অর্থাৎ প্রকৃতির ভারসাম্য প্রকৃতি নিজেই রক্ষা করে। এর জন্য মানুষের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয় না। প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হলে পুনরায় সেই ভারসাম্য ফিরে আসার ব্যবস্থাকেই হোমিওস্ট্যাটিক ব্যবস্থা (homeostatic mechanism) বলে।

[11:22 am, 25/08/2022] Dipbendu: কৃষিতে রাসায়নিক সার, অতিরিক্ত জলসেচ এবং একই জমিতে বারবার চাষ, উচ্চফলনশীল বীজের ব্যবহার বৃদ্ধি ইত্যাদির প্রভাব পরিবেশের ওপর পড়ে। যেমন—

1 জমির উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস; একই জমিতে বছরে তিন-চার বার চাষ করার জন্য জমির ওপর খুব চাপ পড়ে ফলে জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হয়। এতে জমির মধ্যে অতি প্রয়োজনীয় পুষ্টি মৌলের ঘাটতি দেখা যায়। ফলে জমিতে বসবাসকারী বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও প্রাণীদের মৃত্যু ঘটে।

2 দূষণ সৃষ্টি: অধিক চাষবাসের কারণে জমিতে রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার ইউট্রোফিকেশন ঘটায় এবং ভৌমজলেরও দূষণ ঘটায়। এ ছাড়া, বিপুল পরিমাণে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশকের ব্যবহার ভূমির ক্ষয় এবং বায়ুদূষণ সৃষ্টি করে। 3 কাভূমি ধ্বংস অধিক কৃষিকাজ করার জন্য অধিক জমি প্রয়োজন, তাই বনভূমি ধ্বংস করে নতুন নতুন কৃষিজমি তৈরি হচ্ছে। যার ফলে অতি প্রয়োজনীয় বনভূমির বিলুপ্তি ঘটছে এবং বাস্তুতা বিঘ্নিত হচ্ছে।

 

কোনো কারণে পুকুরের জল দূষিত হলে পুকুরের ও বিভিন্ন জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটতে দেখা যায়। পুকুরের জল বিভিন্ন কারণে দূষিত হয়। যেমন—
ইউট্রোফিকেশন: ইউট্রোফিকেশনের জন্য পুকুরে কচুরিপানা বা শ্যাওলার পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে জলে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা যায়। তার ফলে মাছের মৃত্যু ঘটে।
2 আফা শহর বা গ্রামের পুকুরগুলিতে অনেকে আবর্জনা ফেলে যা থেকে দূষণ ছড়ায়, পুকুরের গভীরতা কমে যায়। এর ফলে মাছের মৃত্যু ঘটতে পারে।
3 কল্পকারখানার দূষিত জল: কলকারখানার নোংরা, বিষাক্ত জল যদি স্থানীয় পুকুর বা জলাশয়ে পড়ে তবে পুকুরটির জল দূষিত হয়ে সব নাছ মরে যেতে পারে।

4 পলি : দীর্ঘদিন পুকুর পরিষ্কার করা না হলে পুকুরের তলদেশে পলি সঞ্চিত হয়ে পুকুরের গভীরতা হ্রাস পায়। এর ফলে মাছের মৃত্যু হতে

5 প্রয়োগ; কোনো পুকুর বা জলাশয়ে কীটনাশক প্রয়োগ করলে সব মাছ ও জলজ প্রাণী মারা যেতে পারে।

জলাভূমি পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। কিন্তু জলাভূমি ভরাট করলে পরিবেশে তার মারাত্মক প্রভাব পড়বে । যেমন - 1 ভৌমজলস্তর হ্রাস পাবে, 2 জলজ বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হবে, ও জলাভূমি নোংরা জলকে প্রাকৃতিকভাবে শোধন করে। জলাভূমি ভরাট করলে সেই প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে, @ মাছের উৎপাদন হ্রাস পাবে, 5 ভূমিধসের প্রকোপ বাড়বে, 6 বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে, 7 সামগ্রিকভাবে বাস্ততা বিঘ্নিত হবে।

নগরায়ণের ফলে পরিবেশে বিরূপ প্রভাব পড়ছে, যেমন—

ভূগর্ভস্থ জলে টান: নগরায়ণ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে মানুষের জন্য পানীয় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জলের প্রয়োজন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সেই জন মূলত ভূগর্ভস্থ জল থেকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ভৌমজলস্তর খুব দ্রুত নেমে যাচ্ছে, ফলে আর্সেনিক, ফ্লুরাইড প্রভৃতি দূষণের সৃষ্টি হচ্ছে।

দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি: নগরায়ণের ফলে রাস্তাঘাট এবং যানবাহনের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কলকারখানা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে শব্দ এবং বায়ুদূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জননিকাশির সমস্যা: অতিরিক্ত নগরায়ণের জন্য মানুষের সৃষ্ট আবর্জনা নিকাশি নালাগুলিতে আটকে যায়, ফলে বর্ষাকালে বা একটু বৃষ্টি হলে ওইসব জল নিকাশিনালার মাধ্যমে নিষ্কাশিত হতে পারে না।

4 যানজট: অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে রাস্তাগুলি অপরিসর ও অপরিচ্ছন্ন হয়, এতে যানবাহনের গতি রুদ্ধ হয় এবং যানজট সৃষ্টি হয়।

তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন পদ্ধতি পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, যার ফলে নানা প্রকার দূষণের সৃষ্টি হয়। যেমন

দূষণ: কয়লা পুড়িয়ে তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন করার জন্য বাতাসে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন এর বিভিন্ন অক্সাইড যুক্ত হয়, যা ভয়ংকররূপে বায়ুদূষণ ঘটায়।
জলবায়ুর পরিবর্তন: জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারের মাত্রা যত বাড়বে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা ততই বাড়বে এবং বায়ুর তাপমাত্রা বাড়লে বিশ্ব উন্নয়ন (Global warming) ঘটবে। এর ফলে পৃথিবীর জলবায়ুগত পরিবর্তন ঘটবে। বর্তমানে পৃথিবীতে উন্নতা বৃদ্ধির মূল কারণ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র।

ভূমিদূষণ: তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত ছাই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পার্শ্ববর্তী কৃষিজমির ওপর পড়লে ওই জমি কৃষির অনুপযুক্ত হয় এবং ভূমি কখ্যা হয়ে যায়।

অমবৃষ্টি: তাপবিদ্যুত কেন্দ্র থেকে নির্গত বিভিন্ন প্রকার গ্যাস (যেমন SO2 ) বৃষ্টির জলের সাথে মিশে অম্লবৃষ্টি ঘটায়, যা কৃষিজমি, জলাশয়, মানুষের তৈরি স্মৃতিসৌধকে নষ্ট করে দেয়।

তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, যেমন—

1 নদীর জিয়ো নদীতে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। বলে নদীর গতিপথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ফলে ওই নদীর বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 2 বনভূমির ধ্বংসসাধন: জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সময় নদীর জলকে আটকে রাখার জন্য বাঁধের পিছনে যে বৃহৎ জলাধার তৈরি করা হয়। সেটি নির্মাণের জন্য ওই অঞ্চলের বনভূমি ধ্বংস করা হয়।

3 ভূমিকম্প: জলবিদুৎ কেন্দ্রের জন্য নির্মিত যে বিশাল জলাধারে জল লঙ্কিত থাকে তার চাপে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ভূমিকম্প ঘটতে পারে।

4 জীববৈচিত্র্য হ্রাস: জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পার্শ্ববর্তী নদী অববাহিকায় বসবাসকারী নানা ধরনের উদ্ভিদ এবং প্রাণী বৈচিত্র্য হ্রাস পায় এবং মানুষের বাসস্থানের পরিবর্তন ঘটে।

যে পরিকল্পনার সাহায্যে কোনো নদীতে বাঁধ দিয়ে তার জলসস্তারকে নানাবিধ কাজে ব্যবহার করা হয় সেই সকল পরিকল্পনাকে বহুমুখী নদী পরিকল্পনা (multipurpose river valley project) বলে। এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্যগুলি হল- জলসেচ, ঔ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও মাছ চাষ, @ জলপথ পরিবহণ, © পানীয় জল সরবরাহ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ভূমিক্ষয় রোধ, ৪ রেল, সড়ক ও সেতু নির্মাণ, 9 পর্যটন ইত্যাদি। দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের বাঁধটি এই বহুমুখী নদী পরিকল্পনার অন্তর্গত।

বহুমুখী নদী পরিকল্পনা পরিবেশে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি করে—

1 জলাধারের চাপ: বিশাল জলাধার নীচের শিলাস্তরে চাপ দেয় এবং ওই বিপুল চাপ নীচের শিলাস্তর সহ্য করতে না পারলে সেখানে ভূমিকম্প ঘটতে পারে। যেমন- 1967 সালে মহারাষ্ট্রের কয়নাতে এমনভাবে ভূমিকম্প হয়েছিল।
2 স্বাভাবিক বনাল ধ্বংস: জলাধার নির্মাণের জন্য এবং প্রচুর খান কাটার জন্য বনভূমির পরিমাণ কমে যায়।

3 নদীর ধারণ অববাহিকার অবনমন: বহুমুখী নদী পরিকল্পনার ফলে নদীর ধারণ অববাহিকার অবনমন হয় এবং সমগ্র অববাহিকা জুড়ে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

