অধ্যায়-21.D, নাটক

উদয়পুরের রাজা ভীমসিংহ, তাঁর ভাই বলেন্দ্রসিংহ, জয়পুরের রাজা জগৎসিংহ, তাঁর দূতী মদনিকা, ভীমসিংহের কন্যা কৃয়কুমারী প্রমুখ ।

শচী, রতি, মূরজা, ইন্দ্রনীল, পদ্মাবতী প্রমুখ।

প্রথম নাটক 'নীলদর্পণ', ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে লিখিত।

দীনবন্ধু মিত্রের দুটি প্রহসনের নাম—'সধবার একাদশী” ও “বিয়ে পাগলা বুড়ো'।

'নীলদর্পণ'কে গণনাট্যের নাটক বলা যেতে পারে।

১৮৭২ খ্রিস্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' নাটকের অভিনয়ের মাধ্যমে।

দীনবন্ধুর ‘নীলদর্পণ' নাটকটি ‘কস্যচিৎ পথিকসা' নামে ঢাকা থেকে ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয়।

দীনবন্ধু গিরিশচন্দ্র ঘোষের শাস্তি কি শাস্তি' নাটকের উৎসর্গপত্রে 'নাট্যগুরু স্বর্গীয় দীনবন্ধু মিত্র শ্রীচরণেষু...'—এইরূপে উল্লিখিত।

'নবীন তপস্বিনী' ও 'লীলাবতী' নাটকের।

গোলোক বসু, নবীনমাধব, সাধুচরণ, রাইচরণ, রেবতী, ক্ষেত্রমণি, আদুরী, পদী, আমিন প্রমুখ।

'কলকাতা ও শহরতলির বাস্তবচিত্র ও হাস্যপরিহাসমুখর বিচিত্র বর্ণনা।"

সেকালের কলকাতার উচ্চ শিক্ষিত ও অশিক্ষিত তরুণ সম্প্রদায়ের মদ্যপ্রীতি, নিষিদ্ধ নারীপ্রীতি, পরস্থ হরণ তথা লাম্পট্য সিধবার একাদশী'র বিষয়বস্তু।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রহসন 'একেই কি বলে সভ্যতা'।

কিছু রঙ্গরসের কবিতা বা গীতিকবিতা আর তার কিছু অংশ প্রকাশিত হয়েছিল গুরু ঈশ্বর গুপ্ত সম্পাদির।

হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত 'হিন্দু পেট্রিয়ট' পত্রিকায়।

১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে ন্যাশনাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

প্রথম দিকে গিরিশচন্দ্র গীতিকাব্য লেখেন, যেমন-আগমনী, অকালবোধন, দোললীলা, মোহিনী প্রতিমা ইত্যাদি।

ভক্তিরসের পৌরাণিক নাটক রচনায় গিরিশচন্দ্রের কৃতিত্ব।

অভিমন্যুবধ', 'জনা', 'পাণ্ডবগৌরব', 'চৈতন্যলীলা', 'বিশ্বমলাল'।

দুটি সামাজিক নাটক হল – প্রফুল্ল' ও 'বলিদান'।

'সিরাজদৌল্লা' (১৯০০), মীরকাশিম' (১৯০৬), 'অশোক', 'ছত্রপতি শিবাজি' ইত্যাদি।

'সপ্তমীতে বিসর্জন', 'বেল্লিকবাজার', 'বড়োদিনের বখশিশ', 'সভ্যতার পান্ডা', 'য্যায়সা কি তায়সা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

'রাজা ও রানী' (১৮৮৯), 'বিসর্জন' (১৮৯০), 'মালিনী' (১৮১৬) ও 'মুকুট' (১৯০৮) নিয়মানুগ নাটক।

'রাজা' (১৯১০), 'ডাকঘর' (১৯১২), 'মুক্তধারা' (১৯২৫) ও 'রক্তকরবী' (১৯১৬) হল রবীন্দ্রনাথের রূপক-সাংকেতিক নাটক।

রবীন্দ্রনাথের চারটি রানাট্যের নাম হল গোড়ায় গলদ', 'বৈকুণ্ঠের খাতা', 'বাজাকৌতুক' ও 'চিরকুমার সভা'।

‘বাল্মীকি প্রতিভা', 'প্রকৃতির প্রতিশোধ, ‘মায়ার খেলা' ও 'চিত্রাজাদা' হল রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য।

'তপতী' হল 'রাজা ও রানী'র সংশোধিত রূপ।

রবীন্দ্রনাথের একটি কাব্যনাট্য হল—'চিত্রাঙ্গদা', নৃত্যনাট্য হল—'শ্যামা'।

'শেষরক্ষা' 'গোড়ায় গলদ'-এর সংশোধিত রূপ।

রবীন্দ্রনাথের দুটি নৃত্যনাট্য হল—শ্যামা' ও 'চণ্ডালিকা'।

রবীন্দ্রনাথের 'বিসর্জন' নাটকের কাহিনি তাঁর 'রাজর্ষি' উপন্যাস থেকে নেওয়া হয়েছে।

বাল্মীকি প্রতিভা (১২৮৭ সাল)।

'পরিশোধ' কবিতার পরিবর্তিত রূপ হল শ্যামা নৃত্যনাট্য।

নৃত্যনাট্য 'চিত্রাঙ্গদা' কাব্যনাট্য 'চিত্রাঙ্গদা'র পরিবর্তিত রূপ।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রথম পরিণত নাটক 'প্রকৃতির পরিশোধ' সম্পর্কে মতটি পোষণ করেছিলেন।

'রক্তকরবী' নাটকের প্রথম নাম ছিল 'যক্ষপুরী' এরপর নাম হয় 'নন্দিনী', তারপর আবার নাম পরিবর্ত করে 'রক্তকরবী' নামকরণ করেন রবীন্দ্রনাথ।

'গুরু' হল অচলায়তন নাটকের পরিবর্তিত রূপ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রক্তকরবী' নাটকের দুটি চরিত্র রাজা, নন্দিনী এবং সেটি রূপক-সাংকেতিক নাটক।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের দুটি পৌরাণিক নাটক হল — 'সীতা' (১৯০৮)

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের চারটি ঐতিহাসিক নাটক হল—'চন্দ্রগুপ্ত' 'নূরজাহান' (১৯০৮) ও 'সাজাহান' (১৯০৯)।

‘বিরহ' (১৮৯৭), 'প্রায়শ্চিত্ত' (১৯০২), 'পুনর্জন্ম' (১৯১৩), 'আনন্দ বিদায়' (১৯১২)।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের দুটি নাট্যকাব্যের নাম হল—'পাষাণী' (১৯০০) ও 'সীতা' (১৯০৮)।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের দুটি সামাজিক নাটক হল—'পরপারে' (১৯১২) ও 'বঙ্গনারী' (১৯১৬)।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক নাটকটি হল—'সাজাহান' (১৯০৯)।

