Chapter-9, ভারতীয় সংবিধানঃ গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার

ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় ভারতকে 'সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র' বলা হয়েছে। কারণ—

সার্বভৌম কথার অর্থ হল অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি নির্ধারণে চরম ক্ষমতার অধিকার। অর্থাৎ ভারতরাষ্ট্র অপর কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের বা সংস্থার নির্দেশ, আদেশ বা অনুরোধ মানতে বাধ্য নয়।

সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা হয়, কারণ— ভারতের অর্থনীতিতে উৎপাদনের উপকরণগুলির ওপর ব্যক্তি মালিকানার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়

ধর্মনিরপেক্ষ বলতে বোঝানো হয় যে, রাষ্ট্রের কোনো নিজস্ব ধর্ম নেই। রাষ্ট্র বিশেষ কোনো ধর্মের পক্ষপাতিত্ব বা বিরোধিতা করবে না। ভারতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ পাশাপাশি বাস করেন। প্রত্যেক ভারতবাসীই তার নিজের বিশ্বাস মতো ধর্মাচরণ করতে পারেন।

গণতন্ত্র কথার অর্থ হল — জনগণের শাসনব্যবস্থা। অর্থাৎ জনগণের দ্বারা পরিচালিত এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকদের সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সমানাধিকারের কথা বলা হয়। তবে ভারতে গণতন্ত্র বলতে সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার-কে বোঝানো হয়। অর্থাৎ জনগণের ভোটে কেন্দ্র ও প্রাদেশিক আইনসভার এবং আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হন।

সাধারণতন্ত্র বলা হয় কারণ— ভারতের শাসনতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি। ভারতের শাসনব্যবস্থায় বংশানুক্রমিক কোনো রাজা বা রানির স্থান নেই। আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতি পরোক্ষভাবে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন। তবে সংবিধান অনুযায়ী ভারতীয় শাসনব্যবস্থার উৎস ও রক্ষক হল ভারতের সাধারণ জনগণ

ভারতের কেন্দ্রীয় শাসনবিভাগ দুটি অংশ নিয়ে গঠিত— O রাজনৈতিক অংশ ও অরাজনৈতিক অংশ। ভারতের কেন্দ্রীয় শাসনবিভাগের রাজনৈতিক অংশ গঠিত হয়েছে— 0 রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা নিয়ে। এই রাজনৈতিক অংশ জনগণের ভোটে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচিত হন।
রাষ্ট্রপতি : তত্ত্বগতভাবে রাষ্ট্রপতি হলেন ভারতের শাসনব্যবস্থায় চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু বাস্তবে তাকে মন্ত্রীপরিষদ (ক্যাবিনেট)-এর পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হয় বলে তিনি নাম সর্বস্ব বা নিয়মতান্ত্রিক শাসক বলে পরিচিত। ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি হলেন ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ।
• নির্বাচন : রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের নির্বাচিত সদস্য ও রাজ্য বিধানসভার নির্বাচিত
উপরাষ্ট্রপতি : ভারতীয় সংবিধানের ৬৩নং ধারা অনুসারে ভারতে একজন উপরাষ্ট্রপতি থাকেন। পদমর্যাদার দিক থেকে উপরাষ্ট্রপতির স্থান রাষ্ট্রপতির ঠিক পরেই। ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ।
• নির্বাচন : উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন পার্লামেন্টের উভয়কক্ষের সদস্যদের দ্বারা।
• কার্যকাল : উপরাষ্ট্রপতি ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হন।
• ক্ষমতা ও কার্যবলি : উপরাষ্ট্রপতির প্রধান কাজ হল রাজ্যসভায় সভাপতিত্ব করা। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। তত্ত্বগতভাবে তিনি ভারতের দ্বিতীয় মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি।
• কার্যকাল : রাষ্ট্রপতি ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হন।
• ক্ষমতা ও কার্যাবলি : ভারতের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও কার্যাবলিকে কয়েকটি ভাগ করে আলোচনা করা হয়। যেমন— শাসন-সংক্রান্ত, আইন-সংক্রান্ত, অর্থ-সংক্রান্ত, বিচার-সংক্রান্ত, জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত প্রভৃতি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী : ভারতের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। লোকসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা মোর্চার নেতা বা নেত্রীকেই রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ করেন। প্রধানমন্ত্রী হলেন ভারতের প্রকৃত পরিচালক।