4 অতিরিক্ত পলি সঞ্চয়: নদী যে অতিরিক্ত পলি বহন করে আনে তা সমুদ্রে না পড়ে জলাধার এবং পার্শ্ববর্তী কৃষিজমিগুলিতে পড়ে। এর ফলে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়।

5  মানুষের বসতি পরিবর্তন: বহুমুখী নদী পরিকল্পনার কারণে নদীর পার্শ্ববর্তী মানুষের স্থায়ী বাসস্থানের পরিবর্তন ঘটে এবং মানুষ উদ্‌বাস্তু হয়ে পড়ে।

[11:42 am, 25/08/2022] Dipbendu: কোনো নির্দিষ্ট স্থানে বসবাসকারী জীব এবং জড় গোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যে অনুকূল বসবাসরীতি গড়ে ওঠে, তাকে বাস্তুতন্ত্র ( ecosystem) বলে। 1935 সালে বিজ্ঞানী ট্যান্‌সলি সর্বপ্রথম 'বাস্তুতন্ত্র' শব্দটি ব্যবহার করেন।

জীববৈচিত্র্য: জীববৈচিত্র্য বলতে জীবের সংখ্যা, বিভিন্নতা বা বৈচিত্র্য এবং পরিবর্তনশীলতাকে বোঝায়। 1992 সালে অনুষ্ঠিত বসুন্ধরা সম্মেলন'-এ জীববৈচিত্র্যের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয় তা হল- “লজ এবং জলজ (সামুদ্রিক ও অন্যান্য) বাস্তুতন্ত্রের অন্তর্গত সব ধরনের সজীব উপাদানের মধ্যে যে বৈচিত্র্য তাকেই জীববৈচিত্র্য বলে"।

 

কর্মচা: ঝুমচাষ হল একধরনের আদিম কৃষিব্যবস্থা, যেখানে কোনো অঞ্চলের বনভূমি কেটে পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং কয়েকবছর ওই জমিতে চাষবাস করা হয়। পরে ওই জমির উর্বরতা কমে গেলে অন্য কোনো অঞ্চলের বনভূমি পুড়িয়ে পুনরায় চাষবাস করা হয়। এইভাবে একস্থান থেকে অন্য স্থানে চাষের জমির পরিবর্তন ঘটে বলে ঝুমচাষকে স্থানান্তর কৃষি নামেও অভিহিত করা হয়।
পরিবেশের ওপর ঝুমচাষের প্রভাব: 1 এই ধরনের চাষের ফলে বনভূমি ধ্বংস করা হয়। তাই পরিবেশ অরক্ষিত হয়ে পড়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ গাছের মৃত্যু হয়। 2 ব্যাপকভাবে মাটির ক্ষয় হয় ও বন্যপ্রাণীর অবলুপ্তি ঘটতে পারে। 3 বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং বনাঞ্চল পোড়ানোর জন্য বায়ুদূষণ হয়।

ড. বোরলগের প্রচেষ্টায় এবং ড. স্বামীনামনের সাহায্যে এদেশে 1970-এর দশক থেকে কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে, যা সবুজ বিপ্লব নামে খ্যাত। এই সবুজ বিপ্লবের সুফলগুলি হল – 1 খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর ফলে দেশের মানুষের জন্য খাদ্যশস্য সরবরাহ বেড়ে গেছে। ও দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশে খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করা গেছে। ও কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা গেছে। 1 কৃষিভিত্তিক নানা শিল্পের উন্নতি ঘটেছে। কৃষি যন্ত্রপাতি নির্মাণ, কলকারখানা ও শিল্পের উন্নয়ন হয়েছে এবং রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দ্রব্য উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে।

একসময় বন থেকে ফল সংগ্রহ করত আবার পশুশিকার করেও জীবিকানির্বাহ করত। তারপর বিভিন্ন সময় বা কালের সাথে সাথে মানুষ উন্নত হয়েছে এবং নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষ তার জীবন অতিবাহিত করেছে। এগুলি হল – 1 শিকার ও খাদ্যসংগ্রহের কাল, 2 পশুপালন ও পশুচারণের কাল, ও কৃষিকার্যের কাল, ও বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিক্ষোন্নয়নের কাল। শিকার ও খাদ্যসংগ্রহের কাজ: এই পর্যায়ে মানুষ প্রকৃতির কোনোরকম পরিবর্তন না ঘটিয়েই জীবনযাপন করত, ফলে এই পর্যায়ে মানুষ পরিবেশের কোনো ক্ষতি করেনি বরং প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে আগুনের ব্যবহার, মাংস পুড়িয়ে যাওয়া, বন থেকে ফলমূল সংগ্রহ করে যাওয়া, এর সঙ্গে বন্যপ্রাণীর থেকে আত্মরক্ষা করতে শিখেছিল ।পশুপালন ও পশুচারণের কাল: আগুন জ্বালাতে শেখা এবং তার ব্যবহারের পর সভ্যতার বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের সূচনা হয়। এটি হল ——পশুদের বশ করা এবং স্থানান্তরে বিচরণ বা পশুচারণ করা। প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষ মূলত দুধ এবং মাংসের জন্য পশুপালন আরম্ভ করে কিন্তু তার পরবর্তীকালে পশুর খাদ্য ও বসতি নির্মাণের জন্য মানুষ উদ্ভিদ হত্যা শুরু করে এবং প্রকৃতিকে শোষণ করতে শুরু করে।

