Chapter-9, অন্তঃক্ষরা তন্ত্র ও বয়ঃসন্ধি

উঃ-যেসব গ্রন্থির নিজস্ব কোনো নালিকা নেই, যারা তাদের ক্ষরণ পদার্থকে সরাসরি রক্তস্রোতে মুক্ত করে, তাদের অনাল গ্রন্থি বা অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি বা এন্ডোক্রাইন গ্ল্যান্ড বলে। যেমন—পিটুইটারি, থাইরয়েড, অ্যাড্রিনাল প্রভৃতি।

উঃ-যেসব গ্রন্থির নালিকা থাকে এবং গ্রন্থি নিঃসৃত ক্ষরণ বস্তু নালিকা পথে বাইরে এসে দেহের কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে ক্রিয়া করে, তাদের বহিঃক্ষরা গ্রন্থি বা এক্সোক্রাইন গ্ল্যান্ড বলে।

উদাহরণ: যকৃৎ, লালাগ্রন্থি।

উঃ-যেসব গ্রন্থির মধ্যে অন্তঃক্ষরা ও বহিঃক্ষরা দুধরনের গ্রন্থিকোশ থাকে, অর্থাৎ গ্রন্থিগুলি উৎসেচক ও হরমোন উভয়ই ক্ষরণ করে, তাদের মিশ্র গ্রন্থি বলে।

উদাহরণ : অগ্ন্যাশয়, শুক্রাশয়, ডিম্বাশয়।

উঃ-থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে ক্ষরিত হয়।

♦ এটি থাইরয়েড গ্রন্থির কাজকে নিয়ন্ত্রণ করে।

উঃ-থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোনের দুটি কাজ হল — 1)থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে থাইরক্সিন হরমোন ক্ষরণকে নিয়ন্ত্রণ করা। 2) থাইরয়েড গ্রন্থির বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা।

উঃ-থাইরক্সিন হরমোনের কাজ হল – 1) হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন হারকে বাড়াতে সাহায্য করা। 2) মানুষের শরীরে শক্তি উৎপাদনকে প্রভাবিত কর। 3) শরীরের কোশগুলিতে অক্সিজেনের ব্যবহারকে বাড়িয়ে দেওয়া। 4) দেহের হাড় ও পেশিকে বাড়াতে সাহায্য করা।

উঃ-অগ্ন্যাশয় হল মিশ্র গ্রন্থি।

● এর থেকে ক্ষরিত একটি হরমোনের নাম ইনসুলিন।

উঃ-ইনসুলিনের দুটি কাজ হল— 1) গ্লুকোজের ভাঙন ঘটিয়ে শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করা। 2) গ্লুকোজকে যকৃৎ ও পেশিতে গ্লাইকোজেন হিসেবে সঞ্চয় করে রাখতে সাহায্য করা।

উঃ-অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে ক্ষরিত হরমোন অ্যাড্রিনালিনের কাজ হল— 1) শরীরে শ্বাসকার্যের হারকে বাড়ানো। 2) দেহের তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করা। 3) হৃৎপিণ্ডের সংকোচন ও প্রসারণ ক্ষমতা বাড়ানো। 4) মূত্র উৎপাদনকেও নিয়ন্ত্রণ করা। 5) এই হরমোন ভয়, দ্বন্দ্ব ও পালানোর মনোবৃত্তিকে জরুরি ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রণ করা।

উঃ-ডিম্বাশয় থেকে নিঃসৃত দুইটি হরমোনের নাম— 1) ইস্ট্রোজেন এবং 2) প্রজেস্টেরন।

উঃ-হরমোনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলি নীচে উল্লেখ করা হল—

(1) হরমোন একধরনের রাসায়নিক পদার্থ, যা সাধারণত অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি থেকে ক্ষরিত হয়।

