Chapter-9, উত্তর আমেরিকা

উত্তর আমেরিকার উত্তরের হ্রদ অঞ্চল, সমগ্র পূর্বের উচ্চভূমি অঞ্চল এবং উপকূলভাগ নাতিশীতোয় মিশ্র অরণ্য অঞ্চলের অন্তর্গত। এখানে প্রধানত ওক, ম্যাপল, এলম, অ্যাশ প্রভৃতি পাতাঝরা গাছের অরণ্য দেখা যায়। শীতের প্রারম্ভে, শরৎকালে গাছের পাতাগুলি লাল, হলদে বা কমলা রঙের হয়ে যায় এবং তারপর ঝরে পড়ে। এজন্য শরৎকালকে এখানে Fall বলা হয়।

ক্যালিফোর্নিয়া উপত্যকার দক্ষিণ-পূর্বাংশের অংশবিশেষ, সমুদ্র সম থেকে প্রায় 90 মিটার নীচে অবস্থিত। একেই মৃত্যু উপত্যকা (Death Valley) বলে। এটি উত্তর আমেরিকার উন্নতম (56°সে) স্থান এবং পশ্চিম গোলার্ধের নিম্নতম স্থান।

অ্যাপালেশিয়ান পর্বতের প্রাচীন অংশ পিডমন্ট মালভূমিরূপে অবস্থান করছে। পিডমন্ট মালভূমির পূর্বাংশ খাড়া চালরূপে নেমে গেছে। এই খাড়া চালের যে রেখা বরাবর অনেকগুলি জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়েছে, তাকে প্রপাতরেখা বলে ।

পিডমন্ট কথার অর্থ হল পাদদেশ। উত্তর আমেরিকার অ্যাপালেশিয়ান পর্বতের প্রাচীন অংশ পিডমন্ট মালভূমিরূপে অবস্থান করে। এ ছাড়া, কাম্বারল্যান্ড মালভূমিও একটি পিডমন্ট মালভূমির উদাহরণ।

উত্তর আমেরিকার উত্তরাংশের জলবায়ু শীতল তুন্দ্রা প্রকৃতির, দক্ষিণাংশের জলবায়ু ক্রান্তীয় প্রকৃতির। এ ছাড়া মধ্যভাগে নাতিশীতো প্রকৃতির জলবায়ু দেখা যায়।

অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশগত সীমা: উত্তর আমেরিকা মহাদেশ 7° উত্তর (পানামার দক্ষিণ সীমা) থেকে 840 উত্তর অক্ষাংশ (গ্রিনল্যান্ডের উত্তর সীমা) এবং 20° পশ্চিম থেকে 173° পশ্চিম দ্রাঘিমার মধ্যে অবস্থিত।
ভূখণ্ডগত সীমা: উত্তর আমেরিকার পূর্ব সীমায় আছে আটলান্টিক মহাসাগর, পশ্চিম সীমায় প্রশান্ত মহাসাগর, উত্তর সীমায় সুমেরু মহাসাগর এবং দক্ষিণ সীমায় প্রশান্ত মহাসাগর, মেক্সিকো উপসাগর ও পানামা খাল। উত্তর-পশ্চিম সীমায় অবস্থিত বেরিং প্রণালী উত্তর আমেরিকাকে এশিয়া মহাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। দক্ষিণ সীমায় অবস্থিত পানামা খাল এই মহাদেশকে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।

উত্তর আমেরিকার প্রধান নদী হল মিসিসিপি। এটি ইটাস্কা হ্রদ থেকে উৎপন্ন হয়ে মধ্যভাগের সমভূমির ওপর দিয়ে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে সবশেষে মেক্সিকো উপসাগরে মিশেছে। মিসিসিপির উভয় তীরের উপনদীগুলি হল মিনেসোটা, ভেল সেইিনস, মিসৌরি (প্রধান উপনদী),

1 কানাডার উত্তর-পশ্চিমে এডিকট পর্বত ও আলাস্কা রেঞ্জের মধ্যবর্তী স্থানে আছে ইউকন মালভূমি এবং এর দক্ষিণ-পশ্চিমে আছে কলম্বিয়া মালভূমি । 2 আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমভাগে আছে আইডাহো-স্নেক মালভূমি, এর দক্ষিণে গ্রেট বেসিন (অবনমিত অঞ্চল) এবং আরও দক্ষিণে কলোরাডো মালভূমি 3) কলোরাডো মালভূমির দক্ষিণে মেক্সিকোতে আছে মেক্সিকো মালভূমি। @ সর্বাপেক্ষা দক্ষিণে মধ্য আমেরিকায় আছে মধ্য আমেরিকার মালভূমি ।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমে শুষ্ক কলোরাডো মালভূমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত কলোরাডো নদীতে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন গড়ে উঠেছে। এটি পৃথিবীর দীর্ঘতম ও বৃহত্তম গিরিখাত। 2 ক্যালিফোর্নিয়ার পূর্বাংশে সিয়েরা নেভাডা ও কোস্ট রেঞ্জের মাঝখানে আছে ক্যালিফোর্নিয়া উপত্যকা। সিয়েরা নেভাডার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আছে বিখ্যাত মৃত্যু উপত্যকা (Death Valley)। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় 90 মিটার নীচে অবস্থিত। মৃত্যু উপত্যকা উত্তর আমেরিকার উন্নতম ( 56 °সে) এবং পশ্চিম গোলার্ধের নিম্নতম স্থান।

" উত্তর আমেরিকার চারপাশের উপকূলেই সমভূমি আছে। তবে পক্ষিল ও দক্ষিণ-পূর্বের মেক্সিকো উপসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলবর্তী সমভূমি ছাড়া অধিকাংশ উপকূলের সমভূমি সংকীৰ্ণ । এই উপকূলেই আছে বিভিন্ন লবণাক্ত জলাভূমি, লেগুন, বদ্বীপ ইত্যাদি। উত্তর আমেরিকার উপকূলের সমভূমির সর্বাধিক উচ্চতা 200 মিটারের কম।