'আনন্দবিদায়' নাটকে দ্বিজেন্দ্রলাল রবীন্দ্রনাথকে আক্রমণ করেছিলেন।

'মেবার পতন' (১৯০৮) নাটকে দ্বিজেন্দ্রলাল বিশ্ব-মৈত্রীর জয়গান করেছেন।

সাজাহান ও জাহাঙ্গিরের পারিবারিক জীবনের অন্তর্দ্বন্দুকে প্রকটিত করা।

টডের ‘রাজস্থান কাহিনি' থেকে 'রানা প্রতাপ সিংহ' নাটকের কাহিনি নেওয়া হয়েছে।

'তারাবাঈ' (১৯০৩) হল দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের প্রথম ঐতিহাসিক নাটক।

বিজন ভট্টাচার্য (১৯১৫-১৯৭৮) এবং উৎপল দত্ত (১৯২৯-১৯৯৩)।

'নবান্ন', 'দেবীগর্জন', 'গোত্রান্তর' ও 'আগুন'।

'লাস ঘুইরা যাউক', 'মরাটাদ', 'চুন্নি' ও 'হাঁসখালির হাঁসা।

তেভাগা আন্দোলন ও দেশভাগকে কেন্দ্র করে রচিত দুটি নাটক হল—'জনপদ' ও 'রাণী পাল

'নবান্ন' নাটকটি ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে ২৪ অক্টোবর ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রযোজনায় শ্রীরা প্রথম অভিনীত হয়।

'নবান্ন' নাটকে চারটি অঙ্ক ও ১৫টি দৃশ্য আছে।

'অঙ্গার' (১৯৫৯), 'ফেরারী ফৌজ' (১৯৬১), 'কল্লোল' (১৯৬৫), ও 'টিনের তলোয়ার (১৯৭১),

উৎপল দত্তের দুটি বিখ্যাত নাটক হল—'তিতুমীর' (১৯৭৮), ফকির বিদ্রোহের ‘ব্যারিকেড' (১৯৭২)—জার্মানিতে নাৎসিবাদের উত্থানের প্রেক্ষিতে রচিত।

উত্তা কয়লাখনির মালিকপক্ষের লোভ কীভাবে শ্রমিকদের চরম দুর্দশার দিকে ঠেলে দেয় তার চিত্র 'অঙ্গার' নাটকে অঙ্কিত।

স্বাধানতার জন্য বাংলার সংগ্রামের শিল্পসফল রূপায়ণ উৎপল দত্তের 'ফেরারী ফৌজ' নাটকটি।

উনিশ শতকের প্রমোদপ্রিয় 'বাবু'দের বিরুদ্ধে মণশিল্পীদের প্রতিবাদের নাটক উৎপল দত্তের "টিনের তলোয়ার"।

১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে 'বিসর্জন' নাটকে গোবিন্দমাণিক্যের চরিত্রে উৎপল দত্ত প্রথম অভিনয় করেন।

‘ম্যাকবেথ', ‘ওথেলো', 'জুলিয়াস সিজার' ও 'সমাধান'।

'জালিয়ানওয়ালাবাগ' ও 'রাইফেল’।

'দি অ্যামেচার শেকসপিরিয়ানস', পরে নাম হয়—'লিটল থিয়েটার গ্রুপ”।

উৎপল দত্ত একাধারে নট, নাটককার ও নাট্যপরিচালক। সবক্ষেত্রে তিনি মৌলিকতার পরিচয় রেখেছেন।এবং সবক্ষেত্রেই তিনি সফল।

নটককাররূপে (তার আগে তিনি ইংরেজিতে দুটি কাব্য Captive Ladie ও Visions of the Past এবং একটি ইংরেজি নাটক [অমুদ্রিত] Rizia লেখেন। তবে তার আগে ৩১/৭/১৮৫৮ তে পাইকপাড়ার বিখ্যাত জমিদার মাইকেল মধুসুদনের সমধিক পরিচিতি কবিরূপে, কিন্তু বাংলা সাহিত্যজগতে তিনি আবির্ভূত হন। (সিংহভ্রাতৃদ্বয়) বেলগাছিয়া রঙ্গমঞ্চে রামনারায়ণ তর্করত্ন-অনূদিত শ্রীহর্ষের 'রত্নাবলী' অভিনয় দেখার জন্য তিনি আহত ইন এবং সে অভিনয় দেখতে গিয়ে উপলব্ধি করেন, “রাজারা একখানি অপদার্থ নাটকাভিনয়ের জন্য জলের মত অর্থ ব্যয় করিতেছেন। তখন তিনি বাংলা নাটক রচনায় প্রবৃত্ত হইলেন... ।"

মধুসূদনের নাটক প্রহসন তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত পৌরাণিক 'শর্মিষ্ঠা'—১৮৫৯, 'পদ্মাবতী'—১৮২০ ঐতিহাসিক ‘কৃষ্মকুমারী’—১৮৬১ এবং প্রহসন 'একেই কি বলে সভ্যতা'—১৮৬০, "বুড় সালিকের ঘাড়ে “শর্মিষ্ঠা' নাটকের কাহিনি মূলত মহাভারতের আদিপর্বের শর্মিষ্ঠা-দেবযানী যযাতির উপাখ্যান। কাহিনি চরি সৃজনের ক্ষেত্রে নাটকে ছায়াপাত ঘটেছে মুখ্যত কালিদাসের সংস্কৃত নাটক শকুন্তলা (অভিজ্ঞানশকুন্তলম)। এই নাটকে `নানা ত্রুটি দুর্বলতা' থাকলেও দেবযানী চরিত্রটি যেমন অনেক বেশি উজ্জ্বল, তেমনি এই নাটকটির জনপ্রিয়তা উল্লেখ্য। 'পদ্মাবতী' নাটকে ভারতীয় পুরাণের কথা পরিবেশিত, তবে এর নেপথ্যে আছে গ্রিক পুরাণের প্রসিদ্ধ কাহিনি Apple of Discord। পাশ্চাত্যের জুনো, প্যালাস, ভিনাস, প্যারিস হেলেন চরিত্র এখানে যথাক্রমে শচী, মুরজা, রতি, ইন্দ্রনীল পদ্মাবতী। শুধু তাই নয়, নাটকে প্রাচ্যের জীবনাদর্শের সঙ্গে পাশ্চাত্য সংশ্লেষিত। এ নাটকেই মধুসূদন প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন কলির সংলাপে।