(2) হরমোন রাসায়নিক বার্তাবাহক হিসেবে রাসায়নিক সংযোগ স্থাপনের কাজ করে।

(3) হরমোন খুব ধীরে ধীরে কাজ শুরু করে, কিন্তু কাজের প্রভাব থাকে অনেকক্ষণ | কাজ হয়ে গেলে হরমোন নষ্ট হয়ে যায়।

(4) রক্তে হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে কমে গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী আবার নতুন করে তৈরি হয়।

(5) ধারাবাহিকভাবে রক্তে হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বেশি বা কম থাকলে নানারকম সমস্যা দেখা যায়।

উঃ-যে হরমোন দেহের অন্যান্য অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির কার্যকারিতাকে উদ্দীপিত করে, তাকে ট্রফিক হরমোন বলে |

♦ পিটুইটারির অগ্র খণ্ড থেকে ক্ষরিত হরমোনগুলি হল ট্রফিক হরমোন। যেমন— থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে ক্ষরিত হয়ে থাইরয়েড গ্রন্থির বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে থাইরক্সিন হরমোন ক্ষরণে উদ্দীপনা জোগায় |

উঃ-থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোনের নাম থাইরক্সিন।

থাইরক্সিন হরমোনের কাজ হল— 1) দেহের শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা। 2) হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন হারকে বাড়তে সাহায্য করা।

উঃ-অগ্ন্যাশয় গ্রন্থি হল একপ্রকার মিশ্র গ্রন্থি। এই গ্রন্থির মধ্যে অন্তঃক্ষরা ও বহিঃক্ষরা দু-ধরনের গ্রন্থিকোশ থাকে। মানুষের পাকস্থলীর নীচে ক্ষুদ্রান্ত্রের ডিওডেনামের ‘U’ আকৃতির বাঁক থেকে প্লিহা পর্যন্ত থাকে অগ্ন্যাশয় গ্রন্থি। এই গ্রন্থির নালিকাবিহীন কোশ থেকে ক্ষরিত হয়। ইনসুলিন ও গ্লুকাগন নামক হরমোন এবং নালিকাযুক্ত কোশ থেকে বের হয় উৎসেচক, যা খাবারকে ভাঙতে সাহায্য করে। অগ্ন্যাশয় গ্রন্থি নিঃসৃত ইনসুলিনের প্রভাবে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ঠিক থাকে, ডায়াবেটিস রোগের সম্ভাবনা কমে।

উঃ-ইনসুলিন হরমোনকে অ্যান্টিডায়াবেটিক হরমোন বলে। এইরূপ বলার কারণ ইনসুলিন গ্লুকোজের ভাঙন ঘটিয়ে শক্তি উৎপাদনে সাহায্যের পাশাপাশি গ্লুকোজকে যকৃৎ ও পেশিতে গ্লাইকোজেনরূপে সঞ্চয় করে রাখতে সাহায্য করে। আবার কখনও কখনও প্রোটিন ও ফ্যাট থেকে গ্লুকোজ উৎপাদনে বাধা দেয়। ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ঠিক থাকে ও ডায়াবেটিস রোগের সম্ভাবনা কমে।

♦ইনসুলিন হরমোন অগ্ন্যাশয় গ্রন্থি থেকে ক্ষরিত হয়।

উঃ-পিটুইটারি নিঃসৃত একটি হরমোনের নাম হল সোমাটোট্রফিক হরমোন। সোমাটোট্রফিক হরমোনের কাজ হল আমাদের শরীরের বিভিন্ন পেশি ও হাড়গুলির দৈর্ঘ্য বাড়াতে সাহায্য করে।

অগ্ন্যাশয় গ্রন্থি নিঃসৃত একটি হরমোনের নাম হল ইনসুলিন | ইনসুলিনের কাজ হল রক্তের সাহায্যে গ্লুকোজকে কোশে ঢুকতে সাহায্য করা এবং গ্লুকোজের ভাঙন ঘটিয়ে শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করা।

