Chapter-8, মানুষের খাদ্য ও খাদ্য উৎপাদন

উঃ-সাধারণত শীতের শুরুতে (অক্টোবর/নভেম্বর) যে ধরনের ফসলের চাষ শুরু হয় আর শীতের শেষে (মার্চ/এপ্রিল) ফসল তোলা হয়, তাদের রবি ফসল বলে | রবি ফসল বর্ষার ওপর নির্ভরশীল নয়।

উদাহরণ : গম, বার্লি, ছোলা, মটর, সরষে হল কয়েকটি রবি ফসল |

উঃ-মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে কেঁচোর ভূমিকাগুলি হল—

1) কেঁচো মাটিতে বসবাস করার সময় মাটিতে খুব সরু সরু গর্ত সৃষ্টি করে। ফলে মাটি বেশ আলগা হয় এবং জল, বায়ু ও পুষ্টি উপাদান সহজে মাটির মধ্যে প্রবেশ করতে পারে।

2) কেঁচো মাটির বিভিন্ন জটিল জৈব উপাদানকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে এবং সেগুলিকে সরল অজৈব ও জৈব উপাদান হিসেবে মাটিতেই ত্যাগ করে। ফলে মাটিতে হিউমাস-এর পরিমাণ বাড়ে।

উঃ-চাষিরা খোলা জায়গায় একটি গর্ত খুঁড়ে সেখানে মৃত উদ্ভিদ আর প্রাণীদের বর্জ্য পদার্থ ফেলে রাখেন পচে যাওয়ার জন্য | ব্যাকটেরিয়া আর ছত্রাকের বিয়োজন ও রূপান্তর ক্রিয়ায় ওইসব বর্জ্য পদার্থগুলি পচে গিয়ে জৈব সার তৈরি হয়।

♦ বিভিন্ন প্রকার অজৈব রাসায়নিক উপাদানের মিশ্রণে সার কারখানায় উৎপন্ন সারকে রাসায়নিক সার বলে। যেমন—ইউরিয়া সার, পটাশ সার।

● অজৈব সার ধান, ভুট্টা, গম প্রভৃতি চাষে ব্যবহার করা হয়।

উঃ-জৈব সার যে সকল কারণের জন্য অজৈব সারের চেয়ে ভালো, তা নীচে উল্লেখ করা হল।

1) জৈব সার মাটিতে ব্যবহার করলে, মাটির জলধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

2) এই সার প্রয়োগ করলে মাটি রুন্ধ্রযুক্ত হয়। ফলে মাটির মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন গ্যাসের আদানপ্রদান সহজ হয়।

3) এই সার মাটিতে বসবাসকারী উপকারী জীবাণুদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

4) এই সার মাটির গঠনকে উন্নত করতে সাহায্য করে।

উঃ-অজৈব সারের অত্যধিক আর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মাটিতে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার কাজে বাধা সৃষ্টি করে মাটির উর্বরাশক্তি বা উৎপাদন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। মাটি পরীক্ষা করিয়ে মাটির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী অজৈব সার ব্যবহার না করলে মাটির রসায়ন পালটে যায়। এতে ভালোর থেকে ক্ষতিই বেশি হয়। যেমন—অ্যামোনিয়াম সালফেট [(NH4)2 SO4)] অত্যধিক ব্যবহার করলে মাটিতে অম্লতার পরিমাণ বেড়ে যায়। আবার, সোডিয়াম নাইট্রেট (NaNO3) অতিমাত্রায় ব্যবহার করলে মাটিতে ক্ষারের পরিমাণ বেড়ে যায়। এ ছাড়া অজৈব সার ব্যবহার করা হয়েছে এমন চাষের জমি থেকে নাইট্রোজেন বা ফসফরাসের যৌগ মিশ্রিত জল নদী বা পুকুরের জলে মিশে জলদূষণ ঘটায় |

