Chapter-7.1⇒জৈব সম্পদ : অরণ্য

পৃথিবীর প্রধান অরণ্যগুলিকে জলবায়ুর পার্থক্য অনুসারে দু-ভাগে ভাগ করা যায়— (i) উয় মণ্ডলের অরণ্য এবং (ii) নাতিশীতোয় মণ্ডলের অরণ্য।

দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে অরণ্যের পরিমাণ সর্বাধিক।

নিরক্ষীয় চিরসবুজ অরণ্যে সর্বদা এক অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ বিরাজ করার জন্য এই অরণ্যকে ‘চিরগোধূলি অঞ্চল' বলে।

পৃথিবীর গহনতম বৃষ্টি অরণ্য আমাজন অববাহিকায় দেখা যায়।

নিরক্ষীয় চিরহরিৎ অরণ্যাঞ্চলে জলবায়ু উয় ও আর্দ্র প্রকৃতির হয়৷

পৃথিবীর নিরক্ষীয় চিরহরিৎ অরণ্যের কাঠ শক্ত ও ভারী হয়।

সাইবেরিয়ায় সরলবর্গীয় নরম কাঠের অরণ্য তৈগা নামে পরিচিত।

বাণিজ্যিক দিক থেকে সরলবর্গীয় অরণ্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

রুশ ভাষায় ‘তৈগা’ শব্দের অর্থ হল পাইন বন।

ম্যানগ্রোভ অরণ্যের একটি অভিযোজনগত বৈশিষ্ট্য হল—লবণাক্ত জলমগ্ন মৃত্তিকাতে জন্মায় বলে এই উদ্ভিদের শ্বাসকার্যে যে অসুবিধা হয় সেই অসুবিধা দূর করার জন্য কিছু শ্বাসমূল মৃত্তিকা ভেদ করে আকাশের দিকে বৃদ্ধি পায়, যা তাদের শ্বাসকার্যে সাহায্য করে।

নিয়মিত জোয়ারভাটাযুক্ত লবণাক্ত মৃত্তিকায় যে ধরনের মূল মৃত্তিকা ভেদ করে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বিপরীতে বৃদ্ধি পায় তাকে শ্বাসমূল বলে।

কর্দমাক্ত মৃত্তিকায় উদ্ভিদকে দৃঢ়ভাবে আটকে রাখতে ধনুকের ন্যায় আকৃতির যে মূল থাকে, তাকে ঠেসমূল বলে।

সুন্দরী, গরান, গেওয়া, হেতাল, গোলপাতা প্রভৃতি ম্যানগ্রোভ অরণ্যের উদ্ভিদ।

ওডিশা উপকূলের ভিতরকণিকায় ম্যানগ্রোভজাতীয় অরণ্য সমাবেশ লক্ষ করা যায়।

নিরক্ষীয় চিরসবুজ অরণ্যে পাওয়া যায় এমন দুটি গাছ হল আয়রন উড এবং মেহগনি।

ত্রিস্তরবিশিষ্ট উদ্ভিদ নিরক্ষীয় চিরহরিৎ অরণ্যে দেখা যায়।

ব্রাজিল নাট, রবার, আবলুস, রোজ উড প্রভৃতি নিরক্ষীয় চিরহরিৎ অরণ্যের উদ্ভিদ।

জাপোটি এবং সাপেডিলা গাছের আঠা চুইংগামের উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয় ।

আমাজন অববাহিকার নিরক্ষীয় চিরসবুজ অরণ্যটি সেলভা নামে পরিচিত।

ক্রান্তীয় বৃষ্টি অরণ্যে সারাবছর গাছের পাতা সবুজ থাকে বলে একে নিরক্ষীয় চিরসবুজ অরণ্য' বলে।

শ্বাসমূল ও ঠেসমূল ম্যানগ্রোভ অরণ্যের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

ম্যানগ্রোভ অরণ্য গড়ে ওঠার প্রধান শর্ত হল আর্দ্র লবণাক্ত মৃত্তিকার উপস্থিতি।

ক্রান্তীয় তৃণভূমিতে বৃষ্টিপাতের অভাব এবং মৃত্তিকা ক্ষয়ের প্রবণতা বেশি হওয়ায় কৃষিকাজ বিকাশলাভ করতে পারেনি।

আফ্রিকার সাভানা তৃণভূমি অঞ্চলে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে গাছ জন্মায় যা দেখতে অনেকটা পার্কের মধ্যে লাগে বলে এরূপ বৃক্ষ-সমন্বিত তৃণাঞ্চলকে পার্কল্যান্ড সাভানা বলা হয়।

ইউরেশিয়ার তৃণভূমি ডেপ নামে পরিচিত।

আর্জেন্টিনার পশুখামার এসটেনশিয়া নামে পরিচিত।

শীতল নাতিশীতোয় জলবায়ু অঞ্চলে নরম কাঠের সরলবর্গীয় প্রকৃতির উদ্ভিদ দেখা যায়।

নিরক্ষীয় চিরহরিৎ অরণ্যটি অত্যন্ত গভীর হওয়ার কারণে। এই অরণ্যের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা কঠিন ফলে সম্পদ। আহরণ কষ্টসাধ্য।

ম্যাকুই, ম্যাকিয়া, ম্যাকারেলি ভূমধ্যসাগরীয় অরণ্যের বিভিন্ন নাম।

ভূমধ্যসাগরীয় অরণ্য অঞ্চল ম্যাকিয়া নামে পরিচিত।

ভূমধ্যসাগরীয় অরণ্য অঞ্চলের পুষ্প ও ঝোপঝাড় ফ্রান্সে ম্যাকুই নামে পরিচিত।

ভূমধ্যসাগরীয় বনভূমিতে চিরবসন্ত বিরাজ করতে দেখা যায়।

সরলবর্গীয় অরণ্য অঞ্চলের ওপর নির্ভর করে কাষ্ঠ মন্ড ও কাগজ শিল্প গড়ে উঠেছে।

সরলগীয় বনভূমির পাতাগুলি সরু লম্বা ও সূঁচালো হয়।

পৃথিবীর বৃহত্তম সরলবর্গীয় বনভূমির নাম হল রাশিয়ার তৈগা।

কুহরাকো গাছের কাছ এত শক্ত যে একে কুঠার ভাঙা গাছ বলে।

ভারতের ভৌগোলিক এলাকার 21.23 শতাংশ ভূমি অরণ্যাবৃত।

সারাদেশের মোট বনভূমির 2.4 শতাংশ পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত।