উত্তর আমেরিকার উন্নতা: মহাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশে গ্রীষ্মকালে সবচেয়ে বেশি উষ্ণতা (গড়ে প্রায় 32 °সে) থাকে এবং ক্রমশ উত্তরদিকে উম্নতা কমতে থাকে। শীতকালে মহাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে উম্নতা থাকে মাঝারি (16°সে থেকে 21°সে)। এখানকার উত্তরাংশের জলবায়ু শীতল তুন্দ্ৰা প্রকৃতির, দক্ষিণাংশের জলবায়ু ক্রান্তীয় প্রকৃতির এবং মধ্যভাগের জলবায়ু নাতিশীতোয় প্রকৃতির।

সমগ্র আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের শতকরা প্রায় 75 ভাগ আকরিক লোহা সুপিরিয়র হ্রদের পশ্চিম ও দক্ষিণের এলাকা থেকে আহরিত হয়। এখানকার শিকাগো, গ্যারি, বাফেলো, ডুলুথ, ক্লিভল্যান্ড প্রভৃতি শিল্পকেন্দ্রগুলির প্রয়োজনীয় কয়লা আনার জন্য যে জাহাজগুলি পিটসবার্গ, পশ্চিম ভার্জিনিয়া ও অ্যাপালেশিয়ান অঞ্চলে যায়, তারা যাওয়ার সময় আকরিক লোহা বহন করে নিয়ে যায় এবং ফেরার সময় কয়লা ভরতি করে আনে। এই পদ্ধতিতে পরিবহণ খরচ দুটি উৎপাদক সংস্থার মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। একেই পরিবহণের দোলকনীতি বা দোলকপ্ৰথা বলে।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের হ্রদ অঞ্চলে অবস্থিত হ্রদ পঞ্চক—সুপিরিয়র, মিশিগান, হুরন, ইরি ও অন্টারিও পরস্পর সেন্ট লরেন্স নদীর দ্বারা যুক্ত হলেও এরা একই সমতলে অবস্থিত না হওয়ার জন্য একাধিক জলপ্রপাতের সৃষ্টি হয়েছে | এই অঞ্চলেই ইরি ও অন্টারিও হ্রদের মাঝখানে সৃষ্টি হয়েছে পৃথিবীর বিখ্যাত নায়াগ্রা জলপ্রপাত | ইরি হ্রদ থেকে অন্টারিও হ্রদে জাহাজ চলাচলের জন্য নায়াগ্রা জলপ্রপাতকে এড়িয়ে ওয়েল্যান্ড খাল কাটা হয়েছে।

হ্রদ অঞ্চলের জলবায়ুতে নানা বৈচিত্র্য দেখা যায়, যেমন- হ্রদ অঞ্চলের জলবায়ু সাধারণভাবে শীতল নাতিশীতোয় প্রকৃতির অর্থাৎ শীতের প্রভাব বেশি। 2 গ্রীষ্মকালে এখানকার সর্বোচ্চ উন্নতা হয় গড়ে 17 °সে থেকে 23 °সে কিন্তু শীতকালে সর্বনিম্ন উন্নতা হিমাঙ্কের অনেক নীচে নেমে যায় এবং সর্বনিম্ন উন্নতা হয় গড়ে – 3 °সে থেকে - 13°সে। ও শীতকালে ব্যাপক তুষারপাত হওয়ায় সমগ্র হ্রদ অঞ্চল সাময়িকভাবে বরফে ঢাকা পড়ে যায় | 4 এখানে বৃষ্টিপাত হয় বছরে গড়ে 75 থেকে 80 সেমি এবং এর মধ্যে বেশিরভাগ বৃষ্টিপাত গ্রীষ্মকালেই হয়। O হ্রদ অঞ্চলে শীত ও গ্রীষ্মের উয়তার পার্থক্য খুব বেশি হয় ।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের হ্রদ অঞ্চলের পরিবহণ ব্যবস্থা খুবই উন্নত। এখানে রেলপথ ও সড়কপথ জালের মতো বিস্তার লাভ করেছে। এ ছাড়া, প্রায় প্রতিটি শহরই বিমানপথে যুক্ত। এখানকার শিকাগো ও হেয়ার পৃথিবীর তৃতীয় কর্মব্যস্ত বিমানবন্দর। হ্রদ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নতিতে সেন্ট লরেন্স নদীর মাধ্যমে সৃষ্ট জলপথের গুরুত্বও অপরিসীম |

ভারতে গুজরাত রাজ্য পশুপালন ও খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। গুজরাতের যেখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম সেখানে খুব ভালো কৃষিকাজ করা যায় না, তাই ঘাস জন্মায় ওই ঘাসজমির ওপর নির্ভর করে উত্তর ও পশ্চিম গুজরাতে ব্যাপকভাবে পশুপালন করা হয় | এখানকার সানন্দ, ওয়াভেল প্রভৃতি অঞ্চলে ব্যাপকভাবে গোরু, মহিষ প্রতিপালন করা হয়। এদের দুধের ওপর নির্ভর করে এশিয়ার বৃহত্তম ‘গুজরাত কো-অপারেটিভ সোসাইটি” গঠিত হয়েছে। এখানে দুধ প্রক্রিয়াকরণ এবং গুঁড়ো দুধ, ছানা, পনির, মাখন, চিজ, চকোলেট, ঘনদুধ, আইসক্রিম, দই ও অন্যান্য দুগ্ধজাত দ্রব্যের নানা কারখানা গড়ে উঠেছে।

উত্তর আমেরিকা মহাদেশের কিছুটা উত্তর-পূর্বাংশে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সীমান্তে আছে পাঁচটি বড়ো হ্রদ— সুপিরিয়র, 2 মিশিগান, ও হুরন, 4 ইরি ও 5 অন্টারিও । এই পাঁচটি বড়ো হ্রদের মধ্যে একমাত্র মিশিগান সম্পূর্ণভাবে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অবস্থিত। বাকি চারটি হ্রদের মাঝখান দিয়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সীমান্ত প্রসারিত হয়েছে | আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের হ্রদ অঞ্চল বলতে এই পাঁচটি বড়ো হ্রদের দক্ষিণ তীরের এলাকাসমূহকে বোঝায়। অঞ্চলটি (হ্রদ-সংলগ্ন) আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের আটটি রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত ও সর্বাপেক্ষা জনবহুল এলাকা।

