অধ্যায়-17, বাংলা ভাষাবৈচিত্র্য

রাঢ়ি বঙ্গালীর দুইয়ের অভ্যন্তরে একাধিক বিভাসার জন্ম হয়েছে ।

দুটি বিভাগ-পূর্ব পশ্চিম, সূক্ষ্ম বিচারে রাঢ়ির বিভাগ ৪টি। এগুলি পূর্ব (east-central) কলকাতা, উত্তর পরগনা, হাওড়া, পশ্চিম-মধ্য (west-central) বীরভূম, হুগলি, বাঁকুড়া। উত্তর-মধ্য (north-central) মুরশিদাবাদ, নদিয়া, দক্ষিণ-মালদহ। (ঘ) দক্ষিণ-মধ্য উত্তর-পূর্ব মেদিনীপুর,

বঙ্গালীর বিভাষা ছিল—(ক) বিশুদ্ধ বঙ্গালী (ঢাকা, যশোহর) (খ) চাটিগ্রামী (চট্টগ্রাম নোয়াখালি)।

বাংলা ভাষার উপভাষা।

র্যালী উপভাষায় অপিনিহিতি লক্ষিত হয়।

ঝাড়খণ্ডি উপভাষায় নামধাতুর ব্যাপক ব্যবহার  পরিলক্ষিত হয় ।

যে জনসমষ্টি একই ধরনের ধ্বনিসমষ্টির বিধিবদ্ধ রূপের দ্বারা নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময় করে, ভাষাবিজ্ঞানীরা তাকে একটি ভাষা-সম্প্রদায় বলেন।

ভাষা-উপভাষার মধ্যে পার্থক্য চূড়ান্ত নয়, আপেক্ষিক শ্রেণিগত নয়, মাত্রাগত ।

কোনো বিশেষ কারণে যখন বিশেষ প্রদেশের উপভাষা প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক মর্যাদা পায়, তখন তাকে মানা উপভাষা বলে। যেমন- কলকাতার উপভাষা ইংরেজ শাসনকালে মান্যতার মর্যাদা পেয়েছে।

কথাটির প্রবক্তা হলেন ম্যাকসমূলর।

প্রত্যেকটি ভাষার ধ্বনি, শব্দ বা পদবিন্যাসরীতির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বাংলা, সংস্কৃত, ইংরেজি সব ভাষারই ধ্বনি, পদগুচ্ছের সংগঠন রীতি এক নয়। তেমনি সমস্ত জনগোষ্ঠী একই ভাষা ব্যবহার করে না। যে জনসমষ্টি একই ধরনের ধ্বনিসমষ্টির বিধিবদ্ধ রূপের ধারায় নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময় করে ভাষাবিজ্ঞানীরা তাকে একটি ভাষা সম্প্রদায় (Speech Community) বলেন। সেনাদ ব্লুমফিল্ড (Leonard Bloomfield) তাঁর 'ল্যাংগুরোজ" গ্রন্থে ভাষা-সম্প্রদায় বোঝাতে এ কথা জানান "A Group of people who use the same system of speech signals is a Speech Community." আবার এমনও অনেক সময় দেখা যায় যে, একই ভাষা-সম্প্রদায় যখন বৃহত্তর ভৌগোলিক পরিসর জুড়ে বসবাস করে তখন সেই ভাষা সম্প্রদায়ের মধ্যেই ভাষা ব্যবহারের কম-বেশি ভিন্নতা বা বৈচিত্র্য দেখা যায়। সেই ভাষা ব্যবহারের ভিন্নতা বা বৈচিত্র্যকে তখন উপভাষা (dialect) বলে।

প্রকৃত প্রস্তাবে, এই ভাষা-বৈচিত্র্য বা উপভাষাই একটি ভাষার প্রকৃত পরিচয় মূর্ত করে তোলে। একটি চলিত বা প্রাণবন্ত ভাষার প্রধান অবলম্বন তার ভাষাবৈচিত্র্য বা উপভাষাগুলি। বাংলা ভাষার পাঁচটি উপভাষা। রাঢ়ি, বল্যালী, বরেন্দ্রী, ঝাড়খণ্ড, কামরূপী বা রাজবংশী নিয়ে বাংলা ভাষাবৈচিত্র্য গড়ে উঠেছে।

 