উঃ-কৃষিজমিতে আগাছা জন্মালে যে উদ্ভিদের চাষ করা হয়েছে সেই উদ্ভিদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং ফসল উৎপাদনের পরিমাণ হ্রাস পায়। কারণ আগাছাগুলিই জল ও পুষ্টি উপাদানের কিছু অংশ শোষণ করে নেয় এবং নির্দিষ্ট ফসল উৎপাদনকারী উদ্ভিদের থাকার জায়গা ও আলোতে ভাগ বসায়। এ ছাড়া কোনো কোনো আগাছা ফসল তোলার ক্ষেত্রেও বাধার সৃষ্টি করে। এইসব কারণের জন্যই কৃষিজমিতে আগাছা দমন প্রয়োজনীয়।

উঃ-কৃষিজনিত আগাছা দমনের জন্য নানাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, যেমন—1) জমি চষা হয়, যার ফলে আগাছাগুলি মূলশুদ্ধ উপড়ে আসে এবং পরে ওইগুলি শুকিয়ে মাটিতে মিশে যায়। 2) অনেক সময় হাত দিয়ে আগাছা তুলে কৃষিজমির বাইরে ফেলা হয়।3) গোড়া থেকে কেটে আগাছাগুলিকে জমি থেকে পৃথক করা হয়। 4) কিছু রাসায়নিক পদার্থ যেমন—2, 4-D, ড্যালাপোন, পিক্লোরাম ইত্যাদি স্প্রে করে আগাছা দমন করা হয়।

উঃ-বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ ও জীবাণু বিভিন্নভাবে ফসলের ক্ষতি করে। যেমন—–1) পঙ্গপাল, উই, গুবরেজাতীয় পোকা এবং ইঁদুর ফসল খেয়ে নেয় এবং নষ্ট করে। পঙ্গপালরা আখ, গম প্রভৃতি উদ্ভিদের পাতা খেয়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে।2) মাজরা পোকা (stem borer) ধান গাছের কাণ্ডকে কুরে কুরে খায়।3) উই উদ্ভিদের মূল খায়। 4) কিছু ছত্রাক গমের মরিচা রোগ সৃষ্টি করে।5) কিছু ব্যাকটেরিয়া উদ্ভিদদেহে উইলট (wilt) নামে এক বিশেষ ধরনের রোগ সৃষ্টি করে l

উঃ-উৎপন্ন ফসল মজুত রাখার জন্য যে সকল সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, সেগুলি হল— 1) সদ্য সংগ্রহ করা দানাজাতীয় শস্য শুকিয়ে নিয়ে চটের ব্যাগ বা ধাতব পাত্রে মজুত করা হয়। 2) ব্যাপকভাবে সঞ্চয়ের জন্য শস্যাগার বা বায়ুহীন ঘর (silo) ব্যবহার করা হয়, যাতে সারাক্ষণ একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখার ব্যবস্থা থাকে। 3) বর্তমানে বহু শস্যাগারে সারাক্ষণ নাইট্রোজেন গ্যাস চালনা করা হয়। 4) ফসল মজুত করার আগে গুদামে ও ফসল মজতু রাখার ব্যাগ বা পাত্রে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করা হয়।

উঃ-ফসল তোলার পর সেই ফসলকে সঠিক উপায়ে সঞ্চয় করা বা মজুত করা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সদ্য সংগ্রহ করা ফসলে আর্দ্রতা অনেক বেশি থাকে, তাই সেগুলিকে যথা সম্ভব শুকিয়ে নিয়ে মজুত করতে হয়। দানাজাতীয় শস্য সঠিকভাবে শুকনো না করলে, তাতে অণুজীবের আক্রমণ ঘটে। দানাজাতীয় শস্য মজুত করার জন্য চটের তৈরি ব্যাগ বা ধাতব পাত্র ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া ব্যাপক মাত্রায় সঞ্চয়ের জন্য শস্যাগার বা বায়ুহীন ঘর ব্যবহার করা হয়। এই ধরনের শস্যাগারে ইঁদুরজাতীয় প্রাণীরা ঢুকতে পারে না। এইসব শস্যাগারে সারাক্ষণ একটি নির্দিষ্ট উন্নতা বজায় রাখার ব্যবস্থা করা হয়। অনেকসময় ওইসব শস্যাগারে ফসল মজুত করার আগে ফসল ভরার জন্য ব্যবহৃত ব্যাগ, পাত্র এমনকি ফসলের গুদামকে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করে কাঁটমুক্ত ও ছত্রাকমুক্ত করা হয়।