'কৃষ্ণকুমারী' নাটকের ঘটনা আহত হয়েছে টডের Annals and Antiquities of Rajasthan গ্রন্থ থেকে। নাটকে ইতিহাস যৎসামান্য। এতে বর্ণিত হয়েছে রানা ভীমসিংহের কন্যা কুমারী কৃষ্ণার আত্মহত্যার কাহিনি। কৃষ্ণার পাণিপ্রার্থী দুজন—মরুদেশের মানসিংহ আর জয়পুরের জয়সিংহ। কৃয়াকে না পেলে ধ্বংস হয়ে যাবে উদয়পুর। এমতাবস্থায় ভীমসিংহ কন্যা দেশ কোনটি বাঁচাবেন, ঠিক করতে পারেননি। তখন কুরাই আত্মহত্যার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান। করেন। বাংলা সাহিত্যের এটি একটি শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডি হিসেবে খ্যাত।

এর পরেই উল্লেখ্য, দুটি প্রহসন 'একেই কি বলে সভ্যতা' 'বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ', যা পদ্মাবতী নাটকের সমসময়েই রচিত হয়েছিল। তবে 'পাইকপাড়ার সিংহভ্রাতৃদ্বয়ের অনুরোধে এদুটি রচিত। প্রথমটির বিষয় নবাশিক্ষায়। শিক্ষিত নবীন সম্প্রদায়ের প্রতি ব্যা আর দ্বিতীয়টির বিষয় এক ধর্মধ্বজী বৃদ্ধ জমিদারের কুকীর্তি ও লাম্পট্য। মধুসূদন জীবনের শেষদিকে আর দুটি নাটক লেখেন—মায়াকানন' (১৮৭৪) আর 'বিষ না ধনুর্গুন'। কিন্তু এগুলো তেমন উল্লেখ্য নয়।

পরিশেষে বলা যায়, মধুসূদন তাঁর স্বপ্নায়ু-জীবনে যে কয়টি নাটক ও প্রহসন লিখেছেন, তৎকালে ‘তার সাহিত্যমূল এবং অভিনয়মূল্য বিশেষভাবে প্রশংসনীয়।

মধুসুদনের পর বাংলা নাট্যসাহিত্যে দীনবন্ধু মিত্র সেই নাটককার, যাঁর শিল্পের অবলম্বিত বিষয় বাস্তবের মনুষ্যচরিত্র, সমকাল, যা তাঁর নিপুণ পর্যবেক্ষণে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উন্মোচিত। মধুসূদন তাঁর সাহিত্য-শিল্পের জন্য যে পটভূমিতে বিচরণ করেছেন, দীনবন্ধু সেখান থেকে সম্পূর্ণ সরে এসে দায়বদ্ধ-শিল্পী হিসেবে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন তৎকালীন ঘটনা ও মনুষ্যচরিত্রের এক বিশ্বস্ত দলিল।

প্রথম জীবনে ঈশ্বর গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর'-এ তিনি কবিতা লিখতেন এবং পরেও লিখেছেন কিছু গীতিকবিতা। কিন্তু এসবই তাকে কোনো কবিখ্যাতি দেয়নি। তাই 'নীলদর্পণ' (১৮৬০) নাটকের মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রথম আবির্ভূত হন এবং ভাষাবিভাগের কাজের সূত্রে মফসসলের গ্রামবাংলা ও মানুষজনকে দেখার অভিজ্ঞতাকে নিপুণভাবে কাজে লাগান সাহিত্যে। “কেনচিৎ পথিকেনাভিপ্রণীতম” এই ছদ্মনামে নাটকটি প্রকাশিত হবামাত্র নাটকটি অভিনয়-সফল জনপ্রিয়তা অর্জন করে ও তৎকালে নীলকর সাহেবদের অমানুষিক অত্যাচার তথা নীলচারবিরোধী আগুন আন্দোলনে ঘৃতাহুতি দান করে বা আন্দোলনের মাত্রাকে বৃদ্ধি করে। নাটকটি প্রকাশিত হয় ভারতপ্রেমী রেভারেন্ড লঙ্ সাহেবের উদ্যোগে হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “হিন্দু পেট্রিয়ট' পত্রিকায় ইংরাজি ভাষায় যার অনুবাদ করেন মধুসূদন দত্ত— Nil Durpan of The Indigo Planting Mirror (1861)। এতে নাটকটি বিলাতে শিক্ষিত সমাজে আলোড়ন তোলে । পরে ইন্ডিগো কমিশন বসে এবং আইনানুগভাবে অত্যাচার হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। এখন এ নাটকের মূল্য অপরিসীম। বঙ্কিমচন্দ্রের হল বাংলার Uncle Tom's Cabin | রণ এই গ্রন্থ রচয়িতা শ্রীমতী স্টো (আমেরিকার মহিলা কাসাহিত্যিক) যেমন ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর লেখায় নিগ্রোদের প্রতি শ্বেতাবাদের নির্মম অত্যাচারের কথা প্রকাশ করে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন, তেমনি পেয়েছেন দীনবন্ধু মিত্র। তাঁর এই নাটক নাট্যকলার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচারে নানা ত্রুটিপূর্ণ। তবু অভিনয়ের দিক থেকে এবং কালের প্রেক্ষিতে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

কিন্তু দীনবন্ধু মিত্রের প্রতিভার স্ফুরণ মূলত প্রহসনে। সেগুলি হল : নবীন তপস্থিনী (১৮৬৩), বিয়ে পাগলা বুড়ো (১৮৬৬), সধবার একাদশী (১৮৬৬), লীলাবতী (১৮৬৭), জামাইবারিক (১৮৭২) এবং কমলে কামিনী (১৮৭৩)। এগুলির মধ্যে 'নবীন তপস্বিনী', 'লীলাবতী' ও 'কমলে কামিনী'তে বর্ণিত হয়েছে কিছু রোমান্টিক প্রেমকাহিনি। তবে এগুলোতে তেমন কৃতিত্ব দেখাতে পারেননি তিনি। পক্ষান্তরে ‘বিয়ে পাগলা বুড়ো' কিংবা 'জামাই বারিক' রচনা দুটি বিশেষ উল্লেখ্য ও উপভোগ্য। প্রথমটিতে বর্ণিত হয়েছে এক বৃদ্ধের বিবাহ-বিড়ম্বনা, যা 'হাস্যকর অসংগতির মধ্য দিয়ে প্রকাশিত। দ্বিতীয়টিতে ফুটে উঠেছে 'ধনী সমাজের ঘর জামাই পোষার প্রথার প্রতি তীব্র তীক্ষ্ণ ব্যখা। তবে দীনবন্ধুর 'সধবার একাদশী' বিশেষভাবে উল্লেখ্য। যদিও এর নেপথ্যে আছে মাইকেল মধুসুদন দত্তের 'একেই কি বলে সভ্যতা'র ছায়া, কিন্তু তাঁর রচনা ছিল সর্বার্থেই প্রহসন, তুলনায় দীনবন্ধুর রচনা প্রহসন হয়েও নাট্যধর্মী। এই রচনায় নিমচাদ নানা দিক থেকে একটি উজ্জ্বল চরিত্র। তাঁর নাট্যপ্রতিভা সম্পর্কে ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় যথার্থই বলেছেন, “দীনবন্ধু মাত্র তেতাদিশ বৎসর বাঁচিয়াছিলেন। তিনি আর একটু দীর্ঘজীবী হইলে বাংলা নাটক যে-কোনো দেশের প্রথম শ্রেণির নাট্যসাহিত্যের। সমকক্ষ হইতে পারিত।” (আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত)