ভারতের হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে সরলবর্গীয় বৃদ্ধের বনভূমি দেখা যায়।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা একরে পৃথিবীর প্রায় 60% কাগজ উৎপাদন করে।

সরলবর্গীয় বনভূমির কাঠ প্রধানত কাগজ ও কাগজের মণ্ড উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।

ভূমধ্যসাগরীয় বনভূমির গাছের পাতাগুলি মোমজাতীয় পদার্থের আবরণে ঢাকা থাকে।

সীয় অরণ্য থেকে পৃথিবীর মোট উৎপাদিত কাঠের প্রায় 65% সংগ্রহ করা হয়।

নিরক্ষীয় বৃষ্টি অরণ্যের অপর নাম হল চিরহরিৎ বা লিসবুজ অরণ্য।

পৃথিবীর বৃহত্তম ও গভীরতম নিরক্ষীয় চিরহরিৎ অরণ্যের নাম  সেলভা ।

 

ব্রাজিল নাট ও আইভরি নাট থেকে বোতাম প্রস্তুত করা যায়।

মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে আর্দ্র পর্ণমোচী অরণ্য গড়ে উঠতে দেখা যায়।

ক্রান্তীয় পর্ণমোচী বৃক্ষের বনভূমির ওপর নাম হল পাতাঝরা অরণ্য।

ক্রান্তীয় পর্ণমোচী অরণ্যের উদ্ভিদগুলি শুষ্ক ঋতুতে পাতা ঝরিয়ে দেয়।

পৃথিবীর আর্দ্রতম অঞ্চলটি ক্রান্তীয় পর্ণমোচী অরণ্যা এলে অবস্থিত।

শাল, সেগুন, অর্জুন, শিরীষ প্রভৃতি ক্রান্তীয় পর্ণমোচী অরণ্যের উদ্ভিদ।

শীতকালে পাতাশূন্য উদ্ভিদ ক্রান্তীয় পর্ণমোচী অরণ্যে দেখা যায়।

নিরক্ষীয় চিরহরিৎ বনভূমির পাতাগুলি পরস্পর জুড়ে গিয়ে ছাতার মতো যে আচ্ছাদন সৃষ্টি করে তাকে চাঁদোয়া (Canopy) বলে।

এশিয়া মহাদেশে সর্বাধিক পরিমাণে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

কুল ও পলাশ গাছে লাক্ষাকীট প্রতিপালন করা হয়।

নিরক্ষরেখার উভয়পাশে 5°-10° অক্ষরেখার মধ্যে নিরক্ষীয় চিরসবুজ বনভূমি লক্ষ করা যায়।

নিরক্ষরেখার উভয় পাশে 10% 30 অক্ষরেখার মধ্যে ক্রান্তীয় পর্ণমোচী অরণ্যের উপস্থিতি লক্ষণীয়।

উভয় গোলার্ধে 30-40% অক্ষরেখার মধ্যে নাতিশীতোয় জলবায়ুতে প্রধানত ভূমধ্যসাগরীয় অরণ্য দেখা যায়।

50-70° উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে অবস্থিত অরণ্যটির নাম সরলবর্গীয় অরণ্য।

নিরক্ষীয় চিরসবুজ অরণ্যের গাছের ডালাপালায় প্রচুর পরগাছা ও পরজীবী উদ্ভিদ জন্মায়।।

ঋতুবিশেষে যেসব উদ্ভিদ পাতা ত্যাগ করে তাদের পর্ণমোচী উদ্ভিদ বলে।

ম্যাকারেলি গুল্মজাতীয় গাছ।

শাল গাছের নির্যাস থেকে ধুনো তৈরি হয়।

ম্যাপল গাছের রস থেকে চিনি ও সিরাপ প্রস্তুত করা হয়।

ট্যানিন তৈরি করতে ওক গাছের ছাল ব্যবহৃত হয়।

সরলবর্গীয় অরণ্যের গাছগুলি লম্বায় সাধারণত 50 মিটার উঁচু হয়।

পাইন গাছের রস থেকে তার্পিন তেল প্রস্তুত করা হয়।

সরলবর্গীয় অরণ্যের কাঠ থেকে সেলুলোজ উৎপন্ন হয়।

পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমি গঙ্গা নদীর বদ্বীপে অবস্থিত।

ব্রাজিলে ক্রান্তীয় তৃণভূমি ক্যাম্পোস নামে পরিচিত।

দক্ষিণ আফ্রিকার নাতিশীতোয় তৃণভূমি ভেল্ট পরিচিত।

উষ্ণ নাতিশীতোয় অঞ্চলের মিশ্র অরণ্য চিরসবুজ পর্ণমোচী অরণ্যের সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে।

ইউক্যালিপটাস, কুইব্রাকো, দেবদারু প্রভৃতি নাতিশীতোয় অরণ্য অঞ্চলের উদ্ভিদ।

দক্ষিণ গোলার্ধে স্থলভাগের পরিমাণ বেশি থাক সরলবর্গীয় অরণ্যের পরিমাণ কম।

প্রচণ্ড তুষারপাতের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সরলবর্গীয় অরণ্যের গাছগুলির আকৃতি মোচা বা মন্দিরের

চূড়ার ন্যায় হয়।

চারটি অরণ্য উপজাত দ্রব্য হল লাক্ষা, ধুনো, রঞ্জন, তারপিন তেল।

অরণ্যের মুখ্য বনজ সম্পদগুলি তিন প্রকার, যথা— (1) শর কাঠ, (ii) নরম কাঠ, (ii) নিকৃষ্ট শ্রেণির কাঠ বা জ্বালানি কাঠ।