উপভাষা: উপভাষা হল একটি ভাষার অন্তর্গত এমন বিশেষ বিশেষ রূপ যা এক-একটি বিশেষ অঞ্চলে প্রচলিত, যার সঙ্গে আদর্শ ভাষা (Standard Language) বা সাহিত্যিক ভাষা (Literary Language) ধ্বনিগত রূপগত এবং বাগধারাগত পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য এমন সুস্পষ্ট যে ওইসব বিশেষ বিশেষ অঞ্চলের রূপগুলিকে স্বতন্ত্র বলে ধরা যাবে, অথচ পার্থক্যটা যেন এত বেশি না হয় যাতে আঞ্চলিক রূপগুলিই এক একটি সম্পূর্ণ পৃথক ভাষা হয়ে ওঠে।

• ভাষা-উপভাষার মধ্যে সম্পর্ক : ভাষা ও উপভাষার মধ্যে পার্থক্যটি চূড়ান্ত নয়, আপেক্ষিক। শ্রেণিগত নয়, মাত্রাগত। একই ভাষার মধ্যে আঞ্চলিক পৃথক পৃথক রূপকে উপভাষা বলে। কিন্তু এই আঞ্চলিক পার্থক্য বেড়ে চরমে গেলেই আবার একই ভাষা থেকে একাধিক ভাষার জন্ম হয়। অর্থাৎ আঞ্চলিক রূপগুলি তখন একই ভাষার উপভাষা নয়, তখন সেগুলি এক-একটি স্বতন্ত্র ভাষা।। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে বাংলা আর অসমিয়া প্রথমে একই ভাষার দুটি আঞ্চলিক রূপ ছিল। পরে ক্রমে বঙ্গাদেশ ও অসম-এর ভাষার আঞ্চলিক পার্থক্য যখন বেড়ে গেল তখন বাংলা ও অসমের আঞ্চলিক রূপদুটিকে আলাদা ভাষা রূপে চিহ্নিত করা হল। বাংলা এবং অসমিয়া ভাষা ।

বাংলা ভাষার উপভাষাগুলির প্রত্যেকটির কিছু-কিছু ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আছে।

• রাঢ়ীর   ধনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য (Phonological features) : (ক) উচ্চারণে অ-কারের ও-কার প্রবণতা ই, ও, এবং য-ফলা যুক্ত বাগানের পূর্ববর্তী এর উচ্চারণ হয় ""

যেমন—অতি > ওতি। মধুমাধু লক্ষ লোকশো সত্য> শোভো। অন্য ক্ষেত্রেও অ-কারের এ-কার প্রবণতা দেখা যায়, যেমন— মনমোন, বন বোন। তবে অ-কারের এই এ-কার প্রবণতা না। যেমন— দল-এর উচ্চারণ গোল হয় না।

(খ) অভিশ্রুতি রাঢ়ি উপভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য, যেমন- রাখিয়া রেখে, করিয়া > কোরে, দেখিয়া > দেখে।

(1) রাঢ়িতে স্বরসংগতির ফলে শব্দের মধ্যে পাশাপাশি বা কাছাকাছি অবস্থিত বিষম স্বরধ্বনি সম নিতে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। দেশি দিশি (দ+অংশ++++ই) ইত্যাদি। (খ) শব্দমধ্যস্থ নাসিক্য-ব্যঞ্জন যেখানে লোপ পেয়েছে সেখানে পূর্ববর্তী ঘরের নাসিকীভবন ঘটেছে। যেমন—বন্ধ > বাঁধ, চন্দ্র > চাঁদ (এসব ক্ষেত্রে নাসিক্য-বাঞ্জন 'ন' লোপ পেয়েছে এবং পূর্ববর্তী স্বর দীর্ঘ হয়ে  এবং অনুনাসিক হয়ে 'আ' হয়েছে)। কোথাও কোথাও নাসিকা-বাঞ্জন না থাকলেও স্বরধ্বনির স্বতোনাসিকীভবন দেখা যায়। যেমন— পুস্তর > পুঁথি পুঁথি। এখানে পুস্তক শব্দে কোনো নাসিক্য-বাজন নেই তা সত্ত্বেও তা স্বরধ্বনিটি অনুনাসিক হয়ে তা উচ্চারিত হয়।

(ঙ) শব্দের আদিতে শ্বাসাঘাত থাকলে শব্দের অন্তে অবস্থিত মহাপ্রাণ ধ্বনি স্বপ্নপ্রাণ উচ্চারিত হয়। যেমন- দুধ দুদ, মাছ > মাচ, বাঘ > রাগ ইত্যাদি।

(চ) শব্দের অস্তে অবস্থিত অঘোষ ধ্বনি কখনো-কখনো সঘোষ ধ্বনি হয়ে যায়। যেমন- ছত্র ছাত> ছাদ, কাক > কাগ। ব্যতিক্রম রাত্রি > রাত। অন্যদিকে শব্দের অন্তে অবস্থিত সঘোষ ধ্বনি কখনো-কখনো অঘোষ হয়ে যায়। যেমন—ফারসি গুলাব > গোলাপ, ইত্যাদি। (ঘ) 'ল' কোথাও-কোথাও 'ন-রূপে উচ্চারিত হয়। যেমন— লবণ > নুন, লুচি > নুচি, লোহা > নোয়া।

বাড়ির রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য (১) কর্তৃকারক ছাড়া অন্য কারকে বহুবচনে 'দের বিভক্তি যোগ হয়। যেমন— কর্মকারক। আমাদের বই পাও। করাকারক । তোমাদের যারা একাজ হবে না।

(খ) রাঢ়িতে গৌণ কর্মের বিভক্তি হচ্ছে 'কে' এবং মুখ্য কর্মে কোনো বিভক্তি যোগ হয় না। যেমন— আমি রামকে (গৌণকম) ঢাকা (মুখ্য কর্ম) ধার দিয়েছি। রাঢ়িতে সম্প্রদান কারকেও 'কে' বিভক্তির ব্যবহার করা হয়। যেমন দরিদ্রকে অর্থদান করো।
(গ) অধিকরণ কারকে 'এ' এবং 'তে' বিভক্তির প্রযোগ হয়। যেমন- ঘরেতে ভ্রমর এল গুনগুনিয়ে।
(ঘ) সদ্য অতীত কালে প্রথম পুরুষের অকর্মক ক্রিয়ার বিভক্তি হল 'ল'। যেমন- সে গেল। কিন্তু সকর্মক ক্রিয়ার বিভক্তি হল 'লো। যেমন- সে বললে। সদ্য অতীত কালে উত্তম পুরুষের ক্রিয়ার বিভক্তি হল 'লুম' যেমন— আমি বললুম।

রাঢ়ি উপভাষার নিদর্শন : কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা— “একজন লোকের দুটি ছেলে ছিল। তাদের মধ্যে ছোটোটি বাপকে বললে বাবা, আপনার বিষয়ের মধ্যে যে ভাগ আমি পাব, তা আমাকে দিন। তাতে তাদের বাপ তার বিষয়-আশয় তাদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন।

বঙ্গালী উপভাষা মূলত পূর্ববঙ্গের উপভাষা। যশোহর, খুলনা, ফরিদপুর, নোয়াখালি, চট্টগ্রাম, ঢাকা, মৈমনসিংহ- প্রভৃতি এলাকায় এই উপভাষা প্রচলিত।

কবিতায় দৃষ্টান্ত কোথায় পার কলসী কইন্যা কোথায় পাব দড়ি। তুমি হও গহীন গাজা আমি ডুইবা মরি।।

মৈমনসিংহ গীতিকা ।

•বঙ্গালীর  ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য :

(ক) অপিনিহিতির প্রাচুর্য, যেমন— আজি > আইজ, করিয়া > কইরা, বাক্য > বাইক, যন্ত্র > যইথ, রাক্ষস > রাইখস ইত্যাদি।

(গ) নাসিক্য-ব্যঞ্জনধ্বনির (ই, ন, ম ইত্যাদির) লোপ হয় না, ফলে এই রকম লোপের প্রভাবে পূর্ববর্তী স্বরধ্বনির নাসিক্যীভবনের প্রক্রিয়া ব্যালীতে দেখা যায় না। যেমন চাদ (এখানে নাসিক্য বাঞ্জন 'ন' রক্ষিত আছে)।

(গ) উচ্চমধ্য অর্ধসংবৃত সম্মুখ স্বরধ্বনি 'এ' র্যালীতে নিম্নমধ্য অর্ধবিবৃত সম্মুখ স্বরধ্বনি 'অ্যা'-রূপে উচ্চারিত হয়। | যেমন দেশ > দ্যাশ।

(ঘ) উচ্চমধ্য অর্ধসংবৃত পশ্চাৎ স্বরধ্বনি 'ও' উচ্চারিত হয় উচ্চসংবৃত পশ্চাৎ স্বরধ্বনি 'উ' রূপে। ফোন—লোক > লুক, সোদপুর > সুদপুর, দোষ ।