গিরিশচন্দ্র ছিলেন একই সঙ্গে অভিনেতা, নাটককার, নাট্যপরিচালক এবং অভিনয় শিক্ষক। তিনি স্থাপন করেন সাধারণ রলামনের এবং টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা করেন, এর ফলে সাধারণের পক্ষে অভিনয় দেখা সম্ভব হত।

তিনি প্রায় পলাশটি নাটক লেখেন। নাটক রচনাতেই গিরিশচন্দ্র সবচেয়ে সফল। তাঁর 'জনা' (১৮৯৪) ও 'পাণ্ডবগৌরব (১৯০০) একদা অতি জনপ্রিয় ছিল। এইসব নাটকে তিনি অমিত্রাক্ষর ছন্দের আদলে একটি ছন্দ গড়ে তোলেন যা গৈরিশ ছিল" নামে খ্যাত। গিরিশচন্দ্র রামকৃষ্ণ-ভক্ত বলে তাঁর নাটকে ভরি ও নীতি প্রাধান্য পেরেছে। 'চৈতন্যলীলা' (১৮৮৪) বিষমকাল' (১৮৮৯) তার প্রমাণ। আবার বলাভা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বাংলায় যে দেশপ্রমের উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছিল নাটকও তার থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। গিরিশচন্দ্র এই কারণেই লিখেছিলেন স্যাম' (১৯০৪), সিরাজ-উদদৌলা' (১৯০৬), 'মীরকাশিম (১৯০৬), ছত্রপতি শিবাজি' (১৯০৭) 'অশোক' (১৯৩১) নাটকগুলি।

কলকাতার বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবন নিয়ে গিরিশচন্দ্র লিখেছিলেন—প্রফুল' (১৮৮৯), আরানিধি' (১৮৯০), 'বলিদান' (১৯০৫), শাস্তি কি শান্তি' (১৩১৫ বঙ্গাব্দ), 'মায়াবসান' (১৮৯৮) এইসব নাটক। এগুলির মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় ছিল ভ্রাতৃদ্বহু, পানাসক্তি ও ব্যাংক ফেলের সমন্বয়ে ভেঙে পড়া পারিবারিক জীবনের নাটক 'প্রযুম'।

গিরিশচন্দ্রের 'সপ্তমীতে বিসর্জন', 'বড়োদিনের বখশিস', ‘সভ্যতার পাণ্ডা', 'য্যায়সা কি ত্যায়সা বেমিকবাজার' এইসব স্থূল হাস্যরসের নাটকগুলি এই উদ্দেশ্যেই দেখা হয়।

নাটিক হিসেবে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত না হলেও অভিনয়ের দাবিতে লেখা গিরিশচন্দ্রের নাটকগুলি বাংলা নাট্যসাহিত্যের বিকাশের সহায়ক ছিল একথা মেনে নিতেই হয়। যেমন, তেমনি একটি পরিশীলিত নাট্যকটি গড়ে তুলতে গিরিশচন্দ্র বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন। আবার নাটক অভিনয় করতে গেলে শিক্ষকের দরকার লাগে, এই প্রয়োজনটা তিনিই প্রতিষ্ঠা

সাধারণভাবে রবীন্দ্রনাথের নাটকগুলিকে আমরা পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করতে পারি। ভাগগুলি এইরকম(১) কাব্যনাট্য : 'রুদ্রচণ্ড', 'বাল্মীকি প্রতিভা' (১৮৮১), 'প্রকৃতির প্রতিশোধ' (১৮৮৪) 'কালমৃগয়া' (১৮৮৮), ও 'মায়ার খেলা' (১৮৮৮)।

(২) প্রথানুগ বা প্রচলিত রীতিসম্মত নাটক : 'রাজা ও রানী' (১৮৮৯), 'বিসর্জন' (১৮৯০), 'প্রায়শ্চিত্ত' (১৯০৯), 'গৃহপ্রবেশ' (১৯২৫), 'তপতী' (১৯২৯) প্রভৃতি। (৩) কৌতুক নাট্য : 'শেষরক্ষা' (১৮২৮), 'গোড়ায় গলদ' (১৮৯২), বৈকুণ্ঠের খাতা' (১৮৯৭), 'চিরকুমার সভা'

(১৯২৬) ইত্যাদি।

(৪) ৰূপক ও সাংকেতিক নাটক : 'রাজা' (১৯১০), 'অরূপরতন' (১৯১০), 'অচলায়তন' (১৯১২), 'মুক্তধারা'

(১৯২২), রক্তদাবী' (১৯১৬), 'ডাকঘর' (১৯১২), 'কালের যাত্রা' (১৯৩২) প্রভৃতি।

(৫) নৃত্যনাট্য : 'চিত্রাঙ্গদা' (১৯০৬), 'চণ্ডালিকা' (১৯৩৮), 'শ্যামা' (১৯৩৯) প্রভৃতি। রবীন্দ্রনাথ মূলত কবি। কাব্যের অসীমাকাশেই তাঁর চিত্তের মুক্তি। স্বকীয় গীতিপ্রাণতা ভাবাদর্শ রূপায়ণের জন্য আর শেকসপিয়রীয় নাট্যরীতি অনুসরণের দিকে যাননি। ঘটনাগত বিন্যাসকে বাদ দিয়ে হৃদয়ানুভূতিগত দ্বন্দ্বের আদলে। উপলক্ষ জীবনসত্যকে রূপ দেবার চেষ্টা করেন। তাঁর কাব্যধর্মী নাটকের মধ্যে 'রুদ্রচণ্ড', 'বাল্মীকি প্রতিভা', 'কালমৃগয়া, 'মায়ার খেলা' প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এখন এই নাটকগুলির সংক্ষিপ্ত পরিচয় নেওয়া যাক।