রেশম ক্রান্তীয় মৌসুমি বনাঞ্চল থেকে সংগৃহীত হয়।

কৃত্রিম মাখন বা মার্জারিন তৈরি হয়। পাম গাছের বীজ থেকে।

ঠান্ডা পানীয় 'কোলা' প্রস্তুত করতে কোলা নাট গাছকে ব্যবহার করা হয়।

পানামা হ্যাট' প্রস্তুত করতে টোকুইলা পাম গাছের তন্তু ব্যবহার করা হয়।

সরলবর্গীয় অরণ্যের গাছের বাণিজ্যিক উপযোগিতা সবচেয়ে বেশি।

ভূমধ্যসাগরীয় অরণ্যাঞ্চল পৃথিবীর ফলের বাগান হিসেবে পরিচিত।

ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আঙুর, কমলালেবু, জলপাই প্রভৃতি ফল বেশি পাওয়া যায়।

অরণ্যের নিকৃষ্ট শ্রেণির কাঠ জ্বালানি কাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

উভয় গোলার্ধে 30°-50° অক্ষাংশের মধ্যে নাতিশীতোয় তৃণভূমির অবস্থিত।

একই জমিতে কৃষিকাজের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী পতিত জমিতে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে গাছ লাগানোর কর্মসূচিকে কৃষি বনসৃজন বলে।

নির্দিষ্ট অরণ্য সীমার বাইরে পতিত বা অব্যবহৃত জমিতে সামাজিক পরিকল্পনার মাধ্যমে একক বা যৌথ উদ্যোগে নতুন করে গাছ লাগিয়ে বনভূমির বিকাশ ঘটানো হয়, তখন তাকে সামাজিক বনসৃজন বলা হয়।

1946 সালের সিলভিকালচার সম্মেলনে সর্বপ্রথম সামাজিক বনসৃজনের ধারণাটি গৃহীত হয়েছিল।

কোনো বনভূমিকে বা তার কোনো অংশকে সরকারি আইন অনুসারে জনগণের ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, তাকে সংরক্ষিত বনভূমি বলে।

যে বনভূমির কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় সরকারি অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করতে হয়, তাকে সুরক্ষিত বনভূমি বলে।

অরণ্য

এক জায়গায় একসঙ্গে অনেক গাছের অবস্থানকে অরণ্য বলে অভিহিত করা হয়। অবশ্য রাষ্ট্রসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (Food and Agricultural Organisation of the United Nations, সংক্ষেপে FAO)-এর মতানুসারে—সেই ধরনের গাছপালার সমাবেশকেই অরণ্য নামে অভিহিত করা যায়, যা | স্থানীয় জলবায়ু বা জলবণ্টন-এর ওপর প্রভাব বিস্তার করে, জীবজন্তুকে আশ্রয় দেয় এবং কাঠ উৎপাদনে সক্ষম। এ ছাড়া, অন্তত 0.05 হেক্টর জমির ওপর বেশ কিছু গাছপালার সমাবেশ থাকলে তবেই তাকে অরণ্য বা বনভূমি বলে গণ্য করা হয়।

অরণ্যের গুরুত্ব

প্রত্যক্ষ গুরুত্ব

1. জ্বালানি কাঠ: অরণ্য থেকে প্রাপ্ত শক্ত ও নরম কাঠ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই জ্বালানিরূপে ব্যবহৃত হয়। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে উৎপাদিত মোট কাঠের শতকরা প্রায় 50 ভাগই জ্বালানি কাঠরূপে ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশে জ্বালানি কাঠের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।

2. শিল্পের কাঁচামাল: দেশলাই উৎপাদন, প্লাইউড নির্মাণ, আসবাবপত্র নির্মাণ, রেলপথ নির্মাণ, জাহাজ ও রেলগাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহনের অংশবিশেষ নির্মাণ, কাগজের মণ্ড প্রস্তুতের কাঁচামাল, রেয়ন প্রস্তুতের কাঁচামাল, কাঠের বোর্ড উৎপাদনে নরম ও শক্ত কাঠ ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া, ঘরবাড়ি নির্মাণেও কাঠ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

3. ভেষজ অরণ্য: থেকে সর্পগন্ধা, কুটি, সিঙ্কোনা প্রভৃতি পাওয়া যায় এবং এগুলি ওষুধ তৈরির কাজে লাগে।
4. উপজাত বনজ দ্রব্য: বনভূমি থেকে লাক্ষা, ধুনো, রজন, গঁদ, হরীতকী, দারচিনি, এলাচ, বিভিন্ন ধরনের মশলা, বেত, ঘাস, তার্পিন তেল, রবার, চিকল, বাদাম প্রভৃতি অপ্রধান বনজ দ্রব্য সংগ্রহ করা হয়।

5. পশুপালন : তৃণভূমি অঞ্চলে গবাদিপশু প্রতিপালন করা হয়। ও শিল্পক্ষেত্র গড়ে ওঠে। যেমন—অস্ট্রেলিয়ার ডাউনস্, উত্তর আমেরিকার প্রেইরি, নিউজিল্যান্ডের তুসক ইত্যাদি।

6. কাঠশিল্প ও অন্যান্য বনজ সম্পদ আহরণ শিল্প: বনভূমিকে কেন্দ্র করে কাঠ আহরণ (Lumbering) শিল্প গড়ে ওঠে। এ ছাড়া মধু, মোম প্রভৃতি সংগ্রহেও বহু লোক নিয়োজিত থেকে জীবিকানির্বাহ করে।

7. পর্যটন শিল্প: বনভূমি অসংখ্য পশুপাখির আবাসস্থল। পশুপাখি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আকর্ষণে পৃথিবীর সব বনভূমিতেই পর্যটকেরা বেড়াতে যান। যেমন— আফ্রিকার সেরেংগেটি, মাসাইমারা প্রভৃতি অরণ্যে হাজার হাজার বিদেশি পর্যটক প্রতি বছর বেড়াতে আসেন। এ কারণে বনভূমি অঞ্চলে পর্যটন শিল্প বিকাশলাভ করে।

পরোক্ষ গুরুত্ব

1. জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ: অরণ্য জলবায়ুর ওপর প্রভাব বিস্তার করে। গাছের পাতা থেকে বাষ্পমোচন প্রক্রিয়ায় নির্গত জল বায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। এর ফলে বনভূমির বায়ু আর্দ্র হয় এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