কৃষিকার্যের কাল: খাদ্য জোগানের জন্য কৃষিজমি তৈরি এবং কৃষির প্রচলন সভ্যতার বিবর্তনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এর ফলে মানুষ স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে, বনভূমি কেটে কৃষিজমি তৈরি করে চাষবাস শুরু হয়। প্রায় সাড়ে সাত হাজার বছর আগে এভাবেই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কৃষিভিত্তিক সভ্যতার উদ্ভব হয়।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য কৃষিজমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং পরিবেশ মানুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে অত্যধিক রাসায়নিক সার, কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহার, অতিরিক্ত জলসেচ, উচ্চফলনশীল বীজের ব্যবহার পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিল্পোন্নয়নের কাল: মোটামুটি 1860 সাল অর্থাৎ শিল্পবিপ্লবের সময় থেকেই পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকল, বাড়তে থাকল জনসংখ্যা। কৃষি, শিল্প আর বসতির জন্য জমির চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকল এবং তৈরি হল নতুন নতুন রাস্তাঘাট, কলকারখানা, শহর, নগর। প্রকৃতির সম্পদ নির্বিচারে লুঠ করতে থাকল মানুষ। উন্নয়নের নামে বিশ্বযুদ্ধ, সামরিক অস্ত্র পরীক্ষানিরীক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে বর্তমানে পরিবেশ আজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, আর এর ক্ষতিকর প্রভাব আমরা সকলেই অনুভব করতে পারছি।

পরিবেশের অবনমন বলতে বোঝায় মানুষের হস্তক্ষেপের ফলে পরিবেশের সামগ্রিক গুণমান হ্রাস পাওয়া । অর্থাৎ পরিবেশের অবনমন বলতে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়াকেও বোঝায়। পরিবেশ দূষণ, অরণ্য নিধন, শহর ও নগরোন্নায়ন, কৃষিজমির পরিমাণ বৃদ্ধি, জীবপ্রজাতির ধ্বংস ইত্যাদি পরিবেশ অবনমনের মূল দিক। পরিবেশের অবনমন দু-ভাবে হতে পারে— 1 প্রাকৃতিক কারণে. 2 মনুষ্যসৃষ্ট কারণে।

প্রাকৃতিক কারণ; কখনো-কখনো প্রকৃতি নিজেই পরিবেশের অবনমনের জন্য দায়ী হয়। যেমন -1 অগ্ন্যুৎপাত, 2 বন্যা 3 খরা, 4 ভূমিকম্প,5 ধস, 6 সুনামি, 7 দাবানল, 8 অম্লবৃষ্টি, 9 নিবেন গ্যা 10 ব্যাপক তুষারপাত ও তুষারঝড়, 11 হড়পা বান, 13 ঘূর্ণিঝড় প্রভৃতি। প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতাগুলির জন্য পরিবেশ দূষিত হয় এবং পরিবেশের যথেষ্ট অবনমন হয়। বনভূমির ধ্বংসসাধন, বাতাসের CO2 এর পরিমাণ বৃদ্ধি, নদীগর্ভে অতিরিক্ত পলি সঞ্চয়, ধূলিঝড় প্রভৃতি পরিবেশের কিছু না কিছু ক্ষতি করে, এর ফলে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীদের মৃত্যু হয়।

মনুষ্যসৃষ্ট কারণ: বর্তমানে মানুষই পরিবেশ অবনমনের জন্য সর্বাপেক্ষা দায়ী। মানুষের অদূরদর্শী কার্যকলাপ পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। যেসব কারণে মানুষ পরিবেশের অবনমন ঘটাচ্ছে তা হল -1 জীবাশ্ম জালানির অতিরিক্ত দহন, 2 জনসংখ্যার মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি, 3 নগরায়ণ, 4 কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, 5 সামরিক অস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং যুদ্ধ, 6 কৃষিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, 7 শিল্পের বর্জ্য পদার্থ পুকুর, নদী ও সাগরে স্থানান্তর, 8 সম্পদের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার, 9  নির্বিচারে গাছ কাটা, 10 প্রয়োজনের অধিক খনিজ পদার্থ আচরণ, 11 প্রবহমান জলধারাকে বাঁধ দিয়ে বেঁধে তাকে ব্যবহার করা,12  প্লাস্টিক ও অজৈব পদার্থের সীমাহীন ব্যবহার, 13 পারমাণবিক চুল্লি ও পারমাণবিক বোমার ব্যবহার ইত্যাদি।