● রুদ্রচণ্ড : রবীন্দ্রনাথ বোলপুরে পিতৃদেবের সন্নিধানে থাকার সময় 'পৃথ্বীরাজের পরাজয়' নামে একটি কাব্য রচনা করেন। 'রুদ্রচণ্ড' নাটকটি তারই নাট্যরূপ বলে মনে হয়। এর ভাষা অপরিণত, সাহিত্যিক মূল্য বিশেষ নেই।

• বাল্মীকি প্রতিভা : এই নাটকের কাহিনি নেওয়া হয়েছে দস্যু রত্নাকর-এর কাহিনি থেকে। দেশি-বিদেশি সংগীতের সমন্বয় এ নাটকে আনা হয়েছে। প্রকৃতির প্রতিশোধ' তত্ত্বপ্রধান নাটক, এর আখ্যান কবির নিজস্ব। গীতিমাধুর্য এই নাটকের প্রাণ।

• কালমৃগয়া : এর কাহিনি দশরথ কর্তৃক অন্ধমুনির পুত্র হত্যার কাহিনি থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। 'চিত্রালাদা' না চিত্রাঙ্গদার দেহরূপ ও ব্যক্তিত্বের বর ফুটে উঠেছে। 'গান্ধারীর আবেদন'-এ গান্ধারীর মহান চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। দুঃখের আগুনে পুড়ে পুড়ে কীভাবে সে স্বর্ণকান্তি রূপ ধারণ করেছে তা এই নাটকে দেখানো হয়েছে। 'কর্ণকুন্তীসংবাদ' নাটকে কর্ণের জীবনের ট্র্যাজেডি ও কুন্ডীর কৃতকর্মের জন্য মনস্তাপের ছবি রবীন্দ্রনাথ সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অপরাধী মাতা কীভাবে নিজের পাপ স্বীকার করে অনুতাপ করেছে, ক্ষমা ভিক্ষা করছে তা মর্মস্পর্শী ভাষায় কবি ব্যক্ত করেছেন। 'মালিনী' নাটকে মালিনীর নবধর্মের উপলব্ধি তাকে দেবীর আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

রবীন্দ্রনাথের কাব্য নাট্যগুলিতে কবিতার সার্থক আবেগ এবং নাটকীয় দ্বন্দ্ব সমানভাবে বর্তমান। তাই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নাট্যকাব্য-ধারায় রবীন্দ্রনাথের নাট্যকাব্যগুলি চির অক্ষয় হয়ে থাকবে। রূপক নাটক হল আখ্যানবস্তু ও চরিত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা একটি ভাব বা তত্ত্বের গুপ্তবীজ। তা ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হয়ে শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে এবং লৌকিক জীবনের বর্ণনার মধ্য দিয়ে নাটককার গভীর ভাবসত্যকে প্রকাশ করেন। আর প্রতীক হল স্রষ্টার মনোজগতের অনুভূতিমালার এক সাংকেতিক ও ব্যঞ্জনামণ্ডিত প্রকাশ। প্রতীকের উৎস শিল্পীর অবচেতন বা অর্ধচেতন মন। রবীন্দ্রনাথের রূপক-সাংকেতিক নাটকের মধ্যে 'রাজা', 'ডাকঘর', 'মুক্তধারা', 'রক্তকরবী', 'অচলায়তন' প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

• রাজা বৌদ্ধজাতক গ্রন্থের কুশজাতকের কাহিনি অবলম্বনে 'রাজা' নাটকটি লেখা। এটি অধ্যাত্মরসের নাটক। রাজা এখানে ভগবান, রানি সুদর্শনা মানবাত্মা। জীবাত্মা অনেক সাধনায় পরমাত্মাকে চিনতে পারে এখানে তাই রূপকের মাধ্যমে বলা হয়েছে।

ডাকঘর: ডাকঘর নাটকটিকে বলা চলে একটি ক্ষুদ্র আখ্যান। রুগ্‌ণ বালক অমল ঘরের মধ্যে বন্দি, সে বিশ্বের খবর জানতে চায়, প্রকৃতির সৌন্দর্য আকণ্ঠ পান করতে চায়। এই পৃথিবী তাকে সর্বদা কাছে ডাকে। সীমা-অসীমের সামঞ্জস্যের সাধনাই জীবনসাধনা, অমলের প্রতীকে কবি এ কথাটিই বলতে চেয়েছেন। মুক্তধারা : এ নাটকে যন্ত্ররাজ বিভূতি তার যন্ত্রের দ্বারা প্রাণধারাকে আগলে রেখেছে, রবীন্দ্রনাথ সেই প্রাণকে মুক্ত করতে চেয়েছেন।

• রক্তকরবী : যক্ষপুরীর শ্রমিকরা কীভাবে নিজেদের জীবনকে তুলে কাজের নেশায় বন্দি হয়েছিল তাই এই নাটকে দেখানো হয়েছে। নন্দিনী হল আনন্দের বার্তাবাহী এক নারী যে কি না যক্ষপুরীর রাজাসহ সকলকে প্রাণের স্বাদ পাইয়ে। দেবার চেষ্টা করেছে। মুক্ত নন্দিনীকে দেখে সকলের হিংসা হয়েছে, নন্দিনীকে তারা ছুঁতে চেয়েছে। রক্তকরবী এখানে। একই সঙ্গে আদিসত্তা, বিদ্রোহ ও শক্তির প্রতীক। প্রগতি বিরোধী শোষণ নীতি থেকে মুক্তি লাভই রক্তকরবীর মূল কথা। ) অচলায়তন : এ নাটকে মন্ত্রতন্ত্র, প্রথা ও সংস্কারের প্রভাবে মানবাত্মার স্বাধীন প্রকাশের বিলোপ এবং তা থেকে মুক্তির কথা উচ্চারিত হয়েছে, কখন আচার-বিচারের বেড়াজালে জীবন হাঁপিয়ে ওঠে তখন সকল বাধা ভেঙে ঝড়ের বেগে আবির্ভাব হয় গুরুর। 'কালের যাত্রা', 'রথের রশি' মানুষের সামগ্রিক সংহত সামাজিক বোধকেই জাগ্রত করার নাটক ।