2. পরিবেশ দূষণ রোধ: অরণ্য পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখে। গাছ বায়ু থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে এবং বায়ুতে অক্সিজেন ছেড়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে।
3 . বারণ: বনভূমি থাকলে মৃত্তিকার ওপরে স্তরটি বৃষ্টির জলের সঙ্গে ধুয়ে যায় না অথবা ঝড়ের সময় শুকনে ধূলিকণা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অপসারিত হয় না। গাছে শিকড় মৃত্তিকার কণাগুলিকে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ রেখে মৃত্তিকা নিবারণ করে। পার্বত্য অঞ্চলে ভূমির ঢাল বেশি হওয়ায় দেখান। বনভূমি থাকা অবশ্য প্রয়োজন।

4.মরুভূমির প্রসার রোধ: বনভূমি মরুভূমির বিস্তার রে করে। ভারতে থর মরুভূমির প্রসার রোধ করার উদ্দেশ্যে মরুভূমির প্রান্তদেশে অরণ্য-বলয়ের সৃষ্টি করা হয়েছে।

5. মৃত্তিকার উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি : গাছের ডালপালা, পাতা, শিকড় ইত্যাদি পচে জৈব পদার্থ (Humus) উৎপন্ন হয়। এই জৈব পদার্থ সংযোজিত হয়ে মাটির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি করে।

6. বন্যার প্রকোপ হ্রাস: বৃষ্টির জলের সঙ্গে প্রচুর পলি বাহিত হয়ে নদীতে জমা হয় ও নদীখাতের গভীরতা হ্রাস করে। এর ফলে বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। বনভূমি থাকলে বৃষ্টির জলের সঙ্গে বাহিত পলি গাছের গোড়ায় আবদ্ধ হয়, ফলে জলে পলির পরিমাণ হ্রাস পায় এবং জল ভূগর্ভে অনেক বেশি পরিমাণে প্রবেশ করে বন্যার প্রকোপ কমায়।

7 ঝড়ের গতিবেগ নিয়ন্ত্রণ: অরণ্য বিধ্বংসী ঝড়ের প্রকোপ থেকে জীবন ও সম্পত্তিহানি রোধ করে।

৪ জাতীয় আয়ের উৎস: বনজ সম্পদের প্রাচুর্য দেশের জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। কানাডা, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, মায়ানমার প্রভৃতি দেশে জাতীয় আয়ের একটি প্রধান উৎস হল বনজ সম্পদ।

9 জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ: পাছপালা, পশুপাখি, কীটপতল প্রভৃতি জীববৈচিত্র্যের ধারক ও বাহক হল অরণ্য। প্রজন্মের জন্য জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ বিশেষভাবে প্রয়োজন।

নিরক্ষীয় বনাঞ্চল কাঠশিল্পে অনুন্নত হওয়ার কারণ

1. দুর্গম : বনভূমির ভেতরে প্রবেশ করা কঠিন। তাই, কাষ্ঠ-আহরণ প্রায় দুঃসাধ্য।

2. বিভিন্ন প্রজাতির গাছ: একই প্রজাতির গাছ এক স্থানে পাওয়া যায় না। প্রয়োজনীয় গাছ খুঁজতে হয়। এজন্য গভীর বনভূমিতে যেতে হয়, যা প্রায় অসাধ্য হয়ে ওঠে। এ ছাড়া, বহু গাছ আছে যেগুলি অত্যন্ত নিকৃষ্ট শ্রেণির এবং তাদের বাণিজ্যিক গুরুত্বও বেশ কম।

3. দীর্ঘকায় ও মোটা গাছঃ গাছগুলি এত দীর্ঘ এবং এদের বাড় এত বেশি যে, সাধারণ করাত দিয়ে কাটা যায় না। উন্নত যন্ত্রপাতির দরকার হয়, যা লতাগুল্মে ঢাকা বনের তলদেশ দিয়ে বয়ে নিয়ে যাওয়া বেশ কঠিন।
4. গাছ কাটতে অসুবিধা: গাছ কাটার পর তাকে কাত করে ফেলা কঠিন হয়। এ ছাড়া, একটি বড়ো গাছের ডালপালার আঘাতে অন্যান্য অনেক ছোটো ছোটো গাছ নষ্ট হয়ে যায়।

5. পরিবহণের অসুবিধা: মাটি সব সময় ভিজে থাকে বলে রাস্তাঘাট তৈরি করা যায় না। ফলে, বনের ভেতরে থেকে কাঠ পরিবহণের জন্য বড়ো ভারী যানবাহন ব্যবহার করা যায় না। আবার অধিকাংশ কাঠ ভারী বলে জলপথে ভাসিয়ে আনা যায় না।

6. বনভূমির তলদেশ লতাগুলো পূর্ণ: অরণ্যের তলদেশ লতা, গুল্ম, আগাছায় পূর্ণ এবং মাটি নরম। তাই, মাটির ওপর দিয়ে কাঠ টেনে নিয়ে যাওয়া যায় না।

7. প্রতিকূল পরিবেশ ও পোকামাকড়ের উপদ্রব: ভিজে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ এবং বিষাক্ত সাপ ও কীটপতঙ্গের জ শ্রমিকদের পক্ষে বনভূমিতে কাঠ কাটা বিপজ্জনক।

৪. শ্রমিকের অভাব: বনভূমি ও তার সংলগ্ন এলাকায় জনবসতি কম বলে উপযুক্ত শ্রমিক পাওয়া যায় না।

9. অন্যান্য কারণ: নিরক্ষীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত নয় বলে কাষ্ঠ শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন, উন্নত যন্ত্রপাতি পাওয়া যায় না। এ ছাড়া, প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার জন্য এই অঞ্চলে উন্নত পরিবহণ ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। এই কারণে কাঠের চাহিদা ও ব্যবহার কম।

ম্যানগ্রোভ অরণ্যের প্রধান প্রধান বৃক্ষসমূহ

লবণাক্ত মৃত্তিকায় যেসব উদ্ভিদ জন্মায় তাদের লবণাম্বু বলে। এর মধ্যে যেসব লবণাম্বু উদ্ভিদ সমুদ্রোপকূলবর্তী অঞ্চলের নিম্নভূমিতে যেখানে নিয়মিত সমুদ্রের জোয়ারভাটা থেছে সেখানে জন্মায় তাদের ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ বলে। এই অনলের উল্লেখযোগ্য উদ্ভিদগুলি হল— সুন্দরী, গরান, গেওয়া, দেয়াল, কেওড়া, কেয়া প্রভৃতি।

