Chapter-8, সাম্প্রদায়িকতা থেকে দেশভাগ

ঊনবিংশ শতকে ভারতের হিন্দু সমাজে এক সংস্কারমুখী ধারার জন্ম হয়েছিল। এই সংস্কারমুখী ধারা থেকে জন্ম নিয়েছিল হিন্দু জীবনবাদী আন্দোলন।
তা হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনের জন্ম:
খ্রিস্ট ধর্ম ও পাশ্চাত্য অনুকরণের প্রসাররোধ: খ্রিস্টান মিশনারিরা বিভিন্নভাবে হিন্দুধর্মকে আক্রমণ করত। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতীয়রা ও ব্রিটিশ সরকার বিভিন্নভাবে হিন্দুধর্মের প্রচলিত সংস্কারগুলির ওপর আঘাত করছিল। এই অবস্থায় হিন্দুধর্ম ও সমাজকে রক্ষা করার জন্য ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল। পাশ্চাত্যপথীদের ব্রিটিশ প্রীতি : পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতীয় পাশ্চাত্যবাদীরা ব্রিটিশ শাসন ও সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করত। তাদের এই মনোভাব হিন্দুধর্ম ও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের পক্ষে ক্ষতিকারক ছিল। তাই ভারতীয়দের আত্মশক্তিতে বলীয়ান করার লক্ষ্যে হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনের জন্ম হয়।

)) সাম্প্রদায়িক মনোভাব তৈরিতে হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনের ভূমিকা: ভারতে সাম্প্রদায়িক মনোভাব তৈরিতে হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন থেকে সৃষ্ট রাজনৈতিক চরমপন্থার বিশেষ ভূমিকা ছিল।

1 হিন্দু সভ্যতার অতীত গৌরব তুলে ধরা হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদীরা হিন্দুধর্মের গৌরবময় অতীতের কথা প্রচার করত। এজন্য তারা ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক চরিত্রের অতিরন্বিত কল্পনা করত। তারা ভারত ও হিন্দুধর্মকে সমার্থক বলে মনে করত। এই ধারণা হিন্দু ও মুসলমানদের একজোট হয়ে আন্দোলন করার পরিপন্থী ছিল।

[2] মুসলমানদের দোষারোপ হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদীরা একদিকে যেমন অতীতের হিন্দু সভ্যতার গৌরব তুলে ধরতেন অন্যদিকে তেমনি এই গৌরবময় সভ্যতার অধঃপতনের জন্য মুসলমানদের দায়ী করেন। ফলে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে ব্যবধান বাড়ে।

খ্রিস্টাব্দে চৌরিচৌরা ঘটনার পর অসহযোগ আন্দোলন তুলে নেওয়া হয়। অসহযোগ আন্দোলনের পরে মুসলমান নেতাদের অনেকের সঙ্গে কংগ্রেসের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।

কংগ্রেস ও মুসলিম নেতাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরির কারণ : [1 অসহযোগ আন্দোলনের প্রত্যাহার : ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে চৌরিচৌরা ঘটনার জন্য অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করা হলে খিলাফৎ

•আন্দোলনও স্তিমিত হয়ে যায়। আসলে মুসলিম নেতারা খিলাফৎ আন্দোলনকে সর্বজনগ্রাহ্য করার জন্য কংগ্রেস ও মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্ব স্বীকার করেছিল। ফলে অসহযোগ আন্দোলন বন্ধের ফলে কংগ্রেসের সঙ্গে মুসলিম নেতাদের দূরত্ব 
2 ইসলাম ধর্মীয় আন্দোলনের উপস্থিতি শিলাফৎ আন্দোলনে উলেমাদের উপস্থিতি ও ইসলাম ধর্মীয় প্রতীকের ব্যবহার একদিকে যেমন মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় ভাবাবেগ জাগিয়ে তোলে অন্যদিকে ক্যাগ্রেসের হিন্দু নেতাদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করো।
3 সাম্প্রদায়িক দাংগা অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারের পর ১৯২২-২৩ খ্রিস্টাব্দে অনেক জায়গায় হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়।

4 মুসলিম ধর্মীয় ভাবাবেগ বৃদ্ধি। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে মুস্তাফা কামাল পাশার নেতৃত্বে তুরছে খলিফা পদের অবসান ঘটে। ফলে ভারতে খিলাফৎ আন্দোলন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। তবে। খিলাফৎ আন্দোলন বন্ধ হলেও মুসলমানদের মধ্যে যে ধর্মার ভাবাবেগ সৃষ্টি হয় তা মুসলিম লিগের কর্মসূচিকে প্রভাবিত করেছিল। ফলে মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় ভাবাবেগ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