কৌতুক নাট্য : রবীন্দ্রনাথের কৌতুকনাট্যের মধ্যে ‘গোড়ায় গলদ', 'বৈকুণ্ঠের খাতা', 'চিরকুমার সভা', প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। “গোড়ায় গলদ' নাটকে বিভিন্ন চরিত্রের কৌতুককর কাজকর্ম আমাদের হাসির উদ্রেক করে। অনাবিল হাস্য রসসৃষ্টি করার উদ্দেশ্যেই নাটকটি রচিত। এক সরল ও উদার বৃদ্ধের সাহিত্যিক হবার বৃথা চেষ্টাকে হাস্যরসের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ জমিয়ে তুলেছেন তাঁর 'বৈকুণ্ঠের খাতা' নাটকে। চিরকুমার দুটি তরুণ বন্ধু কীভাবে দুটি তরুণীর প্রেমে পড়ে তাদের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে তা 'চিরকুমার সভা' নাটকে দেখানো হয়েছে। নারী পুরুষের ছদ্মবেশে রতভঙ্গের ষড়যন্ত্রের যোগ দিয়ে হাস্যরসকে ঘনীভূত করেছে। • নৃত্যনাট্য : রবীন্দ্রনাথের নৃত্য নাট্যের মধ্যে 'চিত্রাঙ্গদা', 'চণ্ডালিকা', 'শ্যামা' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 'চিত্রাঙ্গদা' নাটক হলেও মূলত কাব্য। যৌন অনুরাগের টানে নর-নারীকে যে একে অপরকে কাছে পেতে চায়, সেই কাছে পেতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই এই নাটকে প্রবল হয়েছে।

মাতা ও কন্যার সংল্যাপে 'চণ্ডালিকা' নৃত্যনাট্য গড়ে উঠেছে। এ নাটকে প্রেমের মধ্যে জাতপাতের সমস্যাকে দেখানো হয়েছে। জাদুবিদ্যা ও ভগবান বুদ্ধের অলৌকিক শক্তির কথা এ নাটকে তুলে ধরা হয়েছে। অস্পৃশ্যতা দূর করার প্রচেষ্টা এই নাটকে আছে। রবীন্দ্রনাথের সর্বশেষ নাটক 'শ্যামা'। এটি 'কথা' কাব্যের ‘পরিশোধ' কবিতার গল্প অবলম্বনে লেখা।

নাট্যশিল্প হল একটি চলমান জীবন শিল্প। জীবনের বাঁক ও বাকা পথে প্রবাহিত জীবন স্রোতকে গোচরে আনাই নাট্যশিল্পের কাজ। নানান দ্বন্দ্ব সংঘাতের মধ্য দিয়ে মূল কাহিনিকে পরিণতির দিকে চালনা করা নাটক রচনার মূল হয়। কিন্তু এই সূত্র ধরেই নাটক রচনা করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। পাশ্চাত্যের ইবসেন, মেটারলিঙ্ক, বার্নার্ড শ প্রমুখ নাটককার প্রাচীন রীতি সর্বদা অনুসরণ করেননি। রবীন্দ্রনাথও বাংলা নাটক রচনার ক্ষেত্রে নতুন রীতি প্রবর্তনের চেষ্টা করেছেন। 'চিত্রাঙ্গদা', 'গান্ধারীর আবেদনা প্রভৃতি কাব্যপ্রধান নাটক। 'বিসর্জন', 'মালিনী', 'গৃহপ্রবেশ' প্রকৃতি।

নানুগ নাটক। 'রাজা', 'রক্তকরবী' প্রভৃতি ৰূপক নাটক। 'বৈকুণ্ঠের খাতা', 'শোধবোধ' প্রভৃতি কৌতুক নাটকগুলি চারবিশ্লেষণ করে রবীন্দ্রনাটকের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করতে পারি— রবীন্দ্র-নাটকের ভাষা কাব্যিক। নাটকের চরিত্রগুলির সংলাপ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কাব্যিক, তা নাট্যকাব্য হোক আর চলিত ধারার নাটকই হোক। রবীন্দ্রনাথের নাটক তত্ত্বপ্রধান ও গীতিপ্রবণ। প্রচলিত নাট্যরীতি সম্মত দ্বন্দ্ব সংঘাত তাঁর নাটকে নেই। কিন্তু নতুন লাঙ্গিক প্রবর্তনের যে প্রচেষ্টা তিনি গ্রহণ করেছেন তা বিশেষভাবেই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য।

রূপক-সাংকেতিক নাটকগুলিতে তিনি মানবজীবনের যে বিভিন্ন রহস্যময় দিকগুলি নিপুণভাবে অঙ্কনের চেষ্টা করেছেন তা ফেলে দেবার নয়। 'রক্তকরবী', 'ডাকঘর', 'অচলায়তন' নাটকগুলি যুগোত্তীর্ণ নাটক হিসেবে স্বীকৃত হবে। রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি নাটক বাদ দিয়ে বেশির ভাগ নাটকই হয়তো মণ সফল নয়। কিন্তু বর্তমান নাটককার ও এশিল্পীরা নতুন করে রবীন্দ্র-নাটক ও তাঁর মণ পরিকল্পনার কথা নিয়ে ভাবতে বসেছেন। তাঁর নাটকের সংলাপ ইঙ্গিতময় এবং মার্জিত। পাত্রপাত্রীদের সংলাপের মধ্য দিয়ে তাদের অন্তরের কথা বেরিয়ে এসেছে। সব মিলিয়ে বলা যায় রবীন্দ্রনাথ বাংলা নাট্য-সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩-১৯১৩) একাধারে কবি ও নাটককার। তাঁর সংগীত ও হাসির গান উচ্চ প্রশংসিত। রামঞ্চের সঙ্গে তিনি সরাসরি যুক্ত না থাকলেও বাংলা নাট্যসাহিত্যকে উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠা করার সার্বিক প্রয়াস। নিয়েছিলেন। নাটক রচনার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষভাবে শেকসপিয়র-এর আদর্শ গ্রহণ করেছেন। তাঁর নাটকগুলিকে নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করে আলোচনা করতে পারি—

→ হাস্যরসাত্মক প্রহসন : প্রহসনধর্মী নাটকের মধ্যে কল্কি অবতার' (১৮৯৫), 'বিরহ' (১৮৯৭), 'গ্রহস্পর্শ' (১৯০০) 'পুনর্জন্ম' (১৯১১), প্রভৃতি প্রধান। এই নাটকগুলিতে দ্বিজেন্দ্রলাল তৎকালীন সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বলেছেন।