উঃ-ভারতের প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই কম-বেশি ধান চাষ করা হয়। তবে পশ্চিমবঙ্গ, অন্ধ্রপ্রদেশ, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা আর তামিলনাড়ু ধানের উৎপাদন তুলনামূলকভাবে ভালো।

চাষ করার পদ্ধতি অনুসারে ধানকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। এগুলি হল—–1) আউশ বা শরৎকালীন ধান, 2) আমন বা শীতকালীন ধান এবং 3)  বোরো বা গ্রীষ্মকালীন ধান ।

উঃ-আউশ ধান চাষের পদ্ধতি, আমন ও বোরো ধান চাষের পদ্ধতির তুলনায় একটু আলাদা। সাধারণত রবি ফসল তুলে নেওয়ার পর জমি তৈরি করে সরাসরি বীজ ছড়িয়ে এই ধান বোনা হয়। তবে কোনো কোনো অঞ্চলে সরাসরি বীজ না বুনে বীজতলা তৈরি করে নিয়েও আউশ ধানের চাষ করা হয়। পলি, এঁটেল বা দোআঁশ সব ধরনের মাটিতেই আউশ ধানের চাষ হয়। আমাদের রাজ্যের উত্তরভাগে মার্চ-এপ্রিল মাসে এবং দক্ষিণভাগে মে-জুন মাসে আউশ ধানের চাষ করা হয়।

উঃ-সব ধরনের মাটিতে আমন ধানের চাষ করা হয়। তবে কাদা মাটি বা এঁটেল মাটিই আমন ধান চাষের পক্ষে বেশি উপযোগী | আমাদের দেশে প্রায় কয়েক হাজার জাতের আমন ধান রয়েছে | দেশি আমন ধানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি জাত হল–রঘুশাল, ঝিঙ্গাশাল, বাসমতী, ভাসামানিক, পাটনাই- 23 প্রভৃতি। আমন ধান চাষের জন্য আগে বীজতলায় বীজ ফেলে চারাগাছ তৈরি করা হয়। পরে জমি তৈরি করে চারাগাছগুলো রোপণ করা হয়। তবে বীজতলায় ফেলার আগে সঠিকভাবে বীজ শোধন করে নেওয়া উচিত। আমাদের দেশে জুন-জুলাই মাসে বীজতলা তৈরি করা হয় এবং জুলাই- আগস্ট মাসে ধান রোপণ করা হয়।

উঃ-ধান চাষের সময় বীজ বাছাই, বীজ বোনা ও চারাগাছ রোপণ করার পদ্ধতি এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।

ধানের বীজ বাছাই : প্রথমে গাঢ় নুন জলের মধ্যে বীজধানকে ডুবিয়ে নাড়া দিলে সুস্থ আর সবল বীজগুলো জলে ডুবে যায়, আর অপুষ্ট বীজগুলো জলে ভেসে ওঠে। এবার পুষ্ট বা সবল বীজগুলো আলাদা করে পরিষ্কার জলে ধুয়ে শুকিয়ে নিতে হয়।