5 উগ্র হিন্দু আন্দোলন হিন্দুদের মধ্যেও হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনের বিস্তার ঘটে। হিন্দু মহাসভার মতো হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনের শক্তি বাড়তে থাকে। তা ছাড়া কংগ্রেসে মদনমোহন মালব্যের মতো গোঁড়া হিন্দুত্ববাদী নেতাদের কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়। ফলে কংগ্রেসের সঙ্গে অনেক মুসলিম নেতার দূরত্ব তৈরি হয়।

ভারতে হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক জাতি— ব্রিটিশ আমলের এই তত্ত্ব 'দ্বিজাতি তত্ত্ব' নামে পরিচিত। দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রবন্ধা ছিলেন স্যার সৈয়দ আহমদ খান। মুসলিম লিগের নেতা মহম্মদ আলি জিন্নাহ্ এই তত্ত্বকে ব্যাপকভাবে প্রচার করেছিলেন। » দ্বিজাতি তত্ত্বের উদ্ভবের পটভূমি : ভারতে দ্বিজাতি তত্ত্বের উদ্ভবের পটভূমি বা কারণগুলি হল—

[1] হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে উন্নয়নের বৈষম্য - ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রথম পর্বে হিন্দুরা অনেকে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছিল। তারা সরকারি চাকরি করে নিজেদের অবস্থার উন্নতি ঘটিয়েছিল। অপরদিকে মুসলমানরা পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ না করে পিছিয়ে পড়েছিল। ফলে এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিস্তর বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছিল।

2 ব্রিটিশ সরকারের বিভেদনীতি ব্রিটিশ সরকার 'ভাগ করো এবং শাসন করো' নীতির দ্বারা: হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়কে পৃথক করে রাখার চেষ্টা করেছিল। এজন্য তারা হিন্দু-বিরোধী মুসলমানদের বিশেষ গুরুত্ব ও সুযোগসুবিধা দিত। আর মুসলমান নেতারাও সক্রিয়ভাবে হিন্দুদের বিরোধিতা করত।

মহম্মদ আলি বিহ

3. হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা : কয়েকটি হিন্দু সংগঠনও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার করায় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বা দ্বিজাতি তত্ত্বের পটভূমি রচিত হয়েছিল। আর্য সমাজ, হিন্দু মহাসভা, আর. এস. এস প্রভৃতি সংগঠন হিন্দুধর্ম বিপন্ন বলে প্রচার করে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণার পরিবেশ তৈরি করেছিল।

[4] মুসলমান নেতাদের উগ্র প্রচার মুসলমান নেতাদের মধ্যে স্যার সৈয়দ আহমদ খান, চৌধুরি রহমৎ আলি, মহম্মদ আলি জিন্নাহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ প্রচার করে সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টিতে সহায়তা করেছিলেন।

পরিশেষে বলা যায়, ভারতে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায় সংকীর্ণ গোষ্ঠী-রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে ভারতের জাতীয় আন্দোলনকে দুর্বল করেছিল। এরই পরিণামস্বরূপ ভারতের জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট হয়েছিল।

১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ২০ মার্চ লাহোরে মুসলিম লিগের অধিবেশন বসে। এই অধিবেশনে বাংলার ফজলুল হক একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন যা 'লাহোর প্রস্তাব' নামে পরিচিত। এই প্রস্তাবে পাকিস্তান শব্দের কোনো উল্লেখ না থাকলেও এটি 'পাকিস্তান প্রস্তাব' নামে পরিচিত।

লাহোর অধিবেশন : ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ২০ মার্চ মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন মহম্মদ আলি জি লাহোর প্রস্তাবের খসড়া রচনা করেছিলেন সিকদার হায়াৎ খান। বাংলার ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং উত্তরপ্রদেশের মুসলিম নেতা চৌধুরি খালিকুজ্জমান তা সমর্থন করেন।

লাহোর অধিবেশনের প্রস্তাব লাহোর অধিবেশনে যেসব প্রস্তাব গৃহীত।

হয়েছিল, সেগুলি হল

[1] হিন্দু ও মুসলিম দুটি পৃথক জাতি এবং

2 জাতি হিসেবে মুসলিমদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র গঠন করা। মহম্মদ আলি জিন্নাহ এই প্রস্তাব সমর্থন করে বলেছিলেন যে, 'ভারত বিভাগই হল ভারতের রাজনৈতিক সমস্যার একমাত্র সমাধান'।