পঞ্চছদ উৎপত্তির স্বীকৃত মত: আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাংশের হ্রদ অঞ্চল প্রকৃতপক্ষে একটি নিম্নভূমি তুষারযুগ (Ice Age)-এ এখানকার সমগ্র এলাকা বরফে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। এই যুগের শেষের দিকে এই অঞ্চলের বরফ গলে গেলেও জল বেরোনোর কোনো পথ ছিল না। কারণ পূর্ব দিকে সেন্ট লরেন্স নদীর অববাহিকায় তখনও বরফ জমে ছিল। এর ফলে ওই নিম্নভূমির যেসব এলাকার গভীরতা বেশি ছিল, সেখানে জল জমে ওইসব বড়ো বড়ো হ্রদ সৃষ্টি হয়। আগে হ্রদগুলির জল উপচে পড়ে দক্ষিণ দিকে মিসিসিপি নদী দিয়ে বাহিত হয়ে মেক্সিকো উপসাগরে এবং মোহাওক নদী দিয়ে বয়ে গিয়ে উত্তর দিকে হাডসন উপসাগরে চলে যেত। তবে সেন্ট লরেন্স অববাহিকা তুষারমুক্ত হওয়ার পর থেকেই পঞ্চ হ্রদের অতিরিক্ত জল সেন্ট লরেন্স নদীর মাধ্যমে পূর্ব দিকে আটলান্টিক মহাসাগরে গিয়ে পড়েছে। উৎপত্তির অন্যান্য মত: অপর একটি মতে, ভূ-আলোড়নের ফলে গঠিত অপেক্ষাকৃত নাচু স্থানগুলিতে জল জমে পরবর্তীকালে এই পাঁচটি হ্রদ সৃষ্টি হয়েছে।

হ্রদ অঞ্চলের ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্যগুলি হল 1 এখানকার ভূমিরূপ সাধারণভাবে সমতল এবং হ্রদ অঞ্চলটি মধ্যভাগের সমভূমি অঞ্চলের অন্তর্গত। 2 এখানকার উচ্চতা কোথাও 180 মিটারের বেশি না হলেও কোনো কোনো জায়গায় হিমবাহবাহিত নুড়ি, পাথর প্রভৃতি সঞ্চিত হওয়ার ফলে ভূমিতে কিছুটা ঢেউ খেলানো ভাব লক্ষ করা যায়। 3 বিস্তীর্ণ সমভূমির মাঝে মাঝে উঁচু ভূমিও লক্ষ করা যায়। 4 পূর্বাংশে ইরি ও অন্টারিও হ্রদের মাঝখানে ভূমির ঢাল খুব খাড়া হয়, প্রায় 75 মিটার। একে বলে নায়াগ্রা ভৃগু (Escarpment) বা খাড়া ঢাল এবং এখানেই পৃথিবীবিখ্যাত নায়াগ্রা জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়েছে ।

হ্রদ অঞ্চলের প্রধান নদীর নাম সেন্ট লরেন্স। নদীটি সুপিরিয়র, মিশিগান, হুরন, ইরি ও অন্টারিও হ্রদের মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়ে পূর্ব দিকে সেন্ট লরেন্স উপসাগরে পড়েছে। তবে বিভিন্ন স্থানে এর নাম আলাদা, যেমন— 1 সুপিরিয়র ও হুরন হ্রদের মাঝখানে সেন্ট মেরি নদী, 2 হুরন ও ইরি হ্রদের মাঝখানে সেন্ট ক্লেয়ার নদী এবং ও ইরি ও অন্টারিও হ্রদের মাঝে রয়েছে নায়াগ্রা নদী। এখানেই আছে 51 মিটার উঁচু ও 426 মিটার চওড়া নায়াগ্রা জলপ্রপাত। এ ছাড়া, ওহায়ো, ইলিনয় প্রভৃতি নদীও এখানে প্রবাহিত হয়েছে ।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের হ্রদ অঞ্চলে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করা হয়। এ ছাড়া বিস্তীর্ণ তরঙ্গায়িত সমতলভূমি, 2 পরিমিত বৃষ্টিপাত, ও উর্বর চারনোজেম মাটি, 1 আধুনিক পদ্ধতিতে চাষের সুযোগ, 2 শস্যাবর্তন পদ্ধতির প্রয়োগ, 6 ঘন জনবসতির জন্য কৃষিজ ফসলের ব্যাপক চাহিদা ও কৃষি শ্রমিকের সহজলভ্যতা, O হ্রদগুলি থেকে সেচের জল পাওয়ার সুবিধা, ও উন্নত পরিবহণ ব্যবস্থা প্রভৃতি সুযোগসুবিধাগুলির জন্য অঞ্চলটি কৃষিকাজে উন্নত ।

হ্রদ অঞ্চলের প্রধান কৃষিজ ফসলগুলি হল -1 গম, 2 আলু, ও ওট (জ), 4 যব, 5 রাই (তৈলবীজ), 6 বিট, 7 বিভিন্ন প্রকার ফল (আপেল, আঙুর, নাসপাতি ইত্যাদি), ও ভুট্টা প্রভৃতি । হ্রদ অঞ্চলের দক্ষিণ দিকের বিখ্যাত ভুট্টা বলয়ে পশুখাদ্য হিসেবে ভুট্টার চাষ করা হয়। ভুট্টা বলয়ের উত্তরাংশের তৃণভূমিতে হে, ক্লোভার প্রভৃতি ঘাসের চাষ করা হয়।

কানাডীয় শিল্ড অঞ্চলে প্রাচীনযুগের গ্রানাইটজাতীয় শিলা থেকে হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে মৃত্তিকার সৃষ্টি হয়েছে। এখানকার অধিকাংশ জায়গায় মাটির স্তর খুব পাতলা অর্থাৎ অগভীর । তবে হাডসন উপসাগরের দক্ষিণাংশে কিছুটা উর্বর কাদামাটি আছে। এ ছাড়া, দক্ষিণ-পূর্বাংশে সেন্ট লরেন্স নদী উপত্যকা-সংলগ্ন এলাকার মাটিও কিছুটা উর্বর। কানাডীয় শিশু অঞ্চলের মধ্যভাগে অনুর্বর পড়সল মৃত্তিকা দেখা যায়।