বীজ বোনা : আউশ ধানের বীজ সরাসরি জমিতে বোনা হয়। জমি তৈরি করার পর মাটি নরম থাকতে থাকতেই হাতে করে ছিটিয়ে বা জমি চষার সময় লাঙলের পিছনে তৈরি হওয়া খাতে হাত দিয়ে বীজ ফেলা হয়। এ ছাড়া বীজ বপন যন্ত্রের সাহায্যের জমিতে বীজ বোনা হয়।

চারাগাছ রোপণ : প্রথমে বীজতলা থেকে চারাগুলোকে সাবধানে তুলে আনা হয়। তারপর তৈরি জমিতে 2-3 সেন্টিমিটার মতো জল বেঁধে রেখে সারিবদ্ধভাবে ধানের চারা বসানো হয়। একেই চারাগাছ রোপণ বলে।

উঃ-ধান চাষের ক্ষেত্রের সার প্রয়োগ ও আগাছা নিবারণ, জলসেচ এবং ফসল তোলার পদ্ধতি এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।

1) সার প্রয়োগ ও আগাছা নিবারণ: ধানের জাত এবং মাটির উর্বরতার ওপর নির্ভর করে ধান চাষের জমিতে জৈব এবং অজৈব সার দেওয়া হয়। জমিতে সময়ে নিড়ান দিলে জমির আগাছা সহজে দমন করা যায়। অনেকক্ষেত্রে আগাছানাশক প্রয়োগ করেও ধানখেত থেকে আগাছা নিবারণের ব্যবস্থা করা হয়।

2) জলসেচ : ধানের ভালো ফলন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনমতো জলসেচের ব্যবস্থা করা হয়। সেঁউতি, ডোঙা, কপিকল ব্যবস্থা বা পাম্পিং মেশিন প্রভৃতির সাহায্যে জলসেচ করা হয়। রোপণ করা আউশ, আমন আর বোরো ধানের বেড়ে ওঠার সময় ও পরিণত অবস্থায় গাছের গোড়ায় 30 মিলিমিটার থেকে 50 মিলিলিটার গভীর জল থাকা প্রয়োজন। এ ছাড়াও খারিফ ঋতুতে অনিয়মিত বৃষ্টিপাতে প্রাক্-খারিফ ও বোরো ধান চাষে নিয়মিত জলসেচের প্রয়োজন।

3) ফসল তোলা : ধানে পাক ধরলে কাস্তে দিয়ে ফসল কাটা হয়। ফসল তুলে আঁটি বেঁধে খামারে তোলা হয়। শক্ত পাটাতনের ওপর আছাড় দিয়ে মাড়াই করে কিংবা হস্তচালিত ঝাড়াই মেশিনের সাহায্যে দানাগুলিকে খড় থেকে আলাদা করা হয়। কুলোজাতীয় জিনিস দিয়ে শস্যের ওপর হাওয়া দিয়ে ঝাড়াই করা দানাগুলি সংগ্রহ করা হয়।

উঃ-আমের জন্মস্থান ভারতে। ভারতের প্রায় সব জায়গাতেই কমবেশি আমের চাষ হয় | তবে পশ্চিমবঙ্গের মালদা, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়াতে সবথেকে বেশি আমের চাষ হয়। ভারতের বাইরে শ্রীলঙ্কা, ব্রহ্মদেশ, মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে আম জন্মে।

♦ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে 1500 মিটার উচ্চতা অবধি আম গাছ ভালো জন্মে। আম গাছে মুকুল আসার সময় পরিষ্কার থাকা দরকার। কুয়াশা ও তুষারপাত আমের মুকুলের পক্ষে ক্ষতিকারক।

উঃ-গোলাপ, জবা, গাঁদা, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, গন্ধরাজ, প্রভৃতি উদ্ভিদের বীজ থেকে সহজে উন্নতমানের চারা উৎপাদন করা যায় না। এই সমস্ত গাছের শাখা থেকে নতুন চারাগাছ তৈরি করার পদ্ধতিকে কলম করা বলে | কলম থেকে তৈরি গাছের সুবিধা হল, এর থেকে তাড়াতাড়ি ফুল ও ফল পাওয়া যায়।

