Chapter-9, বিভব

শম্ভু মিত্রের ‘বিভাব' নাটকে অমর গাঙ্গুলি ‘বহুরূপী' নাট্যদ সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

‘বিভাব’ নাটকে ‘বহুরূপী'র সভ্য-স্বজনদের কাছে শম্ভু মিত্রের অভিনেত্রী তৃপ্তি মিত্র ‘বৌদি' হিসেবে পরিচিত ছিলেন |

শম্ভু মিত্রের ‘বিভাব' নাটকটি শুরু হয়েছে দর্শকদের সঙ্গে শম্ভু মিে এক দীর্ঘ কথোপকথনের মধ্য দিয়ে।

কোনো এক ভদ্রলোক পুরোনো সব নাট্যশাস্ত্র খুঁজে শম্ভু মিে নাটকের নাম দিয়েছিলেন ‘বিভাব’।

শম্ভু মিত্রের মতে ‘বিভাব' নাটকের নাম হওয়া উচিত ছিল 'অভাব

নাটক'।

শম্ভু মিত্রের মতে, দূরন্ত অভাব থেকে জন্ম নেওয়া এই না দৃশ্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো উপকরণ না থাকায় এর নাম নাটক রাখা উচিত।

নিদারুণ অভাবে মাত্র ইচ্ছাশক্তির জোরে নাটক করতে নামলে সরকারের পেয়াদাকে খাজনা দিতে হয়। পেশাদারি থিয়েটারের তুলনায় তাঁদের প্রতি সরকারের এই বিমাতৃসুলভ আচরণের কথা এখানে বলা হয়েছে।

নাটক নিয়ে ব্যাবসা না করলেও সরকার যেভাবে জোর করে প থিয়েটারের কাছ থেকে খাজনা আদায় করে তার উল্লেখ প্রসঙ্গেই মন্তব্যটি করা হয়েছে।

'বহুরূপী' নাট্যদলের কাছ থেকে সরকার যে কর গ্রহণ করে, সেই কর নেওয়ার কথা বলতে গিয়েই বক্তা উত্তিটি করেছেন।

নাট্যদলের সম্পাদকের নির্দেশমতো নাটকে হাসির উপাদান ধান করতে নাট্যকার-অভিনেতা শম্ভু মিত্র সহ-অভিনেতা অমর গাঙ্গুলির বাড়িতে গিয়েছিলেন।

প্রয়োজনীয় নাট্য-উপকরণকে অগ্রাহ্য করে দর্শকের সামনে কীভাবে নাটককে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপিত করা যায়—সেই বুদ্ধির কথা এখানে বলা হয়েছে।

নাট্যকার শম্ভু মিত্র একটি পুরোনো বাংলা নাটকে দেখেছিলেন যে,লেখা আছে “রাজা রথারোহণম্ নাটয়তি”। অর্থাৎ “রাজা রথে আরোহণ করার ভঙ্গি করলেন”।

‘বিভাব' নাটকে উল্লিখিত 'রাজা রথারোহণম নাটয়তি' কথাটির অর্থ—রাজা রথে আরোহণ করার ভঙ্গি করলেন।

শম্ভু মিত্রের ‘বিভাব' নাটক থেকে জানা যায় যে উপরোক্ত কথাটি উড়ে দেশের যাত্রায় রাজা বলেছিলেন তাঁর দূতকে ।

ওড়িয়া নাটকে রাজা যখন দূতকে ঘোড়ায় চেপে দ্রুত খবর নিয়ে আসার কথা বলেন, তখন দূত ছোটো ছেলের মতো দুই পায়ের ফাঁকে লাঠি গলিয়ে ঘোড়ায় চড়ার ভঙ্গিতে হেট্‌ হেট্‌ করতে করতে মঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

উড়ে দেশের যাত্রায় দূতের পায়ের ফাকে লাঠি গলিয়ে ঘোড়ায় চড়ার ভঙ্গি করতে দেখে দর্শকরা হাসেনি।

মারাঠি তামাশায় একজন চাষি জমিদারের কাছে কাকুতিমিনতি করে ব্যর্থ হয়ে মন্দিরের দিকে যাচ্ছিল।

মারাঠি তামাশায় জমিদার সেজে অভিনয় করা ব্যক্তি যখন দর্শকের সামনেরই মুখে দাড়ি গোঁফ এঁটে পুরুত সেজে চাষির সামনে গিয়ে ধর্মীয় তর্জন শুরু করেছিল তা মাঠ-ভরতি লোক নিঃশব্দে মেনে নিয়ে দেখেছিল |

ইংরেজি শিক্ষিত, রুচিমান দর্শকের কাছে শুধুমাত্র দৈহিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে নাটকের অভিনয় গ্রহণযোগ্য যদি না হয়, তবে তারা সেই পদ্ধতিটা মানবে না |

শহরে ইংরেজি-জানা লোকেরা রবিঠাকুরকে মেনেছিল—তার কারণ, লেখকের মতে, সাহেবরা তাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

প্যান্টালুন পরা এবং ইংরেজি জানা যেসব লোক প্রতি সপ্তাহে বিলিতি বায়োস্কোপ দেখে, সেই শ্রেণির বাঙালি দর্শকের কথা এখানে বলা হয়েছে।

পঞ্চসায়র শিক্ষানিকেতন] উত্তর: ‘বিভাব' নাটকে উল্লিখিত এই সাহেব ছিল বিখ্যাত রুশদেশীয় চিত্রপরিচালক আইজেনস্টাইন |

আইজেনস্টাইন মস্কোতে কাবুকি থিয়েটারের অভিনয় দেখেছিলেন।

‘বিভাব’ নাটকে উল্লিখিত ‘কাবুকি' থিয়েটারের বৈশিষ্ট্য ছিল সেই নাটকের অভিনয়ে ভঙ্গির বহুল ব্যবহার করা হত।

নাইটের বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে শিফটারদের দুর্গদ্বার হাতে দাঁড়ানো এবং তার এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ ছোটো দরজার ব্যবহার—এভাবে পারস্পেক্‌টিভ রচিত হয়েছিল।

জাপানের কাবুকি থিয়েটারে ভঙ্গিনির্ভর অভিনয়ে কাল্পনিক তরোয়াল হাতে দুই যোদ্ধার লড়াইয়ে যার শেষ অবধি কাল্পনিক মৃত্যু ঘটে। তার কথা বলা হয়েছে।

জাপানের কাবুকি নাটকে দেখা যায় দুই যোদ্ধার লড়াইয়ে যার মৃত্যু হচ্ছে তার হয়তো হাতটা নড়ে উঠল, পা ধীরে কাপল, মুণ্ডু দু-বার আর চোখ দু-বার নড়ল, জিভ বের করে এরপরেই তার মৃত্যু হল অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বীভৎস খিঁচুনি বা রক্তাক্ততা নেই এই মৃত্যুর দৃশ্যে। তাই এই মৃত্যু খুব আর্টিস্টিক বা ইসমেটিক।

কাবুকি থিয়েটারে যোদ্ধার কাল্পনিক মৃত্যু ঘটলে তার বিধবা স্ত্রী যখন কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসে মৃত লোকটি তখন উঠে চলে গেলেও দর্শকরা কিছু মনে করে না। কারণ ওই দৃশ্যে স্বামীর মৃত্যুর বিষয়টি সেখানে স্ত্রী-র দুঃখ বা শোকপ্রকাশই প্রধান ।

বুনদেশীয় বিখ্যাত চিত্রপরিচালক আইজেনস্টাইন যে লেখায় জাপানের কাবুকি থিয়েটার অর্থাৎ দেহভঙ্গিনির্ভর নাট্যাভিনয় প্রসঙ্গে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন, সেই লেখার কথা এখানে বলা হয়েছে ।

উপকরণের বাহুল্যহীন দেহের অঙ্গভঙ্গিনির্ভর নাট্যাভিনয়ের কদরের কথাই এখানে বলা হয়েছে।

নাটকের ভঙ্গিসর্বস্ব কাল্পনিক অভিনয়কে মেনে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

'বিভাব' নাটকে অমর গাঙ্গুলির কল্পিত বাড়ির নীচতলায় যে কথিত দরজাটি ছিল, যার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন শম্ভু মিত্র, সেই দরজার কথা বলা হয়েছে।

হাসির নাটক লেখার খোরাক জোগাড় করতে 'বিভাব' নাটকের নাট্যকার শম্ভু মিত্র অমরবাবুর বাড়িতে এসেছিলেন।

এটি আসলে বল্লভভাইয়ের মন্তব্য হলেও এখানে অমর গাঙ্গুলি শ মিত্রকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন।

হাসির নাটকের 'দারুণ বক্স অফিস' অর্থাৎ দর্শকচাহিদা বেশি থাকার জন্য সম্পাদক হাসির নাটক করতে চলেছেন।

‘বিভাব' নাটকের নাট্যকার শম্ভু মিত্রকে নাট্যদলের সম্পাদক হাসির নাটক লিখতে বলেছিলেন এই কথা জানিয়ে যে, হাসির নাইকের বক্স অফিস দারুণ।

‘বিভাব' নাটকে অমর গাঙ্গুলি বলছেন, বল্লভভাই বলে গেছেন বলে, হাসতে হলে বেশ কোমর বেঁধে হাসতে হবে।

'বৌদি'-র আনা কল্পিত চা খেতে গিয়ে শম্ভু মিত্রের কল্পিত সিগারেটটি নষ্ট হলে অমর গাঙ্গুলি তাকে আবার সিগারেট দিতে বললে শম্ভু মিত্র এ কথা বলেন।

শম্ভু মিত্রের প্রশ্নের উত্তরে অমর গাঙ্গুলি বলেছিলেন যে তিনি যা চাইবেন তাই অমর গাঙ্গুলির কাছে পাবেন।