বর্তমান সমাজের ওপর পরিবেশের অবনমনের প্রভাবগুলি হল নিম্নরূপ —

1 দূষণ: পরিবেশ অবনমনের অবশ্যম্ভাन যেমন [i] বায়ুদূষণ: অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, খনিজ তেল) ব্যবহার করে চালিত যানবাহন বা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে যে ধোঁয়া বের হয় তা থেকে বায়ুদূষণ ঘটে। [ii] জলদূষণ: কলকারখানার বর্জ্য পদার্থ নদীর জলের সাথে মিশে এবং অশোধিত খনিজ তেল সমুদ্রের জলের সাথে নিলে জলদূষণ ঘটায়। [ii] চিণ কৃষিতে রাসায়নিক সার কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার, অতিরিক্ত জলসেচ, বারবার মাটিতে লাঙল দেওয়ায় মাটিদূষণ ঘটে।

2  বন্যা ও খরা : বন্যা ও খরা আসলে জলবায়ুগত অবনমন। একদিকে যেমন অধিক বনাঞ্চল ধ্বংসের জন্য ঘরা একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, অন্যদিকে তেমনি পৃথিবীর উন্নতা বৃদ্ধির জন্য বন্যার প্রকোপক্রমশ বাড়ছে | এ ছাড়া ভূমিভাগের ক্ষয়ের ফলে নদীর তলদেশে অধিক পলির সঞ্চয় ঘটে যা প্লাবনের সম্ভাবনা বাড়ায় ।

3 বিশ্ব উন্নায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন: জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার, বনভূমির ধ্বংসসাধন পৃথিবীর উন্নতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এইসব কারণে পৃথিবীর দুই মেরু অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে গিয়ে সমুদ্রের জলের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

4 প্রাকৃতিক সম্পদের হ্রাস : পরিবেশ অবনমনের কারণে প্রকৃতি থেকে যাবতীয় সম্পদের অবলুপ্তি ঘটছে অর্থাৎ নানাবিধ খনিজ সম্পদ, বনভূমি, পানীয় জল, উর্বর মাটি সবকিছুর ওপরই এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে | ফলে প্রকৃতি হয়ে উঠছে শূন্য, রিক্ত এবং সম্পদহীন।

5 জীববৈচিত্র্য হ্রাস: লক্ষ লক্ষ বছর ধরে প্রকৃতির বুকে গড়ে ওঠা নানা প্রজাতির উদ্ভিদ এবং প্রাণী বিগত কয়েকশো বছরে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়েছে। এভাবে দ্রুত জীববৈচিত্র্যের হ্রাস পরিবেশের অবনমনকে তরান্বিত করেছে।

6 ভূমিকম্প: পাহাড়ি ঢালে চাষবাস, গাছ কেটে ফেলা, রাস্তাঘাট নির্মাণ, খনি থেকে খনিজ দ্রব্য সংগ্রহ করা, ভৌমজলের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার প্রভৃতি ভূমিকম্প ঘটাতে সাহায্য করে।

7 রাসায়নিক দুর্ঘটনা : বিভিন্ন শিল্পকারখানায় রাসায়নিক দুর্ঘটনা, পরমাণু কেন্দ্রে বিস্ফোরণ মারাত্মকভাবে পরিবেশের অবনমন ঘটায় যেমন—ভারতের ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা এর উদাহরণ |

8 রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি: পরিবেশের গুণমান নষ্ট হলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে ক্যানসার, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, এনকেফ্যালাইটিস ও অন্যান্য জ্বরঘটিত অসুখ এবং ফুসফুসের রোগ, হার্টের রোগ, চিত্তচঞ্চলতা বৃদ্ধি প্রভৃতি রোগ দেখা দেয় |