" প্রধানমন্ত্রীর কাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ভূমিকা : সংসদের নেতা বা নেত্রী : প্রধানমন্ত্রী হলেন সংসদের নেতা। সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা এবং কত দিন অধিবেশন চলবে তা ঠিক

• মন্ত্রীসভা গঠন : প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসারে রাষ্ট্রপতি মন্ত্রীসভার সদস্যদের নিয়োগ করেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভূমিকা : আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের প্রধান মুখপাত্র হলেন প্রধানমন্ত্রী। গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

জাতির নেতা : প্রধানমন্ত্রী কোনো একটি বিশেষ এলাকা থেকে নির্বাচিত হলেও তিনি শুধুমাত্র তাঁর অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করেন না,

তিনি সমগ্র জাতির নেতা। তিনি দেশের সংকটে বা জনগণের বিভিন্ন সমস্যায় নেতৃত্ব দান করেন।

» মুখ্যমন্ত্রী : ভারতের প্রতিটি রাজ্যের শাসনব্যবস্থা পরিচালনায় মুখ্যমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুখ্যমন্ত্রী হলেন রাজ্যের প্রকৃত শাসক। জনগণের দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত হওয়ার জন্য সংবিধান মুখ্যমন্ত্রীকে প্রকৃত ক্ষমতা প্রদান করেছে। রাজ্য বিধানসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা মোর্চার নেতা বা নেত্রীকে মুখ্যমন্ত্রী পদে ৫ বছরের জন্য নিয়োগ করেন রাজ্যপাল।

» মুখ্যমন্ত্রীর কাজ ও রাজ্য পরিচালনায় ভূমিকা :

বিধানসভার নেতা বা নেত্রী : মুখ্যমন্ত্রী হলেন বিধানসভার নেতা বা নেত্রী। তিনি বিধানসভার অধিবেশন আহ্বান ও স্থগিত রাখা বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তিনি হলেন রাজ্য সরকারের প্রধান মুখপাত্র।

মন্ত্রীসভার ,মন্ত্রীসভা গঠন : মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসারে মন্ত্রীসভার মন্ত্রীদের নিয়োগ করা হয়।

রাজ্যের জনগণের নেতা বা নেত্রী : মুখ্যমন্ত্রী শুধু সরকারের মুখপাত্রই নন, তিনি হলেন রাজ্যের সমস্ত জনগণের নেতা বা নেত্রী। তিনি রাজ্যের জনগণকে নিজ দল ও মতের অনুকূলে। পরিচালনার চেষ্টা করেন।

রাজ্যপালের পরামর্শদাতা: মুখ্যমন্ত্রী হলেন রাজ্যপালের প্রধান পরামর্শদাতা। সাধারণত মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসারে রাজ্যপাল যাবতীয় কাজ পরিচালনা করেন।

অন্যান্য কাজ : মুখ্যমন্ত্রীর অন্যতম প্রধান কাজগুলি হল— জনসংযোগ রক্ষা করা, রাজ্যের সমস্যাবলি সম্পর্কে আলোচনা করা। জনগণ মুখ্যমন্ত্রীকে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু বলে মনে করেন।

প্রধানমন্ত্রী ভারতের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর স্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষের শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী হলেন প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী।

প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ সংবিধান [৭৫ (১) ধারা] অনুসারে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়োগ করেন। তবে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়োগ করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির কোনো স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা নেই। লোকসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বা নেত্রীকে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ করতে বাধ্য থাকেন। কার্যকাল: প্রধানমন্ত্রীর কার্যকালের মেয়াদ ৫ বছর।