বছরের অধিকাংশ সময়েই হিমাঙ্কের নীচে উন্নতা এবং ব্যাপক তুষারপাতের জন্য শিল্ড অঞ্চলে চাষের মরশুম স্বল্পস্থায়ী। শুধু হাডসন উপসাগরের দক্ষিণাংশ এবং সেন্ট লরেন্স নদী উপত্যকা-সংলগ্ন এলাকা কিছুটা উস্ন ও উর্বর চারনোজেম মৃত্তিকা সমৃদ্ধ হওয়ায় এখানে কিছু পরিমাণে গম, যব, আলু, ওট, বিট প্রভৃতি ফসলের চাষ করা হয়।

কানাডীয় শিল্ড অঞ্চলের বনভূমিতে নানা ধরনের লোমযুক্ত জীবজন্তু দেখা যায়, যেমন—খ্যাকশিয়াল, ভোঁদড়, লিংক্স, মারটিন প্রভৃতি। এইসব জন্তুর দীর্ঘলোমযুক্ত চামড়া এই অঞ্চলের অতি মূল্যবান সম্পদ। তুন্দ্ৰা জলবায়ুর প্রভাবাধীন অঞ্চলগুলিতে দীর্ঘলোমযুক্ত হরিণ, ভালুক, নেকড়ে, লোমশ কুকুর এবং অসংখ্য পাখি দেখা যায়। এ ছাড়াও, জলভাগে রয়েছে সিন্ধুঘোটক, সিল, তিমি প্রভৃতি প্রাণী। এখানে মশা ও মাছির উপদ্রবও রয়েছে।

কিছুটা ‘V' আকৃতিবিশিষ্ট অতি প্রাচীন একটি মালভূমি বা উচ্চভূমি কানাডার উত্তর-পূর্বভাগে হাডসন উপসাগরকে পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণে বেষ্টন করে আছে, যা কানাডীয় শিল্ড অঞ্চল নামে পরিচিত। এর আর-এক নাম লরেন্সীয় শিল্ড অঞ্চল (Laurentian Shield)। এই অঞ্চলটি পূর্বে 55° পশ্চিম (ল্যাব্রাডর উচ্চভূমি) থেকে পশ্চিমে 120° পশ্চিম দ্রাঘিমা (গ্রেট বিয়ার হ্রদ) এবং দক্ষিণে 45° উত্তর (অন্টারিও হ্রদ) থেকে উত্তরে 82° উত্তর অক্ষাংশ (এলিসমেয়ার দ্বীপের উত্তর উপকূল) পর্যন্ত বিস্তৃত

কানাডীয় শিল্ড অঞ্চলের ক্ষেত্রমান প্রায় 45 লক্ষ বর্গকিলোমিটার, যা ভারতের ক্ষেত্রমানের প্রায় দেড় গুণ। এই অঞ্চলটির অধিকাংশ কানাডায় বিস্তৃত থাকলেও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সুপিরিয়র হ্রদের দক্ষিণ ও পশ্চিমের কিছু অংশ এই অঞ্চলের অন্তর্গত।

প্রাচীন নিম্ন মালভূমি বলা যায় এবং  কানাডীয় শিল্ড অঞ্চলের ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলি হল – ভূপ্রকৃতি অনুসারে অঞ্চলটিকে এখানকার ভূমি তরঙ্গায়িত কঠিন শিলা দ্বারা গঠিত, ও অঞ্চলটির বহু জায়গাতেই হিমবাহের ক্ষয় ও সঞ্চয় কার্যের প্রভাব লক্ষ করা যায় এবং এজন্য অঞ্চলটির উচ্চতা বেশ কমে গিয়েছে। অঞ্চলটির পূর্বাংশের গড় উচ্চতা প্রায় 900 মিটার হলেও সামগ্রিকভাবে কানাডীয় শিল্ড অঞ্চলের গড় উচ্চতা প্রায় 350 মিটার, ও মহাদেশীয় হিমবাহের ক্ষয় কার্যের ফলেই এখানে বহু ছোটো বড়ো হ্রদ, যেমন—গ্রেট বিয়ার, গ্রেট স্লেভ, উইনিপেগ, আথাবাঙ্কা,  রেইনডিয়ার প্রভৃতি সৃষ্টি হয়েছে। 4 অঞ্চলটি প্রধানত কঠিন গ্রানাইট ও নিস শিলায় গঠিত হলেও কোনো কোনো জায়গায় চুনাপাথর এবং স্লেট পাথরও দেখা যায়। 

-1 কানাডীয় শিল্ড অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য নদীগুলি হল নেলসন, চার্চিল, চেস্টারফিল্ড, অ্যালঘেনি, গ্রেট হোয়েল ইত্যাদি। কিছু নদী যেমন— সাস্কাচুয়ান, রেড প্রভৃতি আবার উইনিপেগ হ্রদে এসে মিশেছে | সেন্ট লরেন্স নদীটি কানাডীয় শিল্ড অঞ্চলের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ দিয়ে বয়ে গিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে মিশেছে। @ এখানকার অধিকাংশ নদী উত্তরবাহিনী। ও এখানকার অধিকাংশ নদীগুলি খরস্রোতা হওয়ায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে সাহায্য করে। 4 এই অঞ্চলের কোনো কোনো জায়গায় হিমবাহের ক্ষয় কার্যের ফলে এবং হিমবাহবাহিত গ্রাবরেখা, বোল্ডার ক্লে, টিল প্রভৃতি সঞ্চিত হয়ে বিভিন্ন হ্রদ সৃষ্টি হয়েছে, যেমন—গ্রেট বিয়ার, গ্রেট স্লেভ, উইনিপেগ, আথাবান্ধা, রেইনডিয়ার প্রভৃতি |