লাহোর প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয়দের প্রতিক্রিয়া মুসলিম লিগের লাহোর প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় কংগ্রেস, গান্ধিজি ছাড়াও বিভিন্ন হিন্দু সংগঠন এর বিরোধিতা করে। গান্ধিজি এই ঘটনাকে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে লাহোর অধিবেশনের সময় মুসলিম লিগ ভারতের অঙ্গবিচ্ছেদের তৎপরতা' বলে অভিহিত করেছেন। লাহোর প্রভাবের গুরুত্ব: ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের লাহোর প্রস্তাব বা পাকিস্তান প্রস্তাবের গুরুত্ব হল

[1] লাহোর প্রস্তাবের ফলে সুবিধাবাদী মুসলিমদের মধ্যে মুসলিম লিগ ও মহম্মদ আলি জিন্নাহর প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ে।

[2 এর ফলে ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে ক্রিসের প্রস্তাবে আলাদা মুসলিম রাষ্ট্রের আভাস দেওয়া হয়।

[3] এর ফলে সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধি পায় এবং ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলি ভারতের স্বাধীনতা-সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনার জন্য তাঁর মন্ত্রীসভার তিন ভারতে পাঠিয়েছিলেন। এই দলটি ‘মন্ত্রী-মিশন' বা 'ক্যাবিনেট মিশন' নামে পরিচিত। ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলো এই দল তার পরিকল্পনা পেশ করেছিল।

সদস্য : ক্যাবিনেট মিশনের তিনজন সদস্য হলেন ভারত সচিব স্যার পেথিক লরেন্স, স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস ও এ. ভি. আলে এঁরা ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মার্চ দিল্লিতে পৌঁছেছিলেন।
ক্যাবিনেট মিশন ও ভারতীয় নেতৃবৃন্দের আলোচনা : ক্যাবিনেট মিশনের সদস্যরা ভারতীয় নেতৃবৃন্দদের সঙ্গে আলোচনা? জিন্নাহ পাকিস্তানের দাবিতে অনড় থাকেন, গান্ধিজি “দ্বিজাতি তত্ত্বের বিরোধিতা করেন, ফলে আলোচনা ব্যর্থ হয়। তা সত্ত্বেও মতার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল।

• পরিকল্পনা মন্ত্রী মিশনের ঘোষিত পরিকল্পনাগুলি ছিল—

[1 ব্রিটিশ শাসিত ভারত ও দেশীয় রাজ্যগুলিকে নিয়ে একটি যুক্তরাষ্ট্র গঠন করা হবে।
2 হিন্দুপ্রধান প্রদেশগুলিকে 'ক' (A), মুসলিমপ্রধান প্রদেশগুলিকে 'খ' (B) এবং যে প্রদেশগুলিতে হিন্দু ও মুসলমানের অনুপাত সমান সমান সেগুলিকে 'গ' (C) শ্রেণিভুক্ত করা হবে।
[3] প্রদেশগুলি নিজেদের জন্য সংবিধান রচনা করবে এবং ইচ্ছে করলে জোটবদ্ধ হতে পারবে।

4 প্রত্যেক শ্রেণিভুক্ত রাজ্য ও দেশীয় রাজ্যগুলির নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে 'সংবিধান সভা' বা 'গণপরিষদ' গঠিত হবে। এই গণপরিষদ ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান রচনা করবে।

5 সংবিধান রচিত না হওয়া পর্যন্ত ভারতের প্রধান রাজনৈতিক দলের সদস্যদের নিয়ে একটি অন্তবর্তী সরকার গঠন করা হবে। * উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, মন্ত্রী মিশনের পরিকল্পনা মুসলিম লিগ মেনে নিলেও কংগ্রেস তা মেনে নেয়নি তবে পরবর্তীকালে কংগ্রেস অন্তবর্তী সরকারে যোগ দিতেও সম্মত হয়েছিল।

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মার্চ লর্ড মাউন্টব্যাটেন বড়োলাট হিসেবে কার্যভার গ্রহণের পর ভারতের অখন্ডতা রক্ষার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

এমতাবস্থায় তিনি ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৩ জুন ভারত ভাগের যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেন তা 'মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা' নামে পরিচিত। মাউন্টব্যাটেনের পরিকল্পনা লর্ড মাউন্টব্যাটেনের পরিকল্পনা বা প্রস্তাবে উল্লিখিত ছিল—

1 ভারতকে ভাগ করে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি ডোমিনিয়ন সৃষ্টি করা হবে। ডোমিনিয়ন দুটি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ পরিচালনা করবে। [2] পাকিস্তান গঠিত হবে পশ্চিম পাঞ্চাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, পূর্ব বাংলা, বালুচিস্তান প্রভৃতি মুসলমানপ্রধান প্রদেশ নিয়ে।

3 সীমান্ত-নির্ধারণ কমিশনের মাধ্যমে পারাব ও বাংলাকে দুই ডোমিনিয়ন এর মধ্যে ভাগ করা হবে।

[4] দেশীয় রাজ্যগুলি ইচ্ছে করলে যে-কোনো ডোমিনিয়ন-এ যোগ দিতে পারবে।

5 প্রত্যেক ডোমিনিয়ন নিজ গণপরিষদের মাধ্যমে সংবিধান রচনা করবে।

● প্রতিক্রিয়া: মহাত্মা গান্ধি, জওহরলাল নেহরু প্রমুখ কংগ্রেস নেতা ভারত ভাগের বিরোধিতা করেছিলেন কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার হাত থেকে বাঁচার জন্য কংগ্রেস এই পরিকল্পনা মেনে নিয়েছিল। লর্ড মাউন্টব্যাটেন

অপরপক্ষে মহম্মদ আলি জিন্নাহ্ সমগ্র পাঞ্জাব ও বাংলাকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করতে না পেরে একে বিকলাঙ্গ ও কীটদগ্ধ' বলে উল্লেখ করেন। পরিশেষে বলা যায়, এই পরিকল্পনা অনুসারে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান ও ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে।

১৯৪০ - ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে দেশ ভাগের ধারণা: ১৯৪০: ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশনে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ শুরু হয়।

১৯৪১ : ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জিন্নাহ বড়োলাটকেনসর্বপ্রকারে সাহায্যের বিনিময়ে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবি করেন।

১৯৪২ : ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম লিগ 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনেরবিরোধিতা করে। এই সময় মুসলিম লিগের বক্তব্য ছিল 'দেশ ভাগ করো এবংভারত ছাড়ো'।

১৯৪৪: ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেস নেতা সি. রাজাগোপালাচারী জিন্নাহর কাছে একটি সমঝোতা প্রস্তাব পেশ করেন। কিন্তু এতে সরাসরি পাকিস্তানের স্বীকৃতি না থাকায় জিন্নাহ এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
১৯৪৫ - ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে বড়োলাট ওয়াভেল আহত সর্বদলীয় সিমলা বৈঠকে জিন্নাহ 'পাকিস্তান' গঠনের দাবীতে অটল থাকেন।
১৯৪৮ * : ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম লিগ দেশভাগের আভাস থাকায় মন্ত্রী-মিশনের পরিকল্পনা মেনে নেয়। ওই বছর আগস্টে জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে মন্ত্রীসভা গঠনে বিষয়কে কেন্দ্র করে মুসলিম লিগ প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক দেয়।

অন্তবর্তী সরকারে যোগদান : ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ২ সেপ্টেম্বর নেহরুর নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে। মুসলিম লিগের ৫ জন সদস্য যোগদান করেছিল, কিন্তু তারা পাকিস্তান গঠনের দাবি থেকে সরে যায়নি। ১৯৪৭* : মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা : ভারতের এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে বড়োলাট লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন ২৪ মার্চ ভারত ভাগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি : ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগস্ট ভারতবর্ষ দ্বিখণ্ডিত হয়ে 'পাকিস্তান' নামে একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠিত হয়।

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট ভারত দীর্ঘদিনের কাঙ্খিত স্বাধীনতা লাভ করেছিল। কিন্তু এর পাশাপাশি ভারত দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়েছিল। এই ভারত বিভাজন অনিবার্য ছিল 'কিনা' তা নিয়ে মতভেদ চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী আছে।
1 দায়িত্ব মুসলিম লিগের নেতা মহম্মদ আলি জিন্নাহ ভারত বিভাজনকে অনিবার্য করেছিলেন। বলা হয় 'পাকিস্তান হল জিন্নাহর একক অবদান। আবার অনেকে এর বিরোধিতাওকরেন।

[2] ব্রিটিশ সরকারের দায়িত্ব ভারতে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িকতা। বৃদ্ধিতে ব্রিটিশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাদের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ভাগ করো ও শাসন করো' নীতি এর জন্য দায়ী ছিল।

13 কংগ্রেসের দায়িত্ব অনেকে বলেন কংগ্রেস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য দেশ ভাগের পরিকল্পনাকে মেনে নিয়েছিল। পরিশেষে বলা যায় যে, সেই সময় দেশের যা পরিস্থিতি ছিল তাতে ভারত বিভাজন ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভারত বিভাজনকে অনিবার্য করে তুলেছিল।

ভারতে ব্রিটিশ আমলের বিষময় ফল ছিল সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উদ্ভব ও বিস্তার। ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এর সূচনা হয়েছিল। এর চূড়ান্ত পরিণতি ছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজন।