ভারতের প্রধান নদী গঙ্গা বর্তমানে দেশের অন্যতম দূষিত নদী। এই গঙ্গাকে তার পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিতে, অর্থাৎ একে স্বচ্ছ, সুন্দর, দূষণমুক্ত এবং পানযোগ্য জলের নদীতে পরিণত করতে হলে বিভিন্ন ধরনের অনেকগুলি ব্যবস্থা নিতে হবে। এর মধ্যে সবার আগে আমি নিম্নলিখিত তিনটি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চাই–0 শহরের পয়ঃপ্রণালীর জল এবং কলকারখানার বর্জ্য জল সরাসরি গঙ্গায় না ফেলা: উত্তরাখন্ড, উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত গঙ্গা নদীর দুই তীরে এমন অসংখ্য শহর, জনবসতি, কলকারখানা প্রভৃতি আছে, যাদের পয়ঃপ্রণালীর জল বা বর্জ্য জল সরাসরি গঙ্গায় ফেলা হয় গঙ্গাকে দূষণমুক্ত করার জন্য এইসব অত্যন্ত ক্ষতিকর জল যাতে নদীতে না পড়ে বা ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে পরিশুদ্ধ করে গঙ্গায় ফেলা হয়, খুব শীঘ্রই সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। 2 মৃত জীবজন্তুর দেহ, কঠিন আবর্জনা, দেবদেবীর মূর্তি প্রভৃতি গঙ্গায় না ফেলা: গঙ্গার সুদীর্ঘ প্রায় 2500 কিমি প্রবাহপথের দুই ধার থেকে প্রতিনিয়তই মৃত জীবজন্তুর দেহ, মৃত মানুষের দেহাবশেষ, অস্থি, নানা ধরনের কঠিন আবর্জনা, দেবদেবীর মূর্তি প্রভৃতি গঙ্গায় ফেলা হয়। এগুলি নদীর জলকে অত্যন্ত দূষিত করে। এসব বন্ধের জন্য প্রণয়নের মাধ্যমে কড়া শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়াও গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্লাব, পঞ্চায়েত, মিউনিসিপ্যালিটি প্রভৃতির সাহায্য নিয়ে স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে। 3 গঙ্গা তীরবর্তী শ্মশান ঘাটগুলিকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া: উৎস থেকে মোহানা পর্যন্ত গঙ্গার দুই তীরে আছে অসংখ্য শ্মশান ঘাট, যেগুলি থেকে নানা ধরনের আবর্জনা, রোগব্যাধির জীবাণু প্রভৃতি গঙ্গায় মিশে গঙ্গাকে সাংঘাতিক দূষিত করে। মৃতদেহ সৎকারের জন্য শুধু বৈদ্যুতিক চুল্লি স্থাপন করলে এই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য শ্মশান ঘাটগুলিকে নদী থেকে যথেষ্ট দূরে স্থানান্তরিত করতে হবে।

‘চিপকো' কথার অর্থ জড়িয়ে ধরা। অরণ্য রক্ষার জন্য গাছকে জড়িয়ে ধরে তাকে কাটতে না দেওয়ার যে আন্দোলন সেটিই 'চিপকো আন্দোলন' নামে খ্যাত ।

আন্দোলনের সূত্রপাত: উত্তরাঞ্চলের গাড়োয়াল অঞ্চলের অধিবাসীরা হিমালয়ের অরণ্য রক্ষার জন্য বিগত শতকের ষাট ও সত্তর দশকে এই আন্দোলন শুরু করেছিল।

ঠিকাদাররা গাছ কাটতে এলে গ্রামবাসীরা, বিশেষ করে গ্রামের মহিলারা এর প্রতিবাদ করে এবং গাছকে জড়িয়ে ধরে গাছ কাটতে বাধা দেয়। গাছ কাটার বিরুদ্ধে, প্রতিরোধে শামিল হয়েছিলেন বিশিষ্ট পরিবেশবাদী সরলাবেন, সুন্দরলাল বহুগুনা, চণ্ডীপ্রসাদ ভাট ও অন্যান্য বহু মানুষ। এই আন্দোলনই চিপকো আন্দোলন নামে খ্যাত।
ফলাফল: (1) এই আন্দোলনের ফলে হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে বহু বছর কোনো গাছ কাটা হয়নি। (2) সারা দেশজুড়ে বৃক্ষরক্ষার তৎপরতা দেখা যায়। ফলে পরিবেশ অনেকখানি সুরক্ষিত করা গেছে।

প্রায় 2500 কিমি দীর্ঘ গঙ্গানদী আজ দূষণে আক্রান্ত | বিশেষ করে মোহানা থেকে উৎসের দিকে 600 কিমি পর্যন্ত নদীটি সর্বাধিক দূষিত। নানাবিধ কারণে আমাদের প্রাণস্বরূপ গঙ্গা দূষিত হয়েছে। গঙ্গাকে দূষণমুক্ত করতে যে প্রকল্প গৃহীত হয়েছে তা গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান নামে পরিচিত।
সময়কাল: 1986 সালের 14 জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বারাণসী শহরে এই প্রকল্পের সূচনা হয়।

কর্মসূচি : 1 প্রথম শ্রেণির 25টি শহরের পয়ঃপ্রণালীর জল পরিশোধন করে গঙ্গায় ফেলার ব্যবস্থা করা। 2 গঙ্গার তীরে ইটভাটা-জাতীয় কারখানা না রাখা। ও গঙ্গায় যাতে সারাবছর জলপ্রবাহ বজায় থাকে তার ব্যবস্থা করা | 4 নদীর পলি অপসারণ করা। 5 দূষিত জল যাতে গঙ্গায় না পড়ে তার 'ব্যবস্থা করা। 6 গঙ্গার পাড়ে অবস্থিত কারখানাগুলি যাতে নোংরা জল ও বর্জ্য নদীতে না ফেলে তার জন্য সজাগ থাকা ইত্যাদি।

উদ্দেশ্য: 1 গঙ্গার জল দূষণমুক্ত করে পুরানো বাস্তুতন্ত্র বজায় রাখা। 2 নদীর গভীরতা বা নাব্যতা বজায় রাখা।'3 নদীর জলকে পানযোগ্য করে তোলা। 4 গঙ্গার পাড়ের ভাঙন রোধ করা। 5 গঙ্গার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের পরিবেশ সুস্থিত ও সুন্দর রাখা।

[0:25 pm, 26/08/2022] Anju: পরিবেশের অবনমন এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে তা বন্ধ করতে না পারলে পৃথিবীর বিপদ আসন্ন। পরিবেশবিদরা পৃথিবীর অবনমন নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। এগুলি হল—

1 শিক্ষা সচেতনতা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ : শিক্ষিত সচেতন মানুষ পরিবেশের অর্থ বোঝেন | সেই কারণে পৃথিবীর সকল মানুষকে সুশিক্ষিত করে তুলতে হবে, যাতে সকলে মিলে পরিবেশকে রক্ষা করতে পারে। আবার দারিদ্র্যতাও পরিবেশের অবনমনের জন্য সমানভাবে দায়ী। তাই
[0:26 pm, 26/08/2022] Anju: দরিদ্র দেশগুলিকে শিক্ষার উন্নয়নের মাধ্যমে উন্নত এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে।

(2) পরিবেশবান্ধব শক্তির ব্যবহার: কয়লা, খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার হ্রাস করে, বিকল্প এবং চিরস্থায়ী পরিবেশবান্ধব শক্তিকে ব্যবহার করতে হবে। যেমন— বায়ুশক্তি, সৌরশক্তি ও অন্যান্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে পরিবেশ দ্রুত আগের মতো সুস্থিত অবস্থায় ফিরে আসবে।

3 সম্পদের পুনর্ব্যবহার: যে-কোনো সম্পদকে যাতে বারংবার ব্যবহার করা যায় তার ওপর দৃষ্টিপাত করা দরকার, এর জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। সম্পদের পুনর্ব্যবহার করলেই সম্পদের সঞ্চয় ঘটানো সম্ভব হবে।

4 জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ: জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ পরিবেশকে অবনমনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। অর্থাৎ কোনো দেশের জনসংখ্যা এবং সম্পদের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে পরিবেশের অবনমন ঘটতে বাধ্য। ঠিক একই কারণে ভারতের মতো দেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ খুব জরুরি।

6 জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ : জীবমণ্ডলের বৈচিত্র্য না থাকলে পরিবেশ ধ্বংস হবে এবং সে কারণে প্রতিটি প্রাণী ও উদ্ভিদকে তার নিজস্ব পরিবেশে বাঁচার সুযোগ করে দিতে হবে।

6 পরিকল্পিত ও সুস্থিত উন্নয়ন : নির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করে রাস্তাঘাট, রেলপথ, সড়ক, নগর, শিল্প কারখানা, নদীবাঁধ, বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রভৃতি স্থাপন করতে হবে যাতে পরিবেশ সুরক্ষিত থাকে।

7 আইন প্রণয়ন: পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে আইন প্রণয়ন এবং তার কঠোর প্রয়োগ পরিবেশের অবনমনের হাত থেকে মানবসমাজকে বাঁচাতে পারে।

ভারত দ্রুত উন্নয়নশীল একটি দেশ। সেজন্য ভারতের সর্বত্র রাস্তাঘাট নির্মাণ, কলকারখানা স্থাপন, রেলপথ নির্মাণ, নগরায়ণ, সম্পদ সংগ্রহ ও অন্যান্য কাজ চলছে। কিন্তু এইসব কাজ একদিকে যেমন সামাজিক উন্নয়ন ঘটাচ্ছে তেমনি অন্যদিকে পরিবেশের অবনমনও সূচিত করছে। এই উন্নয়নের সাপেক্ষে পরিবেশের অবনমনের কয়েকটি উদাহরণ হল নিম্নরূপ—

সবুজ বিপ্লব ও কৃষিভূমির অবনমন : 1970-এর দশকের প্রথমার্ধে পাঞ্জাব, হরিয়ানা প্রভৃতি রাজ্যে কৃষির উন্নতির জন্য যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তার ফলে এই অঞ্চলে 'কৃষিতে ব্যাপক ফলন ঘটে, যা সবুজ বিপ্লব নামে পরিচিত। কিন্তু এই অভূতপূর্ব সাফল্যের পিছনে কৃষিভূমির অবনমন দায়ী এবং এর জন্য পরিবেশে বেশ কিছু সমস্যা তৈরি হয়—