কানাডীয় শিল্ড অঞ্চলের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যগুলি হল – এখানকার জলবায়ু শীতল মহাদেশীয় প্রকৃতির। এখানে স্বল্পস্থায়ী গ্রীষ্মকাল ও দীর্ঘস্থায়ী শীতকাল দেখা যায়। 2 এই অঞ্চলের উত্তর অংশ তুন্দ্রা অঞ্চলের অন্তর্গত হওয়ায় এখানে বছরের মাত্র তিন মাস গ্রীষ্মকাল বিরাজ করে এবং বাকি নয় মাস এখানকার তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে থাকে। ও গ্রীষ্মকালের গড় তাপমাত্রা থাকে 10 °সে এবং এই সময়ে এখানে বৃষ্টিপাত হয়। গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ 40 সেমি। উত্তরের তুলনায় দক্ষিণে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি ও শীতকালে তুষারপাত হয়। 4 এই অঞ্চলের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে তীব্র শীতল পূর্ব উপকূলীয় জলবায়ু দেখা যায়।

কানাডীয় শিল্ড অঞ্চলের স্বাভাবিক উদ্ভিদগুলি হল – শিল্ড অঞ্চলের উত্তরাংশে তুন্দ্রা জলবায়ুর প্রভাব থাকায় শুধু গুল্ম ও শ্যাওলাজাতীয় উদ্ভিদ জন্মায়। এ ছাড়া, কিছু খর্বাকৃতির গাছ ও ঝোপঝাড় দেখা যায়। 2 দক্ষিণাংশের বিস্তীর্ণ এলাকায় আছে মূল্যবান সরলবর্গীয় অরণ্য, যেখানে পাইন, স্পুস, বার্চ, বালসাম প্রভৃতি গাছ জন্মায়। 3 দক্ষিণ-পূর্বাংশে ওক, বিচ, ম্যাপল প্রভৃতি পর্ণমোচী এবং পাইন, ফার প্রভৃতি সরলবর্গীয় গাছের মিশ্র বনভূমি দেখা যায় ৷

‘শিল্ড' কথাটির আভিধানিক অর্থ ঢাল বা বর্ম । ভূপৃষ্ঠের এমন কিছু সুপ্রাচীন মালভূমি অঞ্চল আছে যেগুলি ঢাল বা বর্মের মতো অত্যন্ত কঠিন এবং মজবুত। এগুলিকেই বলে শিল্ড অঞ্চল। এগুলি ভূপৃষ্ঠের খুব স্থায়ী বা সুস্থির অংশ। শিল্ড অঞ্চলের পাথরগুলি খুবই প্রাচীন। ভূপৃষ্ঠে এই ধরনের শিল্ড অঞ্চল আছে 11টি। এর মধ্যে কানাডার শিল্ড অঞ্চল অন্যতম ।

প্লাইস্টোসিন হিমযুগে কানাডীয় শিল্ড অঞ্চলটি হিমবাহ দ্বারা অধিকৃত হয় এবং সম্পূর্ণ অঞ্চলটি বরফে ঢেকে যায়। পরবর্তীকালে বিশাল বিশাল মহাদেশীয় হিমবাহ অগ্রসর হওয়ার সময় ক্ষয়কার্য চালিয়ে অঞ্চলটিতে অসংখ্য ছোটো-বড়ো হ্রদ সৃষ্টি করেছে, যেমন—গ্রেট বিয়ার, আথাবাস্কা, উইনিপেগ, গ্রেট স্লেভ ইত্যাদি।

কানাডীয় শিল্ড অঞ্চলে নিম্নলিখিত কারণগুলির জন্য শিল্পোন্নতি ঘটেছে—

1 খনিজ সম্পদে প্রাচুর্য: এখানে প্রচুর পরিমাণে নিকেল, আকরিক তামা, সোনা, আকরিক লোহা, দস্তা, কোবাল্ট, রুপো, প্ল্যাটিনাম প্রভৃতি পাওয়া যায়, যা ধাতুভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের শিল্প গড়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে।

2 শক্তি সম্পদের প্রাচুর্য: কানাডীয় শিল্ড অঞ্চলের নদীগুলি খরস্রোতা হওয়ার জন্য নদীগুলির ওপর বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে যেগুলি থেকে শিল্পের বিকাশে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎশক্তি সহজে ও সুলভে পাওয়া যায়।

3 প্রাণীজ কাঁচামাল : বন্য পশুর লোমশ চামড়া, ফার, হাড় প্রভৃতি বিভিন্ন শিল্পে বহুল ব্যবহৃত হয় |

4 বনভূমি: কানাডার শিল্ড অঞ্চলে সরলবর্গীয় তৈগা বনভূমি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম বনভূমি। এই সরলবর্গীয় বনভূমির কাঠ ব্যবহার করে কাগজ শিল্পে প্রয়োজনীয় মন্ড উৎপাদন, জাহাজ নির্মাণ, আসবাবপত্র নির্মাণ প্রভৃতি শিল্পের বিপুল উন্নতি হয়েছে

5 পরিবহণ: শীতকালে তুষারপাতের কারণে পরিবহণ ব্যবস্থা বাধাপ্রাপ্ত হলেও বাকি সময়ে জলপথ, রেলপথ ও সড়কপথের মাধ্যমে পণ্য আদানপ্রদান করা হয়ে থাকে ।

গ্রীষ্মকালে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের দক্ষিণাংশে বেশি উন্নতার জন্য নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়। এর ফলে দক্ষিণের ক্যারিবিয়ান সাগর ও মেক্সিকো উপসাগরের ওপর দিয়ে আর্দ্র মৌসুমি বায়ু মধ্য আমেরিকা, মেক্সিকো এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও টেক্সাসের দিকে ছুটে আসে। আবার শীতকালে তীব্র ঠান্ডার জন্য মহাদেশের উত্তরাংশের ওপর উচ্চচাপের সৃষ্টি হয়। এই উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে শীতল বায়ু মধ্যভাগের সমভূমির ওপর দিয়ে দক্ষিণ দিকে বহুদূর পর্যন্ত প্রবাহিত হয়। এ ছাড়া, প্রায় সারাবছরই মহাদেশের দক্ষিণভাগের ওপর দিয়ে উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু এবং উত্তরভাগের ওপর দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বা প্রবাহিত হয়।

উত্তর আমেরিকা মহাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশ, মধ্য আমেরিকা অঞ্চল (ফ্লোরিডা উপদ্বীপ ও মেক্সিকোর দক্ষিণ অংশ) এবং উত্তর-পশ্চিম উপকূল—এই তিনটি অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত (বার্ষিক 100 থেকে 200 সেমি বা তারও বেশি) হয়। পশ্চিম উপকূলের পক্ষিণাংশে (ক্যালিফোর্নিয়া) এবং পূর্বের উচ্চভূমি অঞ্চলে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত (বার্ষিক 50 থেকে 100 সেমি) হয়। আর সমুদ্র থেকে বহুদূরে অবস্থিত হওয়ায় মধ্যভাগের সমভূমি অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কম (বার্ষিক 25 থেকে 50 সেমি) হয়। মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে পর্বতবেষ্টিত মালভূমি অঞ্চলে, মরু অঞ্চলে ও রকি পর্বতের পূর্ব চালের বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে বৃষ্টিপাত খুবই কম। (বার্ষিক 25 সেন্টিমিটারেরও কম) হয়। এজন্য ওখানে উয় মরুভূমির (যেমন—সোনেরান, মোহাভি প্রভৃতি) সৃষ্টি হয়েছে।

বিস্তৃত তৃণভূমির প্রাধান্যের জন্য আমেরিকার হ্রদ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে পশুখাদ্য উৎপাদিত হয় এবং এখানকার শহরগুলিতে দুধ, দুগ্ধজাত দ্রব্য, মাংস প্রভৃতি পশুজাত দ্রব্যের ব্যাপক চাহিদাও আছে। এই দুটি কারণে হ্রদ অঞ্চলে অত্যন্ত উন্নত পদ্ধতিতে গবাদি পশু, শুয়োর প্রভৃতি প্রতিপালন করা হয়। গবাদি পশু ছাড়াও এই অঞ্চলে ডিম এবং মাংসের জন্য হাঁস ও মুরগি পালিত হয়। এইসব পশুজাত দ্রব্যের ওপর ভিত্তি করে হ্রদ অঞ্চলে মাংস কৌটোজাতকরণ, ডেয়ারি, পোলট্রি প্রভৃতি শিল্প গড়ে উঠেছে। গবাদি পশু প্রতিপালন ও দুগ্ধজাত দ্রব্য উৎপাদনে খ্যাতির জন্য এই অঞ্চলের উইসকনসিন রাজ্যের আর এক নাম ডেয়ারি রাজ্য। মাংস উৎপাদন ও সংরক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধির কারণে শিকাগো শহরের অন্য নাম পৃথিবীর কসাইখানা। সুতরাং বলা যায়, পশুজাত দ্রব্য উৎপাদনে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের হ্রদ অঞ্চল যথেষ্ট উন্নত।

তাবস্থান ও বিস্তার: উত্তর আমেরিকা মহাদেশের সমগ্র পশ্চিমভাগ জুড়ে অর্থাৎ উত্তর-পশ্চিমে আলাস্কা থেকে দক্ষিণে পানামা যোজক পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে এক সুবিস্তৃত পার্বত্যভূমি। এই পার্বত্যভূমি প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল বরাবর বিস্তৃত হওয়ায় এর আর এক নাম প্রশান্ত মহাসাগরীয় পার্বত্য অঞ্চল। পর্বতশ্রেণি: উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত তিনটি প্রায় সমান্তরাল পর্বতশ্রেণি নিয়ে গঠিত এই পার্বত্যভূমিকে কর্ডিলেরা (Cordillera) বলে [যার অর্থ 'শৃঙ্খল' (chain) বা 'রজ্জু' (rope)]। এই অঞ্চলের তিনটি সমান্তরাল পর্বতশ্রেণির মধ্যে পূর্ব দিকে আছে রকি পর্বতমালা। 2 উত্তরে আলাস্কায় আলাস্কা রেঞ্জ, কানাডা ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে কাসকেড পর্বত, ক্যালিফোর্নিয়ায় সিয়েরা নেভাডা পর্বত এবং দক্ষিণে মেক্সিকোতে পশ্চিম সিয়েরা মাদ্রে পর্বত। এর মধ্যে আলাস্কা রেঞ্জের অন্তর্গত ম্যাককিনলে (6195 মি) সমগ্র উত্তর আমেরিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। ও পশ্চিমের পার্বত্যভূমির তৃতীয় পর্বতশ্রেণিটির আলাস্কায় নাম সেন্ট ইলিয়াস রেঞ্জ এবং মধ্যভাগে কানাডা ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে নাম কোস্ট রেঞ্জ। এই তিনটি পর্বতশ্রেণির মধ্যে রকি পর্বতমালাই প্রধান এবং দীর্ঘতম। উত্তরে আলাস্কা থেকে দক্ষিণে মেক্সিকো পর্যন্ত রকি পর্বতমালা প্রায় 4800 কিমি দীর্ঘ এবং এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গের নাম এলবার্ট (4399 ) । পর্বতবেষ্টিত মালভূমি: পশ্চিমের পার্বত্যভূমির মাঝে পর্বতবেষ্টিত মালভূমি রয়েছে, যেমন—ইউকন মালভূমি, কলম্বিয়া মালভূমি, আলাস্কা মালভূমি প্রভৃতি। অববাহিকা: পর্বতবেষ্টিত মালভূমির মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন অববাহিকা, যার মধ্যে ইউকন, ফ্রেজার, কলম্বিয়া, কলোরাডো প্রভৃতি নদীর অববাহিকা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। আগ্নেয়গিরি: এই অংশে বলয়ের আকারে পোপোক্যাটেপেটল, ওরিজাবা, কোলিমা প্রভৃতি আগ্নেয়গিরি রয়েছে। ক্যানিয়ন: এই অংশে কলোরাডো নদীতে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন সৃষ্টি হয়েছে, যা পৃথিবীর বৃহত্তম গিরিখাত || মৃত্যু উপত্যকা: ক্যালিফোর্নিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাংশ সমুদ্রতল থেকে প্রায় মিটার নীচে অবস্থিত, যা মৃত্যু উপত্যকা নামে পরিচিত।