নিজের কল্পিত বসার ভঙ্গি নির্দেশ করে শম্ভু মিত্র এ কথা বলেছিলেন।

হাসির গল্প, হিউম্যান ইন্টারেস্ট বা মানবস্বার্থ, পপুলার অ্যাপিল বা জনপ্রিয়তার আবেদন—এই রসদগুলি মজুত থাকলেই ঠিকঠাক হাসি পাবে।

‘বিভাব' নাটকের নাট্যকার তথা অভিনেতা শম্ভু মিত্রের মুখে সম্পাদক হাসির নাটক করার নির্দেশ দিয়েছেন শুনে সহ-অভিনেতা অমর গাঙ্গুলি মন্তব্যটি করেছেন।

'বিভাব' নাটকে বউদি তৃপ্তি মিত্রের মতে পৃথিবীতে সবচেয়ে পপুলার অর্থাৎ জনপ্রিয়তম জিনিস হল প্রেম।

বক্তা তৃপ্তি মিত্রের মতে প্রেম হল পৃথিবীর সবচেয়ে পপুলার জিনিস। তাই নাটকে একটা প্রেমের দৃশ্যের অভিনয় করলে সকলের হাসি পাবে বলে তাঁর মত।

'বিভাব' নাটকের অন্যতম অভিনেতা অমর গাঙ্গুলি বায়োস্কোপে 'লড সিন' বা প্রেমের দৃশ্য দেখার কথা বলেছেন।

'বৌদি' তৃপ্তি মিত্র নাটকে 'লভ সিন' বা প্রেমের দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য একজন নায়ক ও নায়িকার দরকার বলে মন্তব্য করেছেন।

'বিভাব' নাটকে 'বহুরূপী' নাট্যগোষ্ঠীতে 'বৌদি' বলে পরিচিত তৃপ্তি মিত্র সম্পর্কে মন্তব্যটি করা হয়েছে।

প্রশ্নোদ্ধৃত অংশে 'দল' বলতে 'বহুরূপী' নাট্যগোষ্ঠীর কথা বলা হয়েছে।

'বিভাব' নাটকের সহ-অভিনেতা অমর গাঙ্গুলি 'বৌদি' তৃপ্তি মিত্রের কথা শুনে হতাশ হয়েছিলেন।

'' তৃপ্ত 'বিভাব' নাটকে শম্ভু মিনকে 'লভ সিন'-এর নায়ক হিসেবে নির্বাচন করলে অমর পাতগুলি হতাশ হন।

'' 'লভ জিন' বা প্রেমের দৃশ্যে নায়ক হিসেবে নিজের গ্রহণযোগ্যতা প্রসঙ্গে শম্ভু মিত্র মন্তব্যটি করেছেন।

"আমাকে অবশ্য মানায় ভালো"  নাট্যকার শম্ভু মিল মজা করে বলেছেন যে, তাকে নামকের চরিত্রে মানায় ভালো।

অমর গাঙ্গুলি বলতে চেয়েছিলেন যে, যেহেতু শম্ভু মিত্র নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তাই তার হাসি পাওয়া প্রত্যাশিতই ছিল।

বউদির নির্দেশনায় প্রগ্রেসিভ লভ সিনও যথেষ্ট হাসির উদ্রেক করছে পারেনি—অমর গাঙ্গুলি এ কথা বলায় ক্রুদ্ধ হয়ে বউদি অর্থাৎ তৃপ্তি মি স্টেজ থেকে চলে যান।

“মা ব্রূয়াৎ সত্যম্ অপ্রিয়ম্”—কথাটির বাংলা তরজমা হল—অপ্রিয় সত্য বোলো না ।

‘বিভাব' নাটকে অমর গাঙ্গুলি জানিয়েছেন যে, সংস্কৃতে তেরো পেয়েছিলেন বলে হেডপণ্ডিত স্কুলে তাঁকে প্রোমোশন দেননি ।

শম্ভু মিত্রের ‘বিভাব' নাটকে স্কুলের হেডপন্ডিত অমর গাঙ্গুলিকে প্রোমোশন দেননি, কারণ তিনি সংস্কৃতে তেরো পেয়েছিলেন।

একাধিক চেষ্টার পরেও উপযুক্ত হাসির নাটক তৈরি করতে না পেরে শম্ভু মিত্র ও অমর গাঙ্গুলি চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন।

শম্ভু মিত্রের মতে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে জীবনকে উপলব্ধি করা যাবে না, তাই সম্পাদকের চাহিদা অনুযায়ী হাসির উপাদান খুঁজতে বাইরে যেতেই হবে।

জীবনের সন্ধানে ঘরের চার দেয়ালের ভিতর থেকে বাইরে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

একজন লোক একটা মোটর আঁকা ছবি ধরে মুখে হর্নের আওয়াজ করতে করতে শম্ভু মিত্র ও অমর গাঙ্গুলিকে অতিক্রম করে চলে যায়।

'বিভাব' নাটকে মঞ্চে লাইন ধরে ট্রাম চলার দৃশ্যের অভিনয় করা হলে সেই কাল্পনিক চলন্ত ট্রামের দিকে তাকিয়ে শম্ভু মিত্র মন্তব্যটি করেন।

খাদ্য বস্ত্রের দাবি জানিয়ে  'বিভাব' নাটকে রাস্তা দিয়ে যে মিছিল  আসছিল দিকে তাকিয়েই শম্ভু মন্তব্যটি করেন।

মিত্রের 'বিভাব' নাটকে আর কাপড়ের দাবিতে মানুষের মিছিলকে আটকাতে পুলিশ এসেছিল।

পুলিশ আসতে দেখে শম্ভু মিত্র ও গাঙ্গুলি ধরাধরি করে ডানদিকে পিছনের উইং দিয়ে পালিয়ে যান।

উঁচু করে রাখা ইঙ্গিত করছিল তাদের হাতে ফেস্টন পতাকা কিছু আছে।

সার্জেন্টের পরনে একটি ব্রুস বেল্ট ছিল, যা সঙ্গে পুলিশদের পার্থক্য তৈরি করেছিল।

'বিভাব' নাটকে চাল কাপড়ের দাবি জানিয়ে মিছিল করে মানুষদের উদ্দেশ্য করে পুলিশ সার্জেন্ট মন্তব্যটি করেছেন।

সার্জেন্টের নির্দেশমতো চাল-কাপড়ের দাবিতে মিছিল করে যাওয়া মানুষেরা ফিরে যেতে চাইলে সার্জেন্টের নির্দেশে পুলিশরা বন্দুক তাগ করে।

 

পুলিশের গুলিচালনার পরে মঞ্চে যখন হাহাকার আর গোঙানির শব্দ শোনা যায়, আর পুলিশেরা চলে যায়—তখনই অমর গাঙ্গুলি দৌড়ে মঞ্চে  আসেন ।

পুলিশের গুলিতে নিহত এবং আহত মানুষের হাহাকার ও গোঙানির দিকে তাকিয়ে সত্য হাসি খোঁজার প্রবণতাকে বাজা করে শম্ভু মিত্র মন্তব্যটি করেছেন ।

সংস্কৃত নাট্যশাস্ত্রে বলা আছে যে, কাব্যে বা নাটকে রতি ইত্যাদি নয় প্রকার ভাবের উদ্ভবের কারণকেই ‘বিভাব' বলা হয়। শম্ভু মিত্রের বক্তব্য অনুযায়ী এই নাটকের লক্ষ্য ছিল হাসির ভাব জাগিয়ে তোলা | নাট্যদলের সম্পাদকের নির্দেশ, জনপ্রিয়তা অর্জনের লক্ষ্যে একটি হাসির নাটকের উপস্থাপনা করতে হবে। শিল্পসৌন্দর্যকে অতিক্রম করে এখানে ‘বক্স অফিস'-এ ভালো সাড়াই হয়ে ওঠে কাঙ্খিত লক্ষ্য। তাই হাসির দৃশ্য তৈরির জন্য নানা প্রয়াস নেওয়া হয়। মূলত তৃপ্তি মিত্রের নির্দেশনায় হাস্যরস সৃষ্টিতে 'লভ সিন, ‘প্রগ্রেসিভ লভ সিন' তৈরি করা হয় | কিন্তু নাট্যকার তথা অভিনেতা শম্ভু মিত্র, সহ-অভিনেতা অমর গাঙ্গুলিরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে এইভাবে দর্শককে হাসানো সম্ভব নয়। শেষপর্যন্ত সেই হাসির খোরাক খুঁজতে চার দেয়ালের বাইরে বেরিয়ে আসেন তাঁরা। তখনই খাদ্য-বস্ত্রের দাবি জানিয়ে একটি মিছিল আসে। পুলিশের আপত্তি সত্ত্বেও মিছিল এগোলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায় | মিছিলে হাহাকার-গোঙানির আওয়াজ ভেসে আসে। পুলিশ চলে গেলে শম্ভু মিত্র, অমর গাঙ্গুলির কাছে জানতে চান এবার তাঁর হাসি পাচ্ছে কি না। “এবার নিশ্চয়ই লোকের খুব হাসি পাবে?”—এই একটা মন্তব্যই ব্যঙ্গের আশ্রয়ে বুঝিয়ে দেয় সভ্যতার কুশ্রী চরিত্রকে। মানুষ নির্মম ঘটনার মধ্যেও বিনোদন খোঁজে, জীবনের কঠিন স্বরূপকে এড়িয়ে চলতে চায় । তখনই হাসির ‘বিভাব’ হয় মানুষের রক্তক্ষরণ, আর্ত চিৎকার। এই তাৎপর্যেই নাটকের নামকরণ ‘বিভাব’ সার্থক হয়ে উঠেছে।

'বিভাব' নাটকের সূচনা অংশে নাট্যকার শম্ভু মিত্র নিজেই এটিকে 'একাঙ্কিকা' বলে উল্লেখ করেছেন। বহিরাঙ্গিক বিচারে আয়তনের সংক্ষিপ্ততা এবং চরিত্রের স্বল্পতা এই নাটকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শম্ভু মি অমর গাঙ্গুলি এবং 'বৌদি' তৃপ্তি মিত্র—এই তিনটি চরিত্রকে আশ্রয় করে নাটকটি রচিত। একাঙ্ক নাটকের শর্ত মেনে একটিমাত্র উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নাটকটি রচিত হয়েছে এবং তা হল নাটকে হাসির কারণ সন্ধান। কিন্তু তার আড়ালে নাট্যকার আসলে স্পষ্ট করতে চেয়েছেন, জীবনের প্রকৃত স্বরূপকে বিসর্জন দিয়ে স্থূল হাসির জন্য দর্শকদের ও তথাকথিত নাট্যদলগুলোর অপপ্রয়াসকে। একাঙ্ক নাটকেও ক্লাইম্যাক্সের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। 'বিভাব' নাটকে দেখা যায় 'লভ সিন', 'প্রগ্রেসিভ লড সিন' ইত্যাদি অভিনয় করেও যখন যথেষ্ট হাসির উদ্রেক হল না——তখন শম্ভু মিত্র অমর গাঙ্গুলিকে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন, সেখানে দেখা যায় 'চাল', ‘কাপড়'-এর দাবিতে মানুষের মিছিল চলেছে, তাতে পুলিশ গুলি চালায় এবং সামনে থাকা ছেলে মেয়েটি লুটিয়ে পড়ে। সেদিকে তাকিয়ে শম্ভু মিত্র মন্ত করেন—“এবার নিশ্চয়ই লোকের খুব হাসি পাবে?”—সমগ্র নাটকটি শেষ অবধি গিয়ে দাঁড়ায় এই একটি মন্তব্যের শীর্ষদেশে। এই বাস্তবতাকে আশ্রয় করাই একাঙ্ক নাটকের ধর্ম।

এইসব সাধারণ বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি গ্রুপ থিয়েটারের নিজস্ব ভাবনার প্রকাশে ভঙ্গিনির্ভর, মঞ্চসজ্জাহীন অভিনয়ের দিকে নাট্যকারের ঝোঁক এবং শুরুতে সূচনা অংশে তাঁর অনুপ্রেরণা হিসেবে দেশ-বিদেশের নানা নাটকের প্রসঙ্গ উল্লেখ, নিঃসন্দেহে এক অনারকম সূচনা। এভাবে সর্ব অর্থেই 'একাঙ্ক' নাটক হিসেবে 'বিভাব' বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে।

অভিনেতা-নাট্যকার শম্ভু মিত্র তাঁর 'বিভাব' নাটকে প্রধাগত নাট্যরীতি থেকে সরে এসে নিজস্ব নাট্যরীতির অসাধারণ প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। মঞ্চসজ্জা বা অভিনয় উপকরণের স্বল্পতার বাধা কাটিয়ে নাটক অভিনয়ের জন্যই তিনি এই নিজস্ব নাট্যরীতির সন্ধান করেছেন। এক্ষেত্রে প্রাচীন বাংলা নাটক, উড়ে যারা কিংবা মারাঠি তামাশা হয়ে উঠেছে তাঁর প্রেরণা, সাহস জুগিয়েছে বিখ্যাত রাশিয়ান চিত্রপরিচালক আইজেনস্টাইনের লেখা উপকরণের যথাযথ ব্যবহার না করে শুধু ভঙ্গির সাহায্যে দশকের কল্পনাশক্তির উপর নির্ভর করে নাট্যবিষয়কে ফুটিয়ে তোলাই এই নাট্যরীতির বৈশিষ্ট্য।

নাটকের সূচনায় শম্ভু মিত্র তাঁর দীর্ঘ বক্তব্যে নিজের নাট্যভাবনাকে যেমন তুলে ধরেন, তেমনই বাঙালির ঔপনিবেশিক মানসিকতাকেও ব্যঙ্গ করেন। এ নাটকের সংলাপ সুগঠিত নয়। নাটকটিতে কিছু মানুষের পারস্পরিক কথোপকথনের মধ্য দিয়ে ভাষার অনেকগুলো স্তর ফুটে উঠেছে, মাঝেমধ্যে একটা এলোমোলো ধরনও তৈরি হয়েছে। এর ফলে নাটকের মধ্যে জীবনের উত্তাপ আরও বেশি করে খুঁজে পাওয়া গেছে। হাসির উপকরণ খুঁজতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মৃত মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে যখন বলা হয়- “এবার নিশ্চয়ই লোকের খুব হাসি পাবে?” তখন স্থূল হাসি খুঁজতে ব্যস্ত সমাজকে চুপ করিয়ে দেয় নাট্যকারের এই তীব্র ব্যঙ্গ। কাহিনি বিন্যাসের এই চমক নাটককে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেয়।

শম্ভু মিত্র তাঁর 'বিভাব' নাটকে শুধু প্রচলিত নাট্যরীতিরই বদল ঘটাননি, সেই সঙ্গে তাঁর নিজের নাট্য বিষয়ক ভাবনারও প্রকাশ ঘটিয়েছেন। নাটকের সূচনায় শম্ভু মিঘ নিজেই অন্য ধারার নাটকের অভিনয়ে নানা অর্থনৈতিক সমস্যার কথা বলেছেন। সারাজীবনই একটা নিজস্ব মঞ্চের আকাঙ্ক্ষা পোষা করেছেন শম্ভু মিত্র "নিজেদের একটা মঞ্চ থাকবে, যেখানে মনের সাধে নানা রকম প্রয়োগকৌশল পরীক্ষা করা যাবে।" অন্য ধারার নাটকের কাছ থেকে সরকারের কর আদায়, অথচ পেশাদারি থিয়েটারকে করমুক্ত রাখার বিরুদ্ধেও 'বিভাব' নাটকে প্রতিবাদী ভূমিকায় দেখা যায় শত্রু মিত্রকে।

আপাতভাবে হাসির নাটক মস্থ করার যে অভিপ্রায় নিয়ে নাটকের সংলাপ শুরু হয়েছে, তার সঙ্গে বক্স অফিসের চাহিদাকে জুড়ে দেওয়া হয়। নাটকের গুণগত মানের থেকে দর্শক চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়ার যে প্রয়াস নাট্যাভিনয়ে দেখা যায়, তাকেই এখানে তুলে ধরা হয়েছে। কেবল হাসির খোরাক হিসেবে জীবনকে দেখা, মানুষের সমস্যাকে উপলব্ধি না করা ইত্যাদি শম্ভু মিত্রের শিল্পদর্শন ছিল না। তিনি নিজেই লিখেছেন— " শিল্প মানুষের বোধের একটা হাতিয়ার।" নাট্যকাহিনির শেষে খাদ্য ও যন্ত্রের দাবিতে এগিয়ে আসা মিছিলের ওপরে পুলিশের নির্বিচারে গুলিচালনা দেখে যখন নাট্যকার বলেন, “এবার নিশ্চয়ই লোকের খুব হাসি পাবে?”—তখন নাট্যকারের বোধ, মধ্যবিত্তের সম্রা মানসিকতাকে আঘাত করার মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণতা পায় ।

অভিনেতা ও নাট্যকার শম্ভু মিত্রের 'বিভাব' নাটকের প্রেক্ষপটে রয়েছে হাসির নাটক করার জন্য হাসির উপকরণের সন্ধান। কিন্তু কোনো বিশেষ টিন কিংবা 'লক্ষ সিনা বা প্রসেসিভ লাভ দিন' তৈরি করে এই হাসি সৃষ্টিতে কার্য হন নাট্যকার। নাট্যকারের প্রস্তাবমতো চার দেয়ালের বাইরে বেরিয়ে বহু গতিশীল জীবনেও তাঁরা হাসির কোনো উপকরণই খুঁজে পান ন, 'কাপড়'-এর দাবি জানিয়ে একটি নিছিল আসে। উলটো দিক থেকে হাজির হয় পুলিশও। সার্ভেন্ট মিছিলকে ফিরে যাবার নির্দেশ দিলেও স্লোগান চলতেই থাকে। নিরস্ত্র জনগণের ওপর গুলি চালায়। পুলিশ এবং একটি ছেলে ও একটি মেয়ে পড়ে যায়। হাহাকার আর গোঙানির সাব্দে ভরে ওঠে চারপাশ। পুলিশ চলে গেলে অনর গাঙ্গুলি এবং শম্ভু মিত্রের পুনরায় মানে আগমন ঘটে। আর সেসময়ই শম্ভু মিত্র দর্শকদের দিকে তাকিয়ে

বলেন এবার নিশ্চয়ই লোকের খুব হাসি পাবে?” —এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে কোথাও যেন সাধারণ মানুষ সম্পর্কে উন্নাসিক নাগরিক সমাজের আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতাকে চাবুক মারা হয়। যারা সম্ভা মনোরঞ্জনকে উপভোগ করতে চাষ, জীবনের গভীরতাকে ছুঁতে চায় না হাসির উপকরণ খুঁজতে থাকা অভিনেতা শম্ভু মিত্রের বিবেক যেন তাদের সেই উদাসীনতাকেই তাচ্ছিল্য করে।

অভিনেতা ও নাট্যকার শম্ভু মিত্রের 'বিভাব' নাটকের প্রেক্ষপটে রয়েছে হাসির নাটক করার জন্য হাসির উপকরণের সন্ধান। কিন্তু কোনো বিশেষ টিন কিংবা 'লক্ষ সিনা বা প্রসেসিভ লাভ দিন' তৈরি করে এই হাসি সৃষ্টিতে কার্য হন নাট্যকার। নাট্যকারের প্রস্তাবমতো চার দেয়ালের বাইরে বেরিয়ে বহু গতিশীল জীবনেও তাঁরা হাসির কোনো উপকরণই খুঁজে পান ন, 'কাপড়'-এর দাবি জানিয়ে একটি নিছিল আসে। উলটো দিক থেকে হাজির হয় পুলিশও। সার্ভেন্ট মিছিলকে ফিরে যাবার নির্দেশ দিলেও স্লোগান চলতেই থাকে। নিরস্ত্র জনগণের ওপর গুলি চালায়। পুলিশ এবং একটি ছেলে ও একটি মেয়ে পড়ে যায়। হাহাকার আর গোঙানির সাব্দে ভরে ওঠে চারপাশ। পুলিশ চলে গেলে অনর গাঙ্গুলি এবং শম্ভু মিত্রের পুনরায় মানে আগমন ঘটে। আর সেসময়ই শম্ভু মিত্র দর্শকদের দিকে তাকিয়ে

বলেন এবার নিশ্চয়ই লোকের খুব হাসি পাবে?” —এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে কোথাও যেন সাধারণ মানুষ সম্পর্কে উন্নাসিক নাগরিক সমাজের আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতাকে চাবুক মারা হয়। যারা সম্ভা মনোরঞ্জনকে উপভোগ করতে চাষ, জীবনের গভীরতাকে ছুঁতে চায় না হাসির উপকরণ খুঁজতে থাকা অভিনেতা শম্ভু মিত্রের বিবেক যেন তাদের সেই উদাসীনতাকেই তাচ্ছিল্য করে।

[11:37 pm, 26/09/2022] Anju: "বিভাব" নাটকে ঘরের মধ্যে প্রেমের দৃশ্য তৈরি করে তাতে হাসির কোনো উপকরণ খুঁজে না পাওয়ায় চার দেয়ালের বাইরে বেরোনোর প্রস্তাব দেন। নাট্যকার ও অভিনেতা শম্ভু মিত্র। প্রথমে কাল্পনিক বসার ভঙ্গির মাধ্যমে

"হঠাৎ পেছন থেকে..... পরদা নেমে এবং পরে 'লভ সিন' ও 'প্রগ্রেসিভ লভ সিন' অভিনয় করেও সার্থক হাসির নাটক সৃষ্টিতে শম্ভু মিত্র, বউদি তৃপ্তি মিত্র ও সহ-অভিনেতা অমর গাঙ্গুলি ব্যর্থ হন। তখনই নাট্যকার উপলব্ধি করেন ঘরের মধ্যে জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে না। চার দেয়ালের বাইরে জীবনের যে বিরাট তাৎপর্য আছে, প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াই এবং শোষণ ও বঞ্চনার যে করুণ কাহিনি আছে, তা বক্তার চেতনায় ধরা পড়ে না। গণ্ডিবদ্ধ জীবনের বাইরে রাস্তায় মোটরগাড়ি, বাস চলে। হাত-রিকশা নিয়ে মুখে আওয়াজ করতে করতে চালক ছুটে যায় | ঘন্টি বাজিয়ে ছুটে চলে ট্রাম। কিন্তু বাস্তব জগতের এইসব দৃশ্যের মধ্যে কোথাও হাসির আয়োজন বা উপকরণ বক্তা খুঁজে পান না। এই খুঁজে না পাওয়ার অর্থ অবশ্যই জীবনের যথাযথ তাৎপর্য বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর অক্ষমতা। বাংলা নাটকে পপুলারিটি অর্জনের জন্য জীবনকে গভীরভাবে বোঝার ক্ষেত্রে যে দৈন্য তৈরি হয়েছিল, প্রশ্নোদৃত মন্তব্যে যেন তারই প্রকাশ ঘটেছে।

"বিভাব" নাটকে নাট্যদলের সম্পাদকের নির্দেশে হাসির নাটকের উপকরণ খুঁজতে শম্ভু মিত্র সহ-অভিনেতা অমর গাঙ্গুলির বাড়িতে যান। সেখানে তৃপ্তি মিত্রের নির্দেশনায় 'লভ সিন' এবং 'প্রগ্রেসিভ লড সিন'-এর দৃশ্যের অবতারণা করেও যখন হাসি পায় না তখন তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে, ঘরের মধ্যে জীবনকে উপলব্ধি করা যাবে না। হাসির খোরাক, পপুলার জিনিসের খোরাক'-এর জন্য চার দেয়ালের বাইরে বেরোতে হবে। রাস্তায়, মাঠে, ঘাটে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু কাল্পনিকভাবে রাস্তায় গিয়েও সেখানকার মোটরগাড়ি, বাস, হাত রিকশা কিংবা চলন্ত ট্রামের মধ্যে হাসির উপকরণের খোঁজ মেলে না।

হাসির উপাদান নিয়ে শম্ভু মিত্র এবং অমর গাঙ্গুলি যখন হতাশ সেই সময়েই রাস্তায় একটা মিছিল থেকে খাদ্য-বস্ত্রের দাবিতে স্লোগান শোনা যায়। মিছিলের সামনে পুলিশ চলে আসে। তারা আন্দোলনকারীদের ফিরে যেতে বললেও তারা ফিরে যায় না। পুলিশের গুলি চলে। একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে চিৎকার করে পড়ে যায়। হাহাকার আর গোঙানির শব্দের মধ্যেই পুলিশ চলে যায়। এতক্ষণ আড়াল থেকে এইসব দৃশ্য দেখার পরে শম্ভু মিত্র এবং অমর গাঙ্গুলি মঞ্চে প্রবেশ করেন। শম্ভু মিত্র তাঁর হাসির নাটকের সন্ধান শেষ করেন এই বলে—“এবার নিশ্চয়ই লোকের খুব হাসি পাবে?” জীবনের নির্মম অভিজ্ঞতা এবং সস্তা জনপ্রিয়তার খোঁজে নাটকের প্রযোজনাকে এভাবেই তীব্র শ্লেষে বিদ্ধ করেন নাট্যকার।

অভিনেতা ও নাট্যকার শম্ভু মিত্রের 'বিভাব' নাটকে নাট্যদলের সম্পাদকের নির্দেশ ছিল বক্স অফিসের চাহিদা অনুযায়ী হাসির নাটক মঞ্চস্থ করার। সেই হাসির নাটকের উপকরণ খুঁজতে শম্ভু মিত্র এসে পৌঁছোন সহ-অভিনেতা অমর গাঙ্গুলির বাড়িতে। প্রথমে শম্ভু মিত্র বসার ভঙ্গির মাধ্যমে হাস্যরস সৃষ্টির চেষ্টা করেন, কিন্তু অমর গাঙ্গুলি এবং বউদি তৃপ্তি মিত্র জানিয়ে দেন, “এতে হবে না", কারণ এর কোনো 'হিউম্যান ইন্টারেস্ট' বা 'পপুলার অ্যাপিলা নেই। এরপর তৃপ্তি মিত্রের উদ্যোগে দর্শকদের চাহিদার কথা ভেবে 'লভ সিন' এবং তারপর 'প্রগ্রেসিভ লড সিন'-এর দৃশ্য অভিনীত হয়। কিন্তু তা-ও সার্থক হাসি তৈরি করতে পারে না। তখনই শম্ভু মিত্র নাটককে চার দেয়ালের গন্ডি থেকে বের করে বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিয়ে যেতে বলেন। তাঁর মতে সেখানেই 'হাসির খোরাক', পপুলার জিনিসের খোরাক পাওয়া যাবে। এখানে মূলত জীবনের গভীরতাকে খোঁজার বদলে তার লঘু ব্যঞ্জনা বা খোরাক' কে খোঁজার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে বাংলা নাটকের সম্ভা জনপ্রিয়তা খোঁজার যে চেষ্টা, সেদিকেও নাট্যকারের শ্লেষ রয়েছে। শম্ভু মিত্র লিখেছেন— "কিছু গভীর কথা যদি গভীরভাবে বলবার থাকে তার, তবেই সে শিল্পী, .... কেবল যদি মনোহরণ করাটাই উদ্দেশ্য হয় তার, তাহলে সে ভাড় মাত্র।" এই সম্ভা জনপ্রিয়তা খোঁজার প্রবণতাকেই 'বিভাব' নাটকে পরোক্ষ শ্লেষের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

শম্ভু মিত্রের 'বিভাব' নাটক থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশটির বক্তা নাট্যকার স্বয়ং।

"বিভাব" নাটকে ঘরের মধ্যে প্রেমের দৃশ্য তৈরি করে তাতে হাসির কোনো উপকরণ খুঁজে না পাওয়ায় চার দেয়ালের বাইরে বেরোনোর প্রস্তাব দেন। নাট্যকার ও অভিনেতা শম্ভু মিত্র। প্রথমে কাল্পনিক বসার ভঙ্গির মাধ্যমে "হঠাৎ পেছন থেকে..... পরদা নেমে  পরে 'লভ সিন' ও 'প্রগ্রেসিভ লভ সিন' অভিনয় করেও সার্থক হাসির নাটক সৃষ্টিতে শম্ভু মিত্র, বউদি তৃপ্তি মিত্র ও সহ-অভিনেতা অমর গাঙ্গুলি ব্যর্থ হন। তখনই নাট্যকার উপলব্ধি করেন ঘরের মধ্যে জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে না। চার দেয়ালের বাইরে জীবনের যে বিরাট তাৎপর্য আছে, প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াই এবং শোষণ ও বঞ্চনার যে করুণ কাহিনি আছে, তা বক্তার চেতনায় ধরা পড়ে না। গণ্ডিবদ্ধ জীবনের বাইরে রাস্তায় মোটরগাড়ি, বাস চলে। হাত-রিকশা নিয়ে মুখে আওয়াজ করতে করতে চালক ছুটে যায় | ঘন্টি বাজিয়ে ছুটে চলে ট্রাম। কিন্তু বাস্তব জগতের এইসব দৃশ্যের মধ্যে কোথাও হাসির আয়োজন বা উপকরণ বক্তা খুঁজে পান না। এই খুঁজে না পাওয়ার অর্থ অবশ্যই জীবনের যথাযথ তাৎপর্য বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর অক্ষমতা। বাংলা নাটকে পপুলারিটি অর্জনের জন্য জীবনকে গভীরভাবে বোঝার ক্ষেত্রে যে দৈন্য তৈরি হয়েছিল, প্রশ্নোদৃত মন্তব্যে যেন তারই প্রকাশ ঘটেছে।

শম্ভু মিত্রের 'বিভাব' নাটকে দেখা যায়, নাট্যদলের সম্পাদকের নির্দেশ অনুসারে, জনপ্রিয় হাসির নাটক মঞ্চ করবার জন্য তৃপ্তি মিত্র 'লভ সিন' উপস্থাপনার উদ্যোগ নেন। কিন্তু নিজেকে কলেজছাত্রী নায়িকা এবং শম্ভু মিডকে নায়ক করে যে দৃশ্যটির অভিনয় হয়, তাতে যে হাসির সৃষ্টি হচ্ছে না। সে বিষয়ে শম্ভু মিঘ এবং অমর পাগুলি সহমত পোষণ করেন। তখন তৃপ্তি মিত্রের প্রস্তাব অনুযায়ী 'প্রগ্রেসিভ লড সিন' অভিনয়ের সিদ্ধান্ত হয়। নায়ক শম্ভু মিত্রকে একজন আত্মগোপনকারী রাজনৈতিক নেতা, তৃপ্তি মিত্রকে তাঁর প্রেমিকা এবং অমর গাঙ্গুলিকে পুলিশ হিসেবে উপস্থাপন করে অভিনীত এই দৃশ্যের প্রতিক্রিয়ায় শম্ভু মিত্র “একটু একটু হাসি পাচ্ছিল" বললেও অমর গাঙ্গুলি স্পষ্টতই জানিয়ে দেন- "...এতে আমার হাসি পেল না"। এতে বউদি তৃপ্তি মিত্র অত্যন্ত রেগে গিয়ে বলেন— "তা হলে আপনার হাসি জীবনে কোনোদিন পাবে না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শম্ভু মিত্র অপ্রিয় সত্য বলতে অমর গাঙ্গুলিকে নিষেধ করেন। নিজের কথার সমর্থনে সংস্কৃত বাক্য উদ্ধৃত করে শম্ভু মিত্র জানান—"মা বুয়াৎ সত্যম্ অপ্রিয়ম্” অর্থাৎ অপ্রিয় সত্য কথা বলা উচিত নয়। এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই অমর গাঙ্গুলি প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি করেন। সংস্কৃত ভাষায় নিজের জ্ঞানের অভাবকেই এভাবে অকপটে স্বীকার করেছেন বস্তা আর গাঙ্গুলি।

নাট্যকার ও অভিনেতা শম্ভু মিত্রের 'বিভাব' নাটকে দেখা যায়, শম্ভু মিত্র নাট্যদলের সম্পাদকের নির্দেশে হাসির নাটক মঞ্চস্থ করার উদ্দেশ্যে হাসির রসদ খুঁজতে অমর গাঙ্গুলির বাড়িতে যান। প্রথমে কল্পিত বসার ভঙ্গি করে হাসি সৃষ্টিতে লম্ভু মিত্র ব্যর্থ হলে বউদি তৃপ্তি মিত্র 'লভ সিন'-এর মাধ্যমে হাস্যরস সৃষ্টির প্রস্তাব দেন। কিন্তু তাঁর নির্দেশনায় শম্ভু মিত্রকে নায়ক করে এবং নিজেকে নায়িকার ভূমিকায় রেখে যে দৃশ্যটির অনুশীলন হয়, তা দেখে শম্ভু মিত্র এবং অমর গাঙ্গুলি দুজনেই এক মত হন যে, "হাসি পাচ্ছে না”। তখন তৃপ্তি মিত্র একটি 'প্রগ্রেসিভ লভ সিন' অভিনয়ের কথা বলেন। নায়ক শ মিত্রকে একজন আত্মগোপন করে থাকা রাজনৈতিক নেতা, অমর গাঙ্গুলিকে পুলিশ এবং তৃপ্তি মিত্রকে নায়িকা ও শম্ভু মিত্রের প্রেমিকা হিসেবে উপস্থাপন করে দৃশ্যটি অভিনীত হয়। দৃশ্যটির শেষে শম্ভু মিত্র জানলা দিয়ে পালাতে চেষ্টা করেন আর পুলিশবেশী অমর গাঙ্গুলি তাঁকে চোর ভেবে তাড়া করেন। কিন্তু অভিনয় শেষে শম্ভু মিত্র কিছুটা দ্বিধা নিয়ে “একটু একটু হাসি পাচ্ছিল” বললেও অমর গাঙ্গুলি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, দৃশ্যটিতে তাঁর একেবারেই হাসি পায়নি। এতে বউদি তৃপ্তি মিত্র রেগে গিয়ে উদ্ধৃত মন্তব্যটি করেন।

নাট্যকার-অভিনেতা শম্ভু মিত্রের 'বিভাব' নাটকে 'বহুরূপী' নাট্যগোষ্ঠীর সম্পাদকের চাহিদামতো হাসির নাটক তৈরিতে প্রয়াসী হন স্বয়ং শম্ভু মিত্র এবং সহ-অভিনেতা অমর গাঙ্গুলি ও তৃপ্তি মিত্র। তাদের দ্বারা অভিনীত প্রথম সাধারণ প্রেমের দৃশ্যটি হাস্যরস সৃষ্টিতে সফল হয়নি। ফলে নায়িকা তৃপ্তি মিত্র "আর একটা চেষ্টা"-র লক্ষ্যে একটি 'প্রগ্রেসিভ লড সিন' অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। দৃশ্যটিতে নায়ক নায়িকার চরিত্রে যথাক্রমে শম্ভু ও তৃপ্তি মিত্রকে এবং পুলিশ। আধিকারিকের ভূমিকায় দেখা যায় অমর গাঙ্গুলিকে। একজন আত্মগোপনকারী রাজনৈতিক নেতা পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে যাচ্ছেন এবং প্রিয়তমার সঙ্গে তাঁর চিরবিচ্ছেদ ঘটছে— এই দৃশ্যটির অভিনয় করা হয়। তৃপ্তি মিত্রের কথামতো প্রেম পৃথিবীর সবচেয়ে পপুলার জিনিস"। হলেও ইংরেজি শিক্ষিত ঔপনিবেশিকতার বাহক বাঙালির মন তাতে ভিজবে না বুঝতে পেরেই 'প্রগ্রেসিভ লভ সিন'-এর পরিকল্পনা করা হয়।। রাজনীতিচাপ্রিয় বাঙালির মন পেতে প্রেমের গল্পের নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অবতারণা প্রসঙ্গেই 'প্রগ্রেসিভ' কথাটি এসেছে। 'প্রগ্রেসিভ' অর্থাৎ প্রগতিশীল কোনো বিষয়কে প্রেমের দৃশ্যের নেপথ্যে রাখলে তথাকথিত প্রগতিশীল' বাঙালির জনপ্রিয়তা আদায় সম্ভব হবে—এ কথা মাথায় রেখেই দৃশ্যটিকে 'প্রগ্রেসিভ' বলা হয়েছে।

অভিনেতা ও নাট্যকার শম্ভু মিত্রের 'বিভাব' নাটকে হাসির দৃশ্য তৈরির প্রয়োজনে তৃপ্তি মিত্রের নির্দেশনায় একটি 'প্রগ্রেসিভ লভ সিন' তৈরির চেষ্টা হয়। সেখানে নায়ক শম্ভু মিত্র একজন আত্মগোপনকারী রাজনৈতিক নেতা আর অমর গাঙ্গুলি হন একজন পুলিশ। বউদি অর্থাৎ নায়িকা তৃপ্তি মিত্র ভয়ার্ত মুখে নায়ককে খবর দেন, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ নিশ্চয়ই শম্ভু মিত্রকেই ধরতে আসছে। এই মুহূর্তেই তাঁর পালিয়ে যাওয়া দরকার।
নায়ককে প্রথমে সিঁড়ি দিয়ে পালাতে বললেও পরে সাবধানতার খাতিরে তিনি শম্ভু মিত্রকে সিঁড়ি দিয়ে না নেমে জানলা দিয়ে পালাতে বলেন প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে তৃপ্তি মিত্রের 'বীর' সম্বোধনে উদ্দীপ্ত শম্ভু মিত্র কল্পিত জানলা থেকে নীচে লাফিয়ে পড়ার ভঙ্গি করেন এবং উপরের দিকে অর্থাৎ বউদি তৃপ্তি মিত্রের দিকে তাকান। সেই সময়েই ‘পুলিশ' অমর গাঙ্গুলি নীচে দাঁড়িয়ে খৈনি খাচ্ছিলেন | জানলা দিয়ে শম্ভু মিত্রকে লাফিয়ে পড়তে দেখে তিনি তাঁকে। চোর ভেবে ধরতে উদ্যত হন এবং উদ্ধৃত মন্তব্যটি করেন। নাটকের সংলাপকে আরও জীবন্ত করার জন্য, পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে খৈনি খাওয়া পুলিশের মুখে এই ধরনের হিন্দি সংলাপ বিষয়ের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে |

শম্ভু মিত্রের 'বিভাব' নাটকে দেখা যায়, নাট্যদলের সম্পাদকের নির্দেশে, হাসির নাটক তৈরির উদ্দেশ্যে শম্ভু মিত্র বহুরূপী নাট্যগোষ্ঠীর অপর অভিনেতা অমর গাঙ্গুলির বাড়িতে হাসির রসদ খুঁজতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে হাস্যরস সৃষ্টিতে তাঁর প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তখন কীভাবে সার্থকরূপে হাসি সৃষ্টি করা যায়, তা উল্লেখ করতে গিয়ে নাট্যগোষ্ঠীতে 'বৌদি' বলে পরিচিত তৃপ্তি মিত্র মন্তব্যটি করেন।
অমর গাঙ্গুলির বক্তব্য অনুযায়ী, যে নাটকে কোনো গল্প নেই, 'হিউম্যান ইন্টারেস্ট' বা 'পপুলার অ্যাপিল' নেই, তা থেকে সমার্থ হাস্যরস তৈরি হতে পারে না। তাই শম্ভু মিত্রের কথিত বসার ভঙ্গি তাঁদের কাছে হাসির উপকরণ। হিসেবে বিবেচিত হয় না। এরপরই বউদি তৃপ্তি মিত্র প্রেমকে পৃথিবীর সব থেকে পপুলার জিনিস বলে চিহ্নিত করেন। এরই সূত্র ধরে শম্ভু মিত্রকে নায়ক এবং তৃপ্তি মিত্রকে নায়িকা করে মূলত তৃপ্তি মিত্রের নির্দেশনায় একটি প্রেমের দৃশ্যের অভিনয়ের অনুশীলন হয়। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ হাসি সৃষ্টির প্রচেষ্টা সেখানেও বাঘ হয়। ফলে নতুন প্রেমের মূল্য তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। অর্থাৎ, আপাতভাবে নাটকে 'প্রেম' শব্দটিকে রঙ্গতামাশার বিষয় করে তার অবমূল্যায়ন ঘটানোর মধ্য দিয়ে এক সামাজিক প্রবণতাকেই যেন তুলে ধরা হয়, আর তার ভূমিকায় থেকে যায় তৃপ্তি মিত্রের মন্তব্যটি।

বিডাব' নাটকে দেখা যায়, শম্ভু মিত্র তাঁর নাট্যদলের সম্পাদকের ইচ্ছা অনুসারে হাসির নাটকের রসদ খুঁজতে সহ-অভিনেতা অমর গাঙ্গুলির বাড়িতে আসেন। সেখানে উপস্থিত তৃপ্তি মিত্র সাধারণ মানুষের গ্রহণযোগ্যতার কথা ভেবে তাঁদের একটি প্রেমের দৃশ্য তৈরি করা উচিত বলে মন্তব্য করেন। প্রথমেই ঘরের কাল্পনিক চেয়ার-টেবিলগুলো সরিয়ে দৃশ্যের উপযুক্ত পটভূমি তৈরি করা হয়। তারপর শম্ভু মিত্রকে নায়ক, আর বউদি তৃপ্তি মিত্রকে নায়িকার ভূমিকায় নির্বাচন করা হয়। অমর গাঙ্গুলি এতে খানিকটা অপ্রস্তুত হলেও পরে বিষয়টি মেনে নেন। তৃপ্তি মিত্রের নির্দেশনায় মসৃষ্টিকেই রাস্তা ভেবে নিয়ে সেখানে কলেজ থেকে আসা নায়িকার সঙ্গে নায়কের ধাক্কাধাক্কির দৃশ্যের পরিকল্পনা করা হয়। ধাক্কা লাগার পরে এক পা পিছিয়ে গিয়ে "কেয়া আপ দেখতে নেহি...." বলে নায়িকা তৃপ্তি মিত্র শম্ভু মিত্রের গালে একটা চড় কষিয়ে দেন। শম্ভু মিত্র ও অমর গাঙ্গুলি এই আকস্মিক চড়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। শম্ভু মিত্র একে 'জখমি লড সিন' বলে চিহ্নিত করেন। নেপথ্য থেকে হারমোনিয়াম সহযোগে একটি মেয়ের কণ্ঠে কিছুটা ন্যাকামির ভঙ্গিতে 'মালতী লতা দোলে' রবীন্দ্রসংগীতটি শোনা যায়। কিন্তু শম্ভু মিত্র ও অমর গাঙ্গুলি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছোন যে, তাঁদের মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ হাসি সৃষ্টি এখানেও সম্ভব হচ্ছে না। এভাবেই এই দৃশ্য পরিকল্পনার সমাপ্তি ঘটে।

অভিনেতা এবং নাট্যকার শম্ভু মিত্রের 'বিস্তার' নাটকে নেপথ্যের এই মন্তব্যটি করেছেন। বক্স অফিস মাতাতে বউদি অর্থাত্ তৃপ্তি মিত্রের প্রস্তাবে তাঁরই নির্দেশনায় একটি প্রেমের দৃশ্যের অভিনয় হচ্ছিল। সেখানে নায়ক শম্ভু মিত্রের সঙ্গে কলেজছাত্রী নায়িকা তৃপ্তি মিত্রের কল্পিত রাস্তায় ধাক্কার একটি দৃশ্যে নেপথ্যে হারমোনিয়াম বেজে ওঠে এবং একটি মেয়ের কণ্ঠে শোনা যায় 'মালতী লতা দোলে' গানটি। তৃপ্তি মিত্র ফিল্‌ম কায়দায় গাওয়া সেই রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে ঠোঁট মেলান। কিন্তু “কিঞ্চিৎ ন্যাকামির ভঙ্গিতে গাওয়া' সেই গানটি শুনে শম্ভু মিত্র বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন—“...এই কি রবীন্দ্রনাথের গান হচ্ছে নাকি?” তখনই নেপথ্য থেকে উদ্ধৃত মন্তব্যটি ভেসে আসে। হারমোনিয়ামবাদক বলেন, সবসময় নান্দনিকতা অর্থাৎ শিল্পসৌন্দর্যের দিক নিয়ে ভাবলে চলে না। অর্থাৎ দর্শকের চাহিদার কথা মাথায় রেখে শিল্পে এ ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি বা স্খলন হলেও কোনো অসুবিধা নেই । বস্তুতপক্ষে সৃজনশীলতার সঙ্গে জনপ্রিয়তার একটা চিরকালীন দ্বন্দ্ব শিল্পকলায় থেকেই গেছে। শিল্পগতভাবে যা সার্থক তা জনপ্রিয় নাও হতে পারে, আবার জনপ্রিয়তার লক্ষ্যে অনেকসময় শিল্পের বিকার ঘটে থাকে।

শম্ভু মিত্রের 'বিভাব' নাটকে আলোচ্য উক্তিটি করেছেন সহ-অভিনেতা অমর গাঙ্গুলি।

” আলোচ্য নাটকে দেখা যায় শম্ভু মিত্র অমর গাঙ্গুলির বাড়িতে এসেছিলেন এবং তাঁর সেই আগমনের কারণ ছিল 'হাসির খোরাক' জোগাড় করা। বক্স অফিসের চাহিদার কথা ভেবে নাট্যদলের সম্পাদক একটি হাসির নাটক মঞ্চস্থ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরই সূত্র ধরে হাসির উপকরণ খুঁজতে নাটকের অন্যতম চরিত্র শম্ভু মিত্র অমর গাঙ্গুলির বাড়িতে হাজির হলে অমর গাঙ্গুলি এই মন্তব্যটি করেন। এই প্রসঙ্গটির মধ্য দিয়ে নাটক তার মূল বিষয়ে প্রবেশ করে বলেই মন্তব্যটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এরপর শম্ভু মিত্র, অমর গাঙ্গুলি এবং বউদি তৃপ্তি মিত্র একের পর এক প্রেমের দৃশ্য তৈরি করে হাস্যরস সৃষ্টির চেষ্টা করেন। কিন্তু সেইসব দৃশ্য স্বতঃস্ফূর্ত হয় না। এককথায়, নাটকে হাস্যরস সৃষ্টির যে কৃত্রিম প্রচেষ্টা, তার নানা রূপকেই মূলত ব্যঙ্গ করা হয় এই নাট্যদৃশ্যে। শুধু তাই নয়, বাঙালি দর্শকদের জোর করে হাসার চেষ্টার প্রতিও ব্যঙ্গ থাকে। ক্ষুধার্ত মানুষদের মিছিলে পুলিশের গুলি আর মানুষগুলির হাহাকার ও গোঙানির আওয়াজ শুনে শম্ভু মিত্র যখন বলেন— "কী অমর—এবার হাসি পাচ্ছে?”—তখন জীবনকে অস্বীকার করে কাল্পনিক আনন্দ খুঁজে নেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদই যেন ঘোষিত হয়। আর তারই ভূমিকায় থেকে যায় নাটকের প্রায় প্রথম পর্বে করা অমর গাঙ্গুলির উদ্ধৃত মন্তব্যটি।

আলোচ্য নাটকে দেখা যায়, নাট্যদলের সম্পাদকের নির্দেশে হাসির নাটক তৈরির রসদ খুঁজতে নাট্যকার ও অভিনেতা শম্ভু মিত্র হাজির হয়েছিলেন সহ অভিনেতা অমর গাঙ্গুলির বাড়িতে। অমর গাঙ্গুলি তাঁর বাড়িতে শম্ভু মিত্রের আগমনের উদ্দেশ্য জেনে বাঙালিদের 'কাঁদুনে জাত' হিসেবে যে পরিচিতি রয়েছে তার উল্লেখ করে বলেন — “... হাসতে হলে বেশ কোমর বেঁধে হাসতে হবে।” এরপর অমর গাঙ্গুলি, 'বৌদি' তৃপ্তি মিত্র দুজনেই শম্ভু মিত্রের কাছে হাসির কিছু নমুনা দেখতে চান। শম্ভু মিত্র তখন নিজের কল্পিত বসার ভঙ্গি নির্দেশ করে তাতে হাসি পাচ্ছে কি না জানতে চান। কিন্তু অমর গাঙ্গুলি এবং তৃপ্তি মিত্র দুজনেই অকপটে জানিয়ে দেন যে, তাঁর এই বসার বিচিত্র ভঙ্গিতে তাঁদের মোটেও হাসি পাচ্ছে না। শম্ভু মিত্র বিস্ময় প্রকাশ করলেও অমর এবং তৃপ্তি দুজনেই প্রায় একযোগে জানিয়ে দেন “এতে হবে। না”। মানুষের স্বার্থ জড়িত আছে এমন কোনো গল্প না থাকলে তা মানুষকে আকর্ষণ করবে না এবং জনগণের মনে কোনো আবেদন তৈরি হবে না বলে অমর গাঙ্গুলি জানিয়ে দেন শম্ভু মিত্রকে। তাঁর এই মন্তব্য সৃজনশীলতা বনাম জনপ্রিয়তার চিরকালীন দ্বন্দ্বকে যেমন প্রকাশ করে, তেমনই জনপ্রিয়তার নিরিখ ঠিক কী হওয়া উচিত তাও যেন নির্দেশ করে।

আলোচ্য মন্তব্যে খ্যাতনামা রুশদেশীয় চিত্রপরিচালক আইজেনস্টাইনের নাটকের রীতি সম্পর্কিত একটি লেখা পড়ার কথা বলা হয়েছে। প্রসঙ্গত, শম্ভু মিত্র তাঁর 'বিভাব' নাটকের সূচনায় প্রাচীন বাংলা নাটক, উড়ে যান্না, মারাঠি তামাশা ইত্যাদি থেকে অভিনয়ের এক ভঙ্গিনির্ভর এবং দর্শকের কল্পনার উপর নির্ভরশীল নিজস্ব ধরন আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন কিন্তু তাঁর মনে এই সংশয়ও ছিল যে, শহরের ইংরেজি শিক্ষিত ও সাহেবি কেতায় অভ্যন্ত মানুষদের এই অভিনয়রীতি আদৌ ভালো লাগবে কি না। এই সময়েই রাশিয়ান চিত্রপরিচালক আইজেনস্টাইনের লেখায় উৎসাহিত হন তিনি। মস্কোতে অনুষ্ঠিত ভঙ্গিসর্বস্ব জাপানের কাবুকি থিয়েটারের অভিনয় দেখে আইজেনস্টাইন উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন। সেখানে এক 'নাইট' ক্ষুব্ধ হয়ে দুর্গ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন এবং কতদূর চলে এলেন তা বোঝাতে তিনি স্টেজের পিছন দিক থেকে গম্ভীরভাবে এগোতে থাকেন আর শিফটাররা তাঁর ঠিক পিছনে মন্ত দুর্গদ্বার ধরে দাঁড়ায়। নাইট এগোনোর সঙ্গেই এই দরজার মাপ ক্রমশ ছোটো হতে থাকে আর একই সাথে নাইটের আরও দূরে চলে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিত রচিত হয়ে যায়। কোনো মৃত্যুদৃশ্য রচনাতেও এই ভঙ্গিকে অবলম্বন করে তাকে আর্টিস্টিক করে তোলা হয়।

এই লেখা শম্ভু মিত্রকে ভরসা দেয়, কারণ সাহেবরা এই ভঙ্গিনির্ভর নাট্যরীতিকে সমর্থন করায় ঔপনিবেশিকতায় বিশ্বাসী শহুরে দর্শকরাও এই রীতিকে মেনে নেবেন বলে তিনি মনে করেন।

নাট্যকার শম্ভু মিত্রের 'বিভাব' নাটক থেকে গৃহীত উদ্ধৃতিটিতে উল্লিখিত আইজেনস্টাইন সাহেব হলেন প্রখ্যাত এক রাশিয়ান চিত্রপরিচালক। তিনি জাপানের নৃত্যনির্ভর, ঐতিহ্যশালী কাকি থিয়েটারের অভিনেতাদের অভিনয় দেখে উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন।

আইজেনস্টাইন সেই অভিনয় দেখে লেখেন যে, কাবুকি থিয়েটারে দেহ এবং মুখভঙ্গি বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, মে এক ‘নাইট' ক্ষুব্ধ হয়ে দুর্গ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন এবং কতদূর চলে এলেন তা বোঝাতে তিনি স্টেজের পিছন দিক থেকে গম্ভীরভাবে এগোতে থাকেন। শিফটাররা তাঁর ঠিক পিছনে মধ্য দুর্গদ্বার ধরে দাঁড়ায়।

তরোয়াল-যুদ্ধের দৃশ্যে দেখা যায়, দুই যোদ্ধা খাপ থেকে মিছিমিছি তরোয়াল বের করলেন এবং কাল্পনিক যুদ্ধ করতে লাগলেন । একজন অন্যজনের কাল্পনিক খোঁচা খেয়ে লুটিয়ে পড়লেন। মরার আগে একবার তাঁর হাতটা নড়ে উঠল, তারপর একটা পা তিরতির করে কাপল, চোখটা দুবার ঘুরল, মাঘাটা দুবার নড়ল। শেষে তাঁর জিভ বেরিয়ে গেল। তারপর স্টেজে তাঁর সদ্যবিধবা স্ত্রী ঢুকে যখন প্রবল কান্নাকাটি শুরু করলেন, তখন কিন্তু সেই মৃত লোকটা উঠে আস্তে করে চলে গেলেন। কারণ, তখন দর্শকদের কাছে মহিলার শোকপ্রকাশটাই কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য, তার মৃত স্বামীর উপস্থিতি নয়। কাবুকি থিয়েটারের এইসব প্রাসঙ্গিক দৃশ্যগুলির বর্ণনাই দিয়েছিলেন আইজেনস্টাইন।

শম্ভু মিত্র তাঁর ‘বিভাব' নাটকে গ্রুপ থিয়েটারের নানারকম সমস্যার পাশাপাশি সেই সমস্যা থেকে মুক্তির পথও সন্ধান করেছেন। মঞ্চ বা মঞ্চসজ্জার উপকরণসমূহ না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে নাটক মঞ্চস্থ করা যায়, 'বুদ্ধি' শব্দটির প্রয়োগে তার উপায় খুঁজে বের করার কথাই নাট্যকার বোঝাতে চেয়েছেন।

• নাট্যকারের একবার চোখে পড়ে, কোনো এক পুরোনো বাংলা নাটকে 'রাজা রথারোহণম নাটয়তি" অর্থাৎ রাজা রথে আরোহণ করার ভঙ্গি করলেন—এ কথা লেখা ছিল। অর্থাৎ উপকরণ ছাড়াই কেবল ভঙ্গির মাধ্যমে অভিনয় সম্পন্ন করার একটি রেওয়াজ বাংলা নাটকে আগে থেকেই ছিল। উড়িষ্যার যাত্রাতেও ঘোড়ার অনুপস্থিতিতেই একটিমাত্র লাঠি সম্বল। করে রাজার নির্দেশে দূতের খবর নিয়ে আসার উদাহরণ রয়েছে। একইভাবে মারাঠি তামাশাতেও ভঙ্গিনির্ভর অভিনয়ের সাহায্যে জমিদারের কাছে চাষির কাতর আবেদন, কিংবা ব্যর্থ মনোরথ হয়ে মন্দিরে গিয়ে ভগবানের কাছে নালিনের দৃশ্য অভিনীত হতে দেখেছেন নাট্যকার। এভাবেই দর্শকদের কল্পনার সাহায্য নিয়ে ভঙ্গিনির্ভর নাট্য অভিনয়ের যে ঐতিহ্য রয়েছে, সেখান থেকেই নিজেদের নাটক মঞ্চস্থ করার বুদ্ধি পেয়েছিলেন নাট্যকার। শম্ভু মিত্র।

যে অজস্র প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গ্রুপ থিয়েটারকে নাটকের অভিনয় করতে। হয়, শম্ভু মিত্র তাঁর 'বিভাব' নাটকের সূচনায় সেই প্রতিকূলতার উল্লেখ করেছেন। এইসব সমস্যার মধ্যে একদিকে যেমন আছে সরকারের বিমাতৃসুলভ আচরণ তেমনি অন্যদিকে রয়েছে যন্ত্র, মঞ্চসজ্জা, আলো ইত্যাদি অভিনয়ের প্রয়োজনীয় জিনিসের অভাবও | আর এইসব সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য নাট্যকার শম্ভু মিত্র নিজের যতো করে সমাধানের পথ সন্ধান করেছেন। প্রাচীন বাংলা নাটক, উড়ে যাত্রা কিংবা মারাঠি তামাশায় তিনি দেখেছেন যে, শুধুমাত্র ভঙ্গিকে আশ্রয় করে কল্পনার সাহায্য নিয়ে বিষয়কে দর্শকের সামনে ফুটিয়ে তোলা হয়। এই ধরনের বিভিন্ন নাট্যকৌশল থেকে অভিনয়ের এক নিজস্ব আঙ্গিক আবিষ্কারের চেষ্টা করেন শম্ভু মিত্র। কিন্তু পরমুহূর্তে শহরের তথাকথিত শিক্ষিত এবং সাহেবি কেতায় অভ্যন্ত ইংরেজি জানা মানুষদের কাছে এই ধরনের অভিনয় গ্রহণযোগ্য হবে কি না সে বিষয়ে নাট্যকারের মধ্যে সংশয়ও দেখা দেয়। তাঁর মনে হয়েছে যদি ইংরেজরা বা সাদা চামড়ার সাহেবরা এই অভিনয় ধারাকে মেনে নেয়, তাহলেই তা সহজে এ দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে, ঠিক যেমনটা হয়েছিল নোবেল পদক পাওয়ার পর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের ক্ষেত্রে। বলা বাহুল্য, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির ঔপনিবেশিক মানসিকতাকেই এখানে নাট্যকার বাঙ্গ করেছেন।

'বিভাব' নাটকের প্রস্তাবনায় নাট্যকার শম্ভু মিত্র জানিয়েছেন যে, মারাঠি তামাশায় তিনি দেখেছিলেন মঞ্চের একপাশে দাঁড়িয়ে চাষি তার জমিদারের কাছে কাতর প্রার্থনা করে এবং শেষে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে মন্দিরে যায় ভগবানের কাছে নালিশ জানাতে। এই যাওয়ার অর্থ মঞ্চ থেকে বেরিয়ে যাওয়া নয়। সে তত্তার উপরে কয়েকবার গোল হয়ে ঘুরপাক খেল এমনভাবে যেন গ্রামটা অতিক্রম করে যাচ্ছে। তারপরে অন্যপাশে গিয়ে কাল্পনিক "এমনি সময় হঠাই.... ঝঙ্কটি মিটে যায় মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে ভগবানকে মনের দুঃখের কথা নিবেদন করতে থাকল। এদিকে জমিদার সেজে যে অভিনেতা এতক্ষণ অভিনয় করছিল, সে দর্শকদের সামনেই মুখে দাড়ি-গোঁফ এঁটে পুরোহিত সেজে অন্যদিকে চাষির সামনে গিয়ে ধর্মীয় তর্জন শুরু করে দিল। মাঠ ভরতি দর্শক চোখের সামনে দৃশ্য ও সাজসজ্জার রূপান্তর মেনে নিয়েছিল।

মারাঠি তামাশার এই ভঙ্গিনির্ভর অভিনয়শৈলী নাট্যকারকে 'বিভাব' নাটকের পরিকল্পনায় অনুপ্রাণিত করেছিল। 'বিভাব' নাটকে তাই দেখা যায়। মঞ্চসজ্জার কোনো উপকরণ ছাড়াই শুধু ভঙ্গির সাহায্যে বিষয়ের কাল্পনিক উপস্থাপন ঘটেছে দোতলায় ওঠা কিংবা শেষে নীচে রাস্তায় নেমে যাওয়া থেকে সিগারেট খাওয়া, চেয়ার টেবিল সরানো, ঘরকে রাস্তায় বদলে ফেলা, একেবারে শেষে নানারকম যানবাহনের ছবি ধরে মুখের সাহায্যে সেগুলোর মতো শব্দ করা—এই সামগ্রিক নাট্যভাবনাতেই নাট্যকার দর্শকের কল্পনাশক্তিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এই সাহস তিনি যেমন সঞ্চয় করেছিলেন উড়ে দেশের যাত্রা থেকে সেরকমই মারাঠি তামাশা থেকেও

শম্ভু মিত্রের লেখা 'বিভাব' নাটক থেকে সংকলিত এই উদ্ধৃতিটিতে নাট্যকারের দেখা মারাঠি তামাশার প্রসঙ্গ রয়েছে। নাট্যকার শ্রী শম্ভু মিত্র মারাঠি তামাশায় দেখেন যে, যজ্ঞের একদিকে দাঁড়িয়ে থেকে চাষি জমিদারের কাছে অনেক অনুরোধ-উপরোধ করে। তার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হলে সে মন্দিরে যায় ভগবানের কাছে অভিযোগ জানাতে। চাষি মন্দিরে গেলেও মঞ্চের বাইরে সে গেল না, মঞ্চের তত্তার ওপর কয়েকবার সে এমনভাবে ঘুরপাক খেল যে, তাকে দেখে মনে হল সে যেন গ্রামটা পেরিয়ে গেল। তারপর একপাশে গিয়ে সে কাল্পনিক মন্দিরকে লক্ষ করে ভগবানের উদ্দেশে তার মনের দুঃখ কথা নিবেদন করতে লাগল। কিছু আগে যে জমিদারের পাঠ করেছিল, সে মঞ্চে দাঁড়িয়েই মুখে দাড়ি-গোঁফ এঁটে পুরোহিত সাজল এবং মন্দিরের সামনে দাঁড়ানো চাষির কাছে এসে ধর্মীয় তর্জনগর্জন করতে লাগল। শ্রী শম্ভু মিত্র মারাঠি তামাশার এই দৃশ্যই দেখেছিলেন এবং তিনি এও লক্ষ করেছিলেন যে, মাঠ-ভরতি দর্শক এই আজব অভিনয় নিঃশব্দে বিনা বাক্যে দেখে চলেছে।

→ নাট্যকার শম্ভু মিত্র গ্রুপ থিয়েটারের নানাবিধ অসুবিধার কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, মঞ্জু বা মঞ্চসজ্জার উপকরণসমূহ না থাকা সত্ত্বেও নাটক যন্ত্রস্থ করা যায়। এই সিদ্ধান্তটা কীভাবে তার মাথায় এল, তার কারণ হিসেবেই নাট্যকার মারাঠি তামাশার প্রসঙ্গ এনেছেন।

শম্ভু মিত্রের ‘বিভাব' নাটকে আমরা দেখি যে, জনৈক ভদ্রলোক পুরোনো নাট্যশাস্ত্র ঘেঁটে শম্ভু মিত্র রচিত নাটকের নাম দিয়েছিলেন ‘বিভাব' | ‘বিভাব’ শব্দটির অর্থ হল মনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া ন-টি রসানুভূতির কারণ। কিন্তু নিজের নাট্যভাবনা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই নামের বিরোধ খুঁজে পেয়েছেন স্বয়ং নাট্যকারই | একারণেই তাঁর মনে হয়েছে, তাঁদের নাটকের নাম হওয়া উচিত ‘অভাব নাটক'। প্রবল অভাব থেকেই তাঁদের এই নাটকের জন্ম। সেখানে ভালো মঞ্চ নেই, নেই আলো বা ঝালর ইত্যাদি মঞ্চসজ্জার বিবিধ উপকরণ থাকার মধ্যে শুধু আছে নাটক করার অদম্য আকাঙ্ক্ষা | এর ওপর রয়েছে সরকারের চূড়ান্ত অসহযোগিতাও। এত কষ্ট করে সব কিছু জোগাড় করে অভিনয়ের ব্যবস্থা করা হলেও উঠে আসে খাজনার দাবি। পেশাদারি মঞ্চকে যে খাজনা দিতে হয় না, গ্রুপ থিয়েটারকে তা দিতে হয় । সরকারের এই বিমাতৃসুলভ দৃষ্টিভঙ্গিকে তীব্র শ্লেষে বিদ্ধ করে নাট্যকার এরপর নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে জানান— “... আমরা তো নাটক নিয়ে ব্যবসা করি না, তাই সরকার আমাদের গলা টিপে খাজনা আদায় করে নেন।” এই চূড়ান্ত প্রতিকূলতায় গ্রুপ থিয়েটারের পক্ষে নিজের পায়ে দাঁড়ানো অনেক সময়েই সম্ভব হয়ে ওঠে না। গ্রুপ থিয়েটারের প্রবল অভাবের এই চিত্রই ‘বিভাব’ নাটকে প্রকাশ পেয়েছে।

জনৈক ভদ্রলোক পুরোনো নাট্যশাস্ত্র ঘেঁটে শম্ভু মিত্র রচিত নাটকের নাম দিয়েছিলেন 'বিভাব'। 'বিভাব' শব্দটির অর্থ হল মনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া নয়টি রসানুভূতির কারণ। কিন্তু নিজের নাট্যভাবনা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই নামের বিরোধ খুঁজে পেয়েছেন স্বয়ং নাট্যকারই। তাঁর মনে হয়েছে, তাঁদের নাটকের নাম হওয়া উচিত 'অভাব নাটক'। কারণ প্রবল অভাব থেকেই তাঁদের এই নাটকের জন্ম। সেখানে ভালো মঞ্চ নেই, নেই আলো বা ঝালর ইত্যাদি মঞ্চসজ্জার বিবিধ উপকরণ। থাকার মধ্যে শুধু আছে নাটক করার অদম্য ইচ্ছা। এর ওপর রয়েছে সরকারের চূড়ান্ত অসহযোগিতাও। এত কষ্ট করে সব কিছু জোগাড় করে অভিনয়ের ব্যবস্থা করা হলেও উঠে আসে খাজনার দাবি। পেশাদারি সঙ্গকে এই খাজনা দিতে হয় না, কিন্তু স থিয়েটারকে তা দিতে হয়। সরকারের এই বিমাতৃসুলভ দৃষ্টিভঙ্গিকে তাঁর শেষে বিশ্ব করে নাট্যকার এরপর নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে জানান আমরা তো নাটক নিয়ে ব্যবসা করি না, তাই সরকার আমাদের না চিপে খাজনা আদায় করে নেন।" এই চূড়ান্ত প্রতিকূলতায় গ্রুপ থিয়েটারের পক্ষে নিজের পায়ে দাড়ানো অনেক সময়েই সম্ভব হয়ে ওঠে না। থিয়েটারের প্রবল অভাব এবং সমস্যার জন্যই নাট্যকার নাটকটির নামের ক্ষেত্রেও আপত্তি জানিয়েছেন।

শম্ভু মিত্র তাঁর ‘বিভাব' নাটকের সূচনায় গ্রুপ থিয়েটারের নাটক অভিনয়ের ক্ষেত্রে নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। গ্রুপ থিয়েটারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘দুরন্ত অভাব’। তাঁদের অভিনয়ের জন্য ভালো মস্ক নেই, নেই মঞ্চসজ্জার উপকরণ বা আলোও। শুধুমাত্র নাটক করার অদম্য ইচ্ছাকে পাথেয় করেই চলে গ্রুপ থিয়েটার। কিন্তু সেখানেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় সরকারের বিমাতৃসুলভ আচরণ। পেশাদার থিয়েটারকে ছাড় দিলেও গ্রুপ থিয়েটারের কাছ থেকে সরকার খাজনা আদায় করে। চূড়ান্ত আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয় গ্রুপ থিয়েটার। এই সমস্যা থেকে মুক্তির পথও তাই তাঁরা নিজেদের মতো করেই খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। এমন এক অভিনয়ের পরিকল্পনা তাঁরা করেন, যেখানে মঞ্চের কোনো প্রয়োজন হবে না। যে-কোনোরকম একটা প্ল্যাটফর্ম হলেই চলবে। কোনোরকম মঞ্চসজ্জা বা নাট্য-উপকরণ যেমন দরজা-জানলা, টেবিল-বেগ, সিনসিনারি ইত্যাদির দরকার পড়বে না। নাটকের প্রাচীন ঐতিহ্য থেকেই এই অভিনয়রীতির সমর্থন পান নাট্যকার শম্ভু মিত্র। আর এভাবেই যাবতীয় প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে গ্রুপ থিয়েটারের এগিয়ে চলার পথ সন্ধান প্রসঙ্গেই তিনি মন্তব্যটি করেছেন।