Chapter-8, দিগন্তের প্রসার

ষোলো ও সতেরো শতক জুড়ে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ব্যাপক ও অভাবনীয় অগ্রগতি ঘটে। বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির প্রভাবে কৃষিকার্য, শিল্পোৎপাদন, সামরিক ব্যবস্থা, মুদ্রণ ব্যবস্থা প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে দারুণ উৎকর্য লক্ষ করা যায়। বিজ্ঞানের এই অগ্রগতিকে ঐতিহাসিকগণ ‘বৈজ্ঞানিক বিপ্লব' বলেছেন।

প্রাচীন কাল থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত সময়ে ইউরোপে যুক্তি ও আধুনিক বিজ্ঞান-নির্ভরতাহীন যে রসায়নবিদ্যার চর্চা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল তা ‘অপরসায়নবিদ্যা' বা 'অ্যালকেমি' নামে পরিচিত।

প্রাচীন মিশরীয় শব্দ ‘খেম' শব্দটি থেকে গ্রিক 'খেমিয়া' শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে আরবরা মিশর দখল করার পর আরবদের দ্বারা এই শব্দটিই আল-কিমিয়া'য় পরিণত হয়। আরবি 'আল-কিমিয়া' শব্দটি থেকে ইংরেজি Alchemy শব্দের উৎপত্তি, যার বাংলা হল অপরসায়ন।

গ্রিকরা মিশরীয়দের সংস্পর্শে আসার পর অপরসায়নচর্চা শুরু হয়। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে আরবরা মিশর দখল করার পর মিলর থেকে অপরসায়নবিদ্যার চর্চা আরবে ছড়িয়ে পড়ে। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে এই চর্চা আরবরা স্পেনে নিয়ে আসে এবং সেখান থেকে তা পরবর্তীকালে ইউরোপের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

অপরসায়নবিদ্যার সংস্কার করেই তা থেকে আধুনিক রসায়নের উৎপত্তি ঘটে। অপরসায়নবিদরাই সর্বপ্রথম বারুদ, ধাতুি সংক্রান্ত বিভিন্ন কৌশল প্রভৃতি আবিষ্কার করেন। অপরসায়নবিদ প্যারাসেলসাস দস্তা নামে ধাতব মৌলের আবিষ্কার করেন।

ব্রহ্মসিদ্ধান্ত গ্রন্থটি গুপ্তযুগের বিজ্ঞানী ব্রহ্মগুপ্তের লেখা।

অপরসায়ন চর্চার দ্বারা বিভিন্ন মূল্যবান ধাতু, বিশেষ করে সোনা তৈরির চেষ্টা করা হয়।

ইউরোপের কয়েকজন উল্লেখযোগ্য অপরসায়নবিদ ছিলেন মহম্মদ উমেইল আল তামিমি, বেঞ্জামিন মুসাফিয়া, হারমেস ড্রিসমেজিসটাস, কর্নেলিয়াস অ্যাগ্রিয়া, প্যারাসেলসাস, আলবার্ট ম্যাগনাস প্রমুখ।

প্রথমদিকের কয়েকজন আধুনিক রসায়নবিদ ছিলেন চার্লস বয়েল, ব্লক, যেয়ো প্রমুখ।

অপরসায়নবিদ্যাকে 'আধুনিক বিজ্ঞানের বীক্ষণাগার' বলা হয়।

সোরা, ফটকিরি, আয়রন সালফেট, সালফিউরিক অ্যাসিড, সোডা প্রভৃতি দ্রব্যের চাহিদা মেটে। রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে বিভিন্ন ভেষজ ঔষধপত্র প্রস্তুত হতে এবং বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় এই সময় রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার শুরু হয়।

প্রাচীন ভারতে আর্যভট্ট তাঁর সূর্যসিদ্ধান্ত গ্রন্থে বলেন যে, পৃথিবী গোলাকার এবং সে সর্বদা সূর্যকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরছে। বরাহমিহিরের বৃহৎসংহিতায় সূর্য, চন্দ্র, পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহনক্ষত্রের অবস্থান সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। এ ছাড়া এযুগে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ব্রহ্মগুপ্ত তাঁর ব্রহ্মফুট সিদ্ধান্ত গ্রন্থে বিভিন্ন গ্রহের অবস্থান, সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের কারণ প্রভৃতি আলোচনা করেন।

নিকোলাস কোপারনিকাসকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক বলা হয়।