বিস্তৃতি: উত্তরে ল্যাব্রাডর থেকে দক্ষিণে আলাবামা পর্যন্ত উত্তর আমেরিকা মহাদেশের সমগ্র পূর্বভাগ এই অঞ্চলের অন্তর্গত। ল্যাব্রাডরের উত্তরে অবস্থিত গ্রিনল্যান্ডের উচ্চভূমিও এই অঞ্চলের অন্তর্গত | প্রকৃতি: সুপ্রাচীন এই উচ্চভূমি অঞ্চলের অধিকাংশই কেলাসিত শিলা (crystalline rocks) দ্বারা গঠিত । নিস, লিস্ট, প্লেট, কোয়ার্টজাইট, গ্রানাই প্রভৃতি শিলা এখানে দেখা যায়।

বিভাগ : সমগ্র অঞ্চলটি প্রকৃতপক্ষে তিনটি ব্যবচ্ছিন্ন উচ্চভূমি (বা মালভূমি) নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে— 1 উত্তরে আছে ল্যাব্রাডর মালভূমি, 2 মধ্যভাগে নিউ ইংল্যান্ড উচ্চভূমি এবং ও দক্ষিণে অ্যাপালেশিয়ান পার্বত্য অঞ্চল। পূর্বের উচ্চভূমি অঞ্চলের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য অংশ হল অ্যাপালেশিয়ান পার্বত্য অঞ্চল। উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত অ্যাপালেশিয়ান একটি প্রাচীন ভঙ্গির পর্বত। বহু যুগ ধরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির ক্ষয় কার্যের ফলে বর্তমানে রবি পর্বতের তুলনায় অ্যাপালেশিয়ানের উচ্চতা কমে গিয়েছে। অ্যাপালেশিয়ান পার্বত্য অঞ্চলের অংশবিশেষ হল – [i] অ্যাপালেশিয়ানের পশ্চিমাংশের খাড়া ঢালযুক্ত অ্যালেঘেনি মালভূমি। [ii] আরও পশ্চিমে আছে কাম্বারল্যান্ড মালভূমি ও পূর্বাংশে রয়েছে ব্লু পর্বত (Blue Ridge)। ব্লু পর্বতের মাউন্ট মিশেল ( 2037 মি) অ্যাপালেশিয়ান পর্বতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। [iii] ব্লু রিজের পূর্বে আছে পিডমন্ট (পিডমন্ট কথাটির অর্থ পাদদেশ) মালভূমি। পিডমন্টের পূর্ব প্রান্ত হঠাৎ খাড়াভাবে নীচে নেমে গিয়েছে, যা প্রপাতরেখা (Fall line) নামে পরিচিত [iv] পিডমন্ট অঞ্চলের পশ্চিমে 300 মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট বন্ধুর ভূমিভাগ রয়েছে, যা গ্রেট স্মোকি রেঞ্জ নামে পরিচিত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ব্লু রিজ পর্বত এবং পিডমন্ট মালভূমি অ্যাপালেশিয়ানের প্রাচীন অংশ (50 থেকে 80 কোটি বছর আগে সৃষ্ট)। ব্লু রিজের পশ্চিমে অবস্থিত অ্যাপালেশিয়ান শৈলশিরা ও অ্যালেঘেনি প্রাপ্ত অ্যাপালেশিয়ানের নতুন অংশ ( 22 থেকে 32 কোটি বছর আগে সৃষ্ট)। অ্যাপালেশিয়ান পর্বতমালা আটলান্টিকের উপকূল বরাবর বিস্তৃত হওয়ায় একে আটলান্টিক পর্বত (Atlantic Mountain)-ও বলা হয়।

অবস্থান ও বিস্তৃতি: পশ্চিমে রকি পর্বত ও পূর্বে অ্যাপালেশিয়ানের মধ্যবর্তী অংশে উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত সুবিশাল সমভূমিকে বলা হয় উত্তর আমেরিকা মহাদেশের মধ্যভাগের সমভূমি। সুতরাং, পূর্ব ও পশ্চিমে উচ্চভূমি থাকায় স্বাভাবিকভাবেই পূর্ব ও পশ্চিম দিক থেকে ভূমি মাঝ বরাবর চালু হয়ে গিয়েছে। আবার মিসিসিপি-মিসৌরি নদীর গতিপথ দেখলে বোঝা যায় সমভূমির দক্ষিণাংশ দক্ষিণ দিকে ঢালু হয়ে গিয়েছে এবং সমভূমির উত্তরাংশে আছে সুপিরিয়রসহ পাঁচটি বিখ্যাত হ্রদ। বিভাগ: ভূমিরূপের স্থানীয় বৈহিয়ানুসারে সুবিশাল এই সমভূমি অঞ্চলটিকে কয়েকটি উপবিভাগে ভাগ করা যায়। যেমন— 1 উত্তর-পূর্বাংশের নাম সেন্ট লরেন্স নদীর অববাহিকা। এই অববাহিকার পশ্চিমে আছে 2 হ্রদ অঞ্চলের সমভূমি, এবং আরও পশ্চিমে আছে 3 প্রেইরি সমভূমি 4 সমভূমি অঞ্চলের দক্ষিণের বিস্তৃত এলাকা মিসিসিপি অববাহিকার সমভূমি নামে পরিচিত। সেন্ট লরেন্স নদীর অববাহিকা: পূর্বের উচ্চভূমি ও কানাডার শিল্ড 1 অঞ্চলের মধ্যবর্তী অংশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে সেন্ট লরেন্স নদী, যার অববাহিকায় গঠিত সংকীর্ণ সমভূমিটিকে বলে সেন্ট লরেন্স নদীর অববাহিকা।

2 হ্রদ অঞ্চলের সমভূমি: উত্তর আমেরিকা মহাদেশের উত্তর পূর্বাংশে— সুপিরিয়র, মিশিগান, হুরন, ইরি ও অন্টারিও নামে পাঁচটি বড়ো হ্রদ আছে এই পাঁচটি হ্রদের দক্ষিণ তীরের এলাকাসমূহ নিয়ে গঠিত হয়েছে হ্রদ অঞ্চলের সমভূমি |

3) প্রেইরি সমভূমি: উত্তর আমেরিকা মহাদেশের মধ্যভাগের সমভূমি অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে যে তৃণক্ষেত্র আছে, তাকে প্রেইরি সমভূমি বা তৃণভূমি বলে। এখানকার ভূমিরূপ সাধারণভাবে সমতল হলেও সামান্য ঢেউ খেলানো বা উঁচুনীচু প্রকৃতির ভূমিও লক্ষ করা যায় ।

4 মিসিসিপি অববাহিকার সমভূমি: মিসিসিপি অববাহিকার সমভূমিটি পূর্বের উচ্চভূমি এবং পশ্চিমের কর্ডিলেরা পার্বত্য অঞ্চলের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এই সমভূমিটি নদী অববাহিকায় গঠিত হয়েছে বলে নবীন পলি মাটি দ্বারা সমৃদ্ধ। এই সমভূমিটির একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে সৃষ্টি হয়েছে মিসিসিপি নদীর ব-দ্বীপ, যার আকৃতি পাখির পায়ের মতো (Bird's Foot Delta) |

উত্তর আমেরিকার জলবায়ু বৈচিত্র্যপূর্ণ হওয়ার কারণগুলি হল— অক্ষাংশগত বিস্তার: উত্তর আমেরিকা মহাদেশটি নিরক্ষরেখার উত্তরে 7° উত্তর থেকে 83° উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে বিস্তৃত। উত্তর ও দক্ষিণের কিছু এলাকা ছাড়া উত্তর আমেরিকায় প্রধানত নাতিশীতোয় জলবায়ু পরিলক্ষিত হয় মেক্সিকোর ওপর দিয়ে কর্কটক্রান্তিরেখা (232/2° উত্তর) বিস্তৃত হওয়ায় দক্ষিণ মেক্সিকোতে এবং মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন দেশে উপক্রান্তীয় জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়। এই মহাদেশের উত্তরাংশ সুমেরুবৃত্তের (66 /2° উত্তর-এর বেশি) অন্তর্গত হওয়ার এই অঞ্চলে হিমশীতল মেরু জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়।

আকার: এই মহাদেশের ওপরের অংশটি চওড়া হওয়ায় মধ্যভাগের অঞ্চলগুলি সমুদ্র থেকে বহুদূরে অবস্থিত, ফলে এখানকার জলবায়ু মহাদেশীয় প্রকৃতির হয়। আবার, দক্ষিণ দিকের অঞ্চলগুলি সমুদ্রের নিকটে অবস্থিত হওয়ায় জলবায়ু সমভাবাপন্ন ও উপকূলীয় প্রকৃতির হয় ।

পর্বতশ্রেণির অবস্থান: এই মহাদেশের পূর্ব ও পশ্চিমের পর্বতশ্রেণিগুলি উত্তর-দক্ষিণে প্রায় লম্বালম্বিভাবে বিস্তৃত হওয়ায় শীতকালে উত্তরের সুমের থেকে আসা হিমশীতল বায়ু বাধাহীনভাবে দক্ষিণ দিকে বহুদূর পর্যন্ত চলে আসে, ফলে মহাদেশের অর্ধেকেরও বেশি এলাকায় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে নেমে যায়। পশ্চিমে রকি পর্বত উত্তর-দক্ষিণ বরাবর অবস্থান করার জন্য পশ্চিমের সামুদ্রিক বায়ু  আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের হ্রদ অঞ্চলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব • উত্তর আলোচনা করো। হ্রদ অঞ্চল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল হওয়ায় এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব সীমাহীন, যথা—

প্রচুর পরিমাণে কৃষিজ ফসল উৎপাদন: শিল্পপ্রধান অঞ্চল হলেও এখানে প্রচুর পরিমাণে গম, ভুট্টা, ওট, বিট, শাকসবজি প্রভৃতি উৎপাদিত হয়, যেগুলি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্ব ভাগের কৃষিজ ফসলের চাহিদা মেটায় |

পজ সম্পদ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান: বিভিন্ন প্রকার পশুখাদ্য উৎপাদিত হয় বলে এখানে ব্যাপকভাবে গো-পালন করা হয়। গোমাংস উৎপাদনে এই অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রে শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করে। গোদুগ্ধ, মাখন ও পনির উৎপাদনেও এই অঞ্চলটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

শ্রেষ্ঠ আকরিক লোহা-ভাণ্ডার: আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ শতাংশ আকরিক লোহা হ্রদ অঞ্চল থেকে উত্তোলন করা হয়। এখানকার সুপিরিয়র ও মিশিগান হ্রদের …তামা এবং অন্যান্য খনিজ দ্রব্য উত্তোলন; কেবল আকরিক লোহা নয়, হ্রদ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে তামাও উত্তোলন করা হয়। এ ছাড়া, কয়লা, খনিজ তেল, খনিজ লবণ, চুনাপাথর, জিপসাম প্রভৃতি খনিজ দ্রব্যও এখানে উত্তোলিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ শিল্পাঞ্চল: পঞ্চ হ্রদ-সংলগ্ন এলাকা যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ শিল্পাঞ্চল কারণ এখানে বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প গড়ে উঠেছে। যেমন— লোহা ও ইস্পাত শিল্প (বাফেলো ও ডেট্রয়েট), ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প (ডেট্রয়েট), রাসায়নিক শিল্প (শিকাগো), কাগজ শিল্প (গ্রিন বে), মাংস শিল্প (শিকাগো), চর্ম শিল্প (শিকাগো), ডেয়ারি শিল্প (মিলওয়াকি) প্রভৃতি। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মোটরগাড়ি নির্মাণ কেন্দ্র ডেট্রয়েট এবং বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ময়দা শিল্পকেন্দ্র বাফেলো-ও এই অঞ্চলে অবস্থিত।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র: আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম শহর শিকাগো এই অঞ্চলেই অবস্থিত। এ ছাড়া, সেন্ট লুই, বাফেলো, ডেট্রয়েট প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ শহরও এখানে গড়ে উঠেছে। এইসব কারণে হ্রদ অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।