উঃ-জীবনকুশলতা হল মানুষের এক বিশেষ ধরনের আচরণ, যা তাকে তার নানা চাহিদা পূরণে এবং বিভিন্ন প্রকার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে মোকাবিলা করার সাহস ও উদ্যম জোগায় |

উঃ-নিজের ভালো লাগা, খারাপ লাগা থেকে শুরু করে, আবেগ অনুভূতি গুলিকে চিনে তার নিয়ন্ত্রণে পারদর্শী হয়ে ওঠাকে বলে আত্মসচেতনতা।

উঃ-বয়ঃসন্ধিকালে তৈরি হওয়া মানসিক সমস্যাগুলি হল—

1) নিজের ভালো লাগা, খারাপ লাগা থেকে শুরু করে, বিভিন্ন আবেগ অনুভূতিকে চিনতে না পারা,

2) নিজের প্রতি বিশ্বাস বা আস্থা রাখতে না পারা,

3) কিছু ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে পড়া,

4) অল্পতেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়া ও নিজেকে অন্যদের থেকে সরিয়ে নেওয়া,

5) খারাপ কাজ বা অভ্যাসের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা,

6) অল্পতেই রেগে যাওয়া বা অকারণে কেঁদে ফেলা ইত্যাদি। বয়ঃসন্ধিকালের এইজাতীয় সমস্যাগুলিকে শনাক্ত করে তাদের কার্যকরী সমাধানের পথে অগ্রসর হতে হবে। মানসিক চাপগুলিকে চিনে সেগুলি কমানোর জন্য অনুশীলন করতে হবে | তাহলে বয়ঃসন্ধিকালে তৈরি হওয়া মানসিক সমস্যা থেকে ছেলেমেয়েরা কিছুটা হলেও মুক্ত হবে।

উঃ-বয়ঃসন্ধিতে ছেলেমেয়েদের দৈহিক পরিবর্তনের সাথে সাথে মনের বহু পরিবর্তন ঘটে। তারা নিজেদের উচ্চতা এবং ওজন নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, সবসময় ভাবে অন্যের চেয়ে তারা যেন মোটা হয়ে যাচ্ছে। বয়ঃসন্ধিকালে মুখমণ্ডলে ব্রণ দেখা দেয়। এই নিয়েও তাদের মনে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন আসে। তবে এইসময় থেকেই ছেলেমেয়েদের মধ্যে আত্মসচেতনতা ও স্বাধীন মনোভাববোধ গড়ে ওঠে। তাদের মধ্যে রাগ, অভিমান, দুঃখ, আনন্দ প্রভৃতি অনুভূতিগুলি তৈরি হয়।

উঃ-আমরা জানি, তেরো-চোদ্দ বছর বয়সে ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আচরণের সমস্যা হয়। যেমন— 1)একটুতেই রেগে যাওয়া, 2) অকারণে কেঁদে ফেলা, 3) স্বার্থপরতা, 4) মারামারি করা, 5) হিংসা  করা, 6) সন্দেহপ্রবণতা, 7) অভিমানী হওয়া, ৪) মনঃসংযোগের অভাব, 9) হতাশায় ভোগা ইত্যাদি।

এইজাতীয় সমস্যা থাকলে যা করা দরকার, তা হল—1)  পিতামাতাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্য-সদস্যাদের সঙ্গে খোলা মনে মেলামেশা করা, 2) বন্ধুদের সঙ্গে প্রীতি ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তোলা, 3) প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা, 4) জীবনকুশলতার চর্চা করা, 5) সম্ভব হলে দৈনিক আট-দশ মিনিট ধ্যান করা।

উঃ-1) রাগ: এই অনুভূতি বা আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাগের কারণগুলিকে চিনে সেগুলি নিয়ন্ত্রণে পারদর্শী হয়ে উঠতে হবে। বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার মাধ্যমে ওই কারণগুলিকে মন থেকে অপসারিত করতে হবে।