» ा রাজনীতির গতি ও ভারত বিভাজন : । সৈয়দ আহমদ খানের ভূমিকা - ভারতে সাম্প্রদায়িকতা ও দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রসারে সৈয়দ আহমদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সৈয়দ আহমদ প্রচার করেছিলেন যে হিন্দু ও মুসলমান শুধুমাত্র দুটি পৃথক জাতি নয় – এরা পরস্পর বিরোধী ও যুদ্ধরত দুটি পৃথক জাতি।

* ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় তিন দিন করে চলা এই নামায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। এই আশার আগুন কলকাতা ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে বোম্বাই (১ সেপ্টেম্বর) মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠা। গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জন হিন্দু-মুসলমান বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা করেছিলেন।

এই সময় ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার নবাব সালিমউল্লাহ-র নেতৃত্বে সর্বভারতীয় মুসলিম লিগ' প্রতিষ্ঠিত হয়। © মর্গে মিন্টো সংস্কার (১৯০১) মুসলিম সম্প্রদায় ব্রিটিশ সরকার মর্লে-মিন্টো শাসন সংস্কারের মাধ্যমে মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক নির্বাচনের নীতি গ্রহণ করে। এর ফলে প্রশাসনিক © খিলাফৎ আন্দোলন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতীয় মুসলমানরা তুরস্কের খলিফার মর্যাদা রক্ষা ক্ষেত্রেও দ্বিজাতি তত্ত্বের আমদানি করা হয়।

করার জন্য খিলাফৎ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। মহাত্মা গান্ধি খিলাফৎ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এবং অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে খিলাফৎ আন্দোলনকে যুক্ত করে জাতীয় আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছিলেন। কিন্তু খিলাফতিরা গান্ধিজির অহিংস নীতিকে গ্রহণ করেনি, তারা গান্ধিজির জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে জনগণের কাছে পৌঁছাতে চেষ্টা করেছিলেন। ফলে ১৯২২-২৩ খ্রিস্টাব্দে অনেক জায়গায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। অবশ্য এজন্য হিন্দু সংগঠনগুলিও দায়ী ছিল

সর্বভারতীয় মুসলিম লি জিন্নাহ-র চোদ্দ দফা দাবি। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ আলি জিন্নাহ মুসলমানদের জন্য চৌদ্দ দফা দাবি ঘোষণা করেন। এর ফলে। দ্বিজাতি তত্ত্বের ধারণা আরও শক্তিশালী হয়।

সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা (১৯৩২ খ্রিঃ) : ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র‍্যামসে ম্যাকডোনাল্ড সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতি ঘোষণা করেন। এতে মুসলিম, শিখ, হরিজন প্রভৃতি বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক নির্বাচনের নীতি ঘোষণা করেন। এর ফলে মুসলিম সাম্প্রদায়িক রাজনীতি উৎসাহিত হয়েছিল। পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের ভাবনা - ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ ইকবাল এবং ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে চৌধুরি রহমৎ আলি ভারতের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলি নিয়ে পৃথক রাষ্ট্র (পাকিস্তান) গঠনের দাবি জানান। মুসলিম লিগের লাহোর প্রস্তাব: ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ২০ মার্চ মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশনে যে পৃথক রাষ্ট্রগঠনের দাবি উত্থাপন করা হয়, তাকে 'লাহোর প্রস্তাব' বা 'পাকিস্তান প্রস্তাব' বলা হয়।

লিগের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১২ আগস্ট কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহরু মন্ত্রীসভা গঠনের আহ্বান জানান। এই সময় ক্ষুদ্ধ মুসলিম লিগ ১৬ আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক দেয় এবং দাঙ্গা শুরু করে। সামনে বামদিক থেকে চৌধুরি রহমৎ আলি, মহম্মদ ইকবাল, খাজা আবদুল রহিম।

ভারত বিভাজন: সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নেতৃবৃন্দ ভারত বিভাজনকে মেনে নিতে বাধ্য হয়।

• লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারত বিভাজনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। ভারতকে বিভাজন করে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র গঠনের কথা ঘোষণা করেন। এর ফলে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান ও ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হয়।

আলিগড় আন্দোলন : ভারতে ব্রিটিশ কোম্পানির

আমলে মুসলিম সমাজ পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ না করে শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। এই অবস্থায় মুসলিম সমাজের ত্রাণকর্তা ছিলেন স্যার সৈয়দ আহমদ খান (১৮১৭-১৮ খ্রি.)। তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের জন্য ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে আলিগড় অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এই আলিগড় কলেজকে কে করে মুসলমান সমাজে যে সংস্কার আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল, তাকে আলিগড় আন্দোলন বলা হয়।