কোপারনিকাস পোল্যান্ডের মানুষ ছিলেন।

কোপারনিকাস বলেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রে অবস্থান করছে সূর্য। সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীতে ও অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহগুলি নির্দিষ্ট বৃত্তাকার কক্ষপথে সর্বদা ঘুরে চলেছে। তিনি বলেন যে, শুক্র ও মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করছে পৃথিবীর কক্ষপথ।

জিওরদানো ব্রুনো প্রচার করেন যে, মহাবিশ্ব সম্পূর্ণ সুষম ও অসীম নয়। তিনি অনন্ত সংখ্যক মহাবিশ্ব থাকার সম্ভাবনা ব্যক্ত করেন এবং বলেন যে, পৃথিবী সৌরজগতের কেন্দ্রে অবস্থিত নয়।

টাইকো ব্রাহে বলেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রে সূর্য নয়, পৃথিবী অবস্থান করছে। পৃথিবী ছাড়া অন্যান্য গ্রহগুলি সূর্যকে কেন্দ্র করে অনবরত ঘুরে চলেছে। সূর্য-সহ অন্যান্য ঘূর্ণায়মান গ্রহগুলি আবার পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরে চলেছে।

গালিলিয়ো বলেন যে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রে সূর্য নয়, পৃথিবী অবস্থান করছে। পৃথিবী-সহ অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহগুলি সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। তিনি গতিবিদ্যা ও বলবিদ্যার সাহায্যে তাঁর বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করেন।

জোহানেস কেপলার প্রমাণ করেন যে, সূর্যকে ফোকাস দূরত্বে রেখে মঙ্গল গ্রহটি একটি উপবৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরে চলেছে তিনি প্রমাণ করেন যে, পৃথিবী-সহ অন্যান্য গ্রহগুলিও সূর্যের চারদিকে উপবৃত্তাকার বা ডিম্বাকার কক্ষপথ ধরে ঘুরছে।

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় ইউরোপবাসী কুসংস্কার মুক্ত হয় এবং তাদের চিন্তাজগতে আমূল পরিবর্তন ঘটে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রগতি বিশ্বব্রহ্মান্ড সম্পর্কিত পুরাতন ধারণাকে নস্যাৎ করে দেয়। ইউরোপের সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্ঞানের প্রসার ঘটে।

প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানী আর্যভট্ট আহ্নিক গতি, বার্ষিক গতি, সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণের কারণ আবিষ্কার করেন।

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গঠন সম্পর্কে আধুনিক ধারণা দেন নিকোলাস কোপারনিকাস, জিওরদানো ব্রুনো, জোহানেস কেপলার, গ্যালিলিয়ো গ্যালিলি, টাইকো ব্রাহে, স্যার আইজ্যাক নিউটন প্রমুখ বিজ্ঞানী।

কোপারনিকাসের মতবাদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গঠন সংক্রান্ত আধুনিক ধারণা 'কোপারনিকাসের বিপ্লব' নামে পরিচিত।

পোল্যান্ডের অধিবাসী কোপারনিকাস ছিলেন সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বব্রহ্মান্ড মতবাদের প্রধান আধুনিক প্রবক্তা। তিনি ‘আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক' নামেও পরিচিত।

বিজ্ঞানী প্রিস্টলি ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে অক্সিজেন গ্যাস আবিষ্কার করেন।

 

গ্যালিলিয়োকে আধুনিক বিজ্ঞানের জনক বলা হয়। গ্যালিলিয়ো প্রথম টেলিস্কোপ তৈরি করে বৃহস্পতির উপগ্রহ আবিষ্কার করেন, আলোর গতিবেগ নির্ণয় করেন, গতিবেগ, বল প্রভৃতি ধারণাকে অধিকতর স্পষ্ট করে ধারণাতে যথার্থতা আনেন। তাই তাঁকে 'আধুনিক বিজ্ঞানের জনক' বলা হয়।

রোমান ইনক্যুইজিশন আদালতে বিচারের পর চার্চের লোকজন জিওরদানো ব্রুনোকে ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে।

টাইকো ব্রাহে ডেনমার্কের রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডারিকের সহায়তা ভেন নামক দ্বীপে উরানিবর্গ নামে তাঁর আধুনিক বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

টাইকো ব্রাহে মনে করতেন যে, পৃথিবী ছাড়া অন্যান্য গ্রহগুলি সূর্যকে কেন্দ্র করে অনবরত ঘুরে চলেছে এবং সূর্য-সহ অন্যান্য ঘূর্ণায়মান গ্রহগুলি আবার পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরে চলেছে।