2) ভয়: অহেতুক ভীত হলে চলবে না। ভয়ের উৎস অনুসন্ধান করে উপযুক্ত যুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কার্যকরী সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।

3) কান্না: মানসিক কষ্ট থেকে কান্না আসে | মনের জোর বাড়াতে হবে। মানসিক কষ্টের উৎস অনুসন্ধান করে সঠিক যুক্তি দিয়ে সমাধানের উপায় বের করতে হবে।

উঃ-1) হতাশা : ব্যর্থতার কারণে মানুষের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। তাই হতাশা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করে, সেগুলি থেকে উপযুক্ত শিক্ষা নিতে হবে। এর জন্য মনের জোর বাড়াতে হবে।

2) ক্ষোভ : নিজের খারাপ লাগা থেকে শুরু করে, ক্ষোভের অনুভূতিকে চিনে তার নিয়ন্ত্রণে পারদর্শী হয়ে উঠতে হবে। নিজের মধ্যে বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার বিকাশ ঘটাতে হবে। এ ছাড়া পারস্পরিক সম্পর্ক সুন্দর করে তুলতে হবে।

3) আনন্দ : পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করে সবার সঙ্গে মনের অনুভূতি বা আবেগগুলিকে ভাগ করে নিতে হবে।

উঃ- 1) তৃপ্তি: তৃপ্তি অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে, এটিকে প্রিয়জন, বন্ধুবান্ধব ও শিক্ষক-শিক্ষিকার সঙ্গে ভাগ করে নিতে হবে।

2) অভিমান: এটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে নিজের ইচ্ছে বা চাহিদার বিষয়গুলি প্রিয়জনদের কাছে, যেমন—বাবা-মা, ভাই-বোন, শিক্ষক-শিক্ষিকার কাছে প্রকাশ করতে হবেও নিজের মধ্যে সৃজনশীল মনোভাব গড়ে তুলতে হবে।

3) দুঃখ: মনের অনুভূতিকে চেপে না রেখে তাকে প্রকাশ করতে হবে। বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে অংশগ্রহণ করলেও দুঃখ নিয়ন্ত্রিত হয়।

উঃ-বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিকল্পিত দশটি কেন্দ্রীয় জীবনকুশলতা হল—

1) আত্মসচেতনতা: নিজের পছন্দ-অপছন্দ, আবেগ, অনুভূতি প্রভৃতিতে নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা অর্জন করা।

2) বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা: যে-কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য সঠিকভাে চিন্তা করা ও তা মোকাবিলার জন্য অগ্রসর হওয়া।

3) সিদ্ধান্ত নেওয়া: সমস্যা সমাধানের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।

4) সমস্যা দূর করা: সময়মতো উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দ্বারা কার্যকর সমাধানের উপায় নির্ধারণ করে প্রয়োগ করা।

5) সৃজনশীল চিন্তা: যে-কোনো ধরনের সৃজনশীল কাজে উদ্যোগী হওয়া এবং সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা।

6) পারস্পরিক সংযোগ স্থাপন: অন্যের বক্তব্য ধৈর্য ধরে শোনা এবং প্রয়োজন মতো উত্তরদানের মাধ্যমে সংযোগস্থাপন করা।

7) পারস্পরিক সম্পর্ক: পরিবারের অন্যান্য সদস্য, প্রতিবেশী ও অন্যান্য মানুষজনদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা।

8) সমানুভূতি: অপরের সমস্যার সঙ্গে নিজেকে শামিল করে তার অনুভূতিগুলি বোঝার চেষ্টা করা এবং সঠিকভাবে প্রকাশ করা।

9) মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ: নিজের মনের ওপর তৈরি হওয়া চাপগুলিকে চিনে কীভাবে সেগুলিকে কমানো যায় তার অনুশীলন করা।

10) আবেগ নিয়ন্ত্রণ: নিজের বিভিন্ন অনুভূতিগুলি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং যথাযথভাবে প্রকাশ করা।