স্যার সৈয়দ আহমদ খান ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে আলিগড়ে মহামেডান অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ * প্রতিষ্ঠা করেন। এই কলেজকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজের সংস্কার আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল বলে একে আলিগড় আন্দোলন বলা হয়।

আলিগড় আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য হল—

মুসলমান সমাজের আধুনিকীকরণ করা। তাই তিনি এখানে ইসলামীয় ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন।

মুসলমান সমাজ যাতে ব্রিটিশ শাসনের সুযোগসুবিধাগুলো ব্যবহার করতে পারে তার চেষ্টা করা। মুসলমান অভিজাত ও শিক্ষিত শ্রেণিকে স্বনির্ভর করা।

মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে একটি গোষ্ঠী মানসিকতা গড়ে তোলা ।

ভারতীয় সমাজে পৃথক্করণের ধারণা তৈরিতে ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দের আদমশুমারির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই গণনায় পরিষ্কার হয় যে, বাংলা ও পাঞ্জাবে জনসংখ্যার অর্ধেকই হল মুসলমান। জনগণনার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকার ব্যক্তির ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়কেই প্রধান বলে মনে করত, ফলে প্রতিটি সম্প্রদায়ের - উন্নয়নের জন্য আলাদা আলাদা ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়কে বড়ো করে দেখতে থাকে এবং যার ফলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সুযোগসুবিধা পাওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরবর্তীকালে সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দিয়েছিল।

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কার্জনের বাংলা ভাগের প্রতিবাদে স্বদেশি আন্দোলন হয়েছিল। স্বদেশি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক প্রভাবিত হয়েছিল।

1 স্বদেশি আন্দোলনকে ঘিরে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক জটিল হয়েছিল। এই সময় বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী হিন্দু নেতারা বলেন যে, হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানদের বেশি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ফলে এই সময় বাঙালি পরিচয়ের পরিবর্তে হিন্দু-মুসলমান পরিচয় বড়ো হয়ে ওঠে।

2 বঙ্গভঙ্গ বিরোধীরা গরিব চাষিদের বিদেশি কাপড় বর্জন করার জন্য জোর করার ফলেও হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক তিক্ত হয়েছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় মুসলমানরা ইসলাম জগতের ধর্মগুরু 'খলিফা'-র মর্যাদা রক্ষার জন্য যে আন্দোলন করেছিল তা খিলাফৎ আন্দোলন' নামে পরিচিত।

• আন্দোলনের লক্ষ্য : খিলাফৎ আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল মূলত

1 মুসলমান জগতের ধর্মগুরু খলিফার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা।

2 ধর্মগুরু খলিফার তুরস্কের সাম্রাজ্য অটুট রাখা।

3 মুসলমানদের পবিত্র তীর্থস্থানগুলির ওপর বিদেশি হস্তক্ষেপ বন্ধ করা।

মুসলমান জগতের ধর্মগুরু হলেন খলিফা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৪-১৮) খলিফা ছিলেন তুরস্কের সুলতান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের পরাজয় ঘটে। ব্রিটিশরা তুর্কি সাম্রাজ্যের অনেকটা দখল করে নেয় ফলে সুলতানের বা খলিফার ক্ষমতাও অনেক কমে যায়। এতে অসন্তুষ্ট হয়ে ভারতীয় মুসলমানরা পবিত্র তীর্থস্থানগুলি ফেরত দেওয়ার জন্য ও খলিফার মর্যাদা রক্ষা করার জন্য খিলাফৎ আন্দোলন শুরু করেছিল।

বহুজাতি অধ্যুষিত ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদ প্রসারের পিছনে একাধিক কারণ ছিল—

1 ব্রিটিশ সরকার শিক্ষা, সরকারি চাকরি ইত্যাদি ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দিতে থাকে। ফলে মুসলিমরা হিন্দুদের মতো সুযোগসুবিধা পেত না, যা তাদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল।

2 মুসলিম সমাজও ইংরেজি শিক্ষাগ্রহণ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিল।

3 ঔপনিবেশিক সরকারের বিভাজন নীতিও সাম্প্রদায়িকতা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদে ইন্ধন জুগিয়েছিল।

4 ব্রিটিশ সরকার ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠা এবং পৃথক জাতির জন্য পৃথক নির্বাচনের অধিকার প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করে

জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করে দিয়েছিল। বাংলার হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যেও বিভেদ তৈরি হয়েছিল। শিক্ষা-দীক্ষা, চাকরি ও রাজনীতির দিক থেকে উন্নত হিন্দু জাতিকে দেখে মুসলিম সম্প্রদায় শঙ্কিত হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকার মুসলিমদের এই আশঙ্কাকে কাজে লাগিয়ে তাদের সামনে নানান সুযোগের সম্ভাবনা তুলে ধরেছিল। ফলে মুসলিম সমাজ কংগ্রেসের থেকে দূরে যেতে থাকে এবং ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার নবাব সালিমউল্লাহ-র নেতৃত্বে সর্বভারতীয় মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠা করে।

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ ভারতে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় মুসলিম লিগের সভাপতি মহম্মদ ইকবাল ‘পাকিস্তান’-এর কথা উল্লেখ করেন।

• ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম লিগের সভাপতির ভাষণে মহম্মদ ইকবাল উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় মুসলিম রাষ্ট্র-র কথা বলেন। অনেকে বলেন, এই ভাষণ থেকেই পাকিস্তান দাবির সূচনা হয়।

• কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঞ্জাবের ছাত্র চৌধুরি রহমৎ আলি মুসলিম অধ্যুষিত পাঁচটি প্রদেশ নিয়ে ‘পাকিস্তান' গঠনের কথা বলেন মহম্মদ ইকবাল

মহম্মদ ইকবাল প্রথম স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের দাবি জানান।

আধুনিক ভারতের একজন খ্যাতনামা উর্দুকবি ছিলেন মহম্মদ ইকবাল। তিনি দার্শনিক ও রাজনীতিক হিসাবেও পরিচিত। মুসলিম লিগের সভাপতি হিসাবে ইকবাল ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, বালুচিস্তান ও কাশ্মীর— এই চারটি প্রদেশ নিয়ে আলাদা মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মানবতাবাদী ইকবাল বিশ্বাস করতেন যে, ভালো কাজ মানুষকে শান্তি ও অমরত্ব প্রদান করে। তাঁর দেশাত্মবোধক কবিতা 'সারে জাঁহা সে আচ্ছা, হিন্দুস্তাঁ হমারা' রচনার জন্য তিনি অধিক পরিচিত।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র‍্যামসে ম্যাকডোনাল্ড ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ আগস্ট ‘সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা'র নীতি ঘোষণা করেন। এতে মুসলিম, খ্রিস্টান, শিখ, অনুন্নত হিন্দুসম্প্রদায়কে পৃথক নির্বাচনের অধিকার দেওয়া হয়েছিল। প্রতিটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য বিধানমণ্ডলীতে কিছু আসন বরাদ্দ করা হয়। এই ঘোষণায় ব্রিটিশ সরকারের বিভাজন ও শাসননীতির প্রতিফলন র‍্যামসে ম্যাকডোনাল্ড ঘটেছিল।

১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ২০ মার্চ লাহোরে মুসলিম লিগের অধিবেশন বসে। এই অধিবেশনে বাংলার ফজলুল হক উত্তর-পশ্চিম ও পূর্ব ভারতের মুসলিমপ্রধান অঞ্চলগুলিকে নিয়ে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবি তোলেন। এই প্রস্তাবের খসড়া রচনা করেছিলেন সিকন্দার হায়াৎ খান। লাহোর অধিবেশনে মুসলিম লিগ কর্তৃক গৃহীত মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের প্রস্তাব লাহোর প্রস্তাব বা পাকিস্তান প্রস্তাব নামে পরিচিত।

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই 'ভারতীয় স্বাধীনতা আইন' ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হয়।

• এটি ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জুলাই রাজকীয় সম্মতি লাভ করে।আইনে পরিণত হয়।

• ভারতীয় স্বাধীনতা আইনের দুটি ধারা হল

1 ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট ভারত ও পাকিস্তানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে।

2 পশ্চিম পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধুপ্রদেশ, বালুচিস্তান, পূর্ববঙ্গ আসামের কিছু অংশ নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হবে।

স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ ছিলেন বিশিষ্ট ব্রিটিশ আইনজীবী। লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারত বিভাগের সময়ে যে সীমান্ত কমিশন গঠন করেছিলেন র‍্যাডক্লিফ ছিলেন তার সভাপতি।

ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত র‍্যাডক্লিফ লাইন নামে পরিচিত। স্যার র‍্যাডক্লিফ অতি অল্প সময়ের মধ্যে ভারত বিভাজনের মানচিত্র তৈরি করেছিলেন। তবে এর অনেক ত্রুটি ছিল। কারণ— ভারত সম্পর্কে র‍্যাডক্লিফের কোনো প্রত্যক্ষ ধারণা ছিল না এবং সাধারণ মানুষের মতামতকেও কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