)) প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও কার্যলि :

11 পার্লামেন্টের নেতা বা নেত্রী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী সংসদের নেতা বা নেত্রী হলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি লোকসভার অধিবেশন আহ্বান, লোকসভা ভেঙে দেওয়া, নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। 12. ক্যাবিনেটের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী ক্যাবিনেটের নেতা হিসেবে মন্ত্রীদের নিয়োগ ও নীতি-নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ক্যাবিনেট বা মন্ত্রীসভার ভাঙাগড়া বা স্থায়িত্ব তার ওপর নির্ভর করে কারণ, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে সমগ্র মন্ত্রীসভাকে পদত্যাগ করতে হয়।

ভারতের প্রথম প্রধান জওহরলাল নেহরু ও জাতির নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে কোনো একটি বিশেষ এলাকা থেকে নির্বাচিত হলেও তিনি শুধুমাত্র কোনো অঞ্চলের প্রতিনিধি থাকেন না, তিনি দেশের সমগ্র জাতির নেতা। দেশের সংকট বা জনগণের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তিনি নেতৃত্ব দান করেন।

রাষ্ট্রপতির প্রধান পরামর্শদাতা হিসাবে প্রধানমন্ত্রী : বাস্তবে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমেই যাবতীয় কার্য সম্পাদন করে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে মন্ত্রীপরিষদের আইন ও শাসন সংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবহিত করেন। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি ও

মন্ত্রীপরিষদের মধ্যে যোগসূত্র রক্ষা করেন। 5 আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জোটনিরপেক্ষ দেশগুলির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা প্রসঙ্গে ক্রসম্যান বলেছেন— 'Cabinet Government has been transformed into Prime Ministerial Government' তবে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সামাস্য রক্ষা করে প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহার হওয়া উচিত।

ভারতীয় সংবিধানে ১৫৩নং ধারা অনুসারে প্রতিটি রাজ্যে প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে একজন রাজ্যপাল থাকেন। রাজ্যপাল হলেন রাজ্যের সর্বোচ্চ পদাধিকারী। আসলে রাজ্যপালের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য।

রাজ্যপালের যোগ্যতা : ভারতীয় সংবিধান অনুসারে প্রত্যেক রাজ্যপালকে কমপক্ষে ৩৫ বছর বয়স্ক ভারতীয় নাগরিক হতে হবে। তিনি কেন্দ্রীয় আইনসভা (পার্লামেন্ট) বা রাজ্য আইনসভার সদস্য হতে পারবেন না।

• রাজ্যপালের নিয়োগ : প্রতি রাজ্যের রাজ্যপাল রাষ্ট্রপতির দ্বারা ৫ বছরের জন্য মনোনীত হন।

রাজ্যপালের ক্ষমতা ও কার্যাবলি : রাজ্যপালের ক্ষমতা ও কার্যাবলিকে পাঁচ ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা যেতে পারে।
শাসন ক্ষমতা: ভারতীয় সংবিধানের ১৫৪ নং ধারা অনুসারে রাজ্যের শাসনক্ষমতা রাজ্যপালকে দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে রাজ্যপাল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শে অন্যান্য মন্ত্রীদের নিয়োগ করেন। এ ছাড়া তিনি রাজ্যের উচ্চপদাধিকারী ও সম্মানীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ করেন।

2 অনুসারে রাজ্যপাল হলেন রাজ্য আইনসভার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসারে রাজ্য আইনসভার অধিবেশন। আহ্বান করতে, স্থগিত রাখতে বা ভেঙে দিতে পারেন। রাজ্যপালের সম্মতি ছাড়া কোনো বিল আইনে পরিণত হয় না। 3 অর্থ সংক্রান্ত ক্ষমতা রাজ্যপাল অর্থমন্ত্রীর মাধ্যমে প্রতি বছর আয়-ব্যয়ের বিবরণ বা বাজেট বিধানসভায় পেশ করেন। রাজ্যপালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভবন সম্মতি ছাড়া রাজ্য আইনসভায় অর্থবিল উত্থাপন করা যায় না।

1 বিচার সংক্রান্ত ক্ষমতা রাজ্যপালের পরামর্শমতো রাষ্ট্রপতি হাইকোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগ করেন। রাজ্যপাল দেওয়ানি । আদালতের বিচারপতি, অতিরিক্ত জেলা জজ, দায়রা জজ অনুসারে নিয়োগ করেন। রাজ্য সরকারের এলাকাধীন বিষয়ে। অপরাধীর দণ্ড হ্রাস, স্থগিত রাখা এমনকি ক্ষমা প্রদর্শনও করতে পারেন ।

যেছোধীন ক্ষমতা রাজ্যপালের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা বলতে বোঝায় যে ক্ষমতা প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রীসভার সঙ্গে পরামর্শ করতে বাধ্য নন। যেমন- উপজাতি অধ্যুষিত এলাকার উন্নয়ন ও প্রশাসন বিষয়ে পদক্ষেপ। রাজ্যের শাসন বিষয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে রিপোর্ট প্রদান। তা ছাড়া ও মুখ্যমন্ত্রীর নিয়োগ, বিধানসভার অধিবেশন আহ্বানে মুখ্যমন্ত্রীকে নির্দেশদান প্রভৃতি ক্ষেত্রে রাজ্যপালের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা আছে।

ভারতের সংবিধানে নারীদের অধিকার রক্ষা

ভারতীয় সংবিধান নারীদের অধিকার সুরক্ষিত করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। [1 ভারতীয় সংবিধানে নারী-পুরুষ সমান অধিকারের কথা স্বীকার করা হয়েছে।

[2 নারীদের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া নানা অমানবিক ঘটনা রুখতে নানা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নারীদের জীবনে ঘটে যাওয়া অমানবিক

ঘটনাগুলি হল— • পরিবারে ও সমাজজীবনে অবহেলার শিকার হওয়া,

• কন্যাসন্তানের জন্মের পর নবজাত কন্যা ও তার মায়ের প্রতি শারীরিক ও মানসিক পীড়ন,

• বিয়ের জন্য পণ দেওয়া-নেওয়ার প্রথা,

• নারী পাচার প্রভৃতি।

এই ঘটনাগুলি রুখতে সংবিধানে কঠোর আইন বলবৎ করা হয়েছে।

3 নারীশিক্ষার প্রসারের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

4 ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে সংবিধানে বলা হয়েছে জমি-সম্পত্তির অধিকারের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমান অধিকার পাবে।

5 ২০০৫ সালে পারিবারিক হিংসারোধ আইন পাশ করে পরিবারের মহিলাদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করেছে।

» নারীদের সামাজিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠায় অর্থনৈতিক স্বাধীনতা :

নারীদের অধিকার সুরক্ষিত করার জন্য ভারতীয় সংবিধানে নানা ধরনের প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। তবে নারীদের সামাজিক ক্ষমতা

প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা।

• অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী হলে নারীরা স্বাধীনভাবে নিজেদের জীবন যাপন করতে পারবে। নারীদের ওপর ঘটে যাওয়া নানান অমানবিক অত্যাচারে আইনি সাহায্য নেওয়ার জন্যও বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থের প্রয়োজন হয়। নারীরা অর্থনৈতিক দিক থেকে স্বাধীন হলে নিজেদের আইনি সুরক্ষার সুযোগ সহজে নিতে পারবে।

১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি দিনটি ভারতবাসীর কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ওইদিন থেকে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়েছে।

© সংবিধান কার্যকর : ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি ভারতের সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে।