অরণ্য সম্পদ বিনাশের কারণ

বিভিন্ন কারণে অরণ্য সম্পদ বা বনভূমি ধ্বংস হয়ে থাকে।।যেমন—

1. বনভূমি কৃষিজমিতে রূপান্তর: সারা বিশ্বে জনসংখ্যা যত বাড়ছে ততই বাড়ছে খাদ্যের চাহিদা। অধিক পরিমাণ খাদ্য উৎপাদনের উদ্দেশ্যে বনভূমি পরিষ্কার করে কৃষিজমির সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এভাবে বনভূমির বিনাশ হচ্ছে। এই সমস্যা ব্রাজিল, কঙ্গো গণপ্রজাতন্ত্র, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপিনস্, নেপাল, ভারত প্রভৃতি দেশে গুরুতর আকার ধারণ করেছে।

2. কষ্টি আহরণ: কাষ্ঠ আহরণ শিল্প বনভূমি ধ্বংসের একটি প্রধান কারণ। ঘরবাড়ি নির্মাণ, আসবাবপত্র তৈরি, পরিবহণ শিল্প ইত্যাদিতে কাঠের বিপুল চাহিদা রয়েছে। কাগজ, কৃত্রিম রেয়ন, দেশলাই, প্লাইউড প্রভৃতি শিল্পের কাঁচামাল কাঠ। কাঠের এরূপ বিপুল চাহিদা মেটাতে সারা বিশ্বে কাষ্ঠ আহরণ শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। এর অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ প্রতি বছর হাজার হাজার হেক্টর। বনভূমি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হচ্ছে। সম্প্রতি ব্রাজিলের আমাজন অববাহিকায় অরণ্য বিনাশের মূল কারণ এই কাষ্ঠ আহরণ শিল্প।

3. কাঠের সরবরাহ: সারা বিশ্বে বিশেষত উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলিতে ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদার এক বৃহৎ অংশ কাঠের সাহায্যে মেটানো হয়। শীতপ্রধান দেশগুলিতে ঘর গরম রাখার জন্য ব্যবহৃত হয় জ্বালানি কাঠ। কঙ্গো গণপ্রজাতন্ত্র, নাইজিরিয়া, কাম্বোডিয়া প্রভৃতি দেশে কাল ভূমি বিনাশের মূল কারণ হল জ্বালানি কাঠের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার।

4. স্থানান্তর কৃমি: নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলের স্থানে স্থানে আদিম বনভূমি কেটে ও পুড়িয়ে চাষাবাদ করা হয়। এভাবে অরণ্যের বিনাশ ঘটে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধা আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরদিকের। দেশগুলির স্থানে স্থানে এই প্রকার কৃষি-ব্যবস্থা বনবিনাশের একটি প্রধান কারণ।

5 নদীতে বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ: বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলসেচ ব্যবস্থার প্রসার ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নদীতে বাঁধ জলাধার নির্মাণ করা হলে বনভূমি জলমগ্ন হয়ে বিনাশপ্রাপ্ত হয়। ভারতের গাড়োয়াল হিমালয়ের তেহরি বাঁধ প্রকল্পে এ আশঙ্কার কথা পরিবেশবিদেরা ব্যক্ত করেছেন।
6. দাবানল: বজ্রপাতের কারণে মানুষের রিয়াকলাপের জন্য বনভূমিতে আগুন লেগে দাবানলের সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, চিন প্রভৃতি দেশে মানলের জন্য বনভূমি সম্পূর্ণরূপে পুড়ে গেছে।

7. দারায়ণ: রাস্তাঘাট, বাসগৃহ ইত্যাদি নির্মাণ করার প্রয়োজনে বনভূমি নির্বিচারে বিনাশ করা হচ্ছে।
8. কার্য: আকরিক লোহা, চুনাপাথর, ম্যাঙ্গানিজ, কালা প্রভৃতি খনিজ উত্তোলন করার সময়ও বনভূমি বিনষ্ট হয়।
9. অনিয়ন্ত্রিত পশুচারণ: বনভূমিতে অনিয়ন্ত্রিত পশুচারণ কনভূমি বিনাশের একটি প্রধান কারণ।
10.  জনসাধারণের মধ্যে চেতনার অভাব: উন্নয়নশীল ও অনুমত দেশগুলিতে বন বিনাশের ক্ষতিকর প্রভাবগুলির সম্বন্ধে জনসাধারণের চেতনার অভাবের কারণেও যথেচ্ছভাবে বনভূমি। বিনাশপ্রাপ্ত হয়।

11. অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন শিল্পের প্রসার: বিশ্বের অরণ্যাঞ্চলগুলিতে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক বেড়াতে যান। যেমন—আফ্রিকার সেরেংগেটি, মাসাইমারা; ভারতের কানহা, করবেট ন্যাশনাল পার্ক প্রভৃতি। বনাঞ্চলে পর্যটকদের থাকার জন্য অনেক জায়গায় কাঠের গুঁড়ি দিয়ে নির্মিত বাড়ি (Log Cabin) গড়ে উঠেছে। এর ফলে বনভূমির পরিবেশের সার্বিক ক্ষতি হয়।

অরণ্য সম্পদ বিনাশের ফলাফল

অরণ্য সম্পদ বিনাশের ফলে আগামি দিনের পৃথিবী বিভিন্ন প্রকার। সমস্যার সম্মুখীন হবে। যেমন—

1. মৃত্তিকা ক্ষর: অরণ্য বিনাশের ফলে মাটির কণা ও দমাগুলিকে গাছের শিকড় আর বেঁধে রাখতে পারে না। এমনকি বৃষ্টির ফোঁটা সরাসরি এসে মাটিকে আঘাত করে। ফলে মাটি আলগা হয় ও ক্ষয়ে যায়।

2. মৃত্তিকার উর্বরতা হ্রাস: অরণ্য ধ্বংস হলে মাটির উর্বর উপরিস্তরও ক্ষয়ে যায়। শুধু তাই নয় ঝরা পাতা, প্রাণীর দেহাবশেষ প্রভৃতির মাধ্যমেও মাটিতে জৈব পদার্থের জোগান কমে যায়। সার্বিকভাবে মাটির উর্বরতা হ্রাস পায়।