(ঙ) সঘোষ মহাপ্রাণ বর্ণ বালীতে সঘোষ অল্পপ্রাণ রূপে উচ্চারিত হয়। তা ছাড়া এগুলি উচ্চারণের সময় স্বরতন্ত্রী দুটি যুক্ত হয়ে স্বরপথ রুদ্ধ করে দেয় এবং বাইরের বায়ু আকর্ষণ করে উচ্চারণ করতে হয়। এই জন্যে এগুলি বুদ্ধস্বরপথ চালিত অন্তর্মুখী (Glottalic Ingressive) ধ্বনি। এগুলিকে কেউ-কেউ অবরুদ্ধধ্বনি (Recur

sive) বলেছেন। উদাহরণ—ভাই > বাই, ভাত > বাত, ঘর > গায়।

(চ) চ. ই. জ্ প্রভৃতি খৃষ্টধ্বনি (affricate) বঙ্গালীতে প্রায় উচ্চাধ্বনি (fricative/ spirant) রূপে উচ্চারিত হয়। যেমন— চু> > > (2) খেয়েছে > খাইসে জানতে পারো না > জাস্তি (zanti) পারো না।

(জ) স্' ও 'শ' খানে 'হ' উচ্চারিত হয়। যেমন— শাক > হাগ, সে > হে, বসো > বহো। (২) শব্দের আদিতে ও মধ্যে 'হ' স্থানে 'অ' উচ্চারিত হয়। যেমন— হয় > অয়।

(ঝ) তাড়িতধ্বনি 'ড্র' কম্পিতধ্বনি বা রূপে উচ্চারিত হয়। যেমন— বাড়ি > বারি।

বঙ্গালীর রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য :

(ক) কর্তৃকারকে 'এ' বিভক্তি যুক্ত হয়। যেমন—রামে যায়। মায়ে ডাকে।

(খ) বঙ্গালীতে গৌণ-কর্মে ও সম্প্রদান কারকে 'রে' বিভক্তি যোগ হয়। যেমন— আমারে দাও। রামেরে কইসি। গরিব মানুষেরে দুটি পয়সা

(গ) অধিকরণ কারকের বিভক্তি হল 'ত'। যেমন-বাড়ীত থাকুম।

(ঘ) কর্তৃকারক ছাড়া অন্য কারকে বহু বচনের বিভক্তি হল 'গো। যেমন— আমাগো খাইতে দিবা না। (ঙ) ক্রিয়ারূপের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল— রাঢ়িতে যেটা সাধারণ বর্তমানের রূপ রঙ্গালীতে সেটা ঘটমান বর্তমান অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন- মায় ডাকে (অর্থাৎ মা ডাকছে)।

(চ) সদ্য অতীতে উত্তম পুরুষের ক্রিয়ার বিভক্তি হল 'লাম'। যেমন— আমি খাইলাম।

(২) রাঢ়িতে যেটা ঘটমান বর্তমানের বিভক্তি বলালীতে সেটা পুরাঘটিত বর্তমানের বিভক্তিরূপে ব্যবহৃত হয়। যেমন— আমি করসি (< করছি) (অর্থাৎ আমি করেছি)। (জ) মধ্যম পুরুষের সাধারণ ভবিষ্যৎ কালের বিভক্তি হল 'বা'। যেমন— তুমি যারা না? (ঝ) উত্তম পুরুষের সাধারণ ভবিষ্যৎ কালের বিভক্তি হল “উম্ ও ‘মু’। যেমন— আমি যামু (অর্থাৎ আমি যাব) : খেলুম না (অর্থাৎ আমি খেলব না)। (ঞ) রাঢ়িতে অতীত কালের ক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নঞর্থক অব্যয় যেখানে ‘নি’, বঙ্গালীতে সেখানে 'নাই'। যেমন— তুমি যাও নাই? (তুমি যাওনিঃ) (ট) অসমাপিকার সাহায্যে গঠিত ক্রিয়ার সম্পন্নকালের মূল ক্রিয়াটি আগে বসে, অসমাপিকা ক্রিয়াটি পরে বসে। যেমন— রাম গ্যাসে গিয়া (রাম চলে গেছে)। • বঙ্গালী উপভাষার নিদর্শন :

ঢাকা (মানিকগঞ্জ) : "য়্যাক জনের দুইডা ছাওয়াল আছিলো। তাগো মৈদ্দে ছোটডি তার বাপেরে কৈলো, “বাবা, আমার বাগে যে বিত্তি ব্যাসাদ পরে, তা আমারে দ্যাও।" তাতে তিনি তান বিষয়- সোম্পত্তি তাগো মৈদ্দে বাইটা দিল্যান।

কামরূপী উপভাষার ব্যবহার : কামরূপী হল উত্তর-পূর্ব বঙ্গের উপভাষা অর্থাৎ রংপুর, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, দার্জিলিং প্রভৃতি অঞ্চলের ভাষা। কামরূপীর সঙ্গে বরেন্দ্রীর সাদৃশ্য খুবই কম। কামরূপীর সঙ্গে সাদৃশ্য বেশি বঙ্গালীর। কামরূপী হল কামরূপের (অসমের) নিকটবর্তী বঙ্গালীরই রূপান্তর। কোনো কোনো বৈশিষ্ট্য পূর্ববঙ্গের, কোনো কোনো বৈশিষ্ট্য উত্তরবঙ্গের কাছাকাছি।

কামরূপী উপভাষার ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য: সঘোষ মহাপ্রাণ ধ্বনি শব্দের আদিতে বজায় আছে। মধ্য ও অন্ত্য অবস্থানে প্রায়ই পরিবর্তিত হয়ে অল্পপ্রাণ হয়ে গেছে। যেমন— সমঝা সমঝি সজা-সমুজি। (খ) বঙ্গালীর মতো কামরূপীতেও 'ড়' হয়েছে 'র' এবং 'ঢ়' হয়েছে 'রহ'। কিন্তু এই প্রবণতা সর্বত্র দেখা যায় না।

কোচবিহারের উচ্চারণে 'ড' অপরিবর্তিত আছে। যেমন—বাড়ির। (গ) রাঢ়িতে যেমন সাধারণত শব্দের আদিতে শ্বাসাঘাত পড়ে। কামরূপীতে তেমন শ্বাসাঘাত শব্দের মধ্যে এবং অস্তেও পড়তে দেখা যায়।

(ঘ) চ, জুস/শ যথাক্রমে এই উপভাষায় 'স', 'জ'. ই'। কিন্তু এই বৈশিষ্ট্য সর্বত্র অনুসৃত নয়। যেমন- গোয়ালপাড়া রংপুরের উচ্চারণে 'স' রক্ষিত আছে। আবার দিনাজপুরে 'চ' অপরিবর্তিত। যেমন—সতেরো > সাতির সমঝাবার > সমজেবার কিন্তু দিনাজপুরে 'বাচ্চা"।

(ঙ) 'ও' কখনো কখনো 'উ' রূপে উচ্চারিত হয়। যেমন— কোন্ > কুন, তোমার > তুমার। তবে এই প্রবণতা সর্বত্র সুলভ নয়। যেমন— কোচবিহার, গোয়ালপাড়া প্রভৃতি স্থানে 'কোন' উচ্চারণই প্রচলিত।

কামরূপী উপভাষার অন্য আর একটি নাম হল রাজবংশী ।

• কামরূপী উপভাষার রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য : (ক) সামান্য অতীতে উত্তমপুরুষে 'ন' এবং প্রথম পুরুষে ইল' বিভক্তি দেখা যায়। যেমন— সেবা কন্নু (সেবা করলাম), কহিল (বলল), ধরিল (ধরল)।

(খ) উত্তম পুরুষের একবচনের সর্বনাম হল— 'মুই, 'হাম'। (গ) অধিকরণের বিভক্তি হল 'ত' । যেমন— পাছত > পাছ‍ (পশ্চাতে)।

(ঘ) সম্বন্ধ পদের বিভক্তি হল— 'র', 'ক'। যেমন— বাপোক (বাপের)। (৫) গৌণ কর্মের বিভক্তি হল 'ক'। যেমন— বাপক (বাপকে), হামাক্ (আমাকে)।

• কামরূপী উপভাষার নিদর্শন :

কোচবিহার— “এক জনা মানসির দুই কোনা বেটা আছিল। তার মদ্দে ছোট জন উয়ার বাপোক কইল, 'বা, সম্পত্তির যে হিস্যা মুই পাইম্‌ তাক্ মোক দেন।” তাতে তায় তার মালমাত্তা দোনো ব্যাটার বাটিয়া-চিরিয়া দিল।”

বাংলা ভাষার বৈচিত্র্যগুলির সবগুলিই বাংলা ভাষার বিশিষ্ট রূপ করেছে। এর কোনো একটিকে দিয়ে বাংলা ভাষার সামগ্রিক পরিচয় পাওয়া যায় আবার কোনো একটি বিশেষ রূপকে বাংলা ভাষা হিসেবে সুকুমার সেন "ভাষার ইতিবৃত্ত'-এ বলেছেন ভাষা উপভাষার সৃষ্টি হয়। আমরা বলতে পারি এ ধারণা বলতে পারি বিভিন্ন উপভাষার সমন্বয়েই একটি ভাষার প্রকৃত অন্যভাবে বললে এমন দাঁড়ায় যে একটি ব্যাপক এবং (abstract) যাবনা। আর উপভাষা সেই ভাষার (concrete) গ্রুপ। ম্যাকসমূলর প্রকৃত উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন. The real natural life Language is its dialect.