♦ যে কৃত্রিম অঙ্গজ জনন পদ্ধতিতে একই গণের অন্তর্গত দুটি ভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ দেহাংশকে পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে কয়েকমাস রেখে দিলে সেই জোড়া অংশ মিশে যায় এবং নতুন ধরনের উদ্ভিদের সৃষ্টি হয়, তাকে জোড়কলম বলে।

উঃ-বীজের থেকে উৎপন্ন আম গাছে কখনও তার জাতি-বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি বজায় থাকে না। একটা ভালো জাতের আমের আঁটি পুঁতলে যে চারাগাছটা জন্মাবে, তাতে কিন্তু ওই ভালো জাতের সব গুণযুক্ত আম না ফলতেও পারে। এই সমস্যা এড়াতে ভালো জাতের আমগাছ থেকে জোড়কলম করা হয়। জোড়কলম থেকে তৈরি চারাগাছে ভালো জাতের সব গুণ বজায় থাকে। শুধু তাই নয়, জোড়কলম থেকে প্রাপ্ত গাছ, চারা রোপণের পাঁচ বছর পর থেকেই ভালো ফলন দেয়।

উঃ-আমের জোড়কলমের ক্ষেত্রে আঁটি থেকে পাওয়া একটি চারাগাছের (স্টক) সঙ্গে উন্নত জাতের আমগাছের (সিয়ন) শাখা জোড়া লাগানো হয়। একটি অংশের সঙ্গে আরেক অংশ জোড়া লাগানো হয় বলে, এই জাতীয় কলম জোড়কলম নামে পরিচিত। সাধারণত বর্ষাকালে অর্থাৎ আষাঢ় মাসে এই কলম তৈরি করা হয়।

1) প্রথমে স্টক এবং সিয়ন অংশ দুটির কিছুটা করে ছুরি দিয়ে চেঁছে পরস্পর জোড়া লাগিয়ে সুতলি দড়ি দিয়ে আটকানো হয়। ঠিকমতো জোড়া না লাগা পর্যন্ত চারাগাছটাতে (স্টক) জল দেওয়া হয় |

2) জোড়া লাগা সম্পূর্ণ হলে নির্বাচিত সিয়ন গাছটাকে জোড়ের নিম্নাংশ এবং স্টক গাছটার জোড়ের ওপরের দিকের অংশ একবারে না কেটে দুই থেকে তিন বারে কেটে ফেলা হয়।

3) এইভাবে জোড়কলম থেকে তৈরি গাছকে কয়েকদিন ছায়াতে রাখার পর নার্সারিতে লাগানো হয় |

উঃ-চা একপ্রকার উত্তেজক পানীয় | পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চা পানের রীতি লক্ষ করা যায়। চায়ের কয়েকটি গুণাগুণ বা উপকারিতার জন্যই বিভিন্ন দেশে চা সমাদৃত।

চায়ের উল্লেখযোগ্য উপকারিতা হল—

1) চা পান করলে শরীরে উদ্দীপনা আসে। চা-এ উপস্থিত ক্যাফিন, থিয়োফাইলিন এবং প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড স্নায়ুকে উদ্দীপিত করে এবং হৃৎপিণ্ডের কার্যকারিতাকে ভালো রাখে।

2) চা-এ উপস্থিত পলিফেলন রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

3) চা-এ উপস্থিত ফ্লুওরাইড দন্তক্ষয় রোধ করে, দাঁতকে দীর্ঘদিন কর্মক্ষম থাকতে সাহায্য করে।

4) চা-এ উপস্থিত ফ্ল্যাভোনয়েড, ট্যানিন, উদ্বায়ী তেল, ভিটামিন B-কমপ্লেক্স এবং ফলিক অ্যাসিড সুস্বাস্থ্য গঠনে সহায়তা করে । চা-তে থাকা ভিটামিন B-কমপ্লেক্স এবং ফলিক অ্যাসিডের প্রদাহ-প্রতিরোধী ও ক্যানসার প্রতিরোধী ভূমিকা রয়েছে।

5) সবুজ চা-এ উপস্থিত ভিটামিন K, হার্ট অ্যাটাক হতে বাধা দেয়। এ ছাড়া দেহের ভিতরে হওয়া রক্তক্ষরণ ও রিউম্যাটিক প্রদাহ রোধ করে।

উঃ-চা চাষের জন্য মাটি তৈরি ও চারাগাছ লাগানোর পদ্ধতি এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।

1) মাটি তৈরি : চা চাষের জন্য নির্বাচিত জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা সব উদ্ভিদ মূলসমেত উপড়ে ফেলা হয় চা চাষের জমিতে কমপক্ষে 45 সেন্টিমিটার অবধি গভীরভাবে মাটি কর্ষণ করা হয়। ওই মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য গুয়াটেমালা ঘাস, সিট্রোনেলা ঘাস, ক্রোটালারিয়া ও অন্যান্য কিছু উদ্ভিদের চাষ করা হয়। পরে উদ্ভিদগুলিকে অপসারিত করে ওই জমিতে চা গাছের চারা রোপণের ব্যবস্থা করা হয়।

2) চারাগাছ লাগানো : জমিতে চারা রোপণের এক সপ্তাহ আগে গভীর গর্ত খোঁড়া হয় | ওই গর্তগুলি জমির ওপরের স্তরের মাটি দিয়ে ভরতি করা হয় এবং গর্তে 12 থেকে 18 মাস বয়সের চা-এর চারাগাছ লাগানো হয়। চারাগাছের গোড়ার চারিদিকে ভেজা পাতা, খড় ইত্যাদি জড়ো করা হয়।

উঃ-মৌমাছিদের জীবনে চারটি দশা লক্ষ করা যায়। এগুলি হল—ডিম, লাভা, পিউপা এবং পূর্ণাঙ্গ দশা।

♦ প্রথমে রানি আর পুরুষ মৌমাছির মিলনের পর রানি মৌমাছি ডিম পাড়ে। এরপর ডিম থেকে লার্ভা বের হয়। পরে লার্ভা থেকে পিউপা উৎপন্ন হয়। সবশেষে পিউপাগুলি পূর্ণাঙ্গ মৌমাছিতে পরিণত হয়।

উঃ-(1)দেশীয় পদ্ধতিতে সাধারণত মৌমাছিদের প্রতিপালন করা হয় না। প্রাকৃতিকভাবে গাছের ডাল, ঘরের দেয়াল, কার্নিস প্রভৃতি জায়গায় তৈরি হওয়া মৌচাক খুঁজে বের করা হয়।

(2) অনেকসময় ফাঁকা কাঠের গুঁড়ি, কাঠের বাক্স বা মাটির হাঁড়ি মৌমাছিদের চলাচলের জায়গায় রেখে দেওয়া হয় । মৌমাছিরা স্বেচ্ছায় এইসব জায়গায় এসে চাক তৈরি করতে পারে।

(3) পরে আগুন, জল বা ধোঁয়া দিয়ে সেই চাক থেকে মৌমাছিদের তাড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ফলে মৌমাছিরা চাক ছেড়ে পালিয়ে যায়। আবার কখনও বা মারাও যায়। তারপর সেই মৌচাক ভেঙে মধু বের করে নেওয়া হয়।

উঃ-মৌমাছিরা আম, জাম, লেবু, পেয়ারা, গাজর, ধনে, সরষে, মৌরি, লাউ, কুমড়ো, পেঁয়াজ, মটর ইত্যাদি গাছের ফুল থেকে মকরন্দ সংগ্রহ করে।

♦ মানুষ যেমন দলবদ্ধভাবে জীবনযাপন করে ঠিক তেমনিভাবে একটি মৌচাকে রানি, পুরুষ ও শ্রমিক মৌমাছি উপনিবেশ গঠন করে দলবদ্ধভাবে জীবনযাপন করে। সেই কারণে মৌমাছিকে সামাজিক পতঙ্গ বলে|

উঃ-শ্রমিক মৌমাছিকে মৌচাকের যেসব কাজ করতে হয় সেগুলি হল— 1) মৌচাক তৈরি করা। 2) রানি ও পুরুষ মৌমাছিদের সেবা করা। 3) মৌচাক রক্ষণাবেক্ষণ করা ও পাহারা দেওয়া। 4) সন্তান প্রতিপালন করা। 5) ফুলের পরাগরেণু ও মকরন্দ সংগ্রহ করা। 6) মধু ও মোম তৈরি করা।

উঃ-যেসব কার্প আকারে বড়ো, তাড়াতাড়ি বাড়ে এবং সাধারণত বন্ধ জলাশয়ে ডিম পাড়ে না, তাদের মেজর কার্প বলে । ব্যাবসায়িক দিক থেকে মেজর কার্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর এর চাহিদাও বেশি | রুই, কাতলা, মৃগেল ইত্যাদি হল মেজর কার্প।

♦ যেসব কার্প আকারে ছোটো, তাড়াতাড়ি বাড়ে না এবং সাধারণত বদ্ধ জলাশয়ে ডিম পাড়ে, তাদের মাইনর কার্প বলে। ব্যাবসায়িক দিক থেকে মাইনর কার্পেরা অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। পুঁটি, বাটা ইত্যাদি হল মাইনর কার্প।

উঃ-কৃত্রিম পদ্ধতিতে মাছচাষের সময় প্রকৃতি থেকে মাছচাষিদের সংগ্রহ করা নিষিক্ত ডিমগুলি থেকে ডিমপোনা তৈরি করার জন্য একটি পুকুরে রাখা হয়। একেই হ্যাচারি বলে।

মাছ উৎপাদনের ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী মাছচাষ প্রধানত দু-প্রকার, যথা— 1) সংগ্রহভিত্তিক মাছচাষ এবং 2) পালনভিত্তিক মাছচাষ |

উঃ-দেশি কার্পের মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মাছ হল—— রুই, কাতলা ও মৃগেল। এই তিন ধরনের মাছকে একই পুকুরে চাষ করা যায়, কারণ এরা জলাশয়ের তিনটি ভিন্ন স্তর থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে। যেমন—কাতলা মাছ জলের ওপরের স্তর থেকে, রুইমাছ জলের মাঝের স্তর থেকে এবং মৃগেল মাছ জলের নীচের স্তর থেকে খাবার সংগ্রহ করে। তাই এইজাতীয় মাছগুলিকে একসঙ্গে চাষ করলে খাবার ও থাকার জায়গা নিয়ে এদের মধ্যে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায় না। ফলে এই মাছগুলি তাড়াতাড়ি বেড়ে ওঠে। তিন ধরনের দেশি মাছ একই পুকুরে চাষ করাটাই হল মিশ্র মাছচাষ।

উঃ-অর্থনৈতিক গুরুত্বযুক্ত পাখিরা যাদের সাধারণত ডিম ও মাংসের কারণে পালন করা হয়, তাদের পোলট্রি পাখি বলে।

♦ মুরগির মাংস ও ডিম প্রাণীজ প্রোটিনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস | মুরগির ডিম বিভিন্ন অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিডের জোগান দেয়। এ ছাড়া বিভিন্ন মৌলের (Fe, Ca, P, K) ও ভিটামিনের (A, B কমপ্লেক্স, D ও E ) চাহিদা মেটায় | মুরগির মাংস ক্ষতিকারক ফ্যাটের পরিমাণ অন্যান্য মাংসের তুলনায় কম, তাই এটি স্বাস্থ্যকর।