3.জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি: অরণ্যের গাছপালাকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকে বহু প্রাণী। অরণ্য ধ্বংস হলে এই প্রাণীদের খাদ্যের স্লোগান নষ্ট হয়। তাদের আবাস বিনষ্ট হয়। ফলে বাস্তুতন্ত্রে ভারসাম্য বজায় থাকে না। পরিবেশের ক্ষতি হয়।

4. বন্যার আশঙ্কা বৃদ্ধি: অরণ্যের বিনাশ হলে ক্ষয়ে যাওয়া মাটির অনেকটাই নদীগর্ভে সঞ্চিত হয়। ফলে নদ। মজে যায়। এই কারণে নদীর জলধারণ ক্ষমতাও কমে যায়। তাই বন্যার আশঙ্কা

5. মিনহাউস প্রভাব বৃদ্ধি: গাছপালা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন উইঅক্সাইড গ্রহণ করে ও বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন পরিত্যাগ করে। থাকার জন্য এই অক্সিজেন প্রাণীদের একান্ত প্রয়োজন। সুতরাং, অরণ্য ধ্বংস হলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ও গ্রিনহাউস প্রভাব বাড়ে।

6. মরুভূমির সম্প্রসারণ ও মরুকরণঃ অরণ্য ধ্বংস হলে মরুভূমির বালি বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মরুভূমি সংলগ্ন এলাকাও মরুভূমির আওতায় চলে আসে। এইভাবে মরুভূমির আয়তন বাড়ে এবং অ-মরু জমি মরুভূমিতে পরিণত হয়। একে মরুকরণ (Desertification) বলে।

7. বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হ্রাস: যথেচ্ছভাবে গাছপালা কাটা হলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যায় ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। ঝড়ের প্রকোপ বৃদ্ধিঃ অরণ্যের বিনাশ ঘটলে বায়ু অপ্রতিহত গতিতে বইতে পারে। ফলে ঝাড়ঝঞ্ঝার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়।

9 কাঠের জোগান হ্রাস: অরণ্যচ্ছেদনের ফলে কাঠের জোগান হ্রাস পায় ও বনজ শিল্পের ক্ষতি হয়।

অরণ্য সম্পদ সংরক্ষণের পদ্ধতিসমূহ

অরণ্য মানুষের বিভিন্ন প্রকার অভাব মিটিয়ে থাকে। সেইজন্য অরণ্য মানুষের কাছে এক অমূল্য সম্পদ। এই অমূল্য সম্পদের অপচয় বন্ধ করে সঠিকভাবে ব্যবহার করাকেই অরণ্য সম্পদ সংরক্ষণ বলা হয়। অরণ্য সম্পদ সংরক্ষণের জন্য যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, সেগুলি হল—

1. বনসৃজন্ম: গাছ কাটার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে গাছ লাগানো দরকার। পতিত জমি বিশেষত যে জমি কৃষিকাজের পক্ষে অনুপযুক্ত সেই জমিতে নতুন গাছ রোপণ করে বনভূমি গড়ে তোলা অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভজনক।

2. অপরিণত বৃক্ষচ্ছেদন রোধ: অপরিণত গাছ কাটার পরিবর্তে পরিণত গাছ কাটা উচিত। অপরিণত গাছ থেকে কম পরিমাণ কাঠ পাওয়া যায়, ফলে বেশি সংখ্যক গাছ কাটার কারণে বনভূমি দ্রুত ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

3. দাবাল প্রতিরোধ : মানুষের দোষে অথবা প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্ট দাবানল বনভূমির ধ্বংসসাধন করে। দাবানল থেকে বনভূমিকে রক্ষা করার জন্য শুকনো ডালপালা, পাতা ও আগাছা নিয়মিত পরিষ্কার করা, অরণ্যের স্থানে স্থানে সতর্কতা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

4. পশুচারণ নিষিদকরণ: বনভূমিতে পশুচারণ করলে ঘাস ও নতুন চারাগাছ নষ্ট হয়। এর ফলে বনসৃজনের প্রচেষ্টা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়।

5. রোগ নিবারণ: বিষাক্ত পোকামাকড় ও কীটপতঙ্গের আক্রমণে রোগাক্রান্ত হয়ে গাছপালা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তার জন্য কীটনাশক বা রোগ-প্রতিরোধক ওষুধ ব্যবহার করা প্রয়োজন।
6. আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার: কাষ্ঠ আহরণ করবার সময় আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে এমনভাবে গাছ কাটা উচিত যাতে পাশাপাশি অন্য গাছগুলির কোনোরূপ ক্ষতি না হয়।

7. ব্যবহার: অনুন্নাত ও দরিদ্র দেশগুলিতে মানুষ বনভূমির কাঠ জ্বালানিরূপে ব্যবহার করে। ফলে বনভূমি নির্বিচারে বিনাশপ্রাপ্ত হয়। এই দেশগুলির মানুষদের যদি সস্তা দরে জ্বালানির কোনো বিকল্প উৎসের সন্ধান দেওয়া যায় তবে বনভূমি থেকে কাঠের যথেচ্ছ ব্যবহার অনেক হ্রাস পাবে।

৪. আইন প্রণয়ন: সরকার নতুন নতুন আইন প্রণয়ন করে নির্বিচারে গাছ কাটা রোধ করতে সক্ষম। বস্তুত, মানুষের সীমাহীন লোভের থাবা থেকে বনভূমিকে রক্ষা করার জন্য অপরাধীদের দ্রুত ও নির্মম শাস্তি প্রদান প্রয়োজন।

9. কাঠের বিকল্প বা পরিবর্ত দ্রব্যের ব্যবহার: পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কাঠের চাহিদাও ক্রমবর্ধমান। সুতরাং, কাঠের চাহিদা কমাতে প্লাস্টিক, কাগজ, অ্যালুমিনিয়াম, ইস্পাত, কাঁচ প্রভৃতি বিকল্প বা পরিবর্ত দ্রব্যের আরও বেশি ব্যবহার দরকার। এভাবেও বনভূমি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। [10] বনরক্ষক নিয়োগ: বনভূমি ও বনজ সম্পদ যথাযথভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে কি না তা তদারকি করা ও লক্ষ রাখার জন্য উপযুক্ত তত্ত্বাবধায়ক ও বনরক্ষক নিয়োগ করা প্রয়োজন।

11. সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত অরণ্যের সৃষ্টি: দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন নতুন সুরক্ষিত (Protected) ও সংরক্ষিত (Reserved ) অরণ্য গড়ে তোলাও দরকার।

12. জনসাধারণের চেতনা: অরণ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়া মানে মানব সভ্যতার বিনাশ—এই ধারণার নিরবিচ্ছিন্ন প্রচার সরকার ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলি করলে জনসাধারণের চেতনা ধীরে ধীরে উন্নীত হবে। কোনো আইন, কোনো নিয়মই যথাযথ পালন করা সম্ভব নয় যতক্ষণ না জনচেতনার ব্যাপ্তি ঘটছে।

সরলবর্ণীয় অরণ্য অঞ্চলে কাঠশিল্পের বিকাশের কারণসমূহ

সরলবর্গীয় অরণ্যের কাঠ যানবাহন, জাহাজ নির্মাণ, ঘরবাড়ি নির্মাণ, আসবাবপত্র, কাগজের মণ্ড উৎপাদন, দেশলাই, প্যাকিং বাক্স, খেলাধুলার সাজসরঞ্জাম প্রভৃতি উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। এজন্য এই জাতীয় বনাঞ্চল কাঠ শিল্পে খুবই উন্নত। সরলবর্গীয় বনভূমি অঞ্চলে কাঠ শিল্পের উন্নতির কারণগুলি হল—

1 কাঠ আহরণ: একই প্রজাতির গাছ একসঙ্গে জন্মায় বলে বাণিজ্যিকভিত্তিতে কাঠ আহরণের সুবিধা হয়।।

2. সুগম অরণ্য: বনভূমির তলদেশ পরিষ্কার বলে বনের ভেতরে সহজেই প্রবেশ করা যায়।
3. সময় সাশ্রয় : সরলবর্গীয় গাছের কাঠ নরম বলে খরচে সহজে এবং তাড়াতাড়ি গাছ কাটা যায়স্র৪.
4. পরিবহণের সুবিধাঃ ভূমিভাগ শক্ত বরফে ঢাকা থাকে বলে গাছের গুড়িগুলিকে পিচ্ছিল বরফের ওপর দিয়ে সহজেই টে আনা যায়। শীতকালে কাঠের গুঁড়িগুলিকে কাটার পর যে সাহায্যে পিচ্ছিল বরফের ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে গিয়ে ন জমাট বাধা বরফের ওপর ফেলে রাখা হয়। বসন্ত ও বরফ গলে গেলে নদীর স্রোতের সঙ্গে গুড়িগুলি ভেসে চলতে থাকে। তারপর সেগুলিকে নদীর তীরবর্তী করাত কলে সংগ্রহ করা হয়।
5.সুলভ ও দক্ষ শ্রমিক: শীতকালে ভূমি বরফে ঢাকা থাকে তখন চাষ-আবাদ হয় না। ওই সময়ে কনভূমিতে গাছ কাটা হয়। ফলে সহজেই অল্প মজুরিতে শ্রমিক পাওয়া যায়। শীতল নাতিশীতোয় জলবায়ুর প্রভাবে শ্রমিকেরা অত্যন্ত পরিশ্রমী হয় এবং তাদের মাথাপিছু উৎপাদন ক্ষমতাও বেশি।
6. স্বচ্ছ জলের জোগান: কাষ্ঠভিত্তিক শিল্পসমূহে, বিশেষত কাগজ ও রেয়ন শিল্পে স্বচ্ছ জলের প্রয়োজন হয়। এখানকার শিল্পগুলি নদীর তীরে অবস্থিত বলে স্বচ্ছ জলের অভাব হয় না।
7. জলবিদ্যুতের প্রাচুর্য্য: নাতিশীতোয় দেশগুলি প্রযুক্তি বিদ্যায় উন্নত বলে প্রচুর পরিমাণে জলবিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন করে। ফলে, এই অঞ্চলে এই বিদ্যুতের সাহায্যে কাঠ চেরাই ও কাগজ শিল্প গড়ে উঠেছে।
৪. রাসায়ণিক সহ্যের প্রাচুর্য: নাতিশীতোয় অঞ্চলে কাগজ, রেয়ন প্রভৃতি শিল্পের প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্য সহজে পাওয়া যায়।
9. মূলধন: বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কাঠ সংগ্রহ ও কাঠভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার জন্য যে মূলধন ও কারিগরি জ্ঞানের প্রয়োজন হয়, এই অঞ্চলের দেশসমুহে তার অভাব নেই।
10. চাহিদা: নাতিশীতো অঞ্চলের দেশগুলিতে কাঠ কাঠজাত সামগ্রী, কাগজ ইত্যাদির বিপুল চাহিদা রয়েছে। ফলে,বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কাঠ শিল্প গড়ে উঠেছে।

দক্ষিণ গোলার্ধে সরলবর্গীয় বনভূমি কম হওয়ার কারণ

উত্তর গোলার্ধের তুলনায় দক্ষিণ গোলার্ধে সরলবর্গীয় বনভূমির বিস্তার অনেক কম। এর কারণগুলি হল—

1. বিস্তৃত জলভাগ: দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগ বেশি, স্থলভাগ কম। স্বাভাবিকভাবে সরালীর বনভূমিসহ মোট বনভূমির বিস্তার কম।
2. বাতিশীতোষ জলবায়ু: জলভাগ বেশি থাকায় একই অক্ষাংশে জলবায়ুর প্রকৃতি আলাদা । এই গোলার্ধের জলবায়ু মৃদু নাতিশীতোয় প্রকৃতির। তাই উচ্চ পার্বত্যভূমি ছাড়া অন্যত্র এই জাতীয় বৃক্ষ জন্মায় না।
3. উচ্চভূমির অভাব: দঃ গোলার্ধে উঁচু পর্বত খুবই কম দেখা যায়। এইজন্য কেবলমাত্র দঃ আমেরিকার আন্দিজ, আফ্রিকার কিলিমাঞ্জারো, নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ আল্পস পর্বতের উঁচু অংশে অংশ দেখা যায়। এ ছাড়া, অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাংশের পার্বত্য অঞ্চলে অল্প কিছু সরলবর্গীয় অরণ্য দেখা যায়।
স্বল্প তুষারপাত: তুষারপাত সরলবর্গীয় বনভূমি গড়ে ওঠার সহায়ক, কিন্তু মৃদু নাতিশীতোয় জলবায়ুর জন্য দক্ষিণ খেলবে তুষারপাত বিশেষ ঘটে না।