• প্রজাতন্ত্র দিবস : ভারতীয় সংবিধানে ভারতকে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র বলা হয়েছে। ভারতের নেতৃবৃন্দ ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ‘২৬ জানুয়ারি’দিনটিকে সাধারণতন্ত্র দিবস' হিসেবে স্মরণীয় করে রাখেন। প্রতি বছর ২৬ জানুয়ারি ‘সাধারণতন্ত্র দিবস' পালন করা হয়।
২৬ জানুয়ারির ঐতিহাসিক গুরুত্ব : ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকরের নেতৃত্বে রচিত খসড়া সংবিধান ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ নভেম্বর গণপরিষদে গৃহীত হয়। কিন্তু নেতৃবৃন্দ ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা স্মরণ করে এর দুমাস পরে ২৬ জানুয়ারি সংবিধান কার্যকরী করে। কারণ, পরাধীন ভারতে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ২৬ জানুয়ারি দিনটি ভারতীয়রা স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করেছিল।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রের পরিচালনার জন্য প্রয়োজন অনেক আইনের বা সংবিধানের।
• ভারতবর্ষ যখন ব্রিটিশ সরকারের অধীন ছিল তখন ব্রিটিশ সরকারের আইন অনুসারে শাসন করা হত।

প্রথম স্বাধীনতা দিবসে নেহরুর সাথে মাউন্টব্যাটেন • ক্রমাগত আন্দোলনের চাপে ব্রিটিশ সরকার যখন বুঝতে পারল ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা দিতে হবে, তখন ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতের সংবিধান রচনার তাগিদে ভারতীয় সংবিধান সভা গঠনের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এই সংবিধান সভা ভারতের সংবিধান রচনা করে।

ভারতীয় সংবিধান বিশ্বের সব থেকে বড়ো লিখিত সংবিধান। নানা দেশের সংবিধান থেকে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ভারতীয় সংবিধানে গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন—

1 ইংল্যান্ডের সংবিধান থেকে মন্ত্রীসভা পরিচালিত শাসনব্যবস্থা।
2 মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান থেকে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা।
3 আয়ারল্যান্ডের সংবিধান থেকে নির্দেশমূলক নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।

ভারত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ভারতের সংবিধানে ভারতকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা হয়েছে।

• গণতন্ত্রের সংজ্ঞা: যে শাসনব্যবস্থায় জনগণ প্রতিনিধির মাধ্যমে শাসনকাজে অংশগ্রহণ করে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল থাকে তাকে গণতন্ত্র বলে।

● ভারতে গণতন্ত্রের তাৎপর্য : ভারতের সংবিধানে গণতন্ত্র বলতে বোঝায় প্রাপ্তবয়স্কের (১৮ বছর) ভোটাধিকারের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন। ।। ভারতের জনগণ ভোট দিয়ে কেন্দ্র ও প্রাদেশিক আইনসভায় ও স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধি নির্বাচন করে।

ভারত সাধারণতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্র : ভারত একটি সাধারণতান্ত্রিক বা প্রজাতান্ত্রিক দেশ। সাধারণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হল— রাষ্ট্রপ্রধান উত্তরাধিকারসূত্রে ক্ষমতা লাভ করবেন না। তিনি
জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। 2 জনসাধারণের মঙ্গল করাই হবে সরকারের উদ্দেশ্য। ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি, তিনি জনগণের পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন।
ভারতের জনগণই হল সকল ক্ষমতার উৎস এবং রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হল জনগণের মঙ্গল করা।

সমাজতন্ত্র বলতে মূলত উৎপাদনের উপকরণগুলির ওপর রাষ্ট্রের বা সমাজের মালিকানা প্রতিষ্ঠা এবং উৎপাদিত সম্পদের সমান বণ্টন বা ভাগকে বোঝানো হয়। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে অন্য অর্থে। ভারতে মিশ্র অর্থনীতি লক্ষণীয়। অর্থাৎ ভারতের অর্থনীতি রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মালিকানা নির্ভর, এই অর্থে ভারত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে পরিচিত।

ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনায় ভারতকে সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ—
সার্বভৌম : অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ক্ষেত্রে ভারত সম্পূর্ণ স্বাধীন ও বিদেশি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত।

• গণতান্ত্রিক : জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর ভারতের শাসনভার ন্যস্ত।

• প্রজাতান্ত্রিক : ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান জনগণের পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন।

ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনায় ভারতবর্ষকে “ধর্মনিরপেক্ষ” রাষ্ট্র বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

• ধর্মনিরপেক্ষ বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে যে ভারত এমন একটি রাষ্ট্র যার নিজস্ব কোনো ধর্ম নেই।

• ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ : ধর্মনিরপেক্ষ কথাটির অর্থ হল—

1 ভারত কোনো বিশেষ ধর্মকে সাহায্য বা সমর্থন করবে না।

2 রাষ্ট্র এক ধর্ম অপেক্ষা অন্য ধর্মকে প্রাধান্য দেবে না বা বিশেষ কোনো ধর্মের বিরোধিতা করবে না।

3 প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিক নিজের বিশ্বাসমতো ধর্মাচরণ করতে পারবে।

পরিবার এবং সমাজে বসবাসকারী নারীদের ওপর হওয়া নানা অত্যাচার ও দুর্ব্যবহারকে রোধ করার জন্য ভারতীয় সংবিধানে
নানা আইনের কথা বলা আছে। সেই আইনগুলির মধ্যে একটি আইন হল – পারিবারিক হিংসারোধ আইন (২০০৫)।

পরিবারের মধ্যে কোনো মেয়ে যদি মানসিক, শারীরিক অথবা অর্থনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়, তাহলে এই আইন অনুসারে সে মুখ্য বিচারবিভাগীয় বিচারকের কাছে আবেদন জানাতে পারে। তার নিজ জেলার সুরক্ষা আধিকারিক-এর কাছে আবেদন জানালেও এ বিষয়ে বিনামূল্যে আইনি সাহায্য পাওয়া যায়।

ভারতের সংসদ রাষ্ট্রপতি এবং আইনসভা নিয়ে গড়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় আইনসভা দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট। যথা— 1 উচ্চকক্ষ বা রাজ্যসভা এবং 2 নিম্নকক্ষ বা লোকসভা।

[1] উচ্চকক্ষ বা রাজ্যসভা : ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী রাজ্যসভায় থাকবেন ২৫০ জন সদস্য। এই সদস্যদের কার্যকালের মেয়াদ ৬ বছর। রাষ্ট্রপতি বিজ্ঞান, কলা, ক্রীড়াজগৎ ইত্যাদি নানাক্ষেত্র থেকে ১২জন সদস্যকে রাজ্যসভায় নিয়োগ করেন। রাজ্যসভায় সভাপতিত্ব করেন উপরাষ্ট্রপতি।

[ 2 নিম্নকক্ষ বা লোকসভা : সংবিধান অনুযায়ী লোকসভার সদস্য সংখ্যা হবে ৫৫২ জন। লোকসভার সদস্যরা জনগণের ভোটে ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হন এবং রাষ্ট্রপতি ২ জন সদস্যকে মনোনীত করতে পারেন। লোকসভায় সভাপতিত্ব করেন স্পিকার।

ভারতীয় জনসমাজে সামাজিকভাবে অস্পৃশ্য' মানুষেরাই 'দলিত' নামে পরিচিত ছিলেন। মহাত্মা গান্ধি ভারতে দলিতদের

অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।

1 তিনি ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাবে অস্পৃশ্যতা দূরীকরণকে স্বরাজ অর্জনের জরুরি শর্ত বলে উল্লেখ করেছিলেন।

2 তিনি হিন্দু মন্দিরে দলিতদের (হরিজন) ঢুকতে পারার অধিকার নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন।

3 ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র‍্যামসে ম্যাকডোনাল্ড সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা'-র কথা ঘোষণা করে দলিতদের তফশিলি জাতি হিসেবে আলাদা নির্বাচনের অধিকার দেন।