দ্বিজাতি তত্ত্ব বলতে বোঝায়, ভারতে হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক জাতি। দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রবক্তা ছিলেন স্যার সৈয়দ আহমদ খান, মহম্মদ আলি জিন্নাহ প্রমুখ। এই দ্বিজাতি তত্ত্বের ফলে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে।

চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারি ভারতকে দ্বিখণ্ডিত না করে এবং মুসলিম লিগের দাবি অনেকাংশে মেনে নিয়ে একটি সমাধান সূত্র প্রকাশ করেন (১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ)। এটি 'সি. রাজা গোপালাচারী প্রস্তাব' ('চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী সমাধান সূত্র' বা 'সি. আর. ফর্মুলা') নামে পরিচিত।

1 মুসলিম লিগ কংগ্রেসের স্বাধীনতার দাবিকে সমর্থন করবে। [ 2 মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে গণভোটের মাধ্যমে পৃথক রাষ্ট্রগঠনের মতামত নেওয়া হবে।

ওয়াভেল ভারতের ভাইসরয় ছিলেন।

১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুন বড়োলাট লর্ড ওয়াভেল একটি পরিকল্পনা পেশ করেন। ওয়াভেল পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল যে—

1 ব্রিটিশ সরকার শীঘ্রই ক্ষমতা হস্তান্তর করবে।

2 নতুন সংবিধান রচিত না হওয়া পর্যন্ত ভারতীয়দের নিয়ে একটি অন্তবর্তী সরকার গঠিত হবে।

সিমলা বৈঠক : লর্ড ওয়াভেল তাঁর পরিকল্পনার বিষয়ে আলোচনার জন্য ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ২৫ জুন সিমলায় একটি সর্বদলীয় বৈঠক ডাকেন। একে ‘সিমলা বৈঠক' বলা হয়। ওই বৈঠকে জিন্নাহ পাকিস্তানের দাবিতে অনড় থাকেন। কংগ্রেসের পক্ষেও তাঁর দাবি মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না, ফলে সিমলা বৈঠক ব্যর্থ হয়েছিল।

ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতা সংক্রান্ত আলোচনা করার জন্য ক্যাবিনেট মিশন ভারতে এসেছিল।

ক্যাবিনেট মিশন

ক্যাবিনেট মিশনের পরিকল্পনাগুলি হল—

1 ব্রিটিশ শাসিত ভারত ও দেশীয় রাজ্যগুলিকে নিয়ে একটি যুক্তরাষ্ট্র গঠন করা হবে।

[ 2 প্রদেশগুলি নিজেদের শাসনতন্ত্র নিজেরা রচনা করতে পারবে এবং একই স্বার্থ বিশিষ্ট প্রদেশগুলি জোটবদ্ধ হতে পারবে।

ভারতের বড়োলাট লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারত বিভাগের যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন (১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৩ জুন) তা ‘মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা' নামে খ্যাত। এতে বলা হয়েছিল—ভারতবর্ষকে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রে বিভক্ত করা হবে।

দেশীয় রাজ্যগুলি তাদের ইচ্ছা অনুসারে যে-কোনো রাষ্ট্রে যোগদান করতে পারলে।

১৯৪৭ সালের ৬ জুন উর যে পরিকল্পনা ঘোষণা | June Plan নামেও পরিচিত।

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই 'ভারতীয় স্বাধীনতা আইন' ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হয়।

• এটি ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জুলাই রাজকীয় সম্মতি লাভ করে। আইনে পরিণত হয়।

• ভারতীয় স্বাধীনতা আইনের দুটি ধারা হল

1 ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট ভারত ও পাকিস্তানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে।

2 পশ্চিম পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধুপ্রদেশ,বালুচিস্তান, পূর্ববঙ্গ আসামের কিছু অংশ নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হবে।

স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ ছিলেন বিশিষ্ট ব্রিটিশ আইনজীবী। লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারত বিভাগের সময়ে যে সীমান্ত কমিশন গঠন করেছিলেন র‍্যাডক্লিফ ছিলেন তার সভাপতি।

ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত র‍্যাডক্লিফ লাইন নামে পরিচিত। স্যার র‍্যাডক্লিফ অতি অল্প সময়ের মধ্যে ভারত বিভাজনের মানচিত্র তৈরি করেছিলেন। তবে এর অনেক ত্রুটি ছিল। কারণ— ভারত সম্পর্কে র‍্যাডক্লিফের কোনো প্রত্যক্ষ ধারণা ছিল না এবং সাধারণ মানুষের মতামতকেও কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।