অরণ্যকে সম্পদ হিসেবে বিবেচিত করার কারণ

অরণ্য হল যে-কোনো দেশের জাতীয় সম্পদ। এই সম্পদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত কার্যকারিতা এবং উপযোগিতা এত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী যে একে অপরিহার্য সম্পাদ বলে বিবেচনা করা হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অরণ্য সম্পদের উপযোগিতা তথা উপকারিতা (প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ) উল্লেখ করা হল—

1. বিভিন্ন প্রকার শিল্পের কাঁচামাল অরণ্য থেকে পাওয়া যায়, যেমন—কাগজ শিল্প, প্রসাধনী শিল্প, ওষুধ তৈরি, কাঠ চেরাই ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
2. বনভূমির কাঠ সরজ্ঞাম ও আসবাবপত্র নির্মাণ, জাহাজ, ট্রলার, নৌকা ইত্যাদি নির্মাণে কাজে লাগে।
3. অরণ্য থেকে জীবিকানির্বাহ করা হয়।
4. কাভূমি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।
5. কনভূমি বৃষ্টিপাত নিয়ন্ত্রণ করে।
6• বনভূমি প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিহত করে।
7• বনভূমি ভূমিক্ষা নিবারণ ও মাটির উর্বরতা বজায় রাখে।
8.বনভূমি বন্যা প্রতিরোধ করে।
9. বনভূমি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে।

অরণ্যের মুখ্য ও গৌণ সম্পদ

অরণ্য থেকে মানুষ যেসব সম্পদ আহরণ করে, সেগুলিকে সাধারণভাবে দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়— [1] মুখ্য বনজ সম্পদ এবং [2] গৌণ বনজ সম্পদ। অরণ্যের এই দু-ধরনের সম্পদই গুরুত্বপূর্ণ।

1. মুখ্য বনজ সম্পদ: কাঠ (Wood) অরণ্যের প্রধান সম্পদ। ভাগ্য থেকে বিভিন্ন ধরনের কাঠ সংগৃহীত হয়। যেমন—

1 শক্ত কাঠগুলি (Hard Wood) সাধারণত আসবাবপত্র, বাসগৃহ, জাহাজের পাটাতন, মাস্কুল, নৌকা এবং বিভিন্নপ্রকার সাজসরগ্রাম নির্মাণে ব্যবহার করা হয়। শর কাঠের গাছ হিসেবে শাল, সেগুন, ওক, বিচ, চেস্টনাট, আয়রন উত্ত, মেহগনি, আবলুস প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

2• নরম কাঠগুলি (Soft Wood) ব্যবহৃত হয়- প্যাকিং বাক্স, দেশলাই প্রভৃতি প্রস্তুত করার জন্য। বিভিন্ন শ্রেণির ফার, পাইন, বার্চ, হেমলক, হুস প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য নরম কাঠের গাছ।

3. এ ছাড়া, অরণ্য থেকে নিকৃষ্ট শ্রেণির অনেক কাঠ আহরণ করা হয়। এগুলি সাধারণত জ্বালানি কাঠ (Fuel Wood) হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রকৃতপক্ষে, বিশ্বের বিভিন্ন অরণ্য থেকে যত কাঠ আহরণ করা হয়, তার প্রায় 50 শতাংশই জ্বালানি কাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

2. গৌণ বনজ সম্পদ: কাঠ ছাড়াও অরণ্য থেকে আরও নানাবিধ সম্পদ আহরণ করা হয়, যেমন—

1. কাগজ শিল্পের কাঁচামাল : কাগজ উৎপাদনে অরণ্যের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাইন, ফার, সম্প্রস প্রভৃতি গাছের নরম কাঠ থেকে তৈরি করা হয় মণ্ড (Pulp)। আর এই মণ্ড থেকেই প্রস্তুত করা হয় কাগজ।

2. কৃত্রিম রেশম বা রেমন শিল্পের কাঁচামাল : সরলবর্গীয় অরণ্যের নরম কাঠ থেকে তৈরি করা হয় কাঠনও এবং এই কাষ্ঠমণ্ড থেকেই রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি করা হয়। সেলুলোজ, যা কৃত্রিম রেশম বা রেয়ন শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

3. ট্যানিনঃ কাঁচা চামড়া শোধন বা নরম করার জন্য যে ট্যানিন ব্যবহৃত হয়, তাও সংগৃহীত হয় অরণ্য থেকে। এক, হেমলক, কুইব্রাকো গাছের ছাল থেকে এই ট্যানিন নিষ্কাশন করা হয়।

4. ধুনো ও অগুরুঃ শাল গাছের নির্যাস ধুনো হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আর অগুরু গাছের রস থেকে উৎপাদিত হয় অগুরু নামক সুগন্ধি।

5. অন্যান্য: চিরপাইন গাছের নির্যাস থেকে তার্পিন তেল। এবং রজন, কর্পূর গাছের নির্যাস থেকে কর্পূর, চন্দন গাছের নির্যাস থেকে চন্দন তেল প্রভৃতি তৈরি হয়। অরণ্য থেকে আরও সম্পদ সংগৃহীত হয়, যেমন: গम, মধু, মোম, লাক্ষা, পাম তেল (Palm Oil), কুইনাইন, রবার, চিকল (চুইংগাম তৈরি হয়), কর্ক প্রভৃতি। শুধু এগুলিই নয়, কাঠ পুড়িয়ে বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক পদার্থও উৎপন্ন হয়, যেমন— মিথিলিন ক্লোরাইড, পিচ্‌, আলকাতরা প্রভৃতি।