সমস্যা: i একই জমিতে বারবার ফসল উৎপাদনের জন্য জমির উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট হয়েছে অর্থাৎ ভূমি কধ্যা হয়ে পড়েছে। 2 জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করার জন্য জমির আণুবীক্ষণিক জীব ধ্বংস হয়েছে | 3 রাসায়নিক সারের অধিক ব্যবহার ভূমির বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করেছে। 4 অতিরিক্ত জলসেচ জমিকে লবণাক্ত করে দিয়েছে। 5 উচ্চফলনশীল বীজের ব্যবহার ফসলের নানা ধরনের জিনগত ত্রুটিকে সামনে আনছে। 6 ভৌমজলের অতি ব্যবহারে ভৌমজলের স্তর নেমে গেছে। বর্তমানে এই চাষের পদ্ধতি এত ব্যয়বহুল হয়ে গেছে যে সাধারণ কৃষকের পক্ষে তা অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

জলাভূমি ভরাট ও পরিবেশের অবনমন : বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ভৌমজলের পরিমাণ বৃদ্ধি, কৃষিতে জলসেচ ও নোংরা জলের পরিশোধন, বৃষ্টির জলধারণ প্রভৃতি নানা কাজে জলাভূমি পরিবেশকে রক্ষা করে কিন্তু পূর্ব কলকাতার বিখ্যাত একটি জলাভূমি এখন নানা সমস্যায় জর্জরিত যা পরিবেশের অবনমনকে সূচিত করে। এই সমস্যাগুলি হল—সমস্যা: ↑ কিছু পরিমাণ জলাভূমি বুজিয়ে দিয়ে সেই জায়গায় অনেক বহুতল বাড়ি নির্মিত হয়েছে, ফলে জলতল কমেছে, জলে ও মাটিতে লবণের পরিমাণ বেড়েছে। 2 জলাভূমি ভরাট করার ফলে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বন্যা বা প্লাবনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ও এই জলাভূমিকে শহরের আবর্জনা ফেলার জন্য ব্যবহার করার ফলে এখানকার জল, মাটি ও বায়ু যথেষ্ট পরিমাণে দূষিত হচ্ছে ।

পরিবেশবান্ধব শক্তি বলতে বোঝায়, যে শক্তি উৎপাদনে পরিবেশের ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ে না ।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে 1860 সালে ফ্রান্সের অধ্যাপক অগাস্তিন মুশো সৌরশক্তির দ্বারা পরিচালিত বাষ্পীয় ইঞ্জিন উদ্ভাবন করেন। পরে তিনি সৌরশক্তি চালিত পাম্প, সৌর রুধন প্রক্রিয়া, সৌর রেফ্রিজারেটর আবিষ্কার করেন। এগুলি চালাতে কোনোভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রয়োজন হয় না | বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে জল বারবার ব্যবহার্য হলেও তা পরিবেশবান্ধব নয় । কারণ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিবেশে নানা সমস্যা তৈরি করে।

অচিরাচরিত শক্তি বলতে সৌরশক্তি, জোয়ারভাটা, বায়ুশক্তি, ভূতাপশক্তি, সমদ্রজলের তাপের তারতম্য, জীবভর, বর্জ্য থেকে জৈব গ্যাস প্রভৃতিকে বোঝায়। এগুলি পরিবেশবান্ধব শক্তি। কারণ 1 এই শক্তি উৎপাদনে প্রকৃতির কোনো সঞ্চিত পদার্থ ব্যবহার করা হয় না। ফলে প্রকৃতির সম্পদ অটুট থাকে।2 এই শক্তি উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রয়োজন নেই । ফলে কোটি কোটি বছর আগে সঞ্চিত কয়লা, খনিজ তেলের অপচয় ঘটে না। 3 অচিরাচরিত শক্তি উৎপাদন পদ্ধতিতে একেবারেই পরিবেশের দূষণ ঘটে না। 4 এই শক্তি উৎপাদনের প্রাথমিক ব্যয় সামান্য বেশি হলেও পরবর্তীকালে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় বিনামূল্যে করা সম্ভব। 5 এগুলি ছোটো ছোটো ইউনিটের মাধ্যমে উৎপাদন করা হয় বলে কোনো কারণে একসঙ্গে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিদ্যুৎ ঘাটতির সম্ভাবনা কম। 6 অচিরাচরিত শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পৃথিবীর উন্নায়নের সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। এককথায় অচিরাচরিত শক্তি পরিবেশের পক্ষে হিতকর।