নাটকের চরিত্রগুলি রজা-কৌতুকপূর্ণ এবং বেশ উপভোগ্য। চরিত্রগুলির মধ্যে নিছক হাসির ভাড়ামি নেই। • পৌরাণিক নাটক : দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পৌরাণিক নাটকের মধ্যে 'পাষাণী' (১৯০০), 'সীতা' (১৯০৮), 'ভা'(১৯১৪) প্রভৃতি প্রধান। → ঐতিহাসিক নাটক : তাঁর পৌরাণিক নাটকের মধ্যে ‘মেবার পতন' (১৯০৮), 'নুরজাহান' (১৯০৮), 'সাজাহান' (১৯০৯) 'চন্দ্রগুপ্ত' (১৯১১), প্রভৃতি প্রধান। এই নাটকগুলিতে তিনি ইতিহাসের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন। শুধু ইতিহাসের চরিত্রকে চিত্রিত করেননি, চরিত্রগুলির মধ্যে মানবচরিত্রের সাধারণ সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনাকেও জায়গ দিয়েছেন।

→ সামাজিক নাটক : দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের 'পরপারে' (১৯১২), 'বঙ্গনারী' (১৯১৬) নামক নাটকগুলিতে সমকালীন সামাজিক জীবনের ছবি আছে। তবে এই শ্রেণির নাটকগুলি খুব একটা নাট্যোৎকর্ষ লাভ করেনি।

* নাট্যসাহিত্যে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ভূমিকা : ইউরোপীয় নাটকের পথ অনুসরণ করে তিনি বাংলা নাট্য-সাহিত্যের প্রাঙ্গণে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। পুরাণের ভক্তিতরল রাজ্য থেকে মুক্ত করে বাংলা নাটককে নতুন পথে তিনি পরিচালিত করতে চেয়েছিলেন। ঐতিহাসিক নাটকে ইতিহাসের সত্যের পাশাপাশি নাট্যরস সৃষ্টি ও মণ সফলতার দিকটিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। নৈতিকতা ও আদর্শবাদ নাটকের মানকে অনেকক্ষেত্রে ক্ষুণ্ণ করেছে। সংলাপে যথাযথ ভাষার অপপ্রয়োগ, দীর্ঘসংলাপ নাটকের গতিকে শ্লথ করেছে।

তবে দ্বিজেন্দ্রলাল নাটক রচনা করতে গিয়ে কখনোই সাহিত্যিক দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেননি। গিরিশচন্দ্রের যুগের র্যালয়ের নাটক অভিজাত সাহিত্য থেকে অনেক দূরে ছিল, দিজেন্দ্রলাল সেই দূরত্ব ঘোচানোর প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত দুটি নাটকের নাম 'সীতা' (১৯০৮) ও 'সাজাহান' (১৯০৯)। ● বাংলা নাটকের ধারায় দিজেন্দ্রলালের কৃতিত্ব : বলার তামসের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না থেকেও নাটককার হিসেবে যিনি অতীব জনপ্রিয়তা অর্জনে সফলতা লাভ করেছিলেন তিনি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। বাংলা নাট্যজগতে তাঁর আবির্ভাব খানিক বিলম্বিত—গিরিশচন্দ্র তখন খ্যাতির মধ্যগগনে, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ, অমৃতলাল বসু ও ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ-এর মতো নাট্যব্যক্তিত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত। দ্বিজেন্দ্রলাল একাধারে কবি ও নাটককার। বাল্যাবধি কবিতা ও নাটকপাঠে আসত্তি, বিদেশে গিয়ে দর্শক হিসেবে বহু নাটকের অভিনয়ের সঙ্গে সংযোগ, প্রত্যক্ষ জীবনবীক্ষা ও মানবচরিত্র বিশ্লেষণের সহজাত দক্ষতা উত্তরকালে তাঁকে বাংলা নাট্যজগতের অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ নাটককার হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। তাঁর রচিত নাটকগুলিকে মূলত চারটি শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা চলে – প্রহসন, নাট্যকাব্য, ঐতিহাসিক নাটক ও সামাজিক নাটক। দ্বিজেন্দ্রলালের নাট্যপ্রতিভা সর্বাপেক্ষা উত্তমভাবে প্রকাশ পেয়েছে ঐতিহাসিক নাটক রচনার ক্ষেত্রে। বাভা আন্দোলনের সমসময়ে এই শ্রেণির নাটকগুলি রচিত হয়েছিল। এই শ্রেণির রচনায় তাঁর অবদান হল, প্রথমত, প্রধানত মানবিক এবং অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় পুনরুজ্জীবন ও আধ্যাত্মিক মুক্তির পরিবর্তে মানব-আচরণ ও ভাগ্য নির্ভরতা; তৃতীয়ত, জাতীয়তাবোধের উন্মেষের পূর্বেই জাতীয় চরিত্র পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি এবং সবশেষে সব কিছুর ঊর্ধ্বে মনুষ্যত্বের আদর্শকে স্থাপন। মোগল ও রাজপুত—এই দুই বীর জাতিকে কেন্দ্র করে তিনি তার ইতিহাসাশ্রিত নাটকগুলি নির্মাণ করেছেন। "দুর্গাদাস', 'রাণা প্রতাপসিংহ', 'সাজাহান', 'নুরজাহান' তার সাক্ষ্যবাহী।

কিছু অভিনব রীতিবৈচিত্র্য তাঁর নাটকে লক্ষ করা যায় (ক) নাটকের মধ্যে অলৌকিকতা ও আধ্যাত্মিকতা পরিহার ও আধুনিক জীবনভাবনার প্রকাশ, (খ) মহসজ্জার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় নাট্যরীতির আদর্শ অনুসরণ; (গ) চরিত্রের অন্তর্ষন্দু রূপায়ণে যথোচিত গুরুত্ব (ঘ) নাটকীয় সংলাপে স্বগতোকি বর্জনপূর্বক চরিত্রের একাত্মভাষণ (Monologue) প্রচলন;(চ) হাস্যরস সৃষ্টিতে প্রথাগত বিদূষক চরিত্র বর্জন, (চ) কাব্যময় গদ্যসংলাপের প্রচলন। তবে তাঁর নাটকে কবিত্ব একটু বেশি মাত্রায় প্রকাশিত যার ফলে নাটা উপাদান অনেক সময় করিত্বের দ্বারা বিঘ্নিত হয়েছে। আদর্শবাদ, রোমান্স-প্রবণতা ও কবিত্বময় সংলাপ এবং বিভিন্ন চরিত্রের মুখে দীর্ঘ সংলাপ তাঁর নাটকগুলিকে স্বাভাবিকতা গুণ থেকে কিছুমাত্রায় যে বহিত করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

গণনাট্য : দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালের কালোবাজারি, বিয়াল্লিশের ভারত ছাড়ো আন্দোলন, কমিউনিস্টদের জনযুদ্ধনীতি, পঞ্চাশের মন্বন্তর—এই সমস্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে কমিউনিস্ট গোষ্ঠীর তরুণ নাটককারগণ যেসব বিশেষ নাটক রচনা করেন, সেগুলিকেই গণনাট্যের নাটক বলা হয়। যেমন—বিজন ভট্টাচার্যের 'নবান্ন' (১৯৪৪), উৎপল দত্তের 'অঙ্গার' (১৯৫৯) প্রভৃতি। এই সমস্ত নাটকের মধ্য দিয়ে জনগণকে তাদের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করা ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামমুখী হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।

• নবনাট্য গণনাট্য আন্দোলনের সন্ধ্যে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ গণনাট্যের অতি বামপন্থা নীতি, রাজনীতি সর্বস্ব নাট্যাদর্শকে মেনে নিতে পারেননি। এরা গণনাট্য সংঘ ভেঙে বিশেষ নাট্যগোষ্ঠী গড়ে তোলেন এবং তাঁদের রচিত নাটকই হল নবনাট্যের নাটক। আর এই বিশেষ নাট্য আন্দোলনই হল নবনাট্য আন্দোলন। বিজন ভট্টাচার্য, গঙ্গাপদ বসু, যশোর মজুমদার, অমর গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ গড়ে তোলেন 'বহুরূপী' (১৯৪৮) নামে নাট্যগোষ্ঠী।

বিজন ভট্টাচার্য (১৯১৫-১৯৭৮) - বিজন ভট্টাচার্য মার্কসবাদে বিশ্বাসী এবং শ্রেণি-সংগ্রামের বাণী প্রচারের উদ্দেশ্যে ছিলেন অবিচল। কিন্তু তিনি প্রচার সর্বস্বতাকে মেনে নিতে পারেননি। তাঁর একাঙ্ক নাটকের মধ্যে 'আগুন' (১৯৪৩), 'জবানবন্দী' (১৯৪৩), 'মরাচাদ' (১৯৪৬-১৯৪৮), 'কলঙ্ক' (১৯৫০-১৯৫১), 'লাস ঘুইরা যাউক' (১৯৭০), হাঁসখালির হাঁস (১৯৭৪-১৯৭৭) প্রভৃতি প্রধান। পূর্ণাঙ্গ নাটকের মধ্যে 'নবান্ন' (১৯৪৪), ‘গ্রোত্রান্তর' (১৯৫৬-১৯৫৯), 'মরাচাঁদ' (১৯৬০), দেবীগর্জন (১৯৬৬-১৯৬৯), 'ধর্মগোলা' (১৯৬৭), 'গর্ভবর্তী জননী' (১৯৬৯-১৯৭১) 'গুপ্তধন' (১৯৭২) প্রভৃতি প্রধান।

সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, সংস্কার ও লোকায়তধর্ম প্রভৃতিকে কৃষকের বাঁচার লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। যেমন— 'নবান্ন' (১৯৪৪)। জোতদারদের বিরুদ্ধে দলিত কৃষকের উত্থানের সঙ্গে পৌরাণিক অনুষঙ্গকে মিশিয়ে অসাধারণ নাট্যরস সৃষ্টি করেছেন ‘দেবীগর্জন' নাটকে। ‘কলঙ্ক' নাটকে বাঁকুড়া জেলার সাঁওতাল জনজীবনের ছবি পাওয়া যায়। ‘গোত্রান্তর' নাটকে আছে পূর্ববঙ্গের ছিন্নমূল উদ্‌বাস্তুদের জীবনালেখ্য। 'অবরোধ' নাটকটি শ্রমিকদের উপর মালিক শ্রেণির নির্মম অত্যাচারের কাহিনি।

বিজন ভট্টাচার্য বাংলা নাট্য সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিশেষ ব্যক্তিত্ব। তার নাটকের মধ্যে বাংলার সমাজ চিত্রিত হয়েছিল, মানুষের সংগ্রামী মনোভাব সক্রিয় গণআন্দোলনের শক্তি ও ভাষা লাভ করেছিল।

বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী উৎপল দত্ত (১৯২৯-১৯৯৩) ছিলেন একাধারে অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাটককার, নাট্য পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেতা। তাঁর প্রধান নাটকগুলির মধ্যে 'ফেরারি ফৌজ' 'কল্লোল', 'ব্যারিকেড', ‘মানুষের অধিকারে, 'টিনের তলোয়ার', 'ছায়ানট', 'ঘুম নেই', 'রাইফেল', 'ভুলি নাই প্রিয়া', 'মাও সে তুং' প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 'ফেরারি ফৌজ' (১৯৬১) ত্রিশের দশকে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত। জীবনের স্বাভাবিক চাওয়া পাওয়ার কথা এই নাটকে ফুটে উঠেছে। 'কল্লোল' (১৯৬৫) নাটকটি ১৯৪৬-র নৌবিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে রচিত। নাট্যকার উৎপল দল নৌবিদ্রোহকে এখানে শ্রেণি সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। এ নাটকে সশস্ত্র বিপ্লবের পক্ষে নাটককার রায় দিয়েছেন।

“মানুষের অধিকারে' নাটকে সহিংস আন্দোলনের প্রতি আস্থা রেখে দেখিয়েছেন মুক্তির জন্য হত্যার বদলে হত্যা, হিংসার বদলে হিংসা কোনো অন্যায় নয়। নাটকটি আমেরিকার বর্ণবৈষম্যের প্রেক্ষাপটে রচিত। টিনের তলোয়ার' (১৯৭১) নাটকটি উনিশ শতকের প্রমোদপ্রিয় 'বাবু'-দের বিরুদ্ধে মঞ্জুশিল্পীদের প্রতিবাদের কাহিনি। 'ছায়ানট' নাটকে চিত্রনির্মাতাদের জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা ফুটিয়ে তুলেছেন। 'তিতুমীর' (১৯৭৮) নাটকটি ফকির বিদ্রোহের। প্রেক্ষাপটে রচিত। ‘ব্যারিকেড' (১৯৭২) জার্মানিতে নাৎসিবাদের উত্থানের মুহূর্তে সাম্যবাদীদের প্রতিবাদের প্রকাশ।। উৎপল দত্তের অধিকাংশ নাটকেই প্রতিরোধের ঐতিহাসিক ঘটনার ভিত্তিতে রচিত।

শুধু নাট্য রচনায় নয়, নাট্য আঙ্গিকের ক্ষেত্রে তিনি নতুন নতুন চিন্তা চেতনা সংযোজন করেছিলেন। অভিনয়, ম+সজ্জা, পরিচালনা সব বিষয়েই তিনি অসাধারণ